মাটির সেই ফুটো পাত্রটা
শৌভিক রায়
ফাল্গুন চৈত্র এলেই দিদার কথা মনে পড়ে।
আর দিদার কথা মনে হলেই চোখে ভাসে তুলসি বেদি। তুলসি গাছের ওপর ঝুলছে মাটির ছোট্ট ফুটো পাত্র। স্নান সেরে দিদা সেই পাত্রে জল ঢালছে। বহুক্ষণ ধরে জল টপটপ করে তুলসি গাছে জল ঝরে পড়ছে।
টানের দিন এলে তাই দিদা ফ্ল্যাশব্যাকে বারবার। এই টান অবশ্য শুধু চৈত-ফাগুনের টান নয়। এর মধ্যে রয়েছে আরও কিছু গুহ্য কথা! সেসব বোঝে সাধুচরণ। বোঝে আর আর ফক ফক হাসে!
আমাদের তখন একটা অদ্ভুত ঘর ছিল। বিরাট বিরাট ডুলি সেই ঘরের প্রায় পুরোটা দখল করে নিলেও, হাতুড়ি, বাটাল, শাবল, দড়ি, খন্তা, দা, সাইকেলের ভাঙা স্পোক, ফাটা টায়ার, পুরোনো শাড়ি ইত্যাদি হরেক কিসিমের জিনিস নিয়ে সে ঘর ছিল প্রবল হাতছানির। লুকোচুরি খেলায় সেই ঘরে বড় বড় ডুলির পেছনে কতবার যে লুকিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই!
বিয়ের পরে পরে মা'কে দিদা একবার বলেছিল,
- পাকঘরের পিছনের ওই ঘর থেইক্যা দাওহান লইয়া আসো তো রীতা।
নতুন বউ। শাশুড়ির আদেশ মানলেও 'দাওহান'-এর অর্থ রাঢ় বঙ্গের মেয়ের বোঝা হয়নি বলে, মা সেই ঘরে ঢুকে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল।
খানিক বাদেই দিদার আগমন। নিজেই বুঝে নিয়েছিল আদরের দিদিমণি বউমা তার ভাষা বোঝেনি। দা আর খান কে যোগ করে 'দাওহান' অবশ্য অতি সাধারণ বুলি ছিল সেদিনের উদ্বাস্তু বাড়িতে!
দিদার গুরুদেব আসবার তালে থাকতাম। গুরুদেব এলেই দলা প্রসাদ। ওহো কী তার স্বাদ! আতপ চাল, ন্যাতনেতে আলু ভাজা, ডাল, ঘি, সবজি ইত্যাদি সব মিলে সেই দলাকে মনে হত অমৃত! কী নাম ছিল গুরুদেবের? জানি না। জানার চেষ্টাও করিনি। দিদার ঠাকুরঘরে গুরুদেবের ছবি ঝুলত। কোথায় গেল সেই ছবি? জানা নেই তাও... মানুষটার মুখটা অবশ্য মনে আছে আজও। কিন্তু আর কিচ্ছু জানি না। এমনটাও হয়? হয় বোধহয়। ওই যে... সাধুচরণ আবার ফক ফক হাসছে....
তুলসি বেদি আছে। গাছও। রীনা জল দেয়। পুজো করে। সন্ধ্যায় আমি প্রদীপ দেখাই।
টানের দিন। মাটির পাত্রটা খুঁজি। টপটপ করে জল ঝরে যেটা থেকে। পাই না।
দিদার জিনিস মা বোধহয় যত্ন করে রেখেছিল। ওটা কোথায় কাকে জিজ্ঞেস করব বুঝে পাই না।
সাধুচরণকে বার কয়েক বলেছি। হাসি বন্ধ করে চোখ মুছেছে শুধু.....
(* একটি লেখার অংশ)
sauvikr.blogspot.com