রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ।।
শৌভিক রায়
যে কোন ব্যক্তির মহান হয়ে ওঠার পেছনে বেশ কিছু কার্যকারণ শর্ত থাকে। একথা ঠিক নিজস্ব প্রতিভা না থাকলে কারো পক্ষেই খুব বেশী দূর এগোনো সম্ভব নয়। মধ্যমেধার কদর সমকালে নানা কারণে আদৃত হলেও কালের বিচারে কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় সত্যিকার প্রতিভাবান। ইতিহাস তা-ই দেখিয়েছে বারেবারে।
প্রতিভা যদি ব্যক্তির মহান হয়ে ওঠার পেছনে সবচাইতে বড় কারণ হয় তবে পারিবারিক শিক্ষা ও পারিপার্শ্বিকের প্রভাবটিও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। একথা স্মরণে রেখে তাই বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বকবি তথা পরম মানবতাবাদী হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল বিরাট। হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষরিক অর্থেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়ে উঠতে পারতেন না যদি না দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে লালন করতেন।
প্রথম যৌবনে অমিতব্যয়ী, প্রভূত বিত্তের মালিক প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের শৌখিন পুত্রটির কর্মকান্ড জানলে ভাবতে কেমন অবাক লাগে যে ইনিই একদিন হয়ে উঠছেন মহর্ষি। কিন্তু সংসারত্যাগী জটাজুটধারী নন। রয়েছেন সংসারে। কিন্তু সংসারে থেকেও সংসার-ধর্ম সম্পর্কে কেমন যেন উদাসীন। বলছি উদাসীন ঠিকই, কিন্তু একথা মনে রাখতে হবে সংসারের রাশ একফোঁটা আলগা করেন নি তিনি শেষদিন পর্যন্ত। রাশভারী অথচ স্নেহ-মমতায় ভরপুর ছিল তাঁর হৃদয়। নারীশিক্ষা প্রসারে যেমন তাঁর অবদান অনস্বীকার্য তেমনি নিজের বাড়ির মেয়েদের সবসময় শাড়ি পরিধানের অসুবিধে সম্যক উপলব্ধি করে মহর্ষি বানিয়ে দিয়েছিলেন, নিজের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে, নতুন ধরণের পোষাক। এককোটি টাকার দেনা মাথায় নিয়ে (প্রিন্স দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর) প্রায় কপর্দকশূন্য হয়েছিলেন বলেই বোধহয় জানতেন অর্থের মূল্য। তাই সেভাবেই গড়ে তুলেছিলেন তাঁর সন্তানদের। পাশাপাশি তাঁর একেশ্বরবাদী ভাবনা সংক্রামিত হয়েছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তান রত্নটির মধ্যে। সংক্রামিত হয়েছিল তাঁর ভ্রমণ স্পৃহা। আর একটা দিক না উল্লেখ করলেই নয়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্তের কথা মাথায় রেখেও নির্দ্বিধায় একথা বলা যায় যে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের গদ্যপ্রয়াসের সার্থক উত্তরসূরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ যিনি নিজস্ব প্রতিভাবলে সেই গদ্যকে কয়েক যোজন এগিয়ে দিয়েছিলেন।
কনিষ্ঠ পুত্রটির ওপর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ভালবাসা একটু বেশীই ছিল। হতে পারে রবীন্দ্রনাথ কনিষ্ঠ বলে, হতে পারে তাঁর অনেক বয়সের সন্তান বলে। কনিষ্ঠ পুত্রের গান শুনে তিনি সে আমলে পাঁচশো টাকা পুরষ্কার দিতে দেরী করেন নি। কেননা তাঁর মনে হয়েছিল 'দেশের রাজা যদি দেশের ভাষা জানিত ও সাহিত্যের কদর বুঝিত, তবে কবিকে তো তাহারা পুরষ্কার দিত'। কিন্তু তা যখন হওয়ার নয়, তখন সেই কাজটি করেছিলেন তিনি। এই পুরষ্কার প্রদান সেদিন বালক রবীন্দ্রনাথের মনে কি অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল তা জানা না গেলেও একথা অনুমান করতে বেগ পেতে হয় না যে সেই পুরষ্কার বালক রবীন্দ্রনাথের মনে যে প্রত্যয় সৃষ্টি করতে পেরেছিল তা তাঁর পরবর্তী জীবন গঠনে সহায়ক হয়ে ওঠে। বালকের নিতান্ত খেয়াল থেকে শান্তিনিকেতনের প্রান্তর থেকে রবীন্দ্রনাথের নিয়ে আসা পাথরগুলি দেখে তাঁকে নিরুৎসাহিত না করে মহর্ষি বরং ইন্ধন দিয়েছিলেন এবং শান্তিনিকেতনের একটি অংশকে সাজিয়ে দিতে বলেছিলেন সেই পাথর দিয়েই ( 'ওই পাথর দিয়া আমার এই পাহাড়টা সাজাইয়া দাও')। সামান্য কথা কিন্তু কি গভীর। বিশ্বপ্রকৃতিতে কোনো কিছুই ফেলনা নয়। আর সেই আপাত গুরুত্বহীন পদার্থও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তা দিয়েও যে করা যেতে পারে কিছু- এই বোধের উন্মেষ ঘটানো মহর্ষির পক্ষেই সম্ভব ছিল। নিজে হাতে রবীন্দ্রনাথকে চিনিয়েছিলেন তিনি বিশ্বপ্রকৃতি। হিমালয় ভ্রমণে বালক রবিকে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শিখিয়েছিলেন প্রকৃতির প্রথম পাঠ। আবার রাতের আকাশে নক্ষত্র চিনিয়ে দিয়ে পুত্রকে দিয়েছিলেন রহস্যময় বিশ্বের সন্ধান, উসকে দিয়েছিলেন সনাতনী ভাবনা 'আমি চঞ্চল হে, সুদূরের পিয়াসী'। কোনো পিতা যদি এভাবে পুত্রের ফ্রেন্ড, ফিলোজফার, গাইড হয়ে ওঠেন তবে সাধ্য কি সেই পুত্রের আত্মিক উন্নয়নকে আটকাবার!
রবীন্দ্রনাথেরও হয়েছিল সেই উন্নয়ন। পুত্রকে সাবলম্বী হতে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা দেখি মহর্ষির বিবিধ কর্মকান্ডে। গোটা পরিবার যখন রবীন্দ্রনাথের গরুর গাড়ি চেপে গ্রান্ড ট্যাঙ্ক রোড ধরে পেশোয়ার পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রার বিরুদ্ধে, একমাত্র দেবেন্দ্রনাথ তাঁর স্বপক্ষে। না, এটা কোন স্নেহ থেকে নয়, বরং তাঁর এই সমর্থনের কারণ ছিল পুত্র যাতে দুনিয়াদারি চিনতে পারেন, বুঝতে পারেন ঠাকুরবাড়ির বিলাসবহুল জীবনের উল্টোদিকে অত্যন্ত কঠিন একটি জগৎ আছে। নিজে পিতার ঋণ শোধ করেছিলেন, শুনেছিলেন পাওনাদারদের গঞ্জনা, জেনেছিলেন অর্থ থাকলেই হয় না, অর্থকে ধরে রাখতে হয়। তাই বোধহয় চাননি কোন অবস্থাতেই তাঁর সন্তানেরা তাঁর মতো সমস্যার সম্মুখীন হ'ক। তাই হাতে ধরে রবীন্দ্রনাথকে জমিদারীর আয়ব্যয় শিখিয়েছিলেন। বারবার পাঠিয়েছিলেন শিলাইদহে। ভাগ্যিস পাঠিয়েছিলেন। তা না হলে পদ্মাবক্ষে বসে সৃষ্ট সেই মণিমানিক্যগুলো কি পেতাম আমরা?
তবে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোধহয় মানবপ্রেম। রামমোহনের ভাবশিষ্য, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান স্কুলে পড়াশোনা করা মহর্ষি সবসময়ই একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করে এসেছেন। হিন্দু-মুসলিম-পারসি সকলে মিলে তাঁরা তৈরী করেছিলেন সর্বতত্ত্ব দীপিকা সভা। উপনিষদের অমোঘ বাণী 'যা দিয়েছেন ঈশ্বর তোমাকে তাতে সন্তুষ্ট থাকো, ভালবাসো নিজেকে, চেন নিজেকে, জানো নিজেকে....নিজেকে জানলেই মানুষকে জানা, নিজেকে চিনলেই মানুষকে চেনা' মহর্ষি সঞ্জাত করতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথের মধ্যে। ব্যক্তিগত শোকেও স্থিতধী থাকতে শিখিয়েছিলেন নিজের স্ত্রী-কে শেষযাত্রায় নিজের হাতে সাজিয়ে দিয়ে। ব্যক্তিমানুষ আসবে, যাবে। কিন্তু থাকবে মানবপ্রবাহ। যে প্রবাহের এক ক্ষুদ্র অংশ হলেও সাযুজ্যবোধে, একাত্মতায় যোগসাধন ব্যক্তিসত্ত্বার সাথে বিরাট মানবসত্ত্বার। তাই মানবপ্রেম শ্রেষ্ঠ প্রেম। এর বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। সারাজীবন রবীন্দ্রনাথ সেই মানবতার সন্ধান করে গেছেন। বলে গেছেন শ্রেষ্ঠ প্রেম হল মানবপ্রেম। নিজের ব্যক্তিগত বেদনাকে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছেন অনেক ক্ষেত্রেই। পিতার মৃত্যুশোকের মধ্যেও বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের শরিক হয়েছেন। মনে রাখতে হবে 1905 সালে মহর্ষি প্রয়াত হন। নিজের সন্তানের মৃত্যুশোকও রবীন্দ্রনাথ বুঝতে দেন নি দর্শনপ্রার্থীদের। দেবেন্দ্রনাথ যদি এই শিক্ষা না দিতেন হয়তো রবীন্দ্রনাথ পারতেন না। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ পেরেছিলেন নিজের মতো করে তাঁর এই সন্তানটিকে গড়ে তুলতে। তাঁর স্বপ্নের শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই হয়ে উঠেছিল বিশ্ব মানবতা ও বিশ্ব প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ স্থান।
পিতা-পুত্রের এই সম্পর্ক আজকে বিরল। আজ যখন ধর্মভেদে, বর্ণভেদে মানুষকে বিচার করা হয়, নারীর সম্ভ্রম লুঠ করা হয়, দাগিয়ে দেওয়া হয় মানবতাকে তখন বারবার মনে পড়ে মহর্ষির কথা। আজকের এই বহুধাবিভক্ত ভারতে 'জাতের নামে বজ্জাতি'র দুঃসময়ে মহর্ষির একেশ্বরবাদ কি কাম্য নয়? কাম্য নয় কি সংসারে থেকেও পরম নিরাসক্তিতে তন্নিষ্ঠ হয়ে নিজেকে শুদ্ধ করা, পূর্ণ করা? যে শিক্ষা তিনি রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন সে শিক্ষার আজ বড় অভাব।
প্রিন্সের সন্তান মহর্ষি হন আর মহর্ষির সন্তান বিশ্বকবি....কি অদ্ভুত ইতিহাস আর এখানেই মহর্ষি সার্থক যিনি প্রিন্সের সন্তান হয়েও নিজে প্রিন্স হলেন না আর নিজে মহর্ষি হয়ে দিয়ে গেলেন আমাদের অন্তরে থাকা চিরদিনের মরমীয়া-দরদী-মানবপ্রেমী শ্রেষ্ঠ ভারতসন্তানকে।
(প্রকাশিত: উত্তর ভূমিকা)
No comments:
Post a Comment