Thursday, March 30, 2023

 ।। নিজের ভাবনায়।।

      শৌভিক রায় 


আজকাল অনুভূতির কেমন যেন পরিবর্তন হচ্ছে।

 এরকম হয় কি বয়স বাড়লে?


কিছুদিন আগে নিজেকে সারমেয় মনে হচ্ছিল। 

তারপর হঠাৎ করেই বৃন্দাবনের রাখাল রাজা মনে হতে লাগল।

এখন আবার চম্বলের ডাকাত মনে হচ্ছে।


এই যে মনে হওয়া এটা কি কোনও রোগলক্ষণ নাকি ভীমরতি ঠিক বুঝতে পারছি না....



Wednesday, March 29, 2023

 ।।নিজের ভাবনায়।।

      শৌভিক রায় 


কিছু সংখ্যক ছাত্রকে তাদের অভিভাবকরা স্কুলে যেমন পড়তে পাঠান, মিড ডে মিল খেতে নয় তেমনি বহু অভিভাবককেও জানি যারা মিড ডে মিলের জন্য সন্তানকে স্কুলে পাঠান। 


আবার কোনও কোনও স্কুলে মিড ডে মিলের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য যেমন শিক্ষকরা মুখিয়ে থাকে, তেমনি বহু স্কুল আছে যেখানে শিক্ষকরা এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান। অনেক সময় নিজেদের পয়সাও খরচ করেন মিড ডে মিলের জন্য।


মুদ্রার দুটো পিঠ রয়েছে। একটি দেখলে অন্যটিও দেখতে হয়। সেটা না হলে, পক্ষপাতিত্ব ও ইয়েলো জার্নালিজমের দোষে দুষ্ট হতে হয়।


শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। সেটা অন্যায় নয়। তবে সব শিক্ষক এক হবেন এটা ভাবা অতি সরলীকরণ ও পক্ষপাতপূর্ণ। 


ত্রুটি খুঁজুন। খোঁজা উচিত। কিন্তু সঙ্গে সামাজিক অবস্থার গভীরেও ঢুকুন। তা না হলে কাগুজে বাঘ মগুজে হবে না।




Sunday, March 26, 2023


 

১৯৮২ সাল। ক্লাস এইট। জড়িয়ে পড়লাম 'মুজনাই'-এর সঙ্গে। তখন অবশ্য সম্পাদক নই। 
বেশ কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশের হঠাৎ `মুজনাই` শুকিয়ে গেল।
অনলাইন ব্লগ ও সমাজ মাধ্যমের হাত ধরে আবার ফিরল মুজনাই। শুরু হল মুদ্রিত সংখ্যাও। 

`মুজনাই`-এর মতো নিজের লেখালেখিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন কারণে। 
আবারও যখন শুরু করলাম অনলাইন ব্লগ আর সমাজ মাধ্যমের হাত ধরে, গায়ে সেঁটে গেল `ফেসবুক লেখক`-এর তকমা।
 
যদিও মাধ্যম আমার কাছে বড় মনে হয়নি কোনোদিন। 
গুরুত্ব পেয়েছে কী লিখলাম সেটাই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ আজ লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সদ্য প্রয়াত শ্রদ্ধেয় সন্দীপ দত্তকে স্মরণে রেখে 
`রংদার রোববার`-এর পাতা সাজিয়েছে। জায়গা পেয়েছে আমারও একটি লেখা। 

নিজের বা `মুজনাই`-এর কথা বলিনি। বলি না অবশ্য কখনই। 
আগামীতে কী হতে পারে লিটল ম্যাগাজিনের গতিপ্রকৃতি সেটা নিয়ে কিছু কথা বলেছি। অবশ্যই সে কথা আমার নিজের।
 
ধন্যবাদ উত্তরবঙ্গ সংবাদ ও কার্যকরী সম্পাদককে। 
প্রথম সারির একটি বাণিজ্যিক পত্রিকায় লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে এত লেখা সচারাচর স্থান পায় না। 
সেদিক থেকে আজকের উত্তরবঙ্গ সংবাদের রংদার রোববার একেবারেই আলাদা। 


সাহিত্যচর্চায় শহরমুখিনতার মিথ ভেঙে চুরমার 
শৌভিক রায়  

সমাজ মাধ্যমের এই রমরমার যুগে লিটল ম্যাগাজিনের অস্তিত্ব কি বিপন্ন? যেখানে এক ক্লিকে পৌঁছে যাওয়া যায় সিডনি থেকে সিয়াটল, সেখানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পত্রিকা করতে যাওয়া কেন!
 
ভাবনাটি প্রাসঙ্গিক। কেননা কেউ কেউ মনে করছেন সমাজ মাধ্যমই আজকে সবচেয়ে বড় লিটল ম্যাগাজিন। এখানে যত সংখ্যক লেখক-কবির লেখা একসঙ্গে পাওয়া যায়, মুদ্রিত আকারে কোনও লিটল ম্যাগাজিন তার ধারে-কাছেও পৌঁছতে পারে না। কিছুদিন আগেও সমাজ মাধ্যমে যাঁরা লিখতেন, তাঁদের গায়ে একটি বিশেষ তকমা সেঁটে দেওয়া হত। আজ সেটা করতে গেলে দু`বার ভাবতে হবে। কেননা সমাজ মাধ্যমে এখন লিখছেন প্রত্যেকেই। 

নিজেদের পত্রিকার স্বার্থে পিছিয়ে নেই এইসব পত্রিকার সম্পাদক বা প্রকাশকেরাও। তাঁরাও সমাজ মাধ্যমে নিজেদের পত্রিকার বিপণনে ব্যস্ত। মজা হল, এই বিপণনে কিন্তু শুধু লিটল ম্যাগাজিনকেই দেখা যায় না। বাণিজ্যিক পত্রিকারাও একই পথের পথিক। সমাজ মাধ্যমের ভরপুর সুবিধা নিচ্ছেন তারা। তৈরি করে ফেলছেন নিজস্ব অ্যাপ। `আসলে ব্যাপারটা কোথায় লিখলাম সেটা বড় নয়। কী লিখলাম সেটাই শেষ কথা। লিটল ম্যাগাজিনের বক্তব্য যদি সমাজ মাধ্যমের হাত ধরে আরও প্রসারিত হয় বা সমাজ মাধ্যমটিই যদি লিটল ম্যাগাজিন হয়ে যায়, তবে অসুবিধে কোথায়?` স্পষ্ট বলছেন এই প্রজন্মের কবি উদয় সাহা। 

বাস্তব হল, কোচবিহার জেলায় তথ্য প্রযুক্তির এই বিস্ফোরণের যুগেও অনলাইন ম্যাগাজিনের পাশাপাশি মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বিগত এক দশকে এই বৃদ্ধির হার দেড়গুণ বেশি। আগে কোচবিহার জেলায় যে কোনও জনপদ থেকে হাতে গোনা কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হত। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে লেখক-কবির সংখ্যাও। প্রান্তিক জনপদগুলিতেও এখন লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশ অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। অনেক লেখক-কবি উঠে আসছেন এইসব ছোট ছোট জায়গা থেকে। সাহিত্যচর্চায় শহরমুখিনতার মিথ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। একচ্ছত্র আধিপত্য করতেও দেখা যাচ্ছে না আর কাউকে। সৃষ্টি হচ্ছে না তথাকথিত কোনও `লিটেরারি লিজেন্ড`। 

এটাই স্বাভাবিক। তথ্য-প্রযুক্তি যত সাধারণের নাগালে আসবে, তত কমবে একাধিপত্য। লিটল ম্যাগাজিনের জগতেও ঠিক তেমনটাই হয়েছে। ফলে সমাজ মাধ্যম থাকলেও, লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশে অনীহা নেই কারও। বরং সেই প্রকাশে অনেকে যেন স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছেন! 'সংখ্যাটা তাৎপর্যপূর্ণ নয়। প্রয়োজন হল লেখার মান। পত্রিকা তো যে কেউ করতে পারে!` গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছেন বর্ষীয়ান সম্পাদক শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র দেব। বিষয়টি অবশ্যই ভেবে দেখবার। লেখার মান যদি ভাল না হয়, তবে যে উদ্দেশ্যে লিটল ম্যাগাজিন করা তার কোনও অর্থ থাকে না।  

বুদ্ধদেব বসু একবার বলেছিলেন, `.... এক রকমের পত্রিকা আছে যা স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাথে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার আমাদের হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেয়ে দেখে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিনগন্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি, জল, পোকা আর অপহারকদের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্যে। যেসব পত্রিকা এই শ্রেণীর অন্তর্গত হতে চায়, কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাঁদের উঁচুর দিকে, তাঁদের জন্যে নতুন একটা নাম বেরিয়েছিল মার্কিন দেশে, চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটল ম্যাগাজিন।` সত্যি বলতে, বর্তমানের খুব কম সংখ্যক পত্রিকা এই জায়গায় পৌঁছতে পারছে। তারা শুধু নামেই লিটল ম্যাগাজিন। তাদের থাকা বা না থাকায় কিছুই যায় আসে না। বরং এই জাতীয় পত্রিকা সামগ্রিকভাবে লিটল ম্যাগাজিন বিষয়টির ক্ষতি করে। কেননা লিটিল ম্যাগাজিনের অন্যতম উদ্দেশ্য হল, উপযুক্ত লেখা প্রকাশের পাশাপাশি মননশীল পাঠক তৈরি করা। সাহিত্যচর্চাকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়া। সেটা করতে গিয়ে কোনও আপোষের পথে হাঁটে না লিটল ম্যাগাজিন।  

সম্পাদকের বাড়ির ঠিকানায় লেখা খামে ভরে পাঠানো, সেই লেখা প্রেসে যাওয়া, প্রেসের খুপরি খুপরি অক্ষর রাখার খোপ থেকে একটি একটি করে নিয়ে শব্দ সাজানো, ব্লক করা, একটা একটা করে কাগজে ছাপা, বাঁধাই...সেসব দিন কবেই চলে গেছে। এই যুগে `ডিজিটাল গ্যাপ` থাকলেও, ঝকঝকে মুদ্রণ, দামি কাগজ নিয়ে লিটল ম্যাগাজিন অনেকটা এগিয়ে গেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ব্লগ, সমাজ মাধ্যম ইত্যাদি। কিন্তু নিজের নাম মুদ্রিত আকারে দেখা যে কোনও লেখকের স্বপ্ন। অন্যদিকে অনলাইনে অভ্যস্ত মানুষের সংখ্যা এখনও নগণ্য। প্রবীণেরা এখনও সাবলীল নন অনলাইনে। তাঁরা অনলাইনে পড়ার আনন্দ পান না। সেদিক থেকে দেখতে গেলে মুদ্রিত আকারে লিটল ম্যাগাজিনেই আবেদন এখনও অনেক বেশি। তবে সেটা কতদিন তা নিয়ে কিন্তু সন্দিহান অনেকেই। বিশেষ করে মহামারীর পরে বহু মানুষ জীবিকা হারিয়েছেন। অনেকের নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর দশা হয়েছে। তাদের কাছে পয়সা খরচ করে লিটল ম্যাগাজিন কেনা বিলাসিতা মাত্র।  

এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই লিটল ম্যাগাজিন নিজের মতো এগিয়ে চলছে। তার গতি দেখে মনে হয় না, লিটল ম্যাগাজিনের অস্তিত্ব বিপন্ন। আসলে লিটল ম্যাগাজিনের জগৎটি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে সৃষ্টি চলে অন্তর্গত এক তাগিদ থেকে। লিটল ম্যাগাজিনের লেখক কোনও নির্দেশ বা আদেশের দাসত্ব করেন। প্রচারের আলো পড়বে না জেনেও বছরের পর বছর কঠোর শ্রমে অক্ষরশ্রমিকেরা এখানে নিজেদের কানাকড়িটুকুও অনায়াসে বিলিয়ে দেন। লিটল ম্যাগাজিনের আনন্দ স্ক্রলে নয়, বরং জীবনের পাতা ওল্টানোতে। লিটল ম্যাগাজিনের আর্কাইভে তাই যা মেলে তা একান্তই সাধারণ মানুষের কথা। আসলে সাধারণ মানুষই তো ইতিহাস সৃষ্টি করে। তাই লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা অবিসংবাদিত। 

আগামীতে লিটল ম্যাগাজিন হয়ত অন্য মাধ্যম ধরবে। তার একটা হালকা রূপরেখা বোধহয় দেখা যাচ্ছে। সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু মাধ্যম সব কথা নয়। শেষ কথা হল লিটল ম্যাগাজিনের বিষয় ও তার পাঠক। সামাজিক অবক্ষয়ের যে গড্ডালিকা প্রবাহে আমরা এখন চলছি, তা যেন শুধুই দিনগত পাপক্ষয়। এখানেই লিটল ম্যাগাজিনের সবচেয়ে বড় ভূমিকা। সেই ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলে, লিটল ম্যাগাজিনের অস্তিত্ব অবশ্যই বিপন্ন হবে একথা জোর দিয়ে বলতে পারি।  


 


বহুদিন পর 'প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা'র সাম্প্রতিকতম সংখ্যায় প্রকাশিত একটি লেখা। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও সম্পাদক শ্রী কৃষ্ণ দেব-কে প্রণাম ও ধন্যবাদ....

নদীর চেহারা বলে দিচ্ছে ভাল নেই সে
শৌভিক রায়


শীত শেষে তোর্ষা এখন ক্ষীণকায়া। প্রবাহ সরে গেছে অনেকটা দূরে। ক্রমশ বাড়ছে বালির আস্তরণ।

কিছুদিন আগেও বিপুল জলরাশি নদীর শরীরকে ঢেকে রেখেছিল। এখন জল সরতেই তার চেহারা দেখে আঁতকে উঠতে হচ্ছে! শুকিয়ে যাওয়া নদী খাতে দেখা যাচ্ছে ইতস্তত পড়ে থাকা বিপুল নোংরা আবর্জনা। কী নেই তাতে! সভ্যতার সব বর্জ্যই বোধহয় ফেলা হয়েছে নদীর বুকে।

অবশ্য শুধুমাত্র তোর্ষারই এই চেহারা নয়। আত্রেয়ী থেকে সংকোষ পর্যন্ত উত্তরের সব নদীর অবস্থা কমবেশি এক। নোংরা আবর্জনায় ক্রমশ ভরে উঠছে বিভিন্ন নদীর প্রবাহ। বর্ষায় বা অন্য সময় জলের প্রবল স্রোতে সেই আবর্জনা দেখা না গেলেও, বসন্তে জল কমতেই প্রকাশ্যে আসছে সেসব। আর তাতেই ধরা পড়ছে নদী বুকের এই দগদগে ঘা।

নদী নিয়ে আমাদের ভাবনা চিরদিনই কম। তাই অতীতে তো বটেই, আজও নদীকে নোংরা-আবর্জনা ফেলবার জন্য ব্যবহার করে চলেছি আমরা। বিভিন্ন জনপদের নর্দমাও এসে মিশছে নদীর সঙ্গে। ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। আবর্জনা জমে দূষণ যেমন বাড়ছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে বহু প্রবাহ। ফালাকাটার সাপটানা যেমন। একসময় এই প্রবাহটি চারদিকে থেকে ফালাকাটাকে ঘিরে রাখত। কিন্তু বর্জ্য জমে জমে সে আজ প্রায় অদৃশ্য। একই কারণে ধূপগুড়ির কুমলাইকেও যেন খুঁজে পাওয়া যায় না।

শরীরে আবর্জনা নিয়ে জলপাইগুড়ির করলা বা শিলিগুড়ির মহানন্দা মৃতপ্রায়। ভাল নেই শিলিগুড়ির উপকণ্ঠের করতোয়া বা রায়গঞ্জের নাগর। মেখলিগঞ্জের সানিয়াজান, মালবাজারের মাল ও নেওড়ার অবস্থাও খারাপ। বালুরঘাটের আত্রেয়ীও প্রায় শেষ হতে বসেছিল কিছুদিন আগে। পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের সীমা নির্ধারণকারী সংকোষের মধ্যপ্রবাহকে দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না, পাহাড়ি এই নদীটি কতটা বেগবতী! আলিপুরদুয়ারের কালজানি, ময়নাগুড়ির জর্দার দশাও তথৈবচ। যে যত জনপদের পাশ ঘেঁষে গেছে, তার সমস্যা তত বেড়েছে। সভ্যতার অভিশাপ কুড়িয়েছে সে! তবু নিজেকে ক্লেদাক্ত করে বাঁচিয়ে চলেছে জনজীবন।

ইদানিং নদী থেকে বালি ও পাথর তোলায় বিভিন্ন বিধি-নিষেধ জারি হওয়ায় নদীখাতের নাব্যতা যেমন কমছে, তেমনি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরাও বিপদে পড়েছেন। তবু পরিবেশের স্বার্থে যদি এই বিষয়টিকে সরিয়ে রাখি, তাহলেও সমস্যা কম নয়। নাব্যতাহীন নদী বর্ষাকালে কী কাণ্ড ঘটাতে পারে তা আমরা কমবেশি সকলেই জানি। জয়ন্তী নদী এর জলজ্যান্ত উদাহরণ। তার দোসর হিসেবে ডিমা, রায়ডাক, ডায়ানা প্রভৃতি নদীর কথা বলা যেতে পারে।

খুব খারাপ অবস্থা উত্তরের ঝোরাগুলিরও। আবর্জনা ফেলে ফেলে আমরা ইতিমধ্যেই অনেক ঝোরাকে বুজিয়ে ফেলেছি। কিছু কিছু জনপদে তো তাদের অপমৃত্যু ঘটিয়ে, গড়ে তোলা হয়েছে কংক্রিটের জঙ্গল। ভুলে গেছি এদের জলে পুষ্ট হয় উত্তরের অনেক নদীরা। ফলে সুখা মরশুমে নদী যেমন সেচের কাজে আসছে না, তেমনি বর্ষায় জল উপচে ক্ষয়ক্ষতিও অত্যন্ত সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, উত্তরের নদীগুলির স্বাস্থ্য আদৌ ভাল নেই। অচিরে সচেতন না হলে, ক্রমশ বিপদ বাড়বে। আসলে নদী ভাল না থাকলে সভ্যতাও যে ভাল থাকে না, সেটাই বোধহয় মনে রাখছি না আমরা!

Tuesday, March 21, 2023

 বাবা আর কবিতা

শৌভিক রায় 


নিজে কবিতা ছিলেন ব'লে

বাবাকে রহস্যময় মনে হত...


বাবার মতো মানুষেরা

রহস্যে ঘেরা হন


তাদের নিজস্ব উপন্যাস থাকে,

থাকে বেশ কিছু ছোটগল্প,


তবু কবিতা হয়ে বাবা

দেখিয়ে দেন ছন্দ আর যতিচিহ্ন যত!

বুঝিয়ে দেন সব দেওয়া নেওয়া শেষে

থেকে যায় অসামান্য উপত্যকা সব....


(অসামান্য উপত্যকা দিয়ে বাবার চলে গিয়েছিলেন আজ এই বিশ্ব কবিতা দিবসে....)

Friday, March 17, 2023

`যদি মরে যাই, ফুল হয়ে যেন ঝরে যাই.....`? 

শৌভিক রায় 


উত্তরে এখন প্রথম ছবির ফুলটি রং ছড়াচ্ছে।

ইতিমধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মে কোথাও যথাও ঝরেও যাচ্ছে সেই ফুল।
অত্যন্ত সুদৃশ্য এই ফুলের স্থানীয় নাম ওদলা/ ওদাল। বলা হয় ওদলাবাড়ি স্থানটির নাম এই ফুল থেকেই এসেছে। 
গাছ বা ফুলের নাম থেকে বিভিন্ন জনপদের নাম অবশ্য নতুন কিছু নয়। যেমন, জলপাইগুড়ি, ময়নাগুড়ি, শিশুবাড়ি, পলাশবাড়ি ইত্যাদি।
 
গ্রীষ্ম এগিয়ে আসবার সঙ্গে সঙ্গে বহু জায়গায় দেখা যাবে রাস্তার পাশে ওদলা বা ওদাল ফুল শুকোতে দেওয়া হয়েছে। 
শুকিয়ে যাওয়া এই ফুল মণ্ডপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাজানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। 
হয়ত এই ফুলেরও রয়েছে কোনও ভেষজ গুণ।  সেটি অবশ্য আমার জানা নেই।

তবে ভাবতে ভাল লাগে, অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ফুলটি শুকিয়ে গিয়েও কত কাজে আসে!
এই জন্যই কি কবি বলেছিলেন, `যদি মরে যাই, ফুল হয়ে যেন ঝরে যাই.....`? 
















          

Tuesday, March 14, 2023

 মাটির সেই ফুটো পাত্রটা

শৌভিক রায় 


ফাল্গুন চৈত্র এলেই দিদার কথা মনে পড়ে। 


আর দিদার কথা মনে হলেই চোখে ভাসে তুলসি বেদি। তুলসি গাছের ওপর ঝুলছে মাটির ছোট্ট ফুটো পাত্র। স্নান সেরে দিদা সেই পাত্রে জল ঢালছে। বহুক্ষণ ধরে জল টপটপ করে তুলসি গাছে জল ঝরে পড়ছে। 


টানের দিন এলে তাই দিদা ফ্ল্যাশব্যাকে বারবার। এই টান অবশ্য শুধু চৈত-ফাগুনের টান নয়। এর মধ্যে রয়েছে আরও কিছু গুহ্য কথা! সেসব বোঝে সাধুচরণ। বোঝে আর আর ফক ফক হাসে!


আমাদের তখন একটা অদ্ভুত ঘর ছিল। বিরাট বিরাট ডুলি সেই ঘরের প্রায় পুরোটা দখল করে নিলেও, হাতুড়ি, বাটাল, শাবল, দড়ি, খন্তা, দা, সাইকেলের ভাঙা স্পোক, ফাটা টায়ার, পুরোনো শাড়ি ইত্যাদি হরেক কিসিমের জিনিস নিয়ে সে ঘর ছিল প্রবল হাতছানির। লুকোচুরি খেলায় সেই ঘরে বড় বড় ডুলির পেছনে কতবার যে লুকিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই!


বিয়ের পরে পরে মা'কে দিদা একবার বলেছিল, 

- পাকঘরের পিছনের ওই ঘর থেইক্যা দাওহান লইয়া আসো তো রীতা।


নতুন বউ। শাশুড়ির আদেশ মানলেও 'দাওহান'-এর অর্থ রাঢ় বঙ্গের মেয়ের বোঝা হয়নি বলে, মা সেই ঘরে ঢুকে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। 

খানিক বাদেই দিদার আগমন। নিজেই বুঝে নিয়েছিল আদরের দিদিমণি বউমা তার ভাষা বোঝেনি। দা আর খান কে যোগ করে 'দাওহান' অবশ্য অতি সাধারণ বুলি ছিল সেদিনের উদ্বাস্তু বাড়িতে!


দিদার গুরুদেব আসবার তালে থাকতাম। গুরুদেব এলেই দলা প্রসাদ। ওহো কী তার স্বাদ! আতপ চাল, ন্যাতনেতে আলু ভাজা, ডাল, ঘি, সবজি ইত্যাদি সব মিলে সেই দলাকে মনে হত অমৃত! কী নাম ছিল গুরুদেবের? জানি না। জানার চেষ্টাও করিনি। দিদার ঠাকুরঘরে গুরুদেবের ছবি ঝুলত। কোথায় গেল সেই ছবি? জানা নেই তাও... মানুষটার মুখটা অবশ্য মনে আছে আজও। কিন্তু আর কিচ্ছু জানি না। এমনটাও হয়? হয় বোধহয়। ওই যে... সাধুচরণ আবার ফক ফক হাসছে....


তুলসি বেদি আছে। গাছও। রীনা জল দেয়। পুজো করে। সন্ধ্যায় আমি প্রদীপ দেখাই। 


টানের দিন। মাটির পাত্রটা খুঁজি। টপটপ করে জল ঝরে যেটা থেকে। পাই না। 


দিদার জিনিস মা বোধহয় যত্ন করে রেখেছিল। ওটা কোথায় কাকে জিজ্ঞেস করব বুঝে পাই না।


 সাধুচরণকে বার কয়েক বলেছি। হাসি বন্ধ করে চোখ মুছেছে শুধু.....


(* একটি লেখার অংশ)


sauvikr.blogspot.com

Sunday, March 12, 2023

একটি বিকল্প সংলাপ 
শৌভিক রায় 

শরীর পচন ধরলে তা ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।  সমাজের পচন ছড়ায় ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত। তার জন্য যেমন আলাদা করে কাউকে দায়ী করা যায় না, তেমনি সেটি উচিতও না। সেটা করা মানে ভাবের ঘরে চুরি করা। 

ভাবের ঘরের চোরদের সংখ্যাটা আজকাল ক্রমবর্ধমান। তারা নিজেদের আখের গোছান নিঃশব্দে। কিন্তু ভাবটা দেখান যেন দেশোদ্ধার করছেন। আর সেটা করতে গিয়ে তাদের ভাষায় ধমকানি, চমকানি কিছুই বাদ দেন না। আর কাদেরকেই বা ধমকান বা চমকান? সবচেয়ে সফট টার্গেটদের।

ধবধবে সাদা ধুতি পাঞ্জাবিতে কোনোদিন দাগ দেখিনি। প্লিট দেওয়া শাড়িটিও কোনোদিন দুমড়ে মুচড়ে যায়নি। বরং উল্টো দিকে থাকা কিছু গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল মাথা নিচু করে পলায়ন করেছিল একদিন। ঋজু শরীর ঝুঁকে যায়নি কখনও। ঝুলে ঝুলে এই ডালে সেই ডালে দোল খেতেও দেখিনি। 

ইচ্ছে করলেই হারামের জুতোয় পা গলাতে পারতাম। মানায় না বলে সেটা গলাইনি। গলাবোও না। এটাই শিখেছি। এটাই শেখাই। শেখাবোও আগামীতে। 

একজনের জন্য সবাইকে দাগালে বিচারবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন জাগে। যেমন সমাজ, তার প্রোডাক্টও তেমন। সমাজের মাথায় বসে হ্যাটা করলে, সেটা নিচ থেকেই দ্বিগুণ হয়ে উঠে আসবে। নিম্ন চাপ যেমন ভয়ের, উচ্চ চাপও ঠিক তেমনই!

দোষ নিশ্চয়ই রয়েছে। ধোয়া তুলসী পাতা কেউ নয়। কিন্তু কোথায় সেটা নেই? যদি সেটা থাকে, তবে সোনার পাথরবাটিও আছে। 

কিন্তু তবুও ঠগ বাছা উচিত। পাশাপাশি এটাও মাথায় রাখা উচিত, এক ঠগের জন্য গোটা গ্রামকে দাগিয়ে দেওয়া কাজের কথা নয়। সেই নয়টি হয় হয়ে গেলে দেখা যায় নয়ের জয়। নয় একে ৯। অর্থাৎ নয় যোগ শূন্য= নয়। নয় দুগুণে ১৮। এক যোগ আট= নয়। তিন নয় ২৭। দুই যোগ সাত= নয়। করে যান এভাবে। শেষে নয় নয় ৮১। অর্থাৎ এক যোগ আট= নয়। 

তাই সাবধান। সংখ্যার হিসেবে হোলি না খেলাই ভাল। নয়ের হিসেবে মাথায় রাখাই বুদ্ধিমানের। নয় হতে বেশিক্ষণ লাগে না। 

সবশেষে ভাল থাকবেন বন্ধুগণ। 

কবির মতো বলি, ``শিখার এই রুমাল নাড়া নিভে গেলে ছাই ঘেটে দেখে নেবেন পাপ ছিল কিনা`` 

আমি ঘাটতে পারব। আপনি পারবেন কি?? 

সেই গাটস কি আছে আপনার???????

 

 

Wednesday, March 8, 2023

যে ছবি চোখে ভাসে

শৌভিক রায় 


সেই সময় উত্তরে আমাদের ছোট্ট জনপদে সেভাবে ভাল কিছু পাওয়া যেত না। বিশেষ কিছু কিনতে হলে ভরসা করতে হত কোচবিহার বা জলপাইগুড়ির ওপর। সেখানে না হলে হাতে থাকত শিলিগুড়ি। আর এসবের শেষে সব-পাওয়ার কলকাতা ছিল শেষ ভরসা।


বাবা কলকাতায় যেতেন খুব ঘন ঘন। বেশিটাই স্কুলের কাজে। তবে স্কুলের কাজের বাইরেও বাবার কলকাতা যাওয়ার কমতি ছিল না। কলকাতার জন্য অসম্ভব টান ছিল বাবার। তাই বাবার যাতায়াত লেগেই থাকত। 


তখন তিস্তা তোর্ষা এক্সপ্রেস বা উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ছিল না। গৌহাটি থেকে আসা কামরূপ এক্সপ্রেস ছিল একমাত্র সম্বল। কিছুদিন অবশ্য কয়লার ইঞ্জিন টানা জনতা এক্সপ্রেস চলেছিল। সেই ট্রেনে চাপলে সঠিক সময়ে পৌঁছবার চিন্তা কেউ করত না। Abnormal Late ছিল জনতা এক্সপ্রেসের Normal ব্যাপার। এছাড়াও ওই ট্রেনে বাবার ধপধপে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি বাতাসে ভেসে আসা কয়লার গুঁড়োয় কালচে হয়ে যেত। মা বকবক করতে করতে সেই ধুতি পাঞ্জাবি কাচতে বসতেন।


মায়ের সেই বুকনি যে কপট ছিল, সেটা বুঝি এখন। আসলে ওদের ভালবাসার প্রকাশটা ছিল এরকম। মা নিজেই চাইতেন না বাবার সাদা পোশাকে বিন্দুমাত্র দাগ লাগুক।


বাবার প্রকাশ কীরকম ছিল? আসলে, এটা বলবার জন্যই কলকাতা প্রসঙ্গ টেনে আনা।


বহুবার দেখেছি সাদা কাগজে মায়ের পা রাখা। বাবা উবু হয়ে বসে কলম দিয়ে সেই পায়ের চারদিকে দাগ টানছেন। ওটা ছিল পায়ের মাপ নেওয়া। মায়ের জন্য চটি আনতে হবে। কলকাতা থেকে। আমার কালো মায়ের মিষ্টি মুখ সেই সময়ে যে অপার্থিব সুখে কেঁপে কেঁপে উঠত তার তুল্য কিছু তো পেলাম না আর আজও! 


কেন জানি না, নারী দিবস এলেই সেই ছবিটি চোখে ভাসে.....


(একটি লেখার অংশ)



Monday, March 6, 2023


 

শুভ দিনের আশায় শুভ উৎসব
শৌভিক রায়  
 
জিশুর জন্মের আগে থেকেই হোলির চল আর্যাবর্তে। অতীতে বিবাহিতা মহিলাদের মধ্যেই ছিল হোলির প্রচলন। সংসারের শ্রীবৃদ্ধিতে তারা পুজো করতেন ‘রাকা’(পূর্ণচন্দ্র)-কে। জৈমিনীর ‘পূর্বমিমাংস-সূত্র' ঘাটলে দেখা যায়, আর্যাবর্তের উত্তরভাগেই ছিল হোলির ব্যাপক প্রচলন। কালক্রমে হোলি প্রতিটি মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। 

অতীতে চান্দ্রমাসের হিসেব করা হ'ত দু'ভাবে। একটিতে অমাবস্যার পর থেকে আর একটিতে পূর্ণিমার পর থেকে। এই দুই মতের একটিতে, ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা বছরের শেষ দিন বলে ধাৰ্য হ'ত। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে আড়ম্বড়ের আয়োজনও হ'ত। তাই হোলির উৎসবে লেগে থাকতো আনন্দের ছোঁওয়া, প্রাণের ছোঁওয়া। হবেই বা না কেন? নতুনের আহ্বান যে!

বাংলা- উড়িষ্যায় হোলি কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মদিন হিসেবেও পালিত হয়। তবে হোলি শব্দটির প্রচলন ‘হোলিকা’ থেকে। 

কে না জানে হোলিকার কথা! হিরণ্যকশিপুর এই প্রিয় বোনটি ভাইপো প্রহ্লাদকে নিয়ে বসেছিলেন আগুনে। উদ্দেশ্য সহজেই অনুমেয়। দৈত্যকুলে ভক্ত প্রহ্লাদ! তাও হয় নাকি! হিরণ্যকশিপুর আদেশে অগ্নিসিদ্ধা হোলিকা তাই চেয়েছিলেন প্রহ্লাদকে আগুনে পুড়িয়ে মারবেন। কিন্তু দেবতারা তো চিরদিনই সবাইকে ঠকিয়েছেন। তাই বর পেয়েও কাজে লাগাতে পারলেন না হোলিকা। আগুনে নিজেই ছাই হয়ে গেলেন। বেঁচে গেলেন প্রহ্লাদ। 

কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করলো শুভর বিজয়, অশুভর বিরুদ্ধে। ‘অসৃকপাভয় সত্রস্তৈঃ কৃতা ত্বং হোলি বালিশৈঃ অতস্তাং পূজয়িষ্যামি ভূতে ভূতিপ্রদা ভবঃ।।’ আজ হোলি উৎসবের আগে এই যে হোলিকা দহন (কোথাও কোথাও ন্যাড়াপোড়া) সেই হোলিকা দহনকেই স্মরণ ক'রে...

অবশ্য বিজ্ঞান বলছে, এই দহন আসলে দীর্ঘ শীত শেষে ঘরের যাবতীয় নোংরা-আবর্জনা পরিষ্কারের একটি উপায়। তবে, এই পরিষ্কারের মধ্যেও শুভর প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। যা কিছু অশুভ দহন হ’ক তার। বেঁচে থাকুক শুভ।

পরবর্তীতে হোলি তার শ্রেষ্ঠ রূপ নেয় ব্রজধামে। রাধা-কৃষ্ণের হোলি উৎসব সে যুগে যা ছিল আজ বোধহয় তার চেয়ে কয়েক লক্ষ গুণে ধারে ও ভারে বেশী। অবস্থা আজ এমনি দাঁড়িয়েছে যে হোলির সময় ব্রজধামের হোলি দেখা সৌভাগ্যের ব্যাপার। সপ্তাহধীক চলতে থাকা হোলির উৎসবে বারসানা- নন্দগ্রামের লাথ মার হোলি, দেওজীর হোলি, মথুরার হোলিকা দহন, বৃন্দাবনের হোলি দেখতে আন্তর্জাতিক মিডিয়া থেকে শুরু ক'রে কে উপস্থিত নয়!

রঙের উৎসবে প্রতিটি রঙের আলাদা আলাদা ব্যাখ্যাও দেওয়া যায়। হোলিতে ব্যবহৃত প্রতিটি রঙের আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। হোলিতে ব্যবহৃত লাল রঙ তুলে ধরে পবিত্রতাকে। পাশ্চাত্যে লাল রঙ প্যাশন ও রোমান্স প্রকাশ করলেও ভারতে লাল রঙ পবিত্রতাকেই বোঝায়। তাই তো নববধূর পরণে লাল শাড়ি মাথায় লাল সিঁদূর। হলুদ আনে পবিত্র অনুভূতি। এটি এমন একটি রঙ যার ব্যবহার ভারতের সমাজজীবনের সর্বত্র। হলুদ রোগনাশকও বটে! নীল রঙ শান্ত ও বুদ্ধির প্রতীক। ফুটিয়ে তোলে শ্রীকৃষ্ণের চর্মবর্ণকেও। সবুজ সজীবতা আনে। ফসলের রঙ সবুজ। সময়টাও নতুন ফসল উঠবার। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে সবুজ রঙটি ইসলাম ধর্মের সাথে ভীষণভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ভারতের জনসংখ্যার বিপুল একটি অংশ ইসলাম-মতাবলম্বী। সবুজ রঙকে হোলিতে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে হোলির সার্বজনীনতাকেই তুলে ধরা হয়। এ শুধু হিন্দুদের উৎসব নয়, এই উৎসবে অংশ নিতে পারে সব মানুষ। আর কে না জানে আমজনতা হিন্দু-মুসলিম-শিখ-খ্রীষ্টান নিয়ে মাথা ঘামায় না, ওসব রাষ্ট্রনেতারাই করে থাকেন নিজেদের কায়েমী স্বার্থ বজায় রাখতে, আমআদমিকে বোকা বানাতে! 

উৎসবের ধর্মীয়, সামাজিক নানা ব্যাখ্যাই থাকে। থাকবেও। কিন্তু সব কিছুর পর যা থাকে, তা হ'ল আনন্দের শুদ্ধতা। আনন্দ পাওয়ায় নয়। আনন্দ দেওয়ায়। আমার স্যার বলতেন ‘আমার চোখে তাকালে তুই তোকেই দেখবি যেমন আমি দেখি আমাকে তোর চোখে। সোজা ভাষায় আমার মধ্যে তুই, তোর মধ্যে আমি৷' তাই যদি কিছু দিয়ে কাউকে আনন্দিত ক'রতে পারি, তবে সে আনন্দ আমারও। 

কতটুকুই বা দিতে পারি আমরা! বোধ হবার পর থেকেই তো পাওয়া না-পাওয়ার বাটখারায় ওজন ক'রতে ক'রতে দিন চলে যায়। দিনের শেষে ঠিকঠাক হিসেব কষলে দেখা যাবে পাওয়াটাই বেশী, না পাওয়ার চেয়ে। কিন্তু যদি 'দিলাম' আর 'দিলাম-না' কে পাল্লাপাথরে তুলি তবে দেখবো 'দিলাম-না'-এর পাল্লাটা ওজনে অনেকটাই বেশি। আমার কষ্ট হয় হোলিকার জন্য। নিজের জীবন দিয়েও সে শুভকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। অশুভ হয়ে আজও সে পুড়ে যায় আমাদের চোখের সামনে প্রতিদিন। জীবনের সব অশুভকে নিয়ে যদি অসুর-রমণী মরণকে বরণ ক'রতে পারেন, তবে আমরা কেন পারবো না শুভ-অশুভের দ্বন্দ্বে নিজেকে শুভ হিসেবে গড়ে তুলতে! হোলি কি আমাদের সেই বার্তাই দেয় না?

হোলির আনন্দে মাতবে দেশ। মাতোয়ারা জনগণ ছুটি নেবে দু'দিন প্রাত্যহিকতা থেকে। রঙে ভাসবে সমগ্র ভারত। কিন্তু রঙ কি লাগবে নিরন্ন শিশুর মুখে? রঙ কি লাগবে রোগের বিপরীতে ক্রমাগত লড়তে থাকা অসুস্থ মানুষটির মনে? রঙ কি রাঙিয়ে দেবে এক কাল্পনিক রেখাকে রক্ষা করার তাগিদে জলপাইরঙা পোষাক পরা ওই যুদ্ধরত মানুষটিকে? রঙ কি লাগবে ধর্ষিতার ছিনিয়ে নেওয়া সম্মানে? রঙ কি পারবে সব হারানো বিষাদময় মনটিকে হোলির আনন্দে মাতিয়ে তুলতে? 

শুভর তাৎপর্য এখানেই। অশুভের দহন প্রয়োজন এখানেই।

হোলি থাকুক। 
শুভ থাকুক। 
পরাজিত হ’ক সকল অশুভ৷

(পরম প্রিয় বন্ধু বিপ্লবের জন্য একবার এটি লিখেছিলাম। খানিকটা পরিমার্জন করে আবারও পোস্ট করলাম সেই লেখা)

ছবি- টনস নদী, দেরাদুন  

Sunday, March 5, 2023






ফ্রেডরিক নগরে একদিন 

শৌভিক রায় 

হুগলি জেলার মহকুমা। কলকাতা মেট্রোপলিটান ডেভেলপমেন্ট অথরিটির অন্তর্ভুক্ত। আজকাল গ্রেটার কলকাতাও বলছেন কেউ কেউ।
 
গঙ্গা তীরের এই শহরে ড্যানিশরা ঘাঁটি গেড়েছিল। ১৭৫২ থেকে ১৮৪৫ পর্যন্ত দুর্দান্ত ড্যানিশদের দখলে থাকা জনপদটির হাতবদল হয় ১৮৪৫ সালে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিনে নেয়  জনপদটি । 

ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৈরী করেছিলেন রাজা চতুর্থ ফ্রেডরিক। উদ্দেশ্য ছিল একটিই। ব্যবসা। 

হুগলি নদীর তীরে ১৬৯৮ সালে ঘাঁটি গাড়ে তারা। তবে তাদের কলোনি কিন্তু গড়ে ওঠে আরও অনেকটা পরে। ১৭৫৫ সালে তদানীন্তন বাংলার শাসক আলিবর্দি খানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে তারা প্রথম একটি ফ্যাক্টরি করেন এই জনপদে। আনুসাঙ্গিকভাবেই গুদামঘর থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছুই নির্মিত হয়।  বিভিন্ন কাজের জন্য স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন মানুষকে নিয়োগ করা হয়। শুরু হয় ফ্রেডরিক নগরের যাত্রা।
    
ফ্রেডরিক নগর? হ্যাঁ। কলকাতার উপকণ্ঠে, গঙ্গার ওপারে, শ্রীরামপুর এই নামেই পরিচিত ছিল সেদিন। রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডরিকের নামানুসারেই জনপদটির এই নাম দিয়েছিল তারা। 

বাংলার নবজাগরণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রীরামপুর। মার্শম্যান, উইলিয়াম ওয়ার্ডের এই জনপদে বসেই উইলিয়াম কেরি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন বাইবেল। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে মুদ্রিত হয় সেই অনুবাদ। `ফ্রেন্ডস অফ ইন্ডিয়া` পত্রিকার প্রকাশও হত এখান থেকেই।  ১৮১৮ সালে এই শহরেই নির্মিত হয়েছিল ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীন কলেজটি। 

এখানে রয়েছে ড্যানিশদের সমাধি। সেই সমাধির একটিতে শুয়ে কেরি, মার্শম্যান ও তাঁদের পরিবারের লোকেরা। আজকের ড্যানিশ ট্যাভার্ন একটি রেস্টুরেন্ট হলেও, তার ঠাঁটবাট যথেষ্টই রোমাঞ্চকর। ব্যাপটিস্টদের সেন্ট ওলেভ চার্চটিও সুদৃশ্য। 

কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম শ্রীরামপুরে। হুগলি তীরের ছোট্ট জনপদটিতে ইতিহাস ছড়িয়ে চারদিকে। শুধু একটু জেনে নেওয়া। একবার দেখে নেওয়া....













  

Friday, March 3, 2023

 উত্তরে যেখানে বসন্ত আসে না 

(ফোটোগ্রাফার নই। ছবি তোলার ব্যাকরণ জানি না। যা ভাল লাগে, তুলি তাই )























Thursday, March 2, 2023

 উত্তরে বসন্ত যেভাবে আসে.....


(ফোটোগ্রাফার নই। ছবি তোলার ব্যাকরণ জানি না। যা ভাল লাগে, তুলি তাই)