সকলেই কবি নয়
শৌভিক রায়
কুয়াশা দিন। রোদ উঠল বেশ বেলায়।
ডিসেম্বর মাস। সামনে রেজাল্ট । রোদে বসে কাজ করছিলাম। স্কুলের মাঠে।
ভদ্রলোক ঢুকলেন স্কুলে। হাতে কিছু বই। সামনে দিয়েই চলে গেলেন। ভেতরে।
পাবলিশার বা তাঁর প্রতিনিধি নন। বোঝা যাচ্ছিল। অপ্রতিভ চেহারা। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। আটপৌরে পোশাক। শহুরে স্মার্টনেস নেই। বিভিন্ন ক্লাসের স্পেসিমেন বই দিতে যারা আসেন, তারা অনেক ঝকঝকে, চটপটে হন।
খানিক পরেই মানুষটি আমার সামনে এসে হাজির। মুখে কুণ্ঠিত হাসি,
- একটা বই নেবেন? কবিতার...
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। ভাল করে দেখলাম। হাতে বেশ কিছু চটি বই। এক ফর্মার। স্থানীয় কোথাও ছাপা হয়েছে বুঝতেই পারছি। এক ঝলকে দেখা গেল দুই একটি কবিতা। সেগুলির মান নিয়ে কিছু বলছি না। পাঠক যা মনে করবেন সেটাই সঠিক।
চোখ আটকে গেল উৎসর্গ পাতায় এসে। দুজন অতি-পরিচিত মানুষকে উৎসর্গ করা হয়েছে।তাঁরা দুজনই ফালাকাটার। দুজনেই গুণী মানুষ ও শিক্ষক।
- আপনার বাড়ি কোথায়?
- শালকুমারে।
- বই তো ছাপিয়েছেন দেখছি ফালা....
- হ্যাঁ ফালাকাটায়।
- সুভাষ সেনগুপ্ত ও হীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য কে উৎসর্গ করেছেন। কারা এঁরা?
- সুভাষবাবু ফালাকাটা হাই স্কুলের হেড স্যার ছিলেন। আর উনি তো প্রিন্সিপাল।
- আচ্ছা। কিন্তু আপনার বাড়ি তো শালকুমারে। এঁদের জানলেন কীভাবে?
- আমি তো ফালাকাটা কলেজে পড়েছি। স্কুলও ওখানেই।
- তার মানে আপনি এই দুজনের ছাত্র।
- একজনের। হীরেনবাবুর। আর স্কুলে যখন পড়ি, তখন সুভাষ স্যার ছিলেন না।
- কোন সালে পড়েছেন?
- ৯৩-৯৪ হবে। নীরদ বরণ রায় তখন হেডমাস্টার।
- তাই?
মোবাইল ফোন থেকে নীরদ বরণ রায়ের ছবি দেখালাম। সঙ্গে লীলা নাগ রায়েরও।
- হ্যাঁ হ্যাঁ এই তো আমার স্যার আর ম্যাডাম। কিন্তু আপনি কেমন করে চেনেন?
সহকর্মী দীনবন্ধু উত্তর দিল,
- এই দাদার বাবা মা ওঁরা।
- স্যার আপনার বাবা? বলেন কী! স্যারের মতো মানুষ.... আমার এই বইটা স্যারকে উৎসর্গ করা...
ভদ্রলোকের চোখ ছলছল। এগিয়ে দিলেন আর একটি বই। আমি খানিকটা কনফিউজড। মানুষটা কি আমাকে আগে থেকে জানতেন? ইচ্ছে করে এসেছেন? কেউ যে কেনেনি ওর বই, সেটা বুঝতেই পারছি। হয়ত জেনেশুনেই...
নাহ! ভাবনাটাকে প্রশ্রয় দিলাম না। আমাকে চিনবার প্রশ্ন নেই। এমন কেউ নই আমি যে আমাকে জানতে হবে। ব্যর্থ হয়ে চলে যেতে যেতে, একবার চেষ্টা করেছিলেন আমার কাছে। আমি নাও নিতে পারতাম। কিন্তু নিলাম। নিয়েও বইটি রেখে দিতে পারতাম। পাতা না উল্টিয়ে। কিন্তু দেখলাম! আর চোখ আটকে গেল উৎসর্গ পত্রে।
কবি আরও দুটি বই দিয়ে গেলেন। একটির পয়সায়। আর কিছু নিলেন না।
- বইমেলা চলছে। যান। দেখুন যদি কেউ নেয়।
- হ্যাঁ যাব ভাবছি। কেউ তো কবিতার বই কেনে না। তার ওপর আমার বইয়ের যা দশা!
- ওরকম ভাববেন না। আপনি কবিতা লিখে বই তৈরি করে বিক্রি করছেন। সবাই এটা পারে না। - শহুরে পালিশ লাগে। বুঝলেন!
- প্রয়োজন নেই। এরকমই থাকুন।
কবি চলে যাওয়ার আগে একটা ছবি তুললাম। কোচবিহার বইমেলা শেষ হবে কাল। মানুষটি যদি বইমেলায় থাকেন, তবে প্রার্থনা করব, ওঁর বই বিক্রি হোক সামান্য হলেও।
বাবা মায়ের ছাত্র। স্কুলও এক আমাদের। কবি ভাইটির জন্য এই শুভেচ্ছা রাখা ছাড়া আর বা কী করতে পারি!

No comments:
Post a Comment