হৃষিকেশের নতুন ঠিকানা চৌরাশি কুঠিয়া
শৌভিক রায়
হৃষিকেশ শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গাড়োয়াল হিমালয়ের পাহাড়ঘেরা অসাধারণ নৈসর্গিক দৃশ্যের এক জনপদ। হিমালয় পরিক্রমা শেষে গঙ্গা এখানেই সমতল স্পর্শ করেছে। অত্যন্ত প্রাচীন এই জনপদটির কথা পুরান-সহ বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ পাওয়া যায়। বলা হয় যে, এখানেই স্বয়ং বিষ্ণু বৈভ্যকে দর্শন দেন। রাবণ-বধের প্রায়শ্চিত্ত করতে ভাই লক্ষ্মণকে নিয়ে রামচন্দ্র এসেছিলেন এখানে। আবার এটাও কথিত যে, মহাভারতের বিদুর এখানে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
হৃষিকেশের ত্রিবেণী ঘাট থেকে শুরু করে আরও অজস্র ঘাটে সন্ধ্যাবেলার গঙ্গা আরতিও চমকপ্রদ। লক্ষ্মণঝুলা ও রামঝুলা (শিবানন্দ ঝুলে) হৃষিকেশের দুই প্রবল বিস্ময়। ঝুলন্ত এই দুই সেতু থেকে গঙ্গা ও হিমালয় দর্শন অন্য মাত্রা এনে দেয়। এবাদেও কৈলাশানন্দ মিশন আশ্রম, কালীকমলির সমাধি মন্দির, গীতা ভবন, স্বর্গাশ্রমের পাশাপাশি ১২কিমি দূরের নীলকণ্ঠ শিব মন্দিরটিও হৃষিকেশ দর্শনের অন্যতম। সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রসিদ্ধ চটিওয়ালার হোটেল। রয়েছে রাম মন্দিরের পাশাপাশি ভারতের একমাত্র লক্ষ্মণ মন্দিরও।
যোগ সাধনার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র বলে পরিচিত বহুবার দেখা হৃষিকেশে এবারের যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা।হৃষিকেশ হল পৃথিবীবিখ্যাত বিটলসদের একমাত্র ভারত-সংযোগ। ১৯৬৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি 'ফ্যাবুলাস ফোর`-এর ভারতে আগমন হয়েছিল হৃষিকেশের জন্যই। তাঁদের ভারতে আসবার অর্ধ-শতক পরে পর্যটন মানচিত্রে আবার নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে হৃষিকেশের রাজাজী টাইগার রিজার্ভের ভেতর থাকা মহেশ যোগীর যোগসাধনা কেন্দ্র চৌরাশি কুঠিয়া বা বিটলস আশ্রম। পরিত্যক্ত সেই আশ্রমের টানে সারা ভারত থেকে পর্যটকেরা ভিড় জমাচ্ছেন হৃষিকেশে।
১৯৬১ সালে মহেশ যোগী তদানীন্তন উত্তরপ্রদেশ সরকারের বনদপ্তরের কাছ থেকে ১৫ একর জমি লিজ নিয়ে এই আশ্রমটি তৈরী করেছিলেন। এর আগে ১৯৬৭ সালে ওয়েলসে মহেশ যোগীর 'ট্রান্সেন্ডেন্টাল মেডিটেশন`নিয়ে একটি সেমিনার বিটলসকে আকৃষ্ট করে, যদিও তাঁদের ম্যানেজার ব্রায়ান এপস্টাইনের মৃত্যুর জন্য তাঁরা সেই সেমিনার সম্পূর্ণ করতে পারেন নি। কিন্তু মহেশ যোগীর দর্শন তাঁদের আকৃষ্ট করেছিল এবং অধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে তাঁরা একসময় চলে আসেন হৃষিকেশে। তাঁদের প্রসিদ্ধি সেসময় এতটাই ছিল যে, হৃষিকেশও অচিরেই আন্তর্জাতিক প্রসিদ্ধি পেয়ে যায়। মহেশ যোগীর আশ্রমে বসে তাঁরা রচনা করেছিলেন মোট আটচল্লিশটি গান। তাঁদের আশ্রম জীবন বেশিদিন না হলেও, মূলত তাঁদের জন্যই হৃষিকেশে আজও বিদেশিদের ঢল নামে। ১৯৮১ সালে লিজ আর না বাড়িয়ে মহেশ যোগী আশ্রম ত্যাগ করেন। ধীরে ধীরে হিমালয়ের গহন অরণ্য ঢেকে নেয় আশ্রমটিকে। ২০১৫ সালে রাজাজী টাইগার রিজার্ভের উদ্যোগে আবার খুলে দেওয়া হয় চৌরাশি কুঠিয়া, যা লোকমুখে বিটলস আশ্রম নামে পরিচিত। স্বর্গাশ্রম বা রামঝোলা থেকে ট্রেকার ভাড়া করে যেমন অরণ্যের মাঝ দিয়েও পৌঁছানো যায় কিমি খানেক দূরের আশ্রমে, তেমনি গঙ্গার তীর ধরে পায়ে হেঁটেও যাওয়া যায়। রহস্যময় সেই আশ্রমটির অমোঘ টান উপেক্ষা করতে না পেরে সম্প্রতি পৌঁছে গেছিলাম ঋষিকেশে।
মাথাপিছু ১৫০টাকার প্রবেশমূল্যে চৌরাশি কুঠিয়ার ভেতর প্রবেশ মাত্রেই মন প্রশান্ত হয়ে উঠল। হিমালয়ের নির্জনে কানে ভেসে আসল পাহাড়ের নিচ দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গার জল-সংগীত। খানিকটা চড়াই উঠে আরণ্যক পরিবেশে প্রথমেই নজরে আসে গুহার আকারে সাজানো অজস্র 'মেডিটেশন হাট' বা একক ধ্যানের কুঠুরিগুলি। পাথরে নির্মিত ভাঙাচোরা কুঠুরিগুলি দেখে সহজেই বোঝা যায় যে, ধ্যান ও যোগ-সাধনার জন্য তৈরী করা হয়েছিল সেগুলি। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে কুঠুরির ছাদেও ওঠা যায়। চারদিকের শান্ত পরিবেশে শোনা যায় বিভিন্ন পাখির ডাক আর আগের তুলনায় একটু ক্ষীণ হলেও গঙ্গার বয়ে চলার অবিরাম শব্দে পাওয়া যায় প্রাণের স্পন্দন। কুঠুরিগুলি পেছনে রেখে একটু এগোলেই বাঁ-হাতে রয়েছে পোস্ট অফিসটি, যেখান থেকে বিটলসের সদস্যরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা তাদের বন্ধুদের চিঠি লিখতেন। শঙ্করাচার্যনগরের সিল দেওয়া সেই চিঠির অনেকগুলি নিলামে উঠেছে বেশ কয়েকবার। পোস্ট অফিসের উল্টোদিকে উন্মুক্ত মাঠের একধারে রাজাজী টাইগার রিজার্ভ ও মহর্ষি ফাউন্ডেশন তৈরী করেছে ফোটো গ্যালারি। এই কাজে তাদের সাহায্য করেছেন দুবার এম্মি পুরস্কার বিজেতা ভুবনবিখ্যাত চিত্রনির্মাতা পল সালজমান। গ্যালারিটি বিটলস-সহ আরও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের দুষ্প্রাপ্য ছবিতে সমৃদ্ধ। তাছাড়াও রয়েছে রাজাজী টাইগার রিজার্ভের বিভিন্ন জীবজন্তু ও পাখিদের অসাধারণ বহু ছবি। ফোটো গ্যালারি, ক্যাফেটেরিয়া থেকে সামনের দিকে এগোলে পথের দু`ধারে রয়েছে আশ্রমের রান্নাঘর, প্রেস, হল ও মহর্ষির নিজের ঘর। সবগুলিই ভাঙাচোরা। বোঝাই যায় যে, সময়ের গ্রাসে তাদের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। কিন্তু প্রতিটি ঘর বিভিন্ন সময় অসামান্য দেওয়াল-ছবি ও গ্রাফিটিতে সাজিয়ে দিয়েছেন আশ্রমে আগত বিভিন্ন শিল্পীরা। এমনিতে দেওয়ালে ছবি বা গ্রাফিটি আঁকা নিষিদ্ধ হলেও, চৌরাশি কুঠিতে আসা শিল্পীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে তাদের প্রতিভা বিকাশের জন্য। পরিত্যক্ত এই ঘরগুলির দেওয়াল-ছবি ও গ্রাফিটিতে শুধু বিটলসরা নন, আছেন রবিশঙ্করও। এবাদেও ভারতীয় রমণী, সাধু, চক্র ইত্যাদির ছবি ও অজস্র স্লোগান-ধর্মী লেখা দেখে স্তব্ধ হতে হয়। আশ্রমের মাঝের আনন্দ ও সিদ্ধি ভবনটি ১৯৭৬ সালে তৈরী হয়েছিল। সুন্দর স্থাপত্যের এই ভবনটির ছাদেও ওঠা যায়। এখানেও রয়েছে সুন্দর কিছু ছবি ও গ্রাফিটি। আনন্দ ও সিদ্ধি ভবনের পাশে যোগ মন্দির। আর আশ্রমের একদম শেষে রয়েছে মহর্ষি ধ্যান বিদ্যাপীঠ। ষাটের দশকের প্রথম দিকে সালে নির্মিত এই কমপ্লেক্সটি সতপুরী নামেও পরিচিত। এখানেই থেকে গেছেন বিটলসরা। বিখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকায় শুধু তাঁরাই নন, রয়েছেন ডোনোভান, মাইক লাভ ও ফারো বোনেরা। আজকের খণ্ডহর ও চারদিকের প্রবল নিস্তব্ধতা দেখলে অবশ্য বিশ্বাস করা কঠিন যে, এখানেই ড্রাম বাজিয়ে ঝড় তুলতেন রিংগো স্টার বা সুরেলা গলায় গাইতেন লেনন। এই অঞ্চলটি আশ্রমের একদম শেষপ্রান্তে। পাহাড়ের খানিকটা ওপরে হওয়ায় বন্যপ্রাণীরা রাতেরবেলায় অনেকসময় এখানে চলেও আসে।
বিটলস ভক্তদের কাছে তো বটেই, বহু মানুষের কাছে চৌরাশি কুঠি তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। সত্যি বলতে, যে যোগ সাধনা কেন্দ্রটি হৃষিকেশকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও পরিচিতি এনে দিয়েছে, সেটি দর্শন না করলে হৃষিকেশ দেখা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। বিটলস মানসিক শান্তি পেয়েছিলেন কিনা জানিনা, কিন্তু তাঁদের বেশ কিছু বিখ্যাত গান এই আশ্রমবাসের পরেই সৃষ্ট হয়। আজকের চৌরাশি কুঠি সেই স্মৃতিকে মনে করায়।
ফিরতি পথে মনে হয় যে, রাজাজী টাইগার রিজার্ভের বিটলস আশ্রমে আজও যেন কোনো এক লেনন কাঁটাতারহীন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে চলেছেন। বলে চলেছেন এক শান্ত, সুন্দর, ভয়হীন পৃথিবীর কথা যেখানে শুধু মানবতার জয়গান গাওয়া হয়, বলা হয় প্রেমের কথা।
জেনে নিন- হাওড়া থেকে দুন এক্সপ্রেস এবং উপাসনা এক্সপ্রেস (সপ্তাহে দু`দিন) যাচ্ছে হৃষিকেশ। বিমানে গেলে দেরাদুন পৌঁছে বাস বা গাড়িতে যেতে হবে হৃষিকেশ। এখানে থাকার জন্য রয়েছে বিভিন্ন মানের অজস্র হোটেল ও ধর্মশালা।
ছবি- লেখক ও ঋতভাষ রায়
(প্রকাশিত- রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ)


No comments:
Post a Comment