Sunday, March 26, 2023


 

১৯৮২ সাল। ক্লাস এইট। জড়িয়ে পড়লাম 'মুজনাই'-এর সঙ্গে। তখন অবশ্য সম্পাদক নই। 
বেশ কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশের হঠাৎ `মুজনাই` শুকিয়ে গেল।
অনলাইন ব্লগ ও সমাজ মাধ্যমের হাত ধরে আবার ফিরল মুজনাই। শুরু হল মুদ্রিত সংখ্যাও। 

`মুজনাই`-এর মতো নিজের লেখালেখিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন কারণে। 
আবারও যখন শুরু করলাম অনলাইন ব্লগ আর সমাজ মাধ্যমের হাত ধরে, গায়ে সেঁটে গেল `ফেসবুক লেখক`-এর তকমা।
 
যদিও মাধ্যম আমার কাছে বড় মনে হয়নি কোনোদিন। 
গুরুত্ব পেয়েছে কী লিখলাম সেটাই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ আজ লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সদ্য প্রয়াত শ্রদ্ধেয় সন্দীপ দত্তকে স্মরণে রেখে 
`রংদার রোববার`-এর পাতা সাজিয়েছে। জায়গা পেয়েছে আমারও একটি লেখা। 

নিজের বা `মুজনাই`-এর কথা বলিনি। বলি না অবশ্য কখনই। 
আগামীতে কী হতে পারে লিটল ম্যাগাজিনের গতিপ্রকৃতি সেটা নিয়ে কিছু কথা বলেছি। অবশ্যই সে কথা আমার নিজের।
 
ধন্যবাদ উত্তরবঙ্গ সংবাদ ও কার্যকরী সম্পাদককে। 
প্রথম সারির একটি বাণিজ্যিক পত্রিকায় লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে এত লেখা সচারাচর স্থান পায় না। 
সেদিক থেকে আজকের উত্তরবঙ্গ সংবাদের রংদার রোববার একেবারেই আলাদা। 


সাহিত্যচর্চায় শহরমুখিনতার মিথ ভেঙে চুরমার 
শৌভিক রায়  

সমাজ মাধ্যমের এই রমরমার যুগে লিটল ম্যাগাজিনের অস্তিত্ব কি বিপন্ন? যেখানে এক ক্লিকে পৌঁছে যাওয়া যায় সিডনি থেকে সিয়াটল, সেখানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পত্রিকা করতে যাওয়া কেন!
 
ভাবনাটি প্রাসঙ্গিক। কেননা কেউ কেউ মনে করছেন সমাজ মাধ্যমই আজকে সবচেয়ে বড় লিটল ম্যাগাজিন। এখানে যত সংখ্যক লেখক-কবির লেখা একসঙ্গে পাওয়া যায়, মুদ্রিত আকারে কোনও লিটল ম্যাগাজিন তার ধারে-কাছেও পৌঁছতে পারে না। কিছুদিন আগেও সমাজ মাধ্যমে যাঁরা লিখতেন, তাঁদের গায়ে একটি বিশেষ তকমা সেঁটে দেওয়া হত। আজ সেটা করতে গেলে দু`বার ভাবতে হবে। কেননা সমাজ মাধ্যমে এখন লিখছেন প্রত্যেকেই। 

নিজেদের পত্রিকার স্বার্থে পিছিয়ে নেই এইসব পত্রিকার সম্পাদক বা প্রকাশকেরাও। তাঁরাও সমাজ মাধ্যমে নিজেদের পত্রিকার বিপণনে ব্যস্ত। মজা হল, এই বিপণনে কিন্তু শুধু লিটল ম্যাগাজিনকেই দেখা যায় না। বাণিজ্যিক পত্রিকারাও একই পথের পথিক। সমাজ মাধ্যমের ভরপুর সুবিধা নিচ্ছেন তারা। তৈরি করে ফেলছেন নিজস্ব অ্যাপ। `আসলে ব্যাপারটা কোথায় লিখলাম সেটা বড় নয়। কী লিখলাম সেটাই শেষ কথা। লিটল ম্যাগাজিনের বক্তব্য যদি সমাজ মাধ্যমের হাত ধরে আরও প্রসারিত হয় বা সমাজ মাধ্যমটিই যদি লিটল ম্যাগাজিন হয়ে যায়, তবে অসুবিধে কোথায়?` স্পষ্ট বলছেন এই প্রজন্মের কবি উদয় সাহা। 

বাস্তব হল, কোচবিহার জেলায় তথ্য প্রযুক্তির এই বিস্ফোরণের যুগেও অনলাইন ম্যাগাজিনের পাশাপাশি মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বিগত এক দশকে এই বৃদ্ধির হার দেড়গুণ বেশি। আগে কোচবিহার জেলায় যে কোনও জনপদ থেকে হাতে গোনা কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হত। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে লেখক-কবির সংখ্যাও। প্রান্তিক জনপদগুলিতেও এখন লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশ অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। অনেক লেখক-কবি উঠে আসছেন এইসব ছোট ছোট জায়গা থেকে। সাহিত্যচর্চায় শহরমুখিনতার মিথ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। একচ্ছত্র আধিপত্য করতেও দেখা যাচ্ছে না আর কাউকে। সৃষ্টি হচ্ছে না তথাকথিত কোনও `লিটেরারি লিজেন্ড`। 

এটাই স্বাভাবিক। তথ্য-প্রযুক্তি যত সাধারণের নাগালে আসবে, তত কমবে একাধিপত্য। লিটল ম্যাগাজিনের জগতেও ঠিক তেমনটাই হয়েছে। ফলে সমাজ মাধ্যম থাকলেও, লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশে অনীহা নেই কারও। বরং সেই প্রকাশে অনেকে যেন স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছেন! 'সংখ্যাটা তাৎপর্যপূর্ণ নয়। প্রয়োজন হল লেখার মান। পত্রিকা তো যে কেউ করতে পারে!` গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছেন বর্ষীয়ান সম্পাদক শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র দেব। বিষয়টি অবশ্যই ভেবে দেখবার। লেখার মান যদি ভাল না হয়, তবে যে উদ্দেশ্যে লিটল ম্যাগাজিন করা তার কোনও অর্থ থাকে না।  

বুদ্ধদেব বসু একবার বলেছিলেন, `.... এক রকমের পত্রিকা আছে যা স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাথে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার আমাদের হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেয়ে দেখে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিনগন্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি, জল, পোকা আর অপহারকদের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্যে। যেসব পত্রিকা এই শ্রেণীর অন্তর্গত হতে চায়, কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাঁদের উঁচুর দিকে, তাঁদের জন্যে নতুন একটা নাম বেরিয়েছিল মার্কিন দেশে, চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটল ম্যাগাজিন।` সত্যি বলতে, বর্তমানের খুব কম সংখ্যক পত্রিকা এই জায়গায় পৌঁছতে পারছে। তারা শুধু নামেই লিটল ম্যাগাজিন। তাদের থাকা বা না থাকায় কিছুই যায় আসে না। বরং এই জাতীয় পত্রিকা সামগ্রিকভাবে লিটল ম্যাগাজিন বিষয়টির ক্ষতি করে। কেননা লিটিল ম্যাগাজিনের অন্যতম উদ্দেশ্য হল, উপযুক্ত লেখা প্রকাশের পাশাপাশি মননশীল পাঠক তৈরি করা। সাহিত্যচর্চাকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়া। সেটা করতে গিয়ে কোনও আপোষের পথে হাঁটে না লিটল ম্যাগাজিন।  

সম্পাদকের বাড়ির ঠিকানায় লেখা খামে ভরে পাঠানো, সেই লেখা প্রেসে যাওয়া, প্রেসের খুপরি খুপরি অক্ষর রাখার খোপ থেকে একটি একটি করে নিয়ে শব্দ সাজানো, ব্লক করা, একটা একটা করে কাগজে ছাপা, বাঁধাই...সেসব দিন কবেই চলে গেছে। এই যুগে `ডিজিটাল গ্যাপ` থাকলেও, ঝকঝকে মুদ্রণ, দামি কাগজ নিয়ে লিটল ম্যাগাজিন অনেকটা এগিয়ে গেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ব্লগ, সমাজ মাধ্যম ইত্যাদি। কিন্তু নিজের নাম মুদ্রিত আকারে দেখা যে কোনও লেখকের স্বপ্ন। অন্যদিকে অনলাইনে অভ্যস্ত মানুষের সংখ্যা এখনও নগণ্য। প্রবীণেরা এখনও সাবলীল নন অনলাইনে। তাঁরা অনলাইনে পড়ার আনন্দ পান না। সেদিক থেকে দেখতে গেলে মুদ্রিত আকারে লিটল ম্যাগাজিনেই আবেদন এখনও অনেক বেশি। তবে সেটা কতদিন তা নিয়ে কিন্তু সন্দিহান অনেকেই। বিশেষ করে মহামারীর পরে বহু মানুষ জীবিকা হারিয়েছেন। অনেকের নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর দশা হয়েছে। তাদের কাছে পয়সা খরচ করে লিটল ম্যাগাজিন কেনা বিলাসিতা মাত্র।  

এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই লিটল ম্যাগাজিন নিজের মতো এগিয়ে চলছে। তার গতি দেখে মনে হয় না, লিটল ম্যাগাজিনের অস্তিত্ব বিপন্ন। আসলে লিটল ম্যাগাজিনের জগৎটি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে সৃষ্টি চলে অন্তর্গত এক তাগিদ থেকে। লিটল ম্যাগাজিনের লেখক কোনও নির্দেশ বা আদেশের দাসত্ব করেন। প্রচারের আলো পড়বে না জেনেও বছরের পর বছর কঠোর শ্রমে অক্ষরশ্রমিকেরা এখানে নিজেদের কানাকড়িটুকুও অনায়াসে বিলিয়ে দেন। লিটল ম্যাগাজিনের আনন্দ স্ক্রলে নয়, বরং জীবনের পাতা ওল্টানোতে। লিটল ম্যাগাজিনের আর্কাইভে তাই যা মেলে তা একান্তই সাধারণ মানুষের কথা। আসলে সাধারণ মানুষই তো ইতিহাস সৃষ্টি করে। তাই লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা অবিসংবাদিত। 

আগামীতে লিটল ম্যাগাজিন হয়ত অন্য মাধ্যম ধরবে। তার একটা হালকা রূপরেখা বোধহয় দেখা যাচ্ছে। সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু মাধ্যম সব কথা নয়। শেষ কথা হল লিটল ম্যাগাজিনের বিষয় ও তার পাঠক। সামাজিক অবক্ষয়ের যে গড্ডালিকা প্রবাহে আমরা এখন চলছি, তা যেন শুধুই দিনগত পাপক্ষয়। এখানেই লিটল ম্যাগাজিনের সবচেয়ে বড় ভূমিকা। সেই ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলে, লিটল ম্যাগাজিনের অস্তিত্ব অবশ্যই বিপন্ন হবে একথা জোর দিয়ে বলতে পারি।  

No comments: