শালাবাবু জিন্দাবাদ
শৌভিক রায়
- আপনার সঙ্গে কি আর দরদাম করা যায়? সবাই কি এক নাকি! সম্পর্কের একটা ইয়ে থাকে। তাই না?
খুব ভাল লাগল কথাগুলো। ঠিকই তো। সম্পর্কের একটা ইয়ে তো সত্যিই থাকে। মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম গিন্নিকে। একদম সঠিক মানুষের সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
ঘটনা হল, দিন কয়েক আগে গিন্নির একটা কাজে কোর্টে যেতে হয়েছিল। টাইপ নিয়ে বসে থাকা এক মহিলাকে দেখে তিনি ঠিক করলেন, কাজটা তাকেই দেবেন। একেই মহিলা। তায় আবার মুহুরি!
ভাল সিদ্ধান্ত। এমনিতেই দুনিয়ার সব গিন্নি ভাল সিদ্ধান্ত নেন। অন্তত আমার মতো মিনসে বোকা কর্তাদের থেকে। আর এখানে তো নারী প্রগতি। এক নারী আর একজনকে সাহায্য করবেন। সেটাই স্বাভাবিক। আমার কথা বলার প্রয়োজনই নেই।
মহিলা কাজটা নিলেন। নিয়েই পাশের লোকটিকে ফিসফাস করে কিছু বললেন। লোকটি গম্ভীর মুখে টাইপ করলেন। সেটা হাত বদল হয়ে মহিলার মাধ্যমে গিন্নির হাতে এলো। মহিলার টাকা মিটিয়ে দেওয়ার পর সেটাও হাতবদল হয়ে অন্যদিকে গেল কিনা জানি না।
বেরোতে যাব হঠাৎ মধুর কন্ঠে,
- রীনাদি...তুমি!
- আরে...তুই। এখানে কেন!
- আমি তো এখানেই। বাবার জায়গায়। মুহুরির কাজ করি। ভুলে গেছ?
- ওহহহহ....তাই তো! একদম ভুলে গেছিলাম রে....
- হে হে....ওরম হয়...সব কি আর মনে থাকে! তা দিদি কেমন আছো?
- এই তো রে। তোরা ভাল?
- চলছে গো। সেই দিন তো আর নেই। তোমার বাবা মানে আমাদের বলিপ্রসাদ মাস্টারমশাই, সত্যেনবাবু...খুব মনে পড়ে!...উনি?
- তোর জামাইবাবু।
- হ্যাঁ হ্যাঁ... মনে পড়েছে। অনেকদিন আগে দেখছি তো। জাম্বু ভাল তো?
একপেশে একটা হাসি দিই এরকম ক্ষেত্রে। এখনও তাই করলাম। গিন্নি দেখি আবার মুখ খুলেছে,
- তুই আছিস জানলে কাজটা...
- আরে না না। একই ব্যাপার।
- তবু রে...তুই দেওয়ানহাটের ছেলে। বাপের বাড়ির মানুষ। ভাই বলে ডাকি...
- ও ব্যাপার না দিদি। একজন করলেই হল! কী করালে?
- একটা এফিডেভিট। নোটারি।
- আচ্ছা আচ্ছা....কত নিল?
- দুশো।
- একশো রেট এমনি। সেটা যা হোক। ভগবান তো তোমাকে কম দেয়নি। না হয় একটু বেশিই দিলে!
- সে কি রে! ডাবল নিয়ে নিল! দাঁড়া জিজ্ঞেস করি তো।
- না না করো কী! বোঝো না? নিজেদের মধ্যে! ঝামেলা করবে তো। বলো না দিদি।
- তাই বলে ঠকাবে! ধুস। বাজে হল। এরপর দরকার হলে তোর কাছেই...
- হ্যাঁ হ্যাঁ। চলে আসবা। কোনও সমস্যা নাই। আমার ফোন নম্বরটা রাখো। জাম্বু আপনি সেভ কইরে নেন।
আজ দিন কুড়ি পরে, সেই শহরতুতো শালাবাবুর কাছেই নিজের প্রয়োজনে এসেছি। একা। তিনটে কাজ নিয়ে।
- কি গো.... চিনলে তো?
- হ্যাঁ হ্যাঁ....চিনব না সেটা হয় নাকি!
- যাক। কয়েকটা কাজ ছিল।
- আরে বসেন বসেন। কী দরকার বলেন। আগে চা খান। ওইইই...চা দে। অবশ্য যা চা!
- না না চা খাব না। খেয়েই এলাম মাত্র।
- খাবেন না? ওইইই....এক কাপ। বলেন এবার।
- এই যে এই তিনটে কাজ করতে হবে। দুটো এফিডেভিট। টাইপ আছে সঙ্গে। আর একটা এটা।
- অ। দিচ্ছি করে। বসেন।
বসলাম। খট খট টাইপ দেখলাম। উঠে গিয়ে কোথায় কী সই টই নিয়ে এলো। ট্যারা চোখে সেটাও লক্ষ্য করলাম।
এবার খরচপাতি। সেটা জানতে চাওয়াতেই ওই কথাগুলি। ভাল লাগল। সত্যিই তো। আমার সঙ্গে আর কী দরদাম! জাম্বু বলে কথা।
মিটল সেটাও,
- এই যে এফিডেভিটটা.... এটা কিন্তু সামনে না থাকলে সই করে না। বুঝলেন না? ছয়শ রেট। কিন্তু আপনার জন্য পাঁচশো। আর একটার ওত ঝামেলা নাই। তিনশো রেট। নেব না। দুইশো দিয়েন। আর এই যে টাইপ। কেউ যদি চারশ টাকার নিচে করে তো আমাকে বইলেন। কিন্তু আমি কি ওত নিতে পারি? তাও আপনার কাছে! ওই আড়াইশ দিলেই হবে....
খুব খুশি হলাম। কত কম করে রাখছে! নিজেরই খারাপ লাগল,
- আরে ওত কমালে তোমার পোষাবে?
- দ্যাখেন...সম্পর্ক একটা বড় কথা। সব জায়গায় ধান্দা করলে চলে? আমরাও তো মানুষ। এই যে আপনি বললেন নিজে থেকে, এটা কেউ বলে না। এখানেই, বুঝলেন না, পার্থক্য! হবে না? কোন বংশের মানুষ আপনি সেটা তো বুঝতে হবে! যেটা বলছি সেটাতেই হত। তাও আপনি যখন বললেন, তখন আর পঞ্চাশ দিয়েন। গোটা হয়ে যাবে। এমনিতে পাঁচ দুই সাত আর আড়াইশ মানে সাড়ে নয়শ হয় আর কি! ওই হাজার দেন। হবে। আপনারও তো একটা কথার দাম রাখা উচিত।
খুব ভাল লাগল। দিলাম টাকা। বাঁ হাত ডান হাতের কনুইয়ে ঠেকিয়ে টাকাটা নিল।
চলে আসবার আগে বললাম,
- একদিন বাড়িতে এসো তাহলে।
- হ্যাঁ হ্যাঁ যাব যাব। কিন্তু দাদার বাড়িটা যেন কোথায়?
- হাসপাতালের আউটডোরের সামনে দিয়ে এগিয়ে দেখবে ওষুধের দোকান। ওর সঙ্গে লাগানো গলি। ঢুকে পড়বে। বাঁ হাতে চার নম্বর বাড়ি। বাড়ির নাম মুজনাই....
- ওহ...বুঝছি বুঝছি...ওই খানে না আমাদের দেওয়ানহাটের একজনের বিয়ে হয়েছে।
দেওয়ানহাটের আর একজন? আমাদের ওখানে! ওই কয়েকটা বাড়ির মধ্যে? কে? এত বছর ধরে আছি। রীনা ছাড়া তো আর কেউ নেই বলেই জানি।
- কার কথা বলছ?
- আমাদের এক মাস্টারমশাইয়ের মেয়ের...
- মাস্টারমশাইয়ের মেয়ে? কী নাম?
- রীনা। বলিপ্রসাদবাবুর মেয়ে।
- রীনা! ও তো আমার বউ!
- অ্যা... অ্যা...হে হে হে...জাম্বু তো!! তাই তো...
- মানে? তুমি আমাকে কী ভেবেছিলে?
- না মানে আমি আপনাকে এতক্ষণ আর কী....হে হে হে...বাদ দ্যান! হে হে...আইসেন আবার....
বাদ না দিয়ে আর উপায় কী! শালাবাবু বলে কথা! চেনা, না চেনা সবই তার মর্জি! কিন্তু এত যে কথা বলল! সম্পর্ক ইত্যাদি!!
কেমন যেন সন্দেহ হল। বেশি চার্জ করল নাকি! শেষটায় কি ঠকলাম?
মন খারাপ হতে হতেও হল না। মনে হল যদি ঠকেও থাকি, জাম্বু হিসেবে ঠকিনি...অন্য লোক হিসেবে ঠকেছি। জাম্বুর প্রেস্টিজ ঢি
লে করেনি শালাবাবু!
নিজের মনেই তাই বললাম, শালাবাবু জিন্দাবাদ!
(বোকামির এককাল)