কবি
শৌভিক রায়
মঞ্চে গুছিয়ে বসেছেন কবি। তাঁর ডান দিকে স্থানীয় কেউ একজন। বাঁয়ে এখানকার পৌরপ্রধান। ঘোষক অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে বারবার তাঁর নাম ঘোষণা করছেন। উদ্যোক্তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে, এই খারাপ শরীর নিয়েও, তিনি এই শহরে এসেছেন। তারা ধন্য ইত্যাদি ইত্যাদি।
তিনি যেখানেই যান, সবাই দারুণ খুশি হয়। সেটা তিনি বোঝেন। রাজ্যের লোক তাঁর সঙ্গে দেখা করে। তাঁর বই নিয়ে এসে সই নেয়। নিজের বই উপহার দেয়। আর সেলফি? সে তো তোলেই।
কবি হাসি মুখে সব সহ্য করেন। উপহারের একটি বইও তিনি পড়েন না। তাঁর লোক আছে। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথের দোকানে ওসব `ট্র্যাশ` চলে যায়। কিছু আমদানি হয়। সেলফিগুলি ইন্সটাগ্রামে আর ফেসবুকে ঘুরে তাঁর প্রচার করে।
মঞ্চে বসে, তিনি ওপর থেকে হলে ঢুকবার দরজার দিকে নজর রাখছেন। ওখানে একটি টেবিলে তাঁর বই সাজানো আছে। এখানকার কবি যশপ্রার্থীরা উদ্যোগ নিয়ে তাঁর বই বিক্রি করছে।
তিনি যেখানে যান, এটুকু করিয়ে নেন। শর্ত থাকে, অ্যাপিয়ারেন্স ফিয়ের পাশাপাশি তাঁর নির্দিষ্ট সংখ্যক বই বিক্রি করতে হবে। মোটামুটি সকলেই মেনে নেন। যারা পারেন বিক্রি করে দেন। যারা পারেন না, নিজেরাই কিনে নেন।
তাঁর প্রথম দিকের গোটা দশেক বই হৈহৈ করে বিক্রি হয়েছিল। তারপর তাঁর লেখায় বদল এসেছে। আলোচকেরা বলেন, আজকাল আর তাঁর লেখা `কবিতা` হচ্ছে না। এদিকে বইয়ের সংখ্যা তিরিশ ছাড়িয়ে গেছে।
কবি দেখলেন এখানে ভালোই বিক্রি হচ্ছে। বই কিনেই কেউ এগিয়ে এসে, মঞ্চ উঠে তাঁকে দিয়ে বইয়ের ওপরে লিখিয়ে নিচ্ছে। তিনি হাসি মুখে সব আবদার মেনে নিচ্ছেন।
হঠাৎ কবির শিরদাঁড়ায় ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। তাঁর দিকে এবার যে এগিয়ে আসছে, তাকে তিনি খুব ভাল চেনেন। এর লেখাগুলি থেকেই তো তিনি....। কিন্তু এ তো বহুদিন আগেই জলে ডুবে...।
আজকাল ও বারবার কেন আসছে? কী বলতে চায়? এভাবে কেন ভয় দেখাচ্ছে? তিনি তো ওকে ডুবিয়ে দেননি। শুধু ওর লেখাগুলো....
কবি আর কিছু ভাবতে পারলেন না।
অন্য তিনবারের মতো এবারেও কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
No comments:
Post a Comment