Sunday, August 21, 2022

 ওদের গল্প

শৌভিক রায় 

জ্যাকির স্বভাব ছিল আমাদের আড্ডায় ঢুকে পড়া। দিনহাটায় মসজিদের সামনের কালভার্টে (তখন মসজিদের আজকের এই চেহারা ছিল না) বা ডাকবাংলো পাড়ার রাস্তার মুখে, অমলদার পানের দোকানে সামনের কালভার্টে বসে জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছি। জ্যাকি চলে এলো। অথচ খানিক আগে ওকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এই তল্লাটে পাওয়া যায়নি। 

যে মাত্র আমরা বসলাম, উনি হাজির। এসে চুপচাপ বসে থাকলেও না কথা ছিল। কিন্তু সেটা তো করবে না! একবার এর কাছে, আর একবার ওর কাছে যাবে। পারলে কোলে উঠে পড়বে আর আধা ময়লা পোশাক পরা কাউকে দেখলেই তেড়ে যাবে! ভাবটা এরকম যেন দিনহাটার মানুষদের পরিষ্কার পোশাক পরানোর দায়িত্ব ও নিয়েছে! কাঁহাতক সহ্য করা যায়?

আমরা গাল দিই। পারলে মারি। তাও নড়ে না। অদ্ভুত স্বভাব। শেষটায় জীবনদা একদিন শেখালো কীভাবে ওকে তাড়াতে হয়। কিচ্ছু না। খুব সহজ। নিজের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে শুধু বলতে হবে, 'এই যে বের করলাম কিন্তু!' ব্যস জ্যাকি মুহূর্তে ভ্যানিশ। 

কিন্তু রহস্যটা কী?? জীবনদাকে চেপে ধরতে ব্যাপারটা জানা গেল। জ্যাকি নাকি দেশলাইকে খুব পায়। দেশলাই দিয়ে আগুন জ্বালানো যায় তো। তাই। যেহেতু পকেটে দেশলাই বাক্স থাকে, তাই পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটু বললেই হল। ত্রিসীমানায় থাকবে না। রাগে দুঃখে ক্ষোভ অপমানে সেই যে জ্যাকি চলে যেত, আর পাওয়াই যেত না। একমাত্র ফটাকাকা যখন 'জ্যাকিইইইইইইইইইইইইইই' করে হাঁক দিত, তখন দিনহাটার যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, ঠিক চলে আসত।

জ্যাকির দেশোয়ালি আর এক ভাইয়েরও প্রেস্টিজ খুব টনটনে ছিল। ওর সামনে যদি একবার বলা যেত 'উফ! কী গন্ধ!!', তাহলে ও উঠে চলে যেত অভিমানী চোখ নিয়ে। 

জ্যাকির এক বংশধরকে জানি যে দিনের বেলায় মহা বকবক আর চেঁচামেচি করলেও, রাতের বেলায় ওর ঘর থেকে বের করা যেত না হাজার চেষ্টাতেও। আমার সেজকাকু প্রথমটায় বিড়বিড় করতেন, 'ব্যাটা বুরবক।' শেষটায় আমাকে একদিন ফোন করে ডাকলেন। খুব নাকি জরুরি কথা আছে। দ্রুত যেন যাই ফোন পেয়েই। কোচবিহার থেকে ছুটে গেলাম। কী কেস? সেজকাকু আমাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে খুব নিচু স্বরে বললেন, 'বুইলি...আমি বুঝে গেছি কেন ওকে রাতের বেলা ওর ঘর থেকে বের করা যায় না!' 

কাকে ঘর থেকে বের করা যায় না সেটা বুঝতে একটু সময় লাগল। শেষটায় ধাতস্থ হয়ে বললাম, 
- কীভাবে বুঝলে?
- ওদের কে আজকের থেকে চিনি নাকি!!
- অ। বেশ। তা কী বুঝলে?
- ভূতের ভয়।
- ভূতের ভয়?
- একদম। ভূতের ভয়ে বের হয় না, বের করাও যায় না। বুইলি?

আর বুইলাম! হাসব না কাঁদব নাকি রেগে ফায়ার হব বুঝতে পারছিলাম না। এই খবর শোনার জন্য পড়িমরি করে কোচবিহার থেকে দিনহাটায় এলাম! তাও সাহস করে জানতে চাইলাম,
- তা এই খবর দেওয়ার জন্য দরজা বন্ধ করলে কেন? আর এত নিচু গলায় কথাই বা বলছ কেন?
- তোর কাকিমা।
- কাকিমা আবার কী করল?
- করেনি। করতে পারে।
- কী করতে পারে?
- ভয়ানক গালিগালাজ। বকাঝকা।
- কাকে?
- আমাকে। অবভিয়াসলি আমাকে!
- কেন?
- তোকে ডেকে এনেছি এই কথা জানাবার জন্য এটা যদি বোঝে, তবে তাণ্ডব করবে।
- করবে?
- করছে তো। আমি এতদিন থেকে বলে যাচ্ছি ও ব্যাটা ভূতের ভয় পায়, সেটা শুনছে না তোর কাকিমা। আমাকে উল্টোপাল্টা বলে যাচ্ছে। আমার লাইফটা, বুইলি, হেল করে দিল এই মহিলা!
কে কার লাইফ হেল করল সে নিয়ে অবশ্য আর এগোলাম না। আমার নিজের যে সেই মুহূর্তে হেল হয়ে গেছে, সেটা বুঝতে পারছিলাম!

সম্পর্কে জ্যাকির তুতো নাতি বাঘা থাকত ফালাকাটায়। অলকদাদার বাড়িতে। বাঘার মতো ভদ্র আর দ্বিতীয়টা দেখিনি। হলে হবে কি! আমার গিন্নি। বাঘা যেই গিন্নিকে একটু জড়িয়ে ধরেছে, অমনি মহিলা ভয়ানক চিৎকার!! তার চিল চিৎকারে বাঘা সেই যে লুকোলো, আর এলোই না। সব্বাই চেষ্টা করলাম। বহু ডাকলাম। গলা জড়িয়ে টানলাম। কিন্তু কিছুতেই সামনে এলো না। অলকদাদা বলল, 'রীনার চিৎকারে লজ্জা পেয়েছে। ভাবেনি যে, বৌদি ওকে ভয় পাবে!' বাঘা লজ্জা পেয়েছে কিনা জানিনা, তবে এই কথা শুনে গিন্নি একটু লজ্জা পেল। শেষটায় গিন্নির মিহি সুরে বলা 'বাঘা...একবার এসো। আমি এখন যাব তো!' শুনে বাঘা সামনে এলো। তবে এবার আর জড়িয়ে ধরল না। শুধু জিভটা বের করে ফিক করে একটু হাসলো।

জ্যাকি, জ্যাকির দেশোয়ালি বন্ধু, জ্যাকির বংশধর আর বাঘার মতো আরও অনেকে আমাদের চারপাশেই আছে। একটু নজর করলেই সবাইকে খুঁজে পাওয়া যায়। জ্যাকি, জ্যাকির দেশোয়ালি বন্ধু, জ্যাকির বংশধর আর বাঘা....এরা সবাই চারপেয়ে। সারমেয়। গোদা বাংলায় কুকুর। আর এরা সব্বাই মন্টমোরেন্সির ভারতীয় সংস্করণ। 

(বোকামির এককাল)

No comments: