Saturday, December 31, 2022


 


সাহিত্যে দাদাগিরি: একটি ভাবনা

শৌভিক রায় 


'দাদাগিরি' শব্দবন্ধে কেমন একটা নৈঞর্থক ভাবনা আছে। শব্দবন্ধটির উৎপত্তি আদৌ বাংলায় কিনা সেই বিষয়েও প্রশ্ন জাগে। তবে ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলির লর্ডসের ড্রেসিং রুমে জামা খুলে ঘোরানোর মধ্যে কোট আনকোট যে দাদাগিরি দেখা গেছিল সেটি অবশ্য যথেষ্ট সদর্থকভাবেই নিয়েছিল আপামর ভারতবাসী। 


আসলে যে কোনও বিষয়েরই ভাল মন্দ দুটি দিক থাকে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাহিত্যে দাদাগিরির মতো বিষয় এলে, একটু থমকাতে হয়। প্রশ্ন জাগে, সাহিত্যে কি দাদাগিরি চলে? 


প্রশ্ন যখন হ্যাঁ-বোধক, তাহলে উত্তরটি না হবে। এটা বলা যায়। কিন্তু সব নিয়মেরই ব্যতিক্রম আছে। এক্ষেত্রেও রয়েছে। তাই অস্বীকার করার উপায় নেই। সাহিত্যে দাদাগিরি রয়েছে। আগেও ছিল। এখনও আছে। আগামীতেও থাকবে।


আসলে সমস্যা দাদাগিরি থাকা বা না থাকা নিয়ে নয়। দাদাগিরির চেহারাটা আসলে ঠিক কী হবে প্রশ্ন সেটাই। লর্ডসে সৌরভের শার্ট খুলে ঘোরানোর মতো নাকি পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে বেপাড়ার ছেলেকে হুমকি দেওয়ার মতো? 


লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলা সাহিত্যে দুটিই রয়েছে। গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে ব্যাপারটি বোঝা যাবে। গ্রীক, রোমান, ল্যাটিন, ফরাসি, ইংরেজি, রাশিয়ান ইত্যাদি ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ বলে পরিচিত। এদের বয়সও অনেক, অন্তত বাংলার তুলনায়। এইসব ভাষায় সৃষ্ট এক একটি লেখা মাস্টারপিস হিসেবেই পরিচিত। তুলনায় বাংলা অনেক নবীন। চর্যাপদকে বাংলার প্রথম সৃষ্টি মনে করলেও, বয়সের তুলনায় উল্লিখিত ভাষাগুলি থেকে সে নবীন। কিন্তু বাংলা সাহিত্য কোনও অংশে এদের চাইতে পিছিয়ে নেই। বাংলার নব জাগরণের পর থেকে এত দ্রুত এই ভাষার বিকাশ ঘটেছে এবং এত সংখ্যক সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে যে তা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথের আগে থেকেই কিন্তু এই ধারা শুরু হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে মাইকেল মধুসূদনের কথা উল্লেখ করব। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, মাইকেলের সঠিক মূল্যায়ন আজও হয়নি। 


এই পরম্পরাকে বজায় রেখে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে যেভাবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করলেন নিঃসন্দেহে সেটি দাদাগিরি। অবশ্যই সদর্থক অর্থে। এই দাদাগিরি যদি সেদিন না হত, তবে বাংলা সাহিত্যকে কে চিনত? বাঙালিকেই বা ক'জন জানত? এই সদর্থক দাদাগিরি চালু রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী সাহিত্যিকরা। তাঁদের নাম উল্লেখ করে তালিকা আর ভারী করছি না। তবে এই প্রসঙ্গে কিছু বাঙালি সাহিত্যিকের ইংরেজিতে লিখে বিদেশি ভাষার ওপর দাদাগিরি করার কথাটি উল্লেখ না করলেই নয়। এই তালিকায় নীরদ সি চৌধুরী থেকে শুরু করে অমিতাভ ঘোষ, উপমন্যু চট্টোপাধ্যায় প্রমুখেরা থাকবেন। বিদেশি ভাষার ওপর তাঁদের এই দাদাগিরিকে স্বাগত না জানালে অবিচার করা হবে। আর এরা আদ্যন্ত বাঙালি। শুধু প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বাংলাকে। নীরদ সি চৌধুরীর মতো অনেকে আবার দুই ভাষাতেই সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁদের এই দাদাগিরি আখেরে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। 


মুশকিল হল দাদাগিরি যখন খারাপ অর্থে ব্যবহার হয়, তখন সাহিত্য জগতও তাতে প্রভাবিত হয়। অত্যন্ত আফশোষের সঙ্গে এটা বলতে হচ্ছে যে, বর্তমান বাংলা সাহিত্যে এটাই চলছে। সাহিত্য যে নিভৃত এক সাধনার বিষয় সেটা ভুলতে বসেছি আমরা। কী লিখছি বা চর্চা করছি সেই ব্যাপারটিকে পেছনে ফেলে, কোথায় লিখছি বিষয়টি বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর এই 'কোথায়' প্রসঙ্গে সৃষ্টি হচ্ছে দাদাগিরির নতুন চেহারা। সেই চেহারা অত্যন্ত ঘৃণ্য। সমস্যা হল সেই ঘৃণ্য চেহারাকে ঘিরে গড়ে উঠছে এক একটি বৃত্ত। সেই বৃত্তের বাইরে গেলে নতুন লিখতে আসা লেখকের ওপর নেমে আসছে এমন এক খাঁড়া যা সর্ব অর্থে ভয়াবহ। সেটি মেনে চলা সবার পক্ষে সম্ভব নয় বলে অচিরে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিভাশালী নবীন লেখক।


এই দাদারা আসলে সাহিত্য জগতের দুর্বৃত্ত। যে কোনও উপায়ে সাহিত্য জগতের সব কিছু কুক্ষিগত করে রেখে, আলোর বৃত্তে থাকাই তাদের অভ্যেস। সকলে তাদের পদলেহন করুক এটাই তাদের উদ্দেশ্য। আর তার জন্য সবরকম আপোষে তারা তৈরি। উল্টোদিকে যশপ্রার্থী লেখক, নবীন বা প্রবীণ নির্বিশেষে, সেই দাদাগিরিকে পোক্ত করছে সেই আপোষে সাড়া দিয়ে। এই দাদাদের হাত ধরে খুব স্বল্প দিনে তারা তথাকথিত সাফল্যের সিঁড়ি দেখলেও, আদতে ঢুকতে পারছে না সাহিত্যের গভীরে। লেখার নামে যা সৃষ্টি করছে তারা তা কেবল আত্মরতি। এই আত্মরতি বৃহত্তর সমাজের ঠিক কী আর কতটা কাজে আসে তা আমার জানা নেই। সাহিত্য যে সমাজের দর্পণ সেটা ভুলে আত্মরতিতে মেতে ওঠা এই লেখককূল বুঝতে পারেন না, প্রকারান্তরে তারা আসলে ধূর্ত দাদাগিরির শিকার।


মুশকিল হল, নৈঞর্থক দাদাগিরিতে বিশ্বাসী দাদা বা ভাই কেউই বোঝেন না, তাদের দাদাগিরির ফলে আখেরে ক্ষতি হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের। আর আজ যেহেতু এদের সংখ্যা বেশি তাই সেই ক্ষতি হয়ে চলেছে বিরাট আকারে ও দ্রুত গতিতে। এভাবে চললে, যে বাংলা সাহিত্য একদিন বিশ্বে সম্ভ্রম আদায় করেছিল, তা ধূলিসাৎ হবে। ভাবতে কষ্ট হয়, প্রকৃত সৃজনের দাদাগিরির হাত ধরে আসা সেই সম্মান নষ্ট হচ্ছে আপোষকামী ধান্দাবাজ দাদাগিরির জন্য!    



Tuesday, December 27, 2022

 




শীত 
শৌভিক রায় 



এক 

বৃক্ষরা পাতা ঝরিয়ে ফেলেছে নীরবে। মনমরা সব। কিছুদিন আগেও যে সূর্যালোক স্পর্শে গায়ে জ্বালা ধরত তাকেই মিঠে লাগে বড্ড। 
নদীর বুকে জেগে উঠছে চর। কোথায় ছিল এতো বালি তোমার বুকে, ও নদী? কিভাবেই বা চেপে রাখো বুকে তোমার এতো পাথর? সবাইকে জীবন দাও এত কষ্ট চেপে রেখে? তোমাকে দেখেই শিখি কিভাবে কষ্টের পাথর বুকে চেপে বয়ে চলতে হয় জীবন পথে, যে জীবন একদিন মিশবে সময়-সমুদ্রে।

রাতগুলি লম্বা। দীর্ঘ। পক্ষীকূল তাই সারাদিন খুব ব্যস্ত। কিচিরমিচির সারাদিন। যূথবদ্ধ ব'লে দিনান্তে নিজেদের সারাদিনের রসদ নিয়ে নানা আলোচনা। তাদের হৈ চৈ-এ কান পাতা দায়। অবশেষে ডানার চাদর গায়ে ঢেকে নিশ্চিন্ত ঘুম নিজের নীড়ে। নিশ্চিন্তই। ঝড় নেই, বাদল নেই, নেই অন্য কোন সরীসৃপের শব্দহীন বিচরণ। এই শীতে কে আর থাকে ধরিত্রী বুকে! সবাই তাই সুখনিদ্রায় পৃথিবী-গহ্বরের নিজস্ব উষ্ণতায়।

এক এক দিন ঝলমলে, আবার এক এক দিন একদমই বিষন্ন। সকাল থেকেই বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে কুয়াশা। ঢেকে থাকে অন্ধকারে দুহাত দূরের জিনিষও। বেলা হলে ’পর কেটে যায় সে। আলো ঝলমলে সোনালী রোদ প্রবেশ করে দূরতম কোনও এক কোণে। চোখের বন্ধ পাতাতে আলোর উষ্ণতা বুঝিয়ে দেয় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার কখনো, কোনদিন শেষ কথা হতে পারে না। আলো থাকবেই। দরকার শুধু স্থৈর্য আর অন্বেষণ। 

আচ্ছা, নদীর যাত্রাও কি এমন নয়? কোন এক গাঢ় নিকষ কালো অন্ধকার গুহায় প্রাগৈতিহাসিক কালের জমে থাকা বরফ পিন্ড থেকে উৎসারিত জলরাশিও কি যাত্রা শুরু করে না আলোর দিকে? মেশে না গিয়ে দিগন্তব্যাপী আলোয় ঝলমল করা সমুদ্রের সঙ্গে? সেই সমুদ্র যাতে রাতের বেলাতেও ফসফরাসের আলো ক্ষণে ক্ষণেই জানান দেয় অন্ধকার সাময়িক, বড্ড সাময়িক।

শীতকাল। অনেক কিছু শেখানোর কাল। অনেক কিছু শিখিয়ে যায় শীত তার প্রতিটি ছন্দে। পাতা ঝরে গেলেও ফুটে ওঠে রঙবেরঙ ফুল। দরকার সামান্য যত্নের। জীবনের মতোই। জীবন থেকে সুখ ঝরে যায়। কিন্তু যদি যত্ন করি নিজের মননের, ফুটতে পারে ফুল রঙবেরঙ নানা । এক ধূসর সময়ে থেকেও শীতের মতোই জানান দিতে পারি সবাইকে, পারি, আমরাও পারি রাঙিয়ে দিতে এই জীবন।




দুই 


হালকা কুয়াশার স্বচ্ছ চাদর। বাতিঘরের হলুদ আলো ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে ছুঁয়ে যায় সেই কুয়াশার আবরণ। হাওয়ার হঠাৎ দমকা বেগে জমে থাকা কুয়াশা অন্য জায়গা এসে ঢেকে দেয় জানালার শার্সি।  আর সেই হাওয়াতেই পাতার শরশর আওয়াজ ও টুপটাপ খসে পড়া গাছ থেকে। দূরে তাকালে প্রান্তরের পর প্রান্তর জুড়ে দেখা যায় ধোঁওয়ার মতো জমে আছে সাদা আস্তরণ। 

বিকেলে মাঠের আগাছাগুলিকে এক জায়গায় ক'রে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা সেই স্তুপ থেকে ধোঁওয়ার উঠে যাওয়া এখনও ওপরের দিকে হয়তো কুয়াশার সঙ্গে মিলন আকাঙ্খায়! চাঁদটাও যেন দূরে চলে গেছে। ফটফটে সেই জ্যোৎস্না আর নেই। বরং মরা জ্যোৎস্নার মায়াবী রাত যেন। ভোররাতে শুরু হবে শিশিরবর্ষণ। টিনের চাল ভিজে যাবে শব্দহীন শিশিরপাতে। কেবল গাছে জমে থাকা শিশির টিনের চালে ঝরবে টুপটাপ শব্দ ক'রে। সকালের মিঠে রোদে একটু মাটির ছিটে লাগা শিউলি দিয়ে ভরে উঠবে সাজি। 

তবে সাবধান। শিউলির গায়ে গোল জমাট বেঁধে থাকতে পারে শুয়োপোকার দল! গাছের কিছু পাতা ছেঁড়া ছেঁড়া এদের জন্যই। তবে কিছু ক’রতে নেই। প্রজাপতি হবে যে আর ক'দিন পরই! আমার মুজনাই, আমার সাপটানা এখন ক্ষীণকায়া। মাদারীরোড ধরে এগিয়ে চললে জঙ্গলের যে আভাস চোখে পড়ে, তাও এখন ফাঁকা ফাঁকা, শুকনো। জলদাপাড়ার ভিতর যে ঝোরাগুলি  বয়ে গেছে, তাতে নেমে বেত সংগ্রহে আর তেমন অসুবিধে নেই। বরং বড় বড় পাথরের চাঁইয়ে মাঝখানে বসে জলের সেই অপূর্ব সুর শোনার সুবর্ণ সুযোগ। দু'চারটে নদীয়ারি মাছ উকি দিয়ে যেতে পারে। বেরিয়ে আসতে  দুপাশের জঙ্গলের কোনও  এক দিক থেকে বনময়ূরী। অবশ্য পাথরের ওপর বসে থাকা অচেনা পুরুষ দেখে লজ্জায় ফিরে যেতেও পারে নিজের পুরুষ ময়ূরটির কাছে। 

জঙ্গল শেষেই পাকা ধানের বিস্তীর্ণ ক্ষেত। কোথাও কাটা ফসল মাটিতে আঁটি বেঁধে রাখা হয়েছে, কোথাও আবার ফাঁকা ক্ষেতে ধান খুঁজতে হাজির শালিক থেকে শুরু ক'রে পরিযায়ীর দল! অলস দিন।  আলস্য বিছানায়, আলস্য সকালের রোদে। চোখ না ফোটা ছোট্ট কুকুরছানাকে কোলে তুলে আদর ক’রতে ক'রতে রোদের আদর খেতে কি দারুণটাই না লাগে !

সেই শীত। আবার আজ। সেই আমেজ, সেই আলস্য। পার্থক্য একটাই। সেদিন সাংসারিক ভাবনাহীন এক দামাল কিশোর, আর আজ প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া আপাদমস্তক এক কেজো মানুষ। 




তিন 


শিশিরে ভেজা মাঠ। ভেজা টিনের চাল। বারদুয়ারে রাখা পোয়ালের স্তুপও ভেজা। কখনো হেসে ওঠা ঝলমলে সূর্য, কখনো মেঘের আড়ালে মিইয়ে থাকা সূর্য। দিনভর যেন লুকোচুরি খেলা। আর তাদের এই খেলা দেখে মিটিমিটি হাসতে থাকা চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়াসহ মরশুমি ফুলের দল। কখনো কুয়াশার দাপটে মাঝদুপুরকেও ভোর বলে ভ্রম হয়, আবার কখনো মুঠো মুঠো সোনা রোদের উত্তাপ “মিঠেকড়া সারা শরীরে।

শীত সকালে পরিযায়ীর ঢল নামে বিলে, পুকুরে। কখনো দল বেঁধে, কখনো বা একা পরিযায়ী পাখিরা খুঁজে চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাবার প্রকৃতির মাঝে। উদরপূর্তি হ’লে ’পর ভাসমান স্বচ্ছ জলে, চলে অবগাহন, খুনসুটি নিজেদের মাঝে। সবশেষে ডানা ঝাপটে একযোগে উড়ান। উড়ান নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে আর আশ্রয় প্রিয় নীড়ে। 

নীড় খুঁজি আজীবন। খুঁজি নিশ্চিন্ত আশ্রয়। কখনো হাত ধরে আশ্রয় চিনিয়ে দেন পিতামাতা, কখনো শিক্ষক, কখনো পরিজন, প্রিয়জন। যদিও প্রিয়তম আশ্রয় মাটির বুকে অথবা চিতার আগুনে। তাই সারাজীবন কেবল অন্বেষণ। অন্বেষণ শেষে, নিশ্চিত আশ্রয়ে, চোখ বোজা চিরদিনের জন্য, চিরস্বপ্নের দেশে। নীড় তাই কেবল খুঁজেই চলা।

ধুলো ওড়ে বালির চরে। উত্তুরে হাওয়ার কনকনানি মূহুর্মূহ বেড়েই চলে। পাতা ঝরায় পর্ণমোচী। শুকনো পাতায় সতর্ক সঞ্চারণে শ্বাপদ মাথা উঁচু ক'রে পথ খুঁজে নেয় নিজের। অন্বেষণ তারও, নিজস্ব, একান্ত। বৃত্তাকার এক খোঁজ। শুরু কোন এক বিন্দু থেকে, শেষ সেখানেই, সেই বিন্দুতেই।

শীতকাল। গরম আবরণে নিজেকে মুড়ে নিদ্রার সুখ অথবা অসুখ। দীর্ঘ রাতের প্রতিটি পলে অন্বেষণ উষ্ণতার। মনে পড়ে যায় মায়ের শরীরের ওম। ছোট্ট শিশুর সেরা উষ্ণতা মায়ের শরীরের সেই উষ্ণতাই। রাত যত গড়ায় খুঁজে ফিরি মায়ের সেই উষ্ণতা। জীবন যত গড়ায় খুঁজে ফিরি মায়ের সেই উষ্ণতা। অবাক হই ভেবেও যে উষ্ণতা কিভাবে শীতলতা নিয়ে আসে, জুড়িয়ে দেয় প্রাণ, শান্ত ক’রে তোলে মনের গভীরে ফুটতে থাকা অশান্ত জীবনের গরম লাভাস্রোত। অন্বেষণ তাই সারা শীত জুড়ে, নীড়ে ফেরার টানে, মায়ের কাছে.....

Saturday, December 17, 2022







 

বানিয়াদহ একটি নদীর নাম। 


নামে যতই রোমান্টিকতা থাক, নদীর চেহারা দেখলে মন খারাপ হয়। কোথায় সেই প্রবাহ, কোথায় সেই জলরাশি! 


কোন অভিমানে সে ফিরিয়েছে মুখ? হয়ে রয়েছে এরকম অকিঞ্চিৎকর?


ভৌগোলিক অনুসন্ধান বলছে, পুরোনো উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদীর এই চেহারা। অথচ কত বিস্তৃত তার যাত্রা। 


দেওয়ানবস-টাপুরহাট-ঘুঘুমারি-গাঙ্গলের কুঠি-ঘেঘিরঘাট-নবাবগঞ্জ বালাসি-রুইয়ের কুঠি-জড়াবাড়ি-কোয়ালিদহ-রাখালমারি-কুচনিয়া-ভাঙনি-টিয়াদহ-দশগ্রাম-গোবরাছড়া-রতিনন্দন-কোণামুক্তা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে কুড়িগ্রামে ধরলায় (জলঢাকা) মিশেছে সে। 


একদা টলটলে প্রবাহের বানিয়াদহ নাব্যতা হারিয়ে বিলুপ্তপ্রায়। 


আজ নবাবগঞ্জ বালাসিতে বানিয়াদহের ওপর বাতাসি ব্রিজ থেকে তোলা ছবি। 


বাতাসি ব্রিজকে কেন জানি সবসময় রহস্যময় মনে হয়......   




Friday, December 16, 2022


 

রাণার নাট্য সংস্থা: কিছু কথা

শৌভিক রায় 


ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি ঘর ছিল আমাদের জন্য বরাদ্দ। সেই ঘরেই সকাল আট-সাড়ে আট নাগাদ পোলিওর টিকা পৌঁছে যেত। সার দেওয়া চামচের প্রতিটিতে সেই টিকার দুই ড্রপ ফেলা হত। তারপর শুরু হত শিশুদের পোলিও খাওয়ানো। যতদূর মনে পড়ছে মাসের দুদিন বসত এই ক্যাম্প। টিকা আসত জলপাইগুড়ি বা কোচবিহার থেকে। 

১৯৮২/৮২ তখন। শিলিগুড়ি কোচবিহার মিনি বাস সদ্য চলতে শুরু করেছে। 'সাফারি' আর 'ভানুমা' নামের সেই বাস দুটোকে ঘিরে আমাদের ছোটদের উৎসাহ ছিল ভীষন। জলপাইগুড়ি থেকে আসত কৌশিক রায়ের মালিকানায় থাকা 'পারাপার'। কী কদর তখন তাদের! আর যারা মিনি বাসে চাপে তারা যেন সব খানদানি লোক! ফালাকাটা সেই সময় ফাঁকা ফাঁকা। স্কুলের সামনে পীতাম্বরদার ছোলা বাদামের ঠেলা দোকান আর পাঞ্চজন্যের পেছনেই টাউন ক্লাবের ধু ধু মাঠ। পোলিও খাওয়ানোর সকালবেলায় হেলথ সেন্টারের ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনতে হত। দূর থেকে আমাদের দেখলেই ডাক্তারবাবু বেরিয়ে আসতেন ডাকবার সুযোগ না দিয়েই। কেননা অপুদা গত দিন ওঁর স্ত্রী-কে ডেকে বলেছে, 'বৌদি, ডাক্তারকাকুকে একটু তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেবেন!' টুটুদা, সন্টুদা, দিলীপদা, মিন্টুদা, নারায়ণদা, রামসেবকাকু, গৌরদা, বংশীদা এরাও কেউ কম যেত না! আর এরা সবাই মিলেই ছিল রাণার নাট্য সংস্থা। আর সেই সংস্থায় সেই মুহূর্তে সবচেয়ে ছোট সদস্য অবশ্যই আমি!

ফালাকাটার নাট্যচর্চার সমৃদ্ধ ইতিহাসে 'রাণার' অতি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ১৯৭৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাণারের যাত্রা শুরু হয় 'অবরুদ্ধ ইতিহাস' দিয়ে। এরপর 'অশান্ত বিবর' মঞ্চস্থ হলেও, রাণার দৃষ্টি আকর্ষন করে 'যদি আমি কিন্তু আমি' নাটকটির পর। এরপর একে একে এসেছে একটি অবাস্তব গল্প, অভিযাত্রী একটি নাট্য সংস্থা, লোকটা, স্বর্গে সংস্কৃতি, পাথর, তেঁতুল গাছ, একা নয়, ভোরাই খেয়া সহ অজস্র একাঙ্ক। পূর্ণাঙ্গ নাটকে রাণার মাত করেছে শতাব্দীর পদাবলী, নরক গুলজার, মেষ ও রাক্ষস, অমৃত অতীত, রাজদর্শন, আমি সহ বহু নাটকে। 

রাণারের বহু প্রযোজনার সাক্ষী থেকেছি আমি। দলের সঙ্গে গেছি বহু জায়গায়। আমার সেজকাকু প্রয়াত মদন রায়ের নির্দেশনায় রাণার বেশ কিছু নাটক করেছে ভাবতে গর্ব হয়। আমার স্বর্গত বাবা ও মায়েরও এই নাট্য দলের প্রতি আলাদা ভালবাসা ছিল সেটা ভেবেও ভাল লাগে। আমি নিজে প্রয়াত উৎপল ভদ্রের প্রতিষ্ঠিত 'বিদ্রোহী'তে যোগ দিলেও রাণারকে নিজের মনে করে এসেছি চিরকাল। আজও করি। 

একটানা ৪৯ বছর ধরে একটি নাট্য দল শুধু নাটক করে আসছে নয়, নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজনও করছে। আর তাতে অসম ও এই বঙ্গের বহু দল যোগ দিয়েছে। এবারও ২৫ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা নাট্য উৎসবে যোগ দিচ্ছে কলকাতা, বহরমপুর, নৈহাটি, মাথাভাঙ্গা, গড়িয়া, হলদিবাড়ি ইত্যাদি জায়গার নানা দল।

নাটক, সমাজসেবা ও নাট্য আন্দোলনে উত্তরের যে নাট্যদলগুলি প্রথম সারিতে, রাণার তাদের একজন। মনে পড়ে হলদিবাড়িতে 'লোকটা' এবং 'একটি অবাস্তব গল্প' নাটক দুটির মাঝে সংস্থার হয়ে আমার আবৃত্তি, দশমীর ঘাটে বা বেসিক স্কুলের মাঠে সংস্থার ২৫ ডিসেম্বরের নাট্যোৎসব, রাণার প্রদত্ত সম্মাননায় বাবা বা সেজকাকুর শিশুর মতো আনন্দিত হয়ে ওঠা! মনে পড়ে সন্টুদা, নারায়ণদার মতো অকালে চলে যাওয়া নাট্যপ্রেমী কত মানুষের কথা! 

২৫ ডিসেম্বর থেকে রাণার নাট্য উৎসব শুরু হচ্ছে ফালাকাটার কমিউনিটি হলে। এবারের শ্রেষ্ট প্রযোজনা পুরস্কার নামাঙ্কিত হয়েছে আমার বাবা ও মায়ের নামে। ফালাকাটার অগ্রগতির জন্য বাবার অবদান রাণার মনে রেখেছে এই ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে আমাদের কাছে অত্যন্ত আনন্দের। পুরস্কার প্রদানের দিন সশরীরে আমি বা আমার দাদা উপস্থিত থাকতে পারব না। আমাদের পরিবারের হয়ে সেদিন বাবা মায়ের নামাঙ্কিত সম্মাননা তুলে দেবে আমার আর এক দাদা অভ্রোজ্যোতি (অলক) গুহ ও আমার পরিবারের আর এক সদস্য দেবব্রত (পুটন) ঘোষ। 

রাণার এগিয়ে চলুক আরও অনেক দিন...তার চলা যেন শেষ না হয় কখনও....


Monday, December 12, 2022

 ওয়েফার 

শৌভিক রায় 


স্টেশনারি শপটা খোলা দেখে একটু আশ্বস্ত হলাম। যাক, অন্তত কিছু পাওয়া যাবে!

রাত আড়াইটার ব্যাঙ্গালোর কেম্পেগোড়া এয়ারপোর্ট ঘুমিয়ে আছে। আক্ষরিক অর্থেই। চারদিকে হরেক কিসিমের নাক ডাকার আওয়াজ। ডেক চেয়ার বা সোফা যেগুলি আছে সেগুলি আমরা পৌঁছোবার বহু আগেই দখল হয়ে গেছে। স্টিলের যে চেয়ারে বসে আছি, সেটা যথেষ্ট বড়। কিন্তু এত স্লিপারি যে একভাবে বসা যাচ্ছে না। দুই একবার যা একটু চোখ লাগল, তো পিছলে মাটিতে পড়বার অবস্থা! ধুত্তেরি বলে উঠে পড়ে আশেপাশের যত পোস্টার পড়ে ফেললাম। অবশ্য যেগুলি ইংরেজিতে, সেগুলিই। কানাড়া পড়ি তার সাধ্য কোথায়! চারদিকে সাঁটানো নির্দেশ ও অন্য যা আছে মোটামুটি সবই মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু তবু ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে না। এদিকে পেটে ছুঁচো ডন বৈঠক দিচ্ছে! দেবে না-ই বা কেন? খেয়েছি তো সেই রাত নয়টায়। আমাদের ফ্লাইট ছাড়বে ভোর সাড়ে চারটায়। বাগডোগরা নামব সকাল সাড়ে সাতটায়। অর্থাৎ আরও পাঁচ ঘন্টা পরে। এর মধ্যে পেটে কিছু না গেলে মরণদশা!

আসলে আমরা ফিরছি হায়দ্রাবাদ থেকে। তিনদিন আগে হায়দ্রাবাদের গাছিবাউলির খানদানি রেস্টুরেন্ট নবাবে বসে বিরিয়ানি খেতে খেতে ভিরমি খাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। হায়দ্রাবাদ-বাগডোগরা টিকিট দেখাচ্ছে জনপ্রতি সাড়ে বারো হাজার টাকা! অর্থাৎ দুজনের পঁচিশ হাজার। বাগডোগরা থেকে কোচবিহার পৌঁছতে ভাড়ার গাড়িতে অন্তত চার হাজার। এয়ারপোর্টে পৌঁছনো, খাওয়া ইত্যাদি মিলে আরও এক হাজার এদিক ওদিক করে চলে যাবে। তাহলে হল গিয়ে তিরিশ হাজার। আমাদের পক্ষে এটা একটু নয়, অনেকটাই বাড়াবাড়ি। এদিকে ট্রেনের টিকিট নেই। কী মুশকিল! হায়দ্রাবাদি সুস্বাদু বিরিয়ানি ততক্ষণে অসহ্য মনে হচ্ছে।

যাহোক অনেক খুঁজে-পেতে সস্তার টিকিট পেলাম। দুজনে মিলে হায়দ্রাবাদ-বাগডোগরা সাড়ে সাত হাজার। হায়দ্রাবাদ থেকে রাত একটা পনেরোতে ফ্লাইট ছেড়ে পৌনে দুটোয় ব্যাঙ্গালোরে নামাবে। সেখানে কিছুক্ষণ লে ওভার। তারপর ভোরে আবার আর এক ফ্লাইট। সব দিক থেকে এটাই ভাল। পয়সা কম। শুধু একটা রাত জেগে থাকা। কুছ পরোয়া নেই।পঁচিশ থেকে সাড়ে সাত! আমার তখন সাতোয়া আসমান ছোঁয়ার আনন্দ।

সন্তোষ নাইডুর গাড়িতে সারাদিন হায়দ্রাবাদে চক্কর কেটে, প্যারাডাইসের বিরিয়ানি খেয়ে এয়ারপোর্টে ঢুকে গেছিলাম আটটার সময়। এয়ার এশিয়ার কাউন্টারের সুবেশ ছেলেটি ব্যাগেজ নিতে নিতে স্মার্ট ইংরেজিতে বলল, `ইউ সিম টু এক্সসাইটেড টু ফ্লাই। ইটস অনলি এইট নাও....` মুখে হ্যা হ্যা করে হাসলেও, মনে মনে বললাম, বাপু হে তুমি কী বুঝবে! টাকা আকাশ, আকাশ টাকা! 

আটটা থেকে বসে থাকতে থাকতে হায়দ্রাবাদ এয়ারপোর্টের অলিগলি মায় ভাঙাচোরা যখন প্রায় মুখস্থ হয়ে এসেছে, তখন আমাদের বসিয়ে দিল প্লেনে। যার ছাড়বার কথা রাত সওয়া একটায়, তিনি আকাশে উঠে পড়লেন পৌনে একটায়। ব্যাঙ্গালোরে নামলেন আধা ঘন্টা পর। ট্রান্সফার গেট দিয়ে ঢুকে, আবার সিকিউরিটি চেক করে বসতে না বসতে খিদে পেয়ে গেল। খানিক সহ্য করে আর স্লিপি চেয়ারের সঙ্গে পাঙ্গা লড়ে শেষটায় গুটিগুটি পায়ে ঢুকলাম ওই শপে (এয়ারপোর্টের দোকানগুলোকে দোকান বললে নিজেকে কেমন একটা ইয়ে লাগে)। 

অনেক খুঁজে দেখলাম খাবার বলতে ক্যাডবেরির মাঝারি প্যাকেট আর ওয়েফার। উপায় নেই। পেটের আগুন মেটাতে হবে। আর গিন্নিকেও একটু চমক দেওয়া দরকার। সর্বক্ষণ অভিযোগ, আমি নাকি সেকেলে হয়ে রইলাম। এসব হাল ফ্যাশনের ব্যাপার-স্যাপার বুঝিনা। তাই বেশ কায়দা করে দুটো ওয়েফার আর একটা ক্যাডবেরির প্যাকেট তুলে দিলাম ঘুমে ঢুলতে থাকা শপ-বয়কে (শপ-বয়ই তো? নাকি কর্মচারি?)। 

ওদিকে ব্যাংকের থেকে ক্রেডিট কার্ড ধরিয়ে দিয়েছে বহু আগেই। তারা মাঝে মাঝে ফোন করে আমাকে বেশ উৎসাহিত করে। আমি নাকি ওদের প্রিমিয়াম কাস্টমার। আমার ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার দারুন হচ্ছে ইত্যাদি। তাই আজকাল বাইরে গেলে পেমেন্ট করতে হলে ওটাই এগিয়ে দিই। সঙ্গে গলাটা একটু খেলিয়ে উচ্চারণ করি `ওয়াই ফাই কানেক্টেড`। এখনও সেটাই করলাম। পকেটে মোবাইল ফোনের ভাইব্রেশনে টের পেলাম টাকা খরচের মেসেজ চলে এলো। বিল পেপারের দিকে নজর না দিয়ে খাবার নিয়ে বেরিয়ে এলাম।
 
একটা ওয়েফার মুখে দিয়ে গিন্নি বলল, 
- কত নিলো গো সব মিলে?
- কত আর হবে! দেখিনি। খাও....
গিন্নি আর জানতে চাইল না। কিন্তু নিজেরই কৌতূহল হল দেখি তো কত খরচ হল। 

পকেট থেকে ফোন বের করে মেসেজ দেখে চক্ষু চড়কগাছ। ভুল মেসেজ না তো? বিল পেপার বের করলাম তাড়াতাড়ি। না। একই। এদিক ওদিক হবেই বা কেন! স্ক্যানার দিয়ে বিল করেছে। ঠিকই আছে। দুটো ওয়েফার আর একটা ক্যাডবেরি চকোলেট নয়শো টাকা! কী কাণ্ড!
 
অর্ধেক wafer হাতে ধরে তাকিয়ে রইলাম অন্ধকার runway-এর দিকে। wafer তখন far away মনে হচ্ছে। 

গিন্নি আবার প্রশ্ন করল, 
- দেখলে কত পড়ল সব মিলে?
যথাসম্ভব গলা নিচু করে উত্তর দিলাম,
- নব্বই টাকা। 

(আজ রায় ব্রাদার্স থেকে ইউনিবিকের দুটো ওয়েফার কিনেছি। ভয়ে দাম দেখিনি। মালিক রায়দা গোমড়া মুখে বললেন, 'এসব যে আপনারা কী খান! মারি বিস্কুটের ওপর কিছু হয় নাকি!' বললাম, `ঠিক, ঠিক। ওই একটু নিলাম আর কি। আগে একবার খেয়েছিলাম। রাতের বেলায় তো। স্বাদ বুঝিনি। এবার দিনে খেয়ে দেখব।`)      

(বোকামির এককাল) 

 

Saturday, December 10, 2022





শতবর্ষে কড়া নাড়ছে ড্রামাটিক হল
শৌভিক রায়

সাবেক জলপাইগুড়ি জেলার প্রথম মহকুমা ফালাকাটা উত্তরবঙ্গের একটি প্রাচীন ও অত্যন্ত পরিচিত জনপদ। কোনো এক সময় ভুটানের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, কবে কিভাবে এই জনপদটি ইংরেজদের হাতে আসে তা নিয়ে প্রামাণ্য কোনো ইতিহাস নেই। তবে ফালাকাটার দখল নিয়ে কোচবিহার ও ভুটানের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব লেগে থাকত সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।  ১৮৬৯ সালে ফালাকাটাকে মহকুমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইংরেজরা এই জনপদের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছিল, যদিও বর্ষায় ভয়ঙ্কর তিস্তা-জলঢাকা ও তোর্ষার মাঝে অবস্থিত এই জায়গাটি থেকে জেলার অন্যত্র মজুদ থাকা সেনাবাহিনীর রসদ, ওষুধপত্র ইত্যাদি যোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য ছিল বলে চার-পাঁচ বছরের মধ্যে মহকুমা বক্সাতে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু ফালাকাটার কৌলিন্য বা গুরুত্ব তাতে কমে নি। কেননা নির্জন ও প্রায় জনমানবহীন ডুয়ার্সের যে জায়গাগুলি  থেকে কিছু পরিমান খাজনা আদায় করা যেত, ফালাকাটা ছিল তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানে। ফলে এখানে তৈরি হয়েছিল এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ তহশীলখানা। সে সময় ফালাকাটার পরিচয় ছিল যে, ফালাকাটা মানে 'তহশীল অফিসের ঘড়ি, বংশীধরের ভুঁড়ি আর শিরীষ বসুর দাড়ি'। 

প্রথম থেকেই ফালাকাটা ছিল সংস্কৃতি-মনস্ক। যে সময় ডুয়ার্সের বিভিন্ন জনপদ সেভাবে গড়ে ওঠে নি, তখন থেকেই ফালাকাটা কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পরিচয় দিয়ে এসেছে। আর সেই পরিচয়ের ইতিহাস ধরা রয়েছে ফালাকাটার ড্রামাটিক হলে। ১৯২৩ সালে ফালাকাটায় প্রতিষ্ঠিত হয় হলটি। তখনকার ফালাকাটার উত্তরদিকে, তহশীল অফিসের কাছে, খাসমহল ময়দানের পাশে থাকা ড্রামাটিক হল নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তখনকার তহশীলদার স্বয়ং। সঙ্গে ছিলেন জোতদার ফ্যারড ও ফালাকাটার সে সময়কার বিশিষ্ট মানুষেরা। ড্রামাটিক হলের উদ্যোগে ফালাকাটার বুকে ১৯২৪ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হয় 'দেবলা দেবী` নাটকটি। একটানা ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত ড্রামাটিক হলের উদ্যোগে আলিবাবা, বিল্বমঙ্গল, কৃপণের ধন, মেবার পতন, শাহজাহান, সিরাজদৌল্লা, বঙ্গে বর্গী, সীতা সরমা, হরিশচন্দ্র, চাঁদের মেয়ে ইত্যাদি নাটকের সফল মঞ্চায়ন ঘটে। বংশীধর দোবে, হরকাচাঁদ মালচাঁদ ভাদানি, শিরীষ বসু, কুঞ্জবিহারী মুখোটি, দেবেন্দ্রনাথ নন্দী, আব্দুল শোভান, দুর্গামোহন গোপ, তালুক পাহাড়, ধনীরাম  কার্যী, ধনেশ্বর বর্মন, কাজী নবাব আলী প্রমুখেরা ছিলেন ড্রামাটিক হলের প্রথম পর্বের কুশীলবেরা। ড্রামাটিক হলের যাত্রাশুরুর দিন থেকে সেদিনের বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও বর্ণের মানুষেরা একটা ব্যাপার কিন্তু প্রমান করেছিলেন যে, শিল্পের কোনো জাত বা ভাষা হয় না। শিল্প শাশ্বত মাধুর্য। 

ড্রামাটিক হলের ইতিহাসে দ্বিতীয় প্রজন্ম হিসেবে যোগ দিলেন কার্তিক মুখোটি, মানিক বোস, ডঃ রমণী দাস, প্রতুল (গাজী) ঘোষ, সুধীর বোস, গেদু মিয়া, পচা মিয়া, রুহিদাস সাহা, অধীর গুপ্তভায়া প্রমুখেরা। কিন্তু ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও টালমাটাল। ফালাকাটায মিত্র শক্তির পূর্ব-এশীয় রণাঙ্গনের সেনা- স্থাপিত হয়েছে এবং কাকতালীয়ভাবে সেটি ড্রামাটিক হলের্ একদম সামনে। ১৯৪৪ সালে মন্মথ রায়ের 'কারাগার` মঞ্চস্থ হয়ে বাঁধা হয়ে গেল ড্রামাটিক হলের নাট্য-প্রযোজনা। কেননা বিশ্বযুদ্ধের ভ্রুকুটির মধ্যে নাট্য প্রযোজনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে কর নি ড্রামাটিক হল। বিশ্বযুদ্ধ শেষে মার্কিন সেনাছাউনি পরিত্যক্ত হলে, সেখানে ১৯৪৭ সালে গড়ে উঠল 'সুভাষ পাঠাগার`, যার অবস্থান আজও ড্রামাটিক হলের ঠিক সামনে। এই প্রসঙ্গে বারোয়ারি দুর্গামন্দিরটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ড্রামাটিক হল ও সুভাষ পাঠাগার লাগোয়া এই মন্দিরটির শতবর্ষ-প্রাচীন। ফালাকাটার বহু ইতিহাসের নীরব সাক্ষী সে। 

বছর দুই-তিনেক বন্ধ থাকবার পর ১৯৪৭ থেকে আবার শুরু হল ড্রামাটিক হলের পথ চলা শুরু হয়। এইসময় পাখি ঘোষ, কানু চন্দ, সাধন নন্দী, সত্য নন্দী, অমর চৌধুরী, বিনায়ক দেবের মতো বিশিষ্ট অভিনেতা ও পরিচালকেরা ড্রামাটিক হলে তাঁদের প্রতিভা তুলে ধরেন। তখনও অবধি কিন্তু ড্রামাটিক হলের নাট্য জগতে মহিলাদের প্রবেশ ঘটে নি। পুরুষেরাই স্ত্রী-চরিত্রে অভিনয় করছেন। আর সেই পুরুষদের মধ্যে অপরেশ ভৌমিক, রমেন চক্রবর্তী, নারায়ণ সরকার, ব্যোমকেশ চক্রবর্তীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৯ অবধি ড্রামাটিক হলে নেতাজি নাট্য সংস্থা, নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতি ফালাকাটা শাখা 'পথের শেষে', 'নন্দকুমার', 'মানুষ', 'বর্ধমানের বর, বরিশালের কনে' ইত্যাদি মঞ্চস্থ হয়। এদের মধ্যে  'পথের শেষে' ছিল ফালাকাটার বুকে প্রথম সামাজিক পূর্ণাঙ্গ নাটক। 

আনুমানিক ১৯৫৫/৫৬ সালে ড্রামাটিক হলের একটি পরিবর্তন আসে। ফালাকাটায় সিনেমা শিল্পের প্রসারে উদ্যোগী হয়ে মনমোহন মজুমদার, প্রতুল (গাজী) ঘোষ, লক্ষণ ঘোষ প্রমুখেরা হলটিকে ভাড়া নেন। নাটকের পাশাপাশি চলে ছায়াছবির প্রদর্শন। মনমোহন মজুমদারেরা সেসময় চা-বাগান থেকে একটি জেনারেটর কিনতে সক্ষম হন। অন্যান্য যন্ত্রপাতিও আনা হয়।  কিন্তু যৌথ উদ্যোগের এই ব্যবসা বেশিদিন টেকে নি। তাই ১৯৫৭ সালে আলিপুরদুয়ারের অমর-গৌরী আয়ুর্বেদিক ঔষধালয়ের মালিক সারদা সেনশর্মাকে লিজ হিসেবে ড্রামাটিক হল লিজ হিসেবে দেওয়া হয়। নিজের কন্যা গৌরীর নামে 'সারদা কবিরাজ` হলের নাম দেন গৌরী টকিজ। শুরু হয় ড্রামাটিক হলের এক নতুন অধ্যায়। এখনো অবধি প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে গৌরী টকিজে প্রথম প্রদর্শিত ছবিটির নাম ছিল 'ওমকারের জয়যাত্রা'। ড্রামাটিক হলের মালিকানা সাময়িকভাবে অন্য হাতে চলে গেলেও প্রতুল (গাজী) ঘোষকে ম্যানেজার নিযুক্ত করা হয়েছিল যাতে ফালাকাটা বা ড্রামাটিক হলের নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব থাকে এবং অপারেটরের দায়িত্ব পালন করতে পারেন নাট্যপ্রাণ  হরিপদ বসু। (চলবে)






ড্রামাটিক হলের সূত্র ধরেই এল মুক্তমঞ্চ
শৌভিক রায়

 ১৯৬০ সালের ৯ই মে ড্রামাটিক হলে 'চিরকুমার সভা` নাটকে আরতি ঘোষের অভিনয় ছিল ফালাকাটার মঞ্চে প্রথম কোনো মহিলার আবির্ভাব। এরপর অবশ্য অঞ্জলি গুহমজুমদার, গৌরী দত্ত, মীরা বোস, ডলি রায়, হেনা দেব প্রমুখেরা নিয়মিত অভিনয়ে আসেন। ছায়াছবি প্রদর্শনের পাশাপাশি ততদিনে নানা প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠানের জন্যও ড্রামাটিক হলকে বেছে নেওয়া হয়েছে। আর গৌরী টকিজে প্রদর্শিত হয়েছে বিখ্যাত সব ছবি।    

উত্তরের সমৃদ্ধ জনপদ ফালাকাটার সংস্কৃতি চর্চায় ড্রামাটিক হল দীর্ঘদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।পাশাপাশি একটি বিরাট অঞ্চলের বিনোদনের একমাত্র জায়গা ছিল ড্রামাটিক হল যা অন্যসময় নাম পালটে গৌরী টকিজ নামে ছায়াছবি প্রদর্শন করত। সেসময় গৌরী টকিজ এতটাই বিখ্যাত ছিল যে, ফালাকাটার আশেপাশের এলাকা তো বটেই এমনকি শিলবাড়িহাট, মাদারিহাট, বীরপাড়া, গয়েরকাটা, ধূপগুড়ি ইত্যাদি জায়গা থেকেও মানুষজন গৌরী টকিজে আসতেন। গৌরী টকিজ তথা ড্রামাটিক হলের সোনার দিন কিন্তু বহুদিন একইরকম ছিল। নাট্যমঞ্চে ততদিনে আধুনিকতার ছোঁওয়া লেগেছে। আলো ও আবহের ব্যাপারে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। ১৯৬০-এর পর, পূর্ণাঙ্গ নাটকের ক্ষেত্রে ড্রামাটিক হল 'রামের সুমতি', 'রমা', পাহাড়ি ফুল', বৈকুন্ঠের খাতা' ইত্যাদির মতো যুগান্তকারী সব প্রযোজনা মঞ্চস্থ করেছে। পাশাপাশি নাট্য চর্চার জগতে ড্রামাটিক হলকে কেন্দ্র করে আর একটি পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছিল। এই সময়ে ফালাকাটায় জন্ম নিয়েছে বেশ কিছু নাট্যদল, যাদের মধ্যে হিলস্টেশন সংস্থা, উন্মাদ সংঘ, মুক্তিপাড়া নাট্যসংস্থা ইত্যাদির কথা বলা যায়। কিন্তু কালের যাত্রায় এইসব নাট্যসংস্থা বিলীন হয়ে গেলেও আছে রেণেসাঁ, যুবশিল্পী ইত্যাদি দলগুলি আজও রয়েছে। পরবর্তীতে জন্ম নেয় রাণার, খেয়ালি, অমর্ষি, বিদ্রোহী, কোরাস ইত্যাদি নাট্যদলগুলি। এদের অনেকেই সাড়া জাগিয়ে শুরু করলেও তাদের অস্তিত্ব আজ আর নেই। নাটকের দল চালাবার খরচ জোগাড় করতে না পারা, এই নাট্যদলগুলির প্রধান কুশীলবেরা কর্মজীবনে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়া, টিভি-ভিডিওর সর্বগ্রাসী আগ্রাসন হয়ত এই দলগুলির অবলুপ্তির জন্য দায়ী। আবার এটাও ঠিক যে, বিভিন্ন প্রতিকূলতা নিয়েও রাণারের মতো নাট্যদল চার দশকের বেশি সময় ধরে এখনও রাজ্য নাট্য প্রতিযোগিতা আয়োজন করে চলেছে।

যাহোক, ১৯৬৫-১৯৭০ থেকেই নাটকের পরিভাষা বদলে যাচ্ছিল। ড্রামাটিক হলের নাটকেরও এক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। নাটক যে শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য নয়, সেকথা বুঝতে সময় নেন ড্রামাটিক হলকে ঘিরে থাকা ফালাকাটার সংস্কৃতি কর্মীরা। দর্শকরাও বোধহয় মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাই বিভিন্ন নাট্যদল একের পর এক অন্যধারার নাটকের জন্ম দিয়েছিল।  

ড্রামাটিক হলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ফালাকাটার নাট্য ও সংস্কৃতি চর্চার জগতে এক ঝাঁক অভিনেতা-অভিনেত্রী ও দক্ষ পরিচালকের জন্ম হয়। এদের মধ্যে ফালাকাটার প্রথম মহিলা অভিনেত্রী হিসেবে দীপালি দে দিশারী পুরস্কার পান। শিশু অভিনেতা হিসেবে প্রিয়াঙ্কু ঘোষ আশির দশকে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে সাড়া ফেলেছিলেন। ড্রামাটিক হলে নাট্য চর্চা থেকেই ফালাকাটায় ১৯৮০ সালে শুরু হয়েছিল মুক্তমঞ্চ। ড্রামাটিক হলের্ বিপরীতে, আজকের দশমীর ঘাটের কাছে, শিশু সদনের পাশে শুরু হয়েছিল 'ফালাকাটা মুক্তমঞ্চ'। এর আগে উত্তরবঙ্গের একমাত্র শিলিগুড়িতে ১৯৭৯ সালে মুক্তমঞ্চ শুরু হয়। 

সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে ফালাকাটার মুক্তমঞ্চ সেই সময়ের এক সাহসী প্রচেষ্টা। ১৯৯০ সাল অবধি ফালাকাটা মুক্তমঞ্চে বিভিন্ন নাট্যদল লাটক মঞ্চস্থ করেছে। ফালাকাটা মুক্তমঞ্চে যোগ দিয়েছে জটেশ্বরের কিশোর নাট্যসংস্থা, ধূপগুড়ির তরুণ নাট্যসংস্থা, শিলবাড়ীহাটের বলাকা নাট্য গোষ্ঠী, জলপাইগুড়ির শিলালী নাট্যম, কোচবিহারের সংসপ্তক বিভিন্ন সময় যোগ দিয়েছিল। ফালাকাটার মুক্তমঞ্চের এই সাফল্যের পেছনে ড্রামাটিক হলের অবদান কম নয়, কেননা মুক্তমঞ্চের পরিকল্পনা এসেছিল ড্রামাটিক হলের নাট্যচর্চাকে কেন্দ্র করেই। ড্রামাটিক হল কিন্তু ফালাকাটার পাশাপাশি আশেপাশের মানুষদেরকেও উদ্দীপিত করেছিল। 

ফালাকাটার খুব কাছের ভুটানিরঘাট অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলাকা নাট্যসংস্থা, স্বরবর্ণ থিয়েটার ইউনিট। মাদারিহাটে ছিল সবুজ সংঘ। জটেশ্বরের প্রগতি নাট্যসংস্থা, শিলবাড়ীহাটের ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন, মেজবিলের উত্তরণ ইত্যাদি নাট্যদলের পেছনে ছিল ড্রামাটিক হলের প্রভাব। একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সংস্কৃতি চর্চা একটি হলকে ঘিরে - এরকম দৃষ্টান্ত কিন্তু কমই আছে। 

(শেষ)
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Sunday, December 4, 2022


 

আজকের (৪ ডিসেম্বর, ২০২২) উত্তরবঙ্গ সংবাদের 'রংদার রোববার'-এ প্রকাশিত একটি গল্প। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ, কার্যকরী সম্পাদক ও বিভাগীয় সম্পাদককে।

বলরামের পাথর
শৌভিক রায়

বলরামের যখন আট বছর বয়স, তখন সে প্রথম পাথরটাকে দেখে।
আট বছর বয়স দুনিয়াদারি বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে, সেও ছোট্ট জ্বলজ্বলে পাথরটা দেখে বিশেষ কিছু বুঝতে পারেনি। কিন্তু পাড়া প্রতিবেশী, মায় শহর শুদ্ধ সব লোক সেই পাথরটা দেখে দারুণ খুশি। সবাই বলাবলি করছিল, এরকম পাথর তারা এর আগে সারা দেশে কোনোদিন একটাও দেখেনি। পাথরটা একেবারেই অনবদ্য!
বলরাম বড় হচ্ছিল। পাথরটারও আয়তন বাড়ছিল। অবশ্য সেটা বলরাম ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারছিল না। ঘটনাচক্রে বলরামরা ছিল নিজেদের এলাকার জোতদার। প্রচুর জমির মালিক। কিন্তু কী হল কে জানে, একদিন হঠাৎ তারা গরিব হয়ে গেল। বিঘের পর বিঘে তাদেরকে জমি তাদেরকে দিয়ে দিতে হল!
চোখের জল লুকিয়ে বলরামের বাপ-ঠাকুরদা জমির মায়া ছাড়লেন। ব্যাপারটা ভাল না মন্দ হল, সেটা বলরাম ওই বয়সে বুঝতে পারছিল না। তবে তার মনে পড়ছিল নিজের একমাত্র কাকার কথা। কলেজ পড়ুয়া কাকা স্বপ্ন দেখেছিল, একদিন সবাই জমির মালিক হবে। সেই স্বপ্নই তার কাল হয়েছিল। সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল কোথায় কে জানে! কেউ আর কোনোদিন তার খোঁজ পায়নি। কাকার স্বপ্ন সফল হল ভেবে বলরাম একটু খুশি হল।
ছোটকাকার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া বা জমি দিয়ে দেওয়া ইত্যাদি বলরামের ঠাকুরদাকে মানসিকভাবে খানিকটা কাহিল করে দিয়েছিল। তবু তিনি সামলে নিয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন তাদের বাড়ির মুনিশ সুখু মিয়া এলাকার পঞ্চায়েত হয়ে গেল, সেদিন তিনি বড্ড দাগা খেলেন। তার সঙ্গে বসে সুখু মিটিং করবে এটা কিছুতেই মানতে পারলেন না। একটা অস্থির ভাব তাকে ঘিরে ফেলল। ঘরবার করতে করতে তিনি পটাং করে একদিন মরে গেলেন।
ঠাকুরদার মৃত্যুতে বলরাম খানিকটা দুঃখ পেল। বাবার সঙ্গে গিয়ে ফারাক্কায় ঠাকুরদার অস্থি বিসর্জন দিয়ে এলো। জমি নেই। ঠাকুরদা নেই। সংসার কীভাবে চলবে ভাবতে ভাবতে বলরামের বাবা হতাশ হয়ে পড়লেন। কিন্তু কীভাবে যেন সরকারি দপ্তরে একটা ছোটখাট চাকরি জুটিয়ে ফেললেন। ফলে একেবারে গরিব হতে হতে বলরামেরা কোনমতে বেঁচে গেল। সকলে বলাবলি করল, পাথরটার জন্য বলরামের বাবার চাকরি হয়েছে। কথাটা মিথ্যে নয়। বাবা মাঝে মাঝে পাথরটাকে দুধ দিতেন। বলরাম বুঝল সবার কথাই ঠিক।
এসবের মধ্যে পাথরটা বেড়ে চলেছিল। আরও বড় হয়ে উঠছিল। অবশ্য তার সেই ঝকঝকে ভাবটা একটু কমেছিল। বলরাম মাঝে পাথরটাকে মাজাঘষা করবার চেষ্টা করল। কিন্তু লাভ হল না। তাতে অবশ্য বলরামের খুব কিছু গেল এলো না। সে পাথরটাকে যত দেখত, তত তার প্রেমে পড়ত। অবস্থা এমন হয়ে গেল যে, বলরাম কিছুতেই পাথরটাকে ছেড়ে থাকতে পারত না!
বলরামের বাবা কিন্তু ধীরে ধীরে পাথরটাকে অপছন্দ করতে শুরু করেছিলেন। তার মনে হচ্ছিল তার বাবা অর্থাৎ বলরামের ঠাকুদার মৃত্যুর জন্য ওই পাথরটা দায়ী। শুধু তাই নয়, নিজের ছোট ভাইয়ের বাড়িতে না ফেরার কারণও ওই পাথরটা। যদিও পাথরটার জন্য তিনি চাকরি পেয়েছেন, তার সংসার চলছে, তবু কেন জানি তার মনে হচ্ছিল পাথরটার প্রথম দিকের সেই দুর্দান্ত ভাবটা আর নেই।
তিনি এসব বোঝাতেন বলরামকে। কিন্তু বলরাম তখন একবগ্গা। সে পাথরটাকে নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখে চলেছে। তার মনে হচ্ছে, পাথরটা এই এলাকা তো বটেই, ক্রমশ আরও বড় হয়ে ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্র। নিজের বাবাকেও সে এই কথা বলেছিল। বাবা কোনও তর্কে যাননি। কিন্তু সেদিন থেকে যেন বলরামের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার মন বলছিল, বলরাম ঠিক করছে না। কিন্তু তিনি ছাপোষা মানুষ। বলরামের ভেতরের গনগনে আগুন কিংবা নিজের বাপের অহংকারের কোনওটাই তার মধ্যে ছিল না।
তিনি একদম চুপ করে গেলেন। শুধু বলরামের মা-কে জানালেন, সরকারি দপ্তরে তার চাকরি শেষ, তিনি অন্য কোথাও চলে যাবেন। বলরামের মায়ের কাছে তার স্বামী ছিল সব। তাই একদিন বলরাম দেখল, তার বাবা মা বাড়ি ছেড়ে পন্ডিচেরিতে চলে গেলেন। সেখানে অরবিন্দ আশ্রমে বাকি জীবন কাটাবেন। যাওয়ার সময় তারা বলরামকে বলে গেলেন, কোনও কিছুই জীবনে শেষ কথা নয়। বলরাম যেন এটা মনে রাখে। বলরাম কিছু বলতে পারল না। তখন সে টগবগে যুবক। এলাকার লোক তাকে পাথর পূজারি নামে ডাকে।
ইতিমধ্যে পাথরটা আরও বড় হয়েছে। কিন্তু তার আগের সেই উজ্জ্বল ভাবটা নেই। বরং কেমন একটা কালো কালো ভাব। কিন্তু বলরাম এসব কিছুই লক্ষ্য করল না। বরং সে পাথরের গুণগানে ব্যস্ত। বাবা মা চলে যাওয়ার পর এখন সে মুক্তবিহঙ্গ। তার কোনও ভাই-বোন নেই। ফলে পাথরটাকে যারা ভালবাসে, তাদের সঙ্গে মিলে সে এখন নিশ্চিন্তে পাথরটার পুজো করে। এই পুজো করতে গিয়ে যদি কাউকে মারধর বা খুন করতে হয়, তাতেও পিছপা নয় সে। তার একটাই উদ্দেশ্য পাথরটাকে আরও বড় করা। এতটা বড় যে, সবকিছু থাকবে পাথরটার ছায়ায়। ছায়ার রং কালো হোক, বা অন্য কোনও কিছু তাতে তার কিছুই যাবে আসবে না।
এসবের মধ্যে একদিন বলরাম বিয়ে করে নিল। পাথরটাকে ঠিকঠাক পুজো করার জন্য আসলে তার একজন সঙ্গী দরকার ছিল। কিন্তু বিয়ের পর বলরাম বুঝল, সে একটু ভুল করে ফেলেছে। আলেয়া বড্ড সংসারী মেয়ে। সে বলরামকে নিজের বাড়ি বিক্রি করে পাথরের মন্দিরে যেতে দিল না। নিজেও পাথরের পুজো করল না। উল্টে চোখে আঙুল দিয়ে বলরামকে দেখাতে লাগল পাথরটার বিচ্ছিরি চেহারাটা। ওটা যে আসলে একটা জগদ্দল পাথরে পরিণত হয়েছে সেটা আলেয়া বুঝিয়ে দিল।
বলরাম বুঝল। বাড়ির পরিস্থিতি ঠিক হল। কিন্তু পাথরের অন্য পূজারীরা তাকে ব্যঙ্গ করতে শুরু করল। বলরামের বলতে ইচ্ছে হল, পাথরটার নোংরা চেহারার কথা। সেটা যে সব গুণ আর ঔজ্বল্য হারিয়ে একটা বোঝায় পরিণত হয়েছে সেটাও সে বলতে চাইল। কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। কেননা সেই পূজারিরা ততদিনে কেষ্টবিষ্টু হয়ে উঠেছে। তারাই এখন পাথরের নতুন পূজারি। তারা বলরামের কথা শুনবে কেন! পাথরের পুজো করতে করতে তারা সব্বাই গাড়ি-বাড়ি-টাকা করে ফেলেছে। বলরামই বরং কিছু করেনি। এইসব টানাপোড়েনের মধ্যে একদিন আলেয়ার একটি ফুটফুটে ছেলে হল।
আরো কিছুদিন কেটে গেল। পাথরটা একেবারে কালো ঝামার মতো দেখতে হয়ে গেছে। কিন্তু চেহারা তার বিরাট। মাঝখানটা ফুলেফেঁপে প্রায় জয়ঢাক। আগের সেই ঝকঝকে চেহারা হারিয়ে পাথরটা যেন একটা ব্যাং খাওয়া সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে থাকে। আর তার চারপাশে নেচে বেড়ায় নতুন নতুন এমন সব মুখ যাদের একটাই কাজ, পাথরটাকে ভাঙিয়ে শুধু লুট আর লুট। প্রিয়তম পাথরটাকে নিয়ে বলরামের স্বপ্ন এভাবেই শেষ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল, এই পাথরটা যদি এভাবে থেকে যায় তবে সবকিছুই শেষ হয়ে যাবে। আট বছর বয়সে যে পাথরপ্রেম শুরু হয়েছিল তার, তা শেষ হল বিয়াল্লিশ বছরে এসে।
শেষ হল কি? না। আসলে বলরাম অন্য আর একটা পাথরে মজে গেল। এই পাথরটা ওই জগদ্দল কালো পাথরের মতো নয়। বিরাট বিপুল নয়। ছোট্ট। কিন্তু দারুণ ঝকঝকে। বহু লোক এই পাথরটাকে ভালোবাসে। কিন্তু প্রকাশ করে না। পুরোনো কালো পাথরের ভয়ে চুপ করে থাকে। বলরাম আগাগোড়াই ডাকাবুকো। তার ভয়ডর নেই। সে নতুন পাথরের পুজো শুরু করে দিল। কিন্তু তার পুজোতে পুরোনো পাথরের প্রেমিকরা খেপে গেল। তাকে হারামি বলে গালি দিল। প্রবল পেটালো। সে হসপিটালে ভর্তি হল। বেঁচে ফিরল কোনওমতে। আলেয়া কাঁদতে লাগল। তার ছেলে ভয় পেয়ে গেল।
কিন্তু বলরামকে তখন নিশিতে পেয়েছিল। যে পাথরের জন্য সে এতকিছু করেছে এতদিন, সেই পাথরের ওপর সে ভয়ানক রেগে গিয়েছিল। একদিন দলবল জুটিয়ে পুরোনো কালো পাথরটাকে সে ভাঙতে শুরু করল। এতদিনের গেড়ে বসা পাথর। ভাঙা এত সস্তা নাকি! প্রথমটায় সে ভাবতে পারেনি পাথরটাকে আদৌ ভাঙতে পারবে। কিন্তু একটু চেষ্টা করে বলরাম টের পেলো, পাথরটা আসলে একেবারেই খোকলা। খানিকটা ভাঙবার পর সেটা এমনভাবে ভেঙে পড়ল যে কল্পনাই করা যায় না। তাসের ঘরও বোধহয় এভাবে ভাঙে না! বলরাম অবাক হল।
নতুন পাথরের পূজারী হয়ে গেল বলরাম। এই পাথরটা একদম ঝকঝকে। ঝলমলে। পুরোনো পাথরটাকে ভেঙে ফেলার জন্য তার ইনামও জুটল। সবাই তাকে বেশ সম্মান দিল। এমনিতে সে ভালো বলতে পারত। লোককে বোঝাতে পারত। লোকে তার কথা শুনতও। ফলে নতুন পাথরের পূজারীরা তাকে মাথায় তুলে নিল। আলেয়াও খুব খুশি তার ওপর। একদিন যারা তাকে মেরেছিল, তারাও বলরামের সঙ্গে মিশে গেল। নেতা বলে তাকে মেনে নিল।
কিন্তু বলরাম আর অতীতের ভুল করল না। এবার সে নতুন পাথর পুজো করে প্রচুর কিছু লুটে নিল। দেখতে দেখতে তার ভাঙা বাড়ি প্রাসাদোপম হয়ে গেল। স্করপিও, ইনোভা নিয়ে সে চারটে গাড়ি কিনে ফেলল। তার ব্যাংক ব্যালান্স হু হু করে বেড়ে উঠল। এখানে সেখানে সে নিজের আর আলেয়ার নাম জমি কিনতে লাগল। নিজের ছেলের নামেও কিনতে চাইল। কিন্তু ছেলে রাজি হল না। বরং সে বলরামকে নতুন পাথরটার ঝলমলে রূপের পেছনে লুকিয়ে থাকা কালো দাগগুলো প্রায় প্রতিদিন দেখাতে লাগল। বলরাম দেখেও দেখতে চাইল না। সে চোখ বন্ধ করে রইল। ছেলে যখন বলল, নতুন পাথরটাকে এত দ্রুত কালো হতে তার বাবা যে এভাবে সাহায্য করবে এটা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। এই কথা শুনে বলরাম ভয়ানক রেগে গেল।
সে নিজের ছেলে বিপ্লবকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। আলেয়া কান্নাকাটি করল প্রথমটায়। কিন্তু কয়েক কোটির সোনার গয়না পেয়ে তার কান্না একদিন থেমে গেল। ছেলের জন্য মাঝে মাঝে বলরামের মন খারাপ হত। তখন সে একটু মদ্যপান করত। মদের নেশায় তার মনে হত, বিপ্লবের সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া তার সেই কাকার মুখের বড্ড মিল।
এরকম একদিন মন খারাপের রাতে বলরাম পাথরটাকে দেখতে গেল। সেটাকে দেখে তার মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা। আগের পাথরের চাইতে এটা কয়েকগুণ বেশি কালো। বেঢপ। মাঝখানটা ফুলেফেঁপে জয়ঢাককেও ছাড়িয়ে গেছে। ঝকঝকে চেহারা হারিয়ে এই পাথরটাও একটা ব্যাঙ খাওয়া সাপের মতো কুন্ডলি পাকিয়ে বসে আছে আর তার ঘন কালো ছায়া সবকিছুকে ঢেকে দিয়েছে। বলরাম হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে গেল। তার সারা শরীর কাঁপতে লাগল। বুকে ব্যথা শুরু হল। কোনোমতে বুক চেপে আলেয়াকে ডাকতে গিয়ে সে আর কিছু বলতে পারল না। তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
বলরামের মৃত্যুর খবর পেয়ে বিপ্লব এলো। চুপচাপ দাহকাজ শেষ করল। তারপর মায়ের কাছে বিদায় নিল। বলরামের বউ তাকে আটকাবার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। তার উপায় নেই। চাইলেও সে মা`কে সঙ্গ দিতে পারবে না। তার বন্ধুরা সব রাস্তায় বসে আছে। নোংরা কুৎসিত কালো জগদ্দল পাথরটাকে সবাই ভাঙতে চাইছে। তাকে বন্ধুদের পাশে থাকতে হবে। হাত লাগাতে হবে ভাঙার কাজে।
মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে বিপ্লব এগিয়ে চলল। বিপ্লবের বান্ধবী আশাও চলল তার পাশে পাশে। সবাইকে অবাক ক`রে আলেয়াও তাদের সঙ্গ ধরল।