শহরের মিথ চৌচির পরিবর্তনের চাকায়
শৌভিক রায়
মফস্বল শহরের ছোট্ট স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে কামরূপ এক্সপ্রেস। আর পাগলের মতো আমরা খুঁজে চলেছি গেজেট। যদি কোনও যাত্রী এনে থাকেন, তবে উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্টটা অন্তত জানা যাবে। অবশ্য রেজাল্ট বলতে শুধু ডিভিশন ও প্রাপ্ত নম্বর। মার্কশীট পেতে পেতে আরও দিন সাত-দশেকের অপেক্ষা।
গত শতকের আশির দশকের শেষ পর্যন্ত চিত্রটা এরকমই ছিল। সেটা শুধু মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের ক্ষেত্রে নয়। প্রায় সব ব্যাপারেই। প্রায় প্রতিটি বিষয়েই আমাদের নির্ভর করতে হত মহানগর কলকাতা, শিলিগুড়ি ইত্যাদি শহরের ওপর।
খবরের কাগজের কথাই ধরা যাক। কলকাতায় প্রকাশিত আজকের কাগজ আমরা পেতাম পরদিন। তাও প্রতিদিন একই সময়ে নয়। সেটা নির্ভর করত ট্রেনের পৌঁছানোর ওপর। কপাল খুব ভাল থাকলে, সকাল দশটার মধ্যে কাগজ হাতে পেতাম। সেই সৌভাগ্য হতো মাসে মাত্র কয়েকদিন। কেননা ভারতীয় রেলের ঘোষিত `সেফটি-সিকিউরিটি-পাংচুয়ালিটি` নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ট্রেনগুলি প্রায়ই চলত বিলম্বে। আমাদের পরিচিত হকারদের দেখতাম সকালবেলায় সাইকেলে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্টেশনে পৌঁছাতে। কোনও কোনও দিন তাদেরকে প্রায় সারাদিন অপেক্ষা করতে হতো। তখনও আজকের মতো সাইকেলের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে মোটর সাইকেলের সংখ্যা বাড়েনি। স্টেশনগুলি খানিকটা দূরে হওয়ায়, বারবার যাতায়াত করাও সম্ভব ছিল না। ফলে দিনভর অপেক্ষা। উত্তরবঙ্গ সংবাদ শুরু হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি বদলাল।
খুব ছোটোখাটো বিষয়ের জন্যও আমাদের কতটা নির্ভরশীলতা ছিল, সেটা ভাবলে এখন বিস্মিত হই। গান শুনবার জন্য রেকর্ড কিনতে যেতে হত অন্যত্র। পাওয়া যেত না বিনস-গাজরের মতো সবজি। মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা নেওয়ার জন্য পরীক্ষকরা ছুটতেন শিবমন্দিরে বোর্ড অফিসের কাছের কোনও বিতরণকেন্দ্রে। দেখা হয়ে যাওয়ার পর, পোস্ট-অফিসের মাধ্যমে, খাতা পাঠাতে হতো কলকাতায়। কেননা অধিকাংশ প্রধানপরীক্ষক ছিলেন কলকাতার কোনও কলেজের অধ্যাপক বা স্কুলের হেডমাস্টার। উদাহরণ এরকম বহু দেওয়া যায়।
শহরমুখীনতার সেই দিনগুলি কবে যেন কীভাবে উবে গেল! এখনও ঠিক বিশ্বাস হয় না। আজকের প্রজন্ম ভাবতে পারে না, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকে আমাদের দুবেলায় দুটো পেপার পরীক্ষা দিতে হতো। আবার আমি ভাবতে পারি না, আমার ছোট্ট শহরে `পাওয়ার ব্যাংক` বা `ট্যাবলেট প্যাড` পাওয়া বিরাট কিছু ব্যাপার নয়। তাছাড়াও এই অনলাইনের যুগে আমাদের ছোটবেলার সেই লোভনীয় `উইং সাং` কলম থেকে হাল ফ্যাশনের ইলেক্ট্রনিক গেজেট সব কিছুই সর্বত্র হাতের মুঠোয়। পুরো দুনিয়াটা একটি `গ্লোবাল ভিলেজ`।
তাই গুগুল ম্যাপে লোকাল গাইড হিসেবে `লেভেল এইট` পার করবার জন্য, জার্মানি থেকে সুভেনির পৌঁছলেও মনে হয়, এটাই তো হওয়ার কথা ছিল! পরিবর্তনের এই দ্রুত গতির যুগে, রেলের ইলেকট্রিফিকেশন থেকে ফোর লেন রাস্তা, সবকিছুই যেন ছোট জনপদগুলোর পক্ষে গিয়েছে। বিমান পরিষেবার ক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে রইলেও, শহরের মিথ ভেঙে গেছে কবেই!
মিথ আসলে তৈরি হয় ভাঙার জন্যই। যে মফসসল এতদিন যেত শহরের কাছে, আজ সেই মহানগর ও শহর তার হাতের মুঠোয়। এর চাইতে ভাল আর কী হতে পারে!
(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)
* আজকের (এপ্রিল ৪, ২০২৫) উত্তরবঙ্গ সংবাদে সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ ও কার্যকরী সম্পাদককে।

No comments:
Post a Comment