যে ছবি চোখে ভাসে
শৌভিক রায়
সেই সময় উত্তরে আমাদের ছোট্ট জনপদে সেভাবে ভাল কিছু পাওয়া যেত না। বিশেষ কিছু কিনতে হলে ভরসা করতে হত কোচবিহার বা জলপাইগুড়ির ওপর। সেখানে না হলে হাতে থাকত শিলিগুড়ি। আর এসবের শেষে সব-পাওয়ার কলকাতা ছিল শেষ ভরসা।
বাবা কলকাতায় যেতেন খুব ঘন ঘন। বেশিটাই স্কুলের কাজে। তবে স্কুলের কাজের বাইরেও বাবার কলকাতা যাওয়ার কমতি ছিল না। কলকাতার জন্য অসম্ভব টান ছিল বাবার। তাই বাবার যাতায়াত লেগেই থাকত।
তখন তিস্তা তোর্ষা এক্সপ্রেস বা উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ছিল না। গৌহাটি থেকে আসা কামরূপ এক্সপ্রেস ছিল একমাত্র সম্বল। কিছুদিন অবশ্য কয়লার ইঞ্জিন টানা জনতা এক্সপ্রেস চলেছিল। সেই ট্রেনে চাপলে সঠিক সময়ে পৌঁছবার চিন্তা কেউ করত না। Abnormal Late ছিল জনতা এক্সপ্রেসের Normal ব্যাপার। এছাড়াও ওই ট্রেনে বাবার ধপধপে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি বাতাসে ভেসে আসা কয়লার গুঁড়োয় কালচে হয়ে যেত। মা বকবক করতে করতে সেই ধুতি পাঞ্জাবি কাচতে বসতেন।
মায়ের সেই বুকনি যে কপট ছিল, সেটা বুঝি এখন। আসলে ওদের ভালবাসার প্রকাশটা ছিল এরকম। মা নিজেই চাইতেন না বাবার সাদা পোশাকে বিন্দুমাত্র দাগ লাগুক।
বাবার প্রকাশ কীরকম ছিল? আসলে, এটা বলবার জন্যই কলকাতা প্রসঙ্গ টেনে আনা।
বহুবার দেখেছি সাদা কাগজে মায়ের পা রাখা। বাবা উবু হয়ে বসে কলম দিয়ে সেই পায়ের চারদিকে দাগ টানছেন। ওটা ছিল পায়ের মাপ নেওয়া। মায়ের জন্য চটি আনতে হবে। কলকাতা থেকে। আমার কালো মায়ের মিষ্টি মুখ সেই সময়ে যে অপার্থিব সুখে কেঁপে কেঁপে উঠত তার তুল্য কিছু তো পেলাম না আর আজও!
কেন জানি না, নারী দিবস এলেই সেই ছবিটি চোখে ভাসে.....
(একটি লেখার অংশ)
No comments:
Post a Comment