Thursday, September 4, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১৮ 
শৌভিক রায় 

কোনও জায়গা থেকে চলে গেলেই কি সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়? 
প্রশ্নটা ভাবায়। 

আরও একটু স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য, দিনহাটা হাই স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে, বাবা চলে গিয়েছিলেন ফালাকাটা হাই স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে। কিন্তু সপ্তাহ শেষে দিনহাটায় এলেই বাবাকে দেখেছি শ্রদ্ধেয় সুভাষ নাগ, নরেন দেব, অখিল নিয়োগী প্রমুখদের বাড়িতে দেখা করতে যেতে। 

দিনহাটা গার্লস স্কুল থেকে মা ফালাকাটা হাই স্কুলে গেলেন ঠিকই। কিন্তু ভুললেন না মানি (শ্রীমতী সন্ধ্যা সাহা), বড়মাসি (পূজনীয়া মুকুল রায়), দুই ঝর্ণামাসি (শ্রীমতী ঝর্ণা নাগ ও পূজনীয়া ঝর্ণা বর্ধন), মীরামাসি (পূজনীয়া মীরা রায়),  বেলামসি (পূজনীয়া বেলা গুহ), গৌরী মাসি (শ্রীমতী গৌরী সান্যাল), ইলামাসি (ইলামসির টাইটেল ভুলে গেছি), প্রতিমা মাসি (পূজনীয়া প্রতিমা ভাদুড়ী), লিলিমাসি (লিলিমাসির টাইটেল মনে নেই), জয়তীমাসি (শ্রীমতী জয়তী ইশোর), আরতিমাসি (শ্রীমতী আরতি সাহা), পণ্ডিতদাদু, বীরুদাদু, লাবণ্যমাসি, রামেশ্বরদা, রতনদা প্রমুখদের। 

আমার কাকুদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আশুকাকুর (প্রয়াত আশুতোষ রায়) অকালমৃত্যুর অভিঘাত সহ্য করতে না পেরে দিনহাটা ছাড়লেও আমার মনে সবসময় রয়ে গেছে বাবুদা (বড়মাসির সুযোগ্য পুত্র মানবেন্দ্র রায়), রাজাদা অর্থাৎ অনির্বাণ নাগ ও রিঙ্কু (ঝর্ণা মাসির সুশিক্ষিত ও সর্বজনপ্রিয় পুত্র ও কন্যা),  মুন্নি (মীরামাসির মেয়ে), তানিয়া (লিলিমাসির কন্যা), রূপা (ঝর্ণা বর্ধন মাসির মেয়ে), ঈমন (বড়মাসির মেয়ে)। 

দিনহাটা গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকাদের পুত্র-কন্যারা বাদেও ভুলিনি সহপাঠী উলু (দেবত্র) সহ সুজয় (সুজয় সাহা, দিনহাটা চৌপথীর কাছে ওদের সম্ভবত দশকর্মার দোকান ছিল। বাড়িটি ছিল কাঠের।), বিদুর, রঘু, তোতো, মৃদুল, তপন, গাঠু, কানু কাউকেই। আর জ্ঞাতিদের মধ্যে জীবনদা, মধু, ভজন, বাবুন, ঝর্ণাদি, মনাদি তো আজও রয়েছে মনে।  

এখন দিনহাটা কলেজে পড়তে এসে, এই তিন বছরে, নতুন বন্ধু হয়েছে অনেকে। গোপালনগর শরণার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যখন পড়ি, তখন সেই পটলাস্যারও যেমন মনে রয়েছে, আজ কলেজ ছাড়ার সময়ে মনে গেঁথে গেছেন কতজন!

এইসব ভাবতে ভাবতেই দেখি বাস ঢুকছে কোচবিহারে। এই রাজনগর আসলে আমার দিনহাটা-ফালাকাটা নিয়মিত যাত্রার মধ্যে ছোট্ট হাইফেন। এটি এমন এক যতিচিহ্ন, যা মোছা যায় না কখনও। ফালাকাটা থেকে, উচ্চ মাধ্যমিকের পরে, যে আমি উদভ্রান্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে এসেছিলাম দিনহাটায়, সেই আমাকে আবার নতুন করে নির্মাণ করেছে এই শহরটিও। ফিরে পেয়েছি বিশ্বাস। আশ্বাস এসেছে নতুনের। তাই বাস যখন কোচবিহার ছেড়ে সামনে এগোচ্ছে, মন বলল, আবার ফিরতে হবে এখানেই হয়ত বা কখনও। আসলে ওই যে সেই বিখ্যাত কথা  In my beginning is my end....

********************************************************************************************************************************************************************

পার্ট টু-এর রেজাল্ট বেরোতে খুব একটা দেরি হল না। গতবারের চাইতে এবার আরও বেশি মার্কস। তবে খুশি হলাম না। কেননা আরও একটু পাওয়া উচিত ছিল। ইউনিভার্সিটি যে মেধা তালিকা দিয়েছে তাতে পনেরো নম্বরে রয়েছি। কোচবিহার-জলপাইগুড়ি-দার্জিলিং-মালদা-দিনাজপুর অর্থাৎ গঙ্গার এপার থেকে একদম পাহাড় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার সূত্রে রেজাল্ট নিঃসন্দেহে ভাল। তবু ভাল হত আরও, যদি সময় ও সঠিক গাইড পেতাম। 

তবে আমার মন ভরিয়ে দিল রীনার রেজাল্ট। পার্ট ওয়ানের তুলনায় অনেকটা বেশি পেয়েছে এবার। তালিকার হিসেবে পঁচিশের মধ্যেই হবে ওর জায়গা। এতটা নম্বর পাবে, সেটা বোধহয় নিজেও বোঝেনি। ওদের ব্যাচে ওরই সবচেয়ে বেশি মার্কস। ভাল লাগছিল ভেবে যে, হয়ত ও-ও ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করতে যাবে আমারই মতো। 

**********************************************************************************************************************************************************************

মৌলিকবাবুকে প্রণাম করতে গেলাম আমি আর শুভ। মার্কশীট হাতে নিয়ে স্যার চোখ বোলালেন। আমাদের পরের ব্যাচ তখন পড়ছে,
- তোমরা দেখো...এই ছেলেটি...শৌভিক। সব পেপারে ভাল নম্বর। তবু আলাদা করে উল্লেখ করব কবিতা পেপারের কথা। কত পেয়েছে জানো? আজ অবধি আমার ব্যাচে কেউ এত নম্বর পায়নি। ৬০। সিক্সটি। আমি গর্বিত!

এর চাইতে বড় পাওনা আর কিছু হয় না। সকলেই হাততালি দিয়ে উঠলো। ভেসে গেলাম এক অদ্ভুত ভাল লাগায়। 

শুভ স্যারকে প্রণাম করতে ঝুঁকে পড়ে  আর ওঠে না। ওকে যত ডাকি, তত বলে, `দাঁড়া না! আর একটু প্রণাম করি!` 
ভাগ্যিস আমি ঠিক আছি। তা না হলে দুজনেই একই কীর্তি করলে আর হাততালি পেতে হত না! 
তবে সবার মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম যে, ওরা বুঝে গেছে আমরা সত্যিই তূরীয় আনন্দে আছি।
কিন্তু সেদিন সব মাপ। 

**********************************************************************************************************************************************************************

রীনার পোস্টকার্ড এলো,
`আমি ভর্তি হয়েছি। এখনও হোস্টেল পাইনি। তবে শিবমন্দিরে মনদা আছে। মেসে। দরকারে দুই চারদিন ওখানে থাকব। তারপর ব্যবস্থা করব। হয়ত হোস্টেল পাব। কয়েকদিন সময় লাগবে....` 

***********************************************************************************************************************************************************************

মুজনাইয়ের জলে সকালের লাল সূর্যের আভা। একটা অন্ধকার খণ্ড রাত কেটে গেছে। 
এবার পালা অন্য শুরুর। 
আসলে শেষ বলে কিছু হয় না। শেষ যেখানে হয়, শুরু হয় সেখানেই। 
দিনহাটা কলেজ এটাই শিখিয়েছে এই তিন বছরে। 

(শেষ)


* ছবি- দিনহাটা কলেজে রীনা ও আমি। ছবিটি তুলে দিয়েছেন দিনহাটা হাই স্কুলের সুশিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও আমার ভাই শ্রী জয়ন্ত চক্রবর্তী 

* এই সিরিজটি বর্ধিত আকারে গ্রন্থ হয়ে প্রকাশ পাবে হয়ত কখনও। যাঁরা এতদিন ধরে এই কথন পড়লেন, তাঁদের সবার কাছেই ঋণী ও কৃতজ্ঞ রইলাম।  
                 
     

                 
     

No comments: