Tuesday, December 27, 2022

 




শীত 
শৌভিক রায় 



এক 

বৃক্ষরা পাতা ঝরিয়ে ফেলেছে নীরবে। মনমরা সব। কিছুদিন আগেও যে সূর্যালোক স্পর্শে গায়ে জ্বালা ধরত তাকেই মিঠে লাগে বড্ড। 
নদীর বুকে জেগে উঠছে চর। কোথায় ছিল এতো বালি তোমার বুকে, ও নদী? কিভাবেই বা চেপে রাখো বুকে তোমার এতো পাথর? সবাইকে জীবন দাও এত কষ্ট চেপে রেখে? তোমাকে দেখেই শিখি কিভাবে কষ্টের পাথর বুকে চেপে বয়ে চলতে হয় জীবন পথে, যে জীবন একদিন মিশবে সময়-সমুদ্রে।

রাতগুলি লম্বা। দীর্ঘ। পক্ষীকূল তাই সারাদিন খুব ব্যস্ত। কিচিরমিচির সারাদিন। যূথবদ্ধ ব'লে দিনান্তে নিজেদের সারাদিনের রসদ নিয়ে নানা আলোচনা। তাদের হৈ চৈ-এ কান পাতা দায়। অবশেষে ডানার চাদর গায়ে ঢেকে নিশ্চিন্ত ঘুম নিজের নীড়ে। নিশ্চিন্তই। ঝড় নেই, বাদল নেই, নেই অন্য কোন সরীসৃপের শব্দহীন বিচরণ। এই শীতে কে আর থাকে ধরিত্রী বুকে! সবাই তাই সুখনিদ্রায় পৃথিবী-গহ্বরের নিজস্ব উষ্ণতায়।

এক এক দিন ঝলমলে, আবার এক এক দিন একদমই বিষন্ন। সকাল থেকেই বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে কুয়াশা। ঢেকে থাকে অন্ধকারে দুহাত দূরের জিনিষও। বেলা হলে ’পর কেটে যায় সে। আলো ঝলমলে সোনালী রোদ প্রবেশ করে দূরতম কোনও এক কোণে। চোখের বন্ধ পাতাতে আলোর উষ্ণতা বুঝিয়ে দেয় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার কখনো, কোনদিন শেষ কথা হতে পারে না। আলো থাকবেই। দরকার শুধু স্থৈর্য আর অন্বেষণ। 

আচ্ছা, নদীর যাত্রাও কি এমন নয়? কোন এক গাঢ় নিকষ কালো অন্ধকার গুহায় প্রাগৈতিহাসিক কালের জমে থাকা বরফ পিন্ড থেকে উৎসারিত জলরাশিও কি যাত্রা শুরু করে না আলোর দিকে? মেশে না গিয়ে দিগন্তব্যাপী আলোয় ঝলমল করা সমুদ্রের সঙ্গে? সেই সমুদ্র যাতে রাতের বেলাতেও ফসফরাসের আলো ক্ষণে ক্ষণেই জানান দেয় অন্ধকার সাময়িক, বড্ড সাময়িক।

শীতকাল। অনেক কিছু শেখানোর কাল। অনেক কিছু শিখিয়ে যায় শীত তার প্রতিটি ছন্দে। পাতা ঝরে গেলেও ফুটে ওঠে রঙবেরঙ ফুল। দরকার সামান্য যত্নের। জীবনের মতোই। জীবন থেকে সুখ ঝরে যায়। কিন্তু যদি যত্ন করি নিজের মননের, ফুটতে পারে ফুল রঙবেরঙ নানা । এক ধূসর সময়ে থেকেও শীতের মতোই জানান দিতে পারি সবাইকে, পারি, আমরাও পারি রাঙিয়ে দিতে এই জীবন।




দুই 


হালকা কুয়াশার স্বচ্ছ চাদর। বাতিঘরের হলুদ আলো ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে ছুঁয়ে যায় সেই কুয়াশার আবরণ। হাওয়ার হঠাৎ দমকা বেগে জমে থাকা কুয়াশা অন্য জায়গা এসে ঢেকে দেয় জানালার শার্সি।  আর সেই হাওয়াতেই পাতার শরশর আওয়াজ ও টুপটাপ খসে পড়া গাছ থেকে। দূরে তাকালে প্রান্তরের পর প্রান্তর জুড়ে দেখা যায় ধোঁওয়ার মতো জমে আছে সাদা আস্তরণ। 

বিকেলে মাঠের আগাছাগুলিকে এক জায়গায় ক'রে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা সেই স্তুপ থেকে ধোঁওয়ার উঠে যাওয়া এখনও ওপরের দিকে হয়তো কুয়াশার সঙ্গে মিলন আকাঙ্খায়! চাঁদটাও যেন দূরে চলে গেছে। ফটফটে সেই জ্যোৎস্না আর নেই। বরং মরা জ্যোৎস্নার মায়াবী রাত যেন। ভোররাতে শুরু হবে শিশিরবর্ষণ। টিনের চাল ভিজে যাবে শব্দহীন শিশিরপাতে। কেবল গাছে জমে থাকা শিশির টিনের চালে ঝরবে টুপটাপ শব্দ ক'রে। সকালের মিঠে রোদে একটু মাটির ছিটে লাগা শিউলি দিয়ে ভরে উঠবে সাজি। 

তবে সাবধান। শিউলির গায়ে গোল জমাট বেঁধে থাকতে পারে শুয়োপোকার দল! গাছের কিছু পাতা ছেঁড়া ছেঁড়া এদের জন্যই। তবে কিছু ক’রতে নেই। প্রজাপতি হবে যে আর ক'দিন পরই! আমার মুজনাই, আমার সাপটানা এখন ক্ষীণকায়া। মাদারীরোড ধরে এগিয়ে চললে জঙ্গলের যে আভাস চোখে পড়ে, তাও এখন ফাঁকা ফাঁকা, শুকনো। জলদাপাড়ার ভিতর যে ঝোরাগুলি  বয়ে গেছে, তাতে নেমে বেত সংগ্রহে আর তেমন অসুবিধে নেই। বরং বড় বড় পাথরের চাঁইয়ে মাঝখানে বসে জলের সেই অপূর্ব সুর শোনার সুবর্ণ সুযোগ। দু'চারটে নদীয়ারি মাছ উকি দিয়ে যেতে পারে। বেরিয়ে আসতে  দুপাশের জঙ্গলের কোনও  এক দিক থেকে বনময়ূরী। অবশ্য পাথরের ওপর বসে থাকা অচেনা পুরুষ দেখে লজ্জায় ফিরে যেতেও পারে নিজের পুরুষ ময়ূরটির কাছে। 

জঙ্গল শেষেই পাকা ধানের বিস্তীর্ণ ক্ষেত। কোথাও কাটা ফসল মাটিতে আঁটি বেঁধে রাখা হয়েছে, কোথাও আবার ফাঁকা ক্ষেতে ধান খুঁজতে হাজির শালিক থেকে শুরু ক'রে পরিযায়ীর দল! অলস দিন।  আলস্য বিছানায়, আলস্য সকালের রোদে। চোখ না ফোটা ছোট্ট কুকুরছানাকে কোলে তুলে আদর ক’রতে ক'রতে রোদের আদর খেতে কি দারুণটাই না লাগে !

সেই শীত। আবার আজ। সেই আমেজ, সেই আলস্য। পার্থক্য একটাই। সেদিন সাংসারিক ভাবনাহীন এক দামাল কিশোর, আর আজ প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া আপাদমস্তক এক কেজো মানুষ। 




তিন 


শিশিরে ভেজা মাঠ। ভেজা টিনের চাল। বারদুয়ারে রাখা পোয়ালের স্তুপও ভেজা। কখনো হেসে ওঠা ঝলমলে সূর্য, কখনো মেঘের আড়ালে মিইয়ে থাকা সূর্য। দিনভর যেন লুকোচুরি খেলা। আর তাদের এই খেলা দেখে মিটিমিটি হাসতে থাকা চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়াসহ মরশুমি ফুলের দল। কখনো কুয়াশার দাপটে মাঝদুপুরকেও ভোর বলে ভ্রম হয়, আবার কখনো মুঠো মুঠো সোনা রোদের উত্তাপ “মিঠেকড়া সারা শরীরে।

শীত সকালে পরিযায়ীর ঢল নামে বিলে, পুকুরে। কখনো দল বেঁধে, কখনো বা একা পরিযায়ী পাখিরা খুঁজে চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাবার প্রকৃতির মাঝে। উদরপূর্তি হ’লে ’পর ভাসমান স্বচ্ছ জলে, চলে অবগাহন, খুনসুটি নিজেদের মাঝে। সবশেষে ডানা ঝাপটে একযোগে উড়ান। উড়ান নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে আর আশ্রয় প্রিয় নীড়ে। 

নীড় খুঁজি আজীবন। খুঁজি নিশ্চিন্ত আশ্রয়। কখনো হাত ধরে আশ্রয় চিনিয়ে দেন পিতামাতা, কখনো শিক্ষক, কখনো পরিজন, প্রিয়জন। যদিও প্রিয়তম আশ্রয় মাটির বুকে অথবা চিতার আগুনে। তাই সারাজীবন কেবল অন্বেষণ। অন্বেষণ শেষে, নিশ্চিত আশ্রয়ে, চোখ বোজা চিরদিনের জন্য, চিরস্বপ্নের দেশে। নীড় তাই কেবল খুঁজেই চলা।

ধুলো ওড়ে বালির চরে। উত্তুরে হাওয়ার কনকনানি মূহুর্মূহ বেড়েই চলে। পাতা ঝরায় পর্ণমোচী। শুকনো পাতায় সতর্ক সঞ্চারণে শ্বাপদ মাথা উঁচু ক'রে পথ খুঁজে নেয় নিজের। অন্বেষণ তারও, নিজস্ব, একান্ত। বৃত্তাকার এক খোঁজ। শুরু কোন এক বিন্দু থেকে, শেষ সেখানেই, সেই বিন্দুতেই।

শীতকাল। গরম আবরণে নিজেকে মুড়ে নিদ্রার সুখ অথবা অসুখ। দীর্ঘ রাতের প্রতিটি পলে অন্বেষণ উষ্ণতার। মনে পড়ে যায় মায়ের শরীরের ওম। ছোট্ট শিশুর সেরা উষ্ণতা মায়ের শরীরের সেই উষ্ণতাই। রাত যত গড়ায় খুঁজে ফিরি মায়ের সেই উষ্ণতা। জীবন যত গড়ায় খুঁজে ফিরি মায়ের সেই উষ্ণতা। অবাক হই ভেবেও যে উষ্ণতা কিভাবে শীতলতা নিয়ে আসে, জুড়িয়ে দেয় প্রাণ, শান্ত ক’রে তোলে মনের গভীরে ফুটতে থাকা অশান্ত জীবনের গরম লাভাস্রোত। অন্বেষণ তাই সারা শীত জুড়ে, নীড়ে ফেরার টানে, মায়ের কাছে.....

No comments: