আনন্দের কোলাহলে প্রতিবেশী ডুয়ার্সের কান্না কানে আসে না
শৌভিক রায়
'জন্মেছিলাম এই বাগানে। বড় হয়ে ওঠা, বিয়ে সবই এখানে। উনি মারা যাবার পর দুই ছেলেই এই বাগানে এখন চাকরি করে। বড় নাতনি পড়ছে কলেজে। ছোট নাতিকে নিয়ে এসেছি মন্ডপে। আগে তো শুধু বাবুবাসা পূজা হতো, পরে তো আমাদের লাইনেও চালু হল পূজা', বললেন পূর্ণিমা খালকো। বয়স তাঁর আশির কোঠায়। এখনও টানটান শরীর। কুলিলাইনের পুজোমন্ডপে একা বসে আছেন পড়ন্ত বিকেলে। সামনের মাঠে বসেছে মেলা। ছোট নাতি ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে একা।
এই চা-বাগানে দুটো পুজো- বাবুদের আর শ্রমিকদের পুজো। পুজোর বয়স যথাক্রমে পঁচাত্তর ও চল্লিশ।
শহর কোচবিহারের প্রতিবেশী ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলির দুর্গাপূজার বেশ প্রাচীন। যেমন মথুরা চা বাগানের পুজো প্রায় একশো, দলসিংপাড়া চা-বাগানের পুজো আশি ছুঁই ছুঁই, সুভাষিণীর পুজোও ওরকমই। ডুয়ার্সে ছড়িয়ে থাকা অজস্র চা-বাগানগুলির পুজোর খোঁজ নিলে এরকম চিত্রই ফুটে উঠবে। ঠিক কবে থেকে বা কোন কোন চা-বাগানকে পুজো প্রথম শুরু সেকথা জানা না গেলেও অনেক চা-বাগানের পুজোই যে শতাব্দী প্রাচীন তা নিয়ে দ্বিমত নেই। হবে না-ই বা কেন? ডুয়ার্সে প্রথম চা-বাগানের পত্তন হয় ১৮৭৪ সালে। উত্তরবঙ্গে দার্জিলিঙে ১৮৪১ সালে প্রথম চা বীজ পুঁতেছিলেন ডঃ ক্যাম্বেল। কিন্তু ১৮৫৬ সালে লেবঙের কাছে ধোতরে চা-বাগানকেই উত্তরবঙ্গের প্রথম চা-বাগান বলে মনে করা হয়। ডুয়ার্সের জলবায়ু, আবহাওয়া ও মৃত্তিকা যে চা চাষের অনুকূল সেটা বুঝতে ইংরেজরা কিছুদিন সময় নিয়েছিল। কিন্তু একবার বুঝবার পর তারা আর দেরী করে নি। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ডুয়ার্সের ঘন অরণ্য কেটে চা-বাগান তৈরী করতে। রাঁচি, সিংভূম, হাজারিবাগ ইত্যাদি অঞ্চল থেকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ও নেপালের তেমাল, ওয়াফল, মাওয়ার, থংয়াল, ইয়োলমো ইত্যাদি জায়গা থেকে নেপালি সম্প্রদায়ের শ্রমিক আনা হয়েছিল। চা-বাগানের প্রশাসনিক কাজে গোরা সাহেবরা থাকলেও অন্যান্য অফিসিয়াল কাজে ইংরেজরা ভরসা করেছিল সেই বাঙালিদের ওপর। ডুয়ার্সের জনবিন্যাসে তাই নানা জাতির মিশ্রণ সহজেই অনুমেয়।
স্বাধীনতার পূর্বে তো বটেই, স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও দীর্ঘদিন ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। নিজেদের খেলার মাঠ, প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পূজামন্ডপ ইত্যাদি সবই ছিল। প্রাথমিক পর্ব শেষ হলে আশেপাশের আধা-শহরগুলির উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা করতে আসতো চা-বাগানের ছেলেমেয়েরা। তাদেরকে আনার জন্য থাকতো চা-বাগানের নিজস্ব গাড়ি। অর্থাৎ এস্টেট বলতে যা বোঝায় চা-বাগানগুলি ছিল তাই। তাই তাদের পূজাও হতো দেখবার মতো। মনে পড়ছে ছোটবেলায় চা-বাগানের পুজো আমাদের পুজো পরিক্রমায় ওপরের দিকে থাকতো। পুজো ঘিরে বেশিরভাগ চা-বাগানেই ছোটখাটো মেলা বসে যেত। কালীপুজোতেও বজায় থাকতো সেই একই জৌলুষ। ডুয়ার্সের কালীপুজো তখন টেক্কা দিত ডুয়ার্সের শহরগুলির পুজোকে। এখানে বোধহয় এই তথ্যটি দেওয়া অপ্রাঙ্গিক হবে না যে ডুয়ার্সের বেশিরভাগ শহরই কিন্তু গড়ে উঠেছে চা-বাগানগুলিকে কেন্দ্র করে।
সত্তরের দশক থেকে চা-শিল্পে মন্দা, বৈদেশিক বাণিজ্যে ধাক্কা, পর্যাপ্ত পরিকাঠামো, অদক্ষ পরিচালনবর্গ ইত্যাদি নানা কারণে চা-বাগানগুলি ধুঁকতে শুরু করে। তবে আশির দশকে অবস্থা বোধহয় চরমে ওঠে। ডুয়ার্সের বিভিন্ন চা-বাগানে শুরু হয় লকআউট, শ্রমিক অসন্তোষ, অনাহারে মৃত্যুর মতো বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে চা-বাগানগুলি হারায় তাদের আভিজাত্য ও বৈভব। চা-বাগান কিনে চটজলদি মুনাফা করার এক ঘৃণ্য প্রয়াস দেখা দিয়েছিলো একটা সময়। দক্ষ ম্যানেজারের বদলে নিজেদের পছন্দ মতো লোককে কুর্শিতে বসানো, তাকে নিজের খেয়াল খুশি মতো উৎখাত, শ্রমিকদের ন্যূনতম মর্যাদা না দেওয়া এবং চা-বাগানের ঐতিহ্যকে মনে না রাখা সব মিলে চা-বাগানের অবস্থা সঙ্গিন হয়ে উঠেছিল। ভাবতে অবাক লাগে যে চা-বাগানগুলি ডুয়ার্সের শহরগুলির উন্নয়নে এক সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো তাদের এই দৈন্য দশা দেখা দিতে পারে। চা-শিল্পের সাথে যুক্ত উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত পরিবারগুলোও ধীরে ধীরে বীতশ্রদ্ধ হয়ে চা-শিল্প থেকে সরে আসেন। সব মাইল অবস্থা ঘোরালো হতে সময় নেয় নি। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলছে। কখনো কোনো বন্ধ চা-বাগান আশার আলো জ্বালিয়ে খোলে তো পরক্ষণেই কোনো বাগান বন্ধ হয়ে যায়। যে চা-বাগান একসময় ডুয়ার্সের শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলার ক্ষেত্রে অগ্ণি ভূমিকা নিয়েছিল তারা ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত অন্ধকারে ঢেকে গেলো। সৌহার্দের, ভালোবাসার, সম্প্রীতির চা-বাগান যেন নষ্ট হয়ে গেলো চোখের সামনে।
তবু পুজোর ট্র্যাডিশনকে একইরকমভাবে ধরে রাখতে আজও তৎপর ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলি। কোনো কোনো চা-বাগানে বাবু ও শ্রমিক উভয়ে মিলে একটি পুজো হয়, কোথাও আবার আলাদা হয়ে গেছে বাবুদের ও শ্রমিকদের পুজো। আগেকার মতোই আজও বেশ কিছু পুজো মন্ডপকে ঘিরে মেলা বসে। যেমন চারদিকে চা-বাগান ঘেরা হাসিমারার মলঙ্গী সার্বজনীন। মন্ডপের সামনের মাঠে বসে মেলা। হাসিমারার সেন্ট্রাল ক্লাবও চা-বাগানের মাঝে। প্রায় পঁচাশি বছর ধরে চলে আসছে তাদের পুজো। অন্যদিকে কালচিনির কালীপুজো তো বিখ্যাত। মেলাও বসে বিরাট কালীপুজোর সময়। মালবাজার, চালসা, মেটেলি, নাগরাকাটা, বিন্নাগুড়ি, ধূপগুড়ি, গয়েরকাটা, ফালাকাটা, বীরপাড়া, মাদারিহাট ইত্যাদি প্রতিটি জায়গাতেই থাকা চা-বাগানগুলির পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে সম্পন্ন হয়ে আসছে। কোনো কোনো পুজো শতবর্ষ পার করেছে।
শারদ উৎসবের সূচনা হয়েছে। মাসাধিককাল ধরে চলবে উৎসব। কোচবিহারের ক্ষেত্রে রাসমেলা ধরলে এই সময়সীমা আরও বেশি। বিগ বাজেটের পুজোর প্রচারে, আলোর ঝরণাধারায়, আনন্দের কোলাহলে প্রতিবেশী ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলির কান্না আমাদের অনেকের কানে আসে না। অন্ধকারে ডুবে থাকে কোনো এক মংলু কুজুরের বাড়ি, কোনো এক ফুলবন্তীর ঠাঁই হয় আড়কাঠির কারসাজিতে নিষিদ্ধপল্লীতে, হাঁড়ি চড়ে না কোনো বুধুয়া লাকড়ার রান্নাঘরের উনুনে। তবু নিজেদের সীমিত সাধ্যে দুর্গাপুজো আর দীপাবলিতে তারা মেতে ওঠে নিজেদের মতো। এই চারটে দিন আর দীপাবলির দু'দিন বছরের সেরা সময়। নিরন্ন থাকে না কেউ। কমিউনিটির শ্রেষ্ঠ রূপ দেখা যায় চা-বাগানগুলিতে। এদিকে শুকরা কুলির পাতে পরিবেশন করছেন বাগানের রাশভারী বড়বাবু পরেশ মুস্তাফি তো অন্যদিকে বাসন্তী কুজুর ছুটেছে অ্যাসিস্টান্ট ম্যানেজারের সহধর্মিণী ঐন্দ্রিলা মুখার্জীর ভালবাসার কাশ ফুল তুলে আনতে। কোনো এন জি ওর সহযোগিতায় বা নিজেরাই চাঁদা তুলে বাবুরা শ্রমিকদের শিশুদের জন্য এনে দিয়েছেন নতুন জামা। এ তাদের প্রাণের উৎসব, মনের উৎসব। জীবনের সমস্ত দুর্ভোগ দূরে থাক উৎসবের দিনগুলিতে, ভোলা যাক না-পাওয়াগুলিকে। সারা বছরই তো থাকবে দারিদ্র, অনটন, অভাব, অভিযোগ। কিন্তু শারদ উৎসব? তার টান যে আলাদা।
বয়স্কা পূর্ণিমা খালকো তাই দেখে যান মায়ের মুখ, বালক বসন্ত জ্বালায় তারাবাতি। বৃদ্ধা ঠাকুমা ও বালক নাতির মুখে তখন পড়ন্ত সূর্যের অস্তরাগ। প্রতিবেশীদের তৃপ্তির মুখ দেখে কিচ্ছু করতে না পারা অসহায় এই আমি শিখি বাঁচার মন্ত্র।
সত্যিই তো, পাড়াপড়শি যদি ভাল না থাকেন তবে কি ভাল থাকা যায় কখনো? সেই আপ্তবাক্য যে কানে ভাসে 'পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে...'
(উত্তরবঙ্গ সংবাদ: কোচবিহার সংস্করণ ৩/১১/২০১৮)
No comments:
Post a Comment