লেখক যখন সম্পাদক
শৌভিক রায়
আমাদের ছোটবেলায় লিটল ম্যাগাজিন করবার প্রয়াস থাকলেও, আজকের এই উন্মাদনা ছিল না। মূলত উত্তরের বড় বড় শহরগুলি থেকেই তখন পত্রিকা প্রকাশ পেত। তথাকথিত গ্রামে সে অর্থে পত্রিকা দেখা যেত না। ব্যতিক্রম যে ছিল না, তা নয়। অবশ্যই ছিল। কিন্তু ব্যতিক্রম তো নিয়মকেই প্রকাশ করে। তাছাড়া সেসময় কলকাতা-মুখিনতাও বড্ড বেশি ছিল আমাদের। উপায়ও ছিল না। আজকের এই ডিজিটাল যুগ তো তখন কল্পনাতেও ছিল না কারো, কালিঝুলির প্রেস আর পাইকা লেটার ছিল আমাদের চেনা জগত। লেখা পাঠাতে হত পোস্ট অফিসের মাধ্যমে। হাতেই লেখা হত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ।
বিদ্যালয় পত্রিকায় নিজস্ব লেখালিখি যেমন শুরু, তেমনি সম্পাদনার হাতেখড়িও সেই বিদ্যালয় পত্রিকা থেকেই। তবে লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনাতেও দেরি হয়নি। ছাত্রাবস্থাতেই সম্পাদনা করেছিলাম 'মুজনাই'। অবশ্য মুজনাইয়ের সেই সংখ্যাটি ছিল শিশু-কিশোরদের জন্য। তবে একটা ঘটনা হয়েছিল। আমাদের ছোটদের ডাকে সাড়া দিয়ে সেই সময়ে মৈত্রেয়ী দেবী, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, লীলা মজুমদার, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বপনবুড়ো, শঙ্কু মহারাজ প্রমুখেরা কেউ ছড়া, কেউ কবিতা, কেউ শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন। নিজের সম্পাদনার জীবনে ও মুজনাইয়ের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাপ্তি।
এখানে কিন্তু একটি কথা বলার প্রয়োজন যে, ১৯৮২ সালে যখন মুজনাই প্রথম প্রকাশ পায় তখন আমি একজন সাধারণ সদস্য। ১৯৮৫ সালে মুজনাইয়ের শিশুকিশোর বিশেষ সংখ্যার সম্পাদনার ভার ছিল আমার হাতে। এরপর কিছুদিন অনিয়মিতভাবে মুজনাই প্রকাশ পেলেও, তখনকার প্রায় সকলেই পড়াশোনা ও জীবিকার স্বার্থে এদিকওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ায় একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় পত্রিকা। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে দু'একটি জায়গায় লিখলেও সেভাবে লেখা নিয়ে ভাবিনি। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোটগল্পে পুরস্কার পাওয়াও খুব একটা উৎসাহ দেয় নি। গোটা নব্বইয়ের দশক জুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা বা গদ্য প্রকাশ পেলেও, লেখা ও সম্পাদনার তাগিদ অনুভব করি নি।
এরপর চাকরী, সংসার, অসুস্থতা ইত্যাদি সব সামলে কবে যেন মুজনাই সম্পাদনা ও নিজস্ব লেখা শুরু করবার ইচ্ছেটে জেগে উঠল। তবে মুদ্রণে নয়, অনলাইনে। আসলে শূন্য দশকের শেষদিক থেকে অর্থাৎ ২০০৭-০৮ নাগাদ অনুভব করতে পারছিলাম যে, লেখালিখির জগত-সহ অনেককিছুতেই একটা বিরাট পরিবর্তন আসতে চলেছে এবং এই পরিবর্তনই আগামীদিনের বাস্তবতা। নতুন সেই চ্যালেঞ্জকে নিয়ে তাই অনলাইনেই আবার শুরু করি মুজনাই।
আজ এক দশকে মুজনাই অনলাইনে, মুদ্রণে প্রকাশিত হচ্ছে। শুধু প্রকাশিত হচ্ছে বললে ভুল বলা হবে। অনলাইনে সাপ্তাহিক, মাসিক সংখ্যার পাশাপাশি মুজনাই বিভিন্ন বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। মুজনাইয়ের ব্লগে ও ফেসবুক প্রোফাইলে নানা দিবস উদযাপনের একটা ঐতিহ্য রয়েছে। মুদ্রণে বছরে দুটি পূর্ণ পত্রিকা, ফোল্ডার, ট্যাবলয়েড ইত্যাদিও প্রকাশিত হচ্ছে। মুজনাইয়ের ডুয়ার্স সংখ্যা, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্ম দ্বিশতবর্ষ সংখ্যা ইত্যাদি যথেষ্ট আদৃত। মুজনাইয়ের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল যে, মুজনাই নতুন লিখতে আসা কবি লেখকদের ভরসার জায়গা। মুজনাই সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে সবাইকে। শিশু কিশোরদের কাছেও মুজনাই ভীষণ ভরসার জায়গা। ওদের সৃজন মুজনাইয়ের সম্পদ। রয়েছেন নিতান্তই সাধারণ জনেরা। তারা জানেন যে, তাদের ভাবনা প্রকাশের জায়গা হল এই পত্রিকাটি। আবার, মুজনাইতে লেখা শুরু করে আজ মোটামুটিভাবে পরিচিতি লাভ করেছেন এরকম কবি লেখকের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। পাশাপাশি প্রকাশনার জগতেও মুজনাই পা রাখছে ধীরে ধীরে। প্রকাশিত পত্রিকা ও বই বিক্রির টাকা যাচ্ছে সমাজসেবামূলক কাজে। সত্যি বলতে দ্বিতীয়বার মুজনাই শুরু করবার সময়, স্বপ্নেও ভাবিনি যে, মুজনাই আজ এতটা পরিচিতি ও বিস্তার পাবে।
মুজনাইয়ের বিপুল কাজকর্ম করে নিজের লেখালিখির সময় খানিকটা সংকুচিত হয়েছে, সেটা বলাই বাহুল্য। এটাও ঠিক যে, সম্পাদক ও লেখক সত্ত্বা বজায় রাখতে গিয়ে চাপ পড়ে ভীষণ। কিন্তু কোনটিকে বাদ দিয়ে আজ আর নিজেকে ভাবতে পারি না। তাই সম্পাদনার পাশাপাশি যেভাবে পারি, সেভাবে লিখবার চেষ্টা করি। আমার নিজের একটা সুবিধে আছে যে, লেখা প্রকাশের জন্য অনেকের মধ্যে যে প্রবল ইচ্ছে থাকে, সেটা আমার একেবারেই নেই। তাই মানসিকভাবে অনেক হালকা থাকি। দুটো কাজের মধ্যে সমন্বয় করে নিজের লেখার সময় বের করে নিই তাই।
এভাবেই লিখে চলেছি আনন্দবাজার পত্রিকা, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, আজকাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। সেসব লেখালিখি নিয়ে কিছু গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। হয়ত আগামীতে প্রকাশিত হবে আরও কিছু। নিজের লেখা কখনই সেভাবে যেমন সম্পাদনার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় নি, তেমনি উল্টোটাও সত্যি। আসলে যে রাঁধে, সে তো চুলও বাঁধে। সম্পাদনার সঙ্গে তাই নিজের লেখার কোনো শত্রুতা নেই। তার ওপর সম্পাদনা বলতে মুজনাই...মুজনাইয়ের জন্যই আজ কিছুটা হলেও পরিচিত। মুজনাইয়ের বালক হয়ে যদি বলি যে, সম্পাদনার জন্য লেখা নষ্ট হয়েছে তবে সেটা সত্যের অপলাপ হবে। পরিবার ও শুভানুধ্যায়ী আপনজনদের সার্বিক সহযোগিতাও এক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। তাই যে পত্রিকা শুরু হয়েছিল ডুয়ার্সের ফালাকাটায়, আজ তা কোচবিহার থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে চলেছে।
আসলে জীবন একটাই আর জীবনের কোন্ পর্যায়ে কী হবে তা সবারই অজানা। জীবনকে উপভোগ করাই বোধহয় শ্রেষ্ঠ মানবধর্ম। সম্পাদক হয়ে সেই উপভোগের পাশাপাশি যদি লেখক হিসেবেও কিছু আনন্দলাভ হয়, তবে সোনায় সোহাগা বলেই মনে করি। তাই সম্পাদনা ও লেখা দুইই চলুক নিজের নিজের মতো।
(প্রকাশিত: শব্দ বাউল)
No comments:
Post a Comment