এই মুহূর্তে `বিদ্যালাভে লোকসান, নাই অর্থ, নাই মান`?
শৌভিক রায়
সম্প্রতি, অন্ধ্রপ্রদেশের কাকিনাড়ার ভি চন্দ্র কিশোর, আত্মহত্যার পর, খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন।
বর্তমান ভারতে, প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেন। বিগত কুড়ি বছরে প্রতি লাখে আত্মহত্যার সংখ্যা ৭.৯ থেকে ১০.৩ হয়েছে।
কাজেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ওএনজিসি-র জনৈক কর্মী ভি চন্দ্র কিশোরের আত্মহননের সংবাদে আপাত ভাবে সাধারণ বলে মনে হতেই পারে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে আরও একটি ঘটনা ও তার কারণ জানলে অবশ্যই চমকে উঠতে হয়। তিনি শুধু নিজেই মৃত্যুকে বেছে নেননি। গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়বার আগে, জলে চুবিয়ে হত্যা করেছেন নিজের দুই কিশোর সন্তানকে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, পড়াশোনায় সাধারণ এই সন্তানরা ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারবে না।
কাকিনাড়ার এই ঘটনাটিকে কিন্তু বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রম মনে করা ভুল হবে। এই মুহূর্তে এ দেশে এই জাতীয় আশঙ্কায় ভোগা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা ঠিক, সবাই আত্মহননের বা হত্যা করবার চরম পথ বেছে নিচ্ছেন না, কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষ উদ্বেগে ভুগে মানসিক রুগীতে পরিণত হচ্ছে। ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সার্ভে জানাচ্ছে, ভারতের মোট জনসংখ্যার ১০.৬ শতাংশ মানুষ কোনও না কোনও মানসিক রোগে ভুগছে। এবং আরও পনেরো শতাংশের মানসিক রুগী হওয়া ঠেকাতে তাৎক্ষণিক কাউন্সিলিং প্রয়োজন।
তথ্যের কচকচানিকে দূরে সরিয়ে রেখে, যদি একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতেও দেখি, তবু যেন এই হত্যা ও আত্মহত্যার কারণ সত্যিই অবাক করে তোলে। একেই তো পিতার হাতে সন্তানদের হত্যা ব্যাপারটাকে হজম করতে অসুবিধে হয়, তার ওপর কারণ জেনে বিস্মিত হওয়া ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। কিন্তু বাস্তব হল, সেটিই ঘটেছে।
নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আজকের অসংখ্য অভিভাবক নিদারুণ আশঙ্কিত। বিশেষ করে, যাদের সন্তান মধ্যমেধার বা তার নিচের, তাদের তো দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। যাদের পারিবারিক ব্যবসা আছে, তাদের তবু রক্ষে। কিন্তু চাকরির ওপর নির্ভরশীল বাবা-মায়েরা প্রত্যেকেই আজ কমবেশি ডিপ্রেশনের শিকার।
ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে সরকারি চাকরির ক্ষেত্র। বেসরকারি ক্ষেত্রেও তীব্র প্রতিযোগিতা। নামী প্রতিষ্ঠানের তকমা ছাড়া সেখানে ইন্টারভিউতেই ডাক পাওয়া দুষ্কর। আর ডাক পেলেই যে চাকরি হবে, তার গ্যারান্টি কোথায়! চাকরি প্রার্থীরও তো কিছু নিজস্বতা থাকতে হবে! যদি সেটার অভাব থাকে, তবে নামকরা প্রতিষ্ঠানের তকমাও কিছু করতে পারে না। তা ছাড়া শুধু চাকরি পেলেই তো হল না! যোগ্যতার প্রমাণ না দিতে পারলে, ছাঁটাই হতে আর কতক্ষণ! ফলে চাকরি পাওয়া মানে সব চাপ থেকে মুক্ত হওয়া গেল, এরকম ভাবারও কোনও কারণ নেই।
এ সবের চাইতেও বড় বিষয় হল, যোগ্যতা অনুসারে চাকরি কোথায়? আইআইটি-র মতো দেশের প্রিমিয়াম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ড্রপ-আউটের সংখ্যা বাড়ছে। বি টেক প্রোগ্রামে এই পরিমাণ কম হলেও, এম টেক ও পিএইচডি-র ক্ষেত্রে সেটি কিন্তু ৫০ শতাংশেও ঠেকে কখনও। কিন্তু এই অবস্থা কেন? মোটমুটিভাবে ধরে নেওয়া যায়, উচ্চ শিক্ষায় যারা যাচ্ছেন, তারা কর্মক্ষেত্রে আকাডেমিক ব্যাপারেই আগ্রহী হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, এই রাজ্য তো বটেই, সারা দেশের আকাডেমিক ক্ষেত্রের চিত্রটি বড্ড করুণ। ফলে পাঁচ বছর ধরে গবেষণার কঠিন পথ পেরিয়ে, কাউকে যদি এলেবেলে কাজে নিযুক্ত হতে হয়, তাহলে সে এই ঝুঁকি নেবে কেন?
আইআইটি-র পিএইচডি প্রোগ্রাম থেকে ইস্তফা দেওয়া রসায়নের এক গবেষক ছাত্রের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি স্পষ্ট বললেন, `কেন পাঁচ বছরের ঝুঁকি নেব! চাকরি কোথায় তার পর? আমার মতো যারা পিএইচডি করছে, তাদের অধিকাংশই চেষ্টা করছে যেভাবে হোক তাড়াতাড়ি কিছু একটা পেয়ে বেরিয়ে যেতে।` আর এক পড়ুয়াকে জানি যিনি কানপুরে একটি পোস্ট-ডক্টরেট প্রোজেক্ট শেষ করে, চিনে যাচ্ছেন আর একটি প্রোজেক্ট করতে। দেশে যে অফার পাচ্ছেন তিনি, সেগুলির অর্থমূল্য সামান্য। স্থায়ী চাকরি নেই কোথাও। সেই পড়ুয়ার বাবা-মা চিন্তিত। এভাবে প্রোজেক্ট করে কতদিন চলবে!
মেধাবী পড়ুয়াদের যদি এই অবস্থা হয়, তবে সাধারণ ছাত্ররা যাবে কোথায়? অভিভাবকরাই বা কী করবেন! `যোগ্যতমের উদ্বর্তন`-এ এদের জায়গা ঠিক কোথায়? সন্তানকে সাধারণ থেকে অসাধারণ বানাবার প্রচেষ্টায় হয়ত তাই আজ কোটার মতো শহরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সেখানেও তো আত্মহত্যার মিছিল। চাপ নিতে না পেরে ২০২৪ সালে সেখানে ১৭ জন আত্মহত্যা করেছে। তার আগের বছর সংখ্যাটি ছিল ২৬। বড় মেট্রো শহরের বিভিন্ন স্কুলের পড়ুয়াদের এই পথ বেছে নেওয়ার সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। পিছিয়ে নেই গ্রামীণ ভারত। বিগত এক দশকে সেই সংখ্যা ৬ হাজার ৫৫৪ থেকে ১৩ হাজার ৪৪-এ দাঁড়িয়েছে। আর এ রাজ্যে সম্প্রতি সেই পরিমাণ খানিকটা কমলেও, ২০২০ সালে ৪৮.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। অবশ্য পড়ুয়াদের আত্মহত্যার এই বিপুল সংখ্যার পেছনে শুধুমাত্র যে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা একমাত্র কারণ, সেটা বলা যাবে না। কিন্তু অধিকাংশই যে সেই কারণে, এই বিষয়ে সন্দেহ নেই।
শুধু আত্মহত্যাই নয়, ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হবে, এই ভাবনা থেকেও, আজকাল স্কুল-কলেজ থেকে ড্রপ আউটের সংখ্যা বাড়ছে। পড়ার চাইতে অন্য কিছু এখন থেকেই করা ভালো। এ রকমই ধারণা তাদের। বৃদ্ধি পাচ্ছে পরীক্ষা না দেওয়ার ঘটনাও। নিজের এক মেধাবী ছাত্রীকে জানি। পড়াশোনায় ডুবে থাকা মেয়েটি এই বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করতে পারল না শুধুমাত্র একটি ভয়ের কারণে। তার রেজাল্ট ভাল হবে না। নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়তে পারবে না। অন্যরা তার থেকে এগিয়ে যাবে। তার অভিভাবকরাও এতটাই শঙ্কিত যে, তাদের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হচ্ছে। ছাত্রীটির কথা তো ছেড়েই দিলাম।
অন্ধ্রপ্রদেশের এই ঘটনাটি আমাদের সবাইকে একটা আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে। শুধুমাত্র হত্যা ও আত্মহত্যার তত্ত্ব দিয়ে যদি এটিকে আমরা বিচার করি, তবে ভুল করা হবে। এর শেকড় ছড়িয়ে আরও গভীরে। আসলে রাষ্ট্র যখন নিজে অসংবেদনশীল দেউলিয়াপনায় ভোগে, তখন তার নাগরিকদের ওপর এ ভাবেই অভিঘাত নেমে আসে। সঠিক কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যতের ন্যূনতম নিরাপত্তা না থাকলে, আগামীতে এরকম ঘটনা বাড়বে বই কমবে না!
(লেখক কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক)
https://epaper.eisamay.co.in/eisamay/2025-04-09/1/page-1.html#
* প্রকাশিত- উত্তর সম্পাদকীয়, এই সময়, এপ্রিল ৯, ২০২৫/ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা `এই সময়`

No comments:
Post a Comment