Saturday, December 10, 2022





শতবর্ষে কড়া নাড়ছে ড্রামাটিক হল
শৌভিক রায়

সাবেক জলপাইগুড়ি জেলার প্রথম মহকুমা ফালাকাটা উত্তরবঙ্গের একটি প্রাচীন ও অত্যন্ত পরিচিত জনপদ। কোনো এক সময় ভুটানের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, কবে কিভাবে এই জনপদটি ইংরেজদের হাতে আসে তা নিয়ে প্রামাণ্য কোনো ইতিহাস নেই। তবে ফালাকাটার দখল নিয়ে কোচবিহার ও ভুটানের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব লেগে থাকত সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।  ১৮৬৯ সালে ফালাকাটাকে মহকুমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইংরেজরা এই জনপদের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছিল, যদিও বর্ষায় ভয়ঙ্কর তিস্তা-জলঢাকা ও তোর্ষার মাঝে অবস্থিত এই জায়গাটি থেকে জেলার অন্যত্র মজুদ থাকা সেনাবাহিনীর রসদ, ওষুধপত্র ইত্যাদি যোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য ছিল বলে চার-পাঁচ বছরের মধ্যে মহকুমা বক্সাতে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু ফালাকাটার কৌলিন্য বা গুরুত্ব তাতে কমে নি। কেননা নির্জন ও প্রায় জনমানবহীন ডুয়ার্সের যে জায়গাগুলি  থেকে কিছু পরিমান খাজনা আদায় করা যেত, ফালাকাটা ছিল তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানে। ফলে এখানে তৈরি হয়েছিল এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ তহশীলখানা। সে সময় ফালাকাটার পরিচয় ছিল যে, ফালাকাটা মানে 'তহশীল অফিসের ঘড়ি, বংশীধরের ভুঁড়ি আর শিরীষ বসুর দাড়ি'। 

প্রথম থেকেই ফালাকাটা ছিল সংস্কৃতি-মনস্ক। যে সময় ডুয়ার্সের বিভিন্ন জনপদ সেভাবে গড়ে ওঠে নি, তখন থেকেই ফালাকাটা কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পরিচয় দিয়ে এসেছে। আর সেই পরিচয়ের ইতিহাস ধরা রয়েছে ফালাকাটার ড্রামাটিক হলে। ১৯২৩ সালে ফালাকাটায় প্রতিষ্ঠিত হয় হলটি। তখনকার ফালাকাটার উত্তরদিকে, তহশীল অফিসের কাছে, খাসমহল ময়দানের পাশে থাকা ড্রামাটিক হল নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তখনকার তহশীলদার স্বয়ং। সঙ্গে ছিলেন জোতদার ফ্যারড ও ফালাকাটার সে সময়কার বিশিষ্ট মানুষেরা। ড্রামাটিক হলের উদ্যোগে ফালাকাটার বুকে ১৯২৪ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হয় 'দেবলা দেবী` নাটকটি। একটানা ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত ড্রামাটিক হলের উদ্যোগে আলিবাবা, বিল্বমঙ্গল, কৃপণের ধন, মেবার পতন, শাহজাহান, সিরাজদৌল্লা, বঙ্গে বর্গী, সীতা সরমা, হরিশচন্দ্র, চাঁদের মেয়ে ইত্যাদি নাটকের সফল মঞ্চায়ন ঘটে। বংশীধর দোবে, হরকাচাঁদ মালচাঁদ ভাদানি, শিরীষ বসু, কুঞ্জবিহারী মুখোটি, দেবেন্দ্রনাথ নন্দী, আব্দুল শোভান, দুর্গামোহন গোপ, তালুক পাহাড়, ধনীরাম  কার্যী, ধনেশ্বর বর্মন, কাজী নবাব আলী প্রমুখেরা ছিলেন ড্রামাটিক হলের প্রথম পর্বের কুশীলবেরা। ড্রামাটিক হলের যাত্রাশুরুর দিন থেকে সেদিনের বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও বর্ণের মানুষেরা একটা ব্যাপার কিন্তু প্রমান করেছিলেন যে, শিল্পের কোনো জাত বা ভাষা হয় না। শিল্প শাশ্বত মাধুর্য। 

ড্রামাটিক হলের ইতিহাসে দ্বিতীয় প্রজন্ম হিসেবে যোগ দিলেন কার্তিক মুখোটি, মানিক বোস, ডঃ রমণী দাস, প্রতুল (গাজী) ঘোষ, সুধীর বোস, গেদু মিয়া, পচা মিয়া, রুহিদাস সাহা, অধীর গুপ্তভায়া প্রমুখেরা। কিন্তু ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও টালমাটাল। ফালাকাটায মিত্র শক্তির পূর্ব-এশীয় রণাঙ্গনের সেনা- স্থাপিত হয়েছে এবং কাকতালীয়ভাবে সেটি ড্রামাটিক হলের্ একদম সামনে। ১৯৪৪ সালে মন্মথ রায়ের 'কারাগার` মঞ্চস্থ হয়ে বাঁধা হয়ে গেল ড্রামাটিক হলের নাট্য-প্রযোজনা। কেননা বিশ্বযুদ্ধের ভ্রুকুটির মধ্যে নাট্য প্রযোজনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে কর নি ড্রামাটিক হল। বিশ্বযুদ্ধ শেষে মার্কিন সেনাছাউনি পরিত্যক্ত হলে, সেখানে ১৯৪৭ সালে গড়ে উঠল 'সুভাষ পাঠাগার`, যার অবস্থান আজও ড্রামাটিক হলের ঠিক সামনে। এই প্রসঙ্গে বারোয়ারি দুর্গামন্দিরটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ড্রামাটিক হল ও সুভাষ পাঠাগার লাগোয়া এই মন্দিরটির শতবর্ষ-প্রাচীন। ফালাকাটার বহু ইতিহাসের নীরব সাক্ষী সে। 

বছর দুই-তিনেক বন্ধ থাকবার পর ১৯৪৭ থেকে আবার শুরু হল ড্রামাটিক হলের পথ চলা শুরু হয়। এইসময় পাখি ঘোষ, কানু চন্দ, সাধন নন্দী, সত্য নন্দী, অমর চৌধুরী, বিনায়ক দেবের মতো বিশিষ্ট অভিনেতা ও পরিচালকেরা ড্রামাটিক হলে তাঁদের প্রতিভা তুলে ধরেন। তখনও অবধি কিন্তু ড্রামাটিক হলের নাট্য জগতে মহিলাদের প্রবেশ ঘটে নি। পুরুষেরাই স্ত্রী-চরিত্রে অভিনয় করছেন। আর সেই পুরুষদের মধ্যে অপরেশ ভৌমিক, রমেন চক্রবর্তী, নারায়ণ সরকার, ব্যোমকেশ চক্রবর্তীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৯ অবধি ড্রামাটিক হলে নেতাজি নাট্য সংস্থা, নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতি ফালাকাটা শাখা 'পথের শেষে', 'নন্দকুমার', 'মানুষ', 'বর্ধমানের বর, বরিশালের কনে' ইত্যাদি মঞ্চস্থ হয়। এদের মধ্যে  'পথের শেষে' ছিল ফালাকাটার বুকে প্রথম সামাজিক পূর্ণাঙ্গ নাটক। 

আনুমানিক ১৯৫৫/৫৬ সালে ড্রামাটিক হলের একটি পরিবর্তন আসে। ফালাকাটায় সিনেমা শিল্পের প্রসারে উদ্যোগী হয়ে মনমোহন মজুমদার, প্রতুল (গাজী) ঘোষ, লক্ষণ ঘোষ প্রমুখেরা হলটিকে ভাড়া নেন। নাটকের পাশাপাশি চলে ছায়াছবির প্রদর্শন। মনমোহন মজুমদারেরা সেসময় চা-বাগান থেকে একটি জেনারেটর কিনতে সক্ষম হন। অন্যান্য যন্ত্রপাতিও আনা হয়।  কিন্তু যৌথ উদ্যোগের এই ব্যবসা বেশিদিন টেকে নি। তাই ১৯৫৭ সালে আলিপুরদুয়ারের অমর-গৌরী আয়ুর্বেদিক ঔষধালয়ের মালিক সারদা সেনশর্মাকে লিজ হিসেবে ড্রামাটিক হল লিজ হিসেবে দেওয়া হয়। নিজের কন্যা গৌরীর নামে 'সারদা কবিরাজ` হলের নাম দেন গৌরী টকিজ। শুরু হয় ড্রামাটিক হলের এক নতুন অধ্যায়। এখনো অবধি প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে গৌরী টকিজে প্রথম প্রদর্শিত ছবিটির নাম ছিল 'ওমকারের জয়যাত্রা'। ড্রামাটিক হলের মালিকানা সাময়িকভাবে অন্য হাতে চলে গেলেও প্রতুল (গাজী) ঘোষকে ম্যানেজার নিযুক্ত করা হয়েছিল যাতে ফালাকাটা বা ড্রামাটিক হলের নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব থাকে এবং অপারেটরের দায়িত্ব পালন করতে পারেন নাট্যপ্রাণ  হরিপদ বসু। (চলবে)






ড্রামাটিক হলের সূত্র ধরেই এল মুক্তমঞ্চ
শৌভিক রায়

 ১৯৬০ সালের ৯ই মে ড্রামাটিক হলে 'চিরকুমার সভা` নাটকে আরতি ঘোষের অভিনয় ছিল ফালাকাটার মঞ্চে প্রথম কোনো মহিলার আবির্ভাব। এরপর অবশ্য অঞ্জলি গুহমজুমদার, গৌরী দত্ত, মীরা বোস, ডলি রায়, হেনা দেব প্রমুখেরা নিয়মিত অভিনয়ে আসেন। ছায়াছবি প্রদর্শনের পাশাপাশি ততদিনে নানা প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠানের জন্যও ড্রামাটিক হলকে বেছে নেওয়া হয়েছে। আর গৌরী টকিজে প্রদর্শিত হয়েছে বিখ্যাত সব ছবি।    

উত্তরের সমৃদ্ধ জনপদ ফালাকাটার সংস্কৃতি চর্চায় ড্রামাটিক হল দীর্ঘদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।পাশাপাশি একটি বিরাট অঞ্চলের বিনোদনের একমাত্র জায়গা ছিল ড্রামাটিক হল যা অন্যসময় নাম পালটে গৌরী টকিজ নামে ছায়াছবি প্রদর্শন করত। সেসময় গৌরী টকিজ এতটাই বিখ্যাত ছিল যে, ফালাকাটার আশেপাশের এলাকা তো বটেই এমনকি শিলবাড়িহাট, মাদারিহাট, বীরপাড়া, গয়েরকাটা, ধূপগুড়ি ইত্যাদি জায়গা থেকেও মানুষজন গৌরী টকিজে আসতেন। গৌরী টকিজ তথা ড্রামাটিক হলের সোনার দিন কিন্তু বহুদিন একইরকম ছিল। নাট্যমঞ্চে ততদিনে আধুনিকতার ছোঁওয়া লেগেছে। আলো ও আবহের ব্যাপারে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। ১৯৬০-এর পর, পূর্ণাঙ্গ নাটকের ক্ষেত্রে ড্রামাটিক হল 'রামের সুমতি', 'রমা', পাহাড়ি ফুল', বৈকুন্ঠের খাতা' ইত্যাদির মতো যুগান্তকারী সব প্রযোজনা মঞ্চস্থ করেছে। পাশাপাশি নাট্য চর্চার জগতে ড্রামাটিক হলকে কেন্দ্র করে আর একটি পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছিল। এই সময়ে ফালাকাটায় জন্ম নিয়েছে বেশ কিছু নাট্যদল, যাদের মধ্যে হিলস্টেশন সংস্থা, উন্মাদ সংঘ, মুক্তিপাড়া নাট্যসংস্থা ইত্যাদির কথা বলা যায়। কিন্তু কালের যাত্রায় এইসব নাট্যসংস্থা বিলীন হয়ে গেলেও আছে রেণেসাঁ, যুবশিল্পী ইত্যাদি দলগুলি আজও রয়েছে। পরবর্তীতে জন্ম নেয় রাণার, খেয়ালি, অমর্ষি, বিদ্রোহী, কোরাস ইত্যাদি নাট্যদলগুলি। এদের অনেকেই সাড়া জাগিয়ে শুরু করলেও তাদের অস্তিত্ব আজ আর নেই। নাটকের দল চালাবার খরচ জোগাড় করতে না পারা, এই নাট্যদলগুলির প্রধান কুশীলবেরা কর্মজীবনে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়া, টিভি-ভিডিওর সর্বগ্রাসী আগ্রাসন হয়ত এই দলগুলির অবলুপ্তির জন্য দায়ী। আবার এটাও ঠিক যে, বিভিন্ন প্রতিকূলতা নিয়েও রাণারের মতো নাট্যদল চার দশকের বেশি সময় ধরে এখনও রাজ্য নাট্য প্রতিযোগিতা আয়োজন করে চলেছে।

যাহোক, ১৯৬৫-১৯৭০ থেকেই নাটকের পরিভাষা বদলে যাচ্ছিল। ড্রামাটিক হলের নাটকেরও এক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। নাটক যে শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য নয়, সেকথা বুঝতে সময় নেন ড্রামাটিক হলকে ঘিরে থাকা ফালাকাটার সংস্কৃতি কর্মীরা। দর্শকরাও বোধহয় মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাই বিভিন্ন নাট্যদল একের পর এক অন্যধারার নাটকের জন্ম দিয়েছিল।  

ড্রামাটিক হলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ফালাকাটার নাট্য ও সংস্কৃতি চর্চার জগতে এক ঝাঁক অভিনেতা-অভিনেত্রী ও দক্ষ পরিচালকের জন্ম হয়। এদের মধ্যে ফালাকাটার প্রথম মহিলা অভিনেত্রী হিসেবে দীপালি দে দিশারী পুরস্কার পান। শিশু অভিনেতা হিসেবে প্রিয়াঙ্কু ঘোষ আশির দশকে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে সাড়া ফেলেছিলেন। ড্রামাটিক হলে নাট্য চর্চা থেকেই ফালাকাটায় ১৯৮০ সালে শুরু হয়েছিল মুক্তমঞ্চ। ড্রামাটিক হলের্ বিপরীতে, আজকের দশমীর ঘাটের কাছে, শিশু সদনের পাশে শুরু হয়েছিল 'ফালাকাটা মুক্তমঞ্চ'। এর আগে উত্তরবঙ্গের একমাত্র শিলিগুড়িতে ১৯৭৯ সালে মুক্তমঞ্চ শুরু হয়। 

সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে ফালাকাটার মুক্তমঞ্চ সেই সময়ের এক সাহসী প্রচেষ্টা। ১৯৯০ সাল অবধি ফালাকাটা মুক্তমঞ্চে বিভিন্ন নাট্যদল লাটক মঞ্চস্থ করেছে। ফালাকাটা মুক্তমঞ্চে যোগ দিয়েছে জটেশ্বরের কিশোর নাট্যসংস্থা, ধূপগুড়ির তরুণ নাট্যসংস্থা, শিলবাড়ীহাটের বলাকা নাট্য গোষ্ঠী, জলপাইগুড়ির শিলালী নাট্যম, কোচবিহারের সংসপ্তক বিভিন্ন সময় যোগ দিয়েছিল। ফালাকাটার মুক্তমঞ্চের এই সাফল্যের পেছনে ড্রামাটিক হলের অবদান কম নয়, কেননা মুক্তমঞ্চের পরিকল্পনা এসেছিল ড্রামাটিক হলের নাট্যচর্চাকে কেন্দ্র করেই। ড্রামাটিক হল কিন্তু ফালাকাটার পাশাপাশি আশেপাশের মানুষদেরকেও উদ্দীপিত করেছিল। 

ফালাকাটার খুব কাছের ভুটানিরঘাট অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলাকা নাট্যসংস্থা, স্বরবর্ণ থিয়েটার ইউনিট। মাদারিহাটে ছিল সবুজ সংঘ। জটেশ্বরের প্রগতি নাট্যসংস্থা, শিলবাড়ীহাটের ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন, মেজবিলের উত্তরণ ইত্যাদি নাট্যদলের পেছনে ছিল ড্রামাটিক হলের প্রভাব। একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সংস্কৃতি চর্চা একটি হলকে ঘিরে - এরকম দৃষ্টান্ত কিন্তু কমই আছে। 

(শেষ)
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

No comments: