সাহিত্যে দাদাগিরি: একটি ভাবনা
শৌভিক রায়
'দাদাগিরি' শব্দবন্ধে কেমন একটা নৈঞর্থক ভাবনা আছে। শব্দবন্ধটির উৎপত্তি আদৌ বাংলায় কিনা সেই বিষয়েও প্রশ্ন জাগে। তবে ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলির লর্ডসের ড্রেসিং রুমে জামা খুলে ঘোরানোর মধ্যে কোট আনকোট যে দাদাগিরি দেখা গেছিল সেটি অবশ্য যথেষ্ট সদর্থকভাবেই নিয়েছিল আপামর ভারতবাসী।
আসলে যে কোনও বিষয়েরই ভাল মন্দ দুটি দিক থাকে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাহিত্যে দাদাগিরির মতো বিষয় এলে, একটু থমকাতে হয়। প্রশ্ন জাগে, সাহিত্যে কি দাদাগিরি চলে?
প্রশ্ন যখন হ্যাঁ-বোধক, তাহলে উত্তরটি না হবে। এটা বলা যায়। কিন্তু সব নিয়মেরই ব্যতিক্রম আছে। এক্ষেত্রেও রয়েছে। তাই অস্বীকার করার উপায় নেই। সাহিত্যে দাদাগিরি রয়েছে। আগেও ছিল। এখনও আছে। আগামীতেও থাকবে।
আসলে সমস্যা দাদাগিরি থাকা বা না থাকা নিয়ে নয়। দাদাগিরির চেহারাটা আসলে ঠিক কী হবে প্রশ্ন সেটাই। লর্ডসে সৌরভের শার্ট খুলে ঘোরানোর মতো নাকি পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে বেপাড়ার ছেলেকে হুমকি দেওয়ার মতো?
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলা সাহিত্যে দুটিই রয়েছে। গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে ব্যাপারটি বোঝা যাবে। গ্রীক, রোমান, ল্যাটিন, ফরাসি, ইংরেজি, রাশিয়ান ইত্যাদি ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ বলে পরিচিত। এদের বয়সও অনেক, অন্তত বাংলার তুলনায়। এইসব ভাষায় সৃষ্ট এক একটি লেখা মাস্টারপিস হিসেবেই পরিচিত। তুলনায় বাংলা অনেক নবীন। চর্যাপদকে বাংলার প্রথম সৃষ্টি মনে করলেও, বয়সের তুলনায় উল্লিখিত ভাষাগুলি থেকে সে নবীন। কিন্তু বাংলা সাহিত্য কোনও অংশে এদের চাইতে পিছিয়ে নেই। বাংলার নব জাগরণের পর থেকে এত দ্রুত এই ভাষার বিকাশ ঘটেছে এবং এত সংখ্যক সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে যে তা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথের আগে থেকেই কিন্তু এই ধারা শুরু হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে মাইকেল মধুসূদনের কথা উল্লেখ করব। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, মাইকেলের সঠিক মূল্যায়ন আজও হয়নি।
এই পরম্পরাকে বজায় রেখে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে যেভাবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করলেন নিঃসন্দেহে সেটি দাদাগিরি। অবশ্যই সদর্থক অর্থে। এই দাদাগিরি যদি সেদিন না হত, তবে বাংলা সাহিত্যকে কে চিনত? বাঙালিকেই বা ক'জন জানত? এই সদর্থক দাদাগিরি চালু রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী সাহিত্যিকরা। তাঁদের নাম উল্লেখ করে তালিকা আর ভারী করছি না। তবে এই প্রসঙ্গে কিছু বাঙালি সাহিত্যিকের ইংরেজিতে লিখে বিদেশি ভাষার ওপর দাদাগিরি করার কথাটি উল্লেখ না করলেই নয়। এই তালিকায় নীরদ সি চৌধুরী থেকে শুরু করে অমিতাভ ঘোষ, উপমন্যু চট্টোপাধ্যায় প্রমুখেরা থাকবেন। বিদেশি ভাষার ওপর তাঁদের এই দাদাগিরিকে স্বাগত না জানালে অবিচার করা হবে। আর এরা আদ্যন্ত বাঙালি। শুধু প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বাংলাকে। নীরদ সি চৌধুরীর মতো অনেকে আবার দুই ভাষাতেই সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁদের এই দাদাগিরি আখেরে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
মুশকিল হল দাদাগিরি যখন খারাপ অর্থে ব্যবহার হয়, তখন সাহিত্য জগতও তাতে প্রভাবিত হয়। অত্যন্ত আফশোষের সঙ্গে এটা বলতে হচ্ছে যে, বর্তমান বাংলা সাহিত্যে এটাই চলছে। সাহিত্য যে নিভৃত এক সাধনার বিষয় সেটা ভুলতে বসেছি আমরা। কী লিখছি বা চর্চা করছি সেই ব্যাপারটিকে পেছনে ফেলে, কোথায় লিখছি বিষয়টি বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর এই 'কোথায়' প্রসঙ্গে সৃষ্টি হচ্ছে দাদাগিরির নতুন চেহারা। সেই চেহারা অত্যন্ত ঘৃণ্য। সমস্যা হল সেই ঘৃণ্য চেহারাকে ঘিরে গড়ে উঠছে এক একটি বৃত্ত। সেই বৃত্তের বাইরে গেলে নতুন লিখতে আসা লেখকের ওপর নেমে আসছে এমন এক খাঁড়া যা সর্ব অর্থে ভয়াবহ। সেটি মেনে চলা সবার পক্ষে সম্ভব নয় বলে অচিরে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিভাশালী নবীন লেখক।
এই দাদারা আসলে সাহিত্য জগতের দুর্বৃত্ত। যে কোনও উপায়ে সাহিত্য জগতের সব কিছু কুক্ষিগত করে রেখে, আলোর বৃত্তে থাকাই তাদের অভ্যেস। সকলে তাদের পদলেহন করুক এটাই তাদের উদ্দেশ্য। আর তার জন্য সবরকম আপোষে তারা তৈরি। উল্টোদিকে যশপ্রার্থী লেখক, নবীন বা প্রবীণ নির্বিশেষে, সেই দাদাগিরিকে পোক্ত করছে সেই আপোষে সাড়া দিয়ে। এই দাদাদের হাত ধরে খুব স্বল্প দিনে তারা তথাকথিত সাফল্যের সিঁড়ি দেখলেও, আদতে ঢুকতে পারছে না সাহিত্যের গভীরে। লেখার নামে যা সৃষ্টি করছে তারা তা কেবল আত্মরতি। এই আত্মরতি বৃহত্তর সমাজের ঠিক কী আর কতটা কাজে আসে তা আমার জানা নেই। সাহিত্য যে সমাজের দর্পণ সেটা ভুলে আত্মরতিতে মেতে ওঠা এই লেখককূল বুঝতে পারেন না, প্রকারান্তরে তারা আসলে ধূর্ত দাদাগিরির শিকার।
মুশকিল হল, নৈঞর্থক দাদাগিরিতে বিশ্বাসী দাদা বা ভাই কেউই বোঝেন না, তাদের দাদাগিরির ফলে আখেরে ক্ষতি হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের। আর আজ যেহেতু এদের সংখ্যা বেশি তাই সেই ক্ষতি হয়ে চলেছে বিরাট আকারে ও দ্রুত গতিতে। এভাবে চললে, যে বাংলা সাহিত্য একদিন বিশ্বে সম্ভ্রম আদায় করেছিল, তা ধূলিসাৎ হবে। ভাবতে কষ্ট হয়, প্রকৃত সৃজনের দাদাগিরির হাত ধরে আসা সেই সম্মান নষ্ট হচ্ছে আপোষকামী ধান্দাবাজ দাদাগিরির জন্য!

No comments:
Post a Comment