Tuesday, August 9, 2022

 বাংলা সাহিত্যে ইংরেজির প্রভাব: একটি রূপরেখা 

শৌভিক রায় 

বিশ্ব সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ বাংলা সাহিত্য। বয়সের বিচারে তুলনায় অনেকটা নবীন হয়েও বাংলা সাহিত্য বিশ্বের নানা ভাষা ও সাহিত্য সৃষ্টির সাথে একাসনে বসেছে শুধুমাত্র তার গুণমানে। তবু বাংলা সাহিত্য অন্য ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব এড়াতে পারে নি একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এটাই বোধহয় সাহিত্যের নিয়ম। কোনো দেশের নিজস্ব সাহিত্যে অন্য দেশের, অন্য লেখকের প্রভাব পড়াটা একটি অতি পরিচিত ঘটনা। বিশ্বের কোনো সাহিত্যই এই প্রভাবমুক্ত নয়। সব সাহিত্যের ঘরানাটাতেই কমবেশি অন্য কোনো দেশের অন্য ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব লক্ষ করা যায়। কেউই এর বাইরে নন। যে সাহিত্য বা সংস্কৃতি নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা শ্রেষ্ঠ মনে করে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, সে নিজের ক্ষতি করে। কেননা একমাত্র মারাত্মক অপরাধীকে সলিটারি সেলে বা আলাদা রাখা হয়। তাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবি যেমন সম্পূর্ণ ভ্রান্ত একটি ধারণা ঠিক তেমনি সবচেয়ে আলাদা কথাটিও একেবারেই ভ্রান্ত। বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও অন্য দেশ, ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব স্বীকার করতেই হয়। 
বলাই বাহুল্য, দীর্ঘদিন ইংরেজ শাসনে থাকা ভারতে ইংরেজির বিরাট অবদান এবং বাংলা সাহিত্যে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব প্রবল। মনে রাখতে হবে ভারতীয়দের মধ্যে বাঙালিই প্রথম ইংরেজিকে আত্মস্থ করে এবং বাংলা হয়ে ওঠে নবজাগরণের পীঠকেন্দ্র। ইউরোপীয় নবজাগরণের ধারণায় বাঙালিই প্রথম সম্পৃক্ত হয়েছিল। আর ইউরোপিয়ান বলতে সে সময়ে ইংরেজরাই সংখ্যাগুরু ছিল। আবার ইংরেজরা কলকাতাকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী বেছে নেওয়ায় শিল্প-কালা-সাহিত্যের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল শহরটি। তাই নবজাগরণের ঢেউ সর্বপ্রথম কলকাতাই আছড়ে পরে এবং সেই ঢেউয়ে বাংলা সাহিত্যের নৌকো ভেসে চলে নিজের মতো। মনে রাখতে হবে নৌকোটি নিজস্ব হলেও ঢেউটি কিন্তু ইউরোপিয়ান ঘরানার। তাই ইউরোপিয়ান বিশেষত ইংরেজিয়ানার প্রভাব বাংলা সাহিত্যে দেখা যাবে এ আর নতুন কি।  
হয়তো সেই সূত্র ধরেই স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লিখে ফেলেন 'ভ্রান্তিবিলাস' আর কে না জানে শেক্সপিয়ারের 'কমেডি অফ এররস' অবলম্বনে লেখা হয়েছিল এই গদ্যগ্রন্থটি। বিদ্যাসাগরকে দিয়ে শুরু করার কারণ একটিই, যদি মনে করি নিই বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষাবিকাশের অন্যতম জনক তবে সেই জনকটিও ইংরেজি সাহিত্যকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন নি। হয়তো তাঁর মতো ক্ষণজন্মা পুরুষ বুঝেছিলেন যে বাংলা সাহিত্যকে যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয় তবে তাকে বিশ্বসাহিত্যের দোরগোড়ায় পৌঁছতে হবে আর সেক্ষেত্রে ইংরেজির মতো প্রাচীন ভাষার সাহিত্য নিজের  সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবে। মাইকেল মধুসূদনের ইংরেজি প্রীতি ও ইংরেজিতে লেখা এবং পরবর্তীতে বাংলায় ফিরে আসা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। মাইকেল না থাকলে ইংরেজি সাহিত্যের অনেক মণিমুক্তো আমরা জানতে পারতাম না সেই সময়, ফলে পিছিয়ে যেত বাংলা সাহিত্যের অগ্রগতি। মাইকেলই  প্রথম মহাকাব্য, সনেট ইত্যাদি নিয়ে  সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পেরেছিলেন এবং তাঁর নিজের লেখায় ইংরেজি সাহিত্যের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায়। তাঁর প্রথম গদ্য 'হেকটরবধ` হোমারের ইলিয়াড অনুসরণে রচিত। 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এ ভার্জিলের 'ইনিড', দান্তের 'ডিভাইন কমেডি', হোমারের 'ইলিয়াড' আর মিল্টনের 'প্যারাডাইস লস্ট'-এর ছায়া দেখা যায়। মেঘনাদবধ কাব্যে চরিত্রচিত্রায়ণে প্যারাডাইস লস্টের চরিত্রগুলি যে তাঁকে সাহায্য করেছিল সে কথা মাইকেল নিজেও স্বীকার করে গেছেন। অন্যদিকে 'বীরাঙ্গনাকাব্য' ওভিডের রচনায় প্রভাবিত। আবার তাঁর 'ক্যাপটিভ লেডি' ইংরেজিতেই লেখা। এখানে একথা বললে ভুল বলা হবে না যে নবজাগরণের ঢেউ এতটাই উত্তাল ছিল সেসময় যে মাইকেল শুধুমাত্র বীররসাত্মক ধারার মহাকাব্য রচনায় নিজেকে আটকে না রেখে গীতিকবিতায় বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। সে হিসেবে তাঁকে যুগ প্রবর্তক বলা যেতে পারে। নিজস্ব আবেগ-অনুভূতির এই কবিতা যে স্বাতন্ত্রতা এনেছিল তার প্রভাবে সিক্ত হয়েছিলেন হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, বিহারীলাল প্রমুখ। অর্থাৎ এখানেও বিদেশী সাহিত্যের ঋণ অস্বীকার করা যায় না। একথা অনস্বীকার্য যে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি, মনন , ভাবধারাতে সেই গীতিকবিতা অতি অবশ্যই আলাদা রূপ নিয়েছিল। তবে পাশ্চাত্য প্রভাব নতুন করে ভাবতেও শিখিয়েছিল সে যুগের বাঙালি মেধাকে। ইংরেজি সাহিত্যের  এই টান অস্বীকার করতে পারেন নি সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রও। তাঁর প্রথম উপন্যাস 'Rajmohan's Wife' রচিত হয় ইংরেজিতে। সাহিত্যের মনোযোগী পাঠক অবশ্যই বঙ্কিমচন্দ্রের 'রজনী` উপন্যাসের নায়িকা রাজনীর সাথে 'দ্য লাস্ট ডেজ অফ পম্পেই'-এর নিডিয়ার মিল খুঁজে পাবেন। আর 'কমলাকান্তের দপ্তর`-এর প্রেরণা ছিল ডিকুয়েন্সির 'কনফেশন অফ এন ইংলিশ ওপিয়াম ইটার' একথা কমবেশি সকলেরই জানা। 
তাহলে লক্ষ করা যাচ্ছে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব কমবেশি সে যুগের সাহিত্যিকদের ওপর পড়েছিল। আবার সরাসরি সাহিত্যব্যক্তিত্ব বলে চিহ্নিত না হয়েও সে আমলের সমাজে যাঁদের অবদান প্রবলভাবে ছিল, কিছু লেখালিখিও যাঁরা করেছেন তাঁদের ওপরেও ইংরেজি বা ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব ছিল। রাজা রামমোহন রায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষি  দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রহ্মাচার্য কেশবচন্দ্র সেন, রাধানাথ শিকদার, বিবেকানন্দ প্রমুখ সকলেই ইংরেজি সাহিত্যের ধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। ইউরোপের ভাবনাচিন্তা তাঁদের মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে সে সময় ব্রাহ্ম আন্দোলন শুরু হয়। ব্রাহ্ম সংগীত বা অন্যান্য রচনাকে সাহিত্যের দৃষ্টিতে দেখলে সেখানেও বিদেশি সাহিত্যের প্রভাব বিশেষভাবে দেখা যায়। এমনিতেও ডিরোজিও, ইয়ং বেঙ্গলের জন্য  বাঙালি মনোজগতে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছিল। চিন্তায়-ভাবনায় সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছিল যেমন সাহিত্যে তেমনি সমাজজীবনেও। অনেকে তো মনে করেন ব্রাহ্ম-সমাজের মূলে ছিল সমাজতান্ত্রিক ভাবনা। সেজন্য অনেকে তাঁদের ছদ্ম-কম্যুনিস্ট মনে করেন। একেশ্বরবাদ, সমভাবনা, সাম্য, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে অভিন্নতার এই দর্শনটিও নিঃসন্দেহে ইংরেজির প্রভাব। এমন না যে ভারতবর্ষে এই দর্শন ছিল না বা কেউ বলে নি। কিন্তু দীর্ঘদিন তা আটকে ছিল কোনো অন্ধকার কারাগারে। সেই ভাবনা আবার মুক্তি পেয়েছিল পাশ্চাত্যের, বিশেষ করে ইংরেজির, প্রভাবে আর তার স্পর্শ পেয়েছিল বাংলা সাহিত্য।  
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ববর্তী কবিদের মধ্যে হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন ও বিহারীলাল চক্রবর্তীর মধ্যে ইংরেজি সাহিত্যের গীতিকবিতার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মাইকেল মধুসূদন নিজে যে সনেট রচনা করেছিলেন তাতে পেত্রার্ক ও শাকেস্পেয়ারের প্রভাব প্রবলভাবে প্রকট। হেমচন্দ্রের 'ছায়াময়ী' দান্তের ডিভাইন কমেডি অনুসরণে রচিত এবং 'জীবন সংগীত` কাব্যে লংফেলোর প্রভাব ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে আজও সূর্যের মতো উজ্জ্বল। তাঁর বিরাট প্রভাব থেকে এখনো বাংলা সাহিত্য হয়তো পুরোপুরি মুক্ত হয় নি। সেই বিরাট পুরুষ রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। কবি-ঔপন্যাসিক-সংগীত রচয়িতা-শিল্পী-গায়ক ইত্যাদির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী পাঠক। তাঁর পড়াশোনার বিরাট ব্যাপ্তি তাঁকে চেতনা-অবচেতনে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে তাঁর বহু রচনায় ইংরেজি-সহ অন্য ভাষাসাহিত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্ট বিভিন্ন গান সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। আলোচকের ভাষায় 'তাঁর কাব্য বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা, অনুভূতি কল্পনার বর্ণে গন্ধে সমুজ্জ্বল। পাশ্চাত্য সৃষ্টির সংস্পর্শকে তিনি না এড়িয়েও নিজস্ব সত্তার হৃদয়-স্পন্দন কাব্যের যে রূপ তিনি তুলে ধরেন তা বাংলা কাব্যের ইতিহাসে আর সম্ভব নয় বলেই মনে হয়।' অরুন মিত্র বলেছেন, 'মানুষের জাগতিক অবস্থান, প্রেম প্রকৃতি সব কিছু জড়িয়ে তাঁর সৃষ্টি অব্যাহত ধারায় বয়ে চলে এবং তারই সঙ্গে সমস্ত খণ্ডতাকে এক অখণ্ডতায় স্থাপন করে জীবনের পারলাম রূপের সন্ধান করে।' তাই পাশ্চাত্য প্রভাবে অনেকসময় প্রভাবিত হয়েও রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ আলাদা এক সত্ত্বা। তিনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, তাঁর প্রভাবে পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য প্রভাবিত হয়েছিল, বাধ্য হয়েছিল তাঁকে অনুবাদ করতে এবং তাঁর বিপুল সৃষ্টিকে নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতি দিতে।আসলে হয়তো কবিতার ক্ষেত্রে আমরা কেউই নতুন কথা বলি না। কেননা বলার আর কিছু নেই। সর্বদেশে, সর্বকালে মানুষের শাশ্বত অনুভূতিগুলি একই থাকে। তাহলে কিসের ভিত্তিতে একজনের কবিতা আর একজনের চাইতে আলাদা হয়। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কবিতা আলাদা হয়ে যায় শব্দ-চয়নে। অর্থাৎ কবিতা এক অর্থে coinage বা শব্দ-চয়ন। ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে শেলী যেমন ভাবেন, 'If winter comes, can spring be far behind ?', তেমনি রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।` এভাবেই ভাবনার জগতে মিলেমিশে যায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য। প্রভাব ফেলে একে ওপরের ওপর, কেননা মনে রাখতে হবে বহুদিন আগে উপনিষদ এই একই কথা বলেছিল, 'দুখানি চ সুখানি চ চক্রবৎ পরিবর্তনে।` তাই এক দেশের সাহিত্যে আর এক দেশের বা ভাষার প্রভাব খুব স্বাভাবিক। বরং প্রভাব না থাকাটাই অস্বাভাবিক বলা যেতে পারে। 
রবীন্দ্রযুগ বা রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের প্রভাবমুক্ত হতে বাংলা সাহিত্যের অনেকটা সময় লেগেছিল। অবস্থাটা এমন হয়েছিল যে খানিকটা স্বেচ্ছাকৃত রবীন্দ্র বিরোধিতার জায়গা নিয়েছিলেন অনেক কবি-সাহিত্যিকেরা।পাশ্চাত্যেও ঘটে গেছিল অনেক পরিবর্তন। ফ্রয়েডের মনস্তত্ব, টি এস এলিয়ট, জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে। ভিক্টরিয়ান যুগের গোঁড়ামি ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত প্রবল আলোড়ন ফেলেছিল সাহিত্য জগতে। এতদিন ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, শেলী, কিট্স্, বায়রন পড়া বাংলা সাহিত্য টেনিসন, ব্রাউনিং বা টমাস হার্ডি পাঠ শেষে মুগ্ধ হচ্ছিল আধুনিক কালের কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্টিতে। অন্যদিকে বলশেভিক বিপ্লব মানুষের চেতনায় নতুন ধারা সংযোজন করেছিল। ফলে, সাহিত্যের অভিমুখ নীরবে বদলাতে শুরু করেছিল। একের পর এক সাহিত্য আন্দোলন বদলে দিচ্ছিল ভাবনার জগৎকে। ফরাসি সাহিত্যে ইতিমধ্যে বোদলেয়ার, মালার্মে, রাবোঁ, সাঁর্ত্র প্রমুখের দর্শন বদলে দিয়েছিল ইংরেজি সাহিত্যকে আর ইংরেজি সাহিত্যের হাত ধরে সেই ঢেউ আছড়ে পড়ছিল বাংলা সাহিত্যের জগতেও। কবি-সাহিত্যিকেরা বুঝতে পারছিলেন সাহিত্য মানে শুধুই প্রকৃতি বা সুকুমারী প্রবৃত্তি নয়। সাহিত্য হবে বাস্তবের মুখপাত্র আর সেই বাস্তবে থাকবে কৃমি-কীট-বেশ্যা-দালাল-আপোষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো প্রয়োজনে পৃথিবীর নৃশংসতম প্রাণী হতে পারে মানবপ্রজাতি। নাৎসি ক্যাম্প, হিরোশিমা-নাগাসাকির মারণযজ্ঞ ইত্যাদি সব মিলে দ্রুত পাল্টে গেল পুরো দুনিয়া। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে বিংশ শতাব্দীতে মানুষের মনোজগত থেকে শুরু করে রাজনীতি,সমাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে যা আগের শতাব্দীগুলিতে দেখা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সভ্যতার পীঠকেন্দ্রেটিও যেন ইউরোপ থেকে আমেরিকায় চলে গেল এই সময়েই। আমেরিকাতেও কালো মানুষদের লড়াই সমীহ আদায় করে নিলো সারা বিশ্বের।সাহিত্য জগতে এ সবেরই প্রভাব এতো প্রবলভাবে পড়ল যে একের পর এক আন্দোলন গড়ে উঠলো- রিয়ালিজম, সুর-রিয়ালিজম, ইম্প্রেশনিজম, ডাডাইজম, মডার্নিজম, পোস্ট-মডার্নিজম, হাংরি লিটারেচার ইত্যাদি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটায় সাহিত্য জগতের এই পরিবর্তন থেকে বাংলা সাহিত্য দূরে থাকতে পারে নি। জীবনানন্দ দাস, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য, কমলকুমার মজুমদার, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সমর সেন, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে নানাবিধ আন্দোলনের প্রভাব দেখা গেল বাংলা কবিতা বা উপন্যাসে। পরবর্তীতে এই ধারা লক্ষ্য করা যায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দীনেশ দাস, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, রাম বসু, মনীশ ঘটক, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, মনীন্দ্র রায় প্রমুখের মধ্যে। হাংরি সাহিত্যের অন্যতম প্রবক্তা গিন্সবার্গের প্রভাব খানিকটা দেখা গিয়েছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নানা রচনায়। তবে তিনি বেশিদিন সেই ধারায় না থেকে নিজস্ব ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। একই কথা বলা যায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পাশ্চাত্যের প্রভাব কমবেশি ছিল তাঁদের ওপর বা তাঁদের সমসাময়িক বিনয় মজুমদার, শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাসগুপ্ত, আমিতাভ দাসগুপ্ত প্রমুখের ওপর। অন্যদিকে তুষার রায়, রত্নেশ্বর হাজরা, উৎপল কুমার বসু, মলয় রায় চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, দেবী রায়, সমীর রায়চৌধুরী, অরুণেষ ঘোষ প্রমুখের মধ্যে হাংরি প্রভাব যথেষ্টই বিদ্যমান ছিল। পোস্ট মডার্নিজমের ধারণা নিয়ে বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত, কৃষ্ণা বসু, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, মণিভূষণ ভট্টাচার্য্য প্রমুখেরা লিখে গেছেন। ইয়েটসের 'He Reproves the Curlow' অবলম্বনে জীবনানন্দ লিখেছেন 'হায় ছিল`, তাঁর বিখ্যাত বানালাটা সেনের মধ্যে দেখা যায় এডগার এলেন পো -এর 'টু হেলেন' কবিতাটির প্রভাব। টি এস এলিয়টের প্রভাবে সমর  সেন রচনা করেন একাধিক কবিতা। মার্কসিজমকে বিষয় করেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য্য। তারাশঙ্কর, মানিক বন্দোপাধ্যায়, সমরেশ বসুর মধ্যেও এই ছায়া দেখা যায়। জগদীশ গুপ্ত যেন ছোটগল্পের জগতে ও হেনরি, মোপাসাঁ প্রমুখের প্রভাবে লিখে গেছেন একের পর এক কালজয়ী ছোট গল্প। রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর তাঁদের উপন্যাসে যেমন ইংরেজি সাহিত্যের স্মার্ট টানটান ধারাকে বজায় রেখেছেন তেমনি শঙ্কর, বিমল মিত্রের উপন্যাসে ডিকেন্সিয় আঙ্গিক প্রতীয়মান। এরকম বহু উদাহরণ দেওয়া যায় প্রায় সমগ্র বাংলা সাহিত্য থেকে। কিন্তু লিটিল ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠা সংখ্যার কথা মাথায় রেখে আর বেশি বলা উচিত না। 
একদম আজকের দিনে তাকালে দেখি বাংলা সাহিত্যে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আজকের অত্যন্ত দ্রুত যোগাযোগের দিনে বাংলা সাহিত্য পিছিয়ে নেই। একটি ক্লিকের সাহায্যে যখন দেখে নেওয়া যাচ্ছে ইউরোপ বা আমেরিকা বা আফ্রিকার কবি-সাহিত্যিক কি লিখছেন, অনলাইন অর্ডারে দু-একদিনেই যেখানে পৌঁছে যাচ্ছে সদ্য প্রকাশিত বই সেখানে বাঙালি কবি-সাহিত্যিকরা যে একে ওপরের দ্বারা প্রভাবিত হবেন সে কথা বলা বাহুল্য। বিশ্বায়নের এই যুগে অবশ্য কমবেশি সব ভাষাতে একই সুর ও ভাবনা পরিলক্ষিত। কেননা পৃথিবী আজ সংকুচিত। ভাবতে ভাল লাগে আজ পাশ্চাত্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে বাংলা সাহিত্য নিজে এমন জায়গা নিচ্ছে যে তাকে অনুসরণ করছে কেউ কেউ বা তার প্রভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। তবে তার পরিমান সামান্য। সাহিত্য জগতে সেভাবে প্রাচীন না হয়েও বাংলা সাহিত্যের দ্রুত প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠা প্রমান করে যে প্রভাব যতই থাকে নিজস্বতা না থাকলে কোনো ভাষার সাহিত্য বেশি দূর যেতে পারে না। আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা বড়াই করে বলতে পারি সেই নিজস্বতা আমাদের পুরোদমে রয়েছে।  

(প্রকাশিত: এক পশলা বৃষ্টি/ সম্পাদক: অম্বরীশ ঘোষ))     

No comments: