বহুদিন পর 'প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা'র সাম্প্রতিকতম সংখ্যায় প্রকাশিত একটি লেখা। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও সম্পাদক শ্রী কৃষ্ণ দেব-কে প্রণাম ও ধন্যবাদ....
নদীর চেহারা বলে দিচ্ছে ভাল নেই সে
শৌভিক রায়
শীত শেষে তোর্ষা এখন ক্ষীণকায়া। প্রবাহ সরে গেছে অনেকটা দূরে। ক্রমশ বাড়ছে বালির আস্তরণ।
কিছুদিন আগেও বিপুল জলরাশি নদীর শরীরকে ঢেকে রেখেছিল। এখন জল সরতেই তার চেহারা দেখে আঁতকে উঠতে হচ্ছে! শুকিয়ে যাওয়া নদী খাতে দেখা যাচ্ছে ইতস্তত পড়ে থাকা বিপুল নোংরা আবর্জনা। কী নেই তাতে! সভ্যতার সব বর্জ্যই বোধহয় ফেলা হয়েছে নদীর বুকে।
অবশ্য শুধুমাত্র তোর্ষারই এই চেহারা নয়। আত্রেয়ী থেকে সংকোষ পর্যন্ত উত্তরের সব নদীর অবস্থা কমবেশি এক। নোংরা আবর্জনায় ক্রমশ ভরে উঠছে বিভিন্ন নদীর প্রবাহ। বর্ষায় বা অন্য সময় জলের প্রবল স্রোতে সেই আবর্জনা দেখা না গেলেও, বসন্তে জল কমতেই প্রকাশ্যে আসছে সেসব। আর তাতেই ধরা পড়ছে নদী বুকের এই দগদগে ঘা।
নদী নিয়ে আমাদের ভাবনা চিরদিনই কম। তাই অতীতে তো বটেই, আজও নদীকে নোংরা-আবর্জনা ফেলবার জন্য ব্যবহার করে চলেছি আমরা। বিভিন্ন জনপদের নর্দমাও এসে মিশছে নদীর সঙ্গে। ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। আবর্জনা জমে দূষণ যেমন বাড়ছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে বহু প্রবাহ। ফালাকাটার সাপটানা যেমন। একসময় এই প্রবাহটি চারদিকে থেকে ফালাকাটাকে ঘিরে রাখত। কিন্তু বর্জ্য জমে জমে সে আজ প্রায় অদৃশ্য। একই কারণে ধূপগুড়ির কুমলাইকেও যেন খুঁজে পাওয়া যায় না।
শরীরে আবর্জনা নিয়ে জলপাইগুড়ির করলা বা শিলিগুড়ির মহানন্দা মৃতপ্রায়। ভাল নেই শিলিগুড়ির উপকণ্ঠের করতোয়া বা রায়গঞ্জের নাগর। মেখলিগঞ্জের সানিয়াজান, মালবাজারের মাল ও নেওড়ার অবস্থাও খারাপ। বালুরঘাটের আত্রেয়ীও প্রায় শেষ হতে বসেছিল কিছুদিন আগে। পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের সীমা নির্ধারণকারী সংকোষের মধ্যপ্রবাহকে দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না, পাহাড়ি এই নদীটি কতটা বেগবতী! আলিপুরদুয়ারের কালজানি, ময়নাগুড়ির জর্দার দশাও তথৈবচ। যে যত জনপদের পাশ ঘেঁষে গেছে, তার সমস্যা তত বেড়েছে। সভ্যতার অভিশাপ কুড়িয়েছে সে! তবু নিজেকে ক্লেদাক্ত করে বাঁচিয়ে চলেছে জনজীবন।
ইদানিং নদী থেকে বালি ও পাথর তোলায় বিভিন্ন বিধি-নিষেধ জারি হওয়ায় নদীখাতের নাব্যতা যেমন কমছে, তেমনি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরাও বিপদে পড়েছেন। তবু পরিবেশের স্বার্থে যদি এই বিষয়টিকে সরিয়ে রাখি, তাহলেও সমস্যা কম নয়। নাব্যতাহীন নদী বর্ষাকালে কী কাণ্ড ঘটাতে পারে তা আমরা কমবেশি সকলেই জানি। জয়ন্তী নদী এর জলজ্যান্ত উদাহরণ। তার দোসর হিসেবে ডিমা, রায়ডাক, ডায়ানা প্রভৃতি নদীর কথা বলা যেতে পারে।
খুব খারাপ অবস্থা উত্তরের ঝোরাগুলিরও। আবর্জনা ফেলে ফেলে আমরা ইতিমধ্যেই অনেক ঝোরাকে বুজিয়ে ফেলেছি। কিছু কিছু জনপদে তো তাদের অপমৃত্যু ঘটিয়ে, গড়ে তোলা হয়েছে কংক্রিটের জঙ্গল। ভুলে গেছি এদের জলে পুষ্ট হয় উত্তরের অনেক নদীরা। ফলে সুখা মরশুমে নদী যেমন সেচের কাজে আসছে না, তেমনি বর্ষায় জল উপচে ক্ষয়ক্ষতিও অত্যন্ত সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, উত্তরের নদীগুলির স্বাস্থ্য আদৌ ভাল নেই। অচিরে সচেতন না হলে, ক্রমশ বিপদ বাড়বে। আসলে নদী ভাল না থাকলে সভ্যতাও যে ভাল থাকে না, সেটাই বোধহয় মনে রাখছি না আমরা!

No comments:
Post a Comment