Wednesday, December 31, 2025


 

যেন ভুলে না যাই তাঁদের.....

`নেই রাজ্যে`র বাসিন্দা হওয়ার ভয় সাবেক ছিটমহলে 
শৌভিক রায় 

বছর কয়েক আগে ছিটমহল নিয়ে এক বিশেষ কাজে `সেটেলমেন্ট এনক্লেভ`-এ  গিয়েছিলাম। সেখানকার বাসিন্দারা তখন অবশ্য ভারতীয় নাগরিক। অপেক্ষা শুধু বাড়ি তৈরির জমি পাওয়ার। তাঁদের মধ্যেই দেখেছিলাম মানুষটিকে। এক অদ্ভুত সমস্যার মুখোমুখি তিনি।


এই দেশে যখন ছিটমহলের বাসিন্দাদের নাম সরকারিভাবে নথিভুক্ত করা হচ্ছে, তখন তিনি ওদেশে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেননা নির্দিষ্ট একটি তারিখের মধ্যে ওদেশের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক মিটিয়ে দিতে বলা হয়েছিল। জলের দরে সম্পত্তি বিক্রি করে তিনি যখন ফিরে এলেন, ততদিনে এখানে নাম নথিভুক্তকরণ শেষ। পরিবারের সবাই ভারতের নাগরিক হয়ে গেলেও, তিনি হতে পারেননি। ওদিকে ওই দেশ থেকেও তাঁর নাম বাদ পড়ে গেছে। ভারতীয় হাইকমিশন‌ও তাঁর ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি করেনি। ফলে আমাদের সঙ্গে যখন কথা বলছেন, তখন তিনি কোনও দেশেরই নাগরিক নন। 

চোখের সামনে একজন নাগরিকত্বহীন মানুষকে  দেখে চমকে গিয়েছিলাম আমরা সকলেই। এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর, ছিটমহলের বাসিন্দাদের, বিশেষ করে মহিলাদের, অবস্থা দেখে সেই মানুষটির কথাই আবার মনে হচ্ছে। তাঁর মতোই না হয় তাঁদের অবস্থা।

ছিটমহল প্রত্যর্পণের পর অনেকগুলি বছর কেটে গেছে। তার আগেই ছিটমহলের বহু মহিলার বিয়ে হয়েছে। তাঁরা ছড়িয়ে পড়েছেন এদিকে ওদিকে। এসআইআর নথিতে আত্মীয়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁরা এমন কাউকে দেখাতে পারছেন না, যিনি ২০০২ সালে ভারতের ভোটার ছিলেন। ফলে বহু মহিলার ভবিষ্যত এখন প্রশ্নের মুখে। ইতিমধ্যে অনেকেই কমিশনে ডাক পেয়েছেন। কিন্তু কেউ-ই বুঝে উঠতে পারছেন না, কীভাবে নিজেদের পক্ষে যুক্তি সাজাবেন। 

অথচ কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের কেউ-ই তাঁদের সমস্যা জানেন না, এটা হতে পারে না। কিন্তু তাঁদের জন্য কারও কোনও মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। ফলে ভীষণ বিড়ম্বনার মধ্যে রয়েছেন তাঁরা। ভয় পাচ্ছেন আবার না তাঁদেরকে `নেই রাজ্যের` বাসিন্দা হতে হয়। এতদিন যে অন্ধকারে ছিলেন, সেখান থেকে সামান্য আলো দেখে আবার যদি অন্ধকারেই ফিরতে হয়, তবে প্রত্যর্পণ চুক্তিতে লাভ হল কোথায়? সেটি তো করা হয়েছিল নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার জন্যই। সে দিন যদি বিষয়টিকে মান্যতা দেওয়া যায়, তবে আজ আবার নতুন করে প্রমাণ দেওয়ার কী আছে?

আসলে ছিটমহলের বাসিন্দাদের নিয়ে সেভাবে কারও বিশেষ কোনও ভাবনা ছিল না। নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক বাড়াতে যে যেভাবে পেরেছে, তাঁদের ব্যবহার করেছে। প্রয়োজন শেষ হলে সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে আজ তাঁদের কী হল, সেটা নিয়ে কারও হেলদোল নেই। বিচ্ছিন্নভাবে দুই-একজন প্রতিবাদ করলেও, সামগ্রিকভাবে এই অন্যায়ের কোনও প্রতিবাদ নেই। সাবেক বাসিন্দা তো বটেই, কেউ-ই বুঝতে পারছেন না কী ভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে। 

অবিলম্বে যদি এই মানুষগুলিকে এই সমস্যা থেকে উদ্ধার না করা যায়, তবে যে যুক্তিতে ছিটমহল বিনিময় হয়েছিল, সেটিই সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যাবে। ভাবতে অবাক লাগে, যে রাষ্ট্র এক দশক আগেই যাঁদের নিজের নাগরিক বলে স্বীকৃত দিল, সেই রাষ্ট্রই আবার নাগরিকত্বের প্রমাণ চাইছে। এর চাইতে হাস্যকর কাণ্ড বোধহয় পৃথিবীর আর কোনও দেশে কোনও দিন হয়নি।

( শিক্ষক, কোচবিহার)

* বর্ষশেষের দিনে (ডিসেম্বর ৩১,২০২৫) আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তরবঙ্গ সংস্করণে `আপনার অভিমত-এ প্রকাশিত একটি লেখা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আনন্দবাজার পত্রিকা।  


Tuesday, December 23, 2025


 


সকলেই কবি নয় 

শৌভিক রায় 


কুয়াশা দিন। রোদ উঠল বেশ বেলায়। 


ডিসেম্বর মাস। সামনে রেজাল্ট । রোদে বসে কাজ করছিলাম। স্কুলের মাঠে। 


ভদ্রলোক ঢুকলেন স্কুলে। হাতে কিছু বই। সামনে দিয়েই চলে গেলেন। ভেতরে।


পাবলিশার বা তাঁর প্রতিনিধি নন। বোঝা যাচ্ছিল। অপ্রতিভ চেহারা। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। আটপৌরে পোশাক। শহুরে স্মার্টনেস নেই। বিভিন্ন ক্লাসের স্পেসিমেন বই দিতে যারা আসেন, তারা অনেক ঝকঝকে, চটপটে হন। 


খানিক পরেই মানুষটি আমার সামনে এসে হাজির। মুখে কুণ্ঠিত হাসি, 

- একটা বই নেবেন? কবিতার...


 ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। ভাল করে দেখলাম। হাতে বেশ কিছু চটি বই। এক ফর্মার। স্থানীয় কোথাও ছাপা হয়েছে বুঝতেই পারছি। এক ঝলকে দেখা গেল দুই একটি কবিতা। সেগুলির মান নিয়ে কিছু বলছি না। পাঠক যা মনে করবেন সেটাই সঠিক।


চোখ আটকে গেল উৎসর্গ পাতায় এসে। দুজন অতি-পরিচিত মানুষকে উৎসর্গ করা হয়েছে।তাঁরা দুজনই ফালাকাটার। দুজনেই গুণী মানুষ ও শিক্ষক।

- আপনার বাড়ি কোথায়?

- শালকুমারে।

- বই তো ছাপিয়েছেন দেখছি ফালা....

- হ্যাঁ ফালাকাটায়। 

- সুভাষ সেনগুপ্ত ও হীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য কে উৎসর্গ করেছেন। কারা এঁরা?

- সুভাষবাবু ফালাকাটা হাই স্কুলের হেড স্যার ছিলেন। আর উনি তো প্রিন্সিপাল।

 - আচ্ছা। কিন্তু আপনার বাড়ি তো শালকুমারে। এঁদের জানলেন কীভাবে?

- আমি তো ফালাকাটা কলেজে পড়েছি। স্কুল‌ও ওখানেই।

- তার মানে আপনি এই দুজনের ছাত্র।

- একজনের। হীরেনবাবুর। আর স্কুলে যখন পড়ি, তখন সুভাষ স্যার ছিলেন না।

- কোন সালে পড়েছেন?

- ৯৩-৯৪ হবে। নীরদ বরণ রায় তখন হেডমাস্টার।

- তাই?


মোবাইল ফোন থেকে নীরদ বরণ রায়ের ছবি দেখালাম। সঙ্গে লীলা নাগ রায়েরও।


- হ্যাঁ হ্যাঁ এই তো আমার স্যার আর ম্যাডাম। কিন্তু আপনি কেমন করে চেনেন?


সহকর্মী দীনবন্ধু উত্তর দিল,

- এই দাদার বাবা মা ওঁরা।

- স্যার আপনার বাবা? বলেন কী! স্যারের মতো মানুষ.... আমার এই বইটা স্যারকে উৎসর্গ করা...


ভদ্রলোকের চোখ ছলছল। এগিয়ে দিলেন আর একটি বই। আমি খানিকটা কনফিউজড। মানুষটা কি আমাকে আগে থেকে জানতেন? ইচ্ছে করে এসেছেন? কেউ যে কেনেনি ওর বই, সেটা বুঝতেই পারছি। হয়ত জেনেশুনেই...


নাহ! ভাবনাটাকে প্রশ্রয় দিলাম না। আমাকে চিনবার প্রশ্ন নেই। এমন কেউ নই আমি যে আমাকে জানতে হবে। ব্যর্থ হয়ে চলে যেতে যেতে, একবার চেষ্টা করেছিলেন আমার কাছে। আমি নাও নিতে পারতাম। কিন্তু নিলাম। নিয়েও বইটি রেখে দিতে পারতাম। পাতা না উল্টিয়ে। কিন্তু দেখলাম! আর চোখ আটকে গেল উৎসর্গ পত্রে। 


কবি আরও দুটি বই দিয়ে গেলেন। একটির পয়সায়। আর কিছু নিলেন না।


- বইমেলা চলছে। যান। দেখুন যদি কেউ নেয়।

- হ্যাঁ যাব ভাবছি। কেউ তো কবিতার বই কেনে না। তার ওপর আমার বইয়ের যা দশা!

- ওরকম ভাববেন না। আপনি কবিতা লিখে বই তৈরি করে বিক্রি করছেন। সবাই এটা পারে না। - শহুরে পালিশ লাগে। বুঝলেন!

- প্রয়োজন নেই। এরকমই থাকুন। 


কবি চলে যাওয়ার আগে একটা ছবি তুললাম। কোচবিহার বইমেলা শেষ হবে কাল। মানুষটি যদি বইমেলায় থাকেন, তবে প্রার্থনা করব, ওঁর বই বিক্রি হোক সামান্য হলেও। 


বাবা মায়ের ছাত্র। স্কুলও এক আমাদের। কবি ভাইটির জন্য এই শুভেচ্ছা রাখা ছাড়া আর বা কী করতে পারি!



Monday, December 22, 2025

সূর্যের আলো বুকে নিয়ে

শৌভিক রায়

নিজের সম্পাদিত `মুজনাই` অনলাইন পত্রিকায় নাদিরা আহমেদের `মুখোশ পৃথিবী` কাব্যগ্রন্থের পাঠ প্রতিক্রিয়ায় লিখেছিলাম-
`` 'চিরকাল গরমভাত ও নরম বালিশ পেয়েই খুশি' কবি নাদিরা আহমেদ সমকালকে ধরেছেন তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'মুখোশ পৃথিবী'-তে। কোচবিহার জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বড় হয়ে ওঠা কবির সৃষ্টিতে মাটির গন্ধ আর জীবনের অনুসঙ্গ। তাই তিনি বালুচরের ছবি বাঁধানোর সঙ্গে সঙ্গে তুলে ধরেছেন সন্ত্রাসী পুরুষ, অবৈধ সন্তান বা ঋতুচক্রকে। কেননা তাঁর মনে হয়েছে `কখনো চাঁদ উঠলে ভালোবাসা ও চুমু নামক শব্দগুলি জুড়ে দেব না হয়`। বাস্তব এটাই। এই নৈরাজ্যের নেই রাজ্যে, যেখানে সবকিছুই আপোষ আর স্বার্থপরতায় মাখামাখি, সেখানে দাঁড়িয়ে `চিতা ও বসন্ত গুলিয়ে` যায় বৈকি! অত্যন্ত সমাজ-সচেতন কবি তাই তাঁর সৃষ্টিতে তুলে ধরতে পেরেছেন মুখোশ পৃথিবী। আর তা ধরতে গিয়ে আরোপিত হয়ে নয়, স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দভাবে জীবন এঁকেছেন তিনি। আসলে `উর্বর মাটিতে শেকড়সহ মানুষের ছবি` যিনি আঁকতে চান, তাঁকে শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে খোলা চোখে সব দেখতে হয়। নাদিরা আহমেদ সেটাই দেখেছেন। আশা করি, আগামীতেও এভাবেই দেখবেন।``
দুর্ভাগ্য, নাদিরা আর কোনও দিন কিছুই দেখবে না। `আগামী` শব্দটিও ফিরে আসবে না ওর জীবনে। কেননা, আমাদের সবাইকে স্তম্ভিত ও স্তব্ধ করে, ও নিজেই অতীত হয়ে গেল।
ইদানিং নাদিরা নিজের নামের সঙ্গে `আহমেদ`-এর বদলে `আজাদ` শব্দটি ব্যবহার করত। হয়ত ডাকনাম 'মুক্তি`-র সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই। ওর স্বল্প জীবনে ও আসলে স্বাধীনতার স্বপ্নই দেখেছে। প্রশ্ন হতে পারে, ও কি স্বাধীন ছিল না? আপাতভাবে নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু সেটা যেন সেই বিখ্যাত আপ্তবাক্যের মতোই Man is born free but everywhere he is in chains....। এমনিতেই কিছুটা গোঁড়া রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়ে ওঠা নাদিরার বেশ কিছু সামাজিক শৃঙ্খল ছিল। সেটা বোঝাই যায়। ছিল পারিপার্শ্বিক অদৃশ্য চাপও। কিন্তু সব কিছুকেই দূরে সরিয়ে দিতে পেরেছিল বিদ্রোহী এই মেয়ে। ফলে, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছের ছোট্ট জনপদ দিনহাটার মতো প্রত্যন্ত এলাকাতে থেকেও নাদিরা হয়ে উঠেছিল অনন্য। ও নাটক করেছে। আবৃত্তি করেছে। গান গেয়েছে। যোগ দিয়েছে সাংবাদিকতায়। নিজের মতো লিখেছে। ছুটে গিয়েছে মানুষের সেবা করতে। আর দেখেছে দিন বদলের স্বপ্ন। স্বপ্নসন্ধানী ছটফটে ছোট্ট মেয়েটি কবে যেন নিজেই হয়ে উঠেছে এক সম্ভাবনার প্রতীক।
`সম্ভাবনা`! বড্ড ক্লিশে মনে হয় আজকাল। আসলে যত অকালপ্রয়াণ দেখেছি, তারা প্রত্যেকেই `সম্ভাবনা` ছিল। নাদিরার মতো মেয়ে তো নিঃসন্দেহে ছিল এক প্রবল সম্ভাবনা। এতটাই যে, একটা সময় ওর লেখা ছাপতে ভয় পেয়েছেন অনেকে। পাশে দাঁড়াননি কেউ। অবস্থা চরমে উঠেছিল ২০২৪ সালের `রাত দখল`-কে কেন্দ্র করে। কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক তিলোত্তমার নৃশংস হত্যার পর যখন সমস্ত পশ্চিমবঙ্গ গর্জে উঠেছে, তখন দিনহাটায় প্রতিবাদ কর্মসূচিকে সংগঠিত করেছে নাদিরা। অবশ্যই ওর সঙ্গে সেই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন আরও অনেকেই। ওদের ওপর আক্রমণ নেমে এসেছিল কিছু দালাল ও দুষ্কৃতীর। ওদের মিছিল ও মিটিং করতে দেওয়া হয়নি। শারীরিকভাবে হেনস্থা করবার প্রচেষ্টাও হয়। আর তার পর থেকেই শুরু হয় লেখা না ছাপাবার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। আক্ষেপ করত নাদিরা।
১৩ মার্চ, ২০২৩, নাদিরাকে ওর ফোন নম্বর চেয়ে ফেসবুক থেকে মেসেজ করেছিলাম। উত্তরবঙ্গের আত্মার আত্মীয় `উত্তরবঙ্গ সংবাদ`-এর তদানীন্তন কার্যকরী সম্পাদক কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে খুঁজছিলেন। হয়ত খবরের প্রয়োজনেই। সবার প্রথমেই আমার নাদিরার কথা মনে হয়েছিল। ও ফোন নম্বর পাঠালে, জানিয়েছিলাম পত্রিকা দপ্তরে। কয়েক দিন পর জেনেছিলাম যে, নাদিরা সাংবাদিক হিসেবে উত্তরবঙ্গ সংবাদে কাজ করতে শুরু করেছে। খুশি হয়েছিলাম খুব। তবে ওর কর্মজীবন কবে শুরু ও কবে শেষ হয়েছিল সেই বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানিনি কখনও। আমার কাজ ছিল শুধু যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। বাকিটা ছিল পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ও নাদিরার মধ্যে।
ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা ও কথা ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর। দিনহাটায় `হিতেন নাগ সাহিত্য উৎসব`-এ নদী সম্পর্কিত একটি আলোচনায় অন্য কয়েকজনের সঙ্গে বক্তা ছিলাম আমিও। নাদিরা এসেছিল মধুমিতা ও সাহানুরকে নিয়ে। অনুষ্ঠান শেষে হইচই, ছবি তোলা, গল্প নানা। রাতেই মেসেজ এসেছিল ওর, `Sir, অনুষ্ঠানে তোলা ছবিগুলো আমায় দেবেন। ৯৬******৫৯ এটা আমার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার`। এরপর বার কয়েক ফোনে কথা হলেও, মেসেজ করিনি বা ও-ও করেনি। কিন্তু ও যে একই রকম আছে সেটা বুঝতাম ফেসবুকে ওর বিভিন্ন পোস্ট দেখে। সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে ওর শেষ পোস্টে ডঃ অরুণিমা ঘোষের একটি লেখা শেয়ার করে হেডিং লিখেছিল `কিন্তু অপগন্ড মূর্খদের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য বলে কিছু হয়ই না....` এই মানসিক স্বাস্থ্যেরই মুক্তি চেয়েছিল নাদিরা আজীবন। আজাদি চেয়েছিল ভণ্ডামি আর স্বার্থপরতা থেকে। উচ্চকিত বলেছিল, `ইদানীং কিছু লিখতে ইচ্ছে করেনা। সত্যি কথা সোজাসুজি লিখতে পারি না ; মিথ্যে কথা লিখতে ঘৃনা লাগে। ছোটোবেলার মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে যদি সত্যগুলো গরগর করে বলে ফেলতে পারতাম ; যদি কান্না পেলে চিৎকার করে অনেকটা কেঁদে একটা চকলেট হাতে খেলতে যেতে পারতাম তাহলে কতোই ভালো হতো। কিন্তু বড়ো বেলায় কষ্ট পেলে লুকোতে হয়, চোখ মুছে হাসতে হয়। আনন্দে জাপটে না ধরে সামলে নিতে হয় আবেগ। ইচ্ছা অনিচ্ছা গুলিয়ে একটা সমান্তরাল রেখায় রেখেছি। মিথ্যে বলার চেয়ে মিথ্যের অন্তরালে সত্য যাপন করার অনিবার্য প্রয়াস একদিন আমার মুখ থেকে মুখোশ সরিয়ে সত্যিকারের মিথ্যে চেনাবে ..... (৩০ অগাস্ট, ২০২৫)
নাদিরা বলেছিল, `আমি কখনোই পাহাড় হতে চাইনি / আমি কখনোই আমার সন্তানের নাম কাঁটাগাছ- রক্ত বা মরা নদী রাখিনি! / তবুও পৃথিবীর মায়া আমাকে নারীত্বের রুমাল (গ্লানি?) বেঁধে দিয়েছে.../ সেখানে সারাবছর ঝর্নার শীতল জল পরে বুক জুড়ে! / কান্নার মতো! পূর্ণনারীর থৈ থৈ চোখ যেমন...` মৃত্যুর হাতছানি সম্ভবত বুঝতে পেরেছিল ও। বলেছিল-
`ভুলে যাচ্ছি পুরোনো জ্যোৎস্না। বলতে হয় পুরনো আলোর মঞ্চে কার্টেন তুলে দিয়েছি। স্মৃতিরা নরম মাটিতে থাকলেও এবার কবরের জমিতে মাটিচাপা দিয়েছি।
অতীতের যেসব আলোকে স্নিগ্ধতা ভেবে গায়ে মেখেছি তা এখন কয়লার মতো গা থেকে তুলে ফেলছি দামি জল দিয়ে। আফশোষ আমাদের হৃদয়ের ফুলেল বাগানের আয়তন কমায় তাই আমি আফশোষ আর পুরোনো রাতের আলো নিভিয়ে নতুন রাতকে ডেকেছি।
ভালো স্মৃতি আলো দেয় আর খারাপ স্মৃতি দেয় বিস্মরণ। মুছে দিয়েছি পুরোনো উঠোনের আলপনা কান্নাকাটি ফ্যাকাশে আলতা। নতুন ভোরের মাটিতে মৃত্যু আসে তাও তো গোরস্তানে সূর্যের আলোর ছটা থাকবে..... এখানে কোনো কার্টেন নেই....'
নাদিরার `গোরস্তানে` সূর্যের আলো পড়ুক না পড়ুক, ওখান থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। নিশ্চিন্ত সেটা জানি....
সূর্যের আলো বুকে নিয়েই ঘুমিয়ে আছে আমাদের কন্যা।

** অকাল প্রয়াত নাদিরা আহমেদ কে নিয়ে সাশ্রয় নিউজের রবিবারের বিশেষ পাতা.....
https://l.facebook.com/l.php?u=https%3A%2F%2Fsasrayanews.in%2Fsasraya-news-sundays-literature-special-21st-december-2025-edition-92-%25e0%25a6%25b8%25e0%25a6%25be%25e0%25a6%25b6%25e0%25a7%258d%25e0%25a6%25b0%25e0%25a6%25af%25e0%25a6%25bc-%25e0%25a6%25a8%25e0%25a6%25bf%25e0%25a6%2589%25e0%25a6%259c-%25e0%25a6%25b0%25e0%25a6%25ac%2F%3Ffbclid%3DIwZXh0bgNhZW0CMTEAc3J0YwZhcHBfaWQQMjIyMDM5MTc4ODIwMDg5MgABHqaCBM7r31djA4JY69PGfz6FrsGZt-Zfz1MmGWpU_4errshf6TxRvTot_TgI_aem_f-pB6iQOEMDxbPxa4292Nw&h=AT2Jf5GETv2VvRqPiOU--JwZAK7_iJuQgKOGXp0AFldtgl1hR57BPGh07sU4mNet9ijOO-jy5vQ2RokG72wZneGXKmKLbeI7dtqFKYhlRCGGT9VY9Z2UNsM0USrcQ8boKJli0-y78BkeFUPx3gCM0ar-yrY_Yg&__tn__=H-R&c[0]=AT1EFmO9a1jK3LiiasOx0mOtPBDVwHbplYiOzNwgu3tmsa1FV1JuB16j8-O01shRSknOWNgypy0PhU-ZOsM2HQfxg0_z48pGYrkQcWEjKrJ8NL0Abr0NUQyJcEcpzQ0gBcw3ZILJpf4IM_Hn1Z8bOocvA62NzsskyQr3qqNuBpHSGbDv07h0snRoAClSWltr3LjiUyqtG3vZk2R5y2kC0A

Saturday, December 20, 2025

 ।। নিজের ভাবনায় ।।

শৌভিক রায়

বর্বরতা ও পৈশাচিকতার এক নতুন ভাষ্য তৈরি করছে প্রতিবেশী দেশ। আর সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার নোবেল জয়ী একজন মানুষ সেই রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে, সব দেখেও চোখ বন্ধ করে আছেন। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, তাঁর যথেষ্ট সায় আছে এই নব ভাষ্যে।
যেভাবে একজন মানুষকে (পড়ুন হিন্দু ধর্মাবলম্বী দীপু দাসকে) মেরে গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার চাইতেও বেশি মারাত্মক তথাকথিত সভ্য মানুষদের সেই ঘটনা মোবাইল ফোনে ক্যামেরাবন্দি করা। কোনও হেলদোল নেই কারও। এই নারকীয় উল্লাস হার মানিয়েছে তালিবানি সন্ত্রাসকেও। একই প্রকাশ দেখা গেছে ঐতিহ্যবাহী স্মারক বা ভবন ভাঙচুরে, পত্রিকা দপ্তরে আগুন লাগানোয়, অন্য দেশের হাইকমিশনে আক্রমণ করায়।
সভ্য মানুষের জামা কাপড় পরা এই লোকগুলি কারা! এরা লিখবে আগামীর ইতিহাস? ভাঙচুর, অগ্নি সংযোগ, ধর্ষণ, খুন হবে এদের কলম? এই জন্য কি এই দেশের জন্ম হয়েছিল!
একটি দেশকে শরিয়তি শাসনের ঘেরাটোপে ফেলে ক্রমশ মধ্যযুগে নিয়ে যাওয়ার ও সন্ত্রাসবাদের আখড়া বানানোর প্রধান কুশীলব এই ভন্ডগুলোকে সহ্য করাও অন্যায়।
সন্ত্রাস শেষ অবধি সন্ত্রাসের জন্ম দেবে। এর প্রবল অভিঘাত আছড়ে পড়বে সর্বত্র। আর তার ফল হবে অকল্পনীয়, অবর্ণনীয়.....

Monday, December 15, 2025

 কবি 

শৌভিক রায় 

মঞ্চে গুছিয়ে বসেছেন কবি। তাঁর ডান দিকে স্থানীয় কেউ একজন। বাঁয়ে এখানকার পৌরপ্রধান। ঘোষক অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে বারবার তাঁর নাম ঘোষণা করছেন। উদ্যোক্তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে, এই খারাপ শরীর নিয়েও, তিনি এই শহরে এসেছেন।  তারা ধন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। 

তিনি যেখানেই যান, সবাই দারুণ খুশি হয়। সেটা তিনি বোঝেন। রাজ্যের লোক তাঁর সঙ্গে দেখা করে। তাঁর বই নিয়ে এসে সই নেয়। নিজের বই উপহার দেয়। আর সেলফি? সে তো তোলেই।

কবি হাসি মুখে সব সহ্য করেন। উপহারের একটি বইও তিনি পড়েন না। তাঁর লোক আছে। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথের দোকানে ওসব `ট্র্যাশ` চলে যায়। কিছু আমদানি হয়। সেলফিগুলি ইন্সটাগ্রামে আর ফেসবুকে ঘুরে তাঁর প্রচার করে। 

মঞ্চে বসে, তিনি ওপর থেকে হলে ঢুকবার দরজার দিকে নজর রাখছেন। ওখানে একটি টেবিলে তাঁর বই সাজানো আছে। এখানকার কবি যশপ্রার্থীরা উদ্যোগ নিয়ে তাঁর বই বিক্রি করছে। 

তিনি যেখানে যান, এটুকু করিয়ে নেন। শর্ত থাকে, অ্যাপিয়ারেন্স ফিয়ের পাশাপাশি তাঁর নির্দিষ্ট সংখ্যক বই বিক্রি করতে হবে। মোটামুটি সকলেই মেনে নেন। যারা পারেন বিক্রি করে দেন।  যারা পারেন না, নিজেরাই কিনে নেন। 

তাঁর প্রথম দিকের গোটা দশেক বই হৈহৈ করে বিক্রি হয়েছিল। তারপর তাঁর লেখায় বদল এসেছে। আলোচকেরা বলেন, আজকাল আর তাঁর লেখা `কবিতা` হচ্ছে না। এদিকে বইয়ের সংখ্যা তিরিশ ছাড়িয়ে গেছে। 

কবি দেখলেন এখানে ভালোই বিক্রি হচ্ছে। বই কিনেই কেউ এগিয়ে এসে, মঞ্চ উঠে তাঁকে দিয়ে বইয়ের ওপরে লিখিয়ে নিচ্ছে। তিনি হাসি মুখে সব আবদার মেনে নিচ্ছেন। 
 
হঠাৎ কবির শিরদাঁড়ায় ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। তাঁর দিকে এবার যে এগিয়ে আসছে, তাকে তিনি খুব ভাল চেনেন। এর লেখাগুলি থেকেই তো তিনি....। কিন্তু এ তো বহুদিন আগেই জলে ডুবে...। 

আজকাল ও বারবার কেন আসছে? কী বলতে চায়? এভাবে কেন ভয় দেখাচ্ছে? তিনি তো ওকে ডুবিয়ে দেননি। শুধু ওর লেখাগুলো....

কবি আর কিছু ভাবতে পারলেন না। 
অন্য তিনবারের মতো এবারেও কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। 

Sunday, December 14, 2025

 

। নিজের ভাবনায় ।।

     শৌভিক রায় 


কোনও একটি লেখায় পড়েছিলাম, 'বাঙালিরা ছিল-র দলে আছে, আছে-র দলে নেই।' 

হ্যাঁ, বাঙালিরা ছিল। কোনও এক সময়। কোনও এক অতীতে। তখন ছিল What Bengal thinks today, India thinks tomorrow - এর যুগ। এই সময় বাঙালি মনন ও বুদ্ধিমত্তা দেশকে আলোকিত করেছে। 

সেই সুবর্ণ যুগ তো কবেই অতিক্রান্ত। ক্রমশ নিচে নামতে নামতে আমরা নেমেই গেছি। নিজেদের ঐতিহ্যকে নিজেরাই খুন করেছি। আর আজ রাজাকে উলঙ্গ দেখেও হাততালি দিয়ে চলেছি। 

আমাদের স্তাবকতা নিজেদের কতটা হীন করছে প্রতিনিয়ত, সেটা বোঝার ক্ষমতাটুকুও নেই আমাদের। তাই সামাজিক, রাজনৈতিক, নান্দনিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি সব জায়গায় দালালদের ভিড়। সর্বভারতীয় স্তরে মুখ পোড়াতে, বিশ্বের কাছে মাথা হেঁট করাতে এরা সিদ্ধহস্ত। 

যে রাজ্যগুলি এক সময় বাংলার দিকে তাকিয়ে থাকত, তারা আজ বাংলার চাইতে কয়েক যোজন এগিয়ে। আর আমরা ক্রমশ পেছন দিকে এগিয়ে চলেছি.... 


 

হায়দরাবাদের  শিল্পগ্রাম শিল্পরমামে  
শৌভিক রায় 

শহরের মধ্যে শহর থাকে। গ্রামের মধ্যে গ্রাম। কমবেশি এটাই জানতাম। কিন্তু শহরের মধ্যে গ্রাম! ভাবনাতেই ছিল না।  হায়দরাবাদের   শিল্পগ্রাম `শিল্পরমাম`-এ এসে বিস্মিত হলাম তাই।

হায়দরাবাদের গিয়েছিলাম দিন কয়েক আগে। প্রথম দর্শনেই নিজামের শহর মন কেড়ে নেয়। একদা এই শহরের প্রবল প্রতাপশালী শাসক কুলি কুতুব শাহ, ভালবেসে বিয়ে করেন বানজারা হিলসের নর্তকী, ভাগমতীকে। তাঁর নামেই শহরের নাম দেন ভাগ্যনগর। কোনও চাপ না থাকলেও, ভাগমতী, নিজেই ধর্মান্তরিত হয়ে, নাম নিয়েছিলেন হায়দার মহল। কালক্রমে সেই নাম থেকেই ভাগ্যনগর হয়ে উঠল  হায়দরাবাদ । 

ঐতিহাসিকরা অবশ্য এই তত্ত্ব মানতে রাজি নন। তাঁদের মতে, চারদিকের 'বাগ' বা বাগান থেকে ভাগনগর (বাগনগর) কিংবা নবাব পুত্র হায়দারের নাম থেকে ` হায়দরাবাদ ` এসেছে। তত্ত্ব যা-ই হোক, আমার কাছে  হায়দরাবাদ  মানে তুফানি প্রেমের এমন এক শহর, যেখানে হাতে হাত ধরে চলেছে ইতিহাস আর আধুনিকতা। বিত্ত আর বৈভব। সঙ্গে যোগ হয়েছে রুচি। ফলে গোলকুণ্ডা ফোর্ট, কুতুব শাহি সমাধি, হুসেন সাগর লেক, ওসমান সাগর, এনটিআর সমাধিক্ষেত্র, চারমিনার, মক্কা মসজিদ, সালার জং মিউজিয়াম,  চৌমহলা, ফলকনামা প্যালেস, রামোজি ফিল্ম সিটি ইত্যাদি দেখে প্রবল মুগ্ধ হয়েছি। চেখে নিয়েছি প্যারাডাইসের বিশ্ববিখ্যাত হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি ও করাচি বেকারির সুস্বাদু কেক। আর এখন শিল্পরমামে এসে মনে হচ্ছে, এমনটাও হয়! 


হায়দরাবাদের হাইটেক সিটির হৈচৈ থেকে ১৪ কিমি দূরে, মাধপুর এলাকায় তৈরি করা হয়েছে এই গ্রামটি। উদ্দেশ্য ভারতীয় শিল্প ও স্থাপত্যকে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়া। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিল্পীরা এসে সাজিয়ে গেছেন  গ্রামটিকে। কর্পোরেট দুনিয়ার দেখনদারির মাঝে, ৬৫ একর জমি নিয়ে, ১৯৯২ সালে নির্মিত কৃত্রিম গ্রামটিতে রয়েছে দুরন্ত সব শিল্পকর্ম। সঙ্গে নিজেদের সৃষ্ট জিনিসের পসরা নিয়ে বসেছেন স্থানীয় শিল্পীরা। চলছে বেচাকেনা। বছরভর লেগে আছে শিল্প প্রদর্শনী সহ লোকসংস্কৃতি বিষয়ক নানা অনুষ্ঠান। উঁচুনিচু পাথর, ঝরনা, সবুজ প্রান্তর ঘেরা শিল্পরমামের সর্বভারতীয় কলা ও হস্তশিল্প উৎসব ইতিমধ্যেই অত্যন্ত পরিচিত। প্রত্যেক বছর ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হওয়া সেই উৎসবে ভাগ নেওয়া বোধহয় সব শিল্পীরই স্বপ্ন। 
 
শিল্পরমামের প্রবেশ পথেই `রিক্রিয়েশনাল এরিয়া`। এথনিক মোটিফ, টেরাকোটা স্থাপত্যে সজ্জিত এলাকাটির শৈল্পিক ছাপে মুগ্ধ হলাম। সব কিছুই অত্যন্ত সুচারুভাবে রাখা হয়েছে। আর তাতেই ফুটে উঠেছে ঐতিহ্যের সঙ্গে আভিজাত্য। অনবদ্য লাগল ভিলেজ মিউজিয়ামটি। এখানে ভারতের চিরায়ত গ্রামীণ জীবন ছবি তুলে ধরা হয়েছে প্রমাণ সাইজের ১৫টি কুঁড়েঘর ও অদ্ভুত সুন্দর সব মূর্তি দিয়ে। গাছপালায় ঘেরা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সবকিছুই এতটা জীবন্ত যে, মনেই হয় না সেগুলি মানুষের হাতে তৈরি। এই এলাকাটি এক ঝলক দেখলেই, নিতান্ত অজ্ঞ মানুষও ভারতীয় গ্রাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা করতে পারবে। 

আধুনিক স্থাপত্যের অদ্ভুত সব কাজ রয়েছে রক মিউজিয়ামে। তবে চারদিকের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথরগুলিও যেন নিজস্ব স্থাপত্য তৈরি করেছে। এই মিউজিয়ামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শান্তিনিকেতনের সুব্রত বসুর নাম। প্রদর্শিত হয়েছে বুদ্ধের মূর্তি থেকে মেটামরফোসিস। অদিতি গর্গ, রতন সিং, রাজীব মন্ডলের মতো শিল্পীরা আপন খেয়ালে সাজিয়েছেন শিল্পরমামের এই অংশটি। তবে অনন্য হল স্কাল্পচার পার্কটি। যখন এই পার্কটি নির্মিত হয়, তখন ধারণাটি একদম নতুন ছিল। সেই হিসেবে এটি ভারতের মধ্যে প্রথম। নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশ নিয়ে যে কলা প্রদর্শিত হয়েছে, সেগুলি না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আসলে কোনওকিছুই যে ফেলনা নয়, সেটা বোঝা যায় স্কাল্পচার পার্ক দেখে। রোমাঞ্চিত হলাম তাই। একই কথা বলব  ১৫০০ আসনের অ্যাম্পিথিয়েটারের ক্ষেত্রেও।  এখানে প্রতি সন্ধ্যায় খোলা আকাশের তলায়  বসে কর্ণাটকি বা কুচিপুরি সংগীত ও নৃত্যের আসর। 

গোরুর গাড়িতে চেপে ঘুরে গ্রামীণ জীবনের আস্বাদ নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে শিল্পরমামে। ভিড় দেখলাম ভারতীয় হস্তশিল্পের দোকানগুলিতে। মজুদ কাঞ্জিভরম, টাঙ্গাইল, সম্বলপুরি, কাশ্মীরি, ধর্মাভরম ইত্যাদি নানা ধরণের সিল্কের শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজ। 

শিল্পরমাম থেকে ফিরবার পথে পড়ল পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক লেক দুর্গম চেরেভু। সিক্রেট লেক নামেও এর পরিচিতি রয়েছে।  তিরাশি একর এলাকা জুড়ে থাকা এই লেক, একসময় গোলকুণ্ডা ফোর্টের পানীয় জলের উৎস ছিল। পরে হয়ে ওঠে মৎস্য শিকারীদের প্রিয় জায়গা। আর এখন তো কৃত্রিম ঝর্ণা, আলোকসজ্জা, রক ক্লাইম্বিং ইত্যাদি নিয়ে হায়দ্রাবাদের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। লেকের চারপাশে ঘুরে বেড়াবার সুন্দর পথ আর সুদৃশ্য সেতু চোখ টানতে বাধ্য। এই লেক পরিচিত ১৪৯ প্রজাতির পাখির জন্যও।  

হায়দরাবাদের পরিচিত দ্রষ্টব্যগুলি থেকে কিছুটা আলাদা এই দুই জায়গা সত্যিই  শহুরে কোলাহল থেকে মুক্তির টাটকা হাওয়া। গ্রাম ঘুরেছি অনেক। কিন্তু মহানগরের মধ্যে গ্রাম? এই প্রথম।

(প্রকাশিত: আয় মন বেড়াতে যাবি/ রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ/ ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫)


Tuesday, December 9, 2025


 

কতটা সূক্ষ্ম তারে হাঁটতে হচ্ছে, জানেন বিএলও-রাই  
শৌভিক রায় 

শিক্ষক হিসেবে প্রাক্তন ছাত্রটির জন্য গর্ব বোধ করছি। মনে হচ্ছে, আমাদের শিক্ষা ব্যর্থ হয়নি। পিতৃশোক নিয়েও প্রাথমিক শিক্ষক সেই ছাত্রটি বিএল‌ও হিসেবে এসআইআর-এর কঠিন কাজ করে চলেছেন। অবশ্য তিনি একা নন, তাঁর মতো আরও কয়েকজন আছেন, যাঁরা কর্তব্যে অবিচল। পরিস্থিতি বিচারে, ইচ্ছে করলেই তাঁরা এই দুরূহ অব্যাহতি পেতেন। কিন্তু সেটি তাঁরা করেননি। এখানেই তাঁরা আলাদা, অন্যদের চাইতে। 


এসআইআর শুরু হওয়ার পর থেকেই, এই বঙ্গ সহ সারা দেশেই রাজনৈতিক পারদ চড়েছে। বিএলও-রা আন্দোলন করেছেন। কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকের মৃত্যু হয়েছে। কেউ আবার আত্মহত্যা করেছেন বলেও অভিযোগ এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তরফে এসআইআর বন্ধ করার দাবি উঠেছে। আবার এসএইআর-এর  প্রয়োজনীয়তা নিয়েও গলা ফাটাচ্ছেন অনেকে।

এসআইআর কিন্তু আগেও হয়েছে। এমন নয় যে এই প্রক্রিয়া এ বারেই প্রথম। তবে সেই সময় এই রকম শোরগোল লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু এবারের এসআইআর-এর আবহ আলাদা। বিশেষ করে, আমাদের রাজ্যে। আগামী বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে, অনুপ্রবেশ সমস্যা 'পাখির চোখ' করে ঘুঁটি সাজাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। সঙ্গে যোগ হয়েছে, ধর্ম নিয়ে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন। 

কোনও সন্দেহ নেই, স্বাধীনতার পর থেকেই অনুপ্রবেশ এই রাজ্যের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। কাঁটাতার, সীমান্তে কঠোর নজরদারি কোনও কিছুই সেই সমস্যাকে বন্ধ করতে পারেনি। অবৈধ উপায়ে এই দেশে এসে প্রভাবশালীদের সাহায্যে খুব সহজেই ভোটার লিস্টে নাম তুলে ফেলার দীর্ঘ ইতিহাসও আছে এই রাজ্যে। ফলে জনসংখ্যা যেমন ক্রমশ বেড়েছে, তেমনি চাপ পড়েছে অর্থনীতিতেও। অনেক সময় নিজেদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন রাজ্যের মানুষই। 

ফলে, অনুপ্রবেশ রোধে অবিলম্বে কিছু করা দরকার। তা নিয়ে দ্বিমত নেই কারও। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে যেভাবে ধর্মীয় পরিচয় বড় হয়ে উঠছে, তাতে এসআইআর-এর উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। কিন্তু এটাও ঠিক, এসআইআর শুরু হওয়ার পর, নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য সীমান্তে ভিড় দেখে মনে হচ্ছে, অবৈধ অনুপ্রবেশের হিমবাহ কিছুটা হলেও গলতে শুরু করেছে। আর তার জন্য কিন্তু কৃতিত্ব প্রাপ্য সেই সব কর্মীদের যাঁরা নাওয়া খাওয়া তো বটেই, পিতৃ-মাতৃ শোক পর্যন্ত ভুলে দিনরাত খেটে চলেছেন। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, আর এক পরিচিত প্রাথমিক শিক্ষক বিএল‌ও-র কথা। ইতিমধ্যে একশো শতাংশ কাজ শেষ করে তিনি জেলা প্রশাসনের বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন। 

রাষ্ট্র প্রদত্ত একটি কঠিন কাজ যেভাবে বিএল‌ও-রা করছেন, তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। খারাপ লাগে যখন তাঁদের কটু কথা শুনতে দেখি। যাঁরা সেটি করছেন, তাঁরা একবার নিজেদের সেই জায়গায় রেখে দেখুন, তবেই বুঝতে পারবেন। একমাত্র বিএলও-রাই জানেন, কতটা সূক্ষ্ম তারের ওপর তাঁদের হাঁটতে হচ্ছে। একদিকে বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়। অন্যদিকে অবৈধ ভোটারের নাম তালিকাভুক্ত হলে, চাকরি হারানোর ভয়। এই দুইয়ের মাঝে মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করে চলেছেন তাঁরা। আর পৌলব, জয়তোষের মতো মানুষেরা দৃষ্টান্ত রাখছেন কর্তব্যনিষ্ঠা ও দায়িত্বের। তাই অন্য কিছুর সঙ্গে, এসআইআর থেকে পাওনা কিন্তু এই মানুষগুলিও।


(শিক্ষক, কোচবিহার)

(প্রকাশিত: আনন্দবাজার পত্রিকা, উত্তরবঙ্গ সংস্করণ, ডিসেম্বর ৯, ২০২৫
  ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আনন্দবাজার পত্রিকা )

Saturday, December 6, 2025


 


সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়  
পর্ব- একত্রিশ 

ভোর ভোর বেলা। ঝুপি ঝুপি অন্ধকার। বৃষ্টি হয়েছে। রাতে। জমে আছে মেঘ। জানি। কেটে যাবে। জানি। ঝকঝক করবে কাঞ্চনজঙ্ঘা। উত্তরে। দেখা যাবে। জানি। 
 
স্কুল শেষ। কলেজ শুরু। চলে যেতে হবে। এই যাওয়াই, চলে যাওয়া। মায়ের কাছ থেকে। জানি। যারা ঘর ছাড়ে, তারা ফেরে। কিন্তু ফেরে না। ফিরব আমিও। তবে ফিরব না। কেউ ফেরে না। জানি। 

মায়ের চোখ শুকনো। আমার চোখ শুকনো। আমি কাঁদি না। মা কাঁদে। লুকিয়ে। টের পাই। মায়েরা কাঁদে। 

কান্নাই কি মায়েদের জীবন? মানুষের জীবন? কেন চলে যায় মানুষ? কেন ফেরে না? না, ফেরে। কিন্তু ফেরে না। আবছা হয়ে যায় সব। স্মৃতি হয়ে যায় যাবতীয়। ভারি হয়ে চারদিক। যে ফেরে, সে `সে` নয়। নতুন কেউ। তাকে চিনতে হয়। জানতে হয়। বুঝতে হয়। শুরু হয় সব। নতুন করে। আবার। 

ফেরা। অথচ না-ফেরা। চেনা। অথচ আধা-চেনা। জানা। কিন্তু অজানা।

ঘর ঝাঁট দেয় মা। বারান্দা ঝাড়ে। বাসি ঘর। ঝাঁট না দিলে বেরোতে নেই। মা বলে। ঘরও বাসি হয় মা? খাবারের মতো? বাসি হয়ে যায় সব কিছু? মানুষও? সন্তানও? তবে তুমি কেন বাসি হও না, মা! 

মায়েরা বাসি হয় না। তরতাজা থাকে মা। 

বেরিয়ে পড়ি। এগিয়ে চলি। এগোই? সত্যি? কে জানে। পেছনে পড়ে থাকে মা। বাবা। বাড়ি। 
আবার বাড়ি হবে। নিজের। দাঁড়িয়ে থাকব একদিন। আমিও। কেউ এগিয়ে যাবে। সত্যি? এগোবে? পেছনে ফেলে কাউকে, এগোনো কি যায়! 
মিটিমিটি হাসে সূর্য। সূর্য মানে তো জীবন। 

এই সেই যাওয়া। একেবারে। যেতে হয়। এভাবেই। যায় সবাই। আমিও। 
আমার পরেও কেউ যাবে। এভাবেই। বিষণ্ণ হবে রাত। দিন। চারপাশ। তবু যাবে। ফিরবে না। ফিরবে। কিন্তু ফিরবে না। 

হাত বাড়ালো। সময়। নরম। সেই হাত। শক্ত নয়। টলমলে। চারপাশে অন্ধকার। আমার। বৃষ্টি হয়েছিল। কবে যেন। থেমে গেছে। কিন্তু মেঘ কাটেনি। আসেনি বৃষ্টিওয়ালা। আসবে। মা বলেছে। বুলিয়ে দিয়েছে হাত। স্নিগ্ধ। সেই হাত। মায়ের। 

বৃষ্টি নামাতে হবে। যেভাবেই হোক। অন্ধকার সরাতেই হবে। যেমন করেই হোক। রোদ ঝলমলে দিন আনতেই হবে। যে কোনও উপায়েই হোক। 

রোদ ঝলসালে বৃষ্টিওয়ালা চলে যাবে? মা চলে যাবে? 
যে বৃষ্টিওয়ালাকে ভোলে, সে ভুল করে। বড় ভুল করে। 

যে মা কে ভোলে?
উত্তর নেই। উত্তর হয় না........   

(ছবি- লেখক)      

Tuesday, December 2, 2025

 ।। নিজের ভাবনায় ।।

      শৌভিক রায় 

একটি কবিতা লিখতে কবিকে যে যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়, তা তুলনীয় একমাত্র গর্ভযন্ত্রণার সঙ্গে। আমার কথা নয়। এমনটা মনে করতেন প্রখ্যাত কবি টি এস এলিয়ট।  আর এক বিখ্যাত কবি জীবনানন্দের 'সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি' তো আপ্তবাক্যে পরিণত হয়েছে।

তবে সংজ্ঞার ঘেরাটোপে কখনই কোনও লেখা জন্ম নেয় না। কবিতা তো নয়ই। আসলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে (কবিতার ব্যাকরণ বাদে) কবিতা লিখতে গেলে, সেটা কবিতা থাকে না। তাছাড়া কবিতার সংজ্ঞাও তো প্রচুর।  'আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ' মানেই কবিতা, এমনটাও তো কেউ ভাবতেন বা ভাবেন।  

ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বুদ্ধিমত্তা ও আবেগের মিশ্রণেই জন্ম নেয় কবিতা। বাকি সব আর যা হোক, কবিতা নয়।  বিশ্বাস করি, কবিতা `লেখা` হয় না, কবিতা জন্ম নেয় এবং তার জন্য লাগে দীর্ঘ সময়। যা ইচ্ছে লিখলাম, যে কেউ ছাপিয়ে দিল আর তাতেই কবি হয়ে ওঠা গেল- এই ব্যাপারটা আসলে ভাবের ঘরে চুরি। 

আজকাল প্রচুর 'কবিতা' (?) লেখা হচ্ছে। কেউ প্রতিদিন লিখছেন। কেউ দুই বেলায় লিখছেন। কোনও সমস্যা নেই তাতে। লেখার অভ্যাস তো রাখতেই হবে। আর হয়ত এই বিপুল পরিমাণ লেখার মধ্যে থেকে লুকিয়ে জন্ম নেবে একটি বা দুটি কবিতা। কিন্তু ওই অবধিই। এর বেশি নয়।  

সংখ্যা নয়। পাখির চোখ হওয়া উচিত মান। তাতে কবির পাশাপাশি পাঠকেরও বৌদ্ধিক ও মানসিক বিকাশ হয়। 
কবিতার জয়যাত্রার রথ মুখ থুবড়ে পড়ে না....