Sunday, December 4, 2022


 

আজকের (৪ ডিসেম্বর, ২০২২) উত্তরবঙ্গ সংবাদের 'রংদার রোববার'-এ প্রকাশিত একটি গল্প। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ, কার্যকরী সম্পাদক ও বিভাগীয় সম্পাদককে।

বলরামের পাথর
শৌভিক রায়

বলরামের যখন আট বছর বয়স, তখন সে প্রথম পাথরটাকে দেখে।
আট বছর বয়স দুনিয়াদারি বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে, সেও ছোট্ট জ্বলজ্বলে পাথরটা দেখে বিশেষ কিছু বুঝতে পারেনি। কিন্তু পাড়া প্রতিবেশী, মায় শহর শুদ্ধ সব লোক সেই পাথরটা দেখে দারুণ খুশি। সবাই বলাবলি করছিল, এরকম পাথর তারা এর আগে সারা দেশে কোনোদিন একটাও দেখেনি। পাথরটা একেবারেই অনবদ্য!
বলরাম বড় হচ্ছিল। পাথরটারও আয়তন বাড়ছিল। অবশ্য সেটা বলরাম ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারছিল না। ঘটনাচক্রে বলরামরা ছিল নিজেদের এলাকার জোতদার। প্রচুর জমির মালিক। কিন্তু কী হল কে জানে, একদিন হঠাৎ তারা গরিব হয়ে গেল। বিঘের পর বিঘে তাদেরকে জমি তাদেরকে দিয়ে দিতে হল!
চোখের জল লুকিয়ে বলরামের বাপ-ঠাকুরদা জমির মায়া ছাড়লেন। ব্যাপারটা ভাল না মন্দ হল, সেটা বলরাম ওই বয়সে বুঝতে পারছিল না। তবে তার মনে পড়ছিল নিজের একমাত্র কাকার কথা। কলেজ পড়ুয়া কাকা স্বপ্ন দেখেছিল, একদিন সবাই জমির মালিক হবে। সেই স্বপ্নই তার কাল হয়েছিল। সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল কোথায় কে জানে! কেউ আর কোনোদিন তার খোঁজ পায়নি। কাকার স্বপ্ন সফল হল ভেবে বলরাম একটু খুশি হল।
ছোটকাকার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া বা জমি দিয়ে দেওয়া ইত্যাদি বলরামের ঠাকুরদাকে মানসিকভাবে খানিকটা কাহিল করে দিয়েছিল। তবু তিনি সামলে নিয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন তাদের বাড়ির মুনিশ সুখু মিয়া এলাকার পঞ্চায়েত হয়ে গেল, সেদিন তিনি বড্ড দাগা খেলেন। তার সঙ্গে বসে সুখু মিটিং করবে এটা কিছুতেই মানতে পারলেন না। একটা অস্থির ভাব তাকে ঘিরে ফেলল। ঘরবার করতে করতে তিনি পটাং করে একদিন মরে গেলেন।
ঠাকুরদার মৃত্যুতে বলরাম খানিকটা দুঃখ পেল। বাবার সঙ্গে গিয়ে ফারাক্কায় ঠাকুরদার অস্থি বিসর্জন দিয়ে এলো। জমি নেই। ঠাকুরদা নেই। সংসার কীভাবে চলবে ভাবতে ভাবতে বলরামের বাবা হতাশ হয়ে পড়লেন। কিন্তু কীভাবে যেন সরকারি দপ্তরে একটা ছোটখাট চাকরি জুটিয়ে ফেললেন। ফলে একেবারে গরিব হতে হতে বলরামেরা কোনমতে বেঁচে গেল। সকলে বলাবলি করল, পাথরটার জন্য বলরামের বাবার চাকরি হয়েছে। কথাটা মিথ্যে নয়। বাবা মাঝে মাঝে পাথরটাকে দুধ দিতেন। বলরাম বুঝল সবার কথাই ঠিক।
এসবের মধ্যে পাথরটা বেড়ে চলেছিল। আরও বড় হয়ে উঠছিল। অবশ্য তার সেই ঝকঝকে ভাবটা একটু কমেছিল। বলরাম মাঝে পাথরটাকে মাজাঘষা করবার চেষ্টা করল। কিন্তু লাভ হল না। তাতে অবশ্য বলরামের খুব কিছু গেল এলো না। সে পাথরটাকে যত দেখত, তত তার প্রেমে পড়ত। অবস্থা এমন হয়ে গেল যে, বলরাম কিছুতেই পাথরটাকে ছেড়ে থাকতে পারত না!
বলরামের বাবা কিন্তু ধীরে ধীরে পাথরটাকে অপছন্দ করতে শুরু করেছিলেন। তার মনে হচ্ছিল তার বাবা অর্থাৎ বলরামের ঠাকুদার মৃত্যুর জন্য ওই পাথরটা দায়ী। শুধু তাই নয়, নিজের ছোট ভাইয়ের বাড়িতে না ফেরার কারণও ওই পাথরটা। যদিও পাথরটার জন্য তিনি চাকরি পেয়েছেন, তার সংসার চলছে, তবু কেন জানি তার মনে হচ্ছিল পাথরটার প্রথম দিকের সেই দুর্দান্ত ভাবটা আর নেই।
তিনি এসব বোঝাতেন বলরামকে। কিন্তু বলরাম তখন একবগ্গা। সে পাথরটাকে নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখে চলেছে। তার মনে হচ্ছে, পাথরটা এই এলাকা তো বটেই, ক্রমশ আরও বড় হয়ে ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্র। নিজের বাবাকেও সে এই কথা বলেছিল। বাবা কোনও তর্কে যাননি। কিন্তু সেদিন থেকে যেন বলরামের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার মন বলছিল, বলরাম ঠিক করছে না। কিন্তু তিনি ছাপোষা মানুষ। বলরামের ভেতরের গনগনে আগুন কিংবা নিজের বাপের অহংকারের কোনওটাই তার মধ্যে ছিল না।
তিনি একদম চুপ করে গেলেন। শুধু বলরামের মা-কে জানালেন, সরকারি দপ্তরে তার চাকরি শেষ, তিনি অন্য কোথাও চলে যাবেন। বলরামের মায়ের কাছে তার স্বামী ছিল সব। তাই একদিন বলরাম দেখল, তার বাবা মা বাড়ি ছেড়ে পন্ডিচেরিতে চলে গেলেন। সেখানে অরবিন্দ আশ্রমে বাকি জীবন কাটাবেন। যাওয়ার সময় তারা বলরামকে বলে গেলেন, কোনও কিছুই জীবনে শেষ কথা নয়। বলরাম যেন এটা মনে রাখে। বলরাম কিছু বলতে পারল না। তখন সে টগবগে যুবক। এলাকার লোক তাকে পাথর পূজারি নামে ডাকে।
ইতিমধ্যে পাথরটা আরও বড় হয়েছে। কিন্তু তার আগের সেই উজ্জ্বল ভাবটা নেই। বরং কেমন একটা কালো কালো ভাব। কিন্তু বলরাম এসব কিছুই লক্ষ্য করল না। বরং সে পাথরের গুণগানে ব্যস্ত। বাবা মা চলে যাওয়ার পর এখন সে মুক্তবিহঙ্গ। তার কোনও ভাই-বোন নেই। ফলে পাথরটাকে যারা ভালবাসে, তাদের সঙ্গে মিলে সে এখন নিশ্চিন্তে পাথরটার পুজো করে। এই পুজো করতে গিয়ে যদি কাউকে মারধর বা খুন করতে হয়, তাতেও পিছপা নয় সে। তার একটাই উদ্দেশ্য পাথরটাকে আরও বড় করা। এতটা বড় যে, সবকিছু থাকবে পাথরটার ছায়ায়। ছায়ার রং কালো হোক, বা অন্য কোনও কিছু তাতে তার কিছুই যাবে আসবে না।
এসবের মধ্যে একদিন বলরাম বিয়ে করে নিল। পাথরটাকে ঠিকঠাক পুজো করার জন্য আসলে তার একজন সঙ্গী দরকার ছিল। কিন্তু বিয়ের পর বলরাম বুঝল, সে একটু ভুল করে ফেলেছে। আলেয়া বড্ড সংসারী মেয়ে। সে বলরামকে নিজের বাড়ি বিক্রি করে পাথরের মন্দিরে যেতে দিল না। নিজেও পাথরের পুজো করল না। উল্টে চোখে আঙুল দিয়ে বলরামকে দেখাতে লাগল পাথরটার বিচ্ছিরি চেহারাটা। ওটা যে আসলে একটা জগদ্দল পাথরে পরিণত হয়েছে সেটা আলেয়া বুঝিয়ে দিল।
বলরাম বুঝল। বাড়ির পরিস্থিতি ঠিক হল। কিন্তু পাথরের অন্য পূজারীরা তাকে ব্যঙ্গ করতে শুরু করল। বলরামের বলতে ইচ্ছে হল, পাথরটার নোংরা চেহারার কথা। সেটা যে সব গুণ আর ঔজ্বল্য হারিয়ে একটা বোঝায় পরিণত হয়েছে সেটাও সে বলতে চাইল। কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। কেননা সেই পূজারিরা ততদিনে কেষ্টবিষ্টু হয়ে উঠেছে। তারাই এখন পাথরের নতুন পূজারি। তারা বলরামের কথা শুনবে কেন! পাথরের পুজো করতে করতে তারা সব্বাই গাড়ি-বাড়ি-টাকা করে ফেলেছে। বলরামই বরং কিছু করেনি। এইসব টানাপোড়েনের মধ্যে একদিন আলেয়ার একটি ফুটফুটে ছেলে হল।
আরো কিছুদিন কেটে গেল। পাথরটা একেবারে কালো ঝামার মতো দেখতে হয়ে গেছে। কিন্তু চেহারা তার বিরাট। মাঝখানটা ফুলেফেঁপে প্রায় জয়ঢাক। আগের সেই ঝকঝকে চেহারা হারিয়ে পাথরটা যেন একটা ব্যাং খাওয়া সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে থাকে। আর তার চারপাশে নেচে বেড়ায় নতুন নতুন এমন সব মুখ যাদের একটাই কাজ, পাথরটাকে ভাঙিয়ে শুধু লুট আর লুট। প্রিয়তম পাথরটাকে নিয়ে বলরামের স্বপ্ন এভাবেই শেষ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল, এই পাথরটা যদি এভাবে থেকে যায় তবে সবকিছুই শেষ হয়ে যাবে। আট বছর বয়সে যে পাথরপ্রেম শুরু হয়েছিল তার, তা শেষ হল বিয়াল্লিশ বছরে এসে।
শেষ হল কি? না। আসলে বলরাম অন্য আর একটা পাথরে মজে গেল। এই পাথরটা ওই জগদ্দল কালো পাথরের মতো নয়। বিরাট বিপুল নয়। ছোট্ট। কিন্তু দারুণ ঝকঝকে। বহু লোক এই পাথরটাকে ভালোবাসে। কিন্তু প্রকাশ করে না। পুরোনো কালো পাথরের ভয়ে চুপ করে থাকে। বলরাম আগাগোড়াই ডাকাবুকো। তার ভয়ডর নেই। সে নতুন পাথরের পুজো শুরু করে দিল। কিন্তু তার পুজোতে পুরোনো পাথরের প্রেমিকরা খেপে গেল। তাকে হারামি বলে গালি দিল। প্রবল পেটালো। সে হসপিটালে ভর্তি হল। বেঁচে ফিরল কোনওমতে। আলেয়া কাঁদতে লাগল। তার ছেলে ভয় পেয়ে গেল।
কিন্তু বলরামকে তখন নিশিতে পেয়েছিল। যে পাথরের জন্য সে এতকিছু করেছে এতদিন, সেই পাথরের ওপর সে ভয়ানক রেগে গিয়েছিল। একদিন দলবল জুটিয়ে পুরোনো কালো পাথরটাকে সে ভাঙতে শুরু করল। এতদিনের গেড়ে বসা পাথর। ভাঙা এত সস্তা নাকি! প্রথমটায় সে ভাবতে পারেনি পাথরটাকে আদৌ ভাঙতে পারবে। কিন্তু একটু চেষ্টা করে বলরাম টের পেলো, পাথরটা আসলে একেবারেই খোকলা। খানিকটা ভাঙবার পর সেটা এমনভাবে ভেঙে পড়ল যে কল্পনাই করা যায় না। তাসের ঘরও বোধহয় এভাবে ভাঙে না! বলরাম অবাক হল।
নতুন পাথরের পূজারী হয়ে গেল বলরাম। এই পাথরটা একদম ঝকঝকে। ঝলমলে। পুরোনো পাথরটাকে ভেঙে ফেলার জন্য তার ইনামও জুটল। সবাই তাকে বেশ সম্মান দিল। এমনিতে সে ভালো বলতে পারত। লোককে বোঝাতে পারত। লোকে তার কথা শুনতও। ফলে নতুন পাথরের পূজারীরা তাকে মাথায় তুলে নিল। আলেয়াও খুব খুশি তার ওপর। একদিন যারা তাকে মেরেছিল, তারাও বলরামের সঙ্গে মিশে গেল। নেতা বলে তাকে মেনে নিল।
কিন্তু বলরাম আর অতীতের ভুল করল না। এবার সে নতুন পাথর পুজো করে প্রচুর কিছু লুটে নিল। দেখতে দেখতে তার ভাঙা বাড়ি প্রাসাদোপম হয়ে গেল। স্করপিও, ইনোভা নিয়ে সে চারটে গাড়ি কিনে ফেলল। তার ব্যাংক ব্যালান্স হু হু করে বেড়ে উঠল। এখানে সেখানে সে নিজের আর আলেয়ার নাম জমি কিনতে লাগল। নিজের ছেলের নামেও কিনতে চাইল। কিন্তু ছেলে রাজি হল না। বরং সে বলরামকে নতুন পাথরটার ঝলমলে রূপের পেছনে লুকিয়ে থাকা কালো দাগগুলো প্রায় প্রতিদিন দেখাতে লাগল। বলরাম দেখেও দেখতে চাইল না। সে চোখ বন্ধ করে রইল। ছেলে যখন বলল, নতুন পাথরটাকে এত দ্রুত কালো হতে তার বাবা যে এভাবে সাহায্য করবে এটা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। এই কথা শুনে বলরাম ভয়ানক রেগে গেল।
সে নিজের ছেলে বিপ্লবকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। আলেয়া কান্নাকাটি করল প্রথমটায়। কিন্তু কয়েক কোটির সোনার গয়না পেয়ে তার কান্না একদিন থেমে গেল। ছেলের জন্য মাঝে মাঝে বলরামের মন খারাপ হত। তখন সে একটু মদ্যপান করত। মদের নেশায় তার মনে হত, বিপ্লবের সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া তার সেই কাকার মুখের বড্ড মিল।
এরকম একদিন মন খারাপের রাতে বলরাম পাথরটাকে দেখতে গেল। সেটাকে দেখে তার মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা। আগের পাথরের চাইতে এটা কয়েকগুণ বেশি কালো। বেঢপ। মাঝখানটা ফুলেফেঁপে জয়ঢাককেও ছাড়িয়ে গেছে। ঝকঝকে চেহারা হারিয়ে এই পাথরটাও একটা ব্যাঙ খাওয়া সাপের মতো কুন্ডলি পাকিয়ে বসে আছে আর তার ঘন কালো ছায়া সবকিছুকে ঢেকে দিয়েছে। বলরাম হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে গেল। তার সারা শরীর কাঁপতে লাগল। বুকে ব্যথা শুরু হল। কোনোমতে বুক চেপে আলেয়াকে ডাকতে গিয়ে সে আর কিছু বলতে পারল না। তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
বলরামের মৃত্যুর খবর পেয়ে বিপ্লব এলো। চুপচাপ দাহকাজ শেষ করল। তারপর মায়ের কাছে বিদায় নিল। বলরামের বউ তাকে আটকাবার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। তার উপায় নেই। চাইলেও সে মা`কে সঙ্গ দিতে পারবে না। তার বন্ধুরা সব রাস্তায় বসে আছে। নোংরা কুৎসিত কালো জগদ্দল পাথরটাকে সবাই ভাঙতে চাইছে। তাকে বন্ধুদের পাশে থাকতে হবে। হাত লাগাতে হবে ভাঙার কাজে।
মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে বিপ্লব এগিয়ে চলল। বিপ্লবের বান্ধবী আশাও চলল তার পাশে পাশে। সবাইকে অবাক ক`রে আলেয়াও তাদের সঙ্গ ধরল।

No comments: