Wednesday, April 30, 2025

 





সাদা কালো থেকে রঙিন 
শৌভিক রায় 

গোল বাগানটি দেখে বাবার কথা মনে পড়ল। এখানেই বিশেষ দিনগুলিতে বাবা জাতীয় পতাকা তুলতেন। 
শিক্ষক বিরাম কক্ষের (শেষ যখন দেখেছিলাম, তখন এটিই ছিল, জানি না এখন স্থান পরিবর্তন হয়েছে কিনা) সামনের ওই বারান্দায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিন প্রেয়ার লাইনে কম্যান্ড দিয়েছি। দুটো গান গাইতাম আমরা। বিদ্যালয় সংগীত `সমুখে তুঙ্গ তুষার মৌলী...` এবং জাতীয় সংগীত `জনগণমন অধিনায়ক...`। বিদ্যালয় সংগীত শান্তিনিকেতন থেকে তৈরি হয়ে এসেছিল। মূল উদ্যোগ ছিল কার্তিকস্যারের।  
যেহেতু থাকতাম স্কুল কোয়ার্টার্সে, তাই বড় রাস্তার দিকের মূল গেট নয়, আমার ঢুকবার গেট ছিল হোস্টেলের উল্টোদিকের গেট। হোস্টেল বোধহয় আর নেই এখন। শেষের তিন বছর অবশ্য মেন গেট দিয়েই ঢুকেছি। কেননা নতুন বাড়ি করে আমরা কলেজ পাড়ায় চলে গিয়েছিলাম।  




দূরের ওই গেট দিয়ে প্রবেশ ছিল আমার



বাবা বসতেন এই দালানের ঘরেই


শিক্ষক বিরাম কক্ষের সামনের ওই বারান্দা



সাদা ঘরটির ওখানেই থাকতেন গুরুংদা আর রামদা




আমাদের সময় এই মঞ্চ ছিল না


স্কুল স্পোর্টস। টাউন ক্লাবের মাঠ। পোল ভোল্ট। রয়েছেন প্রয়াত মন্টু ঘোষ। 
চেয়ারে বিচারক হিসেবে সম্ভবত শ্রদ্ধেয় নিতাই পাল


স্কুল স্পোর্টস। টাউন ক্লাবের মাঠ। পতাকা তুলছেন বাবা



স্কুল পিকনিক


স্কুল স্পোর্টস। টাউন ক্লাবের মাঠ। 
রয়েছেন আমার বাবা, শিল্পপতি এস পি রায়, 
সুভাষ গার্লস হাই স্কুলের তদানীন্তন প্রধান শিক্ষিকা পূর্ণিমা মাসি, 
আমাদের সহ প্রধান শিক্ষক হরকাকু


স্কুলের অতীত চিত্র


স্কুল এক্সকারসনে কার্তিক স্যার। সঙ্গে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তদানীন্তন ডিরেক্টর, বাবা


স্কুলের পুজো। কার্তিক স্যার, রণেনকাকু, পন্ডিতকাকু, চন্ডীস্যার, বাবা, রামদা...



কোনও এক ভবনের দ্বারোদ্ঘাটন


সুবোধ স্যার, হরকাকু ও অমর স্যার



স্কুল ভবন যখন তৈরি হচ্ছে। বাবা



একতলা ছিল আমাদের স্কুল। যতদূর জানি ১৯৬৭ সালে বাবা প্রধান শিক্ষক হওয়ার পরে পরে ইংরেজি H আকারের এই বিল্ডিং তৈরি হয়েছিল। এখন অবশ্য স্কুল দোতলা। প্রধান শিক্ষক বাবা, সহ প্রধান শিক্ষক হরকাকু, গেমস টিচার চন্ডীস্যার বসতেন যে বিল্ডিংয়ে, সেটি তৈরি হতে দেখেছি। লাইব্রেরি আর অফিসও ছিল ওখানেই। ওই দালান আর বাউন্ডারি দেওয়ালের মাঝে প্রচুর গন্ধরাজ গাছ ছিল। বাবার ঘর ম ম করত।  
স্কুলের পেছন দিকে যে বিল্ডিং, সেটিও আমাদের সামনেই তৈরি হয়েছিল। ওই বিল্ডিংয়ের পেছনে গার্লস হাই স্কুল দেখা যেত। ছিল একটা বিরাট কামরাঙা গাছ। আর পার্কের দিকে ছোট্ট একটা গেট। 
পেছনেই উত্তর দিকে, মানে বেসিক স্কুলের দিকে, একটা ঘরে থাকতেন দপ্তরি রামদা। কিছুদিন গুরুংদাও থেকেছেন ওখানে।
আসলে এই স্কুল নিয়ে কিছু বলতে গেলে কথা থামে না। জীবনের প্রথম পনেরো বছর এই স্কুল ঘিরেই বড় হয়েছি। বাবা প্রধান শিক্ষক আর মা শিক্ষিকা হওয়ার জন্য স্কুলটির ওপর বোধহয় একটু বেশিই অধিকার ছিল। বাকি সব শিক্ষক শিক্ষিকা শিক্ষাকর্মী সকলেই তো কাকু বা দাদা। তাই ওটুকু হবে না-ই বা কেন?
চব্বিশে এপ্রিল, বিকেলে, ফালাকাটা হাই স্কুলে ঢুকেছিলাম। 
বহুদিন পর। 
ফাঁকা স্কুলে শুধু আমি আর রীনা। 
সঙ্গে স্কুল ঘিরে থাকা কত স্মৃতি আর কত কথা!     

Sunday, April 27, 2025


 

জীবনে যেন কিছুই নেই!
শৌভিক রায় 

গৃহ-সহায়িকা মাঝবয়সী মহিলা, এই মাসেও, সময়ের আগেই, বেতন চাইলেন। ভাবলাম, বোধহয় কোনও সমস্যা হয়েছে। 

উনি কুড়ি বছরের ওপর আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। ফলে, বাড়তি একটা দায়িত্ব থেকেই যায়। তাই পর পর তিন মাস ধরে আগাম বেতন চাওয়ার কারণ কী জানতে চাইলাম। খুব কুন্ঠিত গলায় উনি যা জানালেন, তাতে সত্যিই অবাক হলাম। মেয়ের স্মার্টফোনের রিচার্জ করবার জন্য, ওঁকে মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা চাইতে হচ্ছে।

আমার বিস্মিত হওয়াটা বোধহয় সময়ের সঙ্গে পাল্লা না দিতে পারার জন্য। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের প্রাথমিক চাহিদার পর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির মতো বিষয়গুলিকে পেছনে ফেলে, স্মার্টফোন রিচার্জের মতো বিষয় আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় উঠে এসেছে, বুঝতে পারিনি। পরে তথ্য জেনে অবশ্য নিজেকে সত্যিই বোকা মনে হচ্ছিল। চলতি বছরের মাঝামাঝি যা পরিসংখ্যান, তাতে স্পষ্ট, বছর শেষের আগেই আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা নয়শো মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। বিগত বছরের চাইতে এই সংখ্যা অনেকটা বেশি। আরও মজা হল, এই ব্যবহারকারীদের মধ্যে গ্রামাঞ্চলের মানুষের সংখ্যা কিন্তু চমকপ্রদভাবে বিপুল। তুলনায় পুরুষদের চাইতে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, দ্রুতগতিতে মহিলারা উঠে আসছেন এই ক্ষেত্রেও। 

তত্ত্বের কচকচানি দূরে থাক। দুটো ঘটনা বলি। যে ড্রাইভারের সঙ্গে পোর্ট ব্লেয়ার ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, তিনি  ডিগলিপুরে আমাদের সঙ্গে গেলেন না। কেননা পরদিন তাঁর নেট পরিষেবা বন্ধ হবে। আর যে নেটওয়ার্কে তিনি আছেন, সেটি  উত্তর আন্দামানের ওই অঞ্চলে নেই। নিজের ব্যবসার ক্ষতি করে, তিনি অন্য একজনের ব্যবস্থা করে দিলেন। আমরা প্রথমটায় হতভম্ব। পরে বেশ মজা পেয়েছিলাম। হাসতে হাসতে একজনকে বলতে শুনেছিলাম `নেট-ব্যবহাকারী চরিত্রম দেবা না জানন্তি`। মজা করে বলা হলেও, ব্যাপারটি কিন্তু অনেকাংশেই সত্যি। অন্য অনেক কিছু না পেলেও চলবে, ফোনে রিচার্জ লাগবেই! তার জন্য কাজের ক্ষতি হোক, কুছ পরোয়া নেই। 

দ্বিতীয় ঘটনাটি নিজের এক ছাত্রীর ক্ষেত্রে দেখেছি। উঁচু ক্লাসে পড়ার ফলে মিডডে মিলের অধিকার নেই তার। বাড়ি থেকে তাকে টিফিনের জন্য নিয়মিত টাকা দেওয়া হয়। কিন্ত কোনও দিন তাকে খেতে দেখি না। ওর বাড়ির লোক ব্যাপারটি বুঝতে পেরে আমাকে জানালে, একদিন মেয়েটিকে চেপে ধরলাম। ক্রমে সত্যিটা উঠে এলো। টিফিনের পয়সা জমিয়ে ছাত্রীটি ফোন রিচার্জ করে। বাড়ি থেকে ফোন রিচার্জের পয়সা দেয় না? `দেয় স্যার, কিন্তু ডাটা কয়েকদিনেই শেষ হয়ে যায়। তাই টিফিনের পয়সা জমিয়ে ডাটা ভরি।` 

স্মার্টফোন থাকাটাই নাকি আজকাল শুধু আধুনিকতা নয়। ইন্টারনেটের জগতে আপনি কতক্ষণ থাকছেন, সেটাই বড় কথা। কেননা সব স্মার্টনেস সেখানে। ভার্চুয়াল ওই দুনিয়ায় মুহুর্মুহ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে দুনিয়া । তার কোনও একটি বাদ চলে গেলে, পিছিয়ে পড়তে হবে। 

এই পিছিয়ে পড়বার ভয় মারাত্মক। সব বিষয়ে জানতে হবে, টিপ্পনি দিতে হবে। চায়ের কাপে তুফান তুলতে হবে। জানান দিতে হবে নিজের অস্তিত্ব। তার জন্য নিজের মুঠিতে নিয়ে আসতে হবে দুনিয়াকে। আর সেটা সম্ভব একমাত্র ইন্টারনেটের সাহায্যে। ফলে যেভাবেই হোক ফোনে নেট কানেকশন লাগবেই। সেটা না হলেই, নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন। ফলে `ধর্মেও থাকা, জিরাফেও থাকা` নির্ভর করছে  নেটের ওপর। এই ব্যাপারে বোধহয় আট থেকে আশি সকলেই এক। অবশ্যই তরুণ প্রজন্মের ব্যাপারটি নজরে পড়ে বেশি। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বড়রাও মোটামুটি একই পথের পথিক। তথ্য বলছে, ভারতে নেট ব্যবহারকারীদের ১৪.৪ শতাংশের বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চুয়াল্লিশের মধ্যে। আর পঁয়তাল্লিশ থেকে চুয়ান্ন বছর বয়সীদের শতাংশ হল ১১.২। 

আজকাল প্রতিটি জনপদে তাই  একই ছবি। আড্ডা চলছে। নিঃশব্দে। নিজস্ব ফোনে। সব কিছুকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। হয়ত নির্বাক এই আড্ডার টান অনেক বেশি। রয়েছে বিভিন্ন সমাজ মাধ্যম। নানা কর্মকাণ্ড। অনলাইনেই সব। আর এসবের জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দরকার, সেটি যদি না থাকে, তবে তো পাগল পাগল অবস্থা হবেই। 

ফলে লাভ `সার্ভিস প্রোভাইডকারি` সংস্থার। কোনও ভাবে একবার `মার্কেট` ধরে নিতে পারলেই হল। কয়েক বছর আগে, বিনে পয়সায় নেটের লোভ দেখিয়ে, সারা দেশের অধিক সংখ্যক মানুষকে, নিজেদের দিকে নিয়ে আসার ইতিহাস তো এখনও পুরোনো হয়নি!

ফলে `রুটি কাপড়া মকান`-এর সেই সব দিন আজ অতীত। প্রয়োজন একটিই। আর সেই দরকার মেটাতে অন্য সব কিছুকে জলাঞ্জলি দেওয়াটাও দোষের নয়। গতি এখন শুধু রাস্তায় নয়। ফোর জি, ফাইভ জি ইত্যাদির চক্করে সে যেন হাতের মুঠোয়। সেই গতিকে সম্বল করেই সভ্যতা তাই এগিয়ে চলছে। নিজের মতো। অন্তহীন।

(প্রকাশিত: রংদার রোববার, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, এপ্রিল ২৭, ২০২৫)
** কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ মাননীয় কার্যকরী সম্পাদক ও উত্তরবঙ্গ সংবাদকে   

Friday, April 25, 2025

 ।।জ্যোতিদা।।

১৯৮৩ সাল। ফালাকাটা যাদবপল্লি উচ্চ বিদ্যালয়। সায়েন্স মডেল ও ব্যাখ্যা। ব্লক লেভেল। প্রতিযোগিতা।

এক বালক প্রতিযোগী। এক তরুণ সাংবাদিক। ঝকঝকে চেহারা। কিশোরের চোখে নায়ক...

সেদিন তাঁর পিঠ চাপড়ে দেওয়াটা ভোলেনি বালক। কেননা, সেই প্রশংসা এবং পরদিন উত্তরবঙ্গ সংবাদে তাঁর জন্য  জীবনে প্রথমবার নাম ছাপা, বালকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। আজ বালকের যে সামান্য লেখালিখি তাতে সেদিনের সেই মানুষটির এই অবদান কিন্তু কম নয়।

বালক এই কথাগুলি কোনও দিন সেই সাংবাদিককে জানাতে পারেনি। আসলে কিছু কথা কিছু মানুষকে জানানো যায় না কখনওই। কোনও দিনই। 

১৯৮১ সাল থেকে সাংবাদিকতার জগতে থাকা অত্যন্ত প্রিয় মানুষ জ্যোতি সরকার প্রয়াত হলেন আজ। খুব ভাল একজন মানুষকে হারালাম। বীরপাড়ার জ্যোতিদা আর নেই ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে......

স্মরণ: জ্যোতি সরকার 



উচ্চ ন্যায়ালয়ের আদেশে, বহু আগেই চাকরি চলে যাওয়া কারও নাম, যখন সদ্য পাঠানো যোগ্য শিক্ষকদের তালিকায় থাকে, তখনই বোঝা যায়, সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কে কতটা আন্তরিক!! 



Tuesday, April 22, 2025

বেছে বেছে অন্য ধর্মের মানুষদের হত্যা।

এতে যদি সেই অন্য ধর্মের কোনও মানুষ, ক্রমে বিদ্বেষী ও সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে, তবে কি দোষ দেওয়া যায়?

রক্তপাত চিরদিন রক্তপাতের জন্ম দিয়েছে। 

এই সরল সত্য ভুলে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি সভ্যতার, মানুষের.....



Monday, April 21, 2025

 যারা ঘুরপথের সাহায্য নিয়েছে এবং যারা সেই সাহায্য করেছে, তাদেরকে বাঁচানোর প্রবল চেষ্টা দেখে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়। এই না হলে অভিভাবক! উফফ...কতটা আন্তরিক, কতটা কর্তব্যপরায়ণ, কতটা স্নেহময়। ভাবা যায়??

Sunday, April 20, 2025


 

ধানসিঁড়ি 
শৌভিক রায় 

কামরূপ এক্সপ্রেস রঙ্গিয়া স্টেশনে ঢুকতেই কমল ব্যস্ত হয়ে উঠল। আমাদের নেমে পড়তে হবে। বদলাতে হবে ট্রেন। চলব তেজপুর পথে। 

ওই লাইনের ট্রেনে উঠে ব্যাগ রাখা গেল। দীর্ঘ যাত্রা ফালাকাটা থেকে। চা প্রয়োজন। 

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দুই চুমুক দিতে না দিতে, ট্রেন দিল ছেড়ে। পড়িমরি করে লাফিয়ে উঠলাম। খানিকটা খুব জোর গিয়ে সে আবার পেছনে ফিরল। বুঝলাম লাইন বদলাচ্ছে। কী মুশকিল! এভাবে কেউ বেকুব বানায়?

মাজবাটে যখন নামলাম, তখন বিকেল। ছোট্ট স্টেশন। ছিমছাম। কমলের দুই দাদা সাইকেল নিয়ে হাজির। 

পিকচার পোস্টকার্ডের মতো চারদিক। চলছি মাজবাট চা বাগানে। চা বাগান যে এত সুন্দর হতে পারে, ভাবিনি কখনও। অথচ নিজে বড় হয়েছি চা বাগান এলাকাতেই। 

ছিলাম দিন সাতেক। চষে বেরিয়েছিলাম পুরো এলাকা। সাইকেলে। কখনও ডাবল ক্যারি। কখনও দুজনে আলাদা আলাদা সাইকেলে। 

কমলের মা খাইয়েছিলেন চা পাতার বড়া। বাগানের আসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ছিলেন ওর বাবা। শুনেছিলাম `সফেদ হাতি` ছবিটির শুটিং হয়েছিল চা বাগান সংলগ্ন জঙ্গলে।




একটার পর একটা চা বাগান পেরিয়ে গিয়েছিলাম ভুটানে। তখনও জানতাম না, অসম ডুয়ার্সের দরং জেলার একটি দ্বার (যে শব্দ থেকে ডুয়ার্স) স্পর্শ করছি। 

সেবারই পরিচয় মঙ্গলদৈ, টংলা, উদলাগুড়ি, ঢেকিয়াজুলি, রাক্ষসমারি ইত্যাদি জায়গাগুলির সঙ্গে। গিয়েছিলাম প্রতিটি জায়গায়। 

সেই ১৯৮৭ সালে তখনও বোড়োল্যান্ড আন্দোলন সেভাবে দানা বাঁধেনি। ট্রেন লাইনে ইলেকট্রিফিকেশন কল্পনাতেও নেই। ফোর লেন শব্দটিই জানতাম না। 

শুধু মনে আছে, ধানসিঁড়ির টলটলে জলে স্নান করে  শীতল হয়েছিলাম প্রখর গ্রীষ্মদিনে। কী সুন্দর ছিল সেই নদী। আহা!

না, এই নদী কবি বর্ণিত সেই বিখ্যাত ধানসিঁড়ি নয়। ব্রহ্মপুত্রের উপনদী এই ধানসিঁড়ির গল্প আলাদা। 

সম্প্রতি আবার স্পর্শ করে এলাম ধানসিঁড়ি। আটত্রিশ বছর পর। ভাবতেই কেমন অদ্ভুত লাগছে। কত বদলে গেছে চারদিক!

মাজবাট থেকে ওরাং হয়ে ঢেকিয়াজুলির সেই যাত্রা চোখের সামনে জীবন্ত হল। 

না, এবার কমল সঙ্গে ছিল না। কিন্তু তাতে কী! এই যাত্রাটা তো ওর হাত ধরেই শুরু করেছিলাম একদিন। শেষ কি আর হয় সেটা?

আসলে জলের দাগ একবার লাগলে যে আর ওঠে না, তা আমার চাইতে ভাল বুঝবে আর কে! 

জলের দাগ বহমান  প্রজন্মে প্রজন্মে, সময়ের হাত ধরে.....     

Friday, April 18, 2025


 

রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে অন্ধকার শেষ হবে কবে?

শৌভিক রায়

তিরিশ বছর আগে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যখন কর্মরত হই, তখন অগ্রজ সহকর্মীরা শিক্ষার দুরাবস্থা দেখে ব্যথিত হতেন। তাঁদের অনেকেই আজ ইহলোকে নেই। সেই সব শিক্ষকদের অভাব অনুভব করলেও, মনে হয় তাঁদের না থাকাটা শাপে বর হয়েছে। কেননা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রের বর্তমান  দশা তাঁদের দেখতে হচ্ছে না। আর আমার মতো দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা এই পেশায় রয়েছেন, তাঁদের অবস্থা যে কী, সে তো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকার পোষিত বিদ্যালয়গুলিতে ছাত্র শিক্ষক অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে বিসদৃশ্য। কারণ কোনও নিয়োগ নেই। সরকারি স্কুলগুলিতে পিএসসি-র মাধ্যমে আসতে হয়। সেখানে শেষ পরীক্ষা কবে হয়েছে কে জানে! আর যে এসএসসি একটা সময় এই রাজ্যের চাকরি প্রার্থীদের বিরাট ভরসা ছিল, তার দশা নিয়ে নতুন কিছু বলবার নেই। সবাই কমবেশি জানি, সেখানে কী হচ্ছে। দুর্নীতির ঘুঘুর বাসায় পরিণত হওয়া সেই কমিশনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়। এক লপ্তে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ছাব্বিশ হাজার এসএসসি নিয়োজিত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী।

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা মানচিত্রে এই চিত্র কখনও দেখা যেতে পারে, সেটা কেউ কল্পনাতেও আনেননি। বাস্তব হল, সেটাই হয়েছে। ফলে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা। অবস্থা এমনই হয়েছে যে, কোথাও প্রধান শিক্ষককে বেল বাজাতে হচ্ছে, কোথাও আবার পঠন পাঠন ঠিক রাখতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কিংবা প্রাক্তনীদের ডাকতে হচ্ছে। কোথাও সেকশনের সংখ্যা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ, কোথাও দুটো ক্লাস একসঙ্গে করে চালাতে হচ্ছে, কোথাও বিদ্যালয়ের করণিক পরীক্ষার কাজে হাত লাগাচ্ছেন।

এমনিতেই এই রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলিতে দিনের পর দিন ছাত্র সংখ্যা কমছে। বাড়ছে ড্রপ আউট। কিছুদিন আগে, বহু সংখ্যক শিক্ষক সরকারি বদলির সুবিধে নিয়ে গ্রামের স্কুল থেকে শহরে চলে এসেছেন। ফলে গ্রামের স্কুলগুলি এমনিতেই শিক্ষকের অভাবে সমস্যায় পড়েছিল। আর চাকরি চলে যাওয়ায়, তাদের অবস্থা আরও খারাপ। এমনও স্কুল রয়েছে এই বঙ্গে যেখানে শিক্ষক সংখ্যা প্রায় শূন্যে ঠেকেছে। যতই ভলান্টারি সার্ভিসের আবেদন রাখুন রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসক, তাতে কিন্তু সায় দিচ্ছেন না অধিকাংশ চাকরি হারা শিক্ষক। দেবেন বা কেন? যেখানে চাকরির নিরাপত্তা নেই, সেখানে কারও পক্ষেই পাঠদান করা সম্ভব নয় বলেই ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি। মানসিকভাবেও তো তারা সুস্থিত অবস্থায় নেই। 

শিক্ষকতা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই চিত্র দেখব সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি। যে বঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থা একসময় সারা দেশের রোল মডেল ছিল, আজ তা ধূলিসাৎ। ক্ষয় শুরু হয়েছিল বহু আগে থেকেই, কিন্তু বিগত দশ বারো বছরে পুরো ভিতটাই নষ্ট হয়ে গেছে। শূন্য পেয়ে বা ব্ল্যাঙ্ক ও এম আর শিট জমা দিয়েও যে শিক্ষক হ‌ওয়া যায়, সেটা বর্তমান আবহে বোঝা যাচ্ছে। এমন নয় যে, অতীতে সব নিয়োগ স্বচ্ছ ছিল। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, সেই সব কারণেই রাজ্যে পালাবদল হয়েছিল। আশা ছিল অনেক। প্রতিশ্রুতি ছিল পাহাড় প্রমাণ। তাই আজকের অন্যায়কে 'ওই সময় তো এটা হয়েছিল' বলে যারা গলা ফুলিয়ে তর্ক করে, তারা আসলে মূর্খের স্বর্গে বাস করছে।  আর এই মূর্খের প্রাধান্য ও রমরমা ক্রমবর্ধমান। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য চলছেই।

এই মুহূর্তে যে দশা, তাতে কোনও আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। একদিকে চাকরি হারা যোগ্য বৈধ শিক্ষকরা আর অন্যদিকে অযোগ্য অবৈধরা। দীর্ঘদিন সময় পেয়েও সঠিক পদক্ষেপের সদিচ্ছার অভাব রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মোটামুটি খাদে ফেলে দিয়েছে। সেখান থেকে ওঠা যাবে না, তেমনটা নয়। কিন্তু একটা সুন্দর ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে, কয়েক শ পা পিছিয়ে আবার শুরু করার এই বোকামি কিংবা ইচ্ছাকৃত অন্যায় কি আদৌ জরুরি ছিল? অবৈধ নিয়োগকে বৈধ করতে অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করার গর্হিত অপরাধ থেকে রেহাই পেলেও, প্রশ্ন কিন্তু থেকে যাচ্ছে। সব চাইতে বড় বিষয় হল, অন্যায় করেও অনেকে পার পেয়ে গেল। আর শিকার হল সত্যিকারের গুণী শিক্ষকেরা। আজ এই প্রতিবেদন যখন লিখছি, তখন রাজ্যে জুড়ে মার খাচ্ছেন চাকরি চলে যাওয়া শিক্ষকদের একাংশ। তাদের মধ্যে পুরুষ মহিলা দুইই আছেন। প্রায় দশ বছর শিক্ষাদানের মহান পেশায় থেকে, এই মানুষগুলি যখন এভাবে উপহাস ও পুলিশের লাঠির সামনে পড়ছে, তখন শিক্ষক হিসেবে আমারও মাথা হেঁট হচ্ছে। কিন্তু সেটা বুঝবে কে? 

শিক্ষা ব্যবস্থার এই অন্ধকার কাটবে কবে কেউ জানে না। সত্যি বলতে, একদা সমাজে সবচেয়ে আদৃত পেশাটি আজ চরম উপেক্ষিত। কেউ ভাবছে না যে, চাকরি চলে যাওয়া, লোনের ই এম আই দিতে না পারা, সংসার চালানোর উপযুক্ত পথ না থাকা ইত্যাদির পরেও আর একটি বিষয় রয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রের এই অবস্থা দেখে, আগামীতে আদৌ কি কেউ এই পেশায় আসতে চাইবেন? যদি সেটা না হয়, তবে অবস্থা কী দাঁড়াবে সেটা আমরা ভাবছি কি কেউ? একটা রাষ্ট্র কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে শিক্ষকদের ওপরে। তাঁরাই তৈরি করেন ভবিষ্যতের নাগরিক। তাঁরাই দেন ভাষা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার স্পর্ধাও শেখান তাঁরা। তাঁদের জন্যই আমাদের মধ্যে থাকা ছোট্ট শিশু উলঙ্গ রাজাকে উলঙ্গ‌ই দেখে।

এই সব কিছুই শেষ হতে চলেছে। যে অশনি সংকেত দেখা যাচ্ছে, তাতে একদিন স্কুল থাকবে, পড়ুয়া থাকবে, বই খাতা চক ডাস্টার সব থাকবে, থাকবে না পড়ানোর মানুষটি। সমাজের উচ্চ বিত্তদের তাতে কিছু যাবে আসবে না। নেতা নেত্রীর পাশে লন্ডনের পথে হাঁটতে হাঁটতে, তারা হয়ত স্কুল অফ ইকোনমিক্সে বহু টাকা 'ক্যাপিটেশন ফি' দিয়ে নিজেদের সন্তানকে পড়িয়ে আনবেন। কিন্তু যারা প্রান্তিক মানুষ? যাদের থেকে উঠে আসেন একজন আম্বেদকর, তারা কোথায় যাবেন? আজও তো এই রাজ্যের ৮৫ শতাংশ পড়ুয়া সরকারি স্কুলের ওপর নির্ভর করে। আমাদের এই অসভ্যতায় তাদের যে ক্ষতি আমরা করছি, তার দায় কে নেবে!

(প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা/ সম্পাদক : শ্রী কৃষ্ণ দেব)


Thursday, April 17, 2025


 



শিক্ষাব্যবস্থা বাঁচাতে এগোতে হবে শিক্ষককেই 
শৌভিক রায়

শিক্ষক হিসেবে কাজ করছি প্রায় তিন দশক হল।  কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি আগে কোনও দিন দেখিনি। আমার বাবা-মা দুজনেই পঁয়ত্রিশ বছর ধরে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁদেরও কখনও এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। 

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে আজ যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা অভূতপূর্ব। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে যে প্রবল নৈরাজ্য এই মুহূর্তে চলছে, তাতে দিশেহারা আমরা সবাই। কেউ বুঝতে পারছি না, কী হবে কিংবা কী হতে চলেছে। শুধু এটা বুঝতে পারছি , এই মারাত্মক টানাপোড়েনে আখেরে ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষা ব্যাপারটির। 

এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? 

একমাত্র এবং সঠিক উপায় ছিল, যোগ্য ও বৈধ শিক্ষকরা যদি তাঁদের চাকরি না হারাতেন। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে, ২০১৬ সালে নিযুক্ত প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষকের মধ্যে অবৈধ ও অযোগ্য শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। তাঁদের চিহ্নিত করে, সুপ্রিম কোর্টের কাছে যদি রায় পুনর্বিবেচনার করার অনুরোধ করা যায়, তা হলে কিছু হলেও হতে পারে। হয়তো বৃহত্তর ছাত্রসমাজের দিকে তাকিয়ে সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় কিছুটা নরম হতেও পারেন। কেননা ভর্তির হার কমলেও, এই রাজ্যের অধিকাংশ ছাত্র এখন‌ও সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। আশা করা যায়, সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় সেই বিপুল পরিমাণ পড়ুয়াদের বিপদের মুখে ঠেলে দেবেন না। যতদূর শোনা যাচ্ছে, রাজ্যের তরফ থেকে সম্ভবত তা করা হয়েছে। যদিও প্রশ্ন উঠছে, এই ব্যাপারটি আগে করলে এত কিছুই ঘটত না। 

আপাতত সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। তার চাইতে বেশি জরুরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচানো। যদি রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনে সাড়া দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যোগ্য ও বৈধ শিক্ষকদের পুনর্বহালের আদেশ দেন, তবে খাদে পড়ে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে কিছুটা হলেও টেনে তোলা যাবে। কিন্তু যদি সেটি না হয় তবে? 

ইতিমধ্যেই বেশ কিছু স্কুল শিক্ষক-শূন্য হয়ে গেছে। কোথাও বিডিও-কে ক্লাস করতে দেখা যাচ্ছে, কোথাও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা পরীক্ষা নিচ্ছেন।  কিছু স্কুল সেকশনের সংখ্যা কমিয়েছে। বিশেষ করে শহরের স্কুলগুলিতে, যেখানে ছাত্র সংখ্যা এমনিতেই কম, সেখানে এমন করা যেতেই পারে। বিষয় শিক্ষকদের শুধুমাত্র নিজেদের বিষয়ের মধ্যে আটকে না রেখে, তাঁরা অন্য যে বিষয়ে পারদর্শী, সেই ক্লাস দেওয়া যেতে পারে।

সাধারণত প্রত্যেক শিক্ষকের সপ্তাহে গড়ে  পঁচিশ থেকে তিরিশটি ক্লাস থাকে। যদি সেকশন কমানো যায়, তবে তাঁদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়েও, বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাস করানো সম্ভব। আমি নিশ্চিন্ত, সারা রাজ্যে আমার এমন কোনও সহকর্মী নেই, যিনি আপত্তি করবেন। কারণ পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও গভীর উদ্বেগের। এই সময় যদি আমরা নিজেরা এগিয়ে না আসি, তবে আখেরে কিন্তু ক্ষতি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের। সমাজের মেরুদণ্ড হয়ে আমরা সেটা করতে দিতে পারি না।

অতীতে আমরা স্কুল ক্লাস্টার নিয়ে নানা আলোচনা শুনেছি। এই সময় সেই ব্যাপারটিও ভাবা যেতে পারে। এতে 'পিয়ার লার্নিং'-এর সুযোগ যেমন থাকবে, তেমনি বিভিন্ন স্কুলের বিভিন্ন শিক্ষকদের সংস্পর্শে এসে পড়ুয়াদের সর্বাঙ্গীন উন্নতিও হবে। কিন্তু এই ক্লাস্টার করবার সুযোগে  স্কুল বন্ধ করা চলবে না। এর আগে বেশ কিছু স্কুলের অপমৃত্যু দেখেছি। ফলে, দৃষ্টি রাখতে হবে সেদিকেও। আর একটি বিষয় নিতান্তই প্রশাসনিক। একমাত্র উচ্চতর কর্তৃপক্ষ সেই ব্যাপারটি করতে পারেন। কয়েক দিন আগে সরকারি বদলির সুযোগ নিয়ে বহু শিক্ষক নিজেদের পছন্দের মতো স্কুলে চলে এসেছেন। ফলে বহু স্কুল, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছিল। এই পরিস্থিতিতে সে সবের কার্যত নাভিশ্বাস উঠেছে। একবার  সে দিকেও সকলের নজর দেওয়া দরকার। 

শিক্ষার অন্তর্জলী যাত্রা ঠেকাতে এই মুহূর্তে একমাত্র শিক্ষকরাই ভরসা। আমাদের পড়ুয়াদের স্বার্থে, যোগ্য প্রার্থীদের চাকরি ফেরতের পাশাপাশি, আমরা এই ব্যাপারগুলো আমরা কি একবার ভাবতে পারি?

(লেখক শিক্ষক)

(প্রকাশিত: আনন্দবাজার পত্রিকা , উত্তরবঙ্গ সংস্করণ, এপ্রিল ১৬, ২০২৫)

Wednesday, April 9, 2025

 


এই মুহূর্তে `বিদ্যালাভে লোকসান, নাই অর্থ, নাই মান`?

শৌভিক রায়

সম্প্রতি, অন্ধ্রপ্রদেশের কাকিনাড়ার ভি চন্দ্র কিশোর, আত্মহত্যার পর, খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন।
আত্মহত্যা অবশ্য এই দেশে নতুন নয়। মহাভারতেও দেখা যাচ্ছে, পুত্র অভিমূন্যর মৃত্যুর খবর পেয়ে, শোকাতুর পিতা অর্জুন গায়ে আগুন লাগিয়ে দেহত্যাগ করবার পরিকল্পনা করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের হস্তক্ষেপে অবশ্য তা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান ভারতে, প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেন। বিগত কুড়ি বছরে প্রতি লাখে আত্মহত্যার সংখ্যা ৭.৯ থেকে ১০.৩ হয়েছে।
কাজেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ওএনজিসি-র জনৈক কর্মী ভি চন্দ্র কিশোরের আত্মহননের সংবাদে আপাত ভাবে সাধারণ বলে মনে হতেই পারে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে আরও একটি ঘটনা ও তার কারণ জানলে অবশ্যই চমকে উঠতে হয়। তিনি শুধু নিজেই মৃত্যুকে বেছে নেননি। গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়বার আগে, জলে চুবিয়ে হত্যা করেছেন নিজের দুই কিশোর সন্তানকে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, পড়াশোনায় সাধারণ এই সন্তানরা ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারবে না।
কাকিনাড়ার এই ঘটনাটিকে কিন্তু বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রম মনে করা ভুল হবে। এই মুহূর্তে এ দেশে এই জাতীয় আশঙ্কায় ভোগা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা ঠিক, সবাই আত্মহননের বা হত্যা করবার চরম পথ বেছে নিচ্ছেন না, কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষ উদ্বেগে ভুগে মানসিক রুগীতে পরিণত হচ্ছে। ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সার্ভে জানাচ্ছে, ভারতের মোট জনসংখ্যার ১০.৬ শতাংশ মানুষ কোনও না কোনও মানসিক রোগে ভুগছে। এবং আরও পনেরো শতাংশের মানসিক রুগী হওয়া ঠেকাতে তাৎক্ষণিক কাউন্সিলিং প্রয়োজন।
তথ্যের কচকচানিকে দূরে সরিয়ে রেখে, যদি একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতেও দেখি, তবু যেন এই হত্যা ও আত্মহত্যার কারণ সত্যিই অবাক করে তোলে। একেই তো পিতার হাতে সন্তানদের হত্যা ব্যাপারটাকে হজম করতে অসুবিধে হয়, তার ওপর কারণ জেনে বিস্মিত হওয়া ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। কিন্তু বাস্তব হল, সেটিই ঘটেছে।
নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আজকের অসংখ্য অভিভাবক নিদারুণ আশঙ্কিত। বিশেষ করে, যাদের সন্তান মধ্যমেধার বা তার নিচের, তাদের তো দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। যাদের পারিবারিক ব্যবসা আছে, তাদের তবু রক্ষে। কিন্তু চাকরির ওপর নির্ভরশীল বাবা-মায়েরা প্রত্যেকেই আজ কমবেশি ডিপ্রেশনের শিকার।
ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে সরকারি চাকরির ক্ষেত্র। বেসরকারি ক্ষেত্রেও তীব্র প্রতিযোগিতা। নামী প্রতিষ্ঠানের তকমা ছাড়া সেখানে ইন্টারভিউতেই ডাক পাওয়া দুষ্কর। আর ডাক পেলেই যে চাকরি হবে, তার গ্যারান্টি কোথায়! চাকরি প্রার্থীরও তো কিছু নিজস্বতা থাকতে হবে! যদি সেটার অভাব থাকে, তবে নামকরা প্রতিষ্ঠানের তকমাও কিছু করতে পারে না। তা ছাড়া শুধু চাকরি পেলেই তো হল না! যোগ্যতার প্রমাণ না দিতে পারলে, ছাঁটাই হতে আর কতক্ষণ! ফলে চাকরি পাওয়া মানে সব চাপ থেকে মুক্ত হওয়া গেল, এরকম ভাবারও কোনও কারণ নেই।
এ সবের চাইতেও বড় বিষয় হল, যোগ্যতা অনুসারে চাকরি কোথায়? আইআইটি-র মতো দেশের প্রিমিয়াম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ড্রপ-আউটের সংখ্যা বাড়ছে। বি টেক প্রোগ্রামে এই পরিমাণ কম হলেও, এম টেক ও পিএইচডি-র ক্ষেত্রে সেটি কিন্তু ৫০ শতাংশেও ঠেকে কখনও। কিন্তু এই অবস্থা কেন? মোটমুটিভাবে ধরে নেওয়া যায়, উচ্চ শিক্ষায় যারা যাচ্ছেন, তারা কর্মক্ষেত্রে আকাডেমিক ব্যাপারেই আগ্রহী হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, এই রাজ্য তো বটেই, সারা দেশের আকাডেমিক ক্ষেত্রের চিত্রটি বড্ড করুণ। ফলে পাঁচ বছর ধরে গবেষণার কঠিন পথ পেরিয়ে, কাউকে যদি এলেবেলে কাজে নিযুক্ত হতে হয়, তাহলে সে এই ঝুঁকি নেবে কেন?
আইআইটি-র পিএইচডি প্রোগ্রাম থেকে ইস্তফা দেওয়া রসায়নের এক গবেষক ছাত্রের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি স্পষ্ট বললেন, `কেন পাঁচ বছরের ঝুঁকি নেব! চাকরি কোথায় তার পর? আমার মতো যারা পিএইচডি করছে, তাদের অধিকাংশই চেষ্টা করছে যেভাবে হোক তাড়াতাড়ি কিছু একটা পেয়ে বেরিয়ে যেতে।` আর এক পড়ুয়াকে জানি যিনি কানপুরে একটি পোস্ট-ডক্টরেট প্রোজেক্ট শেষ করে, চিনে যাচ্ছেন আর একটি প্রোজেক্ট করতে। দেশে যে অফার পাচ্ছেন তিনি, সেগুলির অর্থমূল্য সামান্য। স্থায়ী চাকরি নেই কোথাও। সেই পড়ুয়ার বাবা-মা চিন্তিত। এভাবে প্রোজেক্ট করে কতদিন চলবে!
মেধাবী পড়ুয়াদের যদি এই অবস্থা হয়, তবে সাধারণ ছাত্ররা যাবে কোথায়? অভিভাবকরাই বা কী করবেন! `যোগ্যতমের উদ্বর্তন`-এ এদের জায়গা ঠিক কোথায়? সন্তানকে সাধারণ থেকে অসাধারণ বানাবার প্রচেষ্টায় হয়ত তাই আজ কোটার মতো শহরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সেখানেও তো আত্মহত্যার মিছিল। চাপ নিতে না পেরে ২০২৪ সালে সেখানে ১৭ জন আত্মহত্যা করেছে। তার আগের বছর সংখ্যাটি ছিল ২৬। বড় মেট্রো শহরের বিভিন্ন স্কুলের পড়ুয়াদের এই পথ বেছে নেওয়ার সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। পিছিয়ে নেই গ্রামীণ ভারত। বিগত এক দশকে সেই সংখ্যা ৬ হাজার ৫৫৪ থেকে ১৩ হাজার ৪৪-এ দাঁড়িয়েছে। আর এ রাজ্যে সম্প্রতি সেই পরিমাণ খানিকটা কমলেও, ২০২০ সালে ৪৮.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। অবশ্য পড়ুয়াদের আত্মহত্যার এই বিপুল সংখ্যার পেছনে শুধুমাত্র যে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা একমাত্র কারণ, সেটা বলা যাবে না। কিন্তু অধিকাংশই যে সেই কারণে, এই বিষয়ে সন্দেহ নেই।
শুধু আত্মহত্যাই নয়, ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হবে, এই ভাবনা থেকেও, আজকাল স্কুল-কলেজ থেকে ড্রপ আউটের সংখ্যা বাড়ছে। পড়ার চাইতে অন্য কিছু এখন থেকেই করা ভালো। এ রকমই ধারণা তাদের। বৃদ্ধি পাচ্ছে পরীক্ষা না দেওয়ার ঘটনাও। নিজের এক মেধাবী ছাত্রীকে জানি। পড়াশোনায় ডুবে থাকা মেয়েটি এই বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করতে পারল না শুধুমাত্র একটি ভয়ের কারণে। তার রেজাল্ট ভাল হবে না। নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়তে পারবে না। অন্যরা তার থেকে এগিয়ে যাবে। তার অভিভাবকরাও এতটাই শঙ্কিত যে, তাদের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হচ্ছে। ছাত্রীটির কথা তো ছেড়েই দিলাম।
অন্ধ্রপ্রদেশের এই ঘটনাটি আমাদের সবাইকে একটা আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে। শুধুমাত্র হত্যা ও আত্মহত্যার তত্ত্ব দিয়ে যদি এটিকে আমরা বিচার করি, তবে ভুল করা হবে। এর শেকড় ছড়িয়ে আরও গভীরে। আসলে রাষ্ট্র যখন নিজে অসংবেদনশীল দেউলিয়াপনায় ভোগে, তখন তার নাগরিকদের ওপর এ ভাবেই অভিঘাত নেমে আসে। সঠিক কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যতের ন্যূনতম নিরাপত্তা না থাকলে, আগামীতে এরকম ঘটনা বাড়বে বই কমবে না!
(লেখক কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক)

https://epaper.eisamay.co.in/eisamay/2025-04-09/1/page-1.html#

* প্রকাশিত- উত্তর সম্পাদকীয়, এই সময়, এপ্রিল ৯, ২০২৫/ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা `এই সময়`


Saturday, April 5, 2025

 আবেদন

শৌভিক রায় 

আসুন উৎসব করি। কবিতা পড়ি।
আমি কবি। তুমি কবি। আমরা কবি।

একটা ফুল গাছ থেকে পড়ে গেল।
আকাশে উড়ে গেল ধবল বক।

লিখি চলুন। নিবিড় লেখা। আত্মরতি।

বড্ড বেশি। বাজে কথা। বলে ছোটলোক।
গেছে তো গেছে। কী হয়েছে তাতে।
ওরকম কত যায়। যাবে আর আসবে।
মেলাবে তবু। মিলিয়েও যাবে। জানি তো।

আসুন উৎসব করি। কবিতা পড়ি।
দুইয়ে ছয়ে জড়িয়ে আনন্দে মাতি।
আমি কবি। তুমি কবি। আমরা কবি।
কবি সব করে রব! রাতি পোহাইল....











Friday, April 4, 2025



শহরের মিথ চৌচির পরিবর্তনের চাকায় 


Wednesday, April 2, 2025



আদিম ডুয়ার্সের ডালিমকোট, গরুবাথান আর শাখাম 
শৌভিক রায় 

প্রকৃতি এখানে অকৃপণ। চারদিকে এত কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে কাকে ছেড়ে কাকে দেখব তা মনস্থির করতে না করতেই বেলা গড়িয়ে যায়। শীত-দুপুর কখন যে টুপ করে গড়িয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে সেটা বোঝা ভার। 


খানিক আগেই দেখে নিয়েছি অহেলা গ্রামের সুইমিং পুল। আর এখন  ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম ডঃ ক্যাম্পবেলের কথা। ভাগ্যিস তিনি ১৮৪১ সালে কুশাং থেকে চিন দেশীয় চা গাছের বীজ আনিয়েছিলেন! তাঁর এই একটি পদক্ষেপ বদলে দিয়েছিল দার্জিলিঙের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন। কেননা, পরীক্ষামূলকভাবে পোঁতা সেই চা বীজ দার্জিলিঙের জলবায়ু ও মাটিতে দ্রুত বেড়ে ওঠায় ব্রিটিশরা বুঝেছিল যে, দার্জিলিং পাহাড় চা-চাষের উপযুক্ত। ১৮২৩ সালে মেজর রবার্ট ব্রুসের অসমের জঙ্গলে চা-গাছ আবিষ্কার এবং ১৮৩৯ সালে অসম চা কোম্পানির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতে চা-শিল্পের প্রসার শুরু হওয়ার পর দার্জিলিঙে চা-গাছের বেড়ে ওঠা খুলে দিয়েছিল নতুন দিগন্ত। দ্রুত ব্রিটিশরা দার্জিলিঙে চা-চাষে উদ্যোগী হয়। এই ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন মেজর গ্রামলিন। পৃথিবীবিখ্যাত দার্জিলিং চায়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। ১৮৫৬ সালে লেবং-এর ধোত্রে চা-বাগান দিয়ে শুরু হয়েছিল উত্তরবঙ্গের চা-অভিযান। 

আসলে অহেলা ভিউ পয়েন্ট থেকে গরুবাথানের বিস্তীর্ন অঞ্চলে বা পাহাড়ে একের পর এক চা-বাগান দেখতে দেখতে এই কথাগুলি মনে পড়া যথেষ্টই প্রাসঙ্গিক। কেননা গরুবাথান বর্তমানে যে জেলার অধীনে সেই জেলাও ছিল আঠারো ডুয়ার্সের অন্যতম। ১৮৬৫ সালে সিনচুলা চুক্তির পর ব্রিটিশরা ডুয়ার্স অঞ্চলকে পূর্ব ও পশ্চিম ভাগে ভাগ করেছিল। সংকোষ নদীর পূর্ব প্রান্ত থেকে অসমের বিস্তীর্ন ডুয়ার্স অঞ্চল ছিল পূর্ব ডুয়ার্স নামে পরিচিত। পশ্চিম ডুয়ার্স বলতে বোঝাত সংকোষ নদীর পশ্চিম তীর থেকে তিস্তা নদীর পূর্বকে। পশ্চিম ডুয়ার্সের পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়েছিল ডালিমকোট। এর সদর দপ্তর ছিল কালিম্পঙ। অর্থাৎ, অতীতে কালিম্পঙ ছিল ভুটানের অধীনে আর সেখান থেকে গিরিপথ বা দ্বার দিয়েই সমতলে নেমে আসতেন ভুটান বা লস্ট হরাইজোনের দুর্দান্ত মানুষেরা। অতীতের সেই ডালিমকোট আজকের গরুবাথানের খুব কাছেই। সেখানকার ভগ্নপ্রায় ফোর্ট টুরিস্টদের হয়ত খুব কিছু আকর্ষণ করে না, কিন্তু সেখানে যে  কত ইতিহাস লেখা আছে তার খবর এই প্রজন্মের  কে আর রাখে!

আজকের কালিম্পঙ পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় চা-বাগানের ব্যাপক প্রসার দেখা গেলেও, দার্জিলিং পাহাড়ে চা-বাগান পত্তনের প্রথম একশ বছর পরেও কালিম্পঙে কিন্তু সেভাবে চা-বাগান গড়ে ওঠে নি। কালিম্পঙের চা-বাগানের ইতিহাস তার পর থেকে। এর কারণ অনুসন্ধানে প্রাবন্ধিক সৌমেন নাগ বলছেন, 'কালিম্পঙ ছিল ভুটানের অধীন। এর জনবসতি ছিল মূলত লেপচা এবং ভুটিয়া। এরা সবাই ছিল মূলত কৃষিজীবী। তিস্তার এপারে চা-বাগিচা গড়ে ওঠার ফলে সেখানে কৃষিজমির অস্তিত্ব প্রায় ছিল না। দার্জিলিং তখন ইংরেজ শাসকদের বাসভূমি। তাদের সেনাবাহিনীর জন্য গোর্খাদের নিয়োগের প্রধান কেন্দ্র। সিকিম থেকে লেপ্চা শ্রমিকদের নিয়ে এসে দার্জিলিং শহর নির্মাণের আর প্রয়োজন ছিল না, এমনকি সেই সম্ভাবনাও ছিল না। কারণ সিকিমের জনসংখ্যা ছিল এমনিতেই কম। সেখান থেকে দার্জিলিং শৈলাবাস নির্মাণের জন্য লেপ্চা শ্রমিকদের নিয়ে আসায় সিকিমে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছিল। তাই সিকিমের শাসক লেপচাদের সিকিম ত্যাগ করার ওপর নানা বাধানিষেধ আরোপ করেছিলেন। পাহাড়ে খাদ্যের প্রয়োজনে দরকার কৃষিক্ষেত্র। তাই ইংরেজ সরকার কালিম্পঙকে কৃষিক্ষেত্ররূপে রাখতে চেয়েছিল।` 

কিন্তু কালিম্পঙের জলবায়ু ও মাটিও চা-চাষের অনুকূল হওয়ায় বর্তমানে এই জেলাতেও প্রচুর চা-বাগান স্থাপিত হয়েছে। আর তাদের অনেকেই পেয়ে গেছে দার্জিলিং চায়ের লোগো।  প্রশ্ন জাগতে পারে যে, দার্জিলিং চা ব্যাপারটি ঠিক কী! পাতার গুণমান, চায়ের সুগন্ধ, স্বাদ, উপকারিতা ইত্যাদি নানা কিছু বিচারে দার্জিলিং ও কালিম্পঙ পাহাড়ের কিছু কিছু চা-বাগানের চা সাধারণ চায়ের তুলনায় একেবারেই আলাদা। ১৯৮৩ সালে   'টি বোর্ড অফ ইন্ডিয়া'র প্রস্তুত করা লোগো একমাত্র তারাই ব্যবহার করতে পারে। এই মুহূর্তে মোট ৮৭টি চা-বাগান সেই মর্যাদার অধিকারী। তার মধ্যে  কালিম্পঙ পাহাড়ের কিছু চা-বাগানও রয়েছে, যারা দার্জিলিং চা প্রস্তুত করছে।   









ডুয়ার্সের এই অঞ্চলে আসলে সবার আগে পা রেখেছি বিখ্যাত সেই ডালিমকোট ফোর্টে।ভুটিয়া ভাষায়  'কোট' শব্দের অর্থ দুর্গ এবং তিব্বতি ভাষায় 'ডালিং' তীর্থস্থানকে বোঝায়। লেপচারা বলেন 'ডালিং' মানে পবিত্র ভূমি। গরুবাথান থেকে ১০ কিমি দূরত্বের এই ফোর্ট আজ হেরিটেজের মর্যাদা পেয়েছে। এই ফোর্টের স্থাপনা নিয়ে কিছু মিথ রয়েছে। মনে করা হয়, বহু বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে যখন গিয়াবো আচোক রাজা হন, তখন প্রয়োজন হয় একটি সুরক্ষিত স্থানের। কেননা তিনি যেখানে তাঁর দিদিমা মনোমায়া রাইয়ের কাছে বড় হয়েছেন সেই চাখুনডারা ততটা নিরাপদ ছিল না তাঁর পক্ষে। অবশেষে সেরকম একটি জায়গার দেখা পাওয়া যায়। আর সেটি ছিল ডালিম এলাকায়, পাহাড়ের এক ঢালে। এর চারদিকে রয়েছে খাত। ফলে জায়গাটি টেবলটপ আকৃতি নিয়েছে। এখানেই গিয়াবো আচোক ও তাঁর সঙ্গীরা গড়ে তোলেন ফোর্টটি। এই ফোর্টের গড়ন ও স্থাপত্য নিঃসন্দেহে অভিনব। এত উঁচুতে যে পাথর ব্যবহার করে ফোর্টটি তৈরি করা হয়েছিল, তা কীভাবে এল সেই ব্যাপার নিঃসন্দেহে গবেষণার বিষয় হতে পারে। ফোর্টের গড়ন, রাজা গিয়াবো আচোকের বীরত্ব, রহস্যমৃত্যু, তাঁর রানির আত্মহত্যা ইত্যাদি সব মিলে ফোর্টটিকে রহস্যময় করে তুলেছে। বক্সা ফোর্টের কথা মনে রেখেও বলতে হয় যে, এই ফোর্টটি সম্ভবত ডুয়ার্স অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন ফোর্ট এবং একে ঘিরে যে গল্প প্রচলিত তা এককথায় রীতিমতো আকর্ষণীয়। নেওরা ভ্যালি জাতীয় উদ্যান ফোর্টের খুব কাছেই। ডালিমখোলা পয়েন্টটিও জিরিয়ে নেওয়ার জন্য অনবদ্য। 

ফোর্ট ফেরত চেল নদীর ধারে পিকনিক স্পটটি ভীষণ মনকাড়া। চারদিকের দৃশ্য চ্যালেঞ্জ করে যে কোনও পাহাড়ি প্যানোরামাকে।  এসব শেষ করে অহেলা ভিউ পয়েন্টে এসে, ডঃ ক্যাম্পবেল আর গ্রামলিন আচ্ছন্ন করেছিলেন। আসলে পাহাড়ের মাথা থেকে চারদিকে চা-বাগান সহ এত সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল যে, না ভেবে উপায় ছিল না বোধহয়। যাহোক এবার চলা ফাগু পার করে মিশন হিলসের দিকে। এই ফাগু অবশ্য লোয়ার ফাগু। ডালিমকোটের পথেই পেয়েছি আপার ফাগুকে। 

মিশন হিলস যেখানে শুরু সেটা রীতিমতো পাহাড়। যত ওপরে উঠছি নিচের দৃশ্য ততই সুন্দর হচ্ছে।  এই চা-বাগানের প্রতি আমার নিজের একটু দুর্বলতা আছে। আসলে বাঙালিদের অধীনে আজকাল যে কয়েকটা চা-বাগান রয়েছে, মিশন হিলস তাদের মধ্যে একটি। মালবাজারের রায় এন্ড কোম্পানির এই চা-বাগানের চায়ের স্বাদ মালবাজারে তাদের নিজস্ব স্টলে বসেও নিয়েছি বেশ কয়েকবার। সর্বোপরি এই চা-বাগান পেয়েছে দার্জিলিং চায়ের মর্যাদা। চারুচন্দ্র সান্যাল, এস পি রায়, বি সি ঘোষের মতো প্রখ্যাত মানুষদের পরে বাঙালি চা-বাগান মালিক আজকাল যেখানে দেখাই যায় না প্রায়, সেখানে এই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে যথেষ্ট গৌরবের। 

মিশন হিলসের ফ্যাক্টরি আর চারপাশ দেখে এবার এগিয়ে চলা সামনে। পাকদন্ডী রাস্তা একসময় নেমে আসে নিচে। শুরু হয় জঙ্গল, পাহাড়, নদী মিলে এক অসাধারণ দৃশ্য। সেই দৃশ্যেই তন্ময় হয়ে গেলাম মুহূর্তে। কিন্তু ঘোর ভাঙল পরিচিত আওয়াজে। কান খাড়া করে আবার শুনলাম। হাতির ডাক। বোঝা যাচ্ছিল আশেপাশে রয়েছে গজরাজ। আর থাকবেই বা না কেন! শাখাম নামে পরিচিত এই জায়গাটি তো হাতিদের আঁতুরঘর। 

শাখামের ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দুর্গম পথে সোজা চলে যাওয়া এবার সৌরেনি গ্রামে। ওখানকার হর্নবিল জলপ্রপাত রূপে ছাঙ্গের জলপ্রপাতকেও হার মানায়। সবসময় দেখা মেলে হিমালয়ের বিভিন্ন পাখিদের। সমাগম হয় হর্নবিলের সব প্রজাতির। সৌরেনি পৌঁছতে বেশ খানিকটা উঠতে হয় পাকদন্ডী পথে। 

ফিরতি পথে মাল নদীর ওপর ব্রিজ পেরিয়ে ঘন জঙ্গলের প্রায় অন্ধকার রাস্তা দিয়ে এসে পৌঁছলাম সামসিংয়ের সুন্দর বস্তিতে। সত্যি বলতে এতক্ষণে মানুষজনের দেখা পেয়ে খানিকটা স্বস্তি হল। আদিম অরণ্যের শাখাম আসলে পৌঁছে দিয়েছিল এমন এক যুগে যেখানে ভুটান রাজা-যুদ্ধ-তন্ত্রমন্ত্র-বৌদ্ধ সন্ন্যাসী-রূপকথা ইত্যাদি সব মিলে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যেন! 

এই ডুয়ার্স সত্যিই অনন্য। কেউ চেনে, আর কেউ চেনে না।  

(প্রকাশিত: এখন ডুয়ার্স)