Monday, December 12, 2022

 ওয়েফার 

শৌভিক রায় 


স্টেশনারি শপটা খোলা দেখে একটু আশ্বস্ত হলাম। যাক, অন্তত কিছু পাওয়া যাবে!

রাত আড়াইটার ব্যাঙ্গালোর কেম্পেগোড়া এয়ারপোর্ট ঘুমিয়ে আছে। আক্ষরিক অর্থেই। চারদিকে হরেক কিসিমের নাক ডাকার আওয়াজ। ডেক চেয়ার বা সোফা যেগুলি আছে সেগুলি আমরা পৌঁছোবার বহু আগেই দখল হয়ে গেছে। স্টিলের যে চেয়ারে বসে আছি, সেটা যথেষ্ট বড়। কিন্তু এত স্লিপারি যে একভাবে বসা যাচ্ছে না। দুই একবার যা একটু চোখ লাগল, তো পিছলে মাটিতে পড়বার অবস্থা! ধুত্তেরি বলে উঠে পড়ে আশেপাশের যত পোস্টার পড়ে ফেললাম। অবশ্য যেগুলি ইংরেজিতে, সেগুলিই। কানাড়া পড়ি তার সাধ্য কোথায়! চারদিকে সাঁটানো নির্দেশ ও অন্য যা আছে মোটামুটি সবই মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু তবু ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে না। এদিকে পেটে ছুঁচো ডন বৈঠক দিচ্ছে! দেবে না-ই বা কেন? খেয়েছি তো সেই রাত নয়টায়। আমাদের ফ্লাইট ছাড়বে ভোর সাড়ে চারটায়। বাগডোগরা নামব সকাল সাড়ে সাতটায়। অর্থাৎ আরও পাঁচ ঘন্টা পরে। এর মধ্যে পেটে কিছু না গেলে মরণদশা!

আসলে আমরা ফিরছি হায়দ্রাবাদ থেকে। তিনদিন আগে হায়দ্রাবাদের গাছিবাউলির খানদানি রেস্টুরেন্ট নবাবে বসে বিরিয়ানি খেতে খেতে ভিরমি খাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। হায়দ্রাবাদ-বাগডোগরা টিকিট দেখাচ্ছে জনপ্রতি সাড়ে বারো হাজার টাকা! অর্থাৎ দুজনের পঁচিশ হাজার। বাগডোগরা থেকে কোচবিহার পৌঁছতে ভাড়ার গাড়িতে অন্তত চার হাজার। এয়ারপোর্টে পৌঁছনো, খাওয়া ইত্যাদি মিলে আরও এক হাজার এদিক ওদিক করে চলে যাবে। তাহলে হল গিয়ে তিরিশ হাজার। আমাদের পক্ষে এটা একটু নয়, অনেকটাই বাড়াবাড়ি। এদিকে ট্রেনের টিকিট নেই। কী মুশকিল! হায়দ্রাবাদি সুস্বাদু বিরিয়ানি ততক্ষণে অসহ্য মনে হচ্ছে।

যাহোক অনেক খুঁজে-পেতে সস্তার টিকিট পেলাম। দুজনে মিলে হায়দ্রাবাদ-বাগডোগরা সাড়ে সাত হাজার। হায়দ্রাবাদ থেকে রাত একটা পনেরোতে ফ্লাইট ছেড়ে পৌনে দুটোয় ব্যাঙ্গালোরে নামাবে। সেখানে কিছুক্ষণ লে ওভার। তারপর ভোরে আবার আর এক ফ্লাইট। সব দিক থেকে এটাই ভাল। পয়সা কম। শুধু একটা রাত জেগে থাকা। কুছ পরোয়া নেই।পঁচিশ থেকে সাড়ে সাত! আমার তখন সাতোয়া আসমান ছোঁয়ার আনন্দ।

সন্তোষ নাইডুর গাড়িতে সারাদিন হায়দ্রাবাদে চক্কর কেটে, প্যারাডাইসের বিরিয়ানি খেয়ে এয়ারপোর্টে ঢুকে গেছিলাম আটটার সময়। এয়ার এশিয়ার কাউন্টারের সুবেশ ছেলেটি ব্যাগেজ নিতে নিতে স্মার্ট ইংরেজিতে বলল, `ইউ সিম টু এক্সসাইটেড টু ফ্লাই। ইটস অনলি এইট নাও....` মুখে হ্যা হ্যা করে হাসলেও, মনে মনে বললাম, বাপু হে তুমি কী বুঝবে! টাকা আকাশ, আকাশ টাকা! 

আটটা থেকে বসে থাকতে থাকতে হায়দ্রাবাদ এয়ারপোর্টের অলিগলি মায় ভাঙাচোরা যখন প্রায় মুখস্থ হয়ে এসেছে, তখন আমাদের বসিয়ে দিল প্লেনে। যার ছাড়বার কথা রাত সওয়া একটায়, তিনি আকাশে উঠে পড়লেন পৌনে একটায়। ব্যাঙ্গালোরে নামলেন আধা ঘন্টা পর। ট্রান্সফার গেট দিয়ে ঢুকে, আবার সিকিউরিটি চেক করে বসতে না বসতে খিদে পেয়ে গেল। খানিক সহ্য করে আর স্লিপি চেয়ারের সঙ্গে পাঙ্গা লড়ে শেষটায় গুটিগুটি পায়ে ঢুকলাম ওই শপে (এয়ারপোর্টের দোকানগুলোকে দোকান বললে নিজেকে কেমন একটা ইয়ে লাগে)। 

অনেক খুঁজে দেখলাম খাবার বলতে ক্যাডবেরির মাঝারি প্যাকেট আর ওয়েফার। উপায় নেই। পেটের আগুন মেটাতে হবে। আর গিন্নিকেও একটু চমক দেওয়া দরকার। সর্বক্ষণ অভিযোগ, আমি নাকি সেকেলে হয়ে রইলাম। এসব হাল ফ্যাশনের ব্যাপার-স্যাপার বুঝিনা। তাই বেশ কায়দা করে দুটো ওয়েফার আর একটা ক্যাডবেরির প্যাকেট তুলে দিলাম ঘুমে ঢুলতে থাকা শপ-বয়কে (শপ-বয়ই তো? নাকি কর্মচারি?)। 

ওদিকে ব্যাংকের থেকে ক্রেডিট কার্ড ধরিয়ে দিয়েছে বহু আগেই। তারা মাঝে মাঝে ফোন করে আমাকে বেশ উৎসাহিত করে। আমি নাকি ওদের প্রিমিয়াম কাস্টমার। আমার ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার দারুন হচ্ছে ইত্যাদি। তাই আজকাল বাইরে গেলে পেমেন্ট করতে হলে ওটাই এগিয়ে দিই। সঙ্গে গলাটা একটু খেলিয়ে উচ্চারণ করি `ওয়াই ফাই কানেক্টেড`। এখনও সেটাই করলাম। পকেটে মোবাইল ফোনের ভাইব্রেশনে টের পেলাম টাকা খরচের মেসেজ চলে এলো। বিল পেপারের দিকে নজর না দিয়ে খাবার নিয়ে বেরিয়ে এলাম।
 
একটা ওয়েফার মুখে দিয়ে গিন্নি বলল, 
- কত নিলো গো সব মিলে?
- কত আর হবে! দেখিনি। খাও....
গিন্নি আর জানতে চাইল না। কিন্তু নিজেরই কৌতূহল হল দেখি তো কত খরচ হল। 

পকেট থেকে ফোন বের করে মেসেজ দেখে চক্ষু চড়কগাছ। ভুল মেসেজ না তো? বিল পেপার বের করলাম তাড়াতাড়ি। না। একই। এদিক ওদিক হবেই বা কেন! স্ক্যানার দিয়ে বিল করেছে। ঠিকই আছে। দুটো ওয়েফার আর একটা ক্যাডবেরি চকোলেট নয়শো টাকা! কী কাণ্ড!
 
অর্ধেক wafer হাতে ধরে তাকিয়ে রইলাম অন্ধকার runway-এর দিকে। wafer তখন far away মনে হচ্ছে। 

গিন্নি আবার প্রশ্ন করল, 
- দেখলে কত পড়ল সব মিলে?
যথাসম্ভব গলা নিচু করে উত্তর দিলাম,
- নব্বই টাকা। 

(আজ রায় ব্রাদার্স থেকে ইউনিবিকের দুটো ওয়েফার কিনেছি। ভয়ে দাম দেখিনি। মালিক রায়দা গোমড়া মুখে বললেন, 'এসব যে আপনারা কী খান! মারি বিস্কুটের ওপর কিছু হয় নাকি!' বললাম, `ঠিক, ঠিক। ওই একটু নিলাম আর কি। আগে একবার খেয়েছিলাম। রাতের বেলায় তো। স্বাদ বুঝিনি। এবার দিনে খেয়ে দেখব।`)      

(বোকামির এককাল) 

 

No comments: