Monday, December 22, 2025

সূর্যের আলো বুকে নিয়ে

শৌভিক রায়

নিজের সম্পাদিত `মুজনাই` অনলাইন পত্রিকায় নাদিরা আহমেদের `মুখোশ পৃথিবী` কাব্যগ্রন্থের পাঠ প্রতিক্রিয়ায় লিখেছিলাম-
`` 'চিরকাল গরমভাত ও নরম বালিশ পেয়েই খুশি' কবি নাদিরা আহমেদ সমকালকে ধরেছেন তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'মুখোশ পৃথিবী'-তে। কোচবিহার জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বড় হয়ে ওঠা কবির সৃষ্টিতে মাটির গন্ধ আর জীবনের অনুসঙ্গ। তাই তিনি বালুচরের ছবি বাঁধানোর সঙ্গে সঙ্গে তুলে ধরেছেন সন্ত্রাসী পুরুষ, অবৈধ সন্তান বা ঋতুচক্রকে। কেননা তাঁর মনে হয়েছে `কখনো চাঁদ উঠলে ভালোবাসা ও চুমু নামক শব্দগুলি জুড়ে দেব না হয়`। বাস্তব এটাই। এই নৈরাজ্যের নেই রাজ্যে, যেখানে সবকিছুই আপোষ আর স্বার্থপরতায় মাখামাখি, সেখানে দাঁড়িয়ে `চিতা ও বসন্ত গুলিয়ে` যায় বৈকি! অত্যন্ত সমাজ-সচেতন কবি তাই তাঁর সৃষ্টিতে তুলে ধরতে পেরেছেন মুখোশ পৃথিবী। আর তা ধরতে গিয়ে আরোপিত হয়ে নয়, স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দভাবে জীবন এঁকেছেন তিনি। আসলে `উর্বর মাটিতে শেকড়সহ মানুষের ছবি` যিনি আঁকতে চান, তাঁকে শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে খোলা চোখে সব দেখতে হয়। নাদিরা আহমেদ সেটাই দেখেছেন। আশা করি, আগামীতেও এভাবেই দেখবেন।``
দুর্ভাগ্য, নাদিরা আর কোনও দিন কিছুই দেখবে না। `আগামী` শব্দটিও ফিরে আসবে না ওর জীবনে। কেননা, আমাদের সবাইকে স্তম্ভিত ও স্তব্ধ করে, ও নিজেই অতীত হয়ে গেল।
ইদানিং নাদিরা নিজের নামের সঙ্গে `আহমেদ`-এর বদলে `আজাদ` শব্দটি ব্যবহার করত। হয়ত ডাকনাম 'মুক্তি`-র সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই। ওর স্বল্প জীবনে ও আসলে স্বাধীনতার স্বপ্নই দেখেছে। প্রশ্ন হতে পারে, ও কি স্বাধীন ছিল না? আপাতভাবে নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু সেটা যেন সেই বিখ্যাত আপ্তবাক্যের মতোই Man is born free but everywhere he is in chains....। এমনিতেই কিছুটা গোঁড়া রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়ে ওঠা নাদিরার বেশ কিছু সামাজিক শৃঙ্খল ছিল। সেটা বোঝাই যায়। ছিল পারিপার্শ্বিক অদৃশ্য চাপও। কিন্তু সব কিছুকেই দূরে সরিয়ে দিতে পেরেছিল বিদ্রোহী এই মেয়ে। ফলে, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছের ছোট্ট জনপদ দিনহাটার মতো প্রত্যন্ত এলাকাতে থেকেও নাদিরা হয়ে উঠেছিল অনন্য। ও নাটক করেছে। আবৃত্তি করেছে। গান গেয়েছে। যোগ দিয়েছে সাংবাদিকতায়। নিজের মতো লিখেছে। ছুটে গিয়েছে মানুষের সেবা করতে। আর দেখেছে দিন বদলের স্বপ্ন। স্বপ্নসন্ধানী ছটফটে ছোট্ট মেয়েটি কবে যেন নিজেই হয়ে উঠেছে এক সম্ভাবনার প্রতীক।
`সম্ভাবনা`! বড্ড ক্লিশে মনে হয় আজকাল। আসলে যত অকালপ্রয়াণ দেখেছি, তারা প্রত্যেকেই `সম্ভাবনা` ছিল। নাদিরার মতো মেয়ে তো নিঃসন্দেহে ছিল এক প্রবল সম্ভাবনা। এতটাই যে, একটা সময় ওর লেখা ছাপতে ভয় পেয়েছেন অনেকে। পাশে দাঁড়াননি কেউ। অবস্থা চরমে উঠেছিল ২০২৪ সালের `রাত দখল`-কে কেন্দ্র করে। কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক তিলোত্তমার নৃশংস হত্যার পর যখন সমস্ত পশ্চিমবঙ্গ গর্জে উঠেছে, তখন দিনহাটায় প্রতিবাদ কর্মসূচিকে সংগঠিত করেছে নাদিরা। অবশ্যই ওর সঙ্গে সেই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন আরও অনেকেই। ওদের ওপর আক্রমণ নেমে এসেছিল কিছু দালাল ও দুষ্কৃতীর। ওদের মিছিল ও মিটিং করতে দেওয়া হয়নি। শারীরিকভাবে হেনস্থা করবার প্রচেষ্টাও হয়। আর তার পর থেকেই শুরু হয় লেখা না ছাপাবার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। আক্ষেপ করত নাদিরা।
১৩ মার্চ, ২০২৩, নাদিরাকে ওর ফোন নম্বর চেয়ে ফেসবুক থেকে মেসেজ করেছিলাম। উত্তরবঙ্গের আত্মার আত্মীয় `উত্তরবঙ্গ সংবাদ`-এর তদানীন্তন কার্যকরী সম্পাদক কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে খুঁজছিলেন। হয়ত খবরের প্রয়োজনেই। সবার প্রথমেই আমার নাদিরার কথা মনে হয়েছিল। ও ফোন নম্বর পাঠালে, জানিয়েছিলাম পত্রিকা দপ্তরে। কয়েক দিন পর জেনেছিলাম যে, নাদিরা সাংবাদিক হিসেবে উত্তরবঙ্গ সংবাদে কাজ করতে শুরু করেছে। খুশি হয়েছিলাম খুব। তবে ওর কর্মজীবন কবে শুরু ও কবে শেষ হয়েছিল সেই বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানিনি কখনও। আমার কাজ ছিল শুধু যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। বাকিটা ছিল পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ও নাদিরার মধ্যে।
ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা ও কথা ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর। দিনহাটায় `হিতেন নাগ সাহিত্য উৎসব`-এ নদী সম্পর্কিত একটি আলোচনায় অন্য কয়েকজনের সঙ্গে বক্তা ছিলাম আমিও। নাদিরা এসেছিল মধুমিতা ও সাহানুরকে নিয়ে। অনুষ্ঠান শেষে হইচই, ছবি তোলা, গল্প নানা। রাতেই মেসেজ এসেছিল ওর, `Sir, অনুষ্ঠানে তোলা ছবিগুলো আমায় দেবেন। ৯৬******৫৯ এটা আমার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার`। এরপর বার কয়েক ফোনে কথা হলেও, মেসেজ করিনি বা ও-ও করেনি। কিন্তু ও যে একই রকম আছে সেটা বুঝতাম ফেসবুকে ওর বিভিন্ন পোস্ট দেখে। সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে ওর শেষ পোস্টে ডঃ অরুণিমা ঘোষের একটি লেখা শেয়ার করে হেডিং লিখেছিল `কিন্তু অপগন্ড মূর্খদের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য বলে কিছু হয়ই না....` এই মানসিক স্বাস্থ্যেরই মুক্তি চেয়েছিল নাদিরা আজীবন। আজাদি চেয়েছিল ভণ্ডামি আর স্বার্থপরতা থেকে। উচ্চকিত বলেছিল, `ইদানীং কিছু লিখতে ইচ্ছে করেনা। সত্যি কথা সোজাসুজি লিখতে পারি না ; মিথ্যে কথা লিখতে ঘৃনা লাগে। ছোটোবেলার মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে যদি সত্যগুলো গরগর করে বলে ফেলতে পারতাম ; যদি কান্না পেলে চিৎকার করে অনেকটা কেঁদে একটা চকলেট হাতে খেলতে যেতে পারতাম তাহলে কতোই ভালো হতো। কিন্তু বড়ো বেলায় কষ্ট পেলে লুকোতে হয়, চোখ মুছে হাসতে হয়। আনন্দে জাপটে না ধরে সামলে নিতে হয় আবেগ। ইচ্ছা অনিচ্ছা গুলিয়ে একটা সমান্তরাল রেখায় রেখেছি। মিথ্যে বলার চেয়ে মিথ্যের অন্তরালে সত্য যাপন করার অনিবার্য প্রয়াস একদিন আমার মুখ থেকে মুখোশ সরিয়ে সত্যিকারের মিথ্যে চেনাবে ..... (৩০ অগাস্ট, ২০২৫)
নাদিরা বলেছিল, `আমি কখনোই পাহাড় হতে চাইনি / আমি কখনোই আমার সন্তানের নাম কাঁটাগাছ- রক্ত বা মরা নদী রাখিনি! / তবুও পৃথিবীর মায়া আমাকে নারীত্বের রুমাল (গ্লানি?) বেঁধে দিয়েছে.../ সেখানে সারাবছর ঝর্নার শীতল জল পরে বুক জুড়ে! / কান্নার মতো! পূর্ণনারীর থৈ থৈ চোখ যেমন...` মৃত্যুর হাতছানি সম্ভবত বুঝতে পেরেছিল ও। বলেছিল-
`ভুলে যাচ্ছি পুরোনো জ্যোৎস্না। বলতে হয় পুরনো আলোর মঞ্চে কার্টেন তুলে দিয়েছি। স্মৃতিরা নরম মাটিতে থাকলেও এবার কবরের জমিতে মাটিচাপা দিয়েছি।
অতীতের যেসব আলোকে স্নিগ্ধতা ভেবে গায়ে মেখেছি তা এখন কয়লার মতো গা থেকে তুলে ফেলছি দামি জল দিয়ে। আফশোষ আমাদের হৃদয়ের ফুলেল বাগানের আয়তন কমায় তাই আমি আফশোষ আর পুরোনো রাতের আলো নিভিয়ে নতুন রাতকে ডেকেছি।
ভালো স্মৃতি আলো দেয় আর খারাপ স্মৃতি দেয় বিস্মরণ। মুছে দিয়েছি পুরোনো উঠোনের আলপনা কান্নাকাটি ফ্যাকাশে আলতা। নতুন ভোরের মাটিতে মৃত্যু আসে তাও তো গোরস্তানে সূর্যের আলোর ছটা থাকবে..... এখানে কোনো কার্টেন নেই....'
নাদিরার `গোরস্তানে` সূর্যের আলো পড়ুক না পড়ুক, ওখান থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। নিশ্চিন্ত সেটা জানি....
সূর্যের আলো বুকে নিয়েই ঘুমিয়ে আছে আমাদের কন্যা।

** অকাল প্রয়াত নাদিরা আহমেদ কে নিয়ে সাশ্রয় নিউজের রবিবারের বিশেষ পাতা.....
https://l.facebook.com/l.php?u=https%3A%2F%2Fsasrayanews.in%2Fsasraya-news-sundays-literature-special-21st-december-2025-edition-92-%25e0%25a6%25b8%25e0%25a6%25be%25e0%25a6%25b6%25e0%25a7%258d%25e0%25a6%25b0%25e0%25a6%25af%25e0%25a6%25bc-%25e0%25a6%25a8%25e0%25a6%25bf%25e0%25a6%2589%25e0%25a6%259c-%25e0%25a6%25b0%25e0%25a6%25ac%2F%3Ffbclid%3DIwZXh0bgNhZW0CMTEAc3J0YwZhcHBfaWQQMjIyMDM5MTc4ODIwMDg5MgABHqaCBM7r31djA4JY69PGfz6FrsGZt-Zfz1MmGWpU_4errshf6TxRvTot_TgI_aem_f-pB6iQOEMDxbPxa4292Nw&h=AT2Jf5GETv2VvRqPiOU--JwZAK7_iJuQgKOGXp0AFldtgl1hR57BPGh07sU4mNet9ijOO-jy5vQ2RokG72wZneGXKmKLbeI7dtqFKYhlRCGGT9VY9Z2UNsM0USrcQ8boKJli0-y78BkeFUPx3gCM0ar-yrY_Yg&__tn__=H-R&c[0]=AT1EFmO9a1jK3LiiasOx0mOtPBDVwHbplYiOzNwgu3tmsa1FV1JuB16j8-O01shRSknOWNgypy0PhU-ZOsM2HQfxg0_z48pGYrkQcWEjKrJ8NL0Abr0NUQyJcEcpzQ0gBcw3ZILJpf4IM_Hn1Z8bOocvA62NzsskyQr3qqNuBpHSGbDv07h0snRoAClSWltr3LjiUyqtG3vZk2R5y2kC0A

No comments: