যেন ভুলে না যাই তাঁদের.....
`নেই রাজ্যে`র বাসিন্দা হওয়ার ভয় সাবেক ছিটমহলে
শৌভিক রায়
বছর কয়েক আগে ছিটমহল নিয়ে এক বিশেষ কাজে `সেটেলমেন্ট এনক্লেভ`-এ গিয়েছিলাম। সেখানকার বাসিন্দারা তখন অবশ্য ভারতীয় নাগরিক। অপেক্ষা শুধু বাড়ি তৈরির জমি পাওয়ার। তাঁদের মধ্যেই দেখেছিলাম মানুষটিকে। এক অদ্ভুত সমস্যার মুখোমুখি তিনি।
এই দেশে যখন ছিটমহলের বাসিন্দাদের নাম সরকারিভাবে নথিভুক্ত করা হচ্ছে, তখন তিনি ওদেশে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেননা নির্দিষ্ট একটি তারিখের মধ্যে ওদেশের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক মিটিয়ে দিতে বলা হয়েছিল। জলের দরে সম্পত্তি বিক্রি করে তিনি যখন ফিরে এলেন, ততদিনে এখানে নাম নথিভুক্তকরণ শেষ। পরিবারের সবাই ভারতের নাগরিক হয়ে গেলেও, তিনি হতে পারেননি। ওদিকে ওই দেশ থেকেও তাঁর নাম বাদ পড়ে গেছে। ভারতীয় হাইকমিশনও তাঁর ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি করেনি। ফলে আমাদের সঙ্গে যখন কথা বলছেন, তখন তিনি কোনও দেশেরই নাগরিক নন।
চোখের সামনে একজন নাগরিকত্বহীন মানুষকে দেখে চমকে গিয়েছিলাম আমরা সকলেই। এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর, ছিটমহলের বাসিন্দাদের, বিশেষ করে মহিলাদের, অবস্থা দেখে সেই মানুষটির কথাই আবার মনে হচ্ছে। তাঁর মতোই না হয় তাঁদের অবস্থা।
ছিটমহল প্রত্যর্পণের পর অনেকগুলি বছর কেটে গেছে। তার আগেই ছিটমহলের বহু মহিলার বিয়ে হয়েছে। তাঁরা ছড়িয়ে পড়েছেন এদিকে ওদিকে। এসআইআর নথিতে আত্মীয়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁরা এমন কাউকে দেখাতে পারছেন না, যিনি ২০০২ সালে ভারতের ভোটার ছিলেন। ফলে বহু মহিলার ভবিষ্যত এখন প্রশ্নের মুখে। ইতিমধ্যে অনেকেই কমিশনে ডাক পেয়েছেন। কিন্তু কেউ-ই বুঝে উঠতে পারছেন না, কীভাবে নিজেদের পক্ষে যুক্তি সাজাবেন।
অথচ কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের কেউ-ই তাঁদের সমস্যা জানেন না, এটা হতে পারে না। কিন্তু তাঁদের জন্য কারও কোনও মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। ফলে ভীষণ বিড়ম্বনার মধ্যে রয়েছেন তাঁরা। ভয় পাচ্ছেন আবার না তাঁদেরকে `নেই রাজ্যের` বাসিন্দা হতে হয়। এতদিন যে অন্ধকারে ছিলেন, সেখান থেকে সামান্য আলো দেখে আবার যদি অন্ধকারেই ফিরতে হয়, তবে প্রত্যর্পণ চুক্তিতে লাভ হল কোথায়? সেটি তো করা হয়েছিল নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার জন্যই। সে দিন যদি বিষয়টিকে মান্যতা দেওয়া যায়, তবে আজ আবার নতুন করে প্রমাণ দেওয়ার কী আছে?
আসলে ছিটমহলের বাসিন্দাদের নিয়ে সেভাবে কারও বিশেষ কোনও ভাবনা ছিল না। নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক বাড়াতে যে যেভাবে পেরেছে, তাঁদের ব্যবহার করেছে। প্রয়োজন শেষ হলে সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে আজ তাঁদের কী হল, সেটা নিয়ে কারও হেলদোল নেই। বিচ্ছিন্নভাবে দুই-একজন প্রতিবাদ করলেও, সামগ্রিকভাবে এই অন্যায়ের কোনও প্রতিবাদ নেই। সাবেক বাসিন্দা তো বটেই, কেউ-ই বুঝতে পারছেন না কী ভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে।
অবিলম্বে যদি এই মানুষগুলিকে এই সমস্যা থেকে উদ্ধার না করা যায়, তবে যে যুক্তিতে ছিটমহল বিনিময় হয়েছিল, সেটিই সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যাবে। ভাবতে অবাক লাগে, যে রাষ্ট্র এক দশক আগেই যাঁদের নিজের নাগরিক বলে স্বীকৃত দিল, সেই রাষ্ট্রই আবার নাগরিকত্বের প্রমাণ চাইছে। এর চাইতে হাস্যকর কাণ্ড বোধহয় পৃথিবীর আর কোনও দেশে কোনও দিন হয়নি।
( শিক্ষক, কোচবিহার)
* বর্ষশেষের দিনে (ডিসেম্বর ৩১,২০২৫) আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তরবঙ্গ সংস্করণে `আপনার অভিমত-এ প্রকাশিত একটি লেখা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আনন্দবাজার পত্রিকা।

No comments:
Post a Comment