হায়দরাবাদের শিল্পগ্রাম শিল্পরমামে
শৌভিক রায়
শহরের মধ্যে শহর থাকে। গ্রামের মধ্যে গ্রাম। কমবেশি এটাই জানতাম। কিন্তু শহরের মধ্যে গ্রাম! ভাবনাতেই ছিল না।
হায়দরাবাদের শিল্পগ্রাম `শিল্পরমাম`-এ এসে বিস্মিত হলাম তাই।
হায়দরাবাদের গিয়েছিলাম দিন কয়েক আগে। প্রথম দর্শনেই নিজামের শহর মন কেড়ে নেয়। একদা এই শহরের প্রবল প্রতাপশালী শাসক কুলি কুতুব শাহ, ভালবেসে বিয়ে করেন বানজারা হিলসের নর্তকী, ভাগমতীকে। তাঁর নামেই শহরের নাম দেন ভাগ্যনগর। কোনও চাপ না থাকলেও, ভাগমতী, নিজেই ধর্মান্তরিত হয়ে, নাম নিয়েছিলেন হায়দার মহল। কালক্রমে সেই নাম থেকেই ভাগ্যনগর হয়ে উঠল
হায়দরাবাদ ।
ঐতিহাসিকরা অবশ্য এই তত্ত্ব মানতে রাজি নন। তাঁদের মতে, চারদিকের 'বাগ' বা বাগান থেকে ভাগনগর (বাগনগর) কিংবা নবাব পুত্র হায়দারের নাম থেকে `
হায়দরাবাদ ` এসেছে। তত্ত্ব যা-ই হোক, আমার কাছে
হায়দরাবাদ মানে তুফানি প্রেমের এমন এক শহর, যেখানে হাতে হাত ধরে চলেছে ইতিহাস আর আধুনিকতা। বিত্ত আর বৈভব। সঙ্গে যোগ হয়েছে রুচি। ফলে গোলকুণ্ডা ফোর্ট, কুতুব শাহি সমাধি, হুসেন সাগর লেক, ওসমান সাগর, এনটিআর সমাধিক্ষেত্র, চারমিনার, মক্কা মসজিদ, সালার জং মিউজিয়াম, চৌমহলা, ফলকনামা প্যালেস, রামোজি ফিল্ম সিটি ইত্যাদি দেখে প্রবল মুগ্ধ হয়েছি। চেখে নিয়েছি প্যারাডাইসের বিশ্ববিখ্যাত হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি ও করাচি বেকারির সুস্বাদু কেক। আর এখন শিল্পরমামে এসে মনে হচ্ছে, এমনটাও হয়!
হায়দরাবাদের হাইটেক সিটির হৈচৈ থেকে ১৪ কিমি দূরে, মাধপুর এলাকায় তৈরি করা হয়েছে এই গ্রামটি। উদ্দেশ্য ভারতীয় শিল্প ও স্থাপত্যকে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়া। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিল্পীরা এসে সাজিয়ে গেছেন গ্রামটিকে। কর্পোরেট দুনিয়ার দেখনদারির মাঝে, ৬৫ একর জমি নিয়ে, ১৯৯২ সালে নির্মিত কৃত্রিম গ্রামটিতে রয়েছে দুরন্ত সব শিল্পকর্ম। সঙ্গে নিজেদের সৃষ্ট জিনিসের পসরা নিয়ে বসেছেন স্থানীয় শিল্পীরা। চলছে বেচাকেনা। বছরভর লেগে আছে শিল্প প্রদর্শনী সহ লোকসংস্কৃতি বিষয়ক নানা অনুষ্ঠান। উঁচুনিচু পাথর, ঝরনা, সবুজ প্রান্তর ঘেরা শিল্পরমামের সর্বভারতীয় কলা ও হস্তশিল্প উৎসব ইতিমধ্যেই অত্যন্ত পরিচিত। প্রত্যেক বছর ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হওয়া সেই উৎসবে ভাগ নেওয়া বোধহয় সব শিল্পীরই স্বপ্ন।
শিল্পরমামের প্রবেশ পথেই `রিক্রিয়েশনাল এরিয়া`। এথনিক মোটিফ, টেরাকোটা স্থাপত্যে সজ্জিত এলাকাটির শৈল্পিক ছাপে মুগ্ধ হলাম। সব কিছুই অত্যন্ত সুচারুভাবে রাখা হয়েছে। আর তাতেই ফুটে উঠেছে ঐতিহ্যের সঙ্গে আভিজাত্য। অনবদ্য লাগল ভিলেজ মিউজিয়ামটি। এখানে ভারতের চিরায়ত গ্রামীণ জীবন ছবি তুলে ধরা হয়েছে প্রমাণ সাইজের ১৫টি কুঁড়েঘর ও অদ্ভুত সুন্দর সব মূর্তি দিয়ে। গাছপালায় ঘেরা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সবকিছুই এতটা জীবন্ত যে, মনেই হয় না সেগুলি মানুষের হাতে তৈরি। এই এলাকাটি এক ঝলক দেখলেই, নিতান্ত অজ্ঞ মানুষও ভারতীয় গ্রাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা করতে পারবে।
আধুনিক স্থাপত্যের অদ্ভুত সব কাজ রয়েছে রক মিউজিয়ামে। তবে চারদিকের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথরগুলিও যেন নিজস্ব স্থাপত্য তৈরি করেছে। এই মিউজিয়ামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শান্তিনিকেতনের সুব্রত বসুর নাম। প্রদর্শিত হয়েছে বুদ্ধের মূর্তি থেকে মেটামরফোসিস। অদিতি গর্গ, রতন সিং, রাজীব মন্ডলের মতো শিল্পীরা আপন খেয়ালে সাজিয়েছেন শিল্পরমামের এই অংশটি। তবে অনন্য হল স্কাল্পচার পার্কটি। যখন এই পার্কটি নির্মিত হয়, তখন ধারণাটি একদম নতুন ছিল। সেই হিসেবে এটি ভারতের মধ্যে প্রথম। নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশ নিয়ে যে কলা প্রদর্শিত হয়েছে, সেগুলি না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আসলে কোনওকিছুই যে ফেলনা নয়, সেটা বোঝা যায় স্কাল্পচার পার্ক দেখে। রোমাঞ্চিত হলাম তাই। একই কথা বলব ১৫০০ আসনের অ্যাম্পিথিয়েটারের ক্ষেত্রেও। এখানে প্রতি সন্ধ্যায় খোলা আকাশের তলায় বসে কর্ণাটকি বা কুচিপুরি সংগীত ও নৃত্যের আসর।
গোরুর গাড়িতে চেপে ঘুরে গ্রামীণ জীবনের আস্বাদ নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে শিল্পরমামে। ভিড় দেখলাম ভারতীয় হস্তশিল্পের দোকানগুলিতে। মজুদ কাঞ্জিভরম, টাঙ্গাইল, সম্বলপুরি, কাশ্মীরি, ধর্মাভরম ইত্যাদি নানা ধরণের সিল্কের শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজ।
শিল্পরমাম থেকে ফিরবার পথে পড়ল পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক লেক দুর্গম চেরেভু। সিক্রেট লেক নামেও এর পরিচিতি রয়েছে। তিরাশি একর এলাকা জুড়ে থাকা এই লেক, একসময় গোলকুণ্ডা ফোর্টের পানীয় জলের উৎস ছিল। পরে হয়ে ওঠে মৎস্য শিকারীদের প্রিয় জায়গা। আর এখন তো কৃত্রিম ঝর্ণা, আলোকসজ্জা, রক ক্লাইম্বিং ইত্যাদি নিয়ে হায়দ্রাবাদের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। লেকের চারপাশে ঘুরে বেড়াবার সুন্দর পথ আর সুদৃশ্য সেতু চোখ টানতে বাধ্য। এই লেক পরিচিত ১৪৯ প্রজাতির পাখির জন্যও।
হায়দরাবাদের পরিচিত দ্রষ্টব্যগুলি থেকে কিছুটা আলাদা এই দুই জায়গা সত্যিই শহুরে কোলাহল থেকে মুক্তির টাটকা হাওয়া। গ্রাম ঘুরেছি অনেক। কিন্তু মহানগরের মধ্যে গ্রাম? এই প্রথম।
(প্রকাশিত: আয় মন বেড়াতে যাবি/ রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ/ ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫)

No comments:
Post a Comment