Tuesday, July 26, 2022



মুজনাই তীরের ফালাকাটা: অনন্য ডুয়ার্সের অন্য গল্প
শৌভিক রায়

ডুয়ার্স তথা উত্তরবঙ্গের সমৃদ্ধ জনপদ ফালাকাটা, ১৮৬৯ সালে, প্রশাসনিক দিক থেকে অবিভক্ত জলপাইগুড়ির প্রথম মহকুমার মর্যাদা পেলেও, তার অস্তিত্ব কিন্তু আগে থেকেই পাওয়া ছিল। একথা বলবার কারণ হল যে, ডুয়ার্সের বহু জনপদ গড়ে উঠেছিল ওই শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে, ডুয়ার্সে চা-বাগান বিস্তারকে কেন্দ্র করে। তার আগে এই অঞ্চল ছিল শ্বাপদসঙ্কুল ঘন অরণ্যে ঢাকা। ফলে, বানিয়া ইংরেজ প্রথমদিকে ডুয়ার্স নিয়ে সেভাবে উৎসাহী ছিল না। কিন্তু ফালাকাটার বিষয়টি ছিল আলাদা। গভীর অরণ্যের ধারে খানিকটা লোকালয়, চাষের জন্য উপযুক্ত জমি, সেচের উপযুক্ত নদীর জল ইত্যাদি লোভনীয় ব্যাপারগুলি ফালাকাটার সঙ্গে জুড়ে ছিল বলে, এই স্থানটির ওপর আলাদা নজর ছিল দু'পক্ষেরই। ফলে, কোচবিহার রাজ্যের সঙ্গে ভুটানের যুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে হাতবদল হয়েছে এই জায়গাটির। ইতিহাস বলছে যে, ১৬৬৩ থেকে ১৭৭৩ অবধি কোচবিহার ও ভুটান বারবার নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে আর বারবার ফালাকাটার মালিকানা বদলেছে। 
কোচবিহারকে ইংরেজরা সহায়তা করবার আগে অবধি দীর্ঘ সময় ফালাকাটা ভুটানের অধীনেই ছিল। পরবর্তীতে বক্সা-জয়ন্তী ইত্যাদি হাতবদলের সময় বা তার কিছুদিন আগে, ফালাকাটাও পাকাপাকিভাবে কোচবিহারের মাধ্যমে ইংরেজদের হাতে আসে। 

ইতিহাস বলছে যে, ভুটানের অধীনে থাকবার সময় কর আদায়ের জন্য জলপথে ভুটানিরা আজকের ভুটনিরঘাটে এসে ডেরা বাঁধতো। অনেকে মনে করেন যে, বর্তমান ফালাকাটার টাউন ক্লাবের মাঠের `মেলার মাঠ` নামের  পেছনেও ভুটানের ইতিহাস রয়েছে। সেসময় অবশ্য মাঠ বলতে  সুভাষ কলোনি, এস এস বি ক্যাম্পের ইত্যাদি বিরাট এলাকার ফাঁকা জায়গাকেও বোঝাতো। সেই মাঠেই বসতো মেলা আর সে মেলাতে ঘোড়দৌড় পর্যন্ত হত।ভুটানের পাবর্ত্য অঞ্চল থেকে নেমে, ডুয়ার্সের ঘন জঙ্গল পেরিয়ে ফালাকাটাই ছিল একমাত্র জনপদ যেখানে ভুটানিরা কর আদায় থেকে শুরু করে অন্য আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠতো। তবে প্রামাণ্য ইতিহাস খানিকটা অধরা আজও।

১৮৬৯ সালে ফালাকাটাকে মহকুমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইংরেজরা এই জনপদের  গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছিল, যদিও বর্ষায় ভয়ঙ্কর তিস্তা-জলঢাকা ও তোর্ষার মাঝে অবস্থিত এই জায়গাটি থেকে জেলার অন্যত্র মজুদ থাকা সেনাবাহিনীর রসদ, ওষুধপত্র ইত্যাদি যোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য ছিল বলে চার-পাঁচ বছরের মধ্যে মহকুমা বক্সাতে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু ফালাকাটার কৌলিন্য বা গুরুত্ব তাতে কমে নি। কেননা নির্জন ও প্রায় জনমানবহীন ডুয়ার্সের যে জায়গাগুলি থেকে কিছু পরিমান খাজনা আদায় করা যেত, ফালাকাটা ছিল তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানে। ফলে এখানে তৈরি হয়েছিল এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ তহশীলখানা। সে সময় ফালাকাটার পরিচয় ছিল যে, ফালাকাটা মানেই হ'ল 'তহশীল অফিসের ঘড়ি, বংশীধরের ভুঁড়ি আর শিরীষ বসুর দাড়ি'। 

মুজনাই নদী তীরের ফালাকাটার নামকরণের পেছনে অধুনা একটি মত বলছে লোকদেবতা ফালাকাটা থেকে জায়গাটির নাম এসেছে। লোকদেবতা ফালাকাটার বাহন হল বাঘ এবং রয়েছে তাঁর দুই ভাই তুলাকাটা এবং ধুনাকাটা। শোনা যায় দেবতা ফালাকাটাকে নিয়ে ছড়াও- 'ভক্তি দিনু ফালাকাটা মহারাজ, থাকেন বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলত। পশ্চিমে হইল করতোয়া, উত্তর হইতে পূর্বেত তিস্তাবুড়ি বহে ধীর...।' তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, আমবাড়ি-ফালাকাটার নামকরণের পেছনে এই ছড়াটি বেশি প্রযোজ্য। অন্য একটি মত বলছে যে, ফালাকাটার পূর্ব -পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে ঘিরে থাকা ছোট্ট যদি সাপটানা ভূখন্ডকে ফালা ফালা করে কেটেছে বলে জায়গাটির নাম ফালাকাটা। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কোচবিহার রাজ্যের সাথে ভুটানের যুদ্ধে কোনো এক পক্ষের সৈনিকদের এখানে টুকরো টুকরো বা ফালা ফালা করা হয় বলে জায়গাটির নাম ফালাকাটা। 

প্রাচীন এই জনপদ আলিপুরদুয়ার জেলা তো বটেই, সমগ্র উত্তরবঙ্গেই পরিচিতি। শিলিগুড়ি-কোচবিহার, শিলিগুড়ি-আলিপুরদুয়ার সড়কপথে ফালাকাটা হয়ে যাতায়াত সময় ও দূরত্ব দুদিক থেকেই কম নেয়। রেলপথেও ফালাকাটা স্টেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের স্টেশন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ফালাকাটা এতদিন পরিচিত ছিল। হালে মাদারিহাট, বীরপাড়া, মাথাভাঙ্গা ইত্যাদি জায়গায় ব্রড গেজ লাইন চালু হওয়ার ফলে চাপ খানিকটা কমেছে। তা না হলে ভুটান-সহ উল্লিখিত জায়গাগুলির মানুষেরা নির্ভর করতেন ফালাকাটার ওপর। ভুটান থেকে ডলোমাইট পাঠানোর ক্ষেত্রেও ফালাকাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। আসলে ভৌগোলিকভাবে ফালাকাটার অবস্থানটি এতটাই সুবিধেজনক যে ডুয়ার্সে বেড়াতে আসা পর্যটক থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই ফালাকাটার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আক্ষরিক অর্থে ডুয়ার্স বলতে যা বোঝায়, তার মধ্যে ফালাকাটা ব্লকের সমস্ত অংশ না এলেও, অনেকটাই ডুয়ার্সের মধ্যে বা ডুয়ার্স ঘেঁষা সেটা বলতে অসুবিধে নেই। আর চরিত্রগত দিক থেকে ডুয়ার্সের জনজীবন, প্রকৃতি, আবহাওয়া ইত্যাদি সবকিছুই এক। বরং বাড়তি সংযোজন ফালাকাটার কৃষি জমি। আলিপুরদুয়ার জেলার আর কোনো ব্লকে এতো পরিমান কৃষি-জমি না থাকায় সমগ্র জেলার খাদ্যশস্য ফালাকাটা থেকেই সরাবরাহ করা হয়। আধুনিক কৃষিমান্ডির সাহায্য বতর্মানে তা পাড়ি দিচ্ছে জেলা পেরিয়ে দূর-দুরান্তেও। 

অতীতে ফালাকাটা ছিল ঘন অরণ্যে ঢাকা। সেই সময় জলদাপাড়া অরণ্যের বিস্তার ছিল  অনেকটা। ফলে সেভাবে লোকবসতি ছিল না। আজও ফালাকাটার কুঞ্জনগর ইকো টুরিজম সেন্টারের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা বুড়িতোর্ষা নদী পার হলেই  জলদাপাড়া।  ফালাকাটার কাছে  দেওগাঁর অরণ্যও একসময় জলদাপাড়ার অংশ ছিল। রাজ্যসড়ক সেই অরণ্যকে দু'ভাগ করেছে সেটা বোঝাই যায়। দেওগাঁতেই রয়েছে দক্ষিণ খয়েরবাড়ির বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন ও ইকো টুরিজম। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আদিম অরণ্যের বিপুল বিস্তারের জন্যই ফালাকাটা ব্লকে সেভাবে জনপদ গড়ে ওঠে নি। তাই এখানে পুরাতাত্ত্বিক কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না। জটেশ্বরের শিব মন্দির, ফালাকাটার মহাকাল মন্দির জাতীয় দু'চারটি সাধারণ মন্দির বা  মসজিদ ছাড়া অতি প্রাচীন বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পন্ন কোনো মন্দির বা মসজিদ বা গির্জা নজরে আসে না। অবশ্য সমগ্র ডুয়ার্সেই এই চিত্র। প্রকৃতি এখানে যতোটা উদার, মনুষ্যকীর্তি ঠিক ততোটাই কম। ভুটান থেকে  আঠারোটি ডোর বা দুয়ার (Doors বা দুয়ার থেকেই ডুয়ার্স কথাটির উদ্ভব) দিয়ে যে সমতলে আসা যেত তা ছিল মূলতঃ ঘন অরণ্যে ঢাকা এবং শ্বাপদসঙ্কুল। বানিয়া ইংরেজ চা চাষের মুনাফার লোভে ডুয়ার্সকে ব্যবহার করতে শুরু করলে চা-বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে শুরু করে এক একটি জনপদ। তাই পুরাতাত্ত্বিক দিক থেকে সমগ্র ডুয়ার্সে সেরকম কিছু পাওয়া যায় না। যদিও ডুয়ার্স নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসে নি, কেননা এখানকার অনেক ইতিহাস আজও অজানা। যাই হ'ক সে প্রসঙ্গ আলাদা। 

ফালাকাটার কাছে থাকা কুঞ্জনগর ইকো টুরিজম সেন্টার ছিমছাম শান্ত পরিবেশে বিনোদনের একটি সুন্দর আশ্রয়। ওয়াচ টাওয়ার থেকে জলদাপাড়ার জঙ্গল দেখার অভিজ্ঞতা অন্যরকম। নদীর ওপর ঝুলন্ত ব্রীজ পেরিয়ে ওপারে জলদাপাড়াতে প্রবেশ করা যায়, যদিও তা নিষিদ্ধ ও বিপদজনক। কুঞ্জনগরের পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিতা, ময়ূর ইত্যাদি রাখা থাকতো কিছুদিন আগেও। দুর্ভাগ্য সেগুলিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরণ্যক কুঞ্জনগর নিঃসন্দেহে ভাললাগার একটি জায়গা। ফালাকাটার নিকটবর্তী  শালকুমারের দিক থেকে পূর্ব জলদাপাড়ার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। কুঞ্জনগর ও শালকুমারে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে থাকবার ব্যবস্থাও রয়েছে। তাই চাঁদনি রাতে নদীগুলির  নীল জলের ধারে যূথবদ্ধ পশুর দল দেখার আনন্দ সারাজীবনের সঞ্চয় হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ খয়েরবাড়িতেও ছোট্ট নদীর দুধারে বিস্তৃত ইকো-পার্ক যেমন শিশুদের মনোরঞ্জন করে তেমনি খাঁচায় বন্দী বাঘেরা আবালবৃদ্ধবনিতাকে আনন্দ দেয়। করা যায় বোটিং। খাওচাঁদপাড়া পিকনিক স্পটটিও সুন্দর। এখানেও আরণ্যক পরিবেশে নদীর সাথে কথোপকথন শেষে হারিয়ে যাওয়ার নেই মানার জগতে চলে যাওয়া যায়।  ফালাকাটার প্রধান নদী মুজনাইয়ের উৎসস্থল মাদারিহাট ব্লকের বাঙাবাড়ি  আর একটি দর্শনীয় স্থান। মুজনাইয়ের বৈশিষ্ট্য হলো তার উৎসমুখ।  মাটির তলা থেকে সৃষ্ট প্রস্রবণ ও সেই প্রস্রবণ থেকে একটি আস্ত নদীর জন্ম মুজনাইকে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। অবশ্য আর্টিজিয় কূপের থেকেই নদীটির সৃষ্টি কিনা সে বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। যদিও নদীতে সারা বছর জলের উৎস নিয়ে ভূগর্ভস্থ কূপগুলির ভূমিকা নিয়ে সকলেই একমত। সামান্য দূরত্বে থাকা এই তিন-চারটে প্রস্রবনের  জলধারা নিম্নগতি-প্রাপ্ত হয়ে দক্ষিণমুখী হয়েছে। চলার পথে তার সাথে মিশেছে আরও কিছু জলধারা। এই প্রবাহই মুজনাই নামে পরিচিত। ফালাকাটা ব্লক পার করে কোচবিহার জেলায় প্রবেশ করে নদীটি মিশেছে  জলঢাকাতে এবং এই মিলনস্থল থেকে জলঢাকা মানসাই নাম নিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে একদা মুজনাই, মানসাই নামে পরিচিত ছিল। মুজনাইয়ের উৎসস্থল, পাশে থাকা শিব মন্দির, উঁচু টিলায় মুজনাই চা -বাগান ও অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য হয়ে উঠতে পারে ডুয়ার্স ভ্রমণের অন্যতম ডেস্টিনেশন।     


ডুয়ার্সের অন্যান্য বহু জনপদের মতোই ফালাকাটার উপকন্ঠেও রয়েছে দু'টি চা-বাগান। আর এই চা-বাগান পত্তনের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে আজকের ফালাকাটার অন্যতম দ্রষ্টব্য এখানকার রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল। এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অমূল্য ইতিহাস। সেভেনথ ডে অফ অ্যাভভেন্টিস্ট চার্চ প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত এই বিদ্যালয়টি  কালের যাত্রায় সত্তরটি বছর পার করে দিয়েছে। স্বাধীনতার দুই বছর পর ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের স্থাপনের পেছনে চা-বাগানের ভূমিকাকে কেন অস্বীকার করা যায় না? আসলে, ডুয়ার্সে চা-বাগান প্রতিষ্ঠার জন্মলগ্নে নেপাল ও ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে দলে দলে শ্রমিক নিয়ে আসা হয়েছিল। এইসব হতদরিদ্র, শোষিত ও বঞ্ছিত মানুষদের কাছে খ্রিস্টান ধর্মের গ্রহণযোগ্যতা অন্য ধর্মের চাইতে বেশি ছিল, কেননা মিশনারীরা নানাভাবে তাদের কাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন। গত শতকের চল্লিশের দশক সময়কালে ফালাকাটার আরণ্যক পরিবেশে বন কেটে তৈরী হচ্ছিল কাদম্বিনী ও কোচবিহার চা-বাগান। আশেপাশের নানা অঞ্চলেও চলছিল চা-বাগান তৈরীর কাজ। আর তার জন্য তদানিন্তন ছোটনাগপুরের কার্মাটার-সহ নানা প্রান্ত থেকে প্রচুর পরিমাণে শ্রমিক আনা হয়েছিল এবং প্রায় তাদের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হয়েছিলেন সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের এম জি চ্যাম্পিয়ান ও সি জে জেনসন। ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি তাদের উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার। ফালাকাটা সেই সময় ছিল অত্যন্ত সুন্দর। তেপান্তরের মাঠের মতো বিরাট মেলার মাঠের উত্তরে ঝকঝক করছে  নীল পাহাড়। জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের সীমা ছুঁয়ে যাচ্ছে  ফালাকাটাকে।  আছে থানা, ড্রামাটিক হল, তহশিল অফিস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সৈনিকদের ব্যবহৃত আবাসস্থলটি পরিণত হয়েছে  গ্রন্থাগারে। ডুয়ার্সের নিয়মানুযায়ী সারা বছরই ফালাকাটায় তখন না ঠান্ডা না গরম আবহাওয়া। বৃষ্টিপাতও প্রচুর।  কার্মাটারের চাইতে তুল্য বিচারে পছন্দের জায়গা ছিল সেই সময়ের ফালাকাটা। এখানে কাজ করবার সুযোগ ও প্রয়োজনও ছিল বেশি। তাছাড়াও কার্মাটারে রবিনসন এস ডি এ হাই স্কুলের দায়িত্বে থাকা এম জে চ্যাম্পিয়ান নিজেও চাইছিলেন বিদ্যালয়টিকে সেখান থেকে অন্যত্র সরাতে। কেননা, কার্মাটারে বিদ্যালয়টি সেভাবে পরিচিতি পাচ্ছিল না। ফালাকাটায় চা-শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করবার ফাঁকেই চ্যাম্পিয়ান ও জেনসন তাই জমি খুঁজতে শুরু করেছিলেন। আজকের ফালাকাটা স্টেশন লাগোয়া পাঁচশো একর জমি সে সময় চা-বাগান তৈরীর জন্য ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বালু জমি হওয়াতে চা-বাগানের মালিক ও ম্যানেজাররা সেই জমিতে কোনও আগ্রহ দেখান নি। চ্যাম্পিয়ান ও জেনসন সেই জমি পছন্দ করলেন। তাঁদের ও অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের শুভানুধ্যায়ী মিসেস রেমন্ড আর্থিকভাবে সহায়তা করলেন। জমি নিজেদের অধিকারে এলে শিক্ষাব্রতী চ্যাম্পিয়ান কার্মাটারে রবিনসন এস ডি এ হাই স্কুলকে স্থানান্তর করলেন ফালাকাটায়। শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। ফালাকাটায় বিদ্যালয় শুরুর দিনগুলিতে কার্মাটার থেকে প্রিন্সিপাল চ্যাম্পিয়ানের সঙ্গে ছয়জন মহিলা ও নয়জন পুরুষ অর্থাৎ মোট পনের জন ছাত্রছাত্রী জিপে চেপে এসেছিলেন। পথে দুর্ঘটনায় একজন ছাত্র মারা যান। চ্যাম্পিয়ান নিজেও আহত হয়েছিলেন। সেইসময় দুটি তাঁবুতে সকলের থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ অবধি চ্যাম্পিয়ান ছিলেন স্কুলের প্রিন্সিপাল। বর্তমান ছাত্রাবাসটি তাঁর নামেই নামাঙ্কিত। চ্যাম্পিয়ানের যোগ্য সঙ্গিনী ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডরোথি। ছাত্রী-আবাসের নামকরণে তাঁর স্মৃতি সযত্নে রক্ষিত আজও।  এম জে চ্যাম্পিয়ানের পর বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেন এল এন হেয়ার। তাঁকে বার্মা থেকে নিয়ে আসা হয়। তাঁর দুই বছরের কার্যকালে বিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামটি তৈরী হয়। তবে বিদ্যালয়ের ভবনগুলি নির্মিত হয় আরও পরে ই এ স্ট্রিটারের আমলে। তাঁর অবসরের পর এইচ ডি এরিকসন, ডি এইচ স্কাও, এ ডব্লু ম্যাথেসন হয়ে ১৯৬৯ সালে, প্রথম ভারতীয় হিসেবে, বিদ্যালয়ের দায়িত্বভার নেন  ডি এস পোদ্দার। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিদ্যালয়ের নানা কর্মকান্ড। আজ 'কমপ্লিট স্কুল' বলতে যা বোঝায় রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল ঠিক তা-ই। মিসেস রেমন্ডের স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে নিজস্ব জমি, চাষের বন্দোবস্ত, শস্যাগার, ট্রাক্টর, হাসপাতাল, খেলার মাঠ, প্রচুর গাছ, সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভান্টিস্ট চার্চ ও উপাসনালয় ইত্যাদি সবকিছুই রয়েছে। ছাত্রসংখ্যাও দিনদিন বেড়ে চলেছে। বিদ্যালয়ের ফলও যথেষ্ট ভাল হচ্ছে।  


প্রথম থেকেই ফালাকাটা ছিল সংস্কৃতি-মনস্ক। যে সময় ডুয়ার্সের বিভিন্ন জনপদ সেভাবে গড়ে ওঠে নি, তখন থেকেই ফালাকাটা কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পরিচয় দিয়ে এসেছে। আর সেই পরিচয়ের ইতিহাস ধরা রয়েছে ফালাকাটার ড্রামাটিক হলে। ১৯২৩ সালে ফালাকাটায় প্রতিষ্ঠিত হয় হলটি। তখনকার ফালাকাটার উত্তরদিকে, তহশীল অফিসের কাছে, খাসমহল ময়দানের পাশে থাকা ড্রামাটিক হল নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তদানিন্তন তহশীলদার স্বয়ং। সঙ্গে ছিলেন জোতদার ফ্যারড ও ফালাকাটার সে সময়কার বিশিষ্ট মানুষেরা। ড্রামাটিক হলের উদ্যোগে ফালাকাটার বুকে ১৯২৪ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হয় 'দেবলা দেবী` নাটকটি। ডুয়ার্সের আর কোনও জায়গায় এরকম নিদর্শন দেখা যাচ্ছে না। সংস্কৃতি চর্চায় ড্রামাটিক হল দীর্ঘদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।পাশাপাশি একটি বিরাট অঞ্চলের বিনোদনের একমাত্র জায়গা ছিল ড্রামাটিক হল যা অন্যসময় নাম পালটে গৌরী টকিজ নামে ছায়াছবি প্রদর্শন করত। সেসময় গৌরী টকিজ এতটাই বিখ্যাত ছিল যে, ফালাকাটার আশেপাশের এলাকা তো বটেই এমনকি শিলবাড়িহাট, মাদারিহাট, বীরপাড়া, গয়েরকাটা, ধূপগুড়ি ইত্যাদি জায়গা থেকেও মানুষজন গৌরী টকিজে আসতেন। এই প্রসঙ্গে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হসপিটালের সঙ্গে যুক্ত নামী চিকিৎসক ডঃ রজত ঘোষ জানাচ্ছেন, 'সে সময় বীরপাড়া থেকে ফালাকাটার গৌরী টকিজে ছবি দেখতে যাওয়া একটা উৎসবের মতো ছিল। আমরা সবাই দল বেঁধে চলে যেতাম। সেসব ছিল সোনার দিন।'  ড্রামাটিক হলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ফালাকাটার নাট্য ও সংস্কৃতি চর্চার জগতে এক ঝাঁক অভিনেতা-অভিনেত্রী ও দক্ষ পরিচালকের জন্ম হয়। এদের মধ্যে ফালাকাটার প্রথম মহিলা অভিনেত্রী হিসেবে দীপালি দে দিশারী পুরস্কার পান। শিশু অভিনেতা হিসেবে প্রিয়াঙ্কু ঘোষ আশির দশকে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে সাড়া ফেলেছিলেন। ড্রামাটিক হলে নাট্য চর্চা থেকেই ফালাকাটায় ১৯৮০ সালে শুরু হয়েছিল মুক্তমঞ্চ। ড্রামাটিক হলের বিপরীতে, আজকের দশমীর ঘাটের কাছে, শিশু সদনের পাশে শুরু হয়েছিল 'ফালাকাটা মুক্তমঞ্চ'। এর আগে উত্তরবঙ্গের একমাত্র শিলিগুড়িতে ১৯৭৯ সালে মুক্তমঞ্চ শুরু হয়। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে ফালাকাটার মুক্তমঞ্চ সেই সময়ের এক সাহসী প্রচেষ্টা। ১৯৯০ সাল অবধি ফালাকাটা মুক্তমঞ্চে বিভিন্ন নাট্যদল নাটক মঞ্চস্থ করেছে। ফালাকাটার নাট্যচর্চায় পাখি ঘোষ, দিলীপ মুখোটি, বিনায়ক দেব, মদন রায় প্রমুখেরা অতীতের বংশীধর দোবে, দেবেন্দ্রনাথ নন্দী, মানিক বোস, ডঃ রমণী দাস প্রমুখদের পরম্পরাকে বহন করেছিলেন দীর্ঘদিন। আজ সেই ঐতিহ্য অনেকটা ম্লান হলেও এখনও রাজ্যস্তরে নাট্যপ্রতিযোগিতার আয়োজন হয় এখানে। 

মুক্তমঞ্চের এই জায়গাতে আজও বসে ফালাকাটার বিখ্যাত দশমীর মেলা। ফালাকাটার দশমীর ভাসান একসময় ছিল অত্যন্ত নামী। মুজনাইয়ের জলে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিমা নিয়ে আসা হত। সেই জাঁকজমক খানিকটা কৌলিন্য হারালেও, যা আছে তা কম দামি নয়।   

১৯৫৯ সালে ফালাকাটা সর্বভারতীয় খবরের শিরোনাম হয়েছিল শৌলমারি আশ্রমকে কেন্দ্র করে। সারদানন্দজী প্রতিষ্ঠিত আশ্রমের দিকে নজর ছিল সমস্ত ভারতের। শৌলমারি কোচবিহার জেলাতে হলেও একেবারেই ফালাকাটা লাগোয়া। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে জলঢাকার উপনদী মুজনাই। রয়েছে কোচবিহার চা-বাগান। আর যে আমলের কথা বলছি তখন তো এমনিতেই ফালাকাটা আরণ্যক পরিবেশের মধ্যে ছোট্ট একটি জনপদ। সারদানন্দজীর চেহারা ও হাবভাবের সাথে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের সাদৃশ্য থাকায় দ্রুত রটে যায় সারদানন্দজী আর কেউ নেন স্বয়ং নেতাজী এবং কোচবিহার জেলার গায়ে লাগানো সাবেক জলপাইগুড়ির এই জায়গাটিকে বেছে নেওয়ার কারণ হল ফালাকাটার ভৌগোলিক অবস্থান। শৌলমারি কোচবিহার জেলার  কিন্তু তার সব কর্মকান্ড ফালাকাটা-কেন্দ্রিক।ছোট্ট এই জায়গাটি থেকে নেপাল, ভুটান, আসাম খুব কাছে। ডুয়ার্স-তরাইয়ের বিস্তীর্ণ জঙ্গল, মুজনাই-জলঢাকা হয়ে ব্রক্ষ্মপুত্রের জলপথ, আসাম হয়ে তখনকার পূর্ব পাকিস্থান এবং ব্রক্ষ্মদেশে গা ঢাকা দেওয়ার সুবিধের জন্যই নাকি সারদানন্দজীবেশী নেতাজী ফালাকাটা বেছে নেন। সেই আমলে সারা ভারত থেকে দলে দলে লোক আসতে শুরু করেন ফালাকাটায় আশ্রম ও সারদানন্দজীকে দেখতে। আসেন প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা। কিন্তু ১৯৬৭ সালে সারদানন্দজী ফালাকাটা ছেড়ে যান। শৌলমারির আশ্রম আজও আছে। আশ্রমে দীক্ষিত যারা তারা দেখভাল করেন আশ্রমের, মিলিত হন। আজ দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত যে সে আমলে এই আশ্রমে জেনারেটর চলতো, প্রাথমিক বিদ্যালয় বসতো, নানাবিধ কর্মকান্ডে সরগরম থাকতো আশ্রম-প্রাঙ্গন। শৈলেশ দে রচিত 'আমি সুভাষ বলছি' থেকে শুরু করে নেতাজী-কেন্দ্রিক বহু গ্রন্থে শৌলমারির উল্লেখ পাওয়া যায়।  

প্রতি বর্গকিমিতে সবচাইতে কম জনঘনত্বের দিক থেকে ফালাকাটা কিন্তু আলিপুরদুয়ার জেলায় প্রথম। তবে ডুয়ার্সের আর সব শহরের মতোই ফালাকাটাতেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে দেশভাগের পর। অসমের রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থাও বহু মানুষকে ফালাকাটামুখী করেছিল একটা সময়। এটা অস্বীকার করা যায় না যে, ফালাকাটার বহু অঞ্চল  দেশভাগের ফলে আগত মানুষদের হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে সত্তরের দশকে আজকের বাংলাদেশ জন্মের সময়েও আছড়ে পড়েছিল সেই একই ঢেউ।  সুভাষপল্লী, অরবিন্দপল্লী, দেশবন্ধুপাড়া ইত্যাদি নামের মধ্যে দেশভাগ ও স্বাধীনতা-আন্দোলনের ছোঁওয়া লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি রিফুইজি রিহ্যাবিলিটেশন প্রাইমারি স্কুল (আর আর প্রাইমারি স্কুল নামে পরিচিত) আজও মনে করিয়ে দেয় সেদিনের উদ্বাস্তু সমস্যাকে। ফালাকাটার অতীতের সেই চিত্র আজও মনে পড়ে পদস্থ সরকারি কর্মী প্রণব রায়ের। তার কথায়, 'সত্তরের দশকের প্রথম দিকে যখন আমরা নিজেরাই খুব ছোট, তখন দেখেছিলাম বিএলআরও অফিসের নিচে, আজকের কমিউনিটি হলের পাশে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাসরুমের পাশের মাঠে খোলা আকাশের তলায় শরণার্থীদের ভিড়। অনেকের পুনর্বাসন হয়েছিল গোপনগর, কুঞ্জনগরের দিকে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে, রিক্সা-ঠ্যালা চালিয়ে, ব্যবসা করে সেই মানুষেরা ধীরে ধীরে ফালাকাটার মূল স্রোতে মিশে গিয়েছিলেন।' এইসব মানুষদের জন্য ফালাকাটার তদানিন্তন মানুষেরা কিন্তু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে স্ব-প্রতিষ্ঠিত সুদীপ্ত আচার্য মনে করালেন খাসমহল ময়দানে বড়দার ফুটবল কোচিং ক্যাম্পকে। ফালাকাটার সব খেলোয়াড়রা অংশ নিলেও, মূলত শরণার্থী পরিবারের ছেলেদের কথা ভেবেই এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন বড়দা নামে পরিচিত হেমেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। ফালাকাটায় অবশ্য খেলাধূলার চর্চা অতীত থেকেই রয়েছে। একটা সময়ে টাউন ক্লাবের মাঠে রীতিমতো টিকিট বিক্রি করে ফুটবল টুর্নামেন্ট পরিচালনা করা হত, তাতে অংশ নিত বিখ্যাত রয়াল ভুটান, নর্থ বেঙ্গল স্টেট ট্রান্সপোর্ট, হালিশহর, বারাসত ইত্যাদি নানা দল। ফালাকাটার এই মাঠ পরবর্তীতে জন্ম দিয়েছিল দেবব্রত (পুটন) ঘোষ, উজ্জ্বল দেসরকার, রবিশঙ্কর দাসের মতো খেলোয়াড়কে। 

ডুয়ার্সে  শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রেও ফালাকাটার ভূমিকা কিন্তু অস্বীকার করা যায় না। ফালাকাটা হাই স্কুল দীর্ঘদিন একটি বিস্তীর্ন অঞ্চলের একমাত্র স্কুল ছিল যেখানে বিজ্ঞান,কলা ও বাণিজ্য তিন বিভাগেই পড়ানো হত। বীরপাড়া, মাদারিহাট, শিলবাড়ীহাট, শালকুমার, আটপুকুরিয়া ইত্যাদি নানা জায়গা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা একসময় ফালাকাটায় পড়তে আসত। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষাকেন্দ্রে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয় ও ফালাকাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে বসত এই বিস্তীর্ন অঞ্চলের ছাত্র ছাত্রীরা। আজ রাজ্যের সব জায়গার মতোই ফালাকাটাতেও অনেকগুলি  বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বোঝা সম্ভব না যে, সেসব দিন কীরকম ছিল। তবে সেদিনের সেই কষ্টের পরম্পরাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এখানকার ছাত্র ছাত্রীরা আজ মেধা তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে ভাবতেই ভাল লাগে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে  ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত  এখানকার টাউন লাইব্রেরি বা সুভাষ পাঠাগারের কথা। ফালাকাটার শিক্ষা বিস্তারে এই গ্রন্থাগারটি এখনও  অসামান্য ভূমিকা নিয়ে চলেছে। ফালাকাটার শিক্ষাব্যবস্থা- সহ সামগ্রিক উন্নতিতে যে সকল মানুষেরা একসময় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে নীরদবরণ রায়, মনোরঞ্জন ভদ্র, হরচন্দ্র চক্রবর্তী, মায়া বোস,  ডঃ সুভাষ সেনগুপ্ত, যোগেশচন্দ্র বর্মন, অনিলকুমার অধিকারী প্রমুখদের কথা অনস্বীকার্য। বাদ পড়ছে বহু নাম। মার্জনা প্রার্থনীয়। 

শিক্ষার পাশাপাশি উল্লেখ করতে হয়, স্বাস্থ্যের কথাও। সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল থাকলেও কেন জানি খানিকটা ঢিলেঢালা ফালাকাটার স্বাস্থ্য পরিষেবা। আবার বাসস্ট্যান্ডের অভাবও ঝাঁ চকচকে রাস্তার কৌলিন্যকে ম্লান করেছে। অথচ, উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহনের জন্মলগ্নে যাত্রীবাহী যে বাস কোচবিহার থেকে প্রথম নিয়মত যাত্রা শুরু করেছিল তার গন্তব্য ছিল ফালাকাটা। উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার পঁচাত্তর বছর পূর্তি বর্ষে ফালাকাটায় কোনও বাসস্ট্যান্ড না থাকা নিঃসন্দেহে একটি বিরাট ক্ষত। একইরকমভাবে মহকুমার মর্যাদা আজও ফিরে পায় নি ফালাকাটা। জোটে নি পৌরসভার তকমাও। নামি দামি হোটেল, রিসোর্ট ও দুরন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলেও, ফালাকাটাকে কেন্দ্র করে সেভাবে করা হয় নি পর্যটন পরিকল্পনা। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে, আজকের ফালাকাটার উত্তর আকাশ থেকে হারিয়ে গেছে ঝকঝকে নীল ভুটান পাহাড়ের সারি। যে সাপটানা নদী কোনো কোনো বর্ষায় দু ' কুল ছাপাতো আজ তা শুকনো খাতে পরিণত। রহস্যময় নদী মুজনাইও গতিপথ পাল্টে কোনো অজানা অভিমানে বয়ে চলেছে নিজের মতো। সারা বছর ভোর বেলার সেই টাটকা আমেজ এখন শুধুই স্মৃতি। উধাও প্রবল শীতের জমজমাট কুয়াশা আর দিগন্তে মেলানো হলুদ পাখি। হারিয়ে গেছে রাস্তার ধারের  শিমুল গাছের লাল ফুলেরা কিংবা বর্ষা শেষের গাছে পুরু শ্যাওলার আস্তরণ। হারানো ও না পাওয়ার তালিকায় এরকম আরও কতো কি রয়ে গেল কে জানে!    

তবে, পাওয়া আর না পাওয়া নিয়েই জীবন বলে কোনও কিছু থেমে থাকে না। ফালাকাটাও থেমে নেই। সেই ধূসর অতীত থেকে বর্তমানের আলোকিত এই উজ্জ্বল দিনে ফালাকাটা আজও একইরকম। 

মুজনাই তীরের এই সমৃদ্ধ জনপদ মনের প্রশান্তি, প্রাণের আরাম।  
             

No comments: