Sunday, April 20, 2025


 

ধানসিঁড়ি 
শৌভিক রায় 

কামরূপ এক্সপ্রেস রঙ্গিয়া স্টেশনে ঢুকতেই কমল ব্যস্ত হয়ে উঠল। আমাদের নেমে পড়তে হবে। বদলাতে হবে ট্রেন। চলব তেজপুর পথে। 

ওই লাইনের ট্রেনে উঠে ব্যাগ রাখা গেল। দীর্ঘ যাত্রা ফালাকাটা থেকে। চা প্রয়োজন। 

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দুই চুমুক দিতে না দিতে, ট্রেন দিল ছেড়ে। পড়িমরি করে লাফিয়ে উঠলাম। খানিকটা খুব জোর গিয়ে সে আবার পেছনে ফিরল। বুঝলাম লাইন বদলাচ্ছে। কী মুশকিল! এভাবে কেউ বেকুব বানায়?

মাজবাটে যখন নামলাম, তখন বিকেল। ছোট্ট স্টেশন। ছিমছাম। কমলের দুই দাদা সাইকেল নিয়ে হাজির। 

পিকচার পোস্টকার্ডের মতো চারদিক। চলছি মাজবাট চা বাগানে। চা বাগান যে এত সুন্দর হতে পারে, ভাবিনি কখনও। অথচ নিজে বড় হয়েছি চা বাগান এলাকাতেই। 

ছিলাম দিন সাতেক। চষে বেরিয়েছিলাম পুরো এলাকা। সাইকেলে। কখনও ডাবল ক্যারি। কখনও দুজনে আলাদা আলাদা সাইকেলে। 

কমলের মা খাইয়েছিলেন চা পাতার বড়া। বাগানের আসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ছিলেন ওর বাবা। শুনেছিলাম `সফেদ হাতি` ছবিটির শুটিং হয়েছিল চা বাগান সংলগ্ন জঙ্গলে।




একটার পর একটা চা বাগান পেরিয়ে গিয়েছিলাম ভুটানে। তখনও জানতাম না, অসম ডুয়ার্সের দরং জেলার একটি দ্বার (যে শব্দ থেকে ডুয়ার্স) স্পর্শ করছি। 

সেবারই পরিচয় মঙ্গলদৈ, টংলা, উদলাগুড়ি, ঢেকিয়াজুলি, রাক্ষসমারি ইত্যাদি জায়গাগুলির সঙ্গে। গিয়েছিলাম প্রতিটি জায়গায়। 

সেই ১৯৮৭ সালে তখনও বোড়োল্যান্ড আন্দোলন সেভাবে দানা বাঁধেনি। ট্রেন লাইনে ইলেকট্রিফিকেশন কল্পনাতেও নেই। ফোর লেন শব্দটিই জানতাম না। 

শুধু মনে আছে, ধানসিঁড়ির টলটলে জলে স্নান করে  শীতল হয়েছিলাম প্রখর গ্রীষ্মদিনে। কী সুন্দর ছিল সেই নদী। আহা!

না, এই নদী কবি বর্ণিত সেই বিখ্যাত ধানসিঁড়ি নয়। ব্রহ্মপুত্রের উপনদী এই ধানসিঁড়ির গল্প আলাদা। 

সম্প্রতি আবার স্পর্শ করে এলাম ধানসিঁড়ি। আটত্রিশ বছর পর। ভাবতেই কেমন অদ্ভুত লাগছে। কত বদলে গেছে চারদিক!

মাজবাট থেকে ওরাং হয়ে ঢেকিয়াজুলির সেই যাত্রা চোখের সামনে জীবন্ত হল। 

না, এবার কমল সঙ্গে ছিল না। কিন্তু তাতে কী! এই যাত্রাটা তো ওর হাত ধরেই শুরু করেছিলাম একদিন। শেষ কি আর হয় সেটা?

আসলে জলের দাগ একবার লাগলে যে আর ওঠে না, তা আমার চাইতে ভাল বুঝবে আর কে! 

জলের দাগ বহমান  প্রজন্মে প্রজন্মে, সময়ের হাত ধরে.....     

No comments: