Friday, April 18, 2025


 

রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে অন্ধকার শেষ হবে কবে?

শৌভিক রায়

তিরিশ বছর আগে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যখন কর্মরত হই, তখন অগ্রজ সহকর্মীরা শিক্ষার দুরাবস্থা দেখে ব্যথিত হতেন। তাঁদের অনেকেই আজ ইহলোকে নেই। সেই সব শিক্ষকদের অভাব অনুভব করলেও, মনে হয় তাঁদের না থাকাটা শাপে বর হয়েছে। কেননা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রের বর্তমান  দশা তাঁদের দেখতে হচ্ছে না। আর আমার মতো দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা এই পেশায় রয়েছেন, তাঁদের অবস্থা যে কী, সে তো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকার পোষিত বিদ্যালয়গুলিতে ছাত্র শিক্ষক অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে বিসদৃশ্য। কারণ কোনও নিয়োগ নেই। সরকারি স্কুলগুলিতে পিএসসি-র মাধ্যমে আসতে হয়। সেখানে শেষ পরীক্ষা কবে হয়েছে কে জানে! আর যে এসএসসি একটা সময় এই রাজ্যের চাকরি প্রার্থীদের বিরাট ভরসা ছিল, তার দশা নিয়ে নতুন কিছু বলবার নেই। সবাই কমবেশি জানি, সেখানে কী হচ্ছে। দুর্নীতির ঘুঘুর বাসায় পরিণত হওয়া সেই কমিশনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়। এক লপ্তে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ছাব্বিশ হাজার এসএসসি নিয়োজিত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী।

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা মানচিত্রে এই চিত্র কখনও দেখা যেতে পারে, সেটা কেউ কল্পনাতেও আনেননি। বাস্তব হল, সেটাই হয়েছে। ফলে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা। অবস্থা এমনই হয়েছে যে, কোথাও প্রধান শিক্ষককে বেল বাজাতে হচ্ছে, কোথাও আবার পঠন পাঠন ঠিক রাখতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কিংবা প্রাক্তনীদের ডাকতে হচ্ছে। কোথাও সেকশনের সংখ্যা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ, কোথাও দুটো ক্লাস একসঙ্গে করে চালাতে হচ্ছে, কোথাও বিদ্যালয়ের করণিক পরীক্ষার কাজে হাত লাগাচ্ছেন।

এমনিতেই এই রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলিতে দিনের পর দিন ছাত্র সংখ্যা কমছে। বাড়ছে ড্রপ আউট। কিছুদিন আগে, বহু সংখ্যক শিক্ষক সরকারি বদলির সুবিধে নিয়ে গ্রামের স্কুল থেকে শহরে চলে এসেছেন। ফলে গ্রামের স্কুলগুলি এমনিতেই শিক্ষকের অভাবে সমস্যায় পড়েছিল। আর চাকরি চলে যাওয়ায়, তাদের অবস্থা আরও খারাপ। এমনও স্কুল রয়েছে এই বঙ্গে যেখানে শিক্ষক সংখ্যা প্রায় শূন্যে ঠেকেছে। যতই ভলান্টারি সার্ভিসের আবেদন রাখুন রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসক, তাতে কিন্তু সায় দিচ্ছেন না অধিকাংশ চাকরি হারা শিক্ষক। দেবেন বা কেন? যেখানে চাকরির নিরাপত্তা নেই, সেখানে কারও পক্ষেই পাঠদান করা সম্ভব নয় বলেই ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি। মানসিকভাবেও তো তারা সুস্থিত অবস্থায় নেই। 

শিক্ষকতা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই চিত্র দেখব সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি। যে বঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থা একসময় সারা দেশের রোল মডেল ছিল, আজ তা ধূলিসাৎ। ক্ষয় শুরু হয়েছিল বহু আগে থেকেই, কিন্তু বিগত দশ বারো বছরে পুরো ভিতটাই নষ্ট হয়ে গেছে। শূন্য পেয়ে বা ব্ল্যাঙ্ক ও এম আর শিট জমা দিয়েও যে শিক্ষক হ‌ওয়া যায়, সেটা বর্তমান আবহে বোঝা যাচ্ছে। এমন নয় যে, অতীতে সব নিয়োগ স্বচ্ছ ছিল। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, সেই সব কারণেই রাজ্যে পালাবদল হয়েছিল। আশা ছিল অনেক। প্রতিশ্রুতি ছিল পাহাড় প্রমাণ। তাই আজকের অন্যায়কে 'ওই সময় তো এটা হয়েছিল' বলে যারা গলা ফুলিয়ে তর্ক করে, তারা আসলে মূর্খের স্বর্গে বাস করছে।  আর এই মূর্খের প্রাধান্য ও রমরমা ক্রমবর্ধমান। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য চলছেই।

এই মুহূর্তে যে দশা, তাতে কোনও আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। একদিকে চাকরি হারা যোগ্য বৈধ শিক্ষকরা আর অন্যদিকে অযোগ্য অবৈধরা। দীর্ঘদিন সময় পেয়েও সঠিক পদক্ষেপের সদিচ্ছার অভাব রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মোটামুটি খাদে ফেলে দিয়েছে। সেখান থেকে ওঠা যাবে না, তেমনটা নয়। কিন্তু একটা সুন্দর ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে, কয়েক শ পা পিছিয়ে আবার শুরু করার এই বোকামি কিংবা ইচ্ছাকৃত অন্যায় কি আদৌ জরুরি ছিল? অবৈধ নিয়োগকে বৈধ করতে অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করার গর্হিত অপরাধ থেকে রেহাই পেলেও, প্রশ্ন কিন্তু থেকে যাচ্ছে। সব চাইতে বড় বিষয় হল, অন্যায় করেও অনেকে পার পেয়ে গেল। আর শিকার হল সত্যিকারের গুণী শিক্ষকেরা। আজ এই প্রতিবেদন যখন লিখছি, তখন রাজ্যে জুড়ে মার খাচ্ছেন চাকরি চলে যাওয়া শিক্ষকদের একাংশ। তাদের মধ্যে পুরুষ মহিলা দুইই আছেন। প্রায় দশ বছর শিক্ষাদানের মহান পেশায় থেকে, এই মানুষগুলি যখন এভাবে উপহাস ও পুলিশের লাঠির সামনে পড়ছে, তখন শিক্ষক হিসেবে আমারও মাথা হেঁট হচ্ছে। কিন্তু সেটা বুঝবে কে? 

শিক্ষা ব্যবস্থার এই অন্ধকার কাটবে কবে কেউ জানে না। সত্যি বলতে, একদা সমাজে সবচেয়ে আদৃত পেশাটি আজ চরম উপেক্ষিত। কেউ ভাবছে না যে, চাকরি চলে যাওয়া, লোনের ই এম আই দিতে না পারা, সংসার চালানোর উপযুক্ত পথ না থাকা ইত্যাদির পরেও আর একটি বিষয় রয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রের এই অবস্থা দেখে, আগামীতে আদৌ কি কেউ এই পেশায় আসতে চাইবেন? যদি সেটা না হয়, তবে অবস্থা কী দাঁড়াবে সেটা আমরা ভাবছি কি কেউ? একটা রাষ্ট্র কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে শিক্ষকদের ওপরে। তাঁরাই তৈরি করেন ভবিষ্যতের নাগরিক। তাঁরাই দেন ভাষা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার স্পর্ধাও শেখান তাঁরা। তাঁদের জন্যই আমাদের মধ্যে থাকা ছোট্ট শিশু উলঙ্গ রাজাকে উলঙ্গ‌ই দেখে।

এই সব কিছুই শেষ হতে চলেছে। যে অশনি সংকেত দেখা যাচ্ছে, তাতে একদিন স্কুল থাকবে, পড়ুয়া থাকবে, বই খাতা চক ডাস্টার সব থাকবে, থাকবে না পড়ানোর মানুষটি। সমাজের উচ্চ বিত্তদের তাতে কিছু যাবে আসবে না। নেতা নেত্রীর পাশে লন্ডনের পথে হাঁটতে হাঁটতে, তারা হয়ত স্কুল অফ ইকোনমিক্সে বহু টাকা 'ক্যাপিটেশন ফি' দিয়ে নিজেদের সন্তানকে পড়িয়ে আনবেন। কিন্তু যারা প্রান্তিক মানুষ? যাদের থেকে উঠে আসেন একজন আম্বেদকর, তারা কোথায় যাবেন? আজও তো এই রাজ্যের ৮৫ শতাংশ পড়ুয়া সরকারি স্কুলের ওপর নির্ভর করে। আমাদের এই অসভ্যতায় তাদের যে ক্ষতি আমরা করছি, তার দায় কে নেবে!

(প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা/ সম্পাদক : শ্রী কৃষ্ণ দেব)


No comments: