রাণার নাট্য সংস্থা: কিছু কথা
শৌভিক রায়
ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি ঘর ছিল আমাদের জন্য বরাদ্দ। সেই ঘরেই সকাল আট-সাড়ে আট নাগাদ পোলিওর টিকা পৌঁছে যেত। সার দেওয়া চামচের প্রতিটিতে সেই টিকার দুই ড্রপ ফেলা হত। তারপর শুরু হত শিশুদের পোলিও খাওয়ানো। যতদূর মনে পড়ছে মাসের দুদিন বসত এই ক্যাম্প। টিকা আসত জলপাইগুড়ি বা কোচবিহার থেকে।
১৯৮২/৮২ তখন। শিলিগুড়ি কোচবিহার মিনি বাস সদ্য চলতে শুরু করেছে। 'সাফারি' আর 'ভানুমা' নামের সেই বাস দুটোকে ঘিরে আমাদের ছোটদের উৎসাহ ছিল ভীষন। জলপাইগুড়ি থেকে আসত কৌশিক রায়ের মালিকানায় থাকা 'পারাপার'। কী কদর তখন তাদের! আর যারা মিনি বাসে চাপে তারা যেন সব খানদানি লোক! ফালাকাটা সেই সময় ফাঁকা ফাঁকা। স্কুলের সামনে পীতাম্বরদার ছোলা বাদামের ঠেলা দোকান আর পাঞ্চজন্যের পেছনেই টাউন ক্লাবের ধু ধু মাঠ। পোলিও খাওয়ানোর সকালবেলায় হেলথ সেন্টারের ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনতে হত। দূর থেকে আমাদের দেখলেই ডাক্তারবাবু বেরিয়ে আসতেন ডাকবার সুযোগ না দিয়েই। কেননা অপুদা গত দিন ওঁর স্ত্রী-কে ডেকে বলেছে, 'বৌদি, ডাক্তারকাকুকে একটু তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেবেন!' টুটুদা, সন্টুদা, দিলীপদা, মিন্টুদা, নারায়ণদা, রামসেবকাকু, গৌরদা, বংশীদা এরাও কেউ কম যেত না! আর এরা সবাই মিলেই ছিল রাণার নাট্য সংস্থা। আর সেই সংস্থায় সেই মুহূর্তে সবচেয়ে ছোট সদস্য অবশ্যই আমি!
ফালাকাটার নাট্যচর্চার সমৃদ্ধ ইতিহাসে 'রাণার' অতি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ১৯৭৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাণারের যাত্রা শুরু হয় 'অবরুদ্ধ ইতিহাস' দিয়ে। এরপর 'অশান্ত বিবর' মঞ্চস্থ হলেও, রাণার দৃষ্টি আকর্ষন করে 'যদি আমি কিন্তু আমি' নাটকটির পর। এরপর একে একে এসেছে একটি অবাস্তব গল্প, অভিযাত্রী একটি নাট্য সংস্থা, লোকটা, স্বর্গে সংস্কৃতি, পাথর, তেঁতুল গাছ, একা নয়, ভোরাই খেয়া সহ অজস্র একাঙ্ক। পূর্ণাঙ্গ নাটকে রাণার মাত করেছে শতাব্দীর পদাবলী, নরক গুলজার, মেষ ও রাক্ষস, অমৃত অতীত, রাজদর্শন, আমি সহ বহু নাটকে।
রাণারের বহু প্রযোজনার সাক্ষী থেকেছি আমি। দলের সঙ্গে গেছি বহু জায়গায়। আমার সেজকাকু প্রয়াত মদন রায়ের নির্দেশনায় রাণার বেশ কিছু নাটক করেছে ভাবতে গর্ব হয়। আমার স্বর্গত বাবা ও মায়েরও এই নাট্য দলের প্রতি আলাদা ভালবাসা ছিল সেটা ভেবেও ভাল লাগে। আমি নিজে প্রয়াত উৎপল ভদ্রের প্রতিষ্ঠিত 'বিদ্রোহী'তে যোগ দিলেও রাণারকে নিজের মনে করে এসেছি চিরকাল। আজও করি।
একটানা ৪৯ বছর ধরে একটি নাট্য দল শুধু নাটক করে আসছে নয়, নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজনও করছে। আর তাতে অসম ও এই বঙ্গের বহু দল যোগ দিয়েছে। এবারও ২৫ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা নাট্য উৎসবে যোগ দিচ্ছে কলকাতা, বহরমপুর, নৈহাটি, মাথাভাঙ্গা, গড়িয়া, হলদিবাড়ি ইত্যাদি জায়গার নানা দল।
নাটক, সমাজসেবা ও নাট্য আন্দোলনে উত্তরের যে নাট্যদলগুলি প্রথম সারিতে, রাণার তাদের একজন। মনে পড়ে হলদিবাড়িতে 'লোকটা' এবং 'একটি অবাস্তব গল্প' নাটক দুটির মাঝে সংস্থার হয়ে আমার আবৃত্তি, দশমীর ঘাটে বা বেসিক স্কুলের মাঠে সংস্থার ২৫ ডিসেম্বরের নাট্যোৎসব, রাণার প্রদত্ত সম্মাননায় বাবা বা সেজকাকুর শিশুর মতো আনন্দিত হয়ে ওঠা! মনে পড়ে সন্টুদা, নারায়ণদার মতো অকালে চলে যাওয়া নাট্যপ্রেমী কত মানুষের কথা!
২৫ ডিসেম্বর থেকে রাণার নাট্য উৎসব শুরু হচ্ছে ফালাকাটার কমিউনিটি হলে। এবারের শ্রেষ্ট প্রযোজনা পুরস্কার নামাঙ্কিত হয়েছে আমার বাবা ও মায়ের নামে। ফালাকাটার অগ্রগতির জন্য বাবার অবদান রাণার মনে রেখেছে এই ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে আমাদের কাছে অত্যন্ত আনন্দের। পুরস্কার প্রদানের দিন সশরীরে আমি বা আমার দাদা উপস্থিত থাকতে পারব না। আমাদের পরিবারের হয়ে সেদিন বাবা মায়ের নামাঙ্কিত সম্মাননা তুলে দেবে আমার আর এক দাদা অভ্রোজ্যোতি (অলক) গুহ ও আমার পরিবারের আর এক সদস্য দেবব্রত (পুটন) ঘোষ।
রাণার এগিয়ে চলুক আরও অনেক দিন...তার চলা যেন শেষ না হয় কখনও....

No comments:
Post a Comment