Tuesday, August 9, 2022

 মায়েরা-কাকীমায়েরা

        শৌভিক রায়

বাড়ির সামনে টাউন ক্লাবের বিরাট মাঠ। আর সেই মাঠের ধারে, কোলবালিশে রাখা হাতে ভর দিয়ে, শীতলপাটিতে আধা-শোওয়া হয়ে, ফুটবল খেলা দেখছেন গাজিকাকু। ভাল নাম একটা ছিল গাজিকাকুর। কিন্তু সে নাম বললে অধিকাংশ মানুষই তাঁকে চিনতেন না। এই ব্যাপারটি বোধহয় তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র, আমার বাল্যবন্ধু পুটন, উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছে। ওর যে একটা ভাল নাম আছে, সে কথা ভুলে যান প্রায় সবাই! পিতার মতোই পুত্রও ডাকনামে বেশি পরিচিত। সে কথা অবশ্য আলাদা। 
গাজিকাকুর ফুটবল বিলাসিতার এই পর্ব কিন্তু হঠাৎ হয়েছে এরকমটি নয়। বয়সকালে নিজে ভাল খেলতেন। চর্চা করতেন নাটকের। সে আমলে ফালাকাটা নাট্যমঞ্চ যাঁরা মাতিয়ে রাখতেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। শ্রদ্ধেয় পাখি ঘোষের স্ত্রী অভিনেত্রী হিসেবে মঞ্চে নামবার আগে, ফালাকাটা নাট্য মঞ্চে যে সমস্ত নট, মহিলা সেজে অভিনয় করতেন, তাঁদের একজন ছিলেন এই গাজিকাকু। 

পাখিকাকু বিয়ে করেছিলেন স্ত্রী-কে মঞ্চে অভিনয় করতে হবে এই পণ চেয়ে। কী বৈপ্লবিক ভাবনা ষাটের দশকের সেই সময়! ভাবতেই গা কাঁটা দেয়। এক এক সময় ভাবি যে, আমরা পুরুষরা যদি কনে পক্ষের কাছে এই জাতীয় পণ চাইতাম তবে দুর্দান্ত হত। যেমন ধরা যাক, নতুন বউটিকে পড়া চালিয়ে যেতে হবে বা গান বন্ধ করা চলবে না বা নিয়মিত নাচের চর্চা জারি রাখতে হবে বা বিদেশে গিয়ে পি এইচ ডি-টা শেষ করতে হবে বা বিউটিশিয়ান কোর্সটা কাজে লাগাতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি! মনে হয় অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত, মনে হয় অনেক স্বপ্ন পূরণ হত! 

থাক এসব কথা। বলছিলাম যে, গাজিকাকুকে আমরা একটু ভয় পেতাম। আবার গাজিকাকুকে দেখেছি নিজের মা'কে ভয় পেতে! ঠাকুমা ছিলেন জাঁদরেল মহিলা। ব্রিটিশ আমলে জন্ম আর কম বয়সে স্বামীকে হারিয়েছিলেন বলেই বোধহয় ভয়ডর ব্যাপারটা কম ছিল। দাপটের সঙ্গে সব সামলাতেন। গাজিকাকুর পরের ভাই মন্টুকাকু আর ছোটভাই দিলীপকাকুও ঠাকুমাকে রীতিমত সমঝে চলতেন। তবে ঠাকুমার সঙ্গে ভাব ছিল নাতি-নাতনীদের। ওই একটি জায়গায় ঠাকুমা কাত। আর সেই ভাব শুধু নিজের নাতি-নাতনীদের সঙ্গেই নয়, তাদের বন্ধুদের সঙ্গেও ছিল বলে, আমরাও ছিলাম ঠাকুমার চিল্লার পার্টি বন্ধুবান্ধব।

গাজিকাকু, ঠাকুমা, অন্য ভাইরা, নাতি-নাতনী, টাউন ক্লাবের মাঠ, ফুটবল ইত্যাদি সবকিছুর মধ্যে সকলের অলক্ষ্যে যিনি ছিলেন তিনি হলেন কাকীমা। একটা বিরাট যৌথ পরিবারের সব দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। কাকীমার উপস্থিতি টের পাওয়া যেত না কোনোদিন, অথচ গাজিকাকুর জন্য শীতলপাটি বিছিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ওই বিরাট পরিবারের সব কাজ একা হাতে সামলেছেন কী অবলীলায়! আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমাদের পরিবারের বধূরা সত্যি কোনও মর্যাদা পান না। কিন্তু সংসারে তাদের অবদান যে কী অপরিমেয় সেটা ভাবাই যায় না! সকালে রুটি তৈরি আর ভাত ডাল করা দিয়ে শুরু হত কাকীমার কাজ। এ আসছে এখন, ও আসছে তখন। মন্টুকাকু ভাত খাচ্ছেন তো দিলিপকাকু রুটি-গুড়। ছোট বোন ডলি পলিকে সামলাতে না পেরে বেবিদি মায়ের জিম্মায় দিয়ে দিচ্ছে তাদের, তো পুটন হাজির বন্ধু শৌভিককে নিয়ে বেগুন ভাজা দিয়ে ঘি ভাত খেতে। মিঠুদা ততক্ষণে বই খুঁজে পাচ্ছে না বলে চিৎকার করছে, বুলা জানতে চাইছে ধুতিতে নীল দেবে কিনা! ঠাকুমা গাজিকাকুকে ধমকে ঘুম থেকে উঠিয়ে চায়ের কাপ নিয়ে বসেছেন। গাজিকাকু আবার টাওয়েল নিয়ে বাইরের ট্যাপকলে যাবেন, তাঁকে বালতি দিতে হচ্ছে! 

এভাবেই কখন সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যেত বোঝাও যেত না। এর মধ্যেই কোনোদিন আবার থাকত কাসুন্দি তৈরি বা বড়ি দেওয়ার ব্যাপার। নিজের স্নান খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিতে না নিতে বিকেলের চা-পর্ব। তারপর তো রাতের রান্না রয়েইছে! গ্যাসের উনুন আর তখন কোথায়, হয় কয়লা বা খড়ি। গালভরা 'ডোমেস্টিক হেল্পার' বেশির ভাগ বাড়িতেই থাকত না। বাসন মাজা, কাপড় কাচার ঝক্কিটাও সামলাতে হত। এর সঙ্গে থাকত সারা মাস সংসার চালানোর অর্থনৈতিক দায়িত্ব। কাকু তো টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়েই খালাস। সারা মাস ওই টাউন ক্লাবের ফুটবলের মতোই সংসারের ফুটবলে টাকা নামের বলটা নিয়ে কখনও ডজ করে, কখনও হৈ হৈ করে বিপক্ষের গোলের কাছে গিয়ে, কখনও নিচে নেমে ডিফেন্সিভ খেলে, কখনও গোল বাঁচিয়ে চলতে হত! অনেকটা পরে বাড়িতে আরও দুই বউ এলে কাকীমা খানিকটা চাপ মুক্ত হলেও, যৌথ পরিবারকে ধরে রাখবার সূক্ষ খেলাটি কিন্তু দুর্দান্তভাবে জিতে গেছেন! নিজে যৌথ পরিবারে বড় হয়ে, সেই পরিবারকে টুকরো টুকরো হতে দেখেছি বলেই জানি যে, এই ধরে রাখা কাজটি কতটা দুরূহ। কাকীমা সেই কাজটি কী অনায়াসে করে গেলেন এতগুলি বছর! 

কাকীমার দুই প্রতিবেশী আরও দুই কাকীমা, প্রণব ও বাপির মায়েরা, কিন্তু ঠিক একইরকম। সংসারের অভাব অনটন হাসিমুখে সহ্য করে গেছেন দিনের পর দিন। নিজেদের সব ইচ্ছে বুকের কোন গভীরে চাপা রেখে, দশভূজা হয়ে সামলেছেন সব! নিদারুণ যত্নে স্বামী সন্তানদের রেখেছেন! নিজেদের কোনও ইচ্ছে মুখ ফুটে বলেনও নি কোনোদিন। দিয়েই গেছেন শুধু। চোখে ভাসে, মাটির ছোট্ট রান্নাঘরে গনগনে উনুনের আঁচে লাল হয়ে যাওয়া ফর্সা মুখে বড় করে সিঁদুর দেওয়া প্রণবের মা হাসি মুখে ভাত বেড়ে দিচ্ছেন শৌভিক আর প্রণবকে। মনে পড়ে বেঁটেখাটো চেহারার সৌম্য মুখের বাপির মা জোর করে খেতে বসিয়েছেন শৌভিককে। শৌভিকের মা কাছে থাকেন না বলে, এই তিন কাকীমার কাছে শৌভিকের দায়িত্ব আগে, পরে নিজের সন্তানদের। 

এক কাকীমা (প্রণবের মা) চলে গেছেন বহু আগে। আর এক কাকীমাও (বাপির মা) গেছেন কিছুদিন হল। আজ চলে গেলেন পুটনের মা। অতীত ফালাকাটার চার মূর্তি শৌভিক-প্রণব-পুটন-বাপি সকলেই আজ মা হারা। এই চার মূর্তিকে ঘিরে থাকা শৈবাল, ঋত্বিক, কমল, জয়ন্ত ও আরও অনেকের জীবন থেকে মা কাকীমা ডাকগুলি হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। বাপি ও পুটনকে সুপ্রতিষ্ঠিত দেখে গেলেন দুজনেই।  প্রণব আজ সে জায়গায় পৌঁছলেও, কাকীমা সেটা দেখে যেতে পারেন নি। ঋত্বিক, শৈবাল, জয়ন্তর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। কমল অবশ্য প্রথম থেকেই অন্যভাবে প্রতিষ্ঠিত।

চার বন্ধু আবার একসঙ্গে হব অচিরেই কোনও এক মুজনাইয়ের তীরে। থাকবে আমাদের আরও বন্ধুরা। মায়েদের, কাকীমায়েদের কথায় স্মরণ করব তাঁদের। জল বয়ে যাবে সেসব কথা নিয়ে। নির্বাক নদী শোনাবে সেই কথা তার তীরে থাকা সব সন্তানদের। আসলে মায়েদের গল্প তো সব দেশে, সব কালে এক! কোনও পরিবর্তন হয় না তাতে। 

মা চলে যান, মা বেঁচে থাকেন। 
মায়েরা চলে যান, মায়েরা বেঁচে থাকেন।

আমাদের তর্পণ তাই মা'কে ঘিরেই... 

No comments: