মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর: এক অনন্য ব্যক্তিত্ব
শৌভিক রায়
বাংলা গদ্যের বিকাশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান অনস্বীকার্য। বিন্দুমাত্র মতভেদ নেই তাতে। কিন্তু যাঁদের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের বিবর্তন শুরু হয়েছিল সেই মহান ব্যক্তিদের মধ্যে কেন যেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে সেরকম কোন আলোচনা নেই। নিজের সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরাট ছায়ায় কি ঢাকা পড়ে গেছেন পিতা দেবেন্দ্রনাথ? নাকি ঝলমলে ব্যক্তিত্বের প্রিন্স দ্বারকানাথের পাশে মহর্ষির সাদামাটা জীবন (নিজেদের ভাবনায়) আমাদেরকে সে অর্থে আকৃষ্ট করে নি? অথবা মহর্ষি উপাধিতে ভূষিত হওয়ায় তাঁর মূল্যায়নে আমরাই পিছিয়ে আছি তিনি ধরাছোঁওয়ার বাইরে ভেবে?
কারণ যেটাই হক, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জন্ম দ্বিশতবর্ষ পার করে এসে একটু দেখাই যাক না মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। প্রশ্ন জাগতে পারে দুশো বছর অতিক্রান্ত একজনের মধ্যে কি এমন থাকতে পারে যা আজকের এই বাংলায় তথা ভারতে প্রযোজ্য? সত্যি বলতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্মকান্ড অধ্যয়ণ করে এটাই মনে হয়েছে তিনি না থাকলে যেমন আমরা রবীন্দ্রনাথ-সহ ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য নক্ষত্রদের পেতাম না তেমনি তাঁর জীবনাদর্শ এমনই মজবুত যা আজও এই অস্থির সময়ে আমাদেরকে দেখাতে পারে নতুন দিশা। আজ যখন ভারতের মেরুকরণ হচ্ছে জাতপাতের ভিত্তিতে, যখন নারীনির্যাতনের পারদ ঊর্ধমুখী, বাড়ছে অস্থিরতা ঠিক তখনই মনে পড়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কথা, তাঁর ভাবনাচিন্তা ও কর্মকান্ডের কথা।
1817 সালে যখন দেবেন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন, বাংলায় তখন নবজাগরণের ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করেছে রাজা রামমোহন রায় প্রমুখের হাত ধরে। ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানটি অত্যন্ত বিলাসিতায় বড় হয়ে উঠেছিলেন। বিলাসিতার মাত্রাটি কি পরিমাণ হতে পারে সেটা প্রিন্স দ্বারকানাথের জীবন দেখলেই বোঝা যায়। বহুবিধ ব্যবসায় প্রভূত অর্থ উপার্জন করা দ্বারকানাথ বিলেত থেকে পুত্র দেবেন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন 'হাতখরচের' জন্য 'এক লক্ষ টাকা পাঠাইতে'। বিলেতে সাহেব-মেমদেরকে যে উপহার দিতেন তিনি তা জানলে আজও বিস্মিত হতে হয়। এহেন পিতার সন্তান যে বিলাসে মেতে উঠবেন সে বিষয়ে দ্বিধা না থাকারই কথা। সত্যি বলতে সে সময়ে কলকাতা শহরের নব্যযুবকদের আইডল হয়ে উঠেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ তাঁর বেশভূষায় ও বাবুয়ানায়। টেরিটিবাজার থেকে নিয়ে আসা পায়রাদের দিয়ে পায়রা লড়াই, ঘুড়ি ইত্যাদি বাবুয়ানার কোন কিছুই বাদ ছিল না। সরস্বতী পুজোতে তাঁর খরচের বহর দেখে স্বয়ং দ্বারকানাথ ঠাকুরও বিরক্ত হন। তবে বিশ্বাস হারান নি লায়েক হয়ে ওঠা ছেলের প্রতি। বেলগাছিয়ায় তাঁর বাগানবাড়িতে তাই দ্বারকানাথ আয়োজিত পার্টির তত্ত্বাবধানের মূল দায়িত্ব অর্পিত হত দেবেন্দ্রনাথের ওপরেই। সেসব আয়োজন এমনই হত যে খবরের শিরোনামে আসত সেগুলি এবং কোনো কোনো ইংরেজ সে পার্টিতে সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে করত। তাঁর বাবুয়ানা এমনই ছিল যে মখমলের তৈরী জুতোতে মুক্তো বসিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন একবার সবাইকে। এই প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা স্মরণ করা যায়, 'জলসার দিন কর্তা দাদামশায় সাদা আচকান পরলেন, মায় মাথার মোড়াসা পাশ পাগড়িটি অবধি সাদা, কোথাও জরি-কিংখাবের নাম গন্ধ নেই। আগাগোড়া ধবধব করছে বেশ, পায়ে কেবল মুক্তো বসানো মখমলের জুতোটি।' এই বাবুয়ানাটি কিন্তু সে সময় যখন দেবেন্দ্রনাথের আর্থিক সঙ্কট চলছে। পিতৃঋণ শোধ করতে গিয়ে অনেক কিছুই ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু ছাড়েন নি স্বাভিমান আর তাই এই ব্যবস্থা। কেননা তিনি জানতেন শহরের লোক তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকবে তিনি কি পরেছেন দেখবার জন্য।
কিন্তু তাঁকে পাল্টে দিয়েছিল তাঁর পিতামহীর মৃত্যু। পিতামহী অলকা সুন্দরীর মৃত্যুর সময় তাঁকে যখন গঙ্গাতীরে নিয়ে যাওয়া তখন সঙ্গী ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। তিনটি রাত কেটেছিল তাঁর গঙ্গাতীরে এবং উপলব্ধি করলেন এক পরম সত্য। তাঁর নিজের কথায়, 'দিদিমার নিকট নাম-সংকীর্তন হইতেছিল...এই অবসরে আমার মনে এক আশ্চর্য উদাস-ভাব উপস্থিত হইল। আমি যেন আর পূর্ব্বের নই। ঐশ্বর্য্যের উপর একেবারে বিরাগ জন্মিল।' এই বিরাগ, বিমর্ষতা থেকে পরিত্রাণ পেলেন তিনি উপনিষদের একটি শ্লোক থেকে। ব্যাপারটি অনেকটা রূপকথার মতো। শ্লোক লেখা সেই পাতাটি উড়ে এসে পড়েছিল তাঁর সামনে। তিনি পড়লেন কিন্তু অর্থ উদ্ধার করতে পারলেন না। রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে সেই শ্লোকের মর্মার্থ উদ্ধার করে তিনি হয়ে ভিন্ন দেবেন্দ্রনাথ। সেই শ্লোকের বাংলা অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়াচ্ছে- 'ঈশ্বর দ্বারাই জগতের সবকিছু আচ্ছাদিত, তিনি যা দিয়েছেন তাই ভোগ করো, অন্যের ধন অপহরণ ক'র না।' কথাটি সামান্য। কিন্তু গভীরতা? এই শ্লোকটিতে উদ্বুদ্ধ দেবেন্দ্রনাথ এরপর উপনিষদ পড়ে ফেলছেন, তৈরী করছেন তত্ত্বরঞ্জনী সভা...পরে তা নাম পাল্টে হচ্ছে তত্ত্ববোধিনী সভা, উপনিষদের বাংলা অনুবাদ করছেন, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশ করছেন অক্ষয়কুমার দত্তের সাথে, ব্রাক্ষ্মবিদ্যালয় স্থাপন করছেন, চালু করছেন মাঘোৎসব, নববর্ষ, দীক্ষাদিন ইত্যাদি, প্রতিষ্ঠা করছেন শান্তিনিকেতন। এক বিরাট কর্মযজ্ঞ দেখা যাচ্ছে যেন! একই সাথে ভ্রমণ করছেন ভারত, বিশেষ করে হিমালয়। মানুষ করছেন সন্তানদের। কিন্তু সংসারে থেকেও যেন নিস্পৃহ তিনি। জাগতিক সব কিছুর উর্ধে তাঁর অবস্থান। তত্ত্ববোধিনী সভা তাঁকে মহর্ষি উপাধিতে ভূষিত করছে তাঁর আপাত নিস্পৃহ অথচ সবেতেই ভীষণভাবে উপস্থিতির জন্য।
কিভাবে সবেতে উপস্থিত হচ্ছেন তিনি? ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়শনের সম্পাদক হিসেবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্বায়ত্বশাসনের দাবী সম্বলিত চিঠি লিখছেন, বাল্য ও বহু বিবাহের বিরোধিতা করছেন, নারী শিক্ষা প্রসারে ব্রতী হয়ে নিজ কন্যাকে বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন, ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের জন্য নিজের পরিকল্পনায় বিশেষ পোশাক বানাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে আগামীর মহানক্ষত্রের সম্ভাবনা বুঝতে পেরে তাঁকে গড়েপিঠে তুলছেন, একই সাথে অন্য পুত্র-কন্যাদেরকেও সমানভাবে উৎসাহিত করছেন এবং দেশের ও দশের মঙ্গলার্থে তাঁর নিজের মতো কাজ করে চলছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ভারতের মতো বহু বর্ণ, ধর্ম, ভাষা, পোশাকের দেশে একমাত্র একেশ্বরবাদী ভাবনাই সঠিক। পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি আর কুব সম্ভবত তার সূত্রপাত হয়ে ছিল 'সর্বতত্ত্ব দীপিকা সভা'র হাত ধরে। এখানে জাতধর্মের কোনো বিচার ছিল না। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, পারসি সকলেই সমমর্যাদা পেতেন। পরবর্তীতে সর্বতত্ত্ব দীপিকা সভার অস্তিত্ব সেভাবে দেখা না গেলেও দেবেন্দ্রনাথের মনে সেই যে একেশ্বরবাদী ভাবনার বীজ গেঁথে ছিল তা যেন উপনিষদ পাঠের মধ্য দিয়ে মহীরুহ আকার ধারণ করে এবং সমাজ-সংসারের সবরকম কাজে থেকেও দেবেন্দ্রনাথ উদাসীন ছিলেন নিজের মতো। স্ত্রী মৃত্যুশয্যায় খবরটিও বিচলিত করে নি তাঁকে। মৃত্যু অনিবার্য সেকথা জেনেই তিনি নিজের মতো করে হিমালয় থেকে ফিরেছেন। আবার মৃত স্ত্রী-কে সাজিয়ে দিয়ে রওনা করিয়েছেন মহাপ্রস্থানের পথে। শোককে আত্মস্থ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাঝেও আমরা এই বৈশিষ্ট্য পাই। নিশ্চিত বলতে পারি এই শিক্ষা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই দেওয়া। উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল, নিজে পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস না করলেও, একেশ্বরবাদী ভাবনায় নিজেকে উন্নীত করলেও দেবেন্দ্রনাথ কোনোদিনই তাঁর স্ত্রীর পৌত্তলিক ধর্মপালনে বাধা দেন নি। এই যে সহিষ্ণুতা, অন্যের বিশ্বাসকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া...এই ভাবনার বড় অভাব আজকে। আর এখানেই বোধহয় মহর্ষির কথা প্রাসঙ্গিক আজকের দিনেও।
একথা সত্য যে মহর্ষির কিছু ভাবনা-চিন্তা ও কর্মে কঠোর হিন্দুত্ববাদ অনেকে খুঁজে পান। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যদি সেটিই তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হতো তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো উদার মানবতাবাদী এক ব্যক্তিকে আমরা পেতাম না। দেবেন্দ্রনাথের কিছু বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁর পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে হিন্দু ছাড়া কেউ পড়তে পারবে না জাতীয় মনোভাব দেখা দেয়। কিন্তু স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের হস্তক্ষেপে সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং শান্তিনিকেতনে পড়বার সুযোগ পান সৈয়দ মুজতফা আলি। আসেন নানা দেশ থেকে নানা ধর্মের লোকেরা শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের ভূমিকায়। এখানেই প্রশ্নটা আসে যে দেবেন্দ্রনাথ যদি কট্টর হিন্দুত্ববাদীই হবেন তবে কি করে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন একজন সত্যিকার মানবপ্রেমী, যিনি সব ধর্মের উর্ধে? উত্তর মেলে না। আসলে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার পেছনে মহর্ষির প্রেরণাই তো কাজ করেছিল। আর সেই প্রেরণা হল বিশ্বপ্রকৃতির মাঝে নিজেকে জানা ও চেনা। দেবেন্দ্রনাথের সেই ভাবনাকেই রূপ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর একেশ্বরবাদী ভাবনায় রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁর কিছু ভাবনা হয়তো ঠিক ছিল যা আজকের দিনে আমাদের সঠিক মনে হচ্ছে না বা তাঁর অনুচরেরা তাঁকে ভুল ব্যাখ্যাও করে থাকতে পারেন, নিজেদের মতো করে তাঁর কথাকে অন্য অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
মনে রাখতে হবে, কোনও মানুষই একেবারে সঠিক যেমন নন, তেমনি সবটাই তার ভুলে ভরা এরকমও নয়। দেবেন্দ্রনাথ এমন একজন ব্যক্তি যিনি পেয়েছেন-হারিয়েছেন-অর্জন করেছেন। তাঁর জীবন এই শিক্ষায় দেয় যে ইচ্ছাশক্তি থাকলে একজন মানুষ একদম হেরে গিয়েও জিততে পারে আবার। তাঁর জীবন চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় কিভাবে একজন ব্যক্তি সংসারে থেকেও সবরকম পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। তাঁর কর্মকান্ড আমাদেরকে এই কথাই বলে যে সবার ওপর মানুষ সত্য।
(প্রকাশিত: উন্মেষ)
No comments:
Post a Comment