শিক্ষাব্যবস্থা বাঁচাতে এগোতে হবে শিক্ষককেই
শৌভিক রায়
শিক্ষক হিসেবে কাজ করছি প্রায় তিন দশক হল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি আগে কোনও দিন দেখিনি। আমার বাবা-মা দুজনেই পঁয়ত্রিশ বছর ধরে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁদেরও কখনও এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে আজ যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা অভূতপূর্ব। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে যে প্রবল নৈরাজ্য এই মুহূর্তে চলছে, তাতে দিশেহারা আমরা সবাই। কেউ বুঝতে পারছি না, কী হবে কিংবা কী হতে চলেছে। শুধু এটা বুঝতে পারছি , এই মারাত্মক টানাপোড়েনে আখেরে ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষা ব্যাপারটির।
এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
একমাত্র এবং সঠিক উপায় ছিল, যোগ্য ও বৈধ শিক্ষকরা যদি তাঁদের চাকরি না হারাতেন। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে, ২০১৬ সালে নিযুক্ত প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষকের মধ্যে অবৈধ ও অযোগ্য শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। তাঁদের চিহ্নিত করে, সুপ্রিম কোর্টের কাছে যদি রায় পুনর্বিবেচনার করার অনুরোধ করা যায়, তা হলে কিছু হলেও হতে পারে। হয়তো বৃহত্তর ছাত্রসমাজের দিকে তাকিয়ে সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় কিছুটা নরম হতেও পারেন। কেননা ভর্তির হার কমলেও, এই রাজ্যের অধিকাংশ ছাত্র এখনও সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। আশা করা যায়, সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় সেই বিপুল পরিমাণ পড়ুয়াদের বিপদের মুখে ঠেলে দেবেন না। যতদূর শোনা যাচ্ছে, রাজ্যের তরফ থেকে সম্ভবত তা করা হয়েছে। যদিও প্রশ্ন উঠছে, এই ব্যাপারটি আগে করলে এত কিছুই ঘটত না।
আপাতত সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। তার চাইতে বেশি জরুরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচানো। যদি রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনে সাড়া দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যোগ্য ও বৈধ শিক্ষকদের পুনর্বহালের আদেশ দেন, তবে খাদে পড়ে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে কিছুটা হলেও টেনে তোলা যাবে। কিন্তু যদি সেটি না হয় তবে?
ইতিমধ্যেই বেশ কিছু স্কুল শিক্ষক-শূন্য হয়ে গেছে। কোথাও বিডিও-কে ক্লাস করতে দেখা যাচ্ছে, কোথাও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা পরীক্ষা নিচ্ছেন। কিছু স্কুল সেকশনের সংখ্যা কমিয়েছে। বিশেষ করে শহরের স্কুলগুলিতে, যেখানে ছাত্র সংখ্যা এমনিতেই কম, সেখানে এমন করা যেতেই পারে। বিষয় শিক্ষকদের শুধুমাত্র নিজেদের বিষয়ের মধ্যে আটকে না রেখে, তাঁরা অন্য যে বিষয়ে পারদর্শী, সেই ক্লাস দেওয়া যেতে পারে।
সাধারণত প্রত্যেক শিক্ষকের সপ্তাহে গড়ে পঁচিশ থেকে তিরিশটি ক্লাস থাকে। যদি সেকশন কমানো যায়, তবে তাঁদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়েও, বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাস করানো সম্ভব। আমি নিশ্চিন্ত, সারা রাজ্যে আমার এমন কোনও সহকর্মী নেই, যিনি আপত্তি করবেন। কারণ পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও গভীর উদ্বেগের। এই সময় যদি আমরা নিজেরা এগিয়ে না আসি, তবে আখেরে কিন্তু ক্ষতি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের। সমাজের মেরুদণ্ড হয়ে আমরা সেটা করতে দিতে পারি না।
অতীতে আমরা স্কুল ক্লাস্টার নিয়ে নানা আলোচনা শুনেছি। এই সময় সেই ব্যাপারটিও ভাবা যেতে পারে। এতে 'পিয়ার লার্নিং'-এর সুযোগ যেমন থাকবে, তেমনি বিভিন্ন স্কুলের বিভিন্ন শিক্ষকদের সংস্পর্শে এসে পড়ুয়াদের সর্বাঙ্গীন উন্নতিও হবে। কিন্তু এই ক্লাস্টার করবার সুযোগে স্কুল বন্ধ করা চলবে না। এর আগে বেশ কিছু স্কুলের অপমৃত্যু দেখেছি। ফলে, দৃষ্টি রাখতে হবে সেদিকেও। আর একটি বিষয় নিতান্তই প্রশাসনিক। একমাত্র উচ্চতর কর্তৃপক্ষ সেই ব্যাপারটি করতে পারেন। কয়েক দিন আগে সরকারি বদলির সুযোগ নিয়ে বহু শিক্ষক নিজেদের পছন্দের মতো স্কুলে চলে এসেছেন। ফলে বহু স্কুল, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছিল। এই পরিস্থিতিতে সে সবের কার্যত নাভিশ্বাস উঠেছে। একবার সে দিকেও সকলের নজর দেওয়া দরকার।
শিক্ষার অন্তর্জলী যাত্রা ঠেকাতে এই মুহূর্তে একমাত্র শিক্ষকরাই ভরসা। আমাদের পড়ুয়াদের স্বার্থে, যোগ্য প্রার্থীদের চাকরি ফেরতের পাশাপাশি, আমরা এই ব্যাপারগুলো আমরা কি একবার ভাবতে পারি?
(লেখক শিক্ষক)
(প্রকাশিত: আনন্দবাজার পত্রিকা , উত্তরবঙ্গ সংস্করণ, এপ্রিল ১৬, ২০২৫)

No comments:
Post a Comment