জীবনে যেন কিছুই নেই!
শৌভিক রায়
গৃহ-সহায়িকা মাঝবয়সী মহিলা, এই মাসেও, সময়ের আগেই, বেতন চাইলেন। ভাবলাম, বোধহয় কোনও সমস্যা হয়েছে।
উনি কুড়ি বছরের ওপর আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। ফলে, বাড়তি একটা দায়িত্ব থেকেই যায়। তাই পর পর তিন মাস ধরে আগাম বেতন চাওয়ার কারণ কী জানতে চাইলাম। খুব কুন্ঠিত গলায় উনি যা জানালেন, তাতে সত্যিই অবাক হলাম। মেয়ের স্মার্টফোনের রিচার্জ করবার জন্য, ওঁকে মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা চাইতে হচ্ছে।
আমার বিস্মিত হওয়াটা বোধহয় সময়ের সঙ্গে পাল্লা না দিতে পারার জন্য। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের প্রাথমিক চাহিদার পর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির মতো বিষয়গুলিকে পেছনে ফেলে, স্মার্টফোন রিচার্জের মতো বিষয় আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় উঠে এসেছে, বুঝতে পারিনি। পরে তথ্য জেনে অবশ্য নিজেকে সত্যিই বোকা মনে হচ্ছিল। চলতি বছরের মাঝামাঝি যা পরিসংখ্যান, তাতে স্পষ্ট, বছর শেষের আগেই আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা নয়শো মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। বিগত বছরের চাইতে এই সংখ্যা অনেকটা বেশি। আরও মজা হল, এই ব্যবহারকারীদের মধ্যে গ্রামাঞ্চলের মানুষের সংখ্যা কিন্তু চমকপ্রদভাবে বিপুল। তুলনায় পুরুষদের চাইতে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, দ্রুতগতিতে মহিলারা উঠে আসছেন এই ক্ষেত্রেও।
তত্ত্বের কচকচানি দূরে থাক। দুটো ঘটনা বলি। যে ড্রাইভারের সঙ্গে পোর্ট ব্লেয়ার ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, তিনি ডিগলিপুরে আমাদের সঙ্গে গেলেন না। কেননা পরদিন তাঁর নেট পরিষেবা বন্ধ হবে। আর যে নেটওয়ার্কে তিনি আছেন, সেটি উত্তর আন্দামানের ওই অঞ্চলে নেই। নিজের ব্যবসার ক্ষতি করে, তিনি অন্য একজনের ব্যবস্থা করে দিলেন। আমরা প্রথমটায় হতভম্ব। পরে বেশ মজা পেয়েছিলাম। হাসতে হাসতে একজনকে বলতে শুনেছিলাম `নেট-ব্যবহাকারী চরিত্রম দেবা না জানন্তি`। মজা করে বলা হলেও, ব্যাপারটি কিন্তু অনেকাংশেই সত্যি। অন্য অনেক কিছু না পেলেও চলবে, ফোনে রিচার্জ লাগবেই! তার জন্য কাজের ক্ষতি হোক, কুছ পরোয়া নেই।
দ্বিতীয় ঘটনাটি নিজের এক ছাত্রীর ক্ষেত্রে দেখেছি। উঁচু ক্লাসে পড়ার ফলে মিডডে মিলের অধিকার নেই তার। বাড়ি থেকে তাকে টিফিনের জন্য নিয়মিত টাকা দেওয়া হয়। কিন্ত কোনও দিন তাকে খেতে দেখি না। ওর বাড়ির লোক ব্যাপারটি বুঝতে পেরে আমাকে জানালে, একদিন মেয়েটিকে চেপে ধরলাম। ক্রমে সত্যিটা উঠে এলো। টিফিনের পয়সা জমিয়ে ছাত্রীটি ফোন রিচার্জ করে। বাড়ি থেকে ফোন রিচার্জের পয়সা দেয় না? `দেয় স্যার, কিন্তু ডাটা কয়েকদিনেই শেষ হয়ে যায়। তাই টিফিনের পয়সা জমিয়ে ডাটা ভরি।`
স্মার্টফোন থাকাটাই নাকি আজকাল শুধু আধুনিকতা নয়। ইন্টারনেটের জগতে আপনি কতক্ষণ থাকছেন, সেটাই বড় কথা। কেননা সব স্মার্টনেস সেখানে। ভার্চুয়াল ওই দুনিয়ায় মুহুর্মুহ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে দুনিয়া । তার কোনও একটি বাদ চলে গেলে, পিছিয়ে পড়তে হবে।
এই পিছিয়ে পড়বার ভয় মারাত্মক। সব বিষয়ে জানতে হবে, টিপ্পনি দিতে হবে। চায়ের কাপে তুফান তুলতে হবে। জানান দিতে হবে নিজের অস্তিত্ব। তার জন্য নিজের মুঠিতে নিয়ে আসতে হবে দুনিয়াকে। আর সেটা সম্ভব একমাত্র ইন্টারনেটের সাহায্যে। ফলে যেভাবেই হোক ফোনে নেট কানেকশন লাগবেই। সেটা না হলেই, নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন। ফলে `ধর্মেও থাকা, জিরাফেও থাকা` নির্ভর করছে নেটের ওপর। এই ব্যাপারে বোধহয় আট থেকে আশি সকলেই এক। অবশ্যই তরুণ প্রজন্মের ব্যাপারটি নজরে পড়ে বেশি। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বড়রাও মোটামুটি একই পথের পথিক। তথ্য বলছে, ভারতে নেট ব্যবহারকারীদের ১৪.৪ শতাংশের বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চুয়াল্লিশের মধ্যে। আর পঁয়তাল্লিশ থেকে চুয়ান্ন বছর বয়সীদের শতাংশ হল ১১.২।
আজকাল প্রতিটি জনপদে তাই একই ছবি। আড্ডা চলছে। নিঃশব্দে। নিজস্ব ফোনে। সব কিছুকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। হয়ত নির্বাক এই আড্ডার টান অনেক বেশি। রয়েছে বিভিন্ন সমাজ মাধ্যম। নানা কর্মকাণ্ড। অনলাইনেই সব। আর এসবের জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দরকার, সেটি যদি না থাকে, তবে তো পাগল পাগল অবস্থা হবেই।
ফলে লাভ `সার্ভিস প্রোভাইডকারি` সংস্থার। কোনও ভাবে একবার `মার্কেট` ধরে নিতে পারলেই হল। কয়েক বছর আগে, বিনে পয়সায় নেটের লোভ দেখিয়ে, সারা দেশের অধিক সংখ্যক মানুষকে, নিজেদের দিকে নিয়ে আসার ইতিহাস তো এখনও পুরোনো হয়নি!
ফলে `রুটি কাপড়া মকান`-এর সেই সব দিন আজ অতীত। প্রয়োজন একটিই। আর সেই দরকার মেটাতে অন্য সব কিছুকে জলাঞ্জলি দেওয়াটাও দোষের নয়। গতি এখন শুধু রাস্তায় নয়। ফোর জি, ফাইভ জি ইত্যাদির চক্করে সে যেন হাতের মুঠোয়। সেই গতিকে সম্বল করেই সভ্যতা তাই এগিয়ে চলছে। নিজের মতো। অন্তহীন।
(প্রকাশিত: রংদার রোববার, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, এপ্রিল ২৭, ২০২৫)
** কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ মাননীয় কার্যকরী সম্পাদক ও উত্তরবঙ্গ সংবাদকে

No comments:
Post a Comment