Monday, March 6, 2023


 

শুভ দিনের আশায় শুভ উৎসব
শৌভিক রায়  
 
জিশুর জন্মের আগে থেকেই হোলির চল আর্যাবর্তে। অতীতে বিবাহিতা মহিলাদের মধ্যেই ছিল হোলির প্রচলন। সংসারের শ্রীবৃদ্ধিতে তারা পুজো করতেন ‘রাকা’(পূর্ণচন্দ্র)-কে। জৈমিনীর ‘পূর্বমিমাংস-সূত্র' ঘাটলে দেখা যায়, আর্যাবর্তের উত্তরভাগেই ছিল হোলির ব্যাপক প্রচলন। কালক্রমে হোলি প্রতিটি মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। 

অতীতে চান্দ্রমাসের হিসেব করা হ'ত দু'ভাবে। একটিতে অমাবস্যার পর থেকে আর একটিতে পূর্ণিমার পর থেকে। এই দুই মতের একটিতে, ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা বছরের শেষ দিন বলে ধাৰ্য হ'ত। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে আড়ম্বড়ের আয়োজনও হ'ত। তাই হোলির উৎসবে লেগে থাকতো আনন্দের ছোঁওয়া, প্রাণের ছোঁওয়া। হবেই বা না কেন? নতুনের আহ্বান যে!

বাংলা- উড়িষ্যায় হোলি কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মদিন হিসেবেও পালিত হয়। তবে হোলি শব্দটির প্রচলন ‘হোলিকা’ থেকে। 

কে না জানে হোলিকার কথা! হিরণ্যকশিপুর এই প্রিয় বোনটি ভাইপো প্রহ্লাদকে নিয়ে বসেছিলেন আগুনে। উদ্দেশ্য সহজেই অনুমেয়। দৈত্যকুলে ভক্ত প্রহ্লাদ! তাও হয় নাকি! হিরণ্যকশিপুর আদেশে অগ্নিসিদ্ধা হোলিকা তাই চেয়েছিলেন প্রহ্লাদকে আগুনে পুড়িয়ে মারবেন। কিন্তু দেবতারা তো চিরদিনই সবাইকে ঠকিয়েছেন। তাই বর পেয়েও কাজে লাগাতে পারলেন না হোলিকা। আগুনে নিজেই ছাই হয়ে গেলেন। বেঁচে গেলেন প্রহ্লাদ। 

কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করলো শুভর বিজয়, অশুভর বিরুদ্ধে। ‘অসৃকপাভয় সত্রস্তৈঃ কৃতা ত্বং হোলি বালিশৈঃ অতস্তাং পূজয়িষ্যামি ভূতে ভূতিপ্রদা ভবঃ।।’ আজ হোলি উৎসবের আগে এই যে হোলিকা দহন (কোথাও কোথাও ন্যাড়াপোড়া) সেই হোলিকা দহনকেই স্মরণ ক'রে...

অবশ্য বিজ্ঞান বলছে, এই দহন আসলে দীর্ঘ শীত শেষে ঘরের যাবতীয় নোংরা-আবর্জনা পরিষ্কারের একটি উপায়। তবে, এই পরিষ্কারের মধ্যেও শুভর প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। যা কিছু অশুভ দহন হ’ক তার। বেঁচে থাকুক শুভ।

পরবর্তীতে হোলি তার শ্রেষ্ঠ রূপ নেয় ব্রজধামে। রাধা-কৃষ্ণের হোলি উৎসব সে যুগে যা ছিল আজ বোধহয় তার চেয়ে কয়েক লক্ষ গুণে ধারে ও ভারে বেশী। অবস্থা আজ এমনি দাঁড়িয়েছে যে হোলির সময় ব্রজধামের হোলি দেখা সৌভাগ্যের ব্যাপার। সপ্তাহধীক চলতে থাকা হোলির উৎসবে বারসানা- নন্দগ্রামের লাথ মার হোলি, দেওজীর হোলি, মথুরার হোলিকা দহন, বৃন্দাবনের হোলি দেখতে আন্তর্জাতিক মিডিয়া থেকে শুরু ক'রে কে উপস্থিত নয়!

রঙের উৎসবে প্রতিটি রঙের আলাদা আলাদা ব্যাখ্যাও দেওয়া যায়। হোলিতে ব্যবহৃত প্রতিটি রঙের আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। হোলিতে ব্যবহৃত লাল রঙ তুলে ধরে পবিত্রতাকে। পাশ্চাত্যে লাল রঙ প্যাশন ও রোমান্স প্রকাশ করলেও ভারতে লাল রঙ পবিত্রতাকেই বোঝায়। তাই তো নববধূর পরণে লাল শাড়ি মাথায় লাল সিঁদূর। হলুদ আনে পবিত্র অনুভূতি। এটি এমন একটি রঙ যার ব্যবহার ভারতের সমাজজীবনের সর্বত্র। হলুদ রোগনাশকও বটে! নীল রঙ শান্ত ও বুদ্ধির প্রতীক। ফুটিয়ে তোলে শ্রীকৃষ্ণের চর্মবর্ণকেও। সবুজ সজীবতা আনে। ফসলের রঙ সবুজ। সময়টাও নতুন ফসল উঠবার। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে সবুজ রঙটি ইসলাম ধর্মের সাথে ভীষণভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ভারতের জনসংখ্যার বিপুল একটি অংশ ইসলাম-মতাবলম্বী। সবুজ রঙকে হোলিতে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে হোলির সার্বজনীনতাকেই তুলে ধরা হয়। এ শুধু হিন্দুদের উৎসব নয়, এই উৎসবে অংশ নিতে পারে সব মানুষ। আর কে না জানে আমজনতা হিন্দু-মুসলিম-শিখ-খ্রীষ্টান নিয়ে মাথা ঘামায় না, ওসব রাষ্ট্রনেতারাই করে থাকেন নিজেদের কায়েমী স্বার্থ বজায় রাখতে, আমআদমিকে বোকা বানাতে! 

উৎসবের ধর্মীয়, সামাজিক নানা ব্যাখ্যাই থাকে। থাকবেও। কিন্তু সব কিছুর পর যা থাকে, তা হ'ল আনন্দের শুদ্ধতা। আনন্দ পাওয়ায় নয়। আনন্দ দেওয়ায়। আমার স্যার বলতেন ‘আমার চোখে তাকালে তুই তোকেই দেখবি যেমন আমি দেখি আমাকে তোর চোখে। সোজা ভাষায় আমার মধ্যে তুই, তোর মধ্যে আমি৷' তাই যদি কিছু দিয়ে কাউকে আনন্দিত ক'রতে পারি, তবে সে আনন্দ আমারও। 

কতটুকুই বা দিতে পারি আমরা! বোধ হবার পর থেকেই তো পাওয়া না-পাওয়ার বাটখারায় ওজন ক'রতে ক'রতে দিন চলে যায়। দিনের শেষে ঠিকঠাক হিসেব কষলে দেখা যাবে পাওয়াটাই বেশী, না পাওয়ার চেয়ে। কিন্তু যদি 'দিলাম' আর 'দিলাম-না' কে পাল্লাপাথরে তুলি তবে দেখবো 'দিলাম-না'-এর পাল্লাটা ওজনে অনেকটাই বেশি। আমার কষ্ট হয় হোলিকার জন্য। নিজের জীবন দিয়েও সে শুভকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। অশুভ হয়ে আজও সে পুড়ে যায় আমাদের চোখের সামনে প্রতিদিন। জীবনের সব অশুভকে নিয়ে যদি অসুর-রমণী মরণকে বরণ ক'রতে পারেন, তবে আমরা কেন পারবো না শুভ-অশুভের দ্বন্দ্বে নিজেকে শুভ হিসেবে গড়ে তুলতে! হোলি কি আমাদের সেই বার্তাই দেয় না?

হোলির আনন্দে মাতবে দেশ। মাতোয়ারা জনগণ ছুটি নেবে দু'দিন প্রাত্যহিকতা থেকে। রঙে ভাসবে সমগ্র ভারত। কিন্তু রঙ কি লাগবে নিরন্ন শিশুর মুখে? রঙ কি লাগবে রোগের বিপরীতে ক্রমাগত লড়তে থাকা অসুস্থ মানুষটির মনে? রঙ কি রাঙিয়ে দেবে এক কাল্পনিক রেখাকে রক্ষা করার তাগিদে জলপাইরঙা পোষাক পরা ওই যুদ্ধরত মানুষটিকে? রঙ কি লাগবে ধর্ষিতার ছিনিয়ে নেওয়া সম্মানে? রঙ কি পারবে সব হারানো বিষাদময় মনটিকে হোলির আনন্দে মাতিয়ে তুলতে? 

শুভর তাৎপর্য এখানেই। অশুভের দহন প্রয়োজন এখানেই।

হোলি থাকুক। 
শুভ থাকুক। 
পরাজিত হ’ক সকল অশুভ৷

(পরম প্রিয় বন্ধু বিপ্লবের জন্য একবার এটি লিখেছিলাম। খানিকটা পরিমার্জন করে আবারও পোস্ট করলাম সেই লেখা)

ছবি- টনস নদী, দেরাদুন  

No comments: