Tuesday, July 26, 2022



মুজনাই তীরের ফালাকাটা: অনন্য ডুয়ার্সের অন্য গল্প
শৌভিক রায়

ডুয়ার্স তথা উত্তরবঙ্গের সমৃদ্ধ জনপদ ফালাকাটা, ১৮৬৯ সালে, প্রশাসনিক দিক থেকে অবিভক্ত জলপাইগুড়ির প্রথম মহকুমার মর্যাদা পেলেও, তার অস্তিত্ব কিন্তু আগে থেকেই পাওয়া ছিল। একথা বলবার কারণ হল যে, ডুয়ার্সের বহু জনপদ গড়ে উঠেছিল ওই শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে, ডুয়ার্সে চা-বাগান বিস্তারকে কেন্দ্র করে। তার আগে এই অঞ্চল ছিল শ্বাপদসঙ্কুল ঘন অরণ্যে ঢাকা। ফলে, বানিয়া ইংরেজ প্রথমদিকে ডুয়ার্স নিয়ে সেভাবে উৎসাহী ছিল না। কিন্তু ফালাকাটার বিষয়টি ছিল আলাদা। গভীর অরণ্যের ধারে খানিকটা লোকালয়, চাষের জন্য উপযুক্ত জমি, সেচের উপযুক্ত নদীর জল ইত্যাদি লোভনীয় ব্যাপারগুলি ফালাকাটার সঙ্গে জুড়ে ছিল বলে, এই স্থানটির ওপর আলাদা নজর ছিল দু'পক্ষেরই। ফলে, কোচবিহার রাজ্যের সঙ্গে ভুটানের যুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে হাতবদল হয়েছে এই জায়গাটির। ইতিহাস বলছে যে, ১৬৬৩ থেকে ১৭৭৩ অবধি কোচবিহার ও ভুটান বারবার নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে আর বারবার ফালাকাটার মালিকানা বদলেছে। 
কোচবিহারকে ইংরেজরা সহায়তা করবার আগে অবধি দীর্ঘ সময় ফালাকাটা ভুটানের অধীনেই ছিল। পরবর্তীতে বক্সা-জয়ন্তী ইত্যাদি হাতবদলের সময় বা তার কিছুদিন আগে, ফালাকাটাও পাকাপাকিভাবে কোচবিহারের মাধ্যমে ইংরেজদের হাতে আসে। 

ইতিহাস বলছে যে, ভুটানের অধীনে থাকবার সময় কর আদায়ের জন্য জলপথে ভুটানিরা আজকের ভুটনিরঘাটে এসে ডেরা বাঁধতো। অনেকে মনে করেন যে, বর্তমান ফালাকাটার টাউন ক্লাবের মাঠের `মেলার মাঠ` নামের  পেছনেও ভুটানের ইতিহাস রয়েছে। সেসময় অবশ্য মাঠ বলতে  সুভাষ কলোনি, এস এস বি ক্যাম্পের ইত্যাদি বিরাট এলাকার ফাঁকা জায়গাকেও বোঝাতো। সেই মাঠেই বসতো মেলা আর সে মেলাতে ঘোড়দৌড় পর্যন্ত হত।ভুটানের পাবর্ত্য অঞ্চল থেকে নেমে, ডুয়ার্সের ঘন জঙ্গল পেরিয়ে ফালাকাটাই ছিল একমাত্র জনপদ যেখানে ভুটানিরা কর আদায় থেকে শুরু করে অন্য আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠতো। তবে প্রামাণ্য ইতিহাস খানিকটা অধরা আজও।

১৮৬৯ সালে ফালাকাটাকে মহকুমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইংরেজরা এই জনপদের  গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছিল, যদিও বর্ষায় ভয়ঙ্কর তিস্তা-জলঢাকা ও তোর্ষার মাঝে অবস্থিত এই জায়গাটি থেকে জেলার অন্যত্র মজুদ থাকা সেনাবাহিনীর রসদ, ওষুধপত্র ইত্যাদি যোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য ছিল বলে চার-পাঁচ বছরের মধ্যে মহকুমা বক্সাতে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু ফালাকাটার কৌলিন্য বা গুরুত্ব তাতে কমে নি। কেননা নির্জন ও প্রায় জনমানবহীন ডুয়ার্সের যে জায়গাগুলি থেকে কিছু পরিমান খাজনা আদায় করা যেত, ফালাকাটা ছিল তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানে। ফলে এখানে তৈরি হয়েছিল এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ তহশীলখানা। সে সময় ফালাকাটার পরিচয় ছিল যে, ফালাকাটা মানেই হ'ল 'তহশীল অফিসের ঘড়ি, বংশীধরের ভুঁড়ি আর শিরীষ বসুর দাড়ি'। 

মুজনাই নদী তীরের ফালাকাটার নামকরণের পেছনে অধুনা একটি মত বলছে লোকদেবতা ফালাকাটা থেকে জায়গাটির নাম এসেছে। লোকদেবতা ফালাকাটার বাহন হল বাঘ এবং রয়েছে তাঁর দুই ভাই তুলাকাটা এবং ধুনাকাটা। শোনা যায় দেবতা ফালাকাটাকে নিয়ে ছড়াও- 'ভক্তি দিনু ফালাকাটা মহারাজ, থাকেন বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলত। পশ্চিমে হইল করতোয়া, উত্তর হইতে পূর্বেত তিস্তাবুড়ি বহে ধীর...।' তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, আমবাড়ি-ফালাকাটার নামকরণের পেছনে এই ছড়াটি বেশি প্রযোজ্য। অন্য একটি মত বলছে যে, ফালাকাটার পূর্ব -পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে ঘিরে থাকা ছোট্ট যদি সাপটানা ভূখন্ডকে ফালা ফালা করে কেটেছে বলে জায়গাটির নাম ফালাকাটা। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কোচবিহার রাজ্যের সাথে ভুটানের যুদ্ধে কোনো এক পক্ষের সৈনিকদের এখানে টুকরো টুকরো বা ফালা ফালা করা হয় বলে জায়গাটির নাম ফালাকাটা। 

প্রাচীন এই জনপদ আলিপুরদুয়ার জেলা তো বটেই, সমগ্র উত্তরবঙ্গেই পরিচিতি। শিলিগুড়ি-কোচবিহার, শিলিগুড়ি-আলিপুরদুয়ার সড়কপথে ফালাকাটা হয়ে যাতায়াত সময় ও দূরত্ব দুদিক থেকেই কম নেয়। রেলপথেও ফালাকাটা স্টেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের স্টেশন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ফালাকাটা এতদিন পরিচিত ছিল। হালে মাদারিহাট, বীরপাড়া, মাথাভাঙ্গা ইত্যাদি জায়গায় ব্রড গেজ লাইন চালু হওয়ার ফলে চাপ খানিকটা কমেছে। তা না হলে ভুটান-সহ উল্লিখিত জায়গাগুলির মানুষেরা নির্ভর করতেন ফালাকাটার ওপর। ভুটান থেকে ডলোমাইট পাঠানোর ক্ষেত্রেও ফালাকাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। আসলে ভৌগোলিকভাবে ফালাকাটার অবস্থানটি এতটাই সুবিধেজনক যে ডুয়ার্সে বেড়াতে আসা পর্যটক থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই ফালাকাটার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আক্ষরিক অর্থে ডুয়ার্স বলতে যা বোঝায়, তার মধ্যে ফালাকাটা ব্লকের সমস্ত অংশ না এলেও, অনেকটাই ডুয়ার্সের মধ্যে বা ডুয়ার্স ঘেঁষা সেটা বলতে অসুবিধে নেই। আর চরিত্রগত দিক থেকে ডুয়ার্সের জনজীবন, প্রকৃতি, আবহাওয়া ইত্যাদি সবকিছুই এক। বরং বাড়তি সংযোজন ফালাকাটার কৃষি জমি। আলিপুরদুয়ার জেলার আর কোনো ব্লকে এতো পরিমান কৃষি-জমি না থাকায় সমগ্র জেলার খাদ্যশস্য ফালাকাটা থেকেই সরাবরাহ করা হয়। আধুনিক কৃষিমান্ডির সাহায্য বতর্মানে তা পাড়ি দিচ্ছে জেলা পেরিয়ে দূর-দুরান্তেও। 

অতীতে ফালাকাটা ছিল ঘন অরণ্যে ঢাকা। সেই সময় জলদাপাড়া অরণ্যের বিস্তার ছিল  অনেকটা। ফলে সেভাবে লোকবসতি ছিল না। আজও ফালাকাটার কুঞ্জনগর ইকো টুরিজম সেন্টারের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা বুড়িতোর্ষা নদী পার হলেই  জলদাপাড়া।  ফালাকাটার কাছে  দেওগাঁর অরণ্যও একসময় জলদাপাড়ার অংশ ছিল। রাজ্যসড়ক সেই অরণ্যকে দু'ভাগ করেছে সেটা বোঝাই যায়। দেওগাঁতেই রয়েছে দক্ষিণ খয়েরবাড়ির বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন ও ইকো টুরিজম। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আদিম অরণ্যের বিপুল বিস্তারের জন্যই ফালাকাটা ব্লকে সেভাবে জনপদ গড়ে ওঠে নি। তাই এখানে পুরাতাত্ত্বিক কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না। জটেশ্বরের শিব মন্দির, ফালাকাটার মহাকাল মন্দির জাতীয় দু'চারটি সাধারণ মন্দির বা  মসজিদ ছাড়া অতি প্রাচীন বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পন্ন কোনো মন্দির বা মসজিদ বা গির্জা নজরে আসে না। অবশ্য সমগ্র ডুয়ার্সেই এই চিত্র। প্রকৃতি এখানে যতোটা উদার, মনুষ্যকীর্তি ঠিক ততোটাই কম। ভুটান থেকে  আঠারোটি ডোর বা দুয়ার (Doors বা দুয়ার থেকেই ডুয়ার্স কথাটির উদ্ভব) দিয়ে যে সমতলে আসা যেত তা ছিল মূলতঃ ঘন অরণ্যে ঢাকা এবং শ্বাপদসঙ্কুল। বানিয়া ইংরেজ চা চাষের মুনাফার লোভে ডুয়ার্সকে ব্যবহার করতে শুরু করলে চা-বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে শুরু করে এক একটি জনপদ। তাই পুরাতাত্ত্বিক দিক থেকে সমগ্র ডুয়ার্সে সেরকম কিছু পাওয়া যায় না। যদিও ডুয়ার্স নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসে নি, কেননা এখানকার অনেক ইতিহাস আজও অজানা। যাই হ'ক সে প্রসঙ্গ আলাদা। 

ফালাকাটার কাছে থাকা কুঞ্জনগর ইকো টুরিজম সেন্টার ছিমছাম শান্ত পরিবেশে বিনোদনের একটি সুন্দর আশ্রয়। ওয়াচ টাওয়ার থেকে জলদাপাড়ার জঙ্গল দেখার অভিজ্ঞতা অন্যরকম। নদীর ওপর ঝুলন্ত ব্রীজ পেরিয়ে ওপারে জলদাপাড়াতে প্রবেশ করা যায়, যদিও তা নিষিদ্ধ ও বিপদজনক। কুঞ্জনগরের পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিতা, ময়ূর ইত্যাদি রাখা থাকতো কিছুদিন আগেও। দুর্ভাগ্য সেগুলিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরণ্যক কুঞ্জনগর নিঃসন্দেহে ভাললাগার একটি জায়গা। ফালাকাটার নিকটবর্তী  শালকুমারের দিক থেকে পূর্ব জলদাপাড়ার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। কুঞ্জনগর ও শালকুমারে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে থাকবার ব্যবস্থাও রয়েছে। তাই চাঁদনি রাতে নদীগুলির  নীল জলের ধারে যূথবদ্ধ পশুর দল দেখার আনন্দ সারাজীবনের সঞ্চয় হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ খয়েরবাড়িতেও ছোট্ট নদীর দুধারে বিস্তৃত ইকো-পার্ক যেমন শিশুদের মনোরঞ্জন করে তেমনি খাঁচায় বন্দী বাঘেরা আবালবৃদ্ধবনিতাকে আনন্দ দেয়। করা যায় বোটিং। খাওচাঁদপাড়া পিকনিক স্পটটিও সুন্দর। এখানেও আরণ্যক পরিবেশে নদীর সাথে কথোপকথন শেষে হারিয়ে যাওয়ার নেই মানার জগতে চলে যাওয়া যায়।  ফালাকাটার প্রধান নদী মুজনাইয়ের উৎসস্থল মাদারিহাট ব্লকের বাঙাবাড়ি  আর একটি দর্শনীয় স্থান। মুজনাইয়ের বৈশিষ্ট্য হলো তার উৎসমুখ।  মাটির তলা থেকে সৃষ্ট প্রস্রবণ ও সেই প্রস্রবণ থেকে একটি আস্ত নদীর জন্ম মুজনাইকে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। অবশ্য আর্টিজিয় কূপের থেকেই নদীটির সৃষ্টি কিনা সে বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। যদিও নদীতে সারা বছর জলের উৎস নিয়ে ভূগর্ভস্থ কূপগুলির ভূমিকা নিয়ে সকলেই একমত। সামান্য দূরত্বে থাকা এই তিন-চারটে প্রস্রবনের  জলধারা নিম্নগতি-প্রাপ্ত হয়ে দক্ষিণমুখী হয়েছে। চলার পথে তার সাথে মিশেছে আরও কিছু জলধারা। এই প্রবাহই মুজনাই নামে পরিচিত। ফালাকাটা ব্লক পার করে কোচবিহার জেলায় প্রবেশ করে নদীটি মিশেছে  জলঢাকাতে এবং এই মিলনস্থল থেকে জলঢাকা মানসাই নাম নিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে একদা মুজনাই, মানসাই নামে পরিচিত ছিল। মুজনাইয়ের উৎসস্থল, পাশে থাকা শিব মন্দির, উঁচু টিলায় মুজনাই চা -বাগান ও অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য হয়ে উঠতে পারে ডুয়ার্স ভ্রমণের অন্যতম ডেস্টিনেশন।     


ডুয়ার্সের অন্যান্য বহু জনপদের মতোই ফালাকাটার উপকন্ঠেও রয়েছে দু'টি চা-বাগান। আর এই চা-বাগান পত্তনের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে আজকের ফালাকাটার অন্যতম দ্রষ্টব্য এখানকার রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল। এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অমূল্য ইতিহাস। সেভেনথ ডে অফ অ্যাভভেন্টিস্ট চার্চ প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত এই বিদ্যালয়টি  কালের যাত্রায় সত্তরটি বছর পার করে দিয়েছে। স্বাধীনতার দুই বছর পর ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের স্থাপনের পেছনে চা-বাগানের ভূমিকাকে কেন অস্বীকার করা যায় না? আসলে, ডুয়ার্সে চা-বাগান প্রতিষ্ঠার জন্মলগ্নে নেপাল ও ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে দলে দলে শ্রমিক নিয়ে আসা হয়েছিল। এইসব হতদরিদ্র, শোষিত ও বঞ্ছিত মানুষদের কাছে খ্রিস্টান ধর্মের গ্রহণযোগ্যতা অন্য ধর্মের চাইতে বেশি ছিল, কেননা মিশনারীরা নানাভাবে তাদের কাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন। গত শতকের চল্লিশের দশক সময়কালে ফালাকাটার আরণ্যক পরিবেশে বন কেটে তৈরী হচ্ছিল কাদম্বিনী ও কোচবিহার চা-বাগান। আশেপাশের নানা অঞ্চলেও চলছিল চা-বাগান তৈরীর কাজ। আর তার জন্য তদানিন্তন ছোটনাগপুরের কার্মাটার-সহ নানা প্রান্ত থেকে প্রচুর পরিমাণে শ্রমিক আনা হয়েছিল এবং প্রায় তাদের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হয়েছিলেন সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের এম জি চ্যাম্পিয়ান ও সি জে জেনসন। ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি তাদের উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার। ফালাকাটা সেই সময় ছিল অত্যন্ত সুন্দর। তেপান্তরের মাঠের মতো বিরাট মেলার মাঠের উত্তরে ঝকঝক করছে  নীল পাহাড়। জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের সীমা ছুঁয়ে যাচ্ছে  ফালাকাটাকে।  আছে থানা, ড্রামাটিক হল, তহশিল অফিস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সৈনিকদের ব্যবহৃত আবাসস্থলটি পরিণত হয়েছে  গ্রন্থাগারে। ডুয়ার্সের নিয়মানুযায়ী সারা বছরই ফালাকাটায় তখন না ঠান্ডা না গরম আবহাওয়া। বৃষ্টিপাতও প্রচুর।  কার্মাটারের চাইতে তুল্য বিচারে পছন্দের জায়গা ছিল সেই সময়ের ফালাকাটা। এখানে কাজ করবার সুযোগ ও প্রয়োজনও ছিল বেশি। তাছাড়াও কার্মাটারে রবিনসন এস ডি এ হাই স্কুলের দায়িত্বে থাকা এম জে চ্যাম্পিয়ান নিজেও চাইছিলেন বিদ্যালয়টিকে সেখান থেকে অন্যত্র সরাতে। কেননা, কার্মাটারে বিদ্যালয়টি সেভাবে পরিচিতি পাচ্ছিল না। ফালাকাটায় চা-শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করবার ফাঁকেই চ্যাম্পিয়ান ও জেনসন তাই জমি খুঁজতে শুরু করেছিলেন। আজকের ফালাকাটা স্টেশন লাগোয়া পাঁচশো একর জমি সে সময় চা-বাগান তৈরীর জন্য ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বালু জমি হওয়াতে চা-বাগানের মালিক ও ম্যানেজাররা সেই জমিতে কোনও আগ্রহ দেখান নি। চ্যাম্পিয়ান ও জেনসন সেই জমি পছন্দ করলেন। তাঁদের ও অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের শুভানুধ্যায়ী মিসেস রেমন্ড আর্থিকভাবে সহায়তা করলেন। জমি নিজেদের অধিকারে এলে শিক্ষাব্রতী চ্যাম্পিয়ান কার্মাটারে রবিনসন এস ডি এ হাই স্কুলকে স্থানান্তর করলেন ফালাকাটায়। শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। ফালাকাটায় বিদ্যালয় শুরুর দিনগুলিতে কার্মাটার থেকে প্রিন্সিপাল চ্যাম্পিয়ানের সঙ্গে ছয়জন মহিলা ও নয়জন পুরুষ অর্থাৎ মোট পনের জন ছাত্রছাত্রী জিপে চেপে এসেছিলেন। পথে দুর্ঘটনায় একজন ছাত্র মারা যান। চ্যাম্পিয়ান নিজেও আহত হয়েছিলেন। সেইসময় দুটি তাঁবুতে সকলের থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ অবধি চ্যাম্পিয়ান ছিলেন স্কুলের প্রিন্সিপাল। বর্তমান ছাত্রাবাসটি তাঁর নামেই নামাঙ্কিত। চ্যাম্পিয়ানের যোগ্য সঙ্গিনী ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডরোথি। ছাত্রী-আবাসের নামকরণে তাঁর স্মৃতি সযত্নে রক্ষিত আজও।  এম জে চ্যাম্পিয়ানের পর বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেন এল এন হেয়ার। তাঁকে বার্মা থেকে নিয়ে আসা হয়। তাঁর দুই বছরের কার্যকালে বিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামটি তৈরী হয়। তবে বিদ্যালয়ের ভবনগুলি নির্মিত হয় আরও পরে ই এ স্ট্রিটারের আমলে। তাঁর অবসরের পর এইচ ডি এরিকসন, ডি এইচ স্কাও, এ ডব্লু ম্যাথেসন হয়ে ১৯৬৯ সালে, প্রথম ভারতীয় হিসেবে, বিদ্যালয়ের দায়িত্বভার নেন  ডি এস পোদ্দার। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিদ্যালয়ের নানা কর্মকান্ড। আজ 'কমপ্লিট স্কুল' বলতে যা বোঝায় রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল ঠিক তা-ই। মিসেস রেমন্ডের স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে নিজস্ব জমি, চাষের বন্দোবস্ত, শস্যাগার, ট্রাক্টর, হাসপাতাল, খেলার মাঠ, প্রচুর গাছ, সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভান্টিস্ট চার্চ ও উপাসনালয় ইত্যাদি সবকিছুই রয়েছে। ছাত্রসংখ্যাও দিনদিন বেড়ে চলেছে। বিদ্যালয়ের ফলও যথেষ্ট ভাল হচ্ছে।  


প্রথম থেকেই ফালাকাটা ছিল সংস্কৃতি-মনস্ক। যে সময় ডুয়ার্সের বিভিন্ন জনপদ সেভাবে গড়ে ওঠে নি, তখন থেকেই ফালাকাটা কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পরিচয় দিয়ে এসেছে। আর সেই পরিচয়ের ইতিহাস ধরা রয়েছে ফালাকাটার ড্রামাটিক হলে। ১৯২৩ সালে ফালাকাটায় প্রতিষ্ঠিত হয় হলটি। তখনকার ফালাকাটার উত্তরদিকে, তহশীল অফিসের কাছে, খাসমহল ময়দানের পাশে থাকা ড্রামাটিক হল নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তদানিন্তন তহশীলদার স্বয়ং। সঙ্গে ছিলেন জোতদার ফ্যারড ও ফালাকাটার সে সময়কার বিশিষ্ট মানুষেরা। ড্রামাটিক হলের উদ্যোগে ফালাকাটার বুকে ১৯২৪ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হয় 'দেবলা দেবী` নাটকটি। ডুয়ার্সের আর কোনও জায়গায় এরকম নিদর্শন দেখা যাচ্ছে না। সংস্কৃতি চর্চায় ড্রামাটিক হল দীর্ঘদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।পাশাপাশি একটি বিরাট অঞ্চলের বিনোদনের একমাত্র জায়গা ছিল ড্রামাটিক হল যা অন্যসময় নাম পালটে গৌরী টকিজ নামে ছায়াছবি প্রদর্শন করত। সেসময় গৌরী টকিজ এতটাই বিখ্যাত ছিল যে, ফালাকাটার আশেপাশের এলাকা তো বটেই এমনকি শিলবাড়িহাট, মাদারিহাট, বীরপাড়া, গয়েরকাটা, ধূপগুড়ি ইত্যাদি জায়গা থেকেও মানুষজন গৌরী টকিজে আসতেন। এই প্রসঙ্গে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হসপিটালের সঙ্গে যুক্ত নামী চিকিৎসক ডঃ রজত ঘোষ জানাচ্ছেন, 'সে সময় বীরপাড়া থেকে ফালাকাটার গৌরী টকিজে ছবি দেখতে যাওয়া একটা উৎসবের মতো ছিল। আমরা সবাই দল বেঁধে চলে যেতাম। সেসব ছিল সোনার দিন।'  ড্রামাটিক হলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ফালাকাটার নাট্য ও সংস্কৃতি চর্চার জগতে এক ঝাঁক অভিনেতা-অভিনেত্রী ও দক্ষ পরিচালকের জন্ম হয়। এদের মধ্যে ফালাকাটার প্রথম মহিলা অভিনেত্রী হিসেবে দীপালি দে দিশারী পুরস্কার পান। শিশু অভিনেতা হিসেবে প্রিয়াঙ্কু ঘোষ আশির দশকে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে সাড়া ফেলেছিলেন। ড্রামাটিক হলে নাট্য চর্চা থেকেই ফালাকাটায় ১৯৮০ সালে শুরু হয়েছিল মুক্তমঞ্চ। ড্রামাটিক হলের বিপরীতে, আজকের দশমীর ঘাটের কাছে, শিশু সদনের পাশে শুরু হয়েছিল 'ফালাকাটা মুক্তমঞ্চ'। এর আগে উত্তরবঙ্গের একমাত্র শিলিগুড়িতে ১৯৭৯ সালে মুক্তমঞ্চ শুরু হয়। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে ফালাকাটার মুক্তমঞ্চ সেই সময়ের এক সাহসী প্রচেষ্টা। ১৯৯০ সাল অবধি ফালাকাটা মুক্তমঞ্চে বিভিন্ন নাট্যদল নাটক মঞ্চস্থ করেছে। ফালাকাটার নাট্যচর্চায় পাখি ঘোষ, দিলীপ মুখোটি, বিনায়ক দেব, মদন রায় প্রমুখেরা অতীতের বংশীধর দোবে, দেবেন্দ্রনাথ নন্দী, মানিক বোস, ডঃ রমণী দাস প্রমুখদের পরম্পরাকে বহন করেছিলেন দীর্ঘদিন। আজ সেই ঐতিহ্য অনেকটা ম্লান হলেও এখনও রাজ্যস্তরে নাট্যপ্রতিযোগিতার আয়োজন হয় এখানে। 

মুক্তমঞ্চের এই জায়গাতে আজও বসে ফালাকাটার বিখ্যাত দশমীর মেলা। ফালাকাটার দশমীর ভাসান একসময় ছিল অত্যন্ত নামী। মুজনাইয়ের জলে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিমা নিয়ে আসা হত। সেই জাঁকজমক খানিকটা কৌলিন্য হারালেও, যা আছে তা কম দামি নয়।   

১৯৫৯ সালে ফালাকাটা সর্বভারতীয় খবরের শিরোনাম হয়েছিল শৌলমারি আশ্রমকে কেন্দ্র করে। সারদানন্দজী প্রতিষ্ঠিত আশ্রমের দিকে নজর ছিল সমস্ত ভারতের। শৌলমারি কোচবিহার জেলাতে হলেও একেবারেই ফালাকাটা লাগোয়া। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে জলঢাকার উপনদী মুজনাই। রয়েছে কোচবিহার চা-বাগান। আর যে আমলের কথা বলছি তখন তো এমনিতেই ফালাকাটা আরণ্যক পরিবেশের মধ্যে ছোট্ট একটি জনপদ। সারদানন্দজীর চেহারা ও হাবভাবের সাথে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের সাদৃশ্য থাকায় দ্রুত রটে যায় সারদানন্দজী আর কেউ নেন স্বয়ং নেতাজী এবং কোচবিহার জেলার গায়ে লাগানো সাবেক জলপাইগুড়ির এই জায়গাটিকে বেছে নেওয়ার কারণ হল ফালাকাটার ভৌগোলিক অবস্থান। শৌলমারি কোচবিহার জেলার  কিন্তু তার সব কর্মকান্ড ফালাকাটা-কেন্দ্রিক।ছোট্ট এই জায়গাটি থেকে নেপাল, ভুটান, আসাম খুব কাছে। ডুয়ার্স-তরাইয়ের বিস্তীর্ণ জঙ্গল, মুজনাই-জলঢাকা হয়ে ব্রক্ষ্মপুত্রের জলপথ, আসাম হয়ে তখনকার পূর্ব পাকিস্থান এবং ব্রক্ষ্মদেশে গা ঢাকা দেওয়ার সুবিধের জন্যই নাকি সারদানন্দজীবেশী নেতাজী ফালাকাটা বেছে নেন। সেই আমলে সারা ভারত থেকে দলে দলে লোক আসতে শুরু করেন ফালাকাটায় আশ্রম ও সারদানন্দজীকে দেখতে। আসেন প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা। কিন্তু ১৯৬৭ সালে সারদানন্দজী ফালাকাটা ছেড়ে যান। শৌলমারির আশ্রম আজও আছে। আশ্রমে দীক্ষিত যারা তারা দেখভাল করেন আশ্রমের, মিলিত হন। আজ দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত যে সে আমলে এই আশ্রমে জেনারেটর চলতো, প্রাথমিক বিদ্যালয় বসতো, নানাবিধ কর্মকান্ডে সরগরম থাকতো আশ্রম-প্রাঙ্গন। শৈলেশ দে রচিত 'আমি সুভাষ বলছি' থেকে শুরু করে নেতাজী-কেন্দ্রিক বহু গ্রন্থে শৌলমারির উল্লেখ পাওয়া যায়।  

প্রতি বর্গকিমিতে সবচাইতে কম জনঘনত্বের দিক থেকে ফালাকাটা কিন্তু আলিপুরদুয়ার জেলায় প্রথম। তবে ডুয়ার্সের আর সব শহরের মতোই ফালাকাটাতেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে দেশভাগের পর। অসমের রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থাও বহু মানুষকে ফালাকাটামুখী করেছিল একটা সময়। এটা অস্বীকার করা যায় না যে, ফালাকাটার বহু অঞ্চল  দেশভাগের ফলে আগত মানুষদের হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে সত্তরের দশকে আজকের বাংলাদেশ জন্মের সময়েও আছড়ে পড়েছিল সেই একই ঢেউ।  সুভাষপল্লী, অরবিন্দপল্লী, দেশবন্ধুপাড়া ইত্যাদি নামের মধ্যে দেশভাগ ও স্বাধীনতা-আন্দোলনের ছোঁওয়া লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি রিফুইজি রিহ্যাবিলিটেশন প্রাইমারি স্কুল (আর আর প্রাইমারি স্কুল নামে পরিচিত) আজও মনে করিয়ে দেয় সেদিনের উদ্বাস্তু সমস্যাকে। ফালাকাটার অতীতের সেই চিত্র আজও মনে পড়ে পদস্থ সরকারি কর্মী প্রণব রায়ের। তার কথায়, 'সত্তরের দশকের প্রথম দিকে যখন আমরা নিজেরাই খুব ছোট, তখন দেখেছিলাম বিএলআরও অফিসের নিচে, আজকের কমিউনিটি হলের পাশে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাসরুমের পাশের মাঠে খোলা আকাশের তলায় শরণার্থীদের ভিড়। অনেকের পুনর্বাসন হয়েছিল গোপনগর, কুঞ্জনগরের দিকে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে, রিক্সা-ঠ্যালা চালিয়ে, ব্যবসা করে সেই মানুষেরা ধীরে ধীরে ফালাকাটার মূল স্রোতে মিশে গিয়েছিলেন।' এইসব মানুষদের জন্য ফালাকাটার তদানিন্তন মানুষেরা কিন্তু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে স্ব-প্রতিষ্ঠিত সুদীপ্ত আচার্য মনে করালেন খাসমহল ময়দানে বড়দার ফুটবল কোচিং ক্যাম্পকে। ফালাকাটার সব খেলোয়াড়রা অংশ নিলেও, মূলত শরণার্থী পরিবারের ছেলেদের কথা ভেবেই এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন বড়দা নামে পরিচিত হেমেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। ফালাকাটায় অবশ্য খেলাধূলার চর্চা অতীত থেকেই রয়েছে। একটা সময়ে টাউন ক্লাবের মাঠে রীতিমতো টিকিট বিক্রি করে ফুটবল টুর্নামেন্ট পরিচালনা করা হত, তাতে অংশ নিত বিখ্যাত রয়াল ভুটান, নর্থ বেঙ্গল স্টেট ট্রান্সপোর্ট, হালিশহর, বারাসত ইত্যাদি নানা দল। ফালাকাটার এই মাঠ পরবর্তীতে জন্ম দিয়েছিল দেবব্রত (পুটন) ঘোষ, উজ্জ্বল দেসরকার, রবিশঙ্কর দাসের মতো খেলোয়াড়কে। 

ডুয়ার্সে  শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রেও ফালাকাটার ভূমিকা কিন্তু অস্বীকার করা যায় না। ফালাকাটা হাই স্কুল দীর্ঘদিন একটি বিস্তীর্ন অঞ্চলের একমাত্র স্কুল ছিল যেখানে বিজ্ঞান,কলা ও বাণিজ্য তিন বিভাগেই পড়ানো হত। বীরপাড়া, মাদারিহাট, শিলবাড়ীহাট, শালকুমার, আটপুকুরিয়া ইত্যাদি নানা জায়গা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা একসময় ফালাকাটায় পড়তে আসত। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষাকেন্দ্রে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয় ও ফালাকাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে বসত এই বিস্তীর্ন অঞ্চলের ছাত্র ছাত্রীরা। আজ রাজ্যের সব জায়গার মতোই ফালাকাটাতেও অনেকগুলি  বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বোঝা সম্ভব না যে, সেসব দিন কীরকম ছিল। তবে সেদিনের সেই কষ্টের পরম্পরাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এখানকার ছাত্র ছাত্রীরা আজ মেধা তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে ভাবতেই ভাল লাগে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে  ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত  এখানকার টাউন লাইব্রেরি বা সুভাষ পাঠাগারের কথা। ফালাকাটার শিক্ষা বিস্তারে এই গ্রন্থাগারটি এখনও  অসামান্য ভূমিকা নিয়ে চলেছে। ফালাকাটার শিক্ষাব্যবস্থা- সহ সামগ্রিক উন্নতিতে যে সকল মানুষেরা একসময় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে নীরদবরণ রায়, মনোরঞ্জন ভদ্র, হরচন্দ্র চক্রবর্তী, মায়া বোস,  ডঃ সুভাষ সেনগুপ্ত, যোগেশচন্দ্র বর্মন, অনিলকুমার অধিকারী প্রমুখদের কথা অনস্বীকার্য। বাদ পড়ছে বহু নাম। মার্জনা প্রার্থনীয়। 

শিক্ষার পাশাপাশি উল্লেখ করতে হয়, স্বাস্থ্যের কথাও। সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল থাকলেও কেন জানি খানিকটা ঢিলেঢালা ফালাকাটার স্বাস্থ্য পরিষেবা। আবার বাসস্ট্যান্ডের অভাবও ঝাঁ চকচকে রাস্তার কৌলিন্যকে ম্লান করেছে। অথচ, উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহনের জন্মলগ্নে যাত্রীবাহী যে বাস কোচবিহার থেকে প্রথম নিয়মত যাত্রা শুরু করেছিল তার গন্তব্য ছিল ফালাকাটা। উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার পঁচাত্তর বছর পূর্তি বর্ষে ফালাকাটায় কোনও বাসস্ট্যান্ড না থাকা নিঃসন্দেহে একটি বিরাট ক্ষত। একইরকমভাবে মহকুমার মর্যাদা আজও ফিরে পায় নি ফালাকাটা। জোটে নি পৌরসভার তকমাও। নামি দামি হোটেল, রিসোর্ট ও দুরন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলেও, ফালাকাটাকে কেন্দ্র করে সেভাবে করা হয় নি পর্যটন পরিকল্পনা। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে, আজকের ফালাকাটার উত্তর আকাশ থেকে হারিয়ে গেছে ঝকঝকে নীল ভুটান পাহাড়ের সারি। যে সাপটানা নদী কোনো কোনো বর্ষায় দু ' কুল ছাপাতো আজ তা শুকনো খাতে পরিণত। রহস্যময় নদী মুজনাইও গতিপথ পাল্টে কোনো অজানা অভিমানে বয়ে চলেছে নিজের মতো। সারা বছর ভোর বেলার সেই টাটকা আমেজ এখন শুধুই স্মৃতি। উধাও প্রবল শীতের জমজমাট কুয়াশা আর দিগন্তে মেলানো হলুদ পাখি। হারিয়ে গেছে রাস্তার ধারের  শিমুল গাছের লাল ফুলেরা কিংবা বর্ষা শেষের গাছে পুরু শ্যাওলার আস্তরণ। হারানো ও না পাওয়ার তালিকায় এরকম আরও কতো কি রয়ে গেল কে জানে!    

তবে, পাওয়া আর না পাওয়া নিয়েই জীবন বলে কোনও কিছু থেমে থাকে না। ফালাকাটাও থেমে নেই। সেই ধূসর অতীত থেকে বর্তমানের আলোকিত এই উজ্জ্বল দিনে ফালাকাটা আজও একইরকম। 

মুজনাই তীরের এই সমৃদ্ধ জনপদ মনের প্রশান্তি, প্রাণের আরাম।  
             

Saturday, July 23, 2022

 । নিজের ভাবনায় ।

       শৌভিক রায় 


আমাদের সময়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবর্ষ এক বছর দেরিতে চলছিল। ফলে এম এ পাস করে বি এড ট্রেনিং নিয়ে চাকরি পেতে পেতে, আমাদের অনেকের বয়স সাতাশ ছুঁই ছুঁই হত। তবে আমাদের একটি ভরসা ছিল, এম এ বি এড ডিগ্রি থাকলে মোটামুটি চাকরি একটি পাব। 


বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই চাকরি হত শিক্ষকতার। আর কোনও বিকল্পও ছিল না। রাজ্যের অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, সে যুগেও এই উত্তরে চা ছাড়া আর কোনও শিল্প ছিল না। (সেই সময় অবশ্য চা শিল্পও ধুঁকছে। লক আউট, মালিক পক্ষের চা বাগান ছেড়ে চলে যাওয়া ইত্যাদি ছিল নিত্য ঘটনা।) ফলে, এম এ বি এড পাস করা মানে মোটামুটিভাবে শিক্ষকতার খাতায় নাম লেখানো। 


যারা শিক্ষকতায় আসতে চাইত না, তারা গ্রাজুয়েট হয়েই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলি দিত। অনেকে এম এ পড়তে পড়তেও সেগুলি টকাটক পাস করে যেত। আমাদের আনন্দ হত, আবার ঈর্ষাও হত। তবে ভরসা ছিল চাকরি আমাদেরও হবে। হতও। যতদূর জানি, আমাদের সময়ে পাস করা বন্ধুরা, মোটামুটি চার পাঁচ বছরের মধ্যে, চাকরিতে ঢুকে গিয়েছিল সবাই। 


আমি নিজে যখন চাকরিতে ঢুকি, তখন আমার বয়স সাড়ে পঁচিশ। মনে আছে, আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন অধ্যাপক গুরুপদ দেব ও অধ্যাপক অম্লানজ্যোতি মজুমদার। দুজনেই কোচবিহারের জাঁদরেল ইংরেজির শিক্ষক। ক্লাস প্রেজেন্টেশন শেষে ভাইবাতে বিকেল চারটা দশ থেকে পাঁচটা অবধি ওঁরা ইংরেজি সাহিত্যের পুরো পরিক্রমা করিয়েছিলেন আমাকে। চাকরিটা অবশ্য হয়েছিল। বেসিক ছিল ১৭৮০ টাকা। গ্রস স্যালারি ৩০০০ টাকার একটু বেশি বা কম। তখনও 'আচ্ছে দিন' আসেনি। ফলে মুদি দোকানে তিন চারশ টাকায় মাসের মাল হয়ে যেত। সবজি, মাছ, বাড়ি ভাড়া (তখনও কোচবিহারে আমার নিজের বাড়ি হয়নি) ইত্যাদি খরচের পর সামান্য যে পয়সা থাকত, সেটা দিয়ে ঘরের জন্য কিছু কিনলে নিজেকে রাজা বাদশা মনে হত।


১৯৯৬ সালের সেই সময় আর আজকের দিন! বেতন বেড়েছে। পরিচিতি আর বয়সও বেড়েছে। কিন্তু এখন যত অসহায় লাগে, তেমনটি আর কোনোদিন লাগেনি ! অথচ আগের তুলনায় সামাজিকভাবে অনেক ভাল আছি হয়ত বা!


আমাদের ব্যাচমেট, সহকর্মী প্যারা-টিচার, দুপুরে বলছিল, "আর অ্যারেস্ট! টেট পাস করেছি সেই কবে। হবে হচ্ছে করে করে রিটায়ারমেন্টের সময় হয়ে এল। অন্যান্য রাজ্যেও প্যারা টিচারদের এই হাল নয়, যা আমাদের এখানে।"


তবু ওর কিছু অন্তত আছে। কিন্তু যে প্রজন্মগুলো পর পর শেষ হয়ে গেল! তাদের কি কিছু যাবে আসবে? যে প্রিয় প্রাক্তন ছাত্রটির চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করতে পারিনা "কেমন আছিস", তার কী যায় আসে কোটি কোটি টাকা পাওয়া গেলে! 


যারা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত নিজেদের দাবিতে খোলা আকাশের তলায় পড়ে রয়েছে, তাদের জন্যই তো এডওয়ার্ড থমাসের সেই প্যাঁচা আজও ডেকে চলেছে! আমরা বধির হয়েছি বলেই বোধহয় শুনতে পারিনা সেটা! এই দমবন্ধ করা পরিবেশের জন্য কি আমরা একদিন স্বপ্ন দেখেছিলাম!!


মোটামুটি স্বচ্ছল বেতনের একজন সরকারি বা বেসরকারি চাকুরে সারা জীবন নিজেকে নিংড়ে দিয়েও, অবসরের সময় যে পয়সা পান, তা দিয়ে কোচবিহারের মতো শহরেও তিন কাঠা জমি কেনা যায় না। মেগা সিটি তো বাদই দিলাম। তবু আমরা তাতেই সন্তুষ্ট থাকি। নিজেদের ওপর আমাদের সেই আস্থা আছে যে, কোনও অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করিনি। সেটাই আমাদের জীবনীশক্তি। কিন্তু আমাদের সেই অহংকারকে আজ একদম শেষ করে দিল কিছু ঘটনা পরম্পরা! এটাই কি আমাদের পাওনা ছিল? কে এই অধিকার দিল আপনাদের?


এই লেখা পড়ে অনেকে কোনও একটি নির্দিষ্ট শব্দবন্ধে আমাকে হয়ত বেঁধে ফেলবেন। না। আমি কোনও রাজনৈতিক দলের নই। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময়ের প্রবল প্রতাপশালী শাসকদের বিরুদ্ধে গিয়ে হাজতে পর্যন্ত ঢুকেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলাম সেদিনও, আজও আছি। থাকবও। সাধারণত এই জাতীয় লেখা লিখতেও পছন্দ করি না। লিখিও না। কিন্তু লিখতে বাধ্য হচ্ছি আজ। ওই সময় ওটা হয়েছিল, সেটা হয়েছিল, ওই রাজ্যে এটা হয়, সেটা হয়, চক্রান্ত করা হয়েছে ইত্যাদি যে যা খুশি বলতে পারেন, আজ কোনও যুক্তিই শুনব না।


এটা মানা যায় না। মানবও না। জানি বিরুদ্ধ শক্তির বিপরীতে ক্ষমতা আমার কিছুই নেই। তবু বলব। এই বলাটাই আমার কাজ। হয়ত এটাই ক্ষমতা.....



 


স্বাধীনতার ৭৫ বছরে উত্তরের  চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকরা
শৌভিক রায় 

সারা দেশ জুড়ে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উৎসব চলছে খুব স্বাভাবিকভাবেই। চলা উচিতও।  কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের এত বছর পরেও, ডুয়ার্স-তরাই সহ উত্তরের চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকদের অবস্থা দেখে মনে হয় যে, তাদের জীবনে স্বাধীনতা শব্দটি নিতান্তই উপহাসের বিষয়। মনোরম ও সুদৃশ্য সবুজ চা-বাগানের আপাত সৌন্দর্যের পেছনে মহিলা শ্রমিকদের কত যে যন্ত্রনা লুকিয়ে আছে তা বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। ভাবতে অবাক লাগে, জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র এই বিষয়ে নিতান্তই উদাসীন। ফলে আজ দেশের সর্বত্র স্বাধীনতার ৭৫ বর্ষপূর্তি উৎসব উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হলেও, চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকদের কাছে তার কোনও তাৎপর্য নেই। কেননা স্বাধীনতার আগেও তারা যে তিমিরে ছিলেন, আজও সেই তিমিরেই রয়ে গেছেন।  

উত্তরের চা-বাগানগুলির দিকে নজর দিলে আমরা সাধারণত দুই ধরণের আদিবাসী শ্রমিকদের দেখতে পাই। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা তাদের 'ব্ল্যাক' ও 'হোয়াইট' ট্রাইবাল নামে চিহ্নিত করেছেন। এদের অধিকাংশদের চা-বাগান পত্তনকালে ছোটনাগপুর ও নেপাল থেকে আনা হয়েছিল। আসলে জঙ্গল কেটে চা-বাগান সৃষ্টি করাকে উত্তরের ভূমিপুত্ররা কখনই ভাল চোখে দেখেন নি। ফলে, ডুয়ার্স-সহ উত্তরের চা-বাগানগুলিতে তারা শ্রমিকের কাজেও যোগ দেন নি। খানিকটা আতান্তরের সম্মুখীন হয়েই চতুর ইংরেজরা অন্য জায়গা থেকে আদিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে এসেছিল ঘন জঙ্গল কেটে চা-বাগান তৈরি করার কাজে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গোটা পরিবার ধরে এই শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়েছিল। ফলে, নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনও প্রভেদ ছিল না কর্মক্ষেত্রে। শ্রমিক-মহিলারা পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেদিন কাজে নেমেছিল। ডুয়ার্সের ঘন জঙ্গল কেটে চা-বাগানের উপযুক্ত জমি তৈরি করতে গিয়ে সেদিন তাদেরও ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর বা সাপের কামড়ে মরতে হয়েছিল। চা-বাগান তৈরি হয়ে গেলে, চারা গাছকে পরিচর্যা থেকে শুরু করে চা-পাতা তোলার কাজে তাদের দক্ষতা সর্ব যুগেই প্রমাণিত হয়েছে। তাই পুরুষ ও মহিলা শ্রমিকেরা সম-অধিকার পাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে চিত্র একেবারেই অন্য। ইংরেজ আমলে পুরুষ শ্রমিকেরা যে সুযোগ সুবিধে পেত, মহিলা শ্রমিকদের সেটা জুটত না। ইংরেজ আমল শেষ হয়ে আজ এতদিন পার করে এলাম আমরা। কিন্তু ব্রিটিশদের সৃষ্ট সেই নিয়ম আজও কমবেশি রয়ে গেছে চা-বাগানের সবুজ অলিন্দে। এখনও মহিলা শ্রমিকেরা পুরুষদের তুলনায় অনেকক্ষেত্রে বঞ্চিত। অথচ সার প্রয়োগ থেকে শুরু করে চা- গাছের পরিচর্যা এবং সুচারু ও সঠিকভাবে চা-পাতা তোলার ক্ষেত্রে মহিলাদের দক্ষতা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি। তাদের এই ক্ষমতা সহজাত ও প্রকৃতিদত্ত। কিন্তু বিস্ময়কর যে, নারী স্বাধীনতার এই সময়েও,  চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকদের কোনো পদোন্নতি হয় না। পুরুষেরা দিনমজুর থেকে মাস মাইনের মজদুরের পর্ব সেরে, বাগানের অফিস কর্মী হয়ে গেলেও, অজানা  কারণে মহিলারা কিন্তু  চা-পাতা তোলার মধ্যেই আটকে রয়েছেন। তাদের জন্য চা-পাতা তোলা এবং সংসার সামলানো ছাড়া আর কিছুই বরাদ্দ নেই!   

স্বাধীনতার আগে চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকদের অনেকেই ইউরোপিয়ান টি প্লান্টার, চা-বাগান ম্যানেজার বা অন্য কোনও উচ্চ পদস্থ কর্মচারীদের যৌন লালসার শিকার হতেন। আজ সে অবস্থা বদলালেও সন্তানের জন্মের পর মরদ বা স্বামীর শিশু পুত্র বা কন্যাকে ছেড়ে দেওয়ার ধারাবাহিকতা এখনও বিদ্যমান। অত্যন্ত কম মজুরি প্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্ত, সেই মহিলাদের দিন গুজরান কীভাবে হয় তা সহজেই অনুমেয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আড়কাঠিদের প্রবল প্রতাপ। কখনও প্রলোভন, কখনও বা ভয় দেখিয়ে তারা খুব সহজেই চা-বাগানের শ্রমিক মহিলাদের পাচার করছে কলকাতা-দিল্লি-মুম্বাই সহ দেশের একাধিক কুখ্যাত পতিতাপল্লীতে। ইদানিং দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আড়কাঠিদের হাত ধরে চা-বাগানের বিপন্ন নারীরা পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বাইরে মধ্যে প্রাচ্যের মতো দেশগুলিতে যৌনদাসী হয়ে। চা-বাগানগুলিতে দারিদ্র ও চেতনা স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও তলানিতেই রয়ে গেছে। এমনও দৃষ্টান্ত আছে যে, একটি লিপস্টিকের প্রলোভন চা-বাগানের কিশোরীকে ঘর ছাড়া করেছে! 'চায়ের ডুয়ার্স কী চায়' গ্রন্থে গৌতম চক্রবর্তী লিখছেন, 'বাগান বন্ধ থাকুক বা চালু, চা-বাগিচায় সক্রিয় মেয়ে পাচারের আড়কাঠিরা। তাদের হাত ধরে দুটো ভাল খেতে-পরতে পাওয়ার আশায় ভিন রাজ্যে পাড়ি দিয়ে কখনও চিরতরে নিখোঁজ হয় চা-বাগান মহল্লার মেয়েরা, কখনও ফেরে লাশ হয়ে, কখনও আবার অন্তঃসত্বা কিংবা বোধ উন্মাদ হয়ে। ...বাগানেরই এক মাসির হাত কাজের খোঁজে গিয়েছিল ১৫-১৬ বছরের দুই কিশোরী। একজন পালিয়ে এসেছে।  অপরজন এখনও নিখোঁজ। জানা গিয়েছে, বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামীণ অনুষ্ঠানে ওদেরকে দিয়ে অশ্লীল নাচ প্রদর্শন করানো হত। ` 

এই চিত্র কিন্তু কখনই কাম্য ছিল না।  একটি তথ্য দেওয়া যাক। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে আমাদের রাজ্যে অপরাধের রিপোর্ট ছিল ১০,২৪৮টি। আমাদের আগে শুধুমাত্র মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র রয়েছে। মনে রাখতে হবে যে, বহু ঘটনা কিন্তু লিপিবদ্ধ হয় নি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে এই সংখ্যা কোথায় পৌঁছবে সেটা সহজেই অনুমেয়। এই ১০,২৪৮টি রিপোর্টের অন্তত ২০ থেকে ২৬ শতাংশ চা-বলয়ের। আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের তুলনায় অপরাধের মাত্রা ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে (সূত্র : হিন্দুস্থান টাইমস, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১)।  নারী পাচারের ক্ষেত্রেও আজকের ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলির অবস্থা উদ্বেগজনক। সরকারি বেসরকারি নানা প্রকল্পেও এই ঘৃণ্য অপরাধ আটকানো যায় নি। ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী চা-বাগান থেকে নারী পাচারের হার যথেষ্ট উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে  নারী পাচারের সংখ্যা ছিল ২০৬৪। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫৯৯। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের চা-বাগানগুলি থেকে পাচারের পরিমান সবচেয়ে বেশি।  দুর্ভাগ্য যে, প্রশাসনিক নির্দেশে সাম্প্রতিক কালে নথিভুক্ত হওয়া তথ্য কিন্তু জানা যাচ্ছে না। ফলে  চা-বলয়ে নারী পাচারের বর্তমান চিত্রটি ঠিক কী সে সম্পর্কে এই মুহূর্তে সকলেই অন্ধকারে। কখনো দেশের কোনও মহানগরের নিষিদ্ধ পল্লী বা উচ্চবিত্তের বাড়ি থেকে অত্যাচারিত নারী উদ্ধার হলে জানা যাচ্ছে যে, তার বাড়ি হয়ত ডুয়ার্সের কোনও চা-বাগানে! 

লিপিবদ্ধ হওয়া অপরাধের এই চিত্র কালেভদ্রে প্রকাশ্যে এলে তার ভয়াবহতায় শিউরে উঠতে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, বহুক্ষেত্রে লোকলজ্জা, প্রথা, কুসংস্কার, দারিদ্র্য ও অশিক্ষাকে ভর করে চলা চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলি আইনের দ্বারস্থ হয় না। এই জাতীয় ঘটনাকে তারা ভাগ্যের মার হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। সেজন্য আসল ছবিটিও জানা যায় না। স্বাধীনতার পর এতগুলি বসন্ত কেটে গেলেও ডুয়ার্সের চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকদের জীবনে অন্তত বসন্তের ছিঁটেফোঁটাও জোটে নি- একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।  চা উৎপাদনের পেছনে তাদের সিংহভাগ অবদান থাকলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে তারা আজও সুযোগ পান না। উল্টে যে সামান্য টাকা আয় করেন, তা অনেক সময়েই জোর করে কেড়ে নেয় বলদর্পী মরদটি, নেশা করবার জন্য। প্রতিবাদে জোটে মার অথবা সংসারে ভাঙন। মালিকপক্ষের দেওয়া এক জোড়া গামবুট আর বর্ষায় ছাতা সম্বল করে চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকেরা বছরের পর বছর তাদের শ্রম দিয়ে আসছেন। দুধের সন্তানকে ক্রেশে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। অধিকাংশ চা-বাগানেই অবশ্য ক্রেশের সুবিধে নেই। ফলে অনেক সময়েই দেখা যায়, বুকে বা পিঠে শিশুকে বেঁধে মা-শ্রমিক নিরলস কাজ করে চলেছেন। আমরা গিয়ে তাদের ছবি তুলছি, এরকম দু-একটি নিবন্ধ লিখছি। কিন্তু এর বেশি আদতে কিছুই হচ্ছে না! 

যদি মনে হয় যে, চা-বলয়ে অপরাধের চিত্রটিই শুধুমাত্র মারাত্মক তাহলে কিন্তু ভুল ভাবা হবে। দারিদ্র আর চা-বাগান বোধহয় হাত ধরাধরি করে চলে। আজও চা-বাগানের শ্রমিদের জ্বালানির জন্য ভরসা কিন্তু চা-বাগান বা আশেপাশের বনাঞ্চল থেকে সংগৃহিত কাঠ।  একটি তথ্য দেওয়া যাক- '' কালচিনি চা-বাগানের শ্রমিক সাবিত্রী ওরাওঁয়ের দৈনিক রোজগার ২০২ টাকা। তিনি বলেন, ' দৈনিক ২০২ টাকা হাজিরায় আমাদের পরিবার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৯০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে তা কেনার মতো এত টাকা নেই। তাই গ্যাস থাকলেও মাটির উনুনে কাঠকুটো দিয়েই রান্না করছি।` বাগানে শ্রমিকের কাজ করতেন পাটালি লামা। তাঁর কোথায়, 'আমি বিধবা। বর্তমানে আমার কোনও কাজ নেই। বিধবা ভাতার মাসিক হাজার টাকাই আমার মাসে রোজগার। তাতে উজ্জ্বলার গ্যাস কিনব কোথা  থেকে?'' (আনন্দবাজার পত্রিকা, ৯ নভেম্বর ২০২১) প্রসঙ্গত, এই মহিলারা উজ্জ্বলা যোজনায় রান্নার গ্যাস পেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আয়ের প্রেক্ষিতে শুধু গ্যাস কেন, যে কোনও জিনিস কেনাই কার্যত অসম্ভব। যাঁরা অবসর নিয়েছেন, তাঁদের কথা যত কম বলা যায়, তত মঙ্গল।যে দেশে কোনও কোনও শিল্পপতির পরিবারে ৭৫০ এম এল জলের বোতলের দাম হয় বাইশ হাজার টাকা, সে দেশে  ১০০০ টাকা দিয়ে সংসার চালানো মানুষ থাকেন বলাটা শুধু রাষ্ট্রের লজ্জা নয়, হয়ত বা বিরোধিতা করা! 

চা সংক্রান্ত পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গের চা-বাগানগুলিতে মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১,২৮,৩৯৯, পুরুষের সংখ্যা সেখানে ১,১৮,১৭৭। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং ও ডুয়ার্স অঞ্চলে পুরুষ ও মহিলা চা-শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় সমান। মহিলাদের সংখ্যা বরং দিনদিন বেড়ে চলেছে। কিন্তু মহিলাদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের অবস্থার কোনো গুনগত পরিবর্তন কি হয়েছে? অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, আগের তুলনায় চা-বাগান শ্রমিকেরা খানিকটা উন্নত জীবনযাপন করলেও তা একেবারেই যথেষ্ট নয়। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো চেপে বসেছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সম্যক বোধের অভাব। রক্তস্বল্পতা-সহ নানা রোগ  তাদের লেগে রয়েছে সারা বছর। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার চাইতে গুনিন বা ওঝার ওপর নির্ভরশীল মহিলা-শ্রমিকদের অকালমৃত্যু তাই সাধারণ ঘটনা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের চা -বাগানগুলিতে হাসপাতালের অভাবে স্থানীয় গুণিন, হাতুড়ে ডাক্তার বা ওঝাদের রমরমা । আবার হাসপাতালের সুবিধা রয়েছে এরকম বাগানে মহিলা ডাক্তারের অভাবে অনেক সময় মহিলারা নিজেদের রোগের কথা বলেন না। ফলে নানা জটিল রোগ বাসা বাঁধে তাদের শরীরে।

বসবাস অযোগ্য কুলি লাইনের বাড়িঘরের দিকে তাকালে বোঝা যায় সমস্যা কতটা প্রকট। মানুষ ও পালিত পশুর সহাবস্থান চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় কেউ সে অর্থে ভালো নেই। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে সারাদিন ধরে চা-পাতা তুলে  যে পয়সা মেলে তা দিয়ে কোনোমতে গ্রাসাচ্ছাদন ছাড়া আর কিছুই হয় না। অথচ মরদের ভুখ মেটাবার জন্য নিয়ম করে প্রতিবছরই গর্ভবতী হাতে হয় তাদের। অবশ্য এক্ষেত্রে অর্থনীতির একটা সূক্ষ তত্ব কাজ করে। দারিদ্র সীমারেখার নিচে থাকা এই পরিবারগুলি মনে করে, সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানে সংসারে আর একজন উপার্জনকারীর আগমন। কিন্তু   এই সরল অর্থনীতি যে আসলে সত্য নয়, সেটি বুঝবার মতো যথেষ্ট পড়াশোনা তাদের নেই। ফলে বছরের পর বছর ধরে সন্তান জন্ম দিয়ে দিয়ে ভেঙে পরে মহিলাদের শরীর। প্রসূতিকালীন নানা সমস্যা দীর্ঘায়িত হয় আর তা পরবর্তী সময়ে ছাপ ফেলে। কম বয়সে বিয়েও চা-বাগানের মহিলাদের একটি বড় সমস্যা। একটি সমীক্ষায় প্রকাশ পাচ্ছে যে, চা-বাগানের শ্রমিক-মহিলাদের বিয়ের গড় বয়স ১৪ থেকে ১৮। বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনরায় বিবাহের সংখ্যা ৭ শতাংশ। 

সামাজিক জীবনেও চা-বাগানের মহিলারা কিন্তু এখনও পুরুষদের মুখাপেক্ষী। নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থেকে তারা অনেক দূরে। পরিবারের ছোট-বড় সব ধরণের ব্যাপারে পুরুষদের মতামত চূড়ান্ত। বাড়ির মহিলাটি কাজে গেলে সংসারের কাজ সামলাতে হয় ছোট মেয়েদেরকেই। ইদানিং কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, মিড ডে মিল ইত্যাদির জন্য বিদ্যালয়ে মেয়েদের কিছুটা ভিড় বাড়লেও সামাজিক উন্নতি কিন্তু সেভাবে চোখে পড়ে না।  যে সামান্য সংখ্যক মহিলা চা-বাগানের শ্রমিকের কাজ করেন না, তারাও কিন্তু এর থেকে বাইরে নন। কেননা তাদের ঠাঁই হয় সামান্য চাষের জমিতে মজুর হিসেবে। অনেকে বাগানের বাবু-বাড়িতে পরিচারিকার কাজেও নামেন। অতএব, শিক্ষার আলো থেকে তারা অনেকটা দূরেই রয়ে গেছেন। আবার কিছুদূর পড়বার পর বিদ্যালয় ত্যাগের চিত্রটিও চিন্তাজনক। বিশেষ করে, কারণে অতিমারির জন্য লকডাউনের পর এই সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক এক ক্ষেত্রে সমীক্ষা দেখাচ্ছে যে, চা-বাগানের নারী শ্রমিক ও তাদের ঘরের মেয়েদের ড্রপ আউটের পরিমাণ ৬৭ শতাংশ। বিদ্যালয় থেকে প্রত্যেক মাসে প্রদত্ত মিড ডে মিল-সহ অন্যান্য সুযোগসুবিধাও আটকাতে পারে নি এই ভয়াবহ অবস্থাকে। একই সঙ্গে চা-বাগানের অভিভাবকদের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।             

সবচেয়ে খারাপ লাগে ভেবে যে, স্বাধীনতার ৭৫ বছরেও চা-বাগানে আজও রয়ে গেছে ডাইনি প্রথা। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর শিকার চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকরা।  আজ অবধি ঠিক কতজন মহিলা এই প্রথার বলি হয়েছে তার সঠিক হিসেবে নেই। কিন্তু ডাইনি প্রথার চল আজও বিলুপ্ত হয় নি। এমনিতে জনজাতি গোষ্ঠীগুলি সাধারণত মাতৃতান্ত্রিক হয়। তাই এটা বিস্ময়কর যে মাতৃতান্ত্রিক সমাজেও  সেই মা বা নারীকে এরকম একটি অমানবিক ও নিষ্ঠুর প্রথার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এর ফলে একেবারেই একঘরে হয়ে পড়ে ডাইনি বলে দাগিয়ে দেওয়া সেই মহিলাটি। অবস্থা চরমে পৌঁছায় ধীরে ধীরে এবং একটা সময় আসে যখন সেই মহিলার প্রাণ সংশয় হয় বা তাকে একেবারে মেরে ফেলা হয়। আজ অবধি ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলিতে ডাইনি সন্দেহে কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে তার সঠিক হিসেবে কেউ দিতে পারবে না। কেননা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা থানা অবধি পৌঁছায় না। অধ্যাপক অর্ণব সেন লিখছেন, 'সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে অর্থাৎ একুশ শতকের গোড়া থেকে বিশ্বায়ন ব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি, সরকারি উদাসীনতা, বাগিচা মালিকদের লোভ ও ধূর্ততা, 'বট লিফ ফ্যাক্টরির`যথেচ্ছ নির্মাণ, অসংখ্য ছোট ছোট বাগিচা সৃষ্টি, বাগিচা-সংক্রান্ত আইনের অসংখ্য ফাঁকফোকর, চা নিলাম ব্যবস্থার ত্রুটির ফলে বেশ কিছু চা বাগান বন্ধ হয়েছে এবং আদিবাসী সমাজকে বিপুল বেকারত্ব ও দারিদ্র এই সংকটকে ঘনীভূত করে তুলেছে।` আর এই সংকটের শিকার হচ্ছেন চা-বাগানের নারীরা। নানকি মুন্ডাকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল ভাসুরের রোগভোগ আর মৃত্যুর কারণে। কালচিনির সেন্ট্রাল ডুয়ার্স চা-বাগানে সুখানি দেবী আর সুমিত্রা দেবী খুন করা হয় কয়েকজনের অসুখের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এরকম উদাহরণ অজস্র। এখানেও মনে রাখতে হবে যে, সব অভিযোগ কিন্তু প্রকাশ্যে আসে না। তা না হলে এই একবিংশ শতকে সাতকাইথা চা-বাগানে 'ডাইন লাইন' বলে শ্রমিকদের বস্তিটি হয়ত থাকত না। 

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতেও তাই ডুয়ার্সের চা-বাগানের মহিলা-শ্রমিকরা কতটা স্বাধীন সে প্রশ্ন রয়ে যায়। স্বাধীন দেশের উন্নয়নের কোনও আলো তাদের আলোকিত করে নি একথা যেমন বলা মিথ্যাচারণ হবে, তেমনি এটা বলা বুঝি ভুল হবে না যে, প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্ত কম। ফলে, কাঙ্খিত মান সম্পূর্ণ অধরা। চা-বাগানের নারী জন্ম তাই যেন এক অভিশাপ। কেটে গেছে আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ, প্রতি বছর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস, নারীদের কল্যাণে ঘোষণা হচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্প, কিন্তু চা-বাগানের নারীরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও স্বাধীন দেশের পরাধীন নাগরিক হয়েই জীবন কাটাচ্ছেন।  

(প্রকাশিত: দ্যুতি, দিনহাটা)

আনন্দের কোলাহলে প্রতিবেশী ডুয়ার্সের কান্না কানে আসে না 

শৌভিক রায় 



'জন্মেছিলাম এই বাগানে। বড় হয়ে ওঠা, বিয়ে সবই এখানে। উনি মারা যাবার পর দুই ছেলেই এই বাগানে এখন চাকরি করে। বড় নাতনি পড়ছে কলেজে। ছোট নাতিকে নিয়ে এসেছি মন্ডপে। আগে তো শুধু বাবুবাসা পূজা হতো, পরে তো আমাদের লাইনেও চালু হল পূজা', বললেন পূর্ণিমা খালকো। বয়স তাঁর আশির কোঠায়। এখনও টানটান শরীর। কুলিলাইনের পুজোমন্ডপে একা বসে আছেন পড়ন্ত বিকেলে। সামনের মাঠে বসেছে মেলা। ছোট নাতি ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে একা। 

এই চা-বাগানে দুটো পুজো-  বাবুদের আর শ্রমিকদের পুজো। পুজোর বয়স যথাক্রমে পঁচাত্তর ও চল্লিশ।

শহর কোচবিহারের প্রতিবেশী ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলির দুর্গাপূজার বেশ প্রাচীন। যেমন মথুরা চা বাগানের পুজো প্রায় একশো, দলসিংপাড়া চা-বাগানের পুজো আশি ছুঁই ছুঁই, সুভাষিণীর পুজোও ওরকমই। ডুয়ার্সে ছড়িয়ে থাকা অজস্র চা-বাগানগুলির পুজোর খোঁজ নিলে এরকম চিত্রই ফুটে উঠবে। ঠিক কবে থেকে বা কোন কোন চা-বাগানকে পুজো প্রথম শুরু সেকথা জানা না গেলেও অনেক চা-বাগানের পুজোই যে শতাব্দী প্রাচীন তা নিয়ে দ্বিমত নেই। হবে না-ই বা কেন? ডুয়ার্সে প্রথম চা-বাগানের পত্তন হয় ১৮৭৪ সালে। উত্তরবঙ্গে দার্জিলিঙে ১৮৪১ সালে প্রথম চা বীজ পুঁতেছিলেন ডঃ ক্যাম্বেল। কিন্তু ১৮৫৬ সালে লেবঙের কাছে ধোতরে চা-বাগানকেই উত্তরবঙ্গের প্রথম চা-বাগান বলে মনে করা হয়। ডুয়ার্সের জলবায়ু, আবহাওয়া ও মৃত্তিকা যে চা চাষের অনুকূল সেটা বুঝতে ইংরেজরা কিছুদিন সময় নিয়েছিল। কিন্তু একবার বুঝবার পর তারা আর দেরী করে নি। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ডুয়ার্সের ঘন অরণ্য কেটে চা-বাগান তৈরী করতে। রাঁচি, সিংভূম, হাজারিবাগ ইত্যাদি অঞ্চল থেকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ও নেপালের তেমাল, ওয়াফল, মাওয়ার, থংয়াল, ইয়োলমো ইত্যাদি জায়গা থেকে নেপালি সম্প্রদায়ের শ্রমিক আনা হয়েছিল। চা-বাগানের প্রশাসনিক কাজে গোরা সাহেবরা থাকলেও অন্যান্য অফিসিয়াল কাজে ইংরেজরা ভরসা করেছিল সেই বাঙালিদের ওপর। ডুয়ার্সের জনবিন্যাসে তাই নানা জাতির মিশ্রণ সহজেই  অনুমেয়।

স্বাধীনতার পূর্বে তো বটেই, স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও দীর্ঘদিন ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। নিজেদের খেলার মাঠ, প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পূজামন্ডপ ইত্যাদি সবই ছিল। প্রাথমিক পর্ব শেষ হলে আশেপাশের আধা-শহরগুলির উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা করতে আসতো চা-বাগানের ছেলেমেয়েরা। তাদেরকে আনার জন্য থাকতো চা-বাগানের নিজস্ব গাড়ি। অর্থাৎ এস্টেট বলতে যা বোঝায় চা-বাগানগুলি ছিল তাই। তাই তাদের পূজাও হতো দেখবার মতো। মনে পড়ছে ছোটবেলায় চা-বাগানের পুজো আমাদের পুজো পরিক্রমায় ওপরের দিকে থাকতো। পুজো ঘিরে বেশিরভাগ চা-বাগানেই ছোটখাটো মেলা বসে যেত।  কালীপুজোতেও বজায় থাকতো সেই একই জৌলুষ। ডুয়ার্সের কালীপুজো তখন টেক্কা দিত ডুয়ার্সের শহরগুলির পুজোকে। এখানে বোধহয় এই তথ্যটি দেওয়া অপ্রাঙ্গিক হবে না যে ডুয়ার্সের বেশিরভাগ শহরই কিন্তু গড়ে উঠেছে চা-বাগানগুলিকে কেন্দ্র করে।

সত্তরের দশক থেকে চা-শিল্পে মন্দা, বৈদেশিক বাণিজ্যে ধাক্কা, পর্যাপ্ত পরিকাঠামো, অদক্ষ পরিচালনবর্গ ইত্যাদি নানা কারণে চা-বাগানগুলি ধুঁকতে শুরু করে। তবে আশির দশকে অবস্থা বোধহয় চরমে ওঠে। ডুয়ার্সের বিভিন্ন চা-বাগানে শুরু হয় লকআউট, শ্রমিক অসন্তোষ, অনাহারে মৃত্যুর মতো বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে চা-বাগানগুলি হারায় তাদের আভিজাত্য ও বৈভব। চা-বাগান কিনে চটজলদি মুনাফা করার এক ঘৃণ্য প্রয়াস দেখা দিয়েছিলো একটা সময়।  দক্ষ ম্যানেজারের বদলে নিজেদের পছন্দ মতো লোককে কুর্শিতে বসানো, তাকে নিজের খেয়াল খুশি মতো উৎখাত, শ্রমিকদের ন্যূনতম মর্যাদা না দেওয়া এবং চা-বাগানের ঐতিহ্যকে মনে না রাখা সব মিলে চা-বাগানের অবস্থা সঙ্গিন হয়ে উঠেছিল। ভাবতে অবাক লাগে যে চা-বাগানগুলি ডুয়ার্সের শহরগুলির উন্নয়নে এক সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো তাদের এই দৈন্য দশা দেখা দিতে পারে। চা-শিল্পের সাথে যুক্ত উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত পরিবারগুলোও ধীরে ধীরে বীতশ্রদ্ধ হয়ে চা-শিল্প থেকে সরে আসেন। সব মাইল অবস্থা ঘোরালো হতে সময় নেয় নি। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলছে। কখনো কোনো বন্ধ চা-বাগান আশার আলো জ্বালিয়ে খোলে তো পরক্ষণেই কোনো বাগান বন্ধ হয়ে যায়। যে চা-বাগান একসময় ডুয়ার্সের শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলার ক্ষেত্রে অগ্ণি ভূমিকা নিয়েছিল তারা ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত অন্ধকারে ঢেকে গেলো। সৌহার্দের, ভালোবাসার, সম্প্রীতির চা-বাগান যেন নষ্ট হয়ে গেলো চোখের সামনে।   

তবু  পুজোর ট্র্যাডিশনকে একইরকমভাবে ধরে রাখতে আজও  তৎপর ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলি। কোনো কোনো চা-বাগানে বাবু ও শ্রমিক উভয়ে মিলে একটি পুজো হয়, কোথাও আবার আলাদা হয়ে গেছে বাবুদের ও শ্রমিকদের পুজো। আগেকার মতোই আজও বেশ কিছু পুজো মন্ডপকে ঘিরে মেলা বসে। যেমন চারদিকে চা-বাগান ঘেরা হাসিমারার মলঙ্গী সার্বজনীন। মন্ডপের সামনের মাঠে বসে মেলা। হাসিমারার সেন্ট্রাল ক্লাবও চা-বাগানের মাঝে। প্রায় পঁচাশি বছর ধরে চলে আসছে তাদের পুজো। অন্যদিকে কালচিনির কালীপুজো তো বিখ্যাত। মেলাও বসে বিরাট কালীপুজোর সময়। মালবাজার, চালসা, মেটেলি, নাগরাকাটা, বিন্নাগুড়ি, ধূপগুড়ি, গয়েরকাটা, ফালাকাটা, বীরপাড়া, মাদারিহাট ইত্যাদি প্রতিটি জায়গাতেই থাকা চা-বাগানগুলির পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে সম্পন্ন হয়ে আসছে। কোনো কোনো পুজো শতবর্ষ পার করেছে।  

শারদ উৎসবের সূচনা হয়েছে। মাসাধিককাল ধরে চলবে উৎসব। কোচবিহারের ক্ষেত্রে রাসমেলা ধরলে এই সময়সীমা আরও বেশি। বিগ বাজেটের পুজোর প্রচারে, আলোর ঝরণাধারায়, আনন্দের কোলাহলে প্রতিবেশী ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলির কান্না আমাদের অনেকের কানে আসে না। অন্ধকারে ডুবে থাকে কোনো এক মংলু কুজুরের বাড়ি, কোনো এক ফুলবন্তীর ঠাঁই হয় আড়কাঠির কারসাজিতে নিষিদ্ধপল্লীতে, হাঁড়ি চড়ে না কোনো বুধুয়া লাকড়ার রান্নাঘরের উনুনে। তবু নিজেদের সীমিত সাধ্যে দুর্গাপুজো আর দীপাবলিতে তারা মেতে ওঠে নিজেদের মতো। এই চারটে দিন আর দীপাবলির দু'দিন বছরের সেরা সময়। নিরন্ন থাকে না কেউ। কমিউনিটির শ্রেষ্ঠ রূপ দেখা যায় চা-বাগানগুলিতে। এদিকে শুকরা কুলির পাতে পরিবেশন করছেন বাগানের রাশভারী বড়বাবু পরেশ মুস্তাফি তো অন্যদিকে বাসন্তী কুজুর ছুটেছে অ্যাসিস্টান্ট ম্যানেজারের সহধর্মিণী ঐন্দ্রিলা মুখার্জীর ভালবাসার কাশ ফুল তুলে আনতে। কোনো এন জি ওর সহযোগিতায় বা নিজেরাই চাঁদা তুলে বাবুরা শ্রমিকদের শিশুদের জন্য এনে দিয়েছেন নতুন জামা। এ তাদের প্রাণের উৎসব, মনের উৎসব। জীবনের সমস্ত দুর্ভোগ দূরে থাক উৎসবের দিনগুলিতে, ভোলা যাক না-পাওয়াগুলিকে। সারা বছরই তো থাকবে দারিদ্র, অনটন, অভাব, অভিযোগ। কিন্তু শারদ উৎসব? তার টান যে আলাদা। 

বয়স্কা পূর্ণিমা খালকো তাই দেখে যান মায়ের মুখ, বালক বসন্ত জ্বালায় তারাবাতি। বৃদ্ধা ঠাকুমা ও বালক নাতির মুখে তখন পড়ন্ত সূর্যের অস্তরাগ। প্রতিবেশীদের তৃপ্তির মুখ দেখে কিচ্ছু করতে না পারা অসহায় এই আমি শিখি বাঁচার মন্ত্র। 

সত্যিই তো, পাড়াপড়শি যদি ভাল না থাকেন তবে কি ভাল থাকা যায় কখনো? সেই আপ্তবাক্য যে কানে ভাসে 'পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে...'

(উত্তরবঙ্গ সংবাদ: কোচবিহার সংস্করণ ৩/১১/২০১৮)



 বোতাম 

শৌভিক  রায় 

বোতাম দেখলেই বড্ড খিদে পায়! এক ছুটে বোতাম স্পর্শ করতে ইচ্ছে জাগে প্রচন্ড।  
যত বেশি স্পর্শ বোতামে, তত লাভ। সেই লাভেই ছুটে চলা অদম্য জেদে, দুরন্ত গতিতে। 
আসলে এ এক অদ্ভুত মায়াজাল। হাতের নাগালে নষ্ট চাঁদ, পায়ের তলায় লুটোপুটির সমুদ্র! 
আর এই সব ছাপিয়ে এক অদ্ভুত সিঁড়ি। টপাটপ ওপরে, আরও ওপরে, আরও ...
অবশেষে পায়ের তলায় আর্যাবর্ত, এমনকি সুউচ্চ হিমালায়টাও। 
তাই বোতাম দেখলেই খিদে পায় ভীষণ। 
স্বপ্ন দেখি, বোতামের জন্য সর্বময় কর্তা থেকে একা এক ঈশ্বর হয়ে উঠছি ক্রমশ...এমন এক ঈশ্বর যার সামনে পেছনে ডাইনে বাঁয়ে কেউ নেই। 
নেই পরিবার, নেই পরিজন, এমনকি কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী। 
নিজের সাম্রাজ্যে সব ক্ষমতা নিয়ে অঙ্গুলি হেলনে গ্রাস করছি সব সর্বগ্রাসী এক খিদে নিয়ে! 
আমার খিদের সামনে ফিকে হয়ে যাচ্ছে বিধ্বংসী দাবানল। খেয়ে নিচ্ছি এই দেশ, এই রাষ্ট্র। 
আমার বিচিত্র খিদেয় চারদিক ধু ধু মরুভূমি কিংবা প্লাবিত জলাভূমি হয়ে গেলেও কিচ্ছু এসে যায় না আমার! 
আমি শুধু নিজেকে জানি। আর জানি আমার খিদেকে। 
বোতাম মেটায় আমার সেই খিদে....    


ভরসা রেখেছি ওই বোতামেই। বোতামের সঙ্গে এক অদ্ভুত শব্দ। ভরসা তাতেও।  
শব্দ মানে ব্রহ্ম। 
ব্রহ্ম সত্য। বাকি সব মিথ্যে। 
তাই অনন্ত শূন্যতা নিয়েও বিশ্বাস সেই সত্যে। জানি চিরদিন এক যায় না। পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। 
ফি বছর ঋণ নিতে হয়। কৃষ্ণ মৃত্তিকায় যে সাদা ফসল ফলে, জোটে না তার ন্যায্য মূল্য। 
শুনেছি শস্য শ্যামলা মিঠে বুলির কোনও এক দেশের মাটি বড় উর্বরা। কিন্তু সেখানেও পথে নামে আমারই ভাইয়েরা। 
ওরা বসে থাকে সিংঘু থেকে অলৌকিক রেখার সর্বত্র। 
প্রত্যেকের চোখে একই স্বপ্ন। ভরসাও সেই এক! 
এক দুরন্ত বোতাম। এক শব্দ ব্রহ্ম। এক স্বপ্ন জগৎ। 
সেই জগতে সব শিশুরা এক আসনে বসে। রাম নামাজ পড়লে, রহিম মন্দিরে বাজায় ঘন্টা।
আন্তরিক আলিঙ্গনে গাছকে জড়িয়ে বারবার ভালবাসেন মোটা চশমার অশীতিপর কোনও বৃদ্ধ। 
মুক্ত আকাশের নিচে গারদের স্যাঁতসেতে পরিবেশকে তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে প্রতিবাদ রাখেন বিষণ্ণ কবি।
আলো জ্বলে ওঠে সুদূর গ্রামে....ঘরে ফেরে জলপাই পোশাক সন্তান হাতের অস্ত্র বিসর্জন দিয়ে।
বোতাম এনে দেয় এইসব যা কিছু .... 

আশা নিরাশা দুরাশার এই টানাপোড়েনে যদি কিছু সত্য থাকে তবে সে ওই বোবা বোতাম। 
বোতামই স্বপ্ন দেখায় এভাবে। বোতামই নিয়ে আসে এক অদ্ভুত আশা। 
তাকে ঘিরেই আবর্তিত নানা তন্ত্র। কখনও সে নিজে একনায়ক, কখনও গণনায়ক। 
তার প্রদর্শিত পথেই ঘুরে চলা নিজেদের মতো। 

বোতাম....কখনও আত্মনিধন, কখনও আততায়ী, কখনও বারিশওয়ালা ! 


(কবি শ্যামলী সেনগুপ্তের ওড়িয়া অনুবাদের জন্য লেখা)
 

 

উত্তরের মুছে যাওয়া মহকুমা ফালাকাটা 
শৌভিক রায়

ডুয়ার্স তথা উত্তরবঙ্গের ছোট ছোট অনেকগুলি জনপদ চা-বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও, আলিপুদুয়ার জেলার ফালাকাটা কিন্তু বয়সের দিক থেকে এদের চাইতে অনেকটা পুরোনো। ঠিক কবে এই জনপদটি গড়ে ওঠে সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য না থাকলেও একসময় ফালাকাটা যে ভুটানের অন্তর্ভুক্ত ছিল তা নিয়ে সন্দেহ নেই। মনে করা হয় যে, কোচবিহার রাজ্যের সাথে ভুটানের যুদ্ধে কোনো এক পক্ষের সৈনিকদের এখানে প্রবল যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে রংপুরের জমিদার শ্যামল বর্মনের স্ত্রী ফুলটুসি সমরবিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন এবং প্রতিপক্ষের সৈনিকদের  টুকরো টুকরো বা ফালা ফালা করে কেটেছিলেন বলে জায়গাটির নাম হয় ফালাকাটা।  অধুনা একটি মত বলছে লোকদেবতা ফালাকাটা থেকে জায়গাটির নাম এসেছে। লোকদেবতা ফালাকাটার বাহন হল বাঘ এবং রয়েছে তাঁর দুই ভাইয়ের নাম হল তুলাকাটা এবং ধুনাকাটা। শোনা যায় দেবতা ফালাকাটাকে নিয়ে ছড়াও- 'ভক্তি দিনু ফালাকাটা মহারাজ, থাকেন বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলত। পশ্চিমে হইল করতোয়া, উত্তর হইতে পূর্বেত তিস্তাবুড়ি বহে ধীর...।' তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, আমবাড়ি-ফালাকাটার নামকরণের পেছনে এই ছড়াটি বেশি প্রযোজ্য। অন্য একটি মত বলছে যে, ফালাকাটার পূর্ব -পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে ঘিরে থাকা ছোট্ট যদি সাপটানা ভূখন্ডকে ফালা ফালা করে কেটেছে বলে জায়গাটির নাম ফালাকাটা। তবে ফালা ফালা করে গাছ কেটে সীমানা চিহ্নিত করার বিষয় থেকে নামকরণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।    

১৮৬৯ সালে ফালাকাটা প্রশাসনিক দিক থেকে অবিভক্ত জলপাইগুড়ির প্রথম মহকুমার মর্যাদা পেয়েছিল। স্থাপিত হয় থানা। কিন্তু ১৮৭৪ সালে মহকুমা স্থান্তরিত হয় বক্সায়। পরবর্তীতে সেখান থেকে আলিপুদুয়ারে।  ফালাকাটাকে মহকুমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইংরেজরা এই জনপদের  গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছিল ঠিকই কিন্তু বর্ষায় ভয়ঙ্কর তিস্তা-জলঢাকা ও তোর্ষার মাঝে অবস্থিত এই জায়গাটি থেকে জেলার অন্যত্র মজুদ থাকা সেনাবাহিনীর রসদ, ওষুধপত্র ইত্যাদি যোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য ছিল।  সেজন্যই মহকুমা বক্সাতে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু ফালাকাটার কৌলিন্য বা গুরুত্ব তাতে কমে নি। কেননা নির্জন ও প্রায় জনমানবহীন ডুয়ার্সের যে জায়গাগুলি থেকে কিছু পরিমান খাজনা আদায় করা যেত, ফালাকাটা ছিল তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানে। ফলে এখানে তৈরি হয়েছিল এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ তহশীলখানা। সে সময় ফালাকাটার পরিচয় ছিল যে, ফালাকাটা মানেই হ'ল 'তহশীল অফিসের ঘড়ি, বংশীধরের ভুঁড়ি আর শিরীষ বসুর দাড়ি'। 


প্রাচীন জনপদ ফালাকাটা অতীতে ছিল ঘন অরণ্যে ঢাকা। সেই সময় জলদাপাড়া অরণ্যের বিস্তার ছিল  অনেকটা। ফলে সেভাবে লোকবসতি ছিল না। আজও ফালাকাটার কুঞ্জনগর ইকো টুরিজম সেন্টারের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা বুড়িতোর্ষা নদী পার হলেই  জলদাপাড়া।  ফালাকাটার কাছে  দেওগাঁর অরণ্যও একসময় জলদাপাড়ার অংশ ছিল। রাজ্যসড়ক সেই অরণ্যকে দু'ভাগ করেছে সেটা বোঝাই যায়। দেওগাঁতেই রয়েছে দক্ষিণ খয়েরবাড়ির বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন ও ইকো টুরিজম। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আদিম অরণ্যের বিপুল বিস্তারের জন্যই ফালাকাটা ব্লকে সেভাবে জনপদ গড়ে ওঠে নি। তাই এখানে পুরাতাত্ত্বিক কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না। জটেশ্বরের শিব মন্দির, ফালাকাটার মহাকাল মন্দির জাতীয় দু'চারটি সাধারণ মন্দির বা  মসজিদ ছাড়া অতি প্রাচীন বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পন্ন কোনো মন্দির বা মসজিদ বা গির্জা নজরে আসে না। 


ডুয়ার্সের অন্যান্য বহু জনপদের মতোই ফালাকাটার উপকন্ঠেও রয়েছে দু'টি চা-বাগান। আর এই চা-বাগান পত্তনের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে আজকের ফালাকাটার অন্যতম দ্রষ্টব্য এখানকার রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল। এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অমূল্য ইতিহাস। সেভেনথ ডে অফ অ্যাভভেন্টিস্ট চার্চ প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত এই বিদ্যালয়টি  কালের যাত্রায় সত্তরটি বছর পার করে দিয়েছে। স্বাধীনতার দুই বছর পর ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের স্থাপনের পেছনে চা-বাগানের ভূমিকাকে কেন অস্বীকার করা যায় না।  আসলে, ডুয়ার্সে চা-বাগান প্রতিষ্ঠার জন্মলগ্নে নেপাল ও ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে দলে দলে শ্রমিক নিয়ে আসা হয়েছিল। এইসব হতদরিদ্র, শোষিত ও বঞ্ছিত মানুষদের কাছে খ্রিস্টান ধর্মের গ্রহণযোগ্যতা অন্য ধর্মের চাইতে বেশি ছিল, কেননা মিশনারীরা নানাভাবে তাদের কাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন। গত শতকের চল্লিশের দশক সময়কালে ফালাকাটার আরণ্যক পরিবেশে বন কেটে তৈরী হচ্ছিল কাদম্বিনী ও কোচবিহার চা-বাগান। আশেপাশের নানা অঞ্চলেও চলছিল চা-বাগান তৈরীর কাজ। আর তার জন্য তদানিন্তন ছোটনাগপুরের কার্মাটার-সহ নানা প্রান্ত থেকে প্রচুর পরিমাণে শ্রমিক আনা হয়েছিল এবং প্রায় তাদের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হয়েছিলেন সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের এম জি চ্যাম্পিয়ান ও সি জে জেনসন। ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি তাদের উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার। ফালাকাটা সেই সময় ছিল অত্যন্ত সুন্দর। তেপান্তরের মাঠের মতো বিরাট মেলার মাঠের উত্তরে ঝকঝক করছে  নীল পাহাড়। জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের সীমা ছুঁয়ে যাচ্ছে  ফালাকাটাকে।  আছে থানা, ড্রামাটিক হল, তহশিল অফিস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সৈনিকদের ব্যবহৃত আবাসস্থলটি পরিণত হয়েছে  গ্রন্থাগারে। ডুয়ার্সের নিয়মানুযায়ী সারা বছরই ফালাকাটায় তখন না ঠান্ডা না গরম আবহাওয়া। বৃষ্টিপাতও প্রচুর।  কার্মাটারের চাইতে তুল্য বিচারে পছন্দের জায়গা ছিল সেই সময়ের ফালাকাটা। এখানে কাজ করবার সুযোগ ও প্রয়োজনও ছিল বেশি। তাছাড়াও কার্মাটারে রবিনসন এস ডি এ হাই স্কুলের দায়িত্বে থাকা এম জে চ্যাম্পিয়ান নিজেও চাইছিলেন বিদ্যালয়টিকে সেখান থেকে অন্যত্র সরাতে। কেননা, কার্মাটারে বিদ্যালয়টি সেভাবে পরিচিতি পাচ্ছিল না। ফালাকাটায় চা-শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করবার ফাঁকেই চ্যাম্পিয়ান ও জেনসন তাই জমি খুঁজতে শুরু করেছিলেন। আজকের ফালাকাটা স্টেশন লাগোয়া পাঁচশো একর জমি সে সময় চা-বাগান তৈরীর জন্য ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বালু জমি হওয়াতে চা-বাগানের মালিক ও ম্যানেজাররা সেই জমিতে কোনও আগ্রহ দেখান নি। চ্যাম্পিয়ান ও জেনসন সেই জমি পছন্দ করলেন। তাঁদের ও অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের শুভানুধ্যায়ী মিসেস রেমন্ড আর্থিকভাবে সহায়তা করলেন। জমি নিজেদের অধিকারে এলে শিক্ষাব্রতী চ্যাম্পিয়ান কার্মাটারে রবিনসন এস ডি এ হাই স্কুলকে স্থানান্তর করলেন ফালাকাটায়। শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। ফালাকাটায় বিদ্যালয় শুরুর দিনগুলিতে কার্মাটার থেকে প্রিন্সিপাল চ্যাম্পিয়ানের সঙ্গে ছয়জন মহিলা ও নয়জন পুরুষ অর্থাৎ মোট পনের জন ছাত্রছাত্রী জিপে চেপে এসেছিলেন। পথে দুর্ঘটনায় একজন ছাত্র মারা যান। চ্যাম্পিয়ান নিজেও আহত হয়েছিলেন। সেইসময় দুটি তাঁবুতে সকলের থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ অবধি চ্যাম্পিয়ান ছিলেন স্কুলের প্রিন্সিপাল। বর্তমান ছাত্রাবাসটি তাঁর নামেই নামাঙ্কিত। চ্যাম্পিয়ানের যোগ্য সঙ্গিনী ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডরোথি। ছাত্রী-আবাসের নামকরণে তাঁর স্মৃতি সযত্নে রক্ষিত আজও। 

পাশাপাশি, ফালাকাটা হাই স্কুল দীর্ঘদিন একটি বিস্তীর্ন অঞ্চলের একমাত্র স্কুল ছিল যেখানে বিজ্ঞান,কলা ও বাণিজ্য তিন বিভাগেই পড়ানো হত। বীরপাড়া, মাদারিহাট, শিলবাড়ীহাট, শালকুমার, আটপুকুরিয়া ইত্যাদি নানা জায়গা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা একসময় ফালাকাটায় পড়তে আসত।  আজ রাজ্যের সব জায়গার মতোই ফালাকাটাতেও অনেকগুলি  বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বোঝা সম্ভব না যে, সেসব দিন কীরকম ছিল। তবে সেদিনের সেই কষ্টের পরম্পরাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এখানকার ছাত্র ছাত্রীরা আজ মেধা তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে ভাবতেই ভাল লাগে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে  ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত  এখানকার টাউন লাইব্রেরি বা সুভাষ পাঠাগারের কথা। ফালাকাটার শিক্ষা বিস্তারে এই গ্রন্থাগারটি এখনও  অসামান্য ভূমিকা নিয়ে চলেছে। 

সংস্কৃতি-মনস্ক এই জনপদের  ড্রামাটিক হল ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখনকার ফালাকাটার উত্তরদিকে, তহশীল অফিসের কাছে, খাসমহল ময়দানের পাশে থাকা ড্রামাটিক হল নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তদানিন্তন তহশীলদার স্বয়ং। সঙ্গে ছিলেন জোতদার ফ্যারড ও ফালাকাটার সে সময়কার বিশিষ্ট মানুষেরা।  ডুয়ার্সের আর কোনও জায়গায় এরকম নিদর্শন দেখা যাচ্ছে না। সংস্কৃতি চর্চায় ড্রামাটিক হল দীর্ঘদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।পাশাপাশি একটি বিরাট অঞ্চলের বিনোদনের একমাত্র জায়গা ছিল ড্রামাটিক হল যা অন্যসময় নাম পালটে গৌরী টকিজ নামে ছায়াছবি প্রদর্শন করত।  ড্রামাটিক হলের বিপরীতে, আজকের দশমীর ঘাটের কাছে, অতীতের শিশু সদনের পাশে শুরু হয়েছিল 'ফালাকাটা মুক্তমঞ্চ'। এর আগে উত্তরবঙ্গের একমাত্র শিলিগুড়িতে ১৯৭৯ সালে মুক্তমঞ্চ শুরু হয়। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে ফালাকাটার মুক্তমঞ্চ সেই সময়ের এক সাহসী প্রচেষ্টা। ১৯৯০ সাল অবধি ফালাকাটা মুক্তমঞ্চে বিভিন্ন নাট্যদল নাটক মঞ্চস্থ করেছে। 

১৯৫৯ সালে ফালাকাটা সর্বভারতীয় খবরের শিরোনাম হয়েছিল শৌলমারি আশ্রমকে কেন্দ্র করে। সারদানন্দজী প্রতিষ্ঠিত আশ্রমের দিকে নজর ছিল সমস্ত ভারতের। শৌলমারি কোচবিহার জেলাতে হলেও একেবারেই ফালাকাটা লাগোয়া।   সারদানন্দজীর চেহারা ও হাবভাবের সাথে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের সাদৃশ্য থাকায় দ্রুত রটে যায় সারদানন্দজী আর কেউ নেন স্বয়ং নেতাজী।  সেই আমলে সারা ভারত থেকে দলে দলে লোক আসতে শুরু করেন ফালাকাটায় আশ্রম ও সারদানন্দজীকে দেখতে। আসেন প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা। কিন্তু ১৯৬৭ সালে সারদানন্দজী ফালাকাটা ছেড়ে যান। শৌলমারির আশ্রম আজও আছে। আশ্রমে দীক্ষিত যারা তারা দেখভাল করেন আশ্রমের, মিলিত হন। 

যোগাযোগের দিক থেকে ফালাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই হয়ত ৭৫ বছরের আগে,  উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহনের জন্মলগ্নে, যাত্রীবাহী যে বাস কোচবিহার থেকে নিয়মত যাত্রা শুরু করেছিল তার প্রথম গন্তব্য ছিল ফালাকাটা। উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার পঁচাত্তর বছর পূর্তি বর্ষে ফালাকাটায় কোনও বাসস্ট্যান্ড না থাকা নিঃসন্দেহে একটি বিরাট ক্ষত। একইরকমভাবে মহকুমার মর্যাদা আজও ফিরে পায় নি ফালাকাটা। কুঞ্জনগর ইকো পার্ক, দক্ষিণ খয়েরবাড়ি, খাওচাঁদপাড়া পিকনিক স্পট ইত্যাদি এখনও পর্যটকদের আকর্ষণ করলেও, পরিকাঠামোর অভাবে ধুঁকছে। ফালাকাটাকে ঘিরে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও, জোর দেওয়া উচিত দ্রুত বাস্তবায়নে।    

দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে, আজকের ফালাকাটার উত্তর আকাশ থেকে হারিয়ে গেছে ঝকঝকে নীল ভুটান পাহাড়ের সারি। যে সাপটানা নদী কোনো কোনো বর্ষায় দু ' কুল ছাপাতো আজ তা শুকনো খাতে পরিণত। রহস্যময় নদী মুজনাইও গতিপথ পাল্টে কোনো অজানা অভিমানে বয়ে চলেছে নিজের মতো। সারা বছর ভোর বেলার সেই টাটকা আমেজ এখন শুধুই স্মৃতি। উধাও প্রবল শীতের জমজমাট কুয়াশা আর দিগন্তে মেলানো হলুদ পাখি। হারিয়ে গেছে রাস্তার ধারের  শিমুল গাছের লাল ফুলেরা কিংবা বর্ষা শেষের গাছে পুরু শ্যাওলার আস্তরণ। হারানো ও না পাওয়ার তালিকায় এরকম আরও কতো কি রয়ে গেল কে জানে!  তবে, পাওয়া আর না পাওয়া নিয়েই জীবন বলে কোনও কিছু থেমে থাকে না। ফালাকাটাও থেমে নেই। সেই ধূসর অতীত থেকে বর্তমানের আলোকিত এই উজ্জ্বল দিনে ফালাকাটা আজও একইরকম। 

(আকাশবাণী শিলিগুড়ি)

এক মধ্যবর্তী জনপদের যন্ত্রণা জানে ফালাকাটা 

শৌভিক রায় 

একটি মধ্যবর্তী জনপদ। একদিকে কোচবিহার ও অসম এবং অন্য দিকে শিলিগুড়ি ও বৃহত্তর পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ছোট্ট হাইফেনের মতো রয়েছে সে। অতীতে এই জনপদের ঊর্বরা ভূমি আর অবস্থানগত সুবিধের জন্য ভুটান ও কোচবিহার রাজ্যের মধ্যে লড়াই বেঁধেই থাকত। দীর্ঘদিন ভুটানের অধীনে থাকা এই জনপদ, ফালাকাটা, দ্বিতীয় ইঙ্গো-ভুটান যুদ্ধের পর ইংরেজদের হাতে আসে এবং ১৮৬৯ সালে জলপাইগুড়ি জেলা গঠিত হলে ফালাকাটাকে মহকুমায় পরিণত করা হয়। স্থাপিত হয় ফালাকাটা থানা। 

তবে ১৮৭৪-৭৫ সালে মহকুমা স্থানান্তরিত হয় বক্সায়। কিন্তু ফালাকাটার গুরুত্ব কমেনি তাতে। বরং এই অঞ্চলের বৃহত্তম তহশিল হিসেবে, ব্রিটিশদের কাছে তার কদর ছিল আলাদা। তাই ১৯০০ সালে ওয়েস্টার্ন ডুয়ার্স ফান্ড মার্কেট গঠিত হলে, তারা হাট তৈরি করবার জন্য বেছে নিয়েছিল এই জনপদকে। শতাব্দী প্রাচীন এই হাটের কিন্তু খুব বেশি উন্নয়ন হয়নি। ফলে অসন্তোষ বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই। 

আসলে দুর্ভাগ্য বোধহয় ফালাকাটার ললাটলিখন। মহকুমার তকমা হারানো জনপদটিতে একটি বাসস্ট্যান্ড এখনও পর্যন্ত গড়ে তোলা গেল না। বছর তিরিশ আগে কিছুদিন মিল রোডে ফালাকাটার বাস স্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু অজানা কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। অথচ, কোচবিহার রাজ্যে যখন প্রথম পরিবহন সংস্থা চালু হয়, তখন প্রথম যাত্রীবাহী বাসটি চলেছিল কোচবিহার ফালাকাটার মধ্যে। তারিখটি ছিল ১৯৪৫ সালের ২ এপ্রিল। তার আগে ২৭শে মার্চ তদানীন্তন কোচবিহার রাজ্যের 'স্টেট কাউন্সিল` কোচবিহার রাজ্য পরিবহনকে প্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়েছিল। সেদিনের সেই পরিবহন সংস্থাই আজকের উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা নামে পরিচিত। 

শিক্ষাব্যবস্থায় অগ্রণী ফালাকাটায় এম ই স্কুল স্থাপিত হয়েছিল ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে। এখানকার শিক্ষাব্যবস্থায় চমৎকৃত হয়ে ১৯৪৯ সালে এম জি চ্যাম্পিয়ান ও সি জে জেনসন কর্মাটার থেকে তাদের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়টিকে ফালাকাটায় স্থানান্তরিত করেছিলেন। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের  মেধাতালিকায় এই জনপদের ছাত্ররা জায়গা পেলেও, আজ অবধি ফালাকাটা কলেজে বিজ্ঞান বা বাণিজ্য বিভাগ খোলা সম্ভবপর হয়নি। অথচ ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্য বিভাগে পড়বার ব্যবস্থা কিন্তু শুরু হয় সেই সত্তরের দশকে।  

আবার, ফালাকাটার গর্বের টাউন ক্লাব মাঠের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ভাবতে খারাপ লাগে একসময় এই মাঠে রয়াল ভুটান সহ রাজ্যের বি-ডিভিশনের নানা ফুটবল দল খেলে গেছে। বহু আগে ইতিহাসের হাত ধরে, গিরিপথ বেয়ে সমতলে নেমে এসে, এই মাঠে খেলতেন লস্ট হরাইজন বা নিষিদ্ধ দেশ ভুটানের দুর্দান্ত মানুষেরা। একই অবস্থা, ইতিহাসের সাক্ষী থাকা খাসমহল ময়দান। সেই বিখ্যাত মাঠটিই হারিয়ে গেছে আজ। 

নাট্যচর্চায় ফালাকাটা উত্তরের যে কোনও জনপদকে টেক্কা দিত একসময়। শুধুমাত্র নাট্যচর্চার জন্য এখানে ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ড্রামাটিক হল। উত্তরবঙ্গের মুক্তমঞ্চ আন্দোলনেও ফালাকাটার স্থান শিলিগুড়ির পরে। ১৯৭৯ সালে এখানে মুক্তমঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বর্তমানে, একটি কমিউনিটি হল ছাড়া ফালাকাটায় নাট্যচর্চার আর কোনও জায়গা নেই। 

ফালাকাটার এই দৈন্য দশা কবে কাটবে জানেন না কেউই। হারানোর যন্ত্রনা নিয়ে তাই ফালাকাটা আজও তাকিয়ে আগামীর দিকে সুদিনের আশায়। 

(প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ, ২১ জুলাই, ২০২২)

অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদারের 'আধুনিকতা ও বাংলা উপন্যাস'

শৌভিক রায়


সাহিত্য-প্রেমী মানুষ মাত্রেই অধ্যাপক শ্রী অশ্রুকুমার সিকদার নামটির সাথে পরিচিত। দীর্ঘদিনের অধ্যাপক শ্রী অশ্রুকুমার সিকদারের ছাত্রদের কাছে তো বটেই, সাহিত্যমনস্ক যে কোন ব্যক্তির কাছেই তিনি নিজে একটি প্রতিষ্ঠান। সাহিত্য কি, সাহিত্য কেন, সাহিত্য কিভাবে...এই সম্পর্কিত পাঠ নিতে গেলে যাঁদের লেখা ও অনুধাবণ পাঠযোগ্য তাঁদের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব হলেন শ্রী অশ্রুকুমার সিকদার। ওঁর মতো ব্যক্তিকে নিয়ে বলতে পারাটা সৌভাগ্যস্বরূপ। তার ওপর যদি দায়িত্ব চাপে ওঁর কোন গ্রন্থকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তবে সে দায়িত্ব পালনে ভয়-মিশ্রিত আনন্দ জাগে কেননা এমন একজনকে নিয়ে বলা আমার মতো অকিঞ্চিৎকরের হয়তো সাজে না। তবু কিছু বলবার চেষ্টা করা।
নবীন যদুর বংশ, আধুনিক কবিতার দিগবলয়, কবির কথা কবিতার কথা, বাক্যের সৃষ্টি: রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ও রোটনস্টাইন, রবীন্দ্রনাট্যে রূপান্তর ও ঐক্য ইত্যাদি সহ অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদারের গ্রন্থ তালিকা দীর্ঘ। সেই দীর্ঘ-তালিকা থেকে 'আধুনিকতা ও বাংলা উপন্যাস' বেছে নিয়েছি পরিচয় করাবার জন্য। বইটির প্রথম প্রকাশ 1988 সালে। কিন্তু আজ তিরিশ বছর বছর অতিক্রান্ত হয়েও বইটির আবেদন একই রকম। সাহিত্য ভাবনা ও আলোচনার ক্ষেত্রে বইটির নিবিড় পাঠ একজন সচেতন পাঠককে কেবলমাত্র ঋদ্ধই করে।
 
গ্রন্থটিতে মোট সতেরোটি অধ্যায়ে রবীন্দ্র-উপন্যাস থেকে শুরু করে সমরেশ বসুকে নিয়ে আলোচনা এবং সংযোজন হিসেবে 'মানিক বন্দোপাধ্যায়ের নিয়তি' অধ্যায়টি স্থান পেয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার আলোচনা করছেন রবীন্দ্র-উপন্যাস নিয়ে। তাঁর মতে 'বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার ঐতিহ্য সন্ধান করতে গেলে শুরু করতে হয় রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের 'পিতৃপদবাচ্য', বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার সূত্রপাতও তাঁরই হাত ধরে।' এই সূত্র ধরে একে একে আলোচনায় এসেছে 'গোরা', 'চোখের বালি', 'চতুরঙ্গ', 'ঘরে-বাইরে', 'যোগাযোগ', 'দুই বোন' ইত্যাদি উপন্যাসগুলির কথা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই অধ্যাপক অশ্রুকুমার শিকদারের তীক্ষ্ণ ধীশক্তি উপন্যাসগুলির ভেতর থেকে তুলে এনেছে ছড়িয়ে থাকা মণিমানিক্য। রবীন্দ্রনাথের কলমে কিভাবে উপন্যাসের 'সময়পরাম্পরাগত বিন্যাস' ভাঙচুর হয়েছিল, ক্রিটিক্যাল রিয়ালিজমে স্বামী সহবাসও কিভাবে অশুচি ও অসতীত্ব হয়ে উঠতে পারে তা বিশ্লেষণ করে রবীন্দ্র-উপন্যাসে আধুনিকতার প্রয়োগকে স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন তিনি।  পাঠকের মনে নতুন দিশা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ভাবতে শিখিয়েছেন নতুন আঙ্গিকে। অবাক হয়ে দেখতে হয় রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসগুলি কতোটা আধুনিক ছিল তাঁর সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে। দ্বিতীয় অধ্যায়টিতেও লেখকের অত্যন্ত সুন্দর বিশ্লেষণ জারি থাকে। 'যুগলের নিঃসঙ্গতা' শীর্ষক অধ্যায়টিতে লেখক দেখান কিভাবে মানুষ আত্মিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আস্থা হারিয়ে ফেলছে প্রত্যয়ে আর প্রমূল্যে। পাশ্চাত্যের বিখ্যাত লেখকদের তুলনা টেনে এনে রবীন্দ্রনাথের লেখায় চরিত্রগুলির পরমশূন্যতাময় বিচ্ছিন্নতাকে চিহ্নিত করেছেন। এই নিঃসঙ্গতার পেছনে রবীন্দ্রনাথের নিজের জীবন অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেছেন লেখক। উদাহরণ সহযোগে দেখিয়েছেন কিভাবে নিঃসঙ্গতার শিকার হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং কিভাবে তার প্রভাব পড়েছিল তাঁর সৃষ্ট গল্প-উপন্যাসে।
তৃতীয় অধ্যায়ে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের বিষয় ও বিন্যাসে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার চরিত্র সৃষ্টিতে শরৎচন্দ্রের দক্ষতা দেখিয়েছেন। পাশাপাশি এটাও প্রমাণ করেছেন প্লট শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের ক্ষেত্রে চরিত্রকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে। আবার চরিত্র সৃষ্টিতেও শরৎচন্দ্র 'হৃদয়বৃত্তি ও বহিরঙ্গ ঘটনার সংঘাতের উপর জোর দিয়েছেন'। ষরল আখ্যানবস্তুতে তাঁর উপন্যাসে একান্নবর্তী পরিবারই মোটামুটিভাবে সব উপন্যাসের মূল প্রসঙ্গ।  লেখকের মতে, সনাতন রীতিতে লিখতে অভ্যস্ত শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে আঙ্গিক সচেতনতার অভাবে উপন্যাসে আধুনিকতার পূর্বাভাস পাওয়া যায় না।  সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার প্রতি শরৎচন্দ্রের পক্ষপাত থাকায় গণতান্ত্রিক ভাবনার মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনটি ধরতে পারেন নি বলেই লেখকের বিশ্বাস। দীর্ঘ আলোচনায় লেখক এই সিদ্ধান্তে আসেন যে 'বাংলা উপন্যাসে আধুনিকতার বিবর্তনে শরৎচন্দ্রের ভূমিকা সামান্য'। কিন্তু তাঁর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। যাঁরা তাঁর প্রভাবমুক্ত হতে পেরেছিলেন যেমন জগদীশচন্দ্র গুপ্ত বা মানিক বন্দোপাধ্যায় তাঁরা বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতা দিতে পেরেছিলেন। 
বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার বিচারে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার মনে করেন একমাত্র জগদীশচন্দ্র গুপ্ত ছাড়া কল্লোল-পন্থী ঔপন্যাসিকরা উপন্যাসকে আধুনিকতার দিকে না নিয়ে গিয়ে পিছিয়ে দিয়েছিলেন অনেকটা। তাঁর পর্যবেক্ষণ হল- '...শরৎচন্দ্রের লঘুকরণ থেকে উদ্ধার করা দূরের কথা, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে জীবনকে পর্যবেক্ষণের যে মহৎ চেষ্টা ভাবালুতার চোরাবালি অতিক্রম করেও বেঁচে ছিল, 'কল্লোল-পন্থীগণ সেই চেষ্টাকে আরো বেশি লঘু তরল ও অবাস্তব করে ফেলেছেন, করে ফেলেছেন রোমান্টিক মরীচিকায় বিভ্রান্ত।' 
পঞ্চম অধ্যায়টি বরাদ্দ হয়েছে জগদীশ গুপ্তের জন্য। লেখকের মতে পোস্ট-রেনেসাঁস অ-মানবতন্ত্রী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য প্রকট জগদীশ গুপ্তের লেখায়। তাঁর 'অসাধু সিদ্ধার্থ', 'গতিহারা জাহ্নবী', 'রোমন্থন', 'সুতিনী', 'মহিষী' ইত্যাদি বিভিন্ন উপন্যাসের দীর্ঘ আলোচনা শেষে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে রবীন্দ্রনাথ-প্রভাতকুমার-শরৎচন্দ্র প্রমুখের প্রভাবমুক্ত হয়ে জগদীশ গুপ্ত যে শৈলীর জন্ম দিলেন তা আক্ষরিক অর্থেই আধুনিক কেননা তাঁর উপন্যাস পড়লে পাঠকের মূল্যবোধ নাড়া খায়। তাঁর স্বকীয় জীবনোপলব্ধি থেকে রচিত উপন্যাসগুলি বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার যাত্রাপথে মাইলস্টোন হয়ে রয়েছে। 
পরবর্তী অধ্যায়ে বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী' ও 'অপরাজিত' প্রসঙ্গ টেনে আলোচক পরিষ্কার খুঁজে পান জৈবিক সমগ্রতা যা আধুনিকতার বিচ্ছিন্নতা ও নির্বেদের রূপায়ণ। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার টোমাস মান, জেমস জয়েসের মতো লেখকদের তুলনা এনেছেন। এটা তো ঠিক 'পথের পাঁচালী'র ভূমিকা বাংলা উপন্যাসের যাত্রাপথে ঠিক কোন জায়গায় তা নিরূপণ করার প্রয়োজন হয় না। তাই যখন লেখক দেখান উপন্যাসের গতি রৈখিক হয় না, হয় বৃত্তাকার, তখন আমরা পরম বিস্ময়ে দেখি নিশ্চিন্দিপুরের গ্রাম থেকে বেরিয়ে অপু সেই গ্রামেই ফিরে আসে এবং কাজলের শৈশবের মধ্যে ঘটে আরও এক বৃত্তের সূত্রপাত। 
'তারাশঙ্কর: দ্বন্দ্বের শিল্পী, দ্বন্বের শিকার' শীর্ষক সপ্তম অধ্যায় থেকে শুরু করে তেরো নম্বর অধ্যায় 'বিশ্বাসের সঙ্কট ও সমরেশ বসু' অবধি আলোচনায় এসেছেন ধূর্জটিপ্রসাদ, অন্নদাশঙ্কর রায়, গোপাল হালদার, মানিক বন্দোপাধ্যায়, জীবনানন্দ, সতীনাথ ভাদুড়ী, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সমরেশ বসু প্রমুখের উপন্যাসকে কাটাছেঁড়া করেছেন লেখক। তারাশঙ্করের প্রথম উপন্যাস 'চৈতালি ঘূর্ণি' দিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা 'ধাত্রীদেবতা', 'পঞ্চগ্রাম', 'গণদেবতা', 'হাঁসুলী বাঁকের উপকথা' ছুঁয়ে 'বিচারক', 'সপ্তপদী', 'বিপাশা' ইত্যাদিতে শেষ হচ্ছে।
বাস্তবের মাত্রা, কালের মাত্রা তারাশঙ্কেরকে বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধ করেছিল। নৈতিক প্রশ্নে, ইতিহাসের বর্ণময়তায়, বিচিত্র সাধনার অধ্যাত্মিক গূঢ়তায় সৃষ্ট দ্বন্দ্বই  তাঁর  উপন্যাসগুলিকে আধুনিক করেছিল। লেখক মনে করেন, 'তারাশঙ্করের প্রায় সব উপন্যাসে ঐতিহ্য - আধুনিকতার, অতীত-বর্তমানের, সেকাল-একালের বিরোধের কথা পুনরাবৃত্তভাবে ফায়ার ফায়ার আসে।`
অন্নদাশঙ্করের 'সত্যাসত্য`তে উজ্জয়িনী ও তার আত্ম-অন্বেষণ বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার আর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একইভাবে ধূর্জটিপ্রসাদের 'অন্তঃশীলা', 'আবর্ত`, 'মোহনা` ইত্যাদি আধুনিক চেতনাপ্রবাহের মিশ্রনে উপন্যাসকে এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল। রাজনৈতিক বাস্তবতা ফুটে উঠেছিল গোপাল হালদারের 'ত্রিদিবা`তে। বস্তুত, রাজনীতি ছাড়া জীবন যে চলমান নয় এবং রাজনীতি আধুনিক জীবনের অঙ্গ সেকথা বোধহয় চোখে আঙ্গুল দিয়ে গোপাল হালদার প্রথম প্রমান করেন। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের 'জননী', 'পদ্মানদীর মাঝি`যে বাস্তবতার জন্ম দেয় সেই ধারায় যেন অনুসরণ করেন কমলকুমার মজুমদার, সমরেশ বসু প্রমুখ যথাক্রমে 'অন্তর্জলি যাত্রা`, 'বিবর`,'তিনপুরুষ` ইত্যাদি উপন্যাসে। উঠে এসেছে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের 'পুতুলনাচের ইতিকথা`, কালকূট নামে সমরেশ বসুর 'অমৃতকুম্ভের সন্ধানে`, 'শাম্ব` ইত্যাদি উপন্যাসগুলোর কথাও। মাঝে আলোচনায় এসেছেন জীবনানন্দ 'অদ্ভুত অপৃথিবী`, অমিয়ভূষণ 'গড় শ্রীখন্ড' এবং অতি অবশ্যই সতীনাথ ভাদুড়ী তাঁর আধুনিক এপিক 'ঢোঁড়াইচরিতমানস` নিয়ে। 
একটি বিরাট সময়কে আলোচনায় ধরে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার তাঁর এই গ্রন্থে বিদগ্ধ আলোচনায় পাঠকের চেতনাকে এমন জায়গায় নিয়ে যান যাতে পাঠক বুঝতে পারেন উপন্যাস হিসেবে কি পড়া উচিত আর কি নয়।  আধুনিকতার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে কালের নিয়মে তা চলবে। আজ থেকে পঞ্চাশ-একশো বছর পর আবার কোনো অশ্রুকুমার সিকদার বর্তমান সময়ের উপন্যাস চেনাবেন এভাবেই যত্ন করে ভবিষ্যতের পাঠকদের। 

(প্রকাশিত: অপরাজিত অর্পণ, মেখলিগঞ্জ)


Tuesday, July 12, 2022

 



কাঠের বাড়ি 

শৌভিক রায় 


ফালাকাটায় আমার দুই বন্ধু রণজিৎ মাহেশ্বরী ও রাজা মাহেশ্বরীর কাঠের বাড়িটা আমার খুব প্রিয় ছিল। ওই কাঠের বাড়িটার টানেই কতদিন যে স্কুল ফেরত ওদের বাড়ি যেতাম, তার হিসেবে নেই। আর এক বন্ধু পিনুদের ভাড়া বাড়িটাও ছিল কাঠের দোতলা। পুটনদের বাড়ির একটা অংশেও ছিল কাঠ নির্মিত ঘর। ফালাকাটা ডাকবাংলো, হাই স্কুলের পুরোনো হোস্টেল, ভূমি-দপ্তরের অফিস, থানা সহ বহু বাড়ি ছিল কাঠের। অবশ্য কাঠের বাড়ি ব্যাপারটি ফালাকাটার একচেটিয়া ছিল না। পূর্বে সঙ্কোশ থেকে পশ্চিমে তিস্তা পর্যন্ত বিস্তৃত ডুয়ার্স-ভূমি, বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ, দার্জিলিং পাহাড় সর্বত্রই ছিল কাঠের বাড়ির রমরমা।





সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে অনেককিছু। খুব স্বাভাবিক সেটা। একবিংশ শতাব্দীতে পা রেখে, গাছ কেটে কাঠ দিয়ে বাড়ি বানাচ্ছি ভাবতে সত্যি কষ্ট হয়। কিন্তু কীভাবে ভুলব কালিম্পঙয়ের ডঃ গ্রাহাম হোমসের কাঠের তৈরি সেই কটেজগুলি বা বহু রাত কাটানো বেকারি ফ্ল্যাট! বীরপাড়ার মুন্নাদিদের কাঠের সেই অভিজাত বাড়ি কি ভুলে যাওয়ার? কিংবা বানারহাটে বাবুদের সেই কাঠের বাড়ি যার টিনের চালে সারা রাত জলতরঙ্গ শুনেছিলাম এক ভরা শ্রাবণ রাতে! এরকম আর কয়েক গন্ডা কাঠের বাড়ির হু হু করে স্মৃতিতে উঠে এলো মিরিকের প্রয়াত শিক্ষক শ্রদ্ধেয় গঙ্গাপ্রসাদজির কাঠের বাড়িটিকে দেখে। অতীত যেন থমকে ছিল ওখানে। 




মিরিকের কসমোপলিটান চরিত্রে  উজ্জ্বল নাম এই অবাঙালি মানুষটি। মিরিকের উন্নয়নে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করেন ওখানকার পুরোনো মানুষ। (যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, উত্তরের ছোট ছোট জনপদগুলির উন্নয়নে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষদের অবদান নিয়ে আমরা বড্ড উদাসীন) মিরিককে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবার সরকারি ঘোষণার দিনে, তাঁর একটি ছবি দেখতে পেলাম ওই বাড়িতেই। সেই ছবিতে দেখতে পাচ্ছি  তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কেও। এছাড়াও সারা বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এমন কিছু উপাদান যার মূল্য আমার কাছে অনেক। কিন্তু সময়াভাবে সেগুলিকে সেভাবে আর খনন করা হল না। সেই অভিজ্ঞতার দুই চারটি ছবি শেয়ার করলাম সবার সঙ্গে। 







গঙ্গাপ্রসাদজি আজ নেই। বাড়িটি রয়ে গেছে। 
বাড়িই রয়ে যায় আসলে, প্রস্থান ঘটে চরিত্রদের.... 




Thursday, July 7, 2022

 জ্বর

শৌভিক রায়


আজকাল জ্বর হলে মায়ের কথা মনে পড়ে,

জ্বর মাখামাখি কপালে মা কতদিন রাখেনি হাত

ধুইয়ে দেয়নি মাথা, খাইয়ে দেয়নি গলা ভাত...


বড় কিংবা বুড়ো হয়ে গেছি বলে

মা'কে পাইনা আর


ছেলে খোঁজ নেয়, ওর মা এসে বসে পাশে


শুধু ধূপের গন্ধে মা ভেসে আসে আবছায়া 

আধো অন্ধকারে কোন্ এক জন্ম থেকে...