স্বাধীনতা দিনে
শৌভিক রায়
বিজন সেতু পার করে গড়িয়াহাটের দিকে সামান্য এগোতেই বা-হাতে ফার্ন প্লেসের রাস্তা। মিটার এক-দেড়শো পরেই মোটামুটি সমান্তরাল রয়েছে ফার্ন রোড। আর ফার্ন রোডের মুখে, উল্টোদিকে, ফার্ন হোটেল। সেই আদ্যিকালের টেবিল চেয়ার নিয়ে এখনও লড়ে যাচ্ছে এককালের ঝকঝকে হোটেলটি। নোনা ধরা দেওয়ালে ঝুলছে উত্তমকুমারের ছবি। খেতে এসেছিলেন কবে যেন। আছেন বিখ্যাত আরও কয়েকজন পাশাপাশি।
ফার্ন প্লেসের বা ফার্ন রোডের রাস্তায় ঢুকলেই বাবার কথা মনে পড়ে বড্ড। বাবা যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন দক্ষিণ কলকাতা গোলপার্ক পার করেই শেষ। সাউথ এন্ড পার্ক নামের রাস্তা সেই স্মৃতি বহন করছে আজও। ইউনিভার্সিটির পর সুলেখা, বাঘা যতীন, নাকতলা ইত্যাদি নেহাতই গ্রাম। খানপুর ঢাল, নেতাজি নগর, গড়িয়া, নরেন্দ্রপুর, রাজপুর ইত্যাদি অঞ্চলেও জনবিস্ফোরণ আর নগরায়নের এই দশা হবে সেটা বুঝলে বাবা বোধহয় সন্তোষপুরে জমি কিনতেন।
ফার্ন প্লেস ধরে কাকুলিয়া রোড হয়ে সামান্য এগোলেই গোলপার্ক। সরু সরু গলি আর দু'ধারে পুরোনো দিনের বাড়ির এই এলাকাটা আমার সবসময়ই বড্ড প্রিয়। এখনও এখানে কয়লার উনুনে চা ঘন হয় ক্রমাগত। পাওয়া যায় লিট্টি আর চোখা। সাবেক আমলের বাড়ির রকে যুগের তালে তাল মিলিয়ে বারমুডা পরা মাঝ বয়স্করা জমিয়ে আড্ডা দেন। গোলপার্কের কাছে আমিনিয়ার সামনে পাওয়া যায় বিরিয়ানির সুবাস।
আজ সাদার্ন এভিনিউতে গাড়ির সারি। সুবেশ নর-নারীরা ভিড় করেছেন লেকে। হরিপদ চক্রবর্তী উদ্যানের উল্টোদিকের লেক কালীবাড়ি অবশ্য তুলনায় অনেকটা হালকা।
ছায়াবীথি এই পথ ধরে হেঁটে হেঁটে শরৎ বোস রোডে ঢুকে, ডানদিকে এগিয়ে, খানিক বিশ্রাম মহারাজা টি স্টলে। সামনেই অবশ্য মহারানিও আছেন। দুই জায়গাতেই ভিড় মোটামুটি সমান।
শেষটায় লেক মল পার করে কালীঘাট। কারণ কিছুই নেই। বাবা হেঁটে বেড়াতেন এইসব পথে। স্বাধীনতার দিনে। আমার উদ্বাস্তু সেই বাবা কেন হাঁটতেন? তাঁর কি মনে পড়ত ময়মনসিংহের জামালপুরের কথা? মোটামুটি স্বচ্ছল একটি পরিবারের হঠাৎ পথে নেমে আসা তাঁকে কি তাড়িয়ে বেড়াত সেই স্বাধীনতা দিনে?
কালীঘাট মন্দিরেও ভিড় নেই তেমন। দু'তিনজন পান্ডা অবশ্য তাও চেষ্টা করলেন নিজেদের মতো। নিরাশ করতে হল তাদের। শ্রাবণের শেষ সোমবারে আজও ডিজের দাপট দেখিয়ে চলে গেল মহাদেবের ভক্ত কিছু মানুষ। মাদারের নির্মল হাউসের সামনে চেনা ছবি সব দিনের মতোই।
বৃত্ত শেষ করলাম এখানেই। পরিক্রমা তো শুরু হয়েছে সেই কবে থেকে! পঁচাত্তর পেরিয়েও চলছে তা। চলবে আরও কত পঁচাত্তর কে জানে!
বাবারা রয়ে যান আসলে। দিয়ে যান কিছু উত্তরাধিকার। বহন করি সেসব আমরাই। নিজেদের মতো....স্বাধীনতা বোধহয় এটাই... এটুকুই....
ছবি- কালীঘাটের এক বাড়ি

No comments:
Post a Comment