Tuesday, December 9, 2025


 

কতটা সূক্ষ্ম তারে হাঁটতে হচ্ছে, জানেন বিএলও-রাই  
শৌভিক রায় 

শিক্ষক হিসেবে প্রাক্তন ছাত্রটির জন্য গর্ব বোধ করছি। মনে হচ্ছে, আমাদের শিক্ষা ব্যর্থ হয়নি। পিতৃশোক নিয়েও প্রাথমিক শিক্ষক সেই ছাত্রটি বিএল‌ও হিসেবে এসআইআর-এর কঠিন কাজ করে চলেছেন। অবশ্য তিনি একা নন, তাঁর মতো আরও কয়েকজন আছেন, যাঁরা কর্তব্যে অবিচল। পরিস্থিতি বিচারে, ইচ্ছে করলেই তাঁরা এই দুরূহ অব্যাহতি পেতেন। কিন্তু সেটি তাঁরা করেননি। এখানেই তাঁরা আলাদা, অন্যদের চাইতে। 


এসআইআর শুরু হওয়ার পর থেকেই, এই বঙ্গ সহ সারা দেশেই রাজনৈতিক পারদ চড়েছে। বিএলও-রা আন্দোলন করেছেন। কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকের মৃত্যু হয়েছে। কেউ আবার আত্মহত্যা করেছেন বলেও অভিযোগ এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তরফে এসআইআর বন্ধ করার দাবি উঠেছে। আবার এসএইআর-এর  প্রয়োজনীয়তা নিয়েও গলা ফাটাচ্ছেন অনেকে।

এসআইআর কিন্তু আগেও হয়েছে। এমন নয় যে এই প্রক্রিয়া এ বারেই প্রথম। তবে সেই সময় এই রকম শোরগোল লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু এবারের এসআইআর-এর আবহ আলাদা। বিশেষ করে, আমাদের রাজ্যে। আগামী বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে, অনুপ্রবেশ সমস্যা 'পাখির চোখ' করে ঘুঁটি সাজাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। সঙ্গে যোগ হয়েছে, ধর্ম নিয়ে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন। 

কোনও সন্দেহ নেই, স্বাধীনতার পর থেকেই অনুপ্রবেশ এই রাজ্যের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। কাঁটাতার, সীমান্তে কঠোর নজরদারি কোনও কিছুই সেই সমস্যাকে বন্ধ করতে পারেনি। অবৈধ উপায়ে এই দেশে এসে প্রভাবশালীদের সাহায্যে খুব সহজেই ভোটার লিস্টে নাম তুলে ফেলার দীর্ঘ ইতিহাসও আছে এই রাজ্যে। ফলে জনসংখ্যা যেমন ক্রমশ বেড়েছে, তেমনি চাপ পড়েছে অর্থনীতিতেও। অনেক সময় নিজেদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন রাজ্যের মানুষই। 

ফলে, অনুপ্রবেশ রোধে অবিলম্বে কিছু করা দরকার। তা নিয়ে দ্বিমত নেই কারও। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে যেভাবে ধর্মীয় পরিচয় বড় হয়ে উঠছে, তাতে এসআইআর-এর উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। কিন্তু এটাও ঠিক, এসআইআর শুরু হওয়ার পর, নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য সীমান্তে ভিড় দেখে মনে হচ্ছে, অবৈধ অনুপ্রবেশের হিমবাহ কিছুটা হলেও গলতে শুরু করেছে। আর তার জন্য কিন্তু কৃতিত্ব প্রাপ্য সেই সব কর্মীদের যাঁরা নাওয়া খাওয়া তো বটেই, পিতৃ-মাতৃ শোক পর্যন্ত ভুলে দিনরাত খেটে চলেছেন। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, আর এক পরিচিত প্রাথমিক শিক্ষক বিএল‌ও-র কথা। ইতিমধ্যে একশো শতাংশ কাজ শেষ করে তিনি জেলা প্রশাসনের বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন। 

রাষ্ট্র প্রদত্ত একটি কঠিন কাজ যেভাবে বিএল‌ও-রা করছেন, তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। খারাপ লাগে যখন তাঁদের কটু কথা শুনতে দেখি। যাঁরা সেটি করছেন, তাঁরা একবার নিজেদের সেই জায়গায় রেখে দেখুন, তবেই বুঝতে পারবেন। একমাত্র বিএলও-রাই জানেন, কতটা সূক্ষ্ম তারের ওপর তাঁদের হাঁটতে হচ্ছে। একদিকে বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়। অন্যদিকে অবৈধ ভোটারের নাম তালিকাভুক্ত হলে, চাকরি হারানোর ভয়। এই দুইয়ের মাঝে মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করে চলেছেন তাঁরা। আর পৌলব, জয়তোষের মতো মানুষেরা দৃষ্টান্ত রাখছেন কর্তব্যনিষ্ঠা ও দায়িত্বের। তাই অন্য কিছুর সঙ্গে, এসআইআর থেকে পাওনা কিন্তু এই মানুষগুলিও।


(শিক্ষক, কোচবিহার)

(প্রকাশিত: আনন্দবাজার পত্রিকা, উত্তরবঙ্গ সংস্করণ, ডিসেম্বর ৯, ২০২৫
  ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আনন্দবাজার পত্রিকা )

No comments: