Monday, August 29, 2022



।।একটি ব্রিজ আর কিছু কথা।।

         শৌভিক রায় 

বিভূতি বলল,

- এটায় উঠতেই হবে!

উঠব কীভাবে? থামলে তো! নাকের ডগা দিয়ে হুঁশ করে বেরিয়ে গেল বাসটা।


চার নম্বরে রাস্তা অনেকটা বাঁক নিয়েছে। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে আলোর সারি। বুঝলাম ব্রিজের জ্যাম খুলেছে। 


কোচবিহারে আড্ডা দিয়ে সন্ধে নাগাদ হরিশ পাল চৌপথি থেকে বাস ধরেছিলাম। বাণী নিকেতন গার্লস স্কুলের সামনে এসে দীর্ঘ লাইন দেখে বুঝতে অসুবিধে হল না, কপালে দুঃখ আছে! জানা গেল, ঘুঘুমারি রেল ব্রিজে ট্রাক নষ্ট হয়েছে। মেরামতি চলছে। কখন রাস্তা খুলবে ঠিক নেই।


এই এক ব্রিজ! সারা ভারতে এরকম আর একটিও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। রেলের হলেও এই ব্রিজ দিয়ে বাস, ট্রাক, টেম্পো, মোটর সাইকেল, স্কুটার, রিক্সা, ঠ্যালা সব চলে। এটিই বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র সেই রেল ব্রিজ যেখানে ট্রেন এসে দাঁড়িয়ে থাকে, কখন ব্রিজটি তার চলার মতো হবে! 


কোচবিহারে তখন ঢুকবার পথ এই একটিই। শিলিগুড়ি, তুফানগঞ্জ, ফালাকাটা, মাথাভাঙ্গা, দিনহাটা ইত্যাদি সব দিক থেকেই রাজনগরে পৌঁছবার এই একটিই পথ! রেল ব্রিজটি সিঙ্গেল ওয়ে হওয়ায় বিপত্তি আরও। শহরে ঢুকতে বা বেরোতে কোনও একবার আটকে থাকতেই হবে! খুব খুব খুব কপাল ভাল হলে ব্রিজ পেরোনো যাবে দ্রুত। 


কিন্তু আমার তো চিরকাল সেই কপাল। তাই সকাল বিকাল রাত মায় গভীর রাত যখনই আসি, ব্রিজ বলে 'ধীরে যা রে বন্ধু!' তা সেদিনও তাই। ট্রাক নষ্ট হওয়ার জন্য ব্রিজের দুদিকেই লম্বা লাইন। অগত্যা হাঁটা শুরু। হাঁটতে হাঁটতে কিমি পাঁচেক চলে আসবার পর প্রথম বাসের সঙ্গে দেখা। তিনি অবশ্য থামলেন না। দ্বিতীয় বাসটিও যখন থামল না, তখন বুদ্ধি খুলল। চার নম্বরে একটি বিকট বাম্প ছিল। দাঁড়ালাম তার সামনে। পরের বাসটি সেখানে স্পিড স্লো করতেই বাসের পেছনে ছাদে ওঠার সিঁড়ি ধরে ঝুলে পড়লাম দুজনে। বাস থামল দেওয়ানহাটে। এবার পেছন থেকে নেমে বাসের ভেতর। পয়সা বাঁচল। হু হু হাওয়ায় এতক্ষণের পরিশ্রমের ঘাম শুকিয়ে গেল!


এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের মাঝবয়েসী (নাকি বুড়ো!) প্রত্যেকেরই কমবেশি আছে। সে আমলে কোচবিহারের রেলব্রিজে আটকে থাকেনি এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না। আর সবারই টিপিক্যাল সব স্মৃতি আছে সেই আটকে থাকার। একেই রেলব্রিজ। তার ওপর গাড়ি চলছে। অর্থাৎ পিচের ওপর রেল লাইন। আর সেই রেল লাইনের গর্তে সাইকেলের চাকা ঢুকে কতজন যে 'পপাত চ' হত তার হিসেব ছিল না! ব্রিজের দুদিকের দুটো রাক্ষুসে গতি নিরোধক ঢিপিতে কত গাড়ির তলা যে ফেটে যেত সেটাই বা জানছে কে! সেই সময়ে ব্রিজকে আমরা প্রতিদিন গালি দিতাম। মজা হল, ব্রিজ পার হলেই কষ্ট ভুলে যেতাম মুহূর্তে!


সেই রেল ব্রিজ এখন শুধুমাত্র ট্রেনের জন্যই। বহুদিন আগেই গাড়ি চলাচলের অন্য সেতু হয়েছে। আজকের প্রজন্ম বুঝবে না কেমন ছিল সেই দিনগুলি। 


আমাদের জীবনটা কি ওই ব্রিজের মতো নয়? একসময় হৈ চৈ, সবার কাজে লাগা, অন্যের বিরক্তির কারণ হলেও গুরুত্ব পাওয়া! তারপর? পরিত্যক্ত! একা। হঠাৎ কখনও কোনও ট্রেনের মতো কারও সঙ্গে সামান্য দেখা বা কথা! বাকি সময়? নিস্তরঙ্গ। জীবন বয়ে চলবে যেমন বয়ে চলে তোর্ষার প্রবাহ। শুধু দেখে যাওয়া চুপচাপ কোনও এক জায়গা থেকে। ওই ব্রিজের মতোই.... 


(ছবি- গাড়ি চলাচলের ব্রিজ থেকে তোলা তোর্ষার ছবি। ২০১৫ তে তোলা ছবিটি 'নদী ও তাহারা' সিরিজের)

Friday, August 26, 2022




এররস আর ব্রেড আরনার্স

শৌভিক রায় 


ইংরেজিতে একটি কথা আছে- Errors are bread-earners। কথাটা শুনে প্রথমটায় থমকে ছিলাম একটু। আমার মধ্যবিত্ত মন কথাটা মানতে চায়নি। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই বোঝা যায়, কথাটা ভীষণভাবে ঠিক। ঠিক মানে, আমাদের শিক্ষকতা জীবনে। 


সত্যিই তো ছাত্ররা যদি ভুল না করত, তবে কি আমার প্রয়োজন হত? অবশ্যই হত না। আর প্রয়োজন না হলে, চাকরিটি থাকত না। না থাকলে, পেটের ভাতও জুটত না! Errors বা ভুলকে ঠিক করাই আমার কাজ, তা সে লাল কালিতেই করি বা সবুজ। কী যায় আসে?


ঘটনা হল, এই ভুল ঠিক করতে করতে একসময় একঘেয়েমি আসে। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর শুধু ভুল ঠিক করো আর ভুল ঠিক করো! কাঁহাতক ভাল লাগে!!


লাগে। ভুলগুলো যদি এক্সট্রা অর্ডিনারি হয়, তবে একঘেয়ে নিস্তরঙ্গ এই জীবনেও বেশ একটা ইয়ে আসে। কীভাবে ভুলব সেই ভুলটিকে যেটি আমার কাছে ক্ল্যাসিক বলে মনে হয় আজও। ক্লাস সিক্সের সেই পুঁচকে Our Headmaster রচনা লিখেছিল Mrs. B. C. Pal is our headmaster. He is short and fat. He has two eyes, two hands, two legs and no tail. ভুল করার ক্ল্যাসিক উদাহরণ নয় কি এটা? আগের ক্লাসে পড়া Mrs. Khan is our headmistress আর গরুর রচনার এরকম পাঞ্চ আর দ্বিতীয়টি পাইনি আজ অবধি! 


'গাছের কাণ্ডের কাজ কী?' উত্তরে যদি কেউ লেখে 'মানুষকে গাছে উঠতে সাহায্য করা', তবে সেই ভুলকে তারিফ করতেই হয়! এরকম বাস্তব বুদ্ধি নিয়ে চলা ছাত্রের জীবনে কিচ্ছু আটকাবে না। সে ঠিক ট্যাকেল করবে সব, এটা নিশ্চিতে বলতে পারি। 


ক্ল্যাসিক ভুলের আর একটা উদাহরণ- 'তামা গাছে ফলে। তামা দিয়ে বিড়ি সিগারেট বানানো হয়। কোচবিহার জেলা তামা চাষের জন্য বিখ্যাত...।' অবাক লাগছে তো? লাগবার কথা। আসলে ছাত্রটি হুড়োহুড়ি করে প্রশ্ন পড়তে গিয়ে, তামার বদলে 'তামাক' পড়েছিল। বেশ জম্পেশ লিখে, রিভিশন দিতে গিয়ে যখন আবিষ্কার করল যে, 'তামা' সম্পর্কে লিখতে বলা হয়েছে, তখন উত্তরটা না কেটে তামাক থেকে শুধু 'ক' গুলো কেটে দিয়েছিল। আর তার ফলে আমরা পেয়ে গেলাম অনবদ্য এই রচনাটি! 


আজ পঞ্চম শ্রেণির এক খুদে 'শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ' হিসেবে যা লিখেছে, তাতে অত্যন্ত চমৎকৃত হয়েছি। উত্তরটি ভুল নাকি সেটা নিয়ে এখনও চিন্তায় আছি ঠিকই, কিন্তু খুদে ছাত্রটির ভাবনায় বিস্মিত না হয়ে পারিনি। ও লিখেছে 'গরুর শরীরে ব্যথা হওয়ার জন্য গরুকে ওষুধ খাওয়ানো হয়। সেই ওষুধ খেয়ে গরুর ব্যথা কমে গেলেও, কিছুদিন পর গরু মরে যায়। শকুন সেই মরা গরু খায়। ফলে তার কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। কিডনি ফেল করে শকুন মরছে। তাই শকুনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।' পড়াই ইংরেজি। একটু স্বাদ বদলাবার জন্য চেয়েচিন্তে ওদের পরিবেশ বিষয়ক ক্লাসটা চেয়ে আজ যে উত্তর পেয়েছি, তাতে নিজেই ভুল করলাম কিনা ভাবতে হচ্ছে! শকুনের কিডনি! বাপরে। বিপদজ্জনক ব্যাপার!!


এরকম মিষ্টি মিষ্টি ভুলের উদাহরণ প্রচুর। সে সব বলতে গেলে সাতকাহন হবে। তাই অলমিতি। শুধু সংযোজন, এরকম ভুল চলুক। সব ভুলই ঠিক হয়ে যাবে একদিন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু ভুলের এই দারুণ রেশটা রয়ে যাবে চিরদিন। আমার সেই ছাত্র আজ যেমন নিজে নিজেই হাসে। টেলিগ্রাম শিখে হোটেল বুক করতে গিয়ে বেচারা লিখেছিল, 'I EAT HOTEL'... কোনও ভুল না করলে, এই অম্লান হাসিটা কিন্তু আর থাকবে না! তাই ERRORS BREAD-EARNERS হোক বা না হোক, THEY ARE CLASS IN THEMSELVES IN FEW CASES.....


(বোকামির এককাল)





Monday, August 22, 2022

অথ সারমেয় কথা

শৌভিক রায় 

সারমেয়র স্বভাব হইল তাহারা কেবল ঘেউ ঘেউ করে। দিনে ঘেউ ঘেউ করে। রাতে ঘেউ ঘেউ করে। ঘেউ ঘেউ করা ব্যতীত তাহাদের আর কাজ নাই। তাহাদের নাকের ডগা দিয়া নানাবিধ কর্মকাণ্ড হইয়া যায়। তবু তাহারা ঘেউ ঘেউ করে। তাহাদের এই ঘেউ ঘেউ স্বভাবের জন্য কেহই তাহাদের পছন্দ করে না। ইহারা ঘেউ ঘেউ করিয়া রাজা রানি ও পার্ষদদিগকে এমন চটাইয়া দিয়াছে যে, তাহারা ইহাদের দেখিলেই দূর ছাইও করে না। কেননা তাহারা জানে, যে সারমেয় যত চিৎকার করে, সে তত কামড়ায় না। তাহার কামড়াইবার মতো ক্ষমতা নাই। তাই ইহাদের কিছু না বলিলেও চলে। বেশি চিল্লাইলে ইহাদের মাথায় বাড়ি মারিয়া বা পশ্চাদ্দেশে লাত্থি মারিয়া বাড়ি হইতে দূরে কোথাও নিক্ষেপ করিলেই হইয়া যায়। তাই ইহারা চিল্লাক। অসুবিধা নাই। ইহাদের চিল্লানোর ফাঁকে ম্যারাপ বান্ধিয়া এমন প্রগতি আসে যে, তাহা রাস্তায় দাঁড়াইয়া থাকে। অতএব, সারমেয়দের ঘেউ ঘেউ করিতে দাও। যাহার যা কাজ সে সেইটাই করুক। তুমি ফুর্তিতে থাকো।





Sunday, August 21, 2022

 ওদের গল্প

শৌভিক রায় 

জ্যাকির স্বভাব ছিল আমাদের আড্ডায় ঢুকে পড়া। দিনহাটায় মসজিদের সামনের কালভার্টে (তখন মসজিদের আজকের এই চেহারা ছিল না) বা ডাকবাংলো পাড়ার রাস্তার মুখে, অমলদার পানের দোকানে সামনের কালভার্টে বসে জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছি। জ্যাকি চলে এলো। অথচ খানিক আগে ওকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এই তল্লাটে পাওয়া যায়নি। 

যে মাত্র আমরা বসলাম, উনি হাজির। এসে চুপচাপ বসে থাকলেও না কথা ছিল। কিন্তু সেটা তো করবে না! একবার এর কাছে, আর একবার ওর কাছে যাবে। পারলে কোলে উঠে পড়বে আর আধা ময়লা পোশাক পরা কাউকে দেখলেই তেড়ে যাবে! ভাবটা এরকম যেন দিনহাটার মানুষদের পরিষ্কার পোশাক পরানোর দায়িত্ব ও নিয়েছে! কাঁহাতক সহ্য করা যায়?

আমরা গাল দিই। পারলে মারি। তাও নড়ে না। অদ্ভুত স্বভাব। শেষটায় জীবনদা একদিন শেখালো কীভাবে ওকে তাড়াতে হয়। কিচ্ছু না। খুব সহজ। নিজের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে শুধু বলতে হবে, 'এই যে বের করলাম কিন্তু!' ব্যস জ্যাকি মুহূর্তে ভ্যানিশ। 

কিন্তু রহস্যটা কী?? জীবনদাকে চেপে ধরতে ব্যাপারটা জানা গেল। জ্যাকি নাকি দেশলাইকে খুব পায়। দেশলাই দিয়ে আগুন জ্বালানো যায় তো। তাই। যেহেতু পকেটে দেশলাই বাক্স থাকে, তাই পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটু বললেই হল। ত্রিসীমানায় থাকবে না। রাগে দুঃখে ক্ষোভ অপমানে সেই যে জ্যাকি চলে যেত, আর পাওয়াই যেত না। একমাত্র ফটাকাকা যখন 'জ্যাকিইইইইইইইইইইইইইই' করে হাঁক দিত, তখন দিনহাটার যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, ঠিক চলে আসত।

জ্যাকির দেশোয়ালি আর এক ভাইয়েরও প্রেস্টিজ খুব টনটনে ছিল। ওর সামনে যদি একবার বলা যেত 'উফ! কী গন্ধ!!', তাহলে ও উঠে চলে যেত অভিমানী চোখ নিয়ে। 

জ্যাকির এক বংশধরকে জানি যে দিনের বেলায় মহা বকবক আর চেঁচামেচি করলেও, রাতের বেলায় ওর ঘর থেকে বের করা যেত না হাজার চেষ্টাতেও। আমার সেজকাকু প্রথমটায় বিড়বিড় করতেন, 'ব্যাটা বুরবক।' শেষটায় আমাকে একদিন ফোন করে ডাকলেন। খুব নাকি জরুরি কথা আছে। দ্রুত যেন যাই ফোন পেয়েই। কোচবিহার থেকে ছুটে গেলাম। কী কেস? সেজকাকু আমাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে খুব নিচু স্বরে বললেন, 'বুইলি...আমি বুঝে গেছি কেন ওকে রাতের বেলা ওর ঘর থেকে বের করা যায় না!' 

কাকে ঘর থেকে বের করা যায় না সেটা বুঝতে একটু সময় লাগল। শেষটায় ধাতস্থ হয়ে বললাম, 
- কীভাবে বুঝলে?
- ওদের কে আজকের থেকে চিনি নাকি!!
- অ। বেশ। তা কী বুঝলে?
- ভূতের ভয়।
- ভূতের ভয়?
- একদম। ভূতের ভয়ে বের হয় না, বের করাও যায় না। বুইলি?

আর বুইলাম! হাসব না কাঁদব নাকি রেগে ফায়ার হব বুঝতে পারছিলাম না। এই খবর শোনার জন্য পড়িমরি করে কোচবিহার থেকে দিনহাটায় এলাম! তাও সাহস করে জানতে চাইলাম,
- তা এই খবর দেওয়ার জন্য দরজা বন্ধ করলে কেন? আর এত নিচু গলায় কথাই বা বলছ কেন?
- তোর কাকিমা।
- কাকিমা আবার কী করল?
- করেনি। করতে পারে।
- কী করতে পারে?
- ভয়ানক গালিগালাজ। বকাঝকা।
- কাকে?
- আমাকে। অবভিয়াসলি আমাকে!
- কেন?
- তোকে ডেকে এনেছি এই কথা জানাবার জন্য এটা যদি বোঝে, তবে তাণ্ডব করবে।
- করবে?
- করছে তো। আমি এতদিন থেকে বলে যাচ্ছি ও ব্যাটা ভূতের ভয় পায়, সেটা শুনছে না তোর কাকিমা। আমাকে উল্টোপাল্টা বলে যাচ্ছে। আমার লাইফটা, বুইলি, হেল করে দিল এই মহিলা!
কে কার লাইফ হেল করল সে নিয়ে অবশ্য আর এগোলাম না। আমার নিজের যে সেই মুহূর্তে হেল হয়ে গেছে, সেটা বুঝতে পারছিলাম!

সম্পর্কে জ্যাকির তুতো নাতি বাঘা থাকত ফালাকাটায়। অলকদাদার বাড়িতে। বাঘার মতো ভদ্র আর দ্বিতীয়টা দেখিনি। হলে হবে কি! আমার গিন্নি। বাঘা যেই গিন্নিকে একটু জড়িয়ে ধরেছে, অমনি মহিলা ভয়ানক চিৎকার!! তার চিল চিৎকারে বাঘা সেই যে লুকোলো, আর এলোই না। সব্বাই চেষ্টা করলাম। বহু ডাকলাম। গলা জড়িয়ে টানলাম। কিন্তু কিছুতেই সামনে এলো না। অলকদাদা বলল, 'রীনার চিৎকারে লজ্জা পেয়েছে। ভাবেনি যে, বৌদি ওকে ভয় পাবে!' বাঘা লজ্জা পেয়েছে কিনা জানিনা, তবে এই কথা শুনে গিন্নি একটু লজ্জা পেল। শেষটায় গিন্নির মিহি সুরে বলা 'বাঘা...একবার এসো। আমি এখন যাব তো!' শুনে বাঘা সামনে এলো। তবে এবার আর জড়িয়ে ধরল না। শুধু জিভটা বের করে ফিক করে একটু হাসলো।

জ্যাকি, জ্যাকির দেশোয়ালি বন্ধু, জ্যাকির বংশধর আর বাঘার মতো আরও অনেকে আমাদের চারপাশেই আছে। একটু নজর করলেই সবাইকে খুঁজে পাওয়া যায়। জ্যাকি, জ্যাকির দেশোয়ালি বন্ধু, জ্যাকির বংশধর আর বাঘা....এরা সবাই চারপেয়ে। সারমেয়। গোদা বাংলায় কুকুর। আর এরা সব্বাই মন্টমোরেন্সির ভারতীয় সংস্করণ। 

(বোকামির এককাল)

Friday, August 19, 2022

 


বাবা মা 

শৌভিক রায় 

ছায়া দীর্ঘ হলে খুঁজি বাবাকে,
মা রয়ে যান শীতল স্পর্শে...

সবটাই এখানে এসে শেষ হয়ে যেতে পারত,
হয় না বলেই জীবন আর তুমি আমি 
দিনের শেষে সূর্যাস্ত তাই,
শুরু থেকে পাপক্ষয় যার যার 

তবু কখনও কোনও এক ভোরে 
কানে আসে বাবার মন্ত্রোচ্চারণ, 
মা`য়ের দীর্ঘ পুজো, লাল-পার শাড়ি,
গৃহস্থ বাড়িতে অন্নকূট এভাবেই হয়

সময় এসে কাঁধে হাত রাখে 
বলে কিছু কথা নিজের মতো, 
চালসে চোখে বুড়িয়ে যেতে যেতে দেখি 
বাবা আর মা, সেই কবে থেকে, 
আছেন দাঁড়িয়ে তাঁদের মতো, 
ঠিক পাশে, খুব পাশে... 

(প্রকাশিত: করতোয়া নন্দিনী / সম্পাদক: রুমি নাহা মজুমদার
পঞ্চম বর্ষ সংখ্যা ২০২২ )

Monday, August 15, 2022


 

স্বাধীনতা দিনে

শৌভিক রায়


বিজন সেতু পার করে গড়িয়াহাটের দিকে সামান্য এগোতেই বা-হাতে ফার্ন প্লেসের রাস্তা। মিটার এক-দেড়শো পরেই মোটামুটি সমান্তরাল রয়েছে ফার্ন রোড। আর ফার্ন রোডের মুখে, উল্টোদিকে, ফার্ন হোটেল। সেই আদ্যিকালের টেবিল চেয়ার নিয়ে এখনও লড়ে যাচ্ছে এককালের ঝকঝকে হোটেলটি। নোনা ধরা দেওয়ালে ঝুলছে উত্তমকুমারের ছবি। খেতে এসেছিলেন কবে যেন। আছেন বিখ্যাত আরও কয়েকজন পাশাপাশি।  


ফার্ন প্লেসের বা ফার্ন রোডের রাস্তায় ঢুকলেই বাবার কথা মনে পড়ে বড্ড। বাবা যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন দক্ষিণ কলকাতা গোলপার্ক পার করেই শেষ। সাউথ এন্ড পার্ক নামের রাস্তা সেই স্মৃতি বহন করছে আজও। ইউনিভার্সিটির পর সুলেখা, বাঘা যতীন, নাকতলা ইত্যাদি নেহাতই গ্রাম। খানপুর ঢাল, নেতাজি নগর, গড়িয়া, নরেন্দ্রপুর, রাজপুর ইত্যাদি অঞ্চলেও জনবিস্ফোরণ আর নগরায়নের এই দশা হবে সেটা বুঝলে বাবা বোধহয় সন্তোষপুরে জমি কিনতেন।


ফার্ন প্লেস ধরে কাকুলিয়া রোড হয়ে সামান্য এগোলেই গোলপার্ক। সরু সরু গলি আর দু'ধারে পুরোনো দিনের বাড়ির এই এলাকাটা আমার সবসময়ই বড্ড প্রিয়। এখনও এখানে কয়লার উনুনে চা ঘন হয় ক্রমাগত। পাওয়া যায় লিট্টি আর চোখা। সাবেক আমলের বাড়ির রকে যুগের তালে তাল মিলিয়ে বারমুডা পরা মাঝ বয়স্করা জমিয়ে আড্ডা দেন। গোলপার্কের কাছে আমিনিয়ার সামনে পাওয়া যায় বিরিয়ানির সুবাস।


আজ সাদার্ন এভিনিউতে গাড়ির সারি। সুবেশ নর-নারীরা ভিড় করেছেন লেকে। হরিপদ চক্রবর্তী উদ্যানের উল্টোদিকের লেক কালীবাড়ি অবশ্য তুলনায় অনেকটা হালকা। 


ছায়াবীথি এই পথ ধরে হেঁটে হেঁটে শরৎ বোস রোডে ঢুকে, ডানদিকে এগিয়ে, খানিক বিশ্রাম মহারাজা টি স্টলে। সামনেই অবশ্য মহারানিও আছেন। দুই জায়গাতেই ভিড় মোটামুটি সমান।


শেষটায় লেক মল পার করে কালীঘাট। কারণ কিছুই নেই। বাবা হেঁটে বেড়াতেন এইসব পথে। স্বাধীনতার দিনে। আমার উদ্বাস্তু সেই বাবা কেন হাঁটতেন? তাঁর কি মনে পড়ত ময়মনসিংহের জামালপুরের কথা? মোটামুটি স্বচ্ছল একটি পরিবারের হঠাৎ পথে নেমে আসা তাঁকে কি তাড়িয়ে বেড়াত সেই স্বাধীনতা দিনে?


কালীঘাট মন্দিরেও ভিড় নেই তেমন। দু'তিনজন পান্ডা অবশ্য তাও চেষ্টা করলেন নিজেদের মতো। নিরাশ করতে হল তাদের। শ্রাবণের শেষ সোমবারে আজও ডিজের দাপট দেখিয়ে চলে গেল মহাদেবের ভক্ত কিছু মানুষ। মাদারের নির্মল হাউসের সামনে চেনা ছবি সব দিনের মতোই।


বৃত্ত শেষ করলাম এখানেই। পরিক্রমা তো শুরু হয়েছে সেই কবে থেকে! পঁচাত্তর পেরিয়েও চলছে তা। চলবে আরও কত পঁচাত্তর কে জানে! 


বাবারা রয়ে যান আসলে। দিয়ে যান কিছু উত্তরাধিকার। বহন করি সেসব আমরাই। নিজেদের মতো....স্বাধীনতা বোধহয় এটাই... এটুকুই....


ছবি- কালীঘাটের এক বাড়ি

Tuesday, August 9, 2022





 হৃষিকেশের নতুন ঠিকানা চৌরাশি কুঠিয়া 

 শৌভিক রায় 
 

হৃষিকেশ শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গাড়োয়াল হিমালয়ের পাহাড়ঘেরা অসাধারণ নৈসর্গিক দৃশ্যের এক জনপদ। হিমালয় পরিক্রমা শেষে গঙ্গা এখানেই সমতল স্পর্শ করেছে। অত্যন্ত প্রাচীন এই জনপদটির কথা পুরান-সহ বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ পাওয়া যায়। বলা হয় যে, এখানেই স্বয়ং বিষ্ণু বৈভ্যকে দর্শন দেন। রাবণ-বধের প্রায়শ্চিত্ত করতে ভাই লক্ষ্মণকে নিয়ে রামচন্দ্র এসেছিলেন এখানে। আবার এটাও কথিত যে, মহাভারতের বিদুর এখানে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। 





হৃষিকেশের ত্রিবেণী ঘাট থেকে শুরু করে আরও অজস্র ঘাটে সন্ধ্যাবেলার গঙ্গা আরতিও চমকপ্রদ। লক্ষ্মণঝুলা ও রামঝুলা (শিবানন্দ ঝুলে) হৃষিকেশের দুই প্রবল বিস্ময়। ঝুলন্ত এই দুই সেতু থেকে গঙ্গা ও হিমালয় দর্শন অন্য মাত্রা এনে দেয়। এবাদেও কৈলাশানন্দ মিশন আশ্রম, কালীকমলির সমাধি মন্দির, গীতা ভবন, স্বর্গাশ্রমের পাশাপাশি ১২কিমি দূরের নীলকণ্ঠ শিব মন্দিরটিও হৃষিকেশ দর্শনের অন্যতম। সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রসিদ্ধ চটিওয়ালার হোটেল। রয়েছে রাম মন্দিরের পাশাপাশি ভারতের একমাত্র লক্ষ্মণ মন্দিরও। 




যোগ সাধনার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র বলে পরিচিত বহুবার দেখা হৃষিকেশে এবারের যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা।হৃষিকেশ  হল পৃথিবীবিখ্যাত বিটলসদের একমাত্র ভারত-সংযোগ। ১৯৬৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি 'ফ্যাবুলাস ফোর`-এর ভারতে আগমন হয়েছিল হৃষিকেশের জন্যই। তাঁদের ভারতে আসবার অর্ধ-শতক পরে পর্যটন মানচিত্রে আবার নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে হৃষিকেশের  রাজাজী টাইগার রিজার্ভের ভেতর থাকা মহেশ যোগীর যোগসাধনা কেন্দ্র চৌরাশি কুঠিয়া বা বিটলস আশ্রম। পরিত্যক্ত সেই আশ্রমের টানে সারা ভারত থেকে পর্যটকেরা ভিড় জমাচ্ছেন হৃষিকেশে।    

১৯৬১ সালে মহেশ যোগী তদানীন্তন উত্তরপ্রদেশ সরকারের বনদপ্তরের কাছ থেকে ১৫ একর জমি লিজ নিয়ে এই আশ্রমটি তৈরী করেছিলেন। এর আগে ১৯৬৭ সালে ওয়েলসে মহেশ যোগীর 'ট্রান্সেন্ডেন্টাল মেডিটেশন`নিয়ে একটি সেমিনার বিটলসকে আকৃষ্ট করে, যদিও তাঁদের ম্যানেজার ব্রায়ান এপস্টাইনের মৃত্যুর জন্য তাঁরা সেই সেমিনার সম্পূর্ণ করতে পারেন নি। কিন্তু মহেশ যোগীর দর্শন তাঁদের আকৃষ্ট করেছিল এবং অধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে তাঁরা একসময় চলে আসেন হৃষিকেশে। তাঁদের প্রসিদ্ধি সেসময় এতটাই ছিল যে, হৃষিকেশও অচিরেই আন্তর্জাতিক প্রসিদ্ধি পেয়ে যায়। মহেশ যোগীর আশ্রমে বসে তাঁরা রচনা করেছিলেন মোট আটচল্লিশটি গান। তাঁদের আশ্রম জীবন বেশিদিন না হলেও, মূলত তাঁদের জন্যই হৃষিকেশে আজও বিদেশিদের ঢল নামে। ১৯৮১ সালে লিজ আর না বাড়িয়ে মহেশ যোগী আশ্রম ত্যাগ করেন। ধীরে ধীরে হিমালয়ের গহন অরণ্য ঢেকে নেয় আশ্রমটিকে। ২০১৫ সালে রাজাজী টাইগার রিজার্ভের উদ্যোগে আবার খুলে দেওয়া হয় চৌরাশি কুঠিয়া, যা লোকমুখে বিটলস আশ্রম নামে পরিচিত। স্বর্গাশ্রম বা রামঝোলা থেকে ট্রেকার ভাড়া করে যেমন অরণ্যের মাঝ দিয়েও পৌঁছানো যায় কিমি খানেক দূরের আশ্রমে, তেমনি গঙ্গার তীর ধরে পায়ে হেঁটেও যাওয়া যায়। রহস্যময় সেই আশ্রমটির অমোঘ টান উপেক্ষা করতে না পেরে সম্প্রতি পৌঁছে গেছিলাম ঋষিকেশে।


 

মাথাপিছু ১৫০টাকার প্রবেশমূল্যে চৌরাশি কুঠিয়ার  ভেতর প্রবেশ মাত্রেই মন প্রশান্ত হয়ে উঠল। হিমালয়ের নির্জনে কানে ভেসে আসল পাহাড়ের নিচ দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গার জল-সংগীত। খানিকটা চড়াই উঠে আরণ্যক পরিবেশে প্রথমেই নজরে আসে গুহার আকারে সাজানো অজস্র 'মেডিটেশন হাট' বা একক ধ্যানের কুঠুরিগুলি। পাথরে নির্মিত ভাঙাচোরা কুঠুরিগুলি দেখে সহজেই বোঝা যায় যে, ধ্যান ও যোগ-সাধনার জন্য তৈরী করা হয়েছিল সেগুলি। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে কুঠুরির ছাদেও ওঠা যায়। চারদিকের শান্ত পরিবেশে শোনা যায় বিভিন্ন পাখির ডাক আর আগের তুলনায় একটু ক্ষীণ হলেও গঙ্গার বয়ে চলার অবিরাম শব্দে পাওয়া যায় প্রাণের স্পন্দন। কুঠুরিগুলি পেছনে রেখে একটু এগোলেই বাঁ-হাতে রয়েছে পোস্ট অফিসটি, যেখান থেকে বিটলসের সদস্যরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা তাদের বন্ধুদের চিঠি লিখতেন। শঙ্করাচার্যনগরের সিল দেওয়া সেই চিঠির অনেকগুলি নিলামে উঠেছে বেশ কয়েকবার। পোস্ট অফিসের উল্টোদিকে উন্মুক্ত মাঠের একধারে রাজাজী টাইগার রিজার্ভ ও মহর্ষি ফাউন্ডেশন তৈরী করেছে ফোটো গ্যালারি। এই কাজে তাদের সাহায্য করেছেন দুবার এম্মি পুরস্কার বিজেতা ভুবনবিখ্যাত চিত্রনির্মাতা পল সালজমান। গ্যালারিটি বিটলস-সহ আরও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের দুষ্প্রাপ্য ছবিতে সমৃদ্ধ। তাছাড়াও রয়েছে রাজাজী টাইগার রিজার্ভের বিভিন্ন জীবজন্তু ও পাখিদের অসাধারণ বহু ছবি। ফোটো গ্যালারি, ক্যাফেটেরিয়া থেকে সামনের দিকে এগোলে পথের দু`ধারে রয়েছে আশ্রমের রান্নাঘর, প্রেস, হল ও মহর্ষির নিজের ঘর। সবগুলিই ভাঙাচোরা। বোঝাই যায় যে, সময়ের গ্রাসে তাদের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। কিন্তু প্রতিটি  ঘর বিভিন্ন সময় অসামান্য দেওয়াল-ছবি ও গ্রাফিটিতে সাজিয়ে দিয়েছেন আশ্রমে আগত বিভিন্ন শিল্পীরা। এমনিতে দেওয়ালে ছবি বা গ্রাফিটি আঁকা নিষিদ্ধ হলেও, চৌরাশি কুঠিতে আসা শিল্পীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে তাদের প্রতিভা বিকাশের জন্য। পরিত্যক্ত এই ঘরগুলির দেওয়াল-ছবি ও গ্রাফিটিতে শুধু বিটলসরা নন, আছেন রবিশঙ্করও। এবাদেও ভারতীয় রমণী, সাধু, চক্র ইত্যাদির ছবি ও অজস্র স্লোগান-ধর্মী লেখা দেখে স্তব্ধ হতে হয়। আশ্রমের মাঝের আনন্দ ও সিদ্ধি ভবনটি ১৯৭৬ সালে তৈরী হয়েছিল। সুন্দর স্থাপত্যের এই ভবনটির ছাদেও ওঠা যায়। এখানেও রয়েছে সুন্দর কিছু ছবি ও গ্রাফিটি। আনন্দ ও সিদ্ধি ভবনের পাশে যোগ মন্দির। আর আশ্রমের একদম শেষে রয়েছে মহর্ষি ধ্যান বিদ্যাপীঠ। ষাটের দশকের প্রথম দিকে সালে নির্মিত এই কমপ্লেক্সটি সতপুরী নামেও পরিচিত। এখানেই থেকে গেছেন বিটলসরা। বিখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকায় শুধু তাঁরাই নন, রয়েছেন  ডোনোভান, মাইক লাভ ও ফারো বোনেরা। আজকের খণ্ডহর ও চারদিকের প্রবল নিস্তব্ধতা দেখলে অবশ্য বিশ্বাস করা কঠিন যে, এখানেই ড্রাম বাজিয়ে ঝড় তুলতেন রিংগো স্টার বা সুরেলা গলায় গাইতেন লেনন। এই অঞ্চলটি আশ্রমের একদম শেষপ্রান্তে। পাহাড়ের খানিকটা ওপরে হওয়ায় বন্যপ্রাণীরা রাতেরবেলায় অনেকসময় এখানে চলেও আসে।




বিটলস ভক্তদের কাছে তো বটেই, বহু মানুষের কাছে চৌরাশি কুঠি তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। সত্যি বলতে, যে যোগ সাধনা কেন্দ্রটি হৃষিকেশকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও পরিচিতি এনে দিয়েছে, সেটি দর্শন না করলে হৃষিকেশ দেখা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। বিটলস মানসিক শান্তি পেয়েছিলেন কিনা জানিনা, কিন্তু তাঁদের বেশ কিছু বিখ্যাত গান এই আশ্রমবাসের পরেই সৃষ্ট হয়। আজকের চৌরাশি কুঠি সেই স্মৃতিকে মনে করায়। 

ফিরতি পথে মনে হয় যে, রাজাজী টাইগার রিজার্ভের বিটলস আশ্রমে আজও যেন কোনো এক লেনন কাঁটাতারহীন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে চলেছেন। বলে চলেছেন এক শান্ত, সুন্দর, ভয়হীন পৃথিবীর কথা যেখানে শুধু মানবতার জয়গান গাওয়া হয়, বলা হয় প্রেমের কথা। 

জেনে নিন- হাওড়া থেকে দুন এক্সপ্রেস এবং উপাসনা এক্সপ্রেস (সপ্তাহে দু`দিন) যাচ্ছে হৃষিকেশ। বিমানে গেলে দেরাদুন পৌঁছে বাস বা গাড়িতে যেতে হবে হৃষিকেশ। এখানে থাকার জন্য রয়েছে বিভিন্ন মানের অজস্র হোটেল ও ধর্মশালা। 

ছবি- লেখক ও ঋতভাষ রায়

(প্রকাশিত- রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ)   

লেখক যখন সম্পাদক

শৌভিক রায়

আমাদের ছোটবেলায় লিটল ম্যাগাজিন করবার প্রয়াস থাকলেও, আজকের এই উন্মাদনা ছিল না। মূলত উত্তরের বড় বড় শহরগুলি থেকেই তখন পত্রিকা প্রকাশ পেত। তথাকথিত গ্রামে সে অর্থে পত্রিকা দেখা যেত না। ব্যতিক্রম যে ছিল না, তা নয়। অবশ্যই ছিল। কিন্তু ব্যতিক্রম তো নিয়মকেই প্রকাশ করে। তাছাড়া সেসময় কলকাতা-মুখিনতাও বড্ড বেশি ছিল আমাদের। উপায়ও ছিল না। আজকের এই ডিজিটাল যুগ তো তখন কল্পনাতেও ছিল না কারো, কালিঝুলির প্রেস আর পাইকা লেটার ছিল আমাদের চেনা জগত। লেখা পাঠাতে হত পোস্ট অফিসের মাধ্যমে। হাতেই লেখা হত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ।

বিদ্যালয় পত্রিকায় নিজস্ব লেখালিখি যেমন শুরু, তেমনি সম্পাদনার হাতেখড়িও সেই বিদ্যালয় পত্রিকা থেকেই। তবে লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনাতেও দেরি হয়নি। ছাত্রাবস্থাতেই সম্পাদনা করেছিলাম 'মুজনাই'। অবশ্য মুজনাইয়ের সেই সংখ্যাটি ছিল শিশু-কিশোরদের জন্য। তবে একটা ঘটনা হয়েছিল। আমাদের ছোটদের ডাকে সাড়া দিয়ে সেই সময়ে মৈত্রেয়ী দেবী, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, লীলা মজুমদার, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বপনবুড়ো, শঙ্কু মহারাজ প্রমুখেরা কেউ ছড়া, কেউ কবিতা, কেউ শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন। নিজের সম্পাদনার জীবনে ও মুজনাইয়ের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাপ্তি। 

এখানে কিন্তু একটি কথা বলার প্রয়োজন যে, ১৯৮২ সালে যখন মুজনাই প্রথম প্রকাশ পায় তখন আমি একজন সাধারণ সদস্য। ১৯৮৫ সালে মুজনাইয়ের শিশুকিশোর বিশেষ সংখ্যার সম্পাদনার ভার ছিল আমার হাতে। এরপর কিছুদিন অনিয়মিতভাবে মুজনাই প্রকাশ পেলেও, তখনকার প্রায় সকলেই পড়াশোনা ও জীবিকার স্বার্থে এদিকওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ায় একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় পত্রিকা। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে দু'একটি জায়গায় লিখলেও সেভাবে লেখা নিয়ে ভাবিনি। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোটগল্পে পুরস্কার পাওয়াও খুব একটা উৎসাহ দেয় নি। গোটা নব্বইয়ের দশক জুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা বা গদ্য প্রকাশ পেলেও, লেখা ও সম্পাদনার তাগিদ অনুভব করি নি। 

এরপর চাকরী, সংসার, অসুস্থতা ইত্যাদি সব সামলে কবে যেন মুজনাই সম্পাদনা ও নিজস্ব লেখা শুরু করবার ইচ্ছেটে জেগে উঠল। তবে মুদ্রণে নয়, অনলাইনে। আসলে শূন্য দশকের শেষদিক থেকে অর্থাৎ ২০০৭-০৮ নাগাদ অনুভব করতে পারছিলাম যে, লেখালিখির জগত-সহ অনেককিছুতেই একটা বিরাট পরিবর্তন আসতে চলেছে এবং এই পরিবর্তনই আগামীদিনের বাস্তবতা। নতুন সেই চ্যালেঞ্জকে নিয়ে তাই অনলাইনেই আবার শুরু করি মুজনাই। 

আজ এক দশকে মুজনাই অনলাইনে, মুদ্রণে প্রকাশিত হচ্ছে। শুধু প্রকাশিত হচ্ছে বললে ভুল বলা হবে। অনলাইনে সাপ্তাহিক, মাসিক সংখ্যার পাশাপাশি মুজনাই বিভিন্ন বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। মুজনাইয়ের ব্লগে ও ফেসবুক প্রোফাইলে নানা দিবস উদযাপনের একটা ঐতিহ্য রয়েছে। মুদ্রণে বছরে দুটি পূর্ণ পত্রিকা, ফোল্ডার, ট্যাবলয়েড ইত্যাদিও প্রকাশিত হচ্ছে। মুজনাইয়ের ডুয়ার্স সংখ্যা, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্ম দ্বিশতবর্ষ সংখ্যা ইত্যাদি যথেষ্ট আদৃত। মুজনাইয়ের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল যে, মুজনাই নতুন লিখতে আসা কবি লেখকদের ভরসার জায়গা। মুজনাই সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে সবাইকে। শিশু কিশোরদের কাছেও মুজনাই ভীষণ ভরসার জায়গা। ওদের সৃজন মুজনাইয়ের সম্পদ। রয়েছেন নিতান্তই সাধারণ জনেরা। তারা জানেন যে, তাদের ভাবনা প্রকাশের জায়গা হল এই পত্রিকাটি। আবার, মুজনাইতে লেখা শুরু করে আজ মোটামুটিভাবে পরিচিতি লাভ করেছেন এরকম কবি লেখকের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। পাশাপাশি প্রকাশনার জগতেও মুজনাই পা রাখছে ধীরে ধীরে। প্রকাশিত পত্রিকা ও বই বিক্রির টাকা যাচ্ছে সমাজসেবামূলক কাজে। সত্যি বলতে দ্বিতীয়বার মুজনাই শুরু করবার সময়, স্বপ্নেও ভাবিনি যে, মুজনাই আজ এতটা পরিচিতি ও বিস্তার পাবে। 

মুজনাইয়ের বিপুল কাজকর্ম করে নিজের লেখালিখির সময় খানিকটা সংকুচিত হয়েছে, সেটা বলাই বাহুল্য। এটাও ঠিক যে, সম্পাদক ও লেখক সত্ত্বা বজায় রাখতে গিয়ে চাপ পড়ে ভীষণ। কিন্তু কোনটিকে বাদ দিয়ে আজ আর নিজেকে ভাবতে পারি না। তাই সম্পাদনার পাশাপাশি যেভাবে পারি, সেভাবে লিখবার চেষ্টা করি। আমার নিজের একটা সুবিধে আছে যে, লেখা প্রকাশের জন্য অনেকের মধ্যে যে প্রবল ইচ্ছে থাকে, সেটা আমার একেবারেই নেই। তাই মানসিকভাবে অনেক হালকা থাকি। দুটো কাজের মধ্যে সমন্বয় করে নিজের লেখার সময় বের করে নিই তাই। 

এভাবেই লিখে চলেছি আনন্দবাজার পত্রিকা, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, আজকাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। সেসব লেখালিখি নিয়ে কিছু গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। হয়ত আগামীতে প্রকাশিত হবে আরও কিছু। নিজের লেখা কখনই সেভাবে যেমন সম্পাদনার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় নি, তেমনি উল্টোটাও সত্যি। আসলে যে রাঁধে, সে তো চুলও বাঁধে। সম্পাদনার সঙ্গে তাই নিজের লেখার কোনো শত্রুতা নেই। তার ওপর সম্পাদনা বলতে মুজনাই...মুজনাইয়ের জন্যই আজ কিছুটা হলেও পরিচিত। মুজনাইয়ের বালক হয়ে যদি বলি যে, সম্পাদনার জন্য লেখা নষ্ট হয়েছে তবে সেটা সত্যের অপলাপ হবে। পরিবার ও শুভানুধ্যায়ী আপনজনদের সার্বিক সহযোগিতাও এক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। তাই যে পত্রিকা শুরু হয়েছিল ডুয়ার্সের ফালাকাটায়, আজ তা কোচবিহার থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে চলেছে।

আসলে জীবন একটাই আর জীবনের কোন্ পর্যায়ে কী হবে তা সবারই অজানা। জীবনকে উপভোগ করাই বোধহয় শ্রেষ্ঠ মানবধর্ম। সম্পাদক হয়ে সেই উপভোগের পাশাপাশি যদি লেখক হিসেবেও কিছু আনন্দলাভ হয়, তবে সোনায় সোহাগা বলেই মনে করি। তাই সম্পাদনা ও লেখা দুইই চলুক নিজের নিজের মতো।

(প্রকাশিত: শব্দ বাউল)

 মায়েরা-কাকীমায়েরা

        শৌভিক রায়

বাড়ির সামনে টাউন ক্লাবের বিরাট মাঠ। আর সেই মাঠের ধারে, কোলবালিশে রাখা হাতে ভর দিয়ে, শীতলপাটিতে আধা-শোওয়া হয়ে, ফুটবল খেলা দেখছেন গাজিকাকু। ভাল নাম একটা ছিল গাজিকাকুর। কিন্তু সে নাম বললে অধিকাংশ মানুষই তাঁকে চিনতেন না। এই ব্যাপারটি বোধহয় তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র, আমার বাল্যবন্ধু পুটন, উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছে। ওর যে একটা ভাল নাম আছে, সে কথা ভুলে যান প্রায় সবাই! পিতার মতোই পুত্রও ডাকনামে বেশি পরিচিত। সে কথা অবশ্য আলাদা। 
গাজিকাকুর ফুটবল বিলাসিতার এই পর্ব কিন্তু হঠাৎ হয়েছে এরকমটি নয়। বয়সকালে নিজে ভাল খেলতেন। চর্চা করতেন নাটকের। সে আমলে ফালাকাটা নাট্যমঞ্চ যাঁরা মাতিয়ে রাখতেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। শ্রদ্ধেয় পাখি ঘোষের স্ত্রী অভিনেত্রী হিসেবে মঞ্চে নামবার আগে, ফালাকাটা নাট্য মঞ্চে যে সমস্ত নট, মহিলা সেজে অভিনয় করতেন, তাঁদের একজন ছিলেন এই গাজিকাকু। 

পাখিকাকু বিয়ে করেছিলেন স্ত্রী-কে মঞ্চে অভিনয় করতে হবে এই পণ চেয়ে। কী বৈপ্লবিক ভাবনা ষাটের দশকের সেই সময়! ভাবতেই গা কাঁটা দেয়। এক এক সময় ভাবি যে, আমরা পুরুষরা যদি কনে পক্ষের কাছে এই জাতীয় পণ চাইতাম তবে দুর্দান্ত হত। যেমন ধরা যাক, নতুন বউটিকে পড়া চালিয়ে যেতে হবে বা গান বন্ধ করা চলবে না বা নিয়মিত নাচের চর্চা জারি রাখতে হবে বা বিদেশে গিয়ে পি এইচ ডি-টা শেষ করতে হবে বা বিউটিশিয়ান কোর্সটা কাজে লাগাতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি! মনে হয় অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত, মনে হয় অনেক স্বপ্ন পূরণ হত! 

থাক এসব কথা। বলছিলাম যে, গাজিকাকুকে আমরা একটু ভয় পেতাম। আবার গাজিকাকুকে দেখেছি নিজের মা'কে ভয় পেতে! ঠাকুমা ছিলেন জাঁদরেল মহিলা। ব্রিটিশ আমলে জন্ম আর কম বয়সে স্বামীকে হারিয়েছিলেন বলেই বোধহয় ভয়ডর ব্যাপারটা কম ছিল। দাপটের সঙ্গে সব সামলাতেন। গাজিকাকুর পরের ভাই মন্টুকাকু আর ছোটভাই দিলীপকাকুও ঠাকুমাকে রীতিমত সমঝে চলতেন। তবে ঠাকুমার সঙ্গে ভাব ছিল নাতি-নাতনীদের। ওই একটি জায়গায় ঠাকুমা কাত। আর সেই ভাব শুধু নিজের নাতি-নাতনীদের সঙ্গেই নয়, তাদের বন্ধুদের সঙ্গেও ছিল বলে, আমরাও ছিলাম ঠাকুমার চিল্লার পার্টি বন্ধুবান্ধব।

গাজিকাকু, ঠাকুমা, অন্য ভাইরা, নাতি-নাতনী, টাউন ক্লাবের মাঠ, ফুটবল ইত্যাদি সবকিছুর মধ্যে সকলের অলক্ষ্যে যিনি ছিলেন তিনি হলেন কাকীমা। একটা বিরাট যৌথ পরিবারের সব দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। কাকীমার উপস্থিতি টের পাওয়া যেত না কোনোদিন, অথচ গাজিকাকুর জন্য শীতলপাটি বিছিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ওই বিরাট পরিবারের সব কাজ একা হাতে সামলেছেন কী অবলীলায়! আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমাদের পরিবারের বধূরা সত্যি কোনও মর্যাদা পান না। কিন্তু সংসারে তাদের অবদান যে কী অপরিমেয় সেটা ভাবাই যায় না! সকালে রুটি তৈরি আর ভাত ডাল করা দিয়ে শুরু হত কাকীমার কাজ। এ আসছে এখন, ও আসছে তখন। মন্টুকাকু ভাত খাচ্ছেন তো দিলিপকাকু রুটি-গুড়। ছোট বোন ডলি পলিকে সামলাতে না পেরে বেবিদি মায়ের জিম্মায় দিয়ে দিচ্ছে তাদের, তো পুটন হাজির বন্ধু শৌভিককে নিয়ে বেগুন ভাজা দিয়ে ঘি ভাত খেতে। মিঠুদা ততক্ষণে বই খুঁজে পাচ্ছে না বলে চিৎকার করছে, বুলা জানতে চাইছে ধুতিতে নীল দেবে কিনা! ঠাকুমা গাজিকাকুকে ধমকে ঘুম থেকে উঠিয়ে চায়ের কাপ নিয়ে বসেছেন। গাজিকাকু আবার টাওয়েল নিয়ে বাইরের ট্যাপকলে যাবেন, তাঁকে বালতি দিতে হচ্ছে! 

এভাবেই কখন সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যেত বোঝাও যেত না। এর মধ্যেই কোনোদিন আবার থাকত কাসুন্দি তৈরি বা বড়ি দেওয়ার ব্যাপার। নিজের স্নান খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিতে না নিতে বিকেলের চা-পর্ব। তারপর তো রাতের রান্না রয়েইছে! গ্যাসের উনুন আর তখন কোথায়, হয় কয়লা বা খড়ি। গালভরা 'ডোমেস্টিক হেল্পার' বেশির ভাগ বাড়িতেই থাকত না। বাসন মাজা, কাপড় কাচার ঝক্কিটাও সামলাতে হত। এর সঙ্গে থাকত সারা মাস সংসার চালানোর অর্থনৈতিক দায়িত্ব। কাকু তো টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়েই খালাস। সারা মাস ওই টাউন ক্লাবের ফুটবলের মতোই সংসারের ফুটবলে টাকা নামের বলটা নিয়ে কখনও ডজ করে, কখনও হৈ হৈ করে বিপক্ষের গোলের কাছে গিয়ে, কখনও নিচে নেমে ডিফেন্সিভ খেলে, কখনও গোল বাঁচিয়ে চলতে হত! অনেকটা পরে বাড়িতে আরও দুই বউ এলে কাকীমা খানিকটা চাপ মুক্ত হলেও, যৌথ পরিবারকে ধরে রাখবার সূক্ষ খেলাটি কিন্তু দুর্দান্তভাবে জিতে গেছেন! নিজে যৌথ পরিবারে বড় হয়ে, সেই পরিবারকে টুকরো টুকরো হতে দেখেছি বলেই জানি যে, এই ধরে রাখা কাজটি কতটা দুরূহ। কাকীমা সেই কাজটি কী অনায়াসে করে গেলেন এতগুলি বছর! 

কাকীমার দুই প্রতিবেশী আরও দুই কাকীমা, প্রণব ও বাপির মায়েরা, কিন্তু ঠিক একইরকম। সংসারের অভাব অনটন হাসিমুখে সহ্য করে গেছেন দিনের পর দিন। নিজেদের সব ইচ্ছে বুকের কোন গভীরে চাপা রেখে, দশভূজা হয়ে সামলেছেন সব! নিদারুণ যত্নে স্বামী সন্তানদের রেখেছেন! নিজেদের কোনও ইচ্ছে মুখ ফুটে বলেনও নি কোনোদিন। দিয়েই গেছেন শুধু। চোখে ভাসে, মাটির ছোট্ট রান্নাঘরে গনগনে উনুনের আঁচে লাল হয়ে যাওয়া ফর্সা মুখে বড় করে সিঁদুর দেওয়া প্রণবের মা হাসি মুখে ভাত বেড়ে দিচ্ছেন শৌভিক আর প্রণবকে। মনে পড়ে বেঁটেখাটো চেহারার সৌম্য মুখের বাপির মা জোর করে খেতে বসিয়েছেন শৌভিককে। শৌভিকের মা কাছে থাকেন না বলে, এই তিন কাকীমার কাছে শৌভিকের দায়িত্ব আগে, পরে নিজের সন্তানদের। 

এক কাকীমা (প্রণবের মা) চলে গেছেন বহু আগে। আর এক কাকীমাও (বাপির মা) গেছেন কিছুদিন হল। আজ চলে গেলেন পুটনের মা। অতীত ফালাকাটার চার মূর্তি শৌভিক-প্রণব-পুটন-বাপি সকলেই আজ মা হারা। এই চার মূর্তিকে ঘিরে থাকা শৈবাল, ঋত্বিক, কমল, জয়ন্ত ও আরও অনেকের জীবন থেকে মা কাকীমা ডাকগুলি হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। বাপি ও পুটনকে সুপ্রতিষ্ঠিত দেখে গেলেন দুজনেই।  প্রণব আজ সে জায়গায় পৌঁছলেও, কাকীমা সেটা দেখে যেতে পারেন নি। ঋত্বিক, শৈবাল, জয়ন্তর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। কমল অবশ্য প্রথম থেকেই অন্যভাবে প্রতিষ্ঠিত।

চার বন্ধু আবার একসঙ্গে হব অচিরেই কোনও এক মুজনাইয়ের তীরে। থাকবে আমাদের আরও বন্ধুরা। মায়েদের, কাকীমায়েদের কথায় স্মরণ করব তাঁদের। জল বয়ে যাবে সেসব কথা নিয়ে। নির্বাক নদী শোনাবে সেই কথা তার তীরে থাকা সব সন্তানদের। আসলে মায়েদের গল্প তো সব দেশে, সব কালে এক! কোনও পরিবর্তন হয় না তাতে। 

মা চলে যান, মা বেঁচে থাকেন। 
মায়েরা চলে যান, মায়েরা বেঁচে থাকেন।

আমাদের তর্পণ তাই মা'কে ঘিরেই... 

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ।।

               শৌভিক রায়

                যে কোন ব্যক্তির মহান হয়ে ওঠার পেছনে বেশ কিছু কার্যকারণ শর্ত থাকে। একথা ঠিক নিজস্ব প্রতিভা না থাকলে কারো পক্ষেই খুব বেশী দূর এগোনো সম্ভব নয়। মধ্যমেধার কদর সমকালে নানা কারণে আদৃত হলেও কালের বিচারে কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় সত্যিকার প্রতিভাবান। ইতিহাস তা-ই দেখিয়েছে বারেবারে। 
             প্রতিভা যদি ব্যক্তির মহান হয়ে ওঠার পেছনে সবচাইতে বড় কারণ হয় তবে পারিবারিক শিক্ষা ও পারিপার্শ্বিকের প্রভাবটিও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। একথা স্মরণে রেখে তাই বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বকবি তথা পরম মানবতাবাদী হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল বিরাট। হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষরিক অর্থেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়ে উঠতে পারতেন না যদি না দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে লালন করতেন।
         প্রথম যৌবনে অমিতব্যয়ী, প্রভূত বিত্তের মালিক প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের শৌখিন পুত্রটির কর্মকান্ড জানলে ভাবতে কেমন অবাক লাগে যে ইনিই একদিন হয়ে উঠছেন মহর্ষি। কিন্তু সংসারত্যাগী জটাজুটধারী নন। রয়েছেন সংসারে। কিন্তু সংসারে থেকেও সংসার-ধর্ম সম্পর্কে কেমন যেন উদাসীন। বলছি উদাসীন ঠিকই, কিন্তু একথা মনে রাখতে হবে সংসারের রাশ একফোঁটা আলগা করেন নি তিনি শেষদিন পর্যন্ত। রাশভারী অথচ স্নেহ-মমতায় ভরপুর ছিল তাঁর হৃদয়। নারীশিক্ষা প্রসারে যেমন তাঁর অবদান অনস্বীকার্য তেমনি নিজের বাড়ির মেয়েদের সবসময় শাড়ি পরিধানের অসুবিধে সম্যক উপলব্ধি করে মহর্ষি বানিয়ে দিয়েছিলেন, নিজের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে, নতুন ধরণের পোষাক। এককোটি টাকার দেনা মাথায় নিয়ে (প্রিন্স দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর) প্রায় কপর্দকশূন্য হয়েছিলেন বলেই বোধহয় জানতেন অর্থের মূল্য। তাই সেভাবেই গড়ে তুলেছিলেন তাঁর সন্তানদের। পাশাপাশি তাঁর একেশ্বরবাদী ভাবনা সংক্রামিত হয়েছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তান রত্নটির মধ্যে। সংক্রামিত হয়েছিল তাঁর ভ্রমণ স্পৃহা। আর একটা দিক না উল্লেখ করলেই নয়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্তের কথা মাথায় রেখেও নির্দ্বিধায় একথা বলা যায় যে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের গদ্যপ্রয়াসের সার্থক উত্তরসূরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ যিনি নিজস্ব প্রতিভাবলে সেই গদ্যকে কয়েক যোজন এগিয়ে দিয়েছিলেন।
                       কনিষ্ঠ পুত্রটির ওপর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ভালবাসা একটু বেশীই ছিল। হতে পারে রবীন্দ্রনাথ কনিষ্ঠ বলে, হতে পারে তাঁর অনেক বয়সের সন্তান বলে। কনিষ্ঠ পুত্রের গান শুনে তিনি সে আমলে পাঁচশো টাকা পুরষ্কার দিতে দেরী করেন নি। কেননা তাঁর মনে হয়েছিল 'দেশের রাজা যদি দেশের ভাষা জানিত ও সাহিত্যের কদর বুঝিত, তবে কবিকে তো তাহারা পুরষ্কার দিত'। কিন্তু তা যখন হওয়ার নয়, তখন সেই কাজটি করেছিলেন তিনি। এই পুরষ্কার প্রদান সেদিন বালক রবীন্দ্রনাথের মনে কি অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল তা জানা না গেলেও একথা অনুমান করতে বেগ পেতে হয় না যে সেই পুরষ্কার বালক রবীন্দ্রনাথের মনে যে প্রত্যয় সৃষ্টি করতে পেরেছিল তা তাঁর পরবর্তী জীবন গঠনে সহায়ক হয়ে ওঠে। বালকের নিতান্ত খেয়াল থেকে শান্তিনিকেতনের প্রান্তর থেকে রবীন্দ্রনাথের নিয়ে আসা পাথরগুলি দেখে তাঁকে নিরুৎসাহিত না করে মহর্ষি বরং ইন্ধন দিয়েছিলেন এবং শান্তিনিকেতনের একটি অংশকে সাজিয়ে দিতে বলেছিলেন সেই পাথর দিয়েই ( 'ওই পাথর দিয়া আমার এই পাহাড়টা সাজাইয়া দাও')। সামান্য কথা কিন্তু কি গভীর। বিশ্বপ্রকৃতিতে কোনো কিছুই ফেলনা নয়। আর সেই আপাত গুরুত্বহীন পদার্থও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তা দিয়েও যে করা যেতে পারে কিছু-  এই বোধের উন্মেষ ঘটানো মহর্ষির পক্ষেই সম্ভব ছিল। নিজে হাতে রবীন্দ্রনাথকে চিনিয়েছিলেন তিনি বিশ্বপ্রকৃতি।  হিমালয় ভ্রমণে বালক রবিকে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শিখিয়েছিলেন প্রকৃতির প্রথম পাঠ।  আবার রাতের আকাশে নক্ষত্র চিনিয়ে দিয়ে পুত্রকে দিয়েছিলেন রহস্যময় বিশ্বের সন্ধান, উসকে দিয়েছিলেন সনাতনী ভাবনা 'আমি চঞ্চল হে, সুদূরের পিয়াসী'। কোনো পিতা যদি এভাবে পুত্রের ফ্রেন্ড, ফিলোজফার, গাইড হয়ে ওঠেন তবে সাধ্য কি সেই পুত্রের আত্মিক উন্নয়নকে আটকাবার!          

              রবীন্দ্রনাথেরও হয়েছিল সেই উন্নয়ন। পুত্রকে সাবলম্বী হতে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা দেখি মহর্ষির বিবিধ কর্মকান্ডে। গোটা পরিবার যখন রবীন্দ্রনাথের গরুর গাড়ি চেপে গ্রান্ড ট্যাঙ্ক রোড ধরে পেশোয়ার পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রার বিরুদ্ধে, একমাত্র দেবেন্দ্রনাথ তাঁর স্বপক্ষে। না, এটা কোন স্নেহ থেকে নয়, বরং তাঁর এই সমর্থনের কারণ ছিল পুত্র যাতে দুনিয়াদারি চিনতে পারেন, বুঝতে পারেন ঠাকুরবাড়ির বিলাসবহুল জীবনের উল্টোদিকে অত্যন্ত কঠিন একটি জগৎ আছে। নিজে পিতার ঋণ শোধ করেছিলেন, শুনেছিলেন পাওনাদারদের গঞ্জনা, জেনেছিলেন অর্থ থাকলেই হয় না, অর্থকে ধরে রাখতে হয়। তাই বোধহয় চাননি কোন অবস্থাতেই তাঁর সন্তানেরা তাঁর মতো সমস্যার সম্মুখীন হ'ক। তাই হাতে ধরে রবীন্দ্রনাথকে জমিদারীর আয়ব্যয় শিখিয়েছিলেন। বারবার পাঠিয়েছিলেন শিলাইদহে। ভাগ্যিস পাঠিয়েছিলেন। তা না হলে পদ্মাবক্ষে বসে সৃষ্ট সেই মণিমানিক্যগুলো কি পেতাম আমরা?
             তবে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোধহয় মানবপ্রেম। রামমোহনের ভাবশিষ্য, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান স্কুলে পড়াশোনা করা মহর্ষি সবসময়ই একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করে এসেছেন। হিন্দু-মুসলিম-পারসি সকলে মিলে তাঁরা তৈরী করেছিলেন  সর্বতত্ত্ব দীপিকা সভা। উপনিষদের অমোঘ বাণী 'যা দিয়েছেন ঈশ্বর তোমাকে তাতে সন্তুষ্ট থাকো, ভালবাসো নিজেকে, চেন নিজেকে, জানো নিজেকে....নিজেকে জানলেই মানুষকে জানা, নিজেকে চিনলেই মানুষকে চেনা' মহর্ষি সঞ্জাত করতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথের মধ্যে। ব্যক্তিগত শোকেও স্থিতধী থাকতে শিখিয়েছিলেন নিজের স্ত্রী-কে শেষযাত্রায় নিজের হাতে সাজিয়ে দিয়ে। ব্যক্তিমানুষ আসবে, যাবে। কিন্তু থাকবে মানবপ্রবাহ। যে প্রবাহের এক ক্ষুদ্র অংশ হলেও সাযুজ্যবোধে, একাত্মতায় যোগসাধন ব্যক্তিসত্ত্বার সাথে বিরাট মানবসত্ত্বার। তাই মানবপ্রেম শ্রেষ্ঠ প্রেম। এর বিকল্প আর কিছু হতে পারে না।  সারাজীবন রবীন্দ্রনাথ সেই মানবতার সন্ধান করে গেছেন। বলে গেছেন শ্রেষ্ঠ প্রেম হল মানবপ্রেম। নিজের ব্যক্তিগত বেদনাকে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছেন অনেক ক্ষেত্রেই। পিতার মৃত্যুশোকের মধ্যেও বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের শরিক হয়েছেন। মনে রাখতে হবে 1905 সালে মহর্ষি প্রয়াত হন। নিজের সন্তানের মৃত্যুশোকও রবীন্দ্রনাথ বুঝতে দেন নি দর্শনপ্রার্থীদের। দেবেন্দ্রনাথ যদি এই শিক্ষা না দিতেন হয়তো রবীন্দ্রনাথ পারতেন না। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ পেরেছিলেন নিজের মতো করে তাঁর এই সন্তানটিকে গড়ে তুলতে। তাঁর স্বপ্নের শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই হয়ে উঠেছিল বিশ্ব মানবতা ও বিশ্ব প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ স্থান।

              পিতা-পুত্রের এই সম্পর্ক আজকে বিরল। আজ যখন ধর্মভেদে, বর্ণভেদে মানুষকে বিচার করা হয়, নারীর সম্ভ্রম লুঠ করা হয়, দাগিয়ে দেওয়া হয় মানবতাকে তখন বারবার মনে পড়ে মহর্ষির কথা। আজকের এই বহুধাবিভক্ত ভারতে 'জাতের নামে বজ্জাতি'র দুঃসময়ে মহর্ষির একেশ্বরবাদ কি কাম্য নয়? কাম্য নয়  কি সংসারে থেকেও পরম নিরাসক্তিতে তন্নিষ্ঠ হয়ে নিজেকে শুদ্ধ করা, পূর্ণ করা? যে শিক্ষা তিনি রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন সে শিক্ষার আজ বড় অভাব। 
            প্রিন্সের সন্তান মহর্ষি হন আর মহর্ষির সন্তান বিশ্বকবি....কি অদ্ভুত ইতিহাস আর এখানেই মহর্ষি সার্থক যিনি প্রিন্সের সন্তান হয়েও নিজে প্রিন্স হলেন না আর নিজে মহর্ষি হয়ে দিয়ে গেলেন আমাদের অন্তরে থাকা চিরদিনের মরমীয়া-দরদী-মানবপ্রেমী শ্রেষ্ঠ ভারতসন্তানকে।

(প্রকাশিত: উত্তর ভূমিকা)

 মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর: এক অনন্য ব্যক্তিত্ব

                 শৌভিক রায়

বাংলা গদ্যের বিকাশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান অনস্বীকার্য। বিন্দুমাত্র মতভেদ নেই তাতে। কিন্তু যাঁদের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের বিবর্তন শুরু হয়েছিল সেই মহান ব্যক্তিদের মধ্যে কেন যেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে সেরকম কোন আলোচনা নেই। নিজের সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরাট ছায়ায় কি ঢাকা পড়ে গেছেন পিতা দেবেন্দ্রনাথ? নাকি ঝলমলে ব্যক্তিত্বের প্রিন্স দ্বারকানাথের পাশে মহর্ষির সাদামাটা জীবন (নিজেদের ভাবনায়) আমাদেরকে সে অর্থে আকৃষ্ট করে নি? অথবা মহর্ষি উপাধিতে ভূষিত হওয়ায় তাঁর মূল্যায়নে আমরাই পিছিয়ে আছি তিনি ধরাছোঁওয়ার বাইরে ভেবে? 
কারণ যেটাই হক, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জন্ম দ্বিশতবর্ষ পার করে এসে একটু দেখাই যাক না মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। প্রশ্ন জাগতে পারে দুশো বছর অতিক্রান্ত একজনের মধ্যে কি এমন থাকতে পারে যা আজকের এই বাংলায় তথা ভারতে প্রযোজ্য? সত্যি বলতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্মকান্ড অধ্যয়ণ করে এটাই মনে হয়েছে তিনি না থাকলে যেমন আমরা রবীন্দ্রনাথ-সহ ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য নক্ষত্রদের পেতাম না তেমনি তাঁর জীবনাদর্শ এমনই মজবুত যা আজও এই অস্থির সময়ে আমাদেরকে দেখাতে পারে নতুন দিশা। আজ যখন ভারতের মেরুকরণ হচ্ছে জাতপাতের ভিত্তিতে, যখন নারীনির্যাতনের পারদ ঊর্ধমুখী, বাড়ছে অস্থিরতা ঠিক তখনই মনে পড়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কথা, তাঁর ভাবনাচিন্তা ও কর্মকান্ডের কথা।
 
1817 সালে যখন দেবেন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন, বাংলায় তখন নবজাগরণের ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করেছে রাজা রামমোহন রায় প্রমুখের হাত ধরে। ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানটি অত্যন্ত বিলাসিতায় বড় হয়ে উঠেছিলেন। বিলাসিতার মাত্রাটি কি পরিমাণ হতে পারে সেটা প্রিন্স দ্বারকানাথের জীবন দেখলেই বোঝা যায়। বহুবিধ ব্যবসায় প্রভূত অর্থ উপার্জন করা দ্বারকানাথ বিলেত থেকে পুত্র দেবেন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন 'হাতখরচের' জন্য 'এক লক্ষ টাকা পাঠাইতে'। বিলেতে সাহেব-মেমদেরকে যে উপহার দিতেন তিনি তা জানলে আজও বিস্মিত হতে হয়। এহেন পিতার সন্তান যে বিলাসে মেতে উঠবেন সে বিষয়ে দ্বিধা না থাকারই কথা। সত্যি বলতে সে সময়ে কলকাতা শহরের নব্যযুবকদের আইডল হয়ে উঠেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ তাঁর বেশভূষায় ও বাবুয়ানায়। টেরিটিবাজার থেকে নিয়ে আসা পায়রাদের দিয়ে পায়রা লড়াই, ঘুড়ি ইত্যাদি বাবুয়ানার কোন কিছুই বাদ ছিল না। সরস্বতী পুজোতে তাঁর খরচের বহর দেখে স্বয়ং দ্বারকানাথ ঠাকুরও বিরক্ত হন। তবে বিশ্বাস হারান নি লায়েক হয়ে ওঠা ছেলের প্রতি। বেলগাছিয়ায় তাঁর বাগানবাড়িতে তাই দ্বারকানাথ আয়োজিত পার্টির তত্ত্বাবধানের মূল দায়িত্ব অর্পিত হত দেবেন্দ্রনাথের ওপরেই। সেসব আয়োজন এমনই হত যে খবরের শিরোনামে আসত সেগুলি এবং কোনো কোনো ইংরেজ সে পার্টিতে সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে করত। তাঁর বাবুয়ানা এমনই ছিল যে মখমলের তৈরী জুতোতে মুক্তো বসিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন একবার সবাইকে। এই প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা স্মরণ করা যায়, 'জলসার দিন কর্তা দাদামশায় সাদা আচকান পরলেন, মায় মাথার মোড়াসা পাশ পাগড়িটি অবধি সাদা, কোথাও জরি-কিংখাবের নাম গন্ধ নেই। আগাগোড়া ধবধব করছে বেশ, পায়ে কেবল মুক্তো বসানো মখমলের জুতোটি।' এই বাবুয়ানাটি কিন্তু সে সময় যখন দেবেন্দ্রনাথের আর্থিক সঙ্কট চলছে। পিতৃঋণ শোধ করতে গিয়ে অনেক কিছুই ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু ছাড়েন নি স্বাভিমান আর তাই এই ব্যবস্থা। কেননা তিনি জানতেন শহরের লোক তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকবে তিনি কি পরেছেন দেখবার জন্য। 

কিন্তু তাঁকে পাল্টে দিয়েছিল তাঁর পিতামহীর মৃত্যু। পিতামহী অলকা সুন্দরীর মৃত্যুর সময় তাঁকে যখন গঙ্গাতীরে নিয়ে যাওয়া তখন সঙ্গী ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। তিনটি রাত কেটেছিল তাঁর গঙ্গাতীরে এবং উপলব্ধি করলেন এক পরম সত্য। তাঁর নিজের কথায়, 'দিদিমার নিকট নাম-সংকীর্তন হইতেছিল...এই অবসরে আমার মনে এক আশ্চর্য উদাস-ভাব উপস্থিত হইল। আমি যেন আর পূর্ব্বের নই। ঐশ্বর্য্যের উপর একেবারে বিরাগ জন্মিল।' এই বিরাগ, বিমর্ষতা থেকে পরিত্রাণ পেলেন তিনি উপনিষদের একটি শ্লোক থেকে। ব্যাপারটি অনেকটা রূপকথার মতো। শ্লোক লেখা সেই পাতাটি উড়ে এসে পড়েছিল তাঁর সামনে। তিনি পড়লেন কিন্তু অর্থ উদ্ধার করতে পারলেন না। রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে সেই শ্লোকের মর্মার্থ উদ্ধার করে তিনি হয়ে ভিন্ন দেবেন্দ্রনাথ। সেই শ্লোকের বাংলা অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়াচ্ছে- 'ঈশ্বর দ্বারাই জগতের সবকিছু আচ্ছাদিত, তিনি যা দিয়েছেন তাই ভোগ করো, অন্যের ধন অপহরণ ক'র না।' কথাটি সামান্য। কিন্তু গভীরতা? এই শ্লোকটিতে উদ্বুদ্ধ দেবেন্দ্রনাথ এরপর উপনিষদ পড়ে ফেলছেন, তৈরী করছেন তত্ত্বরঞ্জনী সভা...পরে তা নাম পাল্টে হচ্ছে তত্ত্ববোধিনী সভা, উপনিষদের বাংলা অনুবাদ করছেন, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশ করছেন অক্ষয়কুমার দত্তের সাথে, ব্রাক্ষ্মবিদ্যালয় স্থাপন করছেন, চালু করছেন মাঘোৎসব, নববর্ষ, দীক্ষাদিন ইত্যাদি, প্রতিষ্ঠা করছেন শান্তিনিকেতন। এক বিরাট কর্মযজ্ঞ দেখা যাচ্ছে যেন! একই সাথে ভ্রমণ করছেন ভারত, বিশেষ করে হিমালয়। মানুষ করছেন সন্তানদের। কিন্তু সংসারে থেকেও যেন নিস্পৃহ তিনি। জাগতিক সব কিছুর উর্ধে তাঁর অবস্থান। তত্ত্ববোধিনী সভা তাঁকে মহর্ষি উপাধিতে ভূষিত করছে তাঁর আপাত নিস্পৃহ অথচ সবেতেই ভীষণভাবে উপস্থিতির জন্য। 
কিভাবে সবেতে উপস্থিত হচ্ছেন তিনি?  ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়শনের সম্পাদক হিসেবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্বায়ত্বশাসনের দাবী সম্বলিত চিঠি লিখছেন, বাল্য ও বহু বিবাহের বিরোধিতা করছেন, নারী শিক্ষা প্রসারে ব্রতী হয়ে নিজ কন্যাকে বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন, ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের জন্য নিজের পরিকল্পনায় বিশেষ পোশাক বানাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে আগামীর মহানক্ষত্রের সম্ভাবনা বুঝতে পেরে তাঁকে গড়েপিঠে তুলছেন, একই সাথে অন্য পুত্র-কন্যাদেরকেও সমানভাবে উৎসাহিত করছেন এবং দেশের ও দশের মঙ্গলার্থে তাঁর নিজের মতো কাজ করে চলছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ভারতের মতো বহু বর্ণ, ধর্ম, ভাষা, পোশাকের দেশে একমাত্র একেশ্বরবাদী ভাবনাই সঠিক। পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি আর কুব সম্ভবত তার সূত্রপাত হয়ে ছিল 'সর্বতত্ত্ব দীপিকা সভা'র হাত ধরে। এখানে জাতধর্মের কোনো বিচার ছিল না। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, পারসি সকলেই সমমর্যাদা পেতেন। পরবর্তীতে সর্বতত্ত্ব দীপিকা সভার অস্তিত্ব সেভাবে দেখা না গেলেও দেবেন্দ্রনাথের মনে সেই যে একেশ্বরবাদী ভাবনার বীজ গেঁথে ছিল তা যেন উপনিষদ পাঠের মধ্য দিয়ে মহীরুহ আকার ধারণ করে এবং সমাজ-সংসারের সবরকম কাজে থেকেও দেবেন্দ্রনাথ উদাসীন ছিলেন নিজের মতো। স্ত্রী মৃত্যুশয্যায় খবরটিও বিচলিত করে নি তাঁকে। মৃত্যু অনিবার্য সেকথা জেনেই তিনি নিজের মতো করে হিমালয় থেকে ফিরেছেন। আবার মৃত স্ত্রী-কে সাজিয়ে দিয়ে রওনা করিয়েছেন মহাপ্রস্থানের পথে। শোককে আত্মস্থ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাঝেও আমরা এই বৈশিষ্ট্য পাই। নিশ্চিত বলতে পারি এই শিক্ষা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই দেওয়া। উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল, নিজে পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস না করলেও, একেশ্বরবাদী ভাবনায় নিজেকে উন্নীত করলেও দেবেন্দ্রনাথ কোনোদিনই তাঁর স্ত্রীর  পৌত্তলিক ধর্মপালনে বাধা দেন নি। এই যে সহিষ্ণুতা, অন্যের বিশ্বাসকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া...এই ভাবনার বড় অভাব আজকে। আর এখানেই বোধহয় মহর্ষির কথা প্রাসঙ্গিক আজকের দিনেও।
একথা সত্য যে মহর্ষির কিছু ভাবনা-চিন্তা ও কর্মে কঠোর হিন্দুত্ববাদ অনেকে খুঁজে পান। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যদি সেটিই তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হতো তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো উদার মানবতাবাদী এক ব্যক্তিকে আমরা পেতাম না। দেবেন্দ্রনাথের কিছু বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁর পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে হিন্দু ছাড়া কেউ পড়তে পারবে না জাতীয় মনোভাব দেখা দেয়। কিন্তু স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের হস্তক্ষেপে সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং শান্তিনিকেতনে পড়বার সুযোগ পান সৈয়দ মুজতফা আলি। আসেন নানা দেশ থেকে নানা ধর্মের লোকেরা শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের ভূমিকায়। এখানেই প্রশ্নটা আসে যে দেবেন্দ্রনাথ যদি কট্টর হিন্দুত্ববাদীই হবেন তবে কি করে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন একজন সত্যিকার মানবপ্রেমী, যিনি সব ধর্মের উর্ধে? উত্তর মেলে না। আসলে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার পেছনে মহর্ষির প্রেরণাই তো কাজ করেছিল। আর সেই প্রেরণা হল বিশ্বপ্রকৃতির মাঝে নিজেকে জানা ও চেনা। দেবেন্দ্রনাথের সেই ভাবনাকেই রূপ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর একেশ্বরবাদী ভাবনায় রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁর কিছু ভাবনা হয়তো ঠিক ছিল যা আজকের দিনে আমাদের সঠিক মনে হচ্ছে না বা তাঁর অনুচরেরা তাঁকে ভুল ব্যাখ্যাও করে থাকতে পারেন, নিজেদের মতো করে তাঁর কথাকে অন্য অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

মনে রাখতে হবে, কোনও মানুষই একেবারে সঠিক যেমন নন, তেমনি সবটাই তার ভুলে ভরা এরকমও নয়। দেবেন্দ্রনাথ এমন একজন ব্যক্তি যিনি পেয়েছেন-হারিয়েছেন-অর্জন করেছেন। তাঁর জীবন এই শিক্ষায় দেয় যে ইচ্ছাশক্তি থাকলে একজন মানুষ একদম হেরে গিয়েও জিততে পারে আবার। তাঁর জীবন চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় কিভাবে একজন ব্যক্তি সংসারে থেকেও সবরকম পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। তাঁর কর্মকান্ড আমাদেরকে এই কথাই বলে যে সবার ওপর মানুষ সত্য। 

(প্রকাশিত: উন্মেষ)

 বাংলা সাহিত্যে ইংরেজির প্রভাব: একটি রূপরেখা 

শৌভিক রায় 

বিশ্ব সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ বাংলা সাহিত্য। বয়সের বিচারে তুলনায় অনেকটা নবীন হয়েও বাংলা সাহিত্য বিশ্বের নানা ভাষা ও সাহিত্য সৃষ্টির সাথে একাসনে বসেছে শুধুমাত্র তার গুণমানে। তবু বাংলা সাহিত্য অন্য ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব এড়াতে পারে নি একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এটাই বোধহয় সাহিত্যের নিয়ম। কোনো দেশের নিজস্ব সাহিত্যে অন্য দেশের, অন্য লেখকের প্রভাব পড়াটা একটি অতি পরিচিত ঘটনা। বিশ্বের কোনো সাহিত্যই এই প্রভাবমুক্ত নয়। সব সাহিত্যের ঘরানাটাতেই কমবেশি অন্য কোনো দেশের অন্য ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব লক্ষ করা যায়। কেউই এর বাইরে নন। যে সাহিত্য বা সংস্কৃতি নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা শ্রেষ্ঠ মনে করে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, সে নিজের ক্ষতি করে। কেননা একমাত্র মারাত্মক অপরাধীকে সলিটারি সেলে বা আলাদা রাখা হয়। তাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবি যেমন সম্পূর্ণ ভ্রান্ত একটি ধারণা ঠিক তেমনি সবচেয়ে আলাদা কথাটিও একেবারেই ভ্রান্ত। বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও অন্য দেশ, ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব স্বীকার করতেই হয়। 
বলাই বাহুল্য, দীর্ঘদিন ইংরেজ শাসনে থাকা ভারতে ইংরেজির বিরাট অবদান এবং বাংলা সাহিত্যে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব প্রবল। মনে রাখতে হবে ভারতীয়দের মধ্যে বাঙালিই প্রথম ইংরেজিকে আত্মস্থ করে এবং বাংলা হয়ে ওঠে নবজাগরণের পীঠকেন্দ্র। ইউরোপীয় নবজাগরণের ধারণায় বাঙালিই প্রথম সম্পৃক্ত হয়েছিল। আর ইউরোপিয়ান বলতে সে সময়ে ইংরেজরাই সংখ্যাগুরু ছিল। আবার ইংরেজরা কলকাতাকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী বেছে নেওয়ায় শিল্প-কালা-সাহিত্যের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল শহরটি। তাই নবজাগরণের ঢেউ সর্বপ্রথম কলকাতাই আছড়ে পরে এবং সেই ঢেউয়ে বাংলা সাহিত্যের নৌকো ভেসে চলে নিজের মতো। মনে রাখতে হবে নৌকোটি নিজস্ব হলেও ঢেউটি কিন্তু ইউরোপিয়ান ঘরানার। তাই ইউরোপিয়ান বিশেষত ইংরেজিয়ানার প্রভাব বাংলা সাহিত্যে দেখা যাবে এ আর নতুন কি।  
হয়তো সেই সূত্র ধরেই স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লিখে ফেলেন 'ভ্রান্তিবিলাস' আর কে না জানে শেক্সপিয়ারের 'কমেডি অফ এররস' অবলম্বনে লেখা হয়েছিল এই গদ্যগ্রন্থটি। বিদ্যাসাগরকে দিয়ে শুরু করার কারণ একটিই, যদি মনে করি নিই বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষাবিকাশের অন্যতম জনক তবে সেই জনকটিও ইংরেজি সাহিত্যকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন নি। হয়তো তাঁর মতো ক্ষণজন্মা পুরুষ বুঝেছিলেন যে বাংলা সাহিত্যকে যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয় তবে তাকে বিশ্বসাহিত্যের দোরগোড়ায় পৌঁছতে হবে আর সেক্ষেত্রে ইংরেজির মতো প্রাচীন ভাষার সাহিত্য নিজের  সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবে। মাইকেল মধুসূদনের ইংরেজি প্রীতি ও ইংরেজিতে লেখা এবং পরবর্তীতে বাংলায় ফিরে আসা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। মাইকেল না থাকলে ইংরেজি সাহিত্যের অনেক মণিমুক্তো আমরা জানতে পারতাম না সেই সময়, ফলে পিছিয়ে যেত বাংলা সাহিত্যের অগ্রগতি। মাইকেলই  প্রথম মহাকাব্য, সনেট ইত্যাদি নিয়ে  সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পেরেছিলেন এবং তাঁর নিজের লেখায় ইংরেজি সাহিত্যের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায়। তাঁর প্রথম গদ্য 'হেকটরবধ` হোমারের ইলিয়াড অনুসরণে রচিত। 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এ ভার্জিলের 'ইনিড', দান্তের 'ডিভাইন কমেডি', হোমারের 'ইলিয়াড' আর মিল্টনের 'প্যারাডাইস লস্ট'-এর ছায়া দেখা যায়। মেঘনাদবধ কাব্যে চরিত্রচিত্রায়ণে প্যারাডাইস লস্টের চরিত্রগুলি যে তাঁকে সাহায্য করেছিল সে কথা মাইকেল নিজেও স্বীকার করে গেছেন। অন্যদিকে 'বীরাঙ্গনাকাব্য' ওভিডের রচনায় প্রভাবিত। আবার তাঁর 'ক্যাপটিভ লেডি' ইংরেজিতেই লেখা। এখানে একথা বললে ভুল বলা হবে না যে নবজাগরণের ঢেউ এতটাই উত্তাল ছিল সেসময় যে মাইকেল শুধুমাত্র বীররসাত্মক ধারার মহাকাব্য রচনায় নিজেকে আটকে না রেখে গীতিকবিতায় বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। সে হিসেবে তাঁকে যুগ প্রবর্তক বলা যেতে পারে। নিজস্ব আবেগ-অনুভূতির এই কবিতা যে স্বাতন্ত্রতা এনেছিল তার প্রভাবে সিক্ত হয়েছিলেন হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, বিহারীলাল প্রমুখ। অর্থাৎ এখানেও বিদেশী সাহিত্যের ঋণ অস্বীকার করা যায় না। একথা অনস্বীকার্য যে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি, মনন , ভাবধারাতে সেই গীতিকবিতা অতি অবশ্যই আলাদা রূপ নিয়েছিল। তবে পাশ্চাত্য প্রভাব নতুন করে ভাবতেও শিখিয়েছিল সে যুগের বাঙালি মেধাকে। ইংরেজি সাহিত্যের  এই টান অস্বীকার করতে পারেন নি সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রও। তাঁর প্রথম উপন্যাস 'Rajmohan's Wife' রচিত হয় ইংরেজিতে। সাহিত্যের মনোযোগী পাঠক অবশ্যই বঙ্কিমচন্দ্রের 'রজনী` উপন্যাসের নায়িকা রাজনীর সাথে 'দ্য লাস্ট ডেজ অফ পম্পেই'-এর নিডিয়ার মিল খুঁজে পাবেন। আর 'কমলাকান্তের দপ্তর`-এর প্রেরণা ছিল ডিকুয়েন্সির 'কনফেশন অফ এন ইংলিশ ওপিয়াম ইটার' একথা কমবেশি সকলেরই জানা। 
তাহলে লক্ষ করা যাচ্ছে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব কমবেশি সে যুগের সাহিত্যিকদের ওপর পড়েছিল। আবার সরাসরি সাহিত্যব্যক্তিত্ব বলে চিহ্নিত না হয়েও সে আমলের সমাজে যাঁদের অবদান প্রবলভাবে ছিল, কিছু লেখালিখিও যাঁরা করেছেন তাঁদের ওপরেও ইংরেজি বা ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব ছিল। রাজা রামমোহন রায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষি  দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রহ্মাচার্য কেশবচন্দ্র সেন, রাধানাথ শিকদার, বিবেকানন্দ প্রমুখ সকলেই ইংরেজি সাহিত্যের ধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। ইউরোপের ভাবনাচিন্তা তাঁদের মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে সে সময় ব্রাহ্ম আন্দোলন শুরু হয়। ব্রাহ্ম সংগীত বা অন্যান্য রচনাকে সাহিত্যের দৃষ্টিতে দেখলে সেখানেও বিদেশি সাহিত্যের প্রভাব বিশেষভাবে দেখা যায়। এমনিতেও ডিরোজিও, ইয়ং বেঙ্গলের জন্য  বাঙালি মনোজগতে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছিল। চিন্তায়-ভাবনায় সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছিল যেমন সাহিত্যে তেমনি সমাজজীবনেও। অনেকে তো মনে করেন ব্রাহ্ম-সমাজের মূলে ছিল সমাজতান্ত্রিক ভাবনা। সেজন্য অনেকে তাঁদের ছদ্ম-কম্যুনিস্ট মনে করেন। একেশ্বরবাদ, সমভাবনা, সাম্য, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে অভিন্নতার এই দর্শনটিও নিঃসন্দেহে ইংরেজির প্রভাব। এমন না যে ভারতবর্ষে এই দর্শন ছিল না বা কেউ বলে নি। কিন্তু দীর্ঘদিন তা আটকে ছিল কোনো অন্ধকার কারাগারে। সেই ভাবনা আবার মুক্তি পেয়েছিল পাশ্চাত্যের, বিশেষ করে ইংরেজির, প্রভাবে আর তার স্পর্শ পেয়েছিল বাংলা সাহিত্য।  
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ববর্তী কবিদের মধ্যে হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন ও বিহারীলাল চক্রবর্তীর মধ্যে ইংরেজি সাহিত্যের গীতিকবিতার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মাইকেল মধুসূদন নিজে যে সনেট রচনা করেছিলেন তাতে পেত্রার্ক ও শাকেস্পেয়ারের প্রভাব প্রবলভাবে প্রকট। হেমচন্দ্রের 'ছায়াময়ী' দান্তের ডিভাইন কমেডি অনুসরণে রচিত এবং 'জীবন সংগীত` কাব্যে লংফেলোর প্রভাব ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে আজও সূর্যের মতো উজ্জ্বল। তাঁর বিরাট প্রভাব থেকে এখনো বাংলা সাহিত্য হয়তো পুরোপুরি মুক্ত হয় নি। সেই বিরাট পুরুষ রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। কবি-ঔপন্যাসিক-সংগীত রচয়িতা-শিল্পী-গায়ক ইত্যাদির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী পাঠক। তাঁর পড়াশোনার বিরাট ব্যাপ্তি তাঁকে চেতনা-অবচেতনে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে তাঁর বহু রচনায় ইংরেজি-সহ অন্য ভাষাসাহিত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্ট বিভিন্ন গান সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। আলোচকের ভাষায় 'তাঁর কাব্য বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা, অনুভূতি কল্পনার বর্ণে গন্ধে সমুজ্জ্বল। পাশ্চাত্য সৃষ্টির সংস্পর্শকে তিনি না এড়িয়েও নিজস্ব সত্তার হৃদয়-স্পন্দন কাব্যের যে রূপ তিনি তুলে ধরেন তা বাংলা কাব্যের ইতিহাসে আর সম্ভব নয় বলেই মনে হয়।' অরুন মিত্র বলেছেন, 'মানুষের জাগতিক অবস্থান, প্রেম প্রকৃতি সব কিছু জড়িয়ে তাঁর সৃষ্টি অব্যাহত ধারায় বয়ে চলে এবং তারই সঙ্গে সমস্ত খণ্ডতাকে এক অখণ্ডতায় স্থাপন করে জীবনের পারলাম রূপের সন্ধান করে।' তাই পাশ্চাত্য প্রভাবে অনেকসময় প্রভাবিত হয়েও রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ আলাদা এক সত্ত্বা। তিনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, তাঁর প্রভাবে পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য প্রভাবিত হয়েছিল, বাধ্য হয়েছিল তাঁকে অনুবাদ করতে এবং তাঁর বিপুল সৃষ্টিকে নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতি দিতে।আসলে হয়তো কবিতার ক্ষেত্রে আমরা কেউই নতুন কথা বলি না। কেননা বলার আর কিছু নেই। সর্বদেশে, সর্বকালে মানুষের শাশ্বত অনুভূতিগুলি একই থাকে। তাহলে কিসের ভিত্তিতে একজনের কবিতা আর একজনের চাইতে আলাদা হয়। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কবিতা আলাদা হয়ে যায় শব্দ-চয়নে। অর্থাৎ কবিতা এক অর্থে coinage বা শব্দ-চয়ন। ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে শেলী যেমন ভাবেন, 'If winter comes, can spring be far behind ?', তেমনি রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।` এভাবেই ভাবনার জগতে মিলেমিশে যায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য। প্রভাব ফেলে একে ওপরের ওপর, কেননা মনে রাখতে হবে বহুদিন আগে উপনিষদ এই একই কথা বলেছিল, 'দুখানি চ সুখানি চ চক্রবৎ পরিবর্তনে।` তাই এক দেশের সাহিত্যে আর এক দেশের বা ভাষার প্রভাব খুব স্বাভাবিক। বরং প্রভাব না থাকাটাই অস্বাভাবিক বলা যেতে পারে। 
রবীন্দ্রযুগ বা রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের প্রভাবমুক্ত হতে বাংলা সাহিত্যের অনেকটা সময় লেগেছিল। অবস্থাটা এমন হয়েছিল যে খানিকটা স্বেচ্ছাকৃত রবীন্দ্র বিরোধিতার জায়গা নিয়েছিলেন অনেক কবি-সাহিত্যিকেরা।পাশ্চাত্যেও ঘটে গেছিল অনেক পরিবর্তন। ফ্রয়েডের মনস্তত্ব, টি এস এলিয়ট, জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে। ভিক্টরিয়ান যুগের গোঁড়ামি ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত প্রবল আলোড়ন ফেলেছিল সাহিত্য জগতে। এতদিন ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, শেলী, কিট্স্, বায়রন পড়া বাংলা সাহিত্য টেনিসন, ব্রাউনিং বা টমাস হার্ডি পাঠ শেষে মুগ্ধ হচ্ছিল আধুনিক কালের কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্টিতে। অন্যদিকে বলশেভিক বিপ্লব মানুষের চেতনায় নতুন ধারা সংযোজন করেছিল। ফলে, সাহিত্যের অভিমুখ নীরবে বদলাতে শুরু করেছিল। একের পর এক সাহিত্য আন্দোলন বদলে দিচ্ছিল ভাবনার জগৎকে। ফরাসি সাহিত্যে ইতিমধ্যে বোদলেয়ার, মালার্মে, রাবোঁ, সাঁর্ত্র প্রমুখের দর্শন বদলে দিয়েছিল ইংরেজি সাহিত্যকে আর ইংরেজি সাহিত্যের হাত ধরে সেই ঢেউ আছড়ে পড়ছিল বাংলা সাহিত্যের জগতেও। কবি-সাহিত্যিকেরা বুঝতে পারছিলেন সাহিত্য মানে শুধুই প্রকৃতি বা সুকুমারী প্রবৃত্তি নয়। সাহিত্য হবে বাস্তবের মুখপাত্র আর সেই বাস্তবে থাকবে কৃমি-কীট-বেশ্যা-দালাল-আপোষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো প্রয়োজনে পৃথিবীর নৃশংসতম প্রাণী হতে পারে মানবপ্রজাতি। নাৎসি ক্যাম্প, হিরোশিমা-নাগাসাকির মারণযজ্ঞ ইত্যাদি সব মিলে দ্রুত পাল্টে গেল পুরো দুনিয়া। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে বিংশ শতাব্দীতে মানুষের মনোজগত থেকে শুরু করে রাজনীতি,সমাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে যা আগের শতাব্দীগুলিতে দেখা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সভ্যতার পীঠকেন্দ্রেটিও যেন ইউরোপ থেকে আমেরিকায় চলে গেল এই সময়েই। আমেরিকাতেও কালো মানুষদের লড়াই সমীহ আদায় করে নিলো সারা বিশ্বের।সাহিত্য জগতে এ সবেরই প্রভাব এতো প্রবলভাবে পড়ল যে একের পর এক আন্দোলন গড়ে উঠলো- রিয়ালিজম, সুর-রিয়ালিজম, ইম্প্রেশনিজম, ডাডাইজম, মডার্নিজম, পোস্ট-মডার্নিজম, হাংরি লিটারেচার ইত্যাদি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটায় সাহিত্য জগতের এই পরিবর্তন থেকে বাংলা সাহিত্য দূরে থাকতে পারে নি। জীবনানন্দ দাস, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য, কমলকুমার মজুমদার, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সমর সেন, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে নানাবিধ আন্দোলনের প্রভাব দেখা গেল বাংলা কবিতা বা উপন্যাসে। পরবর্তীতে এই ধারা লক্ষ্য করা যায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দীনেশ দাস, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, রাম বসু, মনীশ ঘটক, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, মনীন্দ্র রায় প্রমুখের মধ্যে। হাংরি সাহিত্যের অন্যতম প্রবক্তা গিন্সবার্গের প্রভাব খানিকটা দেখা গিয়েছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নানা রচনায়। তবে তিনি বেশিদিন সেই ধারায় না থেকে নিজস্ব ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। একই কথা বলা যায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পাশ্চাত্যের প্রভাব কমবেশি ছিল তাঁদের ওপর বা তাঁদের সমসাময়িক বিনয় মজুমদার, শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাসগুপ্ত, আমিতাভ দাসগুপ্ত প্রমুখের ওপর। অন্যদিকে তুষার রায়, রত্নেশ্বর হাজরা, উৎপল কুমার বসু, মলয় রায় চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, দেবী রায়, সমীর রায়চৌধুরী, অরুণেষ ঘোষ প্রমুখের মধ্যে হাংরি প্রভাব যথেষ্টই বিদ্যমান ছিল। পোস্ট মডার্নিজমের ধারণা নিয়ে বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত, কৃষ্ণা বসু, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, মণিভূষণ ভট্টাচার্য্য প্রমুখেরা লিখে গেছেন। ইয়েটসের 'He Reproves the Curlow' অবলম্বনে জীবনানন্দ লিখেছেন 'হায় ছিল`, তাঁর বিখ্যাত বানালাটা সেনের মধ্যে দেখা যায় এডগার এলেন পো -এর 'টু হেলেন' কবিতাটির প্রভাব। টি এস এলিয়টের প্রভাবে সমর  সেন রচনা করেন একাধিক কবিতা। মার্কসিজমকে বিষয় করেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য্য। তারাশঙ্কর, মানিক বন্দোপাধ্যায়, সমরেশ বসুর মধ্যেও এই ছায়া দেখা যায়। জগদীশ গুপ্ত যেন ছোটগল্পের জগতে ও হেনরি, মোপাসাঁ প্রমুখের প্রভাবে লিখে গেছেন একের পর এক কালজয়ী ছোট গল্প। রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর তাঁদের উপন্যাসে যেমন ইংরেজি সাহিত্যের স্মার্ট টানটান ধারাকে বজায় রেখেছেন তেমনি শঙ্কর, বিমল মিত্রের উপন্যাসে ডিকেন্সিয় আঙ্গিক প্রতীয়মান। এরকম বহু উদাহরণ দেওয়া যায় প্রায় সমগ্র বাংলা সাহিত্য থেকে। কিন্তু লিটিল ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠা সংখ্যার কথা মাথায় রেখে আর বেশি বলা উচিত না। 
একদম আজকের দিনে তাকালে দেখি বাংলা সাহিত্যে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আজকের অত্যন্ত দ্রুত যোগাযোগের দিনে বাংলা সাহিত্য পিছিয়ে নেই। একটি ক্লিকের সাহায্যে যখন দেখে নেওয়া যাচ্ছে ইউরোপ বা আমেরিকা বা আফ্রিকার কবি-সাহিত্যিক কি লিখছেন, অনলাইন অর্ডারে দু-একদিনেই যেখানে পৌঁছে যাচ্ছে সদ্য প্রকাশিত বই সেখানে বাঙালি কবি-সাহিত্যিকরা যে একে ওপরের দ্বারা প্রভাবিত হবেন সে কথা বলা বাহুল্য। বিশ্বায়নের এই যুগে অবশ্য কমবেশি সব ভাষাতে একই সুর ও ভাবনা পরিলক্ষিত। কেননা পৃথিবী আজ সংকুচিত। ভাবতে ভাল লাগে আজ পাশ্চাত্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে বাংলা সাহিত্য নিজে এমন জায়গা নিচ্ছে যে তাকে অনুসরণ করছে কেউ কেউ বা তার প্রভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। তবে তার পরিমান সামান্য। সাহিত্য জগতে সেভাবে প্রাচীন না হয়েও বাংলা সাহিত্যের দ্রুত প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠা প্রমান করে যে প্রভাব যতই থাকে নিজস্বতা না থাকলে কোনো ভাষার সাহিত্য বেশি দূর যেতে পারে না। আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা বড়াই করে বলতে পারি সেই নিজস্বতা আমাদের পুরোদমে রয়েছে।  

(প্রকাশিত: এক পশলা বৃষ্টি/ সম্পাদক: অম্বরীশ ঘোষ))     

Monday, August 1, 2022




 কালের যাত্রায় কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়

শৌভিক রায়  

যে কোনও প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ পূরণ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গর্বের।  কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও সেই শ্লাঘার বিষয়টি ঘটতে চলেছে তিন বছর পর, ২০২৪ সালে। বিদ্যালয় হিসেবে কোচবিহার শহরে  শতবর্ষ প্রাচীন সদর গভর্নমেন্ট হাই স্কুল, জেনকিন্স স্কুল ও সুনীতি একাডেমি ও  এ বি যেন শীল কলেজের পাশাপাশি মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের একশো বছরে পা রাখতে চলা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এই বিদ্যালয়ের ইতিহাস অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির থেকে একেবারেই আলাদা।

১৮৭৮ সালে প্রজাবৎসল মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুরের সঙ্গে ব্রাহ্মধর্মাবতার কেশবচন্দ্র সেনের কন্যা সুনীতি দেবীর বিবাহের পর, কোচবিহারে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায়। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিতা সুনীতি দেবী কোচবিহারের আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রয়োজন অনুভব করেন। তাঁর বিশেষ অনুরোধে মধ্যপ্রদেশ থেকে ১৮৯৬ সালে লিডিয়া ম্যাগুনসন তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত সুনীতি একাডেমিতে সেলাই শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হন। সুইডিশ লিডিয়া ম্যাগুনসন কোচবিহার রাজ্যে খ্রীষ্ট ধর্ম প্রসারের সম্ভাবনা দেখতে পান। কেননা সেই সময় কোচবিহারে  মহারাজার নিজস্ব ব্যান্ড পার্টিতে কাজ করার সুবাদে বেশ কিছু খ্রীষ্টান পরিবার বাস করত। এই ব্যান্ড পার্টিতে শুধু ইউরোপিয়ানরাই ছিল না, ছিল ধর্মান্তরিত ভারতীয় পরিবারও। লিডিয়া ম্যাগুনসন সেই খ্রীষ্টানদের মধ্যে শিক্ষার প্ৰয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যাপারে কোচবিহার রাজ্যে ইংরেজ সরকারের ভূমিকা থাকলেও, ধর্ম-সংস্কৃতি ইত্যাদি ব্যাপারে তারা বা অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারত না। ফলে  লিডিয়া ম্যাগুনসনের আবেদনে  মহারানী সুনীতি দেবী স্বয়ং মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণকে এই ব্যাপারে উদ্যোগী হতে অনুরোধ করেন। সুইডিশরা ছাড়া আর কোনও ইউরোপিয়ান মিশনারি শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে কোচবিহার রাজ্যে অনুমোদন পাবে না এই শর্তে  লিডিয়া ম্যাগুনসনের আবেদন গ্রাহ্য হলে, ১৮৯৮ সালে লিলি উইলম্যান মধ্যপ্রদেশ থেকে কোচবিহারে আসেন। তাঁর উদ্যোগে আজকের নীলকুঠি এলাকায় তাঁর সঙ্গে আসা কিছু ছাত্র, মহারাজার ব্যান্ডপার্টিতে থাকা খ্রীষ্টান পরিবারের এবং একদা 'গারো হিলস' ভাগ্য অন্বেষণে আসা ও ঘুঘুমারী অঞ্চলে থাকা ধর্মান্তরিত গারো খ্রীষ্টান পরিবারের সন্তানদের নিয়ে শুরু হয় একটি 'হোম স্কুল' । 

১৯০০ থেকে ১৯০৬ অবধি সেই হোম স্কুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু ক্রমাগত ছাত্র সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৯০৭ সালে ইংরেজ প্রশাসকদের সহযোগিতায় কুমার ভবেন্দ্রনারায়ণের বাড়ি 'মৃণাল কুটির`-এর কাছে একটি আটচালা ঘরে হোম স্কুলটি স্থানান্তরিত করা হয়। তবে অন্য একটি মত বলছে যে, সুইডিশ মিশনারিরা ১৯১৭ সালে তোর্ষা নদীর চরে, শহরের পশ্চিম প্রান্তে, একটি পাঠশালা স্থাপন করেছিলেন যেটি ১৯২৪ সালে কুমার ভবেন্দ্রনারায়ণের বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। প্রসঙ্গত, কোচবিহার রাজপরিবারের সন্তান কুমার ভবেন্দ্রনারায়ণ, মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের উদ্যোগে ডাক্তারি পাস করেছিলেন। কিন্তু  রাজপরিবারের নিজস্ব রাজনীতির শিকার হয়ে তিনি কুমিল্লার সিভিল সার্জেন পদে যোগ দিয়েছিলেন এবং দীর্ঘদিন সেখানেই ছিলেন। 

উল্লেখ্য যে,  ১৯১১ সালে মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর পরেও বিদ্যালয়ের কোনও অসুবিধে হয় নি, কেননা পরবর্তী মহারাজা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত রাজরাজেন্দ্রনারায়ণও শিক্ষাবিস্তারে সুইডিশ মিশনারিদের অবদান বুঝতে পেরেছিলেন। মহারাজা রাজরাজেন্দ্রনারায়ণের অকাল মৃত্যুর পর তাঁর ভাই জিতেন্দ্রনারায়ণ সিংহাসনে বসেন। তাঁর নয় বছরের রাজত্বকালে তিনি পূর্বসূরীদের অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান।  কিন্তু তিনিও বেশিদিন রাজত্ব করতে পারেন নি। ১৯২২ সালে তিনি প্রয়াত হলে নাবালক  রাজপুত্র জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণকে রাজা ঘোষণা করা হয় এবং রাজকার্যে সহযোগিতার জন্য রাজমাতা ইন্দিরা দেবীর নেতৃত্বে Regency Council গঠিত হয়।

মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ, মহারাজা রাজরাজেন্দ্রনারায়ণ এবং মহারাজা জিতেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর অভিঘাতের মধ্যেও সুইডিশ মিশনারিরা তাঁদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল এবং রাজদরবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক যথেষ্ট মধুর ছিল। যাহোক, তাঁদের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ১৯২৪ সাল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কেননা বিদ্যালয়ের রেকর্ডে এই সালটিকেই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বৎসর হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। ১৯০৭ থেকে ১৯১৮ অবধি বিদ্যালয়ের কেয়ার টেকার ছিলেন এফ ইউ পাল। লিলি উইলম্যান-সহ সত্যপ্রসাদ মণ্ডল, অতুলচন্দ্র বসু, নলিনীকান্ত চক্রবর্তী প্রমুখেরা এই সময় শিক্ষক ছিলেন। ১৯১৮ থেকে ১৯২৬ অবধি রোহিনী সরকার, রামানন্দ সরকার, ভূপেন্দ্র মোহন ব্রহ্ম, সুরেশ রায়, ব্রজেন্দ্র লাল সরকার প্রমুখেরা বিদ্যালয়ে নিযুক্ত হন। 

১৯২৬ সালে লিলি উইলম্যান ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও কিন্তু ছাত্র সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যালয়ে ক্লাসের সংখ্যাও বেড়েছে। ১৯২৮-২৯ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যালয় শুরুর বছর অর্থাৎ ১৯২৪ সালে বিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা ছিল ৫৩ জন। ১৯২৯ সালে সেই সংখ্যা হয় ১৫০। এই বিপুল পরিমান ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কুমার ভবেন্দ্রনারায়ণের লিখিতভাবে বাড়ি ছাড়বার অনুরোধ, সুইডিশ মিশনারিদের চিন্তায় ফেলে। সুইডিশ মিশনের তৎকালীন সভাপতি A. W. BRANDT বিদ্যালয়ের জায়গার জন্য ছোটাছুটি শুরু করেন। এবারেও পরিত্রাতা হিসেবে এগিয়ে এলেন Regency Council। ১৯৩২ সালের ১৮ মার্চ তাঁরা মিশনারিদের আশ্বাস দিলেন যে, এ বি এন শীল কলেজের বিপরীতে থাকা রাজগণ ছাত্রাবাস বিদ্যালয়ের জন্য দেওয়া হবে। সেই বছরের জুলাই মাস বা তার কিছু আগে বিদ্যালয় উঠে এল আজকের জায়গায়। ২৫শে জুলাই Regency Council কে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি Parade Ground- এর দক্ষিণ দিকের মাঠ চাওয়া হল খেলার জন্য। ১৯৩৩ সালে ছাত্রসংখ্যা হল ২৪৪। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, শরীর চর্চা ইত্যাদির জন্য নির্মিত হল আধুনিক ব্যায়ামাগার। শুরু হল বিদ্যালয়ের নতুন করে জয়যাত্রা।  ১৯২৯ সালের নভেম্বর মাসে সতীশচন্দ্র ভৌমিক বিদ্যালয়ের অস্থায়ী প্রধানশিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৩৪ অবধি পরেশ চন্দ্র গুহ, সুরেন্দ্র মোহন ইশোর, অনাদি আইচ, নির্মলচন্দ্র চক্রবর্তী, জ্যোতিলাল ভট্টাচার্য, হেমন্ত কুমার বসু, অবনীতারণ বিশ্বাস প্রমুখেরা শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৩৪ সালে স্থায়ী খ্রীষ্টান প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ের দাযিত্ব নেন ইমানুয়েল রঞ্জিত রায়। সতীশচন্দ্র ভৌমিককে দেওয়া হয় সহ প্রধানশিক্ষকের পদ। ইতিমধ্যে ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সুইডিশ মিশন স্কুলকে সাময়িক অনুমোদন দেয়। সে বছর ৮জন ছাত্র ম্যাট্রিকুলেশন দিয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ২৩।

১৯৩৪ থেকে ১৯৪৭ ছিল বিদ্যালয়ের অত্যন্ত গৌরবের সময়। এই সময়ে মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণ স্বয়ং বিদ্যালয়ে এসেছেন পুরস্কার বিতরণী উৎসবে (৫ মার্চ, ১৯৩৭)। মৌলভী শিক্ষকের পাশাপাশি নিয়োজিত হয়েছেন কাব্যতীর্থ সংস্কৃত পন্ডিত। বাইবেল শিক্ষক তো শুরুর দিন থেকেই ছিলেন। শারীর শিক্ষণ শিক্ষককে রাজ্যাধিপতির মিলিটারি বিভাগে ট্রেনিং নিতে পাঠানো হয়েছে। গ্রন্থাগারে কেনা হয়েছে ২৯৬টি বই। বিদ্যালয়ে ফুটবলে ব্রেটকাপ ও আউএন কাপের খেলা শুরু হয়েছে। বসছে হকির আসর। হাতে লেখা বিদ্যালয় পত্রিকা 'সাধনা` প্রকাশিত হচ্ছে। অচিরেই সেটি মুদ্রিত আকারে পরিবর্তিত হচ্ছে। বিদ্যালয়ে বিতর্ক সভা স্থাপিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমাজসেবার ক্লাব। পঠন কক্ষে শোভা পাচ্ছে টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ইলাস্ট্রেটেড উইকলি, মডার্ন রিভিউ, সচিত্র ভারতের মতো নামী পত্রিকা। মিউজিয়াম তৈরিও এই সময়ের যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৪৪-৪৫ সালেও মহারাজার উপস্থিতিতে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়েছে। তৎকালীন প্রধান শিক্ষক পি কে অধিকারী বাংলায় কার্যবিবরণী পাঠ করছেন। শিক্ষক সংখ্যা হয়েছে ২০, ছাত্র সংখ্যা ৫৫০। বিদ্যালয়ে গঠিত নাট্য সমিতি শিক্ষক প্রমথ বর্ধনের লেখা 'শের শাহ' নাটক মঞ্চস্থ করছে এই সময়েই। ১৯৩৯ সালে ছাত্রাবাস শুরু হয়েছিল ১৩ জন ছাত্রকে নিয়ে, এই সময় সেই সংখ্যা হয়েছে ৫২ জন। বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে যুক্ত হয়েছে কৃষি ও কারিগরী শিক্ষা। কোচবিহার রাজ্যের আর্টিজেন স্কুলে বিদ্যালয়ের ছাত্ররা কারিগরী শিক্ষা লাভ করছে, অষ্টম থেকে দশম শ্রেণীর ছাত্ররা বিদ্যালয়ের কৃষিক্ষেত্রে নিজেদের পাঠ লাভ করছে। গভর্নর জেনারেলের পূর্বাঞ্চলীয় এজেন্ট কর্নেল এ এস সিক এই সময় বিদ্যালয় পরিদর্শন করে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন।  ছাত্রাবাসে রাত্রিযাপন করছে কবি নজরুল ইসলাম এবং ভবানীগঞ্জ বাজারের কাছের মসজিদে 'মিলাদ মহফিলে` সংগীত পরিবেশন করছেন। ১৯৩৬ সালে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বৈদ্যুতিক পাখা লাগানো হচ্ছে। তার আগের বছর ১৯৩৫ সালে শুরু হয় মনিটর ব্যবস্থা।  সব মিলিয়ে সুইডিশ মিশনারি স্কুল ছিল কোচবিহারের বুকে এক নতুন ইতিহাসের নাম। 

সমগ্র দেশের মতোই ১৯৪৭-৪৮ সাল সুইডিশ মিশন স্কুলের পক্ষে ছিল উত্তাল দুই বছর। দেশভাগের জন্য শহর কোচবিহারে শরণার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাদের স্থান হয়েছিল বিদ্যালয়ের আটচালা ঘরে। সাময়িকভাবে বিদ্যালয়ের কাজ চলছিল সকালবেলায় প্রতিবেশী জেঙ্কিন্স স্কুলে। বিদ্যালয়ের দুই ছাত্র ইয়াকুব ও ইয়াসিনের নেতৃত্বে পাকিস্তানের স্বপক্ষে শহরে মিছিলও পরিক্রমা করেছিল। সব মিলে সুইডিশ মিশনারিদের পক্ষে পরিস্থিতি অনুকূল ছিল না। তাঁরা শর্তসাপেক্ষে স্টেস্টের কাছে বিদ্যালয়টি হস্তান্তর করতে চাইলেন। সুইডেনের হোম-বোর্ডও বিদ্যালয়ের অনুদান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু স্টেট দায়িত্ব নিতে রাজি হল না।  A. W. BRANDT চিঠি দিয়ে জানালেও কোনও লাভ হল না।  এই টানাপোড়েনের মাঝে ১৯৪৮ সালের ১৯ শে জানুয়ারি ছাত্ররা বিদ্যালয়ের ভেতর সরস্বতী পুজো করবার আবেদন জানালেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সতীশচন্দ্র ভৌমিক আবেদন পত্র পাঠালেন  A. W. BRANDT-এর কাছে। অবধারিতভাবে আপত্তি এলো তাঁদের দিক থেকে। কিন্তু তখন ছাত্ররা খেপে উঠেছে। প্রাক্তন ছাত্র ও প্রখ্যাত কবি প্রয়াত সনৎ চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, 'স্কুলে শতকরা আশি ছেলেই হিন্দু, তারা দাবী তুলেছে সরস্বতী পুজো করবে। সঙ্গে মুসলমান ছেলেরাও আছে। অন্যদিকে সুইডিশ মিশনের কর্মকর্তারা পুজো করতে দেবেন না। ছাত্র বিক্ষোভ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠলো।  শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিলেন। এত সব কাণ্ডের সময় আমি বাগানে আছি। যেদিন বাগান থেকে হোস্টেলে এলাম, সেদিন স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে আমি হতবাক। সারা স্কুলের মাঠে কাগজের টুকরো। একটা কাগজের টুকরো তুলে দেখি আমাদের পাঠ্য বাইবেল ছেঁড়া হয়েছে। খুব খারাপ লাগল।` এরকম অবস্থায় A. W. BRANDT ও মিশন প্রতিনিধি JOHN A ROY-এর  আপত্তি লিপিবদ্ধ করেও পরিচালন সমিতি পুজো করবার অনুমতি দিল।  

কিন্তু এই ব্যাপারটি যে তাঁরা ভালভাবে নেন নি তার প্রমান পাওয়া গেল  ২১ জানুয়ারি। পদত্যাগপত্র গেল পরিচালন সমিতির কাছে। কিন্তু সেটি গৃহীত না হওয়ায় আবার মার্চের ২ তারিখ আবার পদত্যাগপত্র পাঠানো হল। এবার তা গৃহীত হল। সুইডিশ মিশনারিদের সঙ্গে এতদিনের সম্পর্কের ইতি ঘটল এখানেই। ১৯৪৮ সালের ২৫ মার্চ নতুন কমিটি গঠিত হল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হল। কিন্তু তখনও বিদ্যালয়ের নাম পাল্টায় নি। নাম পরিবর্তনের জন্য পরিচালন সমিতি মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের দ্বারস্থ হলেন। অবশেষে ১৯৪৯ সালের ১৯ জানুয়ারি বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া গেল। মহারাজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ১লা মে ১৯৪৯ পরিচলন সমিতি সিদ্ধান্ত নিল- 'Resolved that the Committee of Management of the school express their most heartful thanks and their deep sense of gratitude to H.H. Maharaja Bhup Bahadur for the favour of H.H's graciously granting the prayer of the Committee to associate the name of the great and illustrious Ruler of the State His Highness Late Maharaja Sir Nripendra Narayan Bhup Bahadur of revered memory.` এর পাশাপাশি বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ৬০০ টাকার মিষ্টি বরাদ্দ হয়েছিল ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হল এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় ১৯৫০ সালের ৬ জানুইয়ারি 'মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়'  নাম অনুমোদন করে পাঠালেন। বর্তমানে অবশ্য `ইংরেজি' শব্দটি বাদ পড়েছে। 

ইতিহাসের বহু কিছুর নীরব সাক্ষী  কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়। নতুন নাম নিয়ে অতীতের সুইডিশ মিশন স্কুল আজ  খাতায় কলমে একশ বছরের কাছে দাঁড়িয়ে, যদিও মনে করা হয় বিদ্যালয়ের বয়স আরও বেশি। আজ ভাবা কঠিন যে, এই বিদ্যালয়ে এক সময়ে  খ্রীষ্টান ছাড়া প্রধানশিক্ষক নিযুক্ত হতেন না অথবা বাইবেল পড়া বাধ্যতামূলক ছিল।  সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডঃ শঙ্কর ভট্টাচার্য, সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল জগদীশ সরকার, মোহনবাগানের প্রাক্তন খেলোয়াড় শৈবাল ঘোষ প্রমুখেরা কৃতি ছাত্র। কোচবিহার জেলার প্রখ্যাত শিক্ষকেরা এই বিদ্যালয়ে একসময় শিক্ষকতা করেছেন। অতীত গৌরব ধরে রেখে আজও বিদ্যালয় সুনামের সঙ্গে জেলায় শিক্ষার আলো দিয়ে চলেছে।

ছবি- ১৫ অগাস্ট, ১৯৪৭ স্বাধীনতা দিবস উদযাপন 

(প্রকাশিত: বকলম পূজা সংখ্যা ২০২১/ সম্পাদক: সঞ্জয় কুমার নাগ
 সংকলিত: চেনা উত্তর অচেনা উত্তর/ গাঙচিল)