কালের যাত্রায় কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়
শৌভিক রায়
যে কোনও প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ পূরণ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গর্বের। কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও সেই শ্লাঘার বিষয়টি ঘটতে চলেছে তিন বছর পর, ২০২৪ সালে। বিদ্যালয় হিসেবে কোচবিহার শহরে শতবর্ষ প্রাচীন সদর গভর্নমেন্ট হাই স্কুল, জেনকিন্স স্কুল ও সুনীতি একাডেমি ও এ বি যেন শীল কলেজের পাশাপাশি মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের একশো বছরে পা রাখতে চলা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এই বিদ্যালয়ের ইতিহাস অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির থেকে একেবারেই আলাদা।
১৮৭৮ সালে প্রজাবৎসল মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুরের সঙ্গে ব্রাহ্মধর্মাবতার কেশবচন্দ্র সেনের কন্যা সুনীতি দেবীর বিবাহের পর, কোচবিহারে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায়। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিতা সুনীতি দেবী কোচবিহারের আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রয়োজন অনুভব করেন। তাঁর বিশেষ অনুরোধে মধ্যপ্রদেশ থেকে ১৮৯৬ সালে লিডিয়া ম্যাগুনসন তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত সুনীতি একাডেমিতে সেলাই শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হন। সুইডিশ লিডিয়া ম্যাগুনসন কোচবিহার রাজ্যে খ্রীষ্ট ধর্ম প্রসারের সম্ভাবনা দেখতে পান। কেননা সেই সময় কোচবিহারে মহারাজার নিজস্ব ব্যান্ড পার্টিতে কাজ করার সুবাদে বেশ কিছু খ্রীষ্টান পরিবার বাস করত। এই ব্যান্ড পার্টিতে শুধু ইউরোপিয়ানরাই ছিল না, ছিল ধর্মান্তরিত ভারতীয় পরিবারও। লিডিয়া ম্যাগুনসন সেই খ্রীষ্টানদের মধ্যে শিক্ষার প্ৰয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যাপারে কোচবিহার রাজ্যে ইংরেজ সরকারের ভূমিকা থাকলেও, ধর্ম-সংস্কৃতি ইত্যাদি ব্যাপারে তারা বা অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারত না। ফলে লিডিয়া ম্যাগুনসনের আবেদনে মহারানী সুনীতি দেবী স্বয়ং মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণকে এই ব্যাপারে উদ্যোগী হতে অনুরোধ করেন। সুইডিশরা ছাড়া আর কোনও ইউরোপিয়ান মিশনারি শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে কোচবিহার রাজ্যে অনুমোদন পাবে না এই শর্তে লিডিয়া ম্যাগুনসনের আবেদন গ্রাহ্য হলে, ১৮৯৮ সালে লিলি উইলম্যান মধ্যপ্রদেশ থেকে কোচবিহারে আসেন। তাঁর উদ্যোগে আজকের নীলকুঠি এলাকায় তাঁর সঙ্গে আসা কিছু ছাত্র, মহারাজার ব্যান্ডপার্টিতে থাকা খ্রীষ্টান পরিবারের এবং একদা 'গারো হিলস' ভাগ্য অন্বেষণে আসা ও ঘুঘুমারী অঞ্চলে থাকা ধর্মান্তরিত গারো খ্রীষ্টান পরিবারের সন্তানদের নিয়ে শুরু হয় একটি 'হোম স্কুল' ।
১৯০০ থেকে ১৯০৬ অবধি সেই হোম স্কুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু ক্রমাগত ছাত্র সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৯০৭ সালে ইংরেজ প্রশাসকদের সহযোগিতায় কুমার ভবেন্দ্রনারায়ণের বাড়ি 'মৃণাল কুটির`-এর কাছে একটি আটচালা ঘরে হোম স্কুলটি স্থানান্তরিত করা হয়। তবে অন্য একটি মত বলছে যে, সুইডিশ মিশনারিরা ১৯১৭ সালে তোর্ষা নদীর চরে, শহরের পশ্চিম প্রান্তে, একটি পাঠশালা স্থাপন করেছিলেন যেটি ১৯২৪ সালে কুমার ভবেন্দ্রনারায়ণের বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। প্রসঙ্গত, কোচবিহার রাজপরিবারের সন্তান কুমার ভবেন্দ্রনারায়ণ, মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের উদ্যোগে ডাক্তারি পাস করেছিলেন। কিন্তু রাজপরিবারের নিজস্ব রাজনীতির শিকার হয়ে তিনি কুমিল্লার সিভিল সার্জেন পদে যোগ দিয়েছিলেন এবং দীর্ঘদিন সেখানেই ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, ১৯১১ সালে মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর পরেও বিদ্যালয়ের কোনও অসুবিধে হয় নি, কেননা পরবর্তী মহারাজা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত রাজরাজেন্দ্রনারায়ণও শিক্ষাবিস্তারে সুইডিশ মিশনারিদের অবদান বুঝতে পেরেছিলেন। মহারাজা রাজরাজেন্দ্রনারায়ণের অকাল মৃত্যুর পর তাঁর ভাই জিতেন্দ্রনারায়ণ সিংহাসনে বসেন। তাঁর নয় বছরের রাজত্বকালে তিনি পূর্বসূরীদের অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু তিনিও বেশিদিন রাজত্ব করতে পারেন নি। ১৯২২ সালে তিনি প্রয়াত হলে নাবালক রাজপুত্র জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণকে রাজা ঘোষণা করা হয় এবং রাজকার্যে সহযোগিতার জন্য রাজমাতা ইন্দিরা দেবীর নেতৃত্বে Regency Council গঠিত হয়।
মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ, মহারাজা রাজরাজেন্দ্রনারায়ণ এবং মহারাজা জিতেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর অভিঘাতের মধ্যেও সুইডিশ মিশনারিরা তাঁদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল এবং রাজদরবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক যথেষ্ট মধুর ছিল। যাহোক, তাঁদের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ১৯২৪ সাল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কেননা বিদ্যালয়ের রেকর্ডে এই সালটিকেই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বৎসর হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। ১৯০৭ থেকে ১৯১৮ অবধি বিদ্যালয়ের কেয়ার টেকার ছিলেন এফ ইউ পাল। লিলি উইলম্যান-সহ সত্যপ্রসাদ মণ্ডল, অতুলচন্দ্র বসু, নলিনীকান্ত চক্রবর্তী প্রমুখেরা এই সময় শিক্ষক ছিলেন। ১৯১৮ থেকে ১৯২৬ অবধি রোহিনী সরকার, রামানন্দ সরকার, ভূপেন্দ্র মোহন ব্রহ্ম, সুরেশ রায়, ব্রজেন্দ্র লাল সরকার প্রমুখেরা বিদ্যালয়ে নিযুক্ত হন।
১৯২৬ সালে লিলি উইলম্যান ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও কিন্তু ছাত্র সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যালয়ে ক্লাসের সংখ্যাও বেড়েছে। ১৯২৮-২৯ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যালয় শুরুর বছর অর্থাৎ ১৯২৪ সালে বিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা ছিল ৫৩ জন। ১৯২৯ সালে সেই সংখ্যা হয় ১৫০। এই বিপুল পরিমান ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কুমার ভবেন্দ্রনারায়ণের লিখিতভাবে বাড়ি ছাড়বার অনুরোধ, সুইডিশ মিশনারিদের চিন্তায় ফেলে। সুইডিশ মিশনের তৎকালীন সভাপতি A. W. BRANDT বিদ্যালয়ের জায়গার জন্য ছোটাছুটি শুরু করেন। এবারেও পরিত্রাতা হিসেবে এগিয়ে এলেন Regency Council। ১৯৩২ সালের ১৮ মার্চ তাঁরা মিশনারিদের আশ্বাস দিলেন যে, এ বি এন শীল কলেজের বিপরীতে থাকা রাজগণ ছাত্রাবাস বিদ্যালয়ের জন্য দেওয়া হবে। সেই বছরের জুলাই মাস বা তার কিছু আগে বিদ্যালয় উঠে এল আজকের জায়গায়। ২৫শে জুলাই Regency Council কে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি Parade Ground- এর দক্ষিণ দিকের মাঠ চাওয়া হল খেলার জন্য। ১৯৩৩ সালে ছাত্রসংখ্যা হল ২৪৪। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, শরীর চর্চা ইত্যাদির জন্য নির্মিত হল আধুনিক ব্যায়ামাগার। শুরু হল বিদ্যালয়ের নতুন করে জয়যাত্রা। ১৯২৯ সালের নভেম্বর মাসে সতীশচন্দ্র ভৌমিক বিদ্যালয়ের অস্থায়ী প্রধানশিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৩৪ অবধি পরেশ চন্দ্র গুহ, সুরেন্দ্র মোহন ইশোর, অনাদি আইচ, নির্মলচন্দ্র চক্রবর্তী, জ্যোতিলাল ভট্টাচার্য, হেমন্ত কুমার বসু, অবনীতারণ বিশ্বাস প্রমুখেরা শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৩৪ সালে স্থায়ী খ্রীষ্টান প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ের দাযিত্ব নেন ইমানুয়েল রঞ্জিত রায়। সতীশচন্দ্র ভৌমিককে দেওয়া হয় সহ প্রধানশিক্ষকের পদ। ইতিমধ্যে ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সুইডিশ মিশন স্কুলকে সাময়িক অনুমোদন দেয়। সে বছর ৮জন ছাত্র ম্যাট্রিকুলেশন দিয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ২৩।
১৯৩৪ থেকে ১৯৪৭ ছিল বিদ্যালয়ের অত্যন্ত গৌরবের সময়। এই সময়ে মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণ স্বয়ং বিদ্যালয়ে এসেছেন পুরস্কার বিতরণী উৎসবে (৫ মার্চ, ১৯৩৭)। মৌলভী শিক্ষকের পাশাপাশি নিয়োজিত হয়েছেন কাব্যতীর্থ সংস্কৃত পন্ডিত। বাইবেল শিক্ষক তো শুরুর দিন থেকেই ছিলেন। শারীর শিক্ষণ শিক্ষককে রাজ্যাধিপতির মিলিটারি বিভাগে ট্রেনিং নিতে পাঠানো হয়েছে। গ্রন্থাগারে কেনা হয়েছে ২৯৬টি বই। বিদ্যালয়ে ফুটবলে ব্রেটকাপ ও আউএন কাপের খেলা শুরু হয়েছে। বসছে হকির আসর। হাতে লেখা বিদ্যালয় পত্রিকা 'সাধনা` প্রকাশিত হচ্ছে। অচিরেই সেটি মুদ্রিত আকারে পরিবর্তিত হচ্ছে। বিদ্যালয়ে বিতর্ক সভা স্থাপিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমাজসেবার ক্লাব। পঠন কক্ষে শোভা পাচ্ছে টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ইলাস্ট্রেটেড উইকলি, মডার্ন রিভিউ, সচিত্র ভারতের মতো নামী পত্রিকা। মিউজিয়াম তৈরিও এই সময়ের যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৪৪-৪৫ সালেও মহারাজার উপস্থিতিতে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়েছে। তৎকালীন প্রধান শিক্ষক পি কে অধিকারী বাংলায় কার্যবিবরণী পাঠ করছেন। শিক্ষক সংখ্যা হয়েছে ২০, ছাত্র সংখ্যা ৫৫০। বিদ্যালয়ে গঠিত নাট্য সমিতি শিক্ষক প্রমথ বর্ধনের লেখা 'শের শাহ' নাটক মঞ্চস্থ করছে এই সময়েই। ১৯৩৯ সালে ছাত্রাবাস শুরু হয়েছিল ১৩ জন ছাত্রকে নিয়ে, এই সময় সেই সংখ্যা হয়েছে ৫২ জন। বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে যুক্ত হয়েছে কৃষি ও কারিগরী শিক্ষা। কোচবিহার রাজ্যের আর্টিজেন স্কুলে বিদ্যালয়ের ছাত্ররা কারিগরী শিক্ষা লাভ করছে, অষ্টম থেকে দশম শ্রেণীর ছাত্ররা বিদ্যালয়ের কৃষিক্ষেত্রে নিজেদের পাঠ লাভ করছে। গভর্নর জেনারেলের পূর্বাঞ্চলীয় এজেন্ট কর্নেল এ এস সিক এই সময় বিদ্যালয় পরিদর্শন করে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন। ছাত্রাবাসে রাত্রিযাপন করছে কবি নজরুল ইসলাম এবং ভবানীগঞ্জ বাজারের কাছের মসজিদে 'মিলাদ মহফিলে` সংগীত পরিবেশন করছেন। ১৯৩৬ সালে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বৈদ্যুতিক পাখা লাগানো হচ্ছে। তার আগের বছর ১৯৩৫ সালে শুরু হয় মনিটর ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে সুইডিশ মিশনারি স্কুল ছিল কোচবিহারের বুকে এক নতুন ইতিহাসের নাম।
সমগ্র দেশের মতোই ১৯৪৭-৪৮ সাল সুইডিশ মিশন স্কুলের পক্ষে ছিল উত্তাল দুই বছর। দেশভাগের জন্য শহর কোচবিহারে শরণার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাদের স্থান হয়েছিল বিদ্যালয়ের আটচালা ঘরে। সাময়িকভাবে বিদ্যালয়ের কাজ চলছিল সকালবেলায় প্রতিবেশী জেঙ্কিন্স স্কুলে। বিদ্যালয়ের দুই ছাত্র ইয়াকুব ও ইয়াসিনের নেতৃত্বে পাকিস্তানের স্বপক্ষে শহরে মিছিলও পরিক্রমা করেছিল। সব মিলে সুইডিশ মিশনারিদের পক্ষে পরিস্থিতি অনুকূল ছিল না। তাঁরা শর্তসাপেক্ষে স্টেস্টের কাছে বিদ্যালয়টি হস্তান্তর করতে চাইলেন। সুইডেনের হোম-বোর্ডও বিদ্যালয়ের অনুদান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু স্টেট দায়িত্ব নিতে রাজি হল না। A. W. BRANDT চিঠি দিয়ে জানালেও কোনও লাভ হল না। এই টানাপোড়েনের মাঝে ১৯৪৮ সালের ১৯ শে জানুয়ারি ছাত্ররা বিদ্যালয়ের ভেতর সরস্বতী পুজো করবার আবেদন জানালেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সতীশচন্দ্র ভৌমিক আবেদন পত্র পাঠালেন A. W. BRANDT-এর কাছে। অবধারিতভাবে আপত্তি এলো তাঁদের দিক থেকে। কিন্তু তখন ছাত্ররা খেপে উঠেছে। প্রাক্তন ছাত্র ও প্রখ্যাত কবি প্রয়াত সনৎ চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, 'স্কুলে শতকরা আশি ছেলেই হিন্দু, তারা দাবী তুলেছে সরস্বতী পুজো করবে। সঙ্গে মুসলমান ছেলেরাও আছে। অন্যদিকে সুইডিশ মিশনের কর্মকর্তারা পুজো করতে দেবেন না। ছাত্র বিক্ষোভ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠলো। শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিলেন। এত সব কাণ্ডের সময় আমি বাগানে আছি। যেদিন বাগান থেকে হোস্টেলে এলাম, সেদিন স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে আমি হতবাক। সারা স্কুলের মাঠে কাগজের টুকরো। একটা কাগজের টুকরো তুলে দেখি আমাদের পাঠ্য বাইবেল ছেঁড়া হয়েছে। খুব খারাপ লাগল।` এরকম অবস্থায় A. W. BRANDT ও মিশন প্রতিনিধি JOHN A ROY-এর আপত্তি লিপিবদ্ধ করেও পরিচালন সমিতি পুজো করবার অনুমতি দিল।
কিন্তু এই ব্যাপারটি যে তাঁরা ভালভাবে নেন নি তার প্রমান পাওয়া গেল ২১ জানুয়ারি। পদত্যাগপত্র গেল পরিচালন সমিতির কাছে। কিন্তু সেটি গৃহীত না হওয়ায় আবার মার্চের ২ তারিখ আবার পদত্যাগপত্র পাঠানো হল। এবার তা গৃহীত হল। সুইডিশ মিশনারিদের সঙ্গে এতদিনের সম্পর্কের ইতি ঘটল এখানেই। ১৯৪৮ সালের ২৫ মার্চ নতুন কমিটি গঠিত হল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হল। কিন্তু তখনও বিদ্যালয়ের নাম পাল্টায় নি। নাম পরিবর্তনের জন্য পরিচালন সমিতি মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের দ্বারস্থ হলেন। অবশেষে ১৯৪৯ সালের ১৯ জানুয়ারি বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া গেল। মহারাজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ১লা মে ১৯৪৯ পরিচলন সমিতি সিদ্ধান্ত নিল- 'Resolved that the Committee of Management of the school express their most heartful thanks and their deep sense of gratitude to H.H. Maharaja Bhup Bahadur for the favour of H.H's graciously granting the prayer of the Committee to associate the name of the great and illustrious Ruler of the State His Highness Late Maharaja Sir Nripendra Narayan Bhup Bahadur of revered memory.` এর পাশাপাশি বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ৬০০ টাকার মিষ্টি বরাদ্দ হয়েছিল ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হল এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় ১৯৫০ সালের ৬ জানুইয়ারি 'মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়' নাম অনুমোদন করে পাঠালেন। বর্তমানে অবশ্য `ইংরেজি' শব্দটি বাদ পড়েছে।
ইতিহাসের বহু কিছুর নীরব সাক্ষী কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়। নতুন নাম নিয়ে অতীতের সুইডিশ মিশন স্কুল আজ খাতায় কলমে একশ বছরের কাছে দাঁড়িয়ে, যদিও মনে করা হয় বিদ্যালয়ের বয়স আরও বেশি। আজ ভাবা কঠিন যে, এই বিদ্যালয়ে এক সময়ে খ্রীষ্টান ছাড়া প্রধানশিক্ষক নিযুক্ত হতেন না অথবা বাইবেল পড়া বাধ্যতামূলক ছিল। সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডঃ শঙ্কর ভট্টাচার্য, সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল জগদীশ সরকার, মোহনবাগানের প্রাক্তন খেলোয়াড় শৈবাল ঘোষ প্রমুখেরা কৃতি ছাত্র। কোচবিহার জেলার প্রখ্যাত শিক্ষকেরা এই বিদ্যালয়ে একসময় শিক্ষকতা করেছেন। অতীত গৌরব ধরে রেখে আজও বিদ্যালয় সুনামের সঙ্গে জেলায় শিক্ষার আলো দিয়ে চলেছে।
ছবি- ১৫ অগাস্ট, ১৯৪৭ স্বাধীনতা দিবস উদযাপন
(প্রকাশিত: বকলম পূজা সংখ্যা ২০২১/ সম্পাদক: সঞ্জয় কুমার নাগ
সংকলিত: চেনা উত্তর অচেনা উত্তর/ গাঙচিল)

No comments:
Post a Comment