এ বড় কঠিন সময়, কেটে যাক কালো মেঘ
শৌভিক রায়
শিক্ষক, কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ হাইস্কুল
চাকরি নাকি শিক্ষকতা? প্রশ্নটা সেদিনও ছিল।
তিনদশক আগে যখন এই পেশায় এলাম, তখন একবারও মনে হয়নি চাকরি করতে এসেছি। বরং গর্বিত হয়েছি এমন মহান একটি পেশায় যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়ে। পরিবারের অনেকে এই পেশায় ছিলেন, তাই কখনও অন্য জীবিকার কথা ভাবিনি। শিক্ষকতাকেই বরাবর পাখির চোখ করেছি। শুধু আমি নই। আমার বন্ধুবৃত্তের অধিকাংশ এই পেশাকে বেছে নিয়েছিল। কারণ, প্রশ্নাতীত সম্মান ও শ্রদ্ধা।
প্রতিটি মানুষ নিজের বাবা-মায়ের পরে যে মানুষটিকে আসনে বসায়, তিনি একজন শিক্ষক। সমাজে তাঁদের পরিচিতি অন্য যে কোনও পেশার মানুষের চাইতে হাজার গুণ বেশি। ভবিষ্যতের সুনাগরিক গড়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁদের কাঁধে। শিক্ষাগত যোগ্যতা নেওয়ার পর বেশিরভাগ বাঙালি পরিবারের ছেলেমেয়েরা এসএসসি’র নোটিফিকেশনের অপেক্ষায় দিন গুণতেন। এখন সেসব অতীত।
হঠাৎ করে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। আজ অবস্থা এমন যে, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাচ্ছে! কে কবে কল্পনা করেছিল যে, শিক্ষকদের গায়েও দাগি তকমা লেগে যাবে! আর তার অভিঘাতে টালমাটাল হয়ে পড়বে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা! নিয়োগের সঠিক পদ্ধতি না মানা সত্ত্বেও যাঁরা এতদিন পড়িয়েছেন, কী শিখিয়েছেন তাঁরা কোমলমতি পড়ুয়াদের? মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার যে খাতাগুলো তাঁরা চেক করেছেন, সেসবের কি আদৌ সঠিক মূল্যায়ন হয়েছে? টাকার বিনিময়ে চাকরি কিনে বা বেঁচে পেশার অপমান করতে বাধেনি কোনও পক্ষের। শুধুই কি শিক্ষাক্ষেত্র? সামাজিক সুস্থিতি নষ্ট হয়নি? যদি শুধুমাত্র চাকরি চলে যাওয়ার দিক দিয়ে বিচার করি, তবে দেখব সেটাও প্রভূত পরিমাণে হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, এই দাগি শিক্ষকরা আগামী প্রজন্মের কাছে এমন এক দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন যে, ভবিষ্যতে পেশায় আসতে দশবার ভাববে অনেকে। যাঁরা দাগি নন, তাঁরাও আজ সব হারিয়েছেন। ফের কোর্ট কেস, প্যানেল বাতিল ইত্যাদির আশঙ্কায় নিরাপত্তাহীনতা নয় শুধুমাত্র। মানুষের আড়চোখে দেখা এবং কীভাবে চাকরি হয়েছে, সেই প্রশ্ন তোলার আশঙ্কা কুরে কুরে খাবে চাকরিপ্রার্থীদের।
এখন না হয় ভালো বেতন দেওয়া হয়। অথচ একসময় স্থানীয় স্তরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে নীতিগত কারণে কম পারিশ্রমিক থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র সম্মান ও শ্রদ্ধার জন্য এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন অনেকে। গ্রামে স্কুল স্থাপনে এগিয়ে এসেছেন বহু মানুষ। বিনা পারশ্রমিকে তাঁরা মাসের পর মাস পড়িয়েছেন। অবসরের পর নিয়মিত স্কুলে পড়াতে যাওয়ার দৃষ্টান্ত আজও রয়েছে এই বাংলায়।
কিন্তু যখন সেই পেশার মর্যাদা, বিশ্বাসযোগ্যতা, সম্মান ভুলুন্ঠিত হতে দেখি, বড় কষ্ট লাগে। যদি এরকম চলতে থাকে, তবে তো রাষ্ট্রের বিপদ। এই পেশা নিয়ে নতুন প্রজন্মের মনে নেতিবাচকতা তৈরি হলে বিপদ সমাজের। এরপরের প্রজন্মকে শেখাবে কে? আমরা যতই বড় হয়ে কারিগরি ও প্রযুক্তির সাহায্যে আকাশ ছুঁই না কেন, ভিত তৈরি করে দেবেন শিক্ষকরাই।
রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগে যে দুর্নীতি হয়েছে, যেভাবে শিক্ষকদের গায়ে দাগি তকমা লেগেছে, আন্দোলন করতে গিয়ে লাঠির বাড়ি খেতে হয়েছে- তা দুশ্চিন্তার বড় কারণ। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন ছবি কখনোই কাম্য ছিল না।
তবু আশাবাদী মানুষ হিসেবে স্বপ্ন দেখি যে, আমার প্রিয় পেশার ওপর থেকে কালোমেঘ কেটে যাবে। যে সমস্ত মানুষ স্কুল-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে, গ্রাম-শহরে চক ডাস্টার হাতে নিয়ে রোজ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সমাজ সংস্কারের, তাঁদের রোল মডেল হিসেবে বেছে নেবে ছেলেমেয়েরা। ঝলমলে আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে শিক্ষকসমাজ।
(প্রকাশিত: ক্যাম্পাস, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৫)

No comments:
Post a Comment