Thursday, September 25, 2025


 

সেই সময় ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের `সমুখে তুঙ্গ তুষার মৌলী রাজে হিমগিরি কনকজঙ্ঘা`। আর ব্যাকগ্রাউন্ডে সেই গিরি বা পাহাড়কে রেখেই কালো ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যেত ট্রেন। স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমরা দেখতাম শিলিগুড়ি কোচবিহার রুটের `সাফারি` আর `ভানুমা` নামের নতুন দুটো বাসকে। প্রেয়ার লাইন যেখানে হত, তার দু`পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছ দুটি তখন কিশোর। ডুয়ার্সের নিয়ম মেনে সারা বছর ভোরবেলায় শিরশিরানি। শরতেও চারদিকের বিরাট বিরাট গাছের গায়ে লেগে থাকত সদ্য শেষ হওয়া বর্ষার সবুজ শ্যাওলা।

ছবিটি সম্ভবত তারও আগের। বোধহয় বাবা তুলেছিলেন তাঁর আগফা ক্লিক থ্রি ক্যামেরায়। গর্বিত হই ভেবে যে, ফালাকাটা হাই স্কুলের ইংরেজি এইচ আকৃতির এই বিল্ডিংটি যখন হয়, তখন বাবা প্রধান শিক্ষক। আর বাবার পাশে রয়েছেন হরকাকু, প্রমথকাকু, পন্ডিতকাকু, অনিলকাকু, কার্তিকদাদু, অমরস্যার, পরিমলস্যার, সুবোধস্যার সহ আরও অনেকেই।

ছবিটি থেকে যাক নিজের ব্লগ আর ফেসবুকের পাতায়। সাদা কালো ছবির সেই রঙিন দিন যে কী দুরন্ত ছিল সেটা আমরাই জানি শুধু..... 

Sunday, September 21, 2025


 

একশৃঙ্গীর সঙ্গে জলে বুনো মোষের পাল    
শৌভিক রায়  

প্রায় পাঁচশো কিমি পথ। অনায়াসেই যেতে পারতাম ট্রেন ধরে। কিন্তু অভ্যেসটাই বাজে। রাস্তায় নিজের মতো দু`চারটে জায়গায় নামব, স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে একটু-আধটু কথা বলব, বাজারঘাট দেখব... এরকম না হলে কীসের আর বেড়ানো! তাই সড়কপথে গাড়িতেই চলছি। ভোরবেলায় রওনা যখন দিলাম, তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। সঙ্গে দামাল হাওয়া। 


রাস্তা ফাঁকা থাকায় বঙ্গাইগাঁও পৌঁছে গেলাম বেশ তাড়াতাড়ি। আকাশে মেঘ থাকলেও, বৃষ্টি নেই। মনেপ্রাণে চাইছি, দ্রুত রোদ উঠুক ঝলমলে। তা না হলে ইচ্ছেপূরণ হবে কীভাবে! আসলে ভারতের বহু বিখ্যাত অভয়ারণ্য ঘুরে বেড়ালেও, প্রতিবেশী রাজ্যের বিখ্যাত কাজিরাঙ্গার অরণ্য দেখবার সুযোগ হয়নি। এবার তাই ধনুক ভাঙা পণ। 

দূরত্ব কমাতে ঝকঝকে ফোর লেন ছেড়ে, রঙ্গিয়ার বাইহাটা চারালি থেকে তেজপুরের পথে ঢুকেই স্মৃতি গ্রাস করল। সেই কবে প্রায় বছর চল্লিশ আগে, কিশোর বয়সে, ঘুরে গিয়েছিলাম মঙ্গলদৈ, টংলা, উদালগুড়ি, ঢেকিয়াঝুলি। আজ আবার এই প্রৌঢ় বয়সে সেই পথে। মাঝে ঢেকিয়াঝুলির হোটেলে শিলঘরিয়া মাছের সুস্বাদু ঝোল ভাল লাগা বাড়িয়ে দিল আরও। জিয়া-ভরালি,মানস, তিরপ আর ডিলি নদী ছাড়া এই মাছের নাকি দেখা পাওয়া ভার।

তেজপুরের কাছে ব্রহ্মপুত্রের ওপর বিরাট কোলিয়াভোমরা সেতু পার করে, জখলাবান্ধাকে পেছনে ফেলে, কাজিরাঙ্গায় যখন ঢুকছি, তখন সন্ধে। এর মধ্যেই রাস্তার ধারে দেখা গেছে শাবক সহ মা গণ্ডারকে। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে একপাল হাতি। এসব দেখেই মনে হল, কাজিরাঙ্গা নিরাশ করবে না।   

চারটি ভাগে বিভক্ত কাজিরাঙ্গা। সেন্ট্রাল বা কোহরা জোন, ওয়েস্টার্ন বা বাগোরি জোন, ইস্টার্ন বা আগরতলি জোন এবং ঘোড়াখাটি বা বুড়া পাহাড় জোন। একশৃঙ্গী  গণ্ডারের জন্য কাজিরাঙ্গা বিশ্ববিখ্যাত হলেও রয়েছে বুনো মোষ, হাতি, হরিণ, কচ্ছপ, উল্লুকের মতো নানা প্রাণী। বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরও দেখা মেলে এখানে। এলিফ্যান্ট ঘাসের প্রান্তর, জলাশয়ের এই গভীর অরণ্যে বাঘ দেখা যাচ্ছে বলে, ২০০৬ থেকে টাইগার রিজার্ভের মর্যাদাও পেয়েছে কাজিরাঙ্গা

কাজিরাঙ্গার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন মেরি কার্জন। ভারতের তদানিন্তন ভাইসরয় লর্ড কার্জনের স্ত্রী মেরি গিয়েছিলেন কাজিরাঙ্গায়। ভারতের বিখ্যাত একশৃঙ্গী  গণ্ডার দেখতে। এমনই দুর্ভাগ্য যে, একটিও দেখতে পাননি তিনি। তাঁর বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, এই অত্যন্ত বলশালী নিরীহ প্রাণীটির অস্তিত্ব বিপন্ন। দেরি না করে লর্ড কার্জনের কাছে দরবার করেন মেরি। আর তার ফলেই ১৯০৮ (অনেকের মতে ১৯০৫) সালে গড়ে ওঠে ২৩২ বর্গ কিমি`র পৃথিবীখ্যাত এই পার্ক। আজ অবশ্য পার্কের এলাকা আরও বড়। ৪৩০ বর্গ কিমি। গণ্ডারের সংখ্যা এই মুহূর্তে ২২০০-এর বেশি। পৃথিবীর তিন ভাগ গণ্ডারের দুই ভাগই কাজিরাঙ্গার।

পরদিন সকাল থেকেই শুরু হল আমাদের সাফারি। সত্যি বলতে, এত গণ্ডার এর আগে কোনওদিন দেখিনি। পরম নিশ্চিন্তে ঘাস খেয়েই চলেছে। আমরা যে এত কাছে চলে এসেছি, ভ্রূক্ষেপ নেই তাদের। কেউ আবার নেমে পড়েছে অভয়ারণ্যের ভেতরের জলাশয়ে। আর এই জলে নামার ব্যাপারে তাদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বুনো মোষেরা। কী রাজকীয় তাদের চেহারা আর গায়ের চকচকে রং! 

হাতিরা অবশ্য একটু বিরক্ত হয়েছিল আমাদের ওপর। বিশেষ করে দলপতিটি। রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকল খানিকক্ষণ। শেষটায় আমাদের গাইড সাইদুল প্রার্থনার মতো বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল, `বাবা যাআআ এ বাবা যাআআ..মোরা তোর ব্যাটা রে....যাতি দে বাবা...এ বাবা...` সাইদুলের প্রার্থনার জন্যই হোক বা অন্য কোনও কারণে, শেষটায় তিনি পথ ছাড়লেন। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। 

দেখা গেল জানা-অজানা অজস্র পাখি, কচ্ছপ, গুঁই সাপ। তবে বাঘ জুটল না কপালে। জঙ্গলের ধুপছায়ায় ঝিঁঝিঁর একটানা ডাকে শান্ত নির্জনতা বলে দিচ্ছিল, সময় এখানে থমকে আছে।

কাজিরাঙ্গার চারটি জোনেই মোটামুটি একই ধরণের প্রাণী ও পাখি। তবে বাগোরিতে তাদের সংখ্যা সম্ভবত বেশি। চা-বাগান, পাহাড় আর জঙ্গল নিয়ে বুড়া পাহাড় রেঞ্জ সুন্দর। তবে আমাদের উত্তরবঙ্গবাসীদের কাছে সেই দৃশ্য পরিচিত। আগরতলি জোনে পাখিদের আধিপত্য। বেশি ভালো লাগে শীতকালে। পরিযায়ী পাখিরা ভিড় জমায় তখন। জঙ্গলের একধার দিয়ে চলে গেছে জাতীয় সড়ক। আর সেই রাস্তার দুই ধারে দোকানপাট-বাড়িঘর-হোটেল-রিসোর্ট। প্রত্যেকের জীবিকা কাজিরাঙ্গাকে ঘিরেই।

কাজিরাঙ্গার আর এক আকর্ষণ অর্কিড পার্ক। এই অঞ্চলের সেরা এই পার্কে ৬০০ প্রজাতির অর্কিডের দেখা মেলে। আর সন্ধেবেলায় পরিবেশিত হয়  অসমের বিভিন্ন জনজাতির বর্ণময় নৃত্য ও গীত। বোরো, মিরি, কাৰ্বি, রাভা, কাছারি ইত্যাদি সম্প্রদায়ের ঘূর্ণন, বাগরুমবা, হামজার, মাটিয়াখাড়া, দেওধনি, ডোমেদিরাং এবং অতি অবশ্যই বিহু নৃত্য দেখা নিঃসন্দেহে সারা জীবনের অন্যতম সেরা সঞ্চয়। 

এতদিন মনের মাঝে `মানস` ছিল। কাজিরাঙ্গা রইল এবার তার পাশে।  

(প্রকাশিত: আয় মন বেড়াতে যাবি/ রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ/ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৫। 
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ) 

Saturday, September 20, 2025


 

এ বড় কঠিন সময়, কেটে যাক কালো মেঘ
শৌভিক রায়
শিক্ষক, কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ হাইস্কুল

চাকরি নাকি শিক্ষকতা? প্রশ্নটা সেদিনও ছিল। 

তিনদশক আগে যখন এই পেশায় এলাম, তখন একবারও মনে হয়নি চাকরি করতে এসেছি। বরং গর্বিত হয়েছি এমন মহান একটি পেশায় যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়ে। পরিবারের অনেকে এই পেশায় ছিলেন, তাই কখনও অন্য জীবিকার কথা ভাবিনি। শিক্ষকতাকেই বরাবর পাখির চোখ করেছি। শুধু আমি নই। আমার বন্ধুবৃত্তের অধিকাংশ এই পেশাকে বেছে নিয়েছিল। কারণ, প্রশ্নাতীত সম্মান ও শ্রদ্ধা। 

প্রতিটি মানুষ নিজের বাবা-মায়ের পরে যে মানুষটিকে আসনে বসায়, তিনি একজন শিক্ষক। সমাজে তাঁদের পরিচিতি অন্য যে কোনও পেশার মানুষের চাইতে হাজার গুণ বেশি। ভবিষ্যতের সুনাগরিক গড়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁদের কাঁধে। শিক্ষাগত যোগ্যতা নেওয়ার পর বেশিরভাগ বাঙালি পরিবারের ছেলেমেয়েরা এসএসসি’র নোটিফিকেশনের অপেক্ষায় দিন গুণতেন। এখন সেসব অতীত।

হঠাৎ করে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। আজ অবস্থা এমন যে, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাচ্ছে! কে কবে কল্পনা করেছিল যে, শিক্ষকদের গায়েও দাগি তকমা লেগে যাবে! আর তার অভিঘাতে টালমাটাল হয়ে পড়বে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা! নিয়োগের সঠিক পদ্ধতি না মানা সত্ত্বেও যাঁরা এতদিন পড়িয়েছেন, কী শিখিয়েছেন তাঁরা কোমলমতি পড়ুয়াদের? মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার যে খাতাগুলো তাঁরা চেক করেছেন, সেসবের কি আদৌ সঠিক মূল্যায়ন হয়েছে? টাকার বিনিময়ে চাকরি কিনে বা বেঁচে পেশার অপমান করতে বাধেনি কোনও পক্ষের। শুধুই কি শিক্ষাক্ষেত্র? সামাজিক সুস্থিতি নষ্ট হয়নি? যদি শুধুমাত্র চাকরি চলে যাওয়ার দিক দিয়ে বিচার করি, তবে দেখব সেটাও প্রভূত পরিমাণে হয়েছে।    

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, এই দাগি শিক্ষকরা আগামী প্রজন্মের কাছে এমন এক দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন যে, ভবিষ্যতে পেশায় আসতে দশবার ভাববে অনেকে। যাঁরা দাগি নন, তাঁরাও আজ সব হারিয়েছেন। ফের কোর্ট কেস, প্যানেল বাতিল ইত্যাদির আশঙ্কায় নিরাপত্তাহীনতা নয় শুধুমাত্র। মানুষের আড়চোখে দেখা এবং কীভাবে চাকরি হয়েছে, সেই প্রশ্ন তোলার আশঙ্কা কুরে কুরে  খাবে চাকরিপ্রার্থীদের। 

এখন না হয় ভালো বেতন দেওয়া হয়। অথচ একসময় স্থানীয় স্তরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে নীতিগত কারণে কম পারিশ্রমিক থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র সম্মান ও শ্রদ্ধার জন্য এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন অনেকে। গ্রামে স্কুল স্থাপনে এগিয়ে এসেছেন বহু মানুষ। বিনা পারশ্রমিকে তাঁরা মাসের পর মাস পড়িয়েছেন। অবসরের পর নিয়মিত স্কুলে পড়াতে যাওয়ার দৃষ্টান্ত আজও রয়েছে এই বাংলায়। 

কিন্তু যখন সেই পেশার মর্যাদা, বিশ্বাসযোগ্যতা, সম্মান ভুলুন্ঠিত হতে দেখি, বড় কষ্ট লাগে। যদি এরকম চলতে থাকে, তবে তো রাষ্ট্রের বিপদ। এই পেশা নিয়ে নতুন প্রজন্মের মনে নেতিবাচকতা তৈরি হলে বিপদ সমাজের। এরপরের প্রজন্মকে শেখাবে কে? আমরা যতই বড় হয়ে কারিগরি ও প্রযুক্তির সাহায্যে আকাশ ছুঁই না কেন, ভিত  তৈরি করে দেবেন শিক্ষকরাই। 

রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগে যে দুর্নীতি হয়েছে, যেভাবে শিক্ষকদের গায়ে দাগি তকমা লেগেছে, আন্দোলন করতে গিয়ে লাঠির বাড়ি খেতে হয়েছে- তা দুশ্চিন্তার বড় কারণ। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন ছবি কখনোই কাম্য ছিল না। 

তবু আশাবাদী মানুষ হিসেবে স্বপ্ন দেখি যে, আমার প্রিয় পেশার ওপর থেকে কালোমেঘ কেটে যাবে। যে সমস্ত মানুষ স্কুল-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে, গ্রাম-শহরে চক ডাস্টার হাতে নিয়ে রোজ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সমাজ সংস্কারের, তাঁদের রোল মডেল হিসেবে বেছে নেবে ছেলেমেয়েরা। ঝলমলে আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে শিক্ষকসমাজ।

(প্রকাশিত: ক্যাম্পাস, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৫) 





   

Friday, September 19, 2025


একটি পুরোনো ছবি পেলাম। ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে ছবিটি তোলা সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু উপলক্ষ্য জানি না। 

ছবিটিতে ফালাকাটার চারটি স্কুলের তদানীন্তন প্রধানদের দেখতে পাচ্ছি। ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও আমার বাবা প্রয়াত নীরদ বরণ রায়ের পাশে রয়েছেন ফালাকাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শ্রদ্ধেয়া শ্রীমতী মায়া বোস। মায়াপিসির পাশে সুভাষ গার্লস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শ্রদ্ধেয়া সন্ধ্যা বোস। সন্ধ্যা পিসির পাশে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহপ্রধান শিক্ষক ও আমাদের অত্যন্ত প্রিয় প্রয়াত হরচন্দ্র চক্রবর্তী। হরকাকুর পাশে যাদবপল্লী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রয়াত মৃণালকান্তি সরকার। 

মাটিতে যাঁরা বসে আছেন তাঁদের মধ্যে রমা কাকিমা (  সুভাষ গার্লস হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা ও  শ্রদ্ধেয় প্রয়াত সত্যরঞ্জন নন্দীর স্ত্রী)। আছেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক শ্রী সুজিত নাথ। 

মাটিতে দাঁড়িয়ে যাঁরা আছেন তাঁদের মধ্যে একদম বাঁ দিকে তদানীন্তন শিক্ষাকর্মী প্রয়াত শ্রদ্ধেয় বেণীমাধব দাস (আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ও ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে সকলের বেণীদা)।
 
ছবিতে সম্ভবত অমর স্যারও (প্রয়াত অমরেন্দ্রনাথ চৌধুরী) রয়েছেন, ঠিক বুঝতে পারছি না। যদি অন্যদের কেউ চিনতে পারেন, অনুগ্রহ করে জানাবেন কমেন্ট সেকশনে।  

ছবিটি রইল আগামী প্রজন্মের জন্য....      
 

Wednesday, September 17, 2025


 

১৯৮১ সালের ৬ নভেম্বর। 

ফালাকাটা কমিউনিটি হল এখন যেখানে, সেখানে তখন মাঠ। 

মাঠের পূর্ব দিকে ফালাকাটা হাই স্কুলের হোস্টেল। হোস্টেল লাগোয়া শাক সবজির ক্ষেত। তার পাশ দিয়ে এগোলে ডাইনে‌‌ আমাদের কোয়ার্টার্স। আমাদের বলতে আমরা সহ পণ্ডিতকাকু, জহর স্যার আর প্রদীপ স্যারের পরিবার। আমাদের কোয়ার্টার্সগুলোর উল্টোদিকে ইংরেজি L শেপ কয়েকটি ঘর। সেগুলিতে এক সময় ফালাকাটা হাই স্কুলের ইলেভেন টুয়েলভ ক্লাস হত।

ওই ঘরগুলিতেই অস্থায়ীভাবে শুরু হয়েছিল ফালাকাটা কলেজ। আর কলেজের উদ্বোধন হয়েছিল ওই তারিখ অর্থাৎ ৬ নভেম্বর, ১৯৮১।

ছবিটিতে একদম বাঁয়ে তদানিন্তন বন ও পর্যটন মন্ত্রী প্রয়াত পরিমল মিত্র, মাঝে স্বাস্থ্য মন্ত্রী শ্রদ্ধেয় প্রয়াত ননী ভট্টাচার্য ও শিক্ষামন্ত্রী প্রয়াত শম্ভু ঘোষ। যে দুজন তরুণ দাঁড়িয়ে আছেন তাঁদের একজন শ্রী সুনীল বণিক ও অন্যজন তবলাবাদক পাঁচুদা (ভাল নাম মনে নেই)। কিশোরটি আমি। এঁদের অটোগ্রাফ নিচ্ছিলাম। ফালাকাটা কলেজের উদ্বোধনের সেই দিন উপস্থিত ছিলেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য ড: প্রসাদকুমার ঘোষ এবং শিল্পমন্ত্রী প্রয়াত নির্মল বসু। 

এই ছবিটি ও বাকি তথ্য রাখা থাকল এখানে ও আমার নিজের ব্লগে ভবিষ্যতের জন্য...

Sunday, September 14, 2025

 

শালাবাবু জিন্দাবাদ

শৌভিক রায় 


- আপনার সঙ্গে কি আর দরদাম করা যায়? সবাই কি এক নাকি! সম্পর্কের একটা ইয়ে থাকে। তাই না? 


খুব ভাল লাগল কথাগুলো। ঠিকই তো। সম্পর্কের একটা ইয়ে তো সত্যিই থাকে। মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম গিন্নিকে। একদম সঠিক মানুষের সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। 


ঘটনা হল, দিন কয়েক আগে গিন্নির একটা কাজে কোর্টে যেতে হয়েছিল। টাইপ নিয়ে বসে থাকা এক মহিলাকে দেখে তিনি ঠিক করলেন, কাজটা তাকেই দেবেন। একেই মহিলা। তায় আবার মুহুরি!


ভাল সিদ্ধান্ত। এমনিতেই দুনিয়ার সব গিন্নি ভাল সিদ্ধান্ত নেন। অন্তত আমার মতো মিনসে বোকা কর্তাদের থেকে। আর এখানে তো নারী প্রগতি। এক নারী আর একজনকে সাহায্য করবেন। সেটাই স্বাভাবিক। আমার কথা বলার প্রয়োজনই নেই। 


মহিলা কাজটা নিলেন। নিয়েই পাশের লোকটিকে ফিসফাস করে কিছু বললেন। লোকটি গম্ভীর মুখে টাইপ করলেন। সেটা হাত বদল হয়ে মহিলার মাধ্যমে গিন্নির হাতে এলো। মহিলার টাকা মিটিয়ে দেওয়ার পর সেটাও হাতবদল হয়ে অন্যদিকে গেল কিনা জানি না।


বেরোতে যাব হঠাৎ মধুর কন্ঠে,  

- রীনাদি...তুমি!

- আরে...তুই। এখানে কেন! 

- আমি তো এখানেই। বাবার জায়গায়। মুহুরির কাজ করি। ভুলে গেছ?

- ওহহহহ....তাই তো! একদম ভুলে গেছিলাম রে....

- হে হে....ওরম হয়...সব কি আর মনে থাকে! তা দিদি কেমন আছো? 

- এই তো রে। তোরা ভাল?

- চলছে গো। সেই দিন তো আর নেই। তোমার বাবা মানে আমাদের বলিপ্রসাদ মাস্টারমশাই, সত্যেনবাবু...খুব মনে পড়ে!...উনি? 

- তোর জামাইবাবু।

- হ্যাঁ হ্যাঁ... মনে পড়েছে। অনেকদিন আগে দেখছি তো। জাম্বু ভাল তো?


একপেশে একটা হাসি দিই এরকম ক্ষেত্রে। এখনও তাই করলাম। গিন্নি দেখি আবার মুখ খুলেছে,

- তুই আছিস জানলে কাজটা...

- আরে না না। একই ব্যাপার। 

- তবু রে...তুই দেওয়ানহাটের ছেলে। বাপের বাড়ির মানুষ। ভাই বলে ডাকি... 

- ও ব্যাপার না দিদি। একজন করলেই হল! কী করালে?

- একটা এফিডেভিট। নোটারি।

- আচ্ছা আচ্ছা....কত নিল?

- দুশো।

- একশো রেট এমনি। সেটা যা হোক। ভগবান তো তোমাকে কম দেয়নি। না হয় একটু বেশিই দিলে!

- সে কি রে! ডাবল নিয়ে নিল! দাঁড়া জিজ্ঞেস করি তো।

- না না করো কী! বোঝো না? নিজেদের মধ্যে! ঝামেলা করবে তো। বলো না দিদি।

- তাই বলে ঠকাবে! ধুস। বাজে হল। এরপর দরকার হলে তোর কাছেই...

- হ্যাঁ হ্যাঁ। চলে আসবা। কোনও সমস্যা নাই। আমার ফোন নম্বরটা রাখো। জাম্বু আপনি সেভ কইরে নেন।


আজ দিন কুড়ি পরে, সেই শহরতুতো শালাবাবুর কাছেই নিজের প্রয়োজনে এসেছি। একা। তিনটে কাজ নিয়ে।


- কি গো.... চিনলে তো?

- হ্যাঁ হ্যাঁ....চিনব না সেটা হয় নাকি!

- যাক। কয়েকটা কাজ ছিল।

- আরে বসেন বসেন। কী দরকার বলেন। আগে চা খান। ওইইই...চা দে। অবশ্য যা চা!

- না না চা খাব না। খেয়েই এলাম মাত্র।

- খাবেন না? ওইইই....এক কাপ। বলেন এবার।

- এই যে এই তিনটে কাজ করতে হবে। দুটো এফিডেভিট। টাইপ আছে সঙ্গে। আর একটা এটা।

- অ। দিচ্ছি করে। বসেন।


বসলাম। খট খট টাইপ দেখলাম। উঠে গিয়ে কোথায় কী সই টই নিয়ে এলো। ট্যারা চোখে সেটাও লক্ষ্য করলাম। 


এবার খরচপাতি। সেটা জানতে চাওয়াতেই ওই কথাগুলি। ভাল লাগল। সত্যিই তো। আমার সঙ্গে আর কী দরদাম! জাম্বু বলে কথা। 


মিটল সেটাও,

- এই যে এফিডেভিটটা.... এটা কিন্তু সামনে না থাকলে সই করে না। বুঝলেন না? ছয়শ রেট। কিন্তু আপনার জন্য পাঁচশো। আর একটার ওত ঝামেলা নাই। তিনশো রেট। নেব না। দুইশো দিয়েন। আর এই যে টাইপ। কেউ যদি চারশ টাকার নিচে করে তো আমাকে বইলেন। কিন্তু আমি কি ওত নিতে পারি? তাও আপনার কাছে! ওই আড়াইশ দিলেই হবে....


খুব খুশি হলাম। কত কম করে রাখছে! নিজেরই খারাপ লাগল,

- আরে ওত কমালে তোমার পোষাবে?

- দ্যাখেন...সম্পর্ক একটা বড় কথা। সব জায়গায় ধান্দা করলে চলে? আমরাও তো মানুষ। এই যে আপনি বললেন নিজে থেকে, এটা কেউ বলে না। এখানেই, বুঝলেন না, পার্থক্য! হবে না? কোন বংশের মানুষ আপনি সেটা তো বুঝতে হবে! যেটা বলছি সেটাতেই হত। তাও আপনি যখন বললেন, তখন আর পঞ্চাশ দিয়েন। গোটা হয়ে যাবে। এমনিতে পাঁচ দুই সাত আর আড়াইশ মানে সাড়ে নয়শ হয় আর কি! ওই হাজার দেন। হবে। আপনারও তো একটা কথার দাম রাখা উচিত।


খুব ভাল লাগল। দিলাম টাকা। বাঁ হাত ডান হাতের কনুইয়ে ঠেকিয়ে টাকাটা নিল। 


চলে আসবার আগে বললাম,

- একদিন বাড়িতে এসো তাহলে।

- হ্যাঁ হ্যাঁ যাব যাব। কিন্তু দাদার বাড়িটা যেন কোথায়?

- হাসপাতালের আউটডোরের সামনে দিয়ে এগিয়ে দেখবে ওষুধের দোকান। ওর সঙ্গে লাগানো গলি। ঢুকে পড়বে। বাঁ হাতে চার নম্বর বাড়ি। বাড়ির নাম মুজনাই....

- ওহ...বুঝছি বুঝছি...ওই খানে না আমাদের দেওয়ানহাটের একজনের বিয়ে হয়েছে।


দেওয়ানহাটের আর একজন? আমাদের ওখানে! ওই কয়েকটা বাড়ির মধ্যে? কে? এত বছর ধরে আছি। রীনা ছাড়া তো আর কেউ নেই বলেই জানি।

- কার কথা বলছ?

- আমাদের এক মাস্টারমশাইয়ের মেয়ের...

- মাস্টারমশাইয়ের মেয়ে? কী নাম?

- রীনা। বলিপ্রসাদবাবুর মেয়ে।

- রীনা! ও তো আমার বউ!

- অ্যা... অ্যা...হে হে হে...জাম্বু তো!! তাই তো...

- মানে? তুমি আমাকে কী ভেবেছিলে?

- না মানে আমি আপনাকে এতক্ষণ আর কী....হে হে হে...বাদ দ্যান! হে হে...আইসেন আবার....


বাদ না দিয়ে আর উপায় কী! শালাবাবু বলে কথা! চেনা, না চেনা সবই তার মর্জি! কিন্তু এত যে কথা বলল! সম্পর্ক ইত্যাদি!! 


কেমন যেন সন্দেহ হল। বেশি চার্জ করল নাকি! শেষটায় কি ঠকলাম? 


মন খারাপ হতে হতেও হল না। মনে হল যদি ঠকেও থাকি, জাম্বু হিসেবে ঠকিনি...অন্য লোক হিসেবে ঠকেছি। জাম্বুর প্রেস্টিজ ঢি

লে করেনি শালাবাবু!


নিজের মনেই তাই বললাম, শালাবাবু জিন্দাবাদ!


(বোকামির এককাল)




Friday, September 12, 2025


 

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের একাধিক জনপদের মেরিন ড্রাইভ দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু আন্দামান ট্রাঙ্ক রোডের তুলনা? 
না। হয় না। আমার দেখা এখনও অবধি সেরা মেরিন ড্রাইভ ওটিই।   

এমনিতে আন্দামান বলতে পোর্ট ব্লেয়ার-হ্যাভলক-নিল-বারাটাং মোটামুটি এটুকুই বোঝেন সকলে।
কিন্তু ৫৭২টি দ্বীপের আন্দামান-নিকোবর শুধু এটুকুতেই আটকে নেই। বিস্তার তার বিরাট। 
 
দুই বছর আগে গিয়েছিলাম আন্দামানে। 
সাউথ আন্দামান অর্থাৎ পোর্ট ব্লেয়ার ও আশেপাশের দ্বীপগুলি তো বটেই, গিয়েছিলাম মিডল আর নর্থ আন্দামানেও। অনেকটা দেখলেও, বারবার মনে হয়েছিল, কত কী এখনও বাকি রয়ে গেল! 

জীবনে খুব বেশি না হলেও, যে কয়েকটি জায়গা দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে, তাতে জোর গলায় বলতে পারি, আন্দামানের মতো প্রশান্তি আর কোথাও পাইনি। পাবোও না। প্রতিদিন রঙ্গত, ডিগলিপুর, মায়াবন্দর, কারমাটাং, মিডল ক্রিক, লামিয়া বে, কালীপুর ইত্যাদি কোনও কোনও জায়গা চোখে ভাসে তাই। 

এই লেখার সঙ্গে ছবিটি আন্দামান ট্রাঙ্ক রোডের। একদিকে ছোট পাহাড় আর একদিকে এরকম সমুদ্রকে সঙ্গী করে আমরা তখন উত্তর পথে.....
 

Wednesday, September 10, 2025


 

Monday, September 8, 2025

।।নিজের ভাবনায়।।
শৌভিক রায়

সারা দেশেই সরকারি চাকরির হাল খারাপ। যত দিন যাবে, আরও খারাপ হবে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি চাকরি সংকোচনের ব্যাপারে মোটামুটি একই পথে চলেছে।
ফলে ভিন রাজ্য থেকে এই রাজ্যে চাকরির পরীক্ষা দিতে আসা প্রার্থীদের দেখে, বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
এই রাজ্য থেকেও প্রচুর সংখ্যক চাকরি প্রার্থী ভিন রাজ্যে পরীক্ষা দিতে যায়। এতেও অবাক হওয়ার ব্যাপার দেখি না।
সরকার চাকরিই যেখানে নেই, সেখানে তো এই অবস্থা হবেই!
ভিন রাজ্যের চাকরি প্রার্থীরা কেন এখানে এলো কিংবা এই রাজ্যের চাকরি প্রার্থীরা বাইরে কেন চাকরির সন্ধানে যাচ্ছে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যারা চেঁচামেচি করেন, তারা নিজেরাও খুব ভাল জানেন, কেন করেন। এটাই রাজনীতি।

Saturday, September 6, 2025


 

Thursday, September 4, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১৮ 
শৌভিক রায় 

কোনও জায়গা থেকে চলে গেলেই কি সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়? 
প্রশ্নটা ভাবায়। 

আরও একটু স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য, দিনহাটা হাই স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে, বাবা চলে গিয়েছিলেন ফালাকাটা হাই স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে। কিন্তু সপ্তাহ শেষে দিনহাটায় এলেই বাবাকে দেখেছি শ্রদ্ধেয় সুভাষ নাগ, নরেন দেব, অখিল নিয়োগী প্রমুখদের বাড়িতে দেখা করতে যেতে। 

দিনহাটা গার্লস স্কুল থেকে মা ফালাকাটা হাই স্কুলে গেলেন ঠিকই। কিন্তু ভুললেন না মানি (শ্রীমতী সন্ধ্যা সাহা), বড়মাসি (পূজনীয়া মুকুল রায়), দুই ঝর্ণামাসি (শ্রীমতী ঝর্ণা নাগ ও পূজনীয়া ঝর্ণা বর্ধন), মীরামাসি (পূজনীয়া মীরা রায়),  বেলামসি (পূজনীয়া বেলা গুহ), গৌরী মাসি (শ্রীমতী গৌরী সান্যাল), ইলামাসি (ইলামসির টাইটেল ভুলে গেছি), প্রতিমা মাসি (পূজনীয়া প্রতিমা ভাদুড়ী), লিলিমাসি (লিলিমাসির টাইটেল মনে নেই), জয়তীমাসি (শ্রীমতী জয়তী ইশোর), আরতিমাসি (শ্রীমতী আরতি সাহা), পণ্ডিতদাদু, বীরুদাদু, লাবণ্যমাসি, রামেশ্বরদা, রতনদা প্রমুখদের। 

আমার কাকুদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আশুকাকুর (প্রয়াত আশুতোষ রায়) অকালমৃত্যুর অভিঘাত সহ্য করতে না পেরে দিনহাটা ছাড়লেও আমার মনে সবসময় রয়ে গেছে বাবুদা (বড়মাসির সুযোগ্য পুত্র মানবেন্দ্র রায়), রাজাদা অর্থাৎ অনির্বাণ নাগ ও রিঙ্কু (ঝর্ণা মাসির সুশিক্ষিত ও সর্বজনপ্রিয় পুত্র ও কন্যা),  মুন্নি (মীরামাসির মেয়ে), তানিয়া (লিলিমাসির কন্যা), রূপা (ঝর্ণা বর্ধন মাসির মেয়ে), ঈমন (বড়মাসির মেয়ে)। 

দিনহাটা গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকাদের পুত্র-কন্যারা বাদেও ভুলিনি সহপাঠী উলু (দেবত্র) সহ সুজয় (সুজয় সাহা, দিনহাটা চৌপথীর কাছে ওদের সম্ভবত দশকর্মার দোকান ছিল। বাড়িটি ছিল কাঠের।), বিদুর, রঘু, তোতো, মৃদুল, তপন, গাঠু, কানু কাউকেই। আর জ্ঞাতিদের মধ্যে জীবনদা, মধু, ভজন, বাবুন, ঝর্ণাদি, মনাদি তো আজও রয়েছে মনে।  

এখন দিনহাটা কলেজে পড়তে এসে, এই তিন বছরে, নতুন বন্ধু হয়েছে অনেকে। গোপালনগর শরণার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যখন পড়ি, তখন সেই পটলাস্যারও যেমন মনে রয়েছে, আজ কলেজ ছাড়ার সময়ে মনে গেঁথে গেছেন কতজন!

এইসব ভাবতে ভাবতেই দেখি বাস ঢুকছে কোচবিহারে। এই রাজনগর আসলে আমার দিনহাটা-ফালাকাটা নিয়মিত যাত্রার মধ্যে ছোট্ট হাইফেন। এটি এমন এক যতিচিহ্ন, যা মোছা যায় না কখনও। ফালাকাটা থেকে, উচ্চ মাধ্যমিকের পরে, যে আমি উদভ্রান্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে এসেছিলাম দিনহাটায়, সেই আমাকে আবার নতুন করে নির্মাণ করেছে এই শহরটিও। ফিরে পেয়েছি বিশ্বাস। আশ্বাস এসেছে নতুনের। তাই বাস যখন কোচবিহার ছেড়ে সামনে এগোচ্ছে, মন বলল, আবার ফিরতে হবে এখানেই হয়ত বা কখনও। আসলে ওই যে সেই বিখ্যাত কথা  In my beginning is my end....

********************************************************************************************************************************************************************

পার্ট টু-এর রেজাল্ট বেরোতে খুব একটা দেরি হল না। গতবারের চাইতে এবার আরও বেশি মার্কস। তবে খুশি হলাম না। কেননা আরও একটু পাওয়া উচিত ছিল। ইউনিভার্সিটি যে মেধা তালিকা দিয়েছে তাতে পনেরো নম্বরে রয়েছি। কোচবিহার-জলপাইগুড়ি-দার্জিলিং-মালদা-দিনাজপুর অর্থাৎ গঙ্গার এপার থেকে একদম পাহাড় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার সূত্রে রেজাল্ট নিঃসন্দেহে ভাল। তবু ভাল হত আরও, যদি সময় ও সঠিক গাইড পেতাম। 

তবে আমার মন ভরিয়ে দিল রীনার রেজাল্ট। পার্ট ওয়ানের তুলনায় অনেকটা বেশি পেয়েছে এবার। তালিকার হিসেবে পঁচিশের মধ্যেই হবে ওর জায়গা। এতটা নম্বর পাবে, সেটা বোধহয় নিজেও বোঝেনি। ওদের ব্যাচে ওরই সবচেয়ে বেশি মার্কস। ভাল লাগছিল ভেবে যে, হয়ত ও-ও ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করতে যাবে আমারই মতো। 

**********************************************************************************************************************************************************************

মৌলিকবাবুকে প্রণাম করতে গেলাম আমি আর শুভ। মার্কশীট হাতে নিয়ে স্যার চোখ বোলালেন। আমাদের পরের ব্যাচ তখন পড়ছে,
- তোমরা দেখো...এই ছেলেটি...শৌভিক। সব পেপারে ভাল নম্বর। তবু আলাদা করে উল্লেখ করব কবিতা পেপারের কথা। কত পেয়েছে জানো? আজ অবধি আমার ব্যাচে কেউ এত নম্বর পায়নি। ৬০। সিক্সটি। আমি গর্বিত!

এর চাইতে বড় পাওনা আর কিছু হয় না। সকলেই হাততালি দিয়ে উঠলো। ভেসে গেলাম এক অদ্ভুত ভাল লাগায়। 

শুভ স্যারকে প্রণাম করতে ঝুঁকে পড়ে  আর ওঠে না। ওকে যত ডাকি, তত বলে, `দাঁড়া না! আর একটু প্রণাম করি!` 
ভাগ্যিস আমি ঠিক আছি। তা না হলে দুজনেই একই কীর্তি করলে আর হাততালি পেতে হত না! 
তবে সবার মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম যে, ওরা বুঝে গেছে আমরা সত্যিই তূরীয় আনন্দে আছি।
কিন্তু সেদিন সব মাপ। 

**********************************************************************************************************************************************************************

রীনার পোস্টকার্ড এলো,
`আমি ভর্তি হয়েছি। এখনও হোস্টেল পাইনি। তবে শিবমন্দিরে মনদা আছে। মেসে। দরকারে দুই চারদিন ওখানে থাকব। তারপর ব্যবস্থা করব। হয়ত হোস্টেল পাব। কয়েকদিন সময় লাগবে....` 

***********************************************************************************************************************************************************************

মুজনাইয়ের জলে সকালের লাল সূর্যের আভা। একটা অন্ধকার খণ্ড রাত কেটে গেছে। 
এবার পালা অন্য শুরুর। 
আসলে শেষ বলে কিছু হয় না। শেষ যেখানে হয়, শুরু হয় সেখানেই। 
দিনহাটা কলেজ এটাই শিখিয়েছে এই তিন বছরে। 

(শেষ)


* ছবি- দিনহাটা কলেজে রীনা ও আমি। ছবিটি তুলে দিয়েছেন দিনহাটা হাই স্কুলের সুশিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও আমার ভাই শ্রী জয়ন্ত চক্রবর্তী 

* এই সিরিজটি বর্ধিত আকারে গ্রন্থ হয়ে প্রকাশ পাবে হয়ত কখনও। যাঁরা এতদিন ধরে এই কথন পড়লেন, তাঁদের সবার কাছেই ঋণী ও কৃতজ্ঞ রইলাম।  
                 
     

                 
     

Monday, September 1, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১৭
শৌভিক রায় 

পথচলতি মানুষেরা তাকিয়ে দেখছে। পাঁচটি ছেলে মদনমোহন মন্দিরের বাগানে, রাজবাড়ির মাঠে, সাগরদিঘির ধারে গোল হয়ে বসে কী যেন করছে! কেউ বলছে `এটা ডিসিলাবিক`, কেউ আবার চিৎকার করছে `পেন্টামিটার`.....

চলছে আমাদের পড়াশোনা। ফিলোলোজি পেপারের। ওই পেপারে দীর্ঘ `এসে রাইটিং` ছাড়াও `প্রেসি রাইটিং` আছে। `এসে` আর `প্রেসি`র ব্যাপারে কিছু করবার নেই। নিজেকেই করতে হবে। সাহায্য করার ব্যাপার কিছু নেই। কিন্তু ফিলোলোজি বোঝানো যায়। আপাতত আমরা সেটাই করছি। নিজেরাই নিজেদেরকে পড়াচ্ছি।

তবে ব্যাপারটা বেশিদিন চলল না। কেননা কয়েকদিনের মধ্যেই মৌলিক স্যার আমাদের ব্যাচ বন্ধ করে দিলেন। রীনার কাছে জানলাম আমাদের ওপর খুব রেগে আছেন। ওদের ব্যাচে সেটা বুঝিয়েছেন,
- তোদের জন্য আমাদেরও সমস্যা হয়েছে। 
- কেন?
- স্যার ভাবছেন আমরাও তোদের মতো করতে পারি। 
- দেখ, আমাদের উপায় ছিল না কিছু। তিনমাস পর শুরু করেছি। আর স্যার নিজেই বলেছিলেন, আমাদের যা দরকার সেটা বলতে হবে, তার বাইরে স্যার আলাদা কিছু করাবেন না। সেটাই বলেছি...
- সবসময় সব কিছু বলতে হয় না। কী লাভ হল?

সত্যিই কোনও লাভ হল না। নিজেদের পড়াও সেভাবে এগোলো না। শুধু শুধু কে আর কোচবিহারে আসবে এটুকুর জন্য? মুকুল সরে গেল সবার আগে। অরিন্দম তুফানগঞ্জ থেকে আসে। সুতরাং ওর পক্ষেও সম্ভব হল না। গৌরাঙ্গের বাড়ি দিনহাটা ছাড়িয়ে প্রান্তিক এলাকায়, সীমান্তের দিকে। রইলাম শুধু আমি আর শুভ। শাটল ককের মতো সেই ছোট থেকে দিনহাটা-ফালাকাটা করছি। ফলে আমার অসুবিধে নেই। শুভদের পুরোনো পোস্ট অফিস পাড়ার `প্রিয় কুটির` নামের বাড়িটি আমারও প্রিয় হয়ে গেল। মাঝেমাঝেই আসি। দুজনে পড়ি। ভাতও খেয়ে নিই কখনও। দেদার ধোঁয়া ওড়ে। কখনও বাইরে গিয়ে আরও কিছু জোটে। শুভর দিদি বনবাণীদি কখনও টের পায়। দুজনকেই বকে। দিদি ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। মাঝে মাঝে আসে। 

থার্ড ইয়ারে কলেজে একটা ক্লাসও হল না। নির্দিষ্ট কোনও কারণ নেই। আজ হয়ত এই স্যার নেই। কাল আর একজন। অনিলকাকু তো এমনিতেই এম ফিলের জন্য ছুটিতে। মাঝে মাঝে ডিসি স্যারের কাছে যাই। এটা ওটা বুঝে নিই। অধিকাংশ সময় ফালাকাটায় থাকি। তবে রীনার সঙ্গে যোগাযোগ আছে। পোস্টকার্ডে ওকে চিঠি লিখি। এক-দুদিন পরেই পেয়ে যায়। ওর উত্তর পাই। ওরা যে খুব সিরিয়াসলি পড়ছে সেটা বুঝতে পারি। কখনও দিনহাটায় আসবার পথে ওদের বাড়ির দিকে তাকাই। ইচ্ছে করে নেমে পড়তে। নিজেকে আটকে রাখি। ওরা কী ভাববে সেটা ভেবে। 

দেখতে দেখতে পরীক্ষা চলে এলো। কলেজের উত্তরদিকের দোতলা বিল্ডিংয়ের ঘরে সিট পড়ল। মাঝে একদিনের গ্যাপ দিয়ে প্রত্যেকটা পেপার। পার্ট ওয়ানের সেই নড়বড়ে অবস্থা আর নেই। সব উবে গেছে। যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নিয়ে লিখে চলি। এক্সট্রা পাতা নিই। সব্যসাচী স্যার গার্ড দিতে এসে মজা করে বলেন, `ইউনিভার্সিটিকে কত পয়সা দিয়েছ ফর্ম ফিলাপের সময় যে এত কাগজ নিচ্ছো!` স্যারের কথা শুনে হেসে ফেলি। পিঠ চাপড়ে দেন স্যার। ডিসি আসেন। চোখ দুটো গোল গোল করে বলেন, `লেখো লেখো।` 

একটার পর একটা পেপার হয়। ফিলোলোজি পেপারে এসে মন খুলে চল্লিশ মার্কসের `এসে` লিখলাম। আমার এতদিনের যাবতীয় জানা আক্ষরিক অর্থেই ঢেলে দিলাম লেখায়। প্রেসি রাইটিংয়ের জন্য আলাদা করে তৈরি করেছিলাম নিজেকে। ভাল লিখলাম সেটাও। ফিলোলোজি অবশ্য বুঝতে পারলাম না যে, ঠিক হল নাকি ভুল! কিন্তু সব মিলে মনে হল ঠিকই আছে। তবে সবচেয়ে ভাল লিখলাম পোয়েট্রি পেপার। অন্যগুলোও ঠিকঠাক মনে হল। অনার্স পাব না, সেই ভাবনা আর নেই। কিন্তু যে পার্সেন্টেজ পেয়েছি সেটা ধরে রাখতে পারব কিনা, সে চিন্তা মাথায় ঘুরতে লাগল। 

আট নম্বর পেপার দিয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে এলাম। কলেজের উল্টোদিকে এসডি স্যারের বাড়ি। কোচবিহারের বাস দাঁড়ায় ওখানে। প্যাসেঞ্জার তোলে। রীনা দাঁড়িয়ে আছে। বাস ধরবে বলে। 
- কেমন হল পরীক্ষা?
- ভালই। তোর?
- মোটামুটি। 
- ভালই হবে। ভাল নম্বর পাবি। 
- তোরা তো অনেক আগে পড়তে শুরু করেছিলি। তোদের ভাল হবে। আমাদের তো মাঝপথেই....
- ভাল হবে। ভাল করে পড় এরপরেও। একটা জায়গায় তো আসতে হবে। 
- মানে?
- মানে বুঝতে হবে না.....

বাস এসে গেল। রীনা উঠে গেল বাসে। কী বলল কিছুই বুঝলাম না। পিকনিকের দিন জানতে চেয়েছিলাম, আমাদের বন্ধুত্ব এরকমই থাকবে কিনা। এটা কি তার উত্তর? ও কি কিছু বলে গেল? কিন্তু কী বলল? কেনই বা বলল?

উত্তর হাতড়াতে লাগলাম নিজের মনেই.....

(ক্রমশ)   

* ছবি- সম্প্রতি নির্মিত দিনহাটার স্বাগত তোরণ....