একশৃঙ্গীর সঙ্গে জলে বুনো মোষের পাল
শৌভিক রায়
প্রায় পাঁচশো কিমি পথ। অনায়াসেই যেতে পারতাম ট্রেন ধরে। কিন্তু অভ্যেসটাই বাজে। রাস্তায় নিজের মতো দু`চারটে জায়গায় নামব, স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে একটু-আধটু কথা বলব, বাজারঘাট দেখব... এরকম না হলে কীসের আর বেড়ানো! তাই সড়কপথে গাড়িতেই চলছি। ভোরবেলায় রওনা যখন দিলাম, তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। সঙ্গে দামাল হাওয়া।
রাস্তা ফাঁকা থাকায় বঙ্গাইগাঁও পৌঁছে গেলাম বেশ তাড়াতাড়ি। আকাশে মেঘ থাকলেও, বৃষ্টি নেই। মনেপ্রাণে চাইছি, দ্রুত রোদ উঠুক ঝলমলে। তা না হলে ইচ্ছেপূরণ হবে কীভাবে! আসলে ভারতের বহু বিখ্যাত অভয়ারণ্য ঘুরে বেড়ালেও, প্রতিবেশী রাজ্যের বিখ্যাত কাজিরাঙ্গার অরণ্য দেখবার সুযোগ হয়নি। এবার তাই ধনুক ভাঙা পণ।
দূরত্ব কমাতে ঝকঝকে ফোর লেন ছেড়ে, রঙ্গিয়ার বাইহাটা চারালি থেকে তেজপুরের পথে ঢুকেই স্মৃতি গ্রাস করল। সেই কবে প্রায় বছর চল্লিশ আগে, কিশোর বয়সে, ঘুরে গিয়েছিলাম মঙ্গলদৈ, টংলা, উদালগুড়ি, ঢেকিয়াঝুলি। আজ আবার এই প্রৌঢ় বয়সে সেই পথে। মাঝে ঢেকিয়াঝুলির হোটেলে শিলঘরিয়া মাছের সুস্বাদু ঝোল ভাল লাগা বাড়িয়ে দিল আরও। জিয়া-ভরালি,মানস, তিরপ আর ডিলি নদী ছাড়া এই মাছের নাকি দেখা পাওয়া ভার।
তেজপুরের কাছে ব্রহ্মপুত্রের ওপর বিরাট কোলিয়াভোমরা সেতু পার করে, জখলাবান্ধাকে পেছনে ফেলে, কাজিরাঙ্গায় যখন ঢুকছি, তখন সন্ধে। এর মধ্যেই রাস্তার ধারে দেখা গেছে শাবক সহ মা গণ্ডারকে। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে একপাল হাতি। এসব দেখেই মনে হল, কাজিরাঙ্গা নিরাশ করবে না।
চারটি ভাগে বিভক্ত কাজিরাঙ্গা। সেন্ট্রাল বা কোহরা জোন, ওয়েস্টার্ন বা বাগোরি জোন, ইস্টার্ন বা আগরতলি জোন এবং ঘোড়াখাটি বা বুড়া পাহাড় জোন। একশৃঙ্গী গণ্ডারের জন্য কাজিরাঙ্গা বিশ্ববিখ্যাত হলেও রয়েছে বুনো মোষ, হাতি, হরিণ, কচ্ছপ, উল্লুকের মতো নানা প্রাণী। বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরও দেখা মেলে এখানে। এলিফ্যান্ট ঘাসের প্রান্তর, জলাশয়ের এই গভীর অরণ্যে বাঘ দেখা যাচ্ছে বলে, ২০০৬ থেকে টাইগার রিজার্ভের মর্যাদাও পেয়েছে কাজিরাঙ্গা।
কাজিরাঙ্গার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন মেরি কার্জন। ভারতের তদানিন্তন ভাইসরয় লর্ড কার্জনের স্ত্রী মেরি গিয়েছিলেন কাজিরাঙ্গায়। ভারতের বিখ্যাত একশৃঙ্গী গণ্ডার দেখতে। এমনই দুর্ভাগ্য যে, একটিও দেখতে পাননি তিনি। তাঁর বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, এই অত্যন্ত বলশালী নিরীহ প্রাণীটির অস্তিত্ব বিপন্ন। দেরি না করে লর্ড কার্জনের কাছে দরবার করেন মেরি। আর তার ফলেই ১৯০৮ (অনেকের মতে ১৯০৫) সালে গড়ে ওঠে ২৩২ বর্গ কিমি`র পৃথিবীখ্যাত এই পার্ক। আজ অবশ্য পার্কের এলাকা আরও বড়। ৪৩০ বর্গ কিমি। গণ্ডারের সংখ্যা এই মুহূর্তে ২২০০-এর বেশি। পৃথিবীর তিন ভাগ গণ্ডারের দুই ভাগই কাজিরাঙ্গার।
পরদিন সকাল থেকেই শুরু হল আমাদের সাফারি। সত্যি বলতে, এত গণ্ডার এর আগে কোনওদিন দেখিনি। পরম নিশ্চিন্তে ঘাস খেয়েই চলেছে। আমরা যে এত কাছে চলে এসেছি, ভ্রূক্ষেপ নেই তাদের। কেউ আবার নেমে পড়েছে অভয়ারণ্যের ভেতরের জলাশয়ে। আর এই জলে নামার ব্যাপারে তাদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বুনো মোষেরা। কী রাজকীয় তাদের চেহারা আর গায়ের চকচকে রং!
হাতিরা অবশ্য একটু বিরক্ত হয়েছিল আমাদের ওপর। বিশেষ করে দলপতিটি। রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকল খানিকক্ষণ। শেষটায় আমাদের গাইড সাইদুল প্রার্থনার মতো বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল, `বাবা যাআআ এ বাবা যাআআ..মোরা তোর ব্যাটা রে....যাতি দে বাবা...এ বাবা...` সাইদুলের প্রার্থনার জন্যই হোক বা অন্য কোনও কারণে, শেষটায় তিনি পথ ছাড়লেন। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
দেখা গেল জানা-অজানা অজস্র পাখি, কচ্ছপ, গুঁই সাপ। তবে বাঘ জুটল না কপালে। জঙ্গলের ধুপছায়ায় ঝিঁঝিঁর একটানা ডাকে শান্ত নির্জনতা বলে দিচ্ছিল, সময় এখানে থমকে আছে।
কাজিরাঙ্গার চারটি জোনেই মোটামুটি একই ধরণের প্রাণী ও পাখি। তবে বাগোরিতে তাদের সংখ্যা সম্ভবত বেশি। চা-বাগান, পাহাড় আর জঙ্গল নিয়ে বুড়া পাহাড় রেঞ্জ সুন্দর। তবে আমাদের উত্তরবঙ্গবাসীদের কাছে সেই দৃশ্য পরিচিত। আগরতলি জোনে পাখিদের আধিপত্য। বেশি ভালো লাগে শীতকালে। পরিযায়ী পাখিরা ভিড় জমায় তখন। জঙ্গলের একধার দিয়ে চলে গেছে জাতীয় সড়ক। আর সেই রাস্তার দুই ধারে দোকানপাট-বাড়িঘর-হোটেল-রিসোর্ট। প্রত্যেকের জীবিকা কাজিরাঙ্গাকে ঘিরেই।
কাজিরাঙ্গার আর এক আকর্ষণ অর্কিড পার্ক। এই অঞ্চলের সেরা এই পার্কে ৬০০ প্রজাতির অর্কিডের দেখা মেলে। আর সন্ধেবেলায় পরিবেশিত হয় অসমের বিভিন্ন জনজাতির বর্ণময় নৃত্য ও গীত। বোরো, মিরি, কাৰ্বি, রাভা, কাছারি ইত্যাদি সম্প্রদায়ের ঘূর্ণন, বাগরুমবা, হামজার, মাটিয়াখাড়া, দেওধনি, ডোমেদিরাং এবং অতি অবশ্যই বিহু নৃত্য দেখা নিঃসন্দেহে সারা জীবনের অন্যতম সেরা সঞ্চয়।
এতদিন মনের মাঝে `মানস` ছিল। কাজিরাঙ্গা রইল এবার তার পাশে।
(প্রকাশিত: আয় মন বেড়াতে যাবি/ রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ/ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৫।
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ)

No comments:
Post a Comment