স্বাধীনতার ৭৫ বছরে উত্তরের চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকরা
শৌভিক রায়
সারা দেশ জুড়ে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উৎসব চলছে খুব স্বাভাবিকভাবেই। চলা উচিতও। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের এত বছর পরেও, ডুয়ার্স-তরাই সহ উত্তরের চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকদের অবস্থা দেখে মনে হয় যে, তাদের জীবনে স্বাধীনতা শব্দটি নিতান্তই উপহাসের বিষয়। মনোরম ও সুদৃশ্য সবুজ চা-বাগানের আপাত সৌন্দর্যের পেছনে মহিলা শ্রমিকদের কত যে যন্ত্রনা লুকিয়ে আছে তা বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। ভাবতে অবাক লাগে, জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র এই বিষয়ে নিতান্তই উদাসীন। ফলে আজ দেশের সর্বত্র স্বাধীনতার ৭৫ বর্ষপূর্তি উৎসব উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হলেও, চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকদের কাছে তার কোনও তাৎপর্য নেই। কেননা স্বাধীনতার আগেও তারা যে তিমিরে ছিলেন, আজও সেই তিমিরেই রয়ে গেছেন।
উত্তরের চা-বাগানগুলির দিকে নজর দিলে আমরা সাধারণত দুই ধরণের আদিবাসী শ্রমিকদের দেখতে পাই। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা তাদের 'ব্ল্যাক' ও 'হোয়াইট' ট্রাইবাল নামে চিহ্নিত করেছেন। এদের অধিকাংশদের চা-বাগান পত্তনকালে ছোটনাগপুর ও নেপাল থেকে আনা হয়েছিল। আসলে জঙ্গল কেটে চা-বাগান সৃষ্টি করাকে উত্তরের ভূমিপুত্ররা কখনই ভাল চোখে দেখেন নি। ফলে, ডুয়ার্স-সহ উত্তরের চা-বাগানগুলিতে তারা শ্রমিকের কাজেও যোগ দেন নি। খানিকটা আতান্তরের সম্মুখীন হয়েই চতুর ইংরেজরা অন্য জায়গা থেকে আদিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে এসেছিল ঘন জঙ্গল কেটে চা-বাগান তৈরি করার কাজে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গোটা পরিবার ধরে এই শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়েছিল। ফলে, নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনও প্রভেদ ছিল না কর্মক্ষেত্রে। শ্রমিক-মহিলারা পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেদিন কাজে নেমেছিল। ডুয়ার্সের ঘন জঙ্গল কেটে চা-বাগানের উপযুক্ত জমি তৈরি করতে গিয়ে সেদিন তাদেরও ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর বা সাপের কামড়ে মরতে হয়েছিল। চা-বাগান তৈরি হয়ে গেলে, চারা গাছকে পরিচর্যা থেকে শুরু করে চা-পাতা তোলার কাজে তাদের দক্ষতা সর্ব যুগেই প্রমাণিত হয়েছে। তাই পুরুষ ও মহিলা শ্রমিকেরা সম-অধিকার পাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে চিত্র একেবারেই অন্য। ইংরেজ আমলে পুরুষ শ্রমিকেরা যে সুযোগ সুবিধে পেত, মহিলা শ্রমিকদের সেটা জুটত না। ইংরেজ আমল শেষ হয়ে আজ এতদিন পার করে এলাম আমরা। কিন্তু ব্রিটিশদের সৃষ্ট সেই নিয়ম আজও কমবেশি রয়ে গেছে চা-বাগানের সবুজ অলিন্দে। এখনও মহিলা শ্রমিকেরা পুরুষদের তুলনায় অনেকক্ষেত্রে বঞ্চিত। অথচ সার প্রয়োগ থেকে শুরু করে চা- গাছের পরিচর্যা এবং সুচারু ও সঠিকভাবে চা-পাতা তোলার ক্ষেত্রে মহিলাদের দক্ষতা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি। তাদের এই ক্ষমতা সহজাত ও প্রকৃতিদত্ত। কিন্তু বিস্ময়কর যে, নারী স্বাধীনতার এই সময়েও, চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকদের কোনো পদোন্নতি হয় না। পুরুষেরা দিনমজুর থেকে মাস মাইনের মজদুরের পর্ব সেরে, বাগানের অফিস কর্মী হয়ে গেলেও, অজানা কারণে মহিলারা কিন্তু চা-পাতা তোলার মধ্যেই আটকে রয়েছেন। তাদের জন্য চা-পাতা তোলা এবং সংসার সামলানো ছাড়া আর কিছুই বরাদ্দ নেই!
স্বাধীনতার আগে চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকদের অনেকেই ইউরোপিয়ান টি প্লান্টার, চা-বাগান ম্যানেজার বা অন্য কোনও উচ্চ পদস্থ কর্মচারীদের যৌন লালসার শিকার হতেন। আজ সে অবস্থা বদলালেও সন্তানের জন্মের পর মরদ বা স্বামীর শিশু পুত্র বা কন্যাকে ছেড়ে দেওয়ার ধারাবাহিকতা এখনও বিদ্যমান। অত্যন্ত কম মজুরি প্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্ত, সেই মহিলাদের দিন গুজরান কীভাবে হয় তা সহজেই অনুমেয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আড়কাঠিদের প্রবল প্রতাপ। কখনও প্রলোভন, কখনও বা ভয় দেখিয়ে তারা খুব সহজেই চা-বাগানের শ্রমিক মহিলাদের পাচার করছে কলকাতা-দিল্লি-মুম্বাই সহ দেশের একাধিক কুখ্যাত পতিতাপল্লীতে। ইদানিং দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আড়কাঠিদের হাত ধরে চা-বাগানের বিপন্ন নারীরা পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বাইরে মধ্যে প্রাচ্যের মতো দেশগুলিতে যৌনদাসী হয়ে। চা-বাগানগুলিতে দারিদ্র ও চেতনা স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও তলানিতেই রয়ে গেছে। এমনও দৃষ্টান্ত আছে যে, একটি লিপস্টিকের প্রলোভন চা-বাগানের কিশোরীকে ঘর ছাড়া করেছে! 'চায়ের ডুয়ার্স কী চায়' গ্রন্থে গৌতম চক্রবর্তী লিখছেন, 'বাগান বন্ধ থাকুক বা চালু, চা-বাগিচায় সক্রিয় মেয়ে পাচারের আড়কাঠিরা। তাদের হাত ধরে দুটো ভাল খেতে-পরতে পাওয়ার আশায় ভিন রাজ্যে পাড়ি দিয়ে কখনও চিরতরে নিখোঁজ হয় চা-বাগান মহল্লার মেয়েরা, কখনও ফেরে লাশ হয়ে, কখনও আবার অন্তঃসত্বা কিংবা বোধ উন্মাদ হয়ে। ...বাগানেরই এক মাসির হাত কাজের খোঁজে গিয়েছিল ১৫-১৬ বছরের দুই কিশোরী। একজন পালিয়ে এসেছে। অপরজন এখনও নিখোঁজ। জানা গিয়েছে, বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামীণ অনুষ্ঠানে ওদেরকে দিয়ে অশ্লীল নাচ প্রদর্শন করানো হত। `
এই চিত্র কিন্তু কখনই কাম্য ছিল না। একটি তথ্য দেওয়া যাক। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে আমাদের রাজ্যে অপরাধের রিপোর্ট ছিল ১০,২৪৮টি। আমাদের আগে শুধুমাত্র মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র রয়েছে। মনে রাখতে হবে যে, বহু ঘটনা কিন্তু লিপিবদ্ধ হয় নি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে এই সংখ্যা কোথায় পৌঁছবে সেটা সহজেই অনুমেয়। এই ১০,২৪৮টি রিপোর্টের অন্তত ২০ থেকে ২৬ শতাংশ চা-বলয়ের। আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের তুলনায় অপরাধের মাত্রা ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে (সূত্র : হিন্দুস্থান টাইমস, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১)। নারী পাচারের ক্ষেত্রেও আজকের ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলির অবস্থা উদ্বেগজনক। সরকারি বেসরকারি নানা প্রকল্পেও এই ঘৃণ্য অপরাধ আটকানো যায় নি। ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী চা-বাগান থেকে নারী পাচারের হার যথেষ্ট উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে নারী পাচারের সংখ্যা ছিল ২০৬৪। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫৯৯। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের চা-বাগানগুলি থেকে পাচারের পরিমান সবচেয়ে বেশি। দুর্ভাগ্য যে, প্রশাসনিক নির্দেশে সাম্প্রতিক কালে নথিভুক্ত হওয়া তথ্য কিন্তু জানা যাচ্ছে না। ফলে চা-বলয়ে নারী পাচারের বর্তমান চিত্রটি ঠিক কী সে সম্পর্কে এই মুহূর্তে সকলেই অন্ধকারে। কখনো দেশের কোনও মহানগরের নিষিদ্ধ পল্লী বা উচ্চবিত্তের বাড়ি থেকে অত্যাচারিত নারী উদ্ধার হলে জানা যাচ্ছে যে, তার বাড়ি হয়ত ডুয়ার্সের কোনও চা-বাগানে!
লিপিবদ্ধ হওয়া অপরাধের এই চিত্র কালেভদ্রে প্রকাশ্যে এলে তার ভয়াবহতায় শিউরে উঠতে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, বহুক্ষেত্রে লোকলজ্জা, প্রথা, কুসংস্কার, দারিদ্র্য ও অশিক্ষাকে ভর করে চলা চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলি আইনের দ্বারস্থ হয় না। এই জাতীয় ঘটনাকে তারা ভাগ্যের মার হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। সেজন্য আসল ছবিটিও জানা যায় না। স্বাধীনতার পর এতগুলি বসন্ত কেটে গেলেও ডুয়ার্সের চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকদের জীবনে অন্তত বসন্তের ছিঁটেফোঁটাও জোটে নি- একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। চা উৎপাদনের পেছনে তাদের সিংহভাগ অবদান থাকলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে তারা আজও সুযোগ পান না। উল্টে যে সামান্য টাকা আয় করেন, তা অনেক সময়েই জোর করে কেড়ে নেয় বলদর্পী মরদটি, নেশা করবার জন্য। প্রতিবাদে জোটে মার অথবা সংসারে ভাঙন। মালিকপক্ষের দেওয়া এক জোড়া গামবুট আর বর্ষায় ছাতা সম্বল করে চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকেরা বছরের পর বছর তাদের শ্রম দিয়ে আসছেন। দুধের সন্তানকে ক্রেশে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। অধিকাংশ চা-বাগানেই অবশ্য ক্রেশের সুবিধে নেই। ফলে অনেক সময়েই দেখা যায়, বুকে বা পিঠে শিশুকে বেঁধে মা-শ্রমিক নিরলস কাজ করে চলেছেন। আমরা গিয়ে তাদের ছবি তুলছি, এরকম দু-একটি নিবন্ধ লিখছি। কিন্তু এর বেশি আদতে কিছুই হচ্ছে না!
যদি মনে হয় যে, চা-বলয়ে অপরাধের চিত্রটিই শুধুমাত্র মারাত্মক তাহলে কিন্তু ভুল ভাবা হবে। দারিদ্র আর চা-বাগান বোধহয় হাত ধরাধরি করে চলে। আজও চা-বাগানের শ্রমিদের জ্বালানির জন্য ভরসা কিন্তু চা-বাগান বা আশেপাশের বনাঞ্চল থেকে সংগৃহিত কাঠ। একটি তথ্য দেওয়া যাক- '' কালচিনি চা-বাগানের শ্রমিক সাবিত্রী ওরাওঁয়ের দৈনিক রোজগার ২০২ টাকা। তিনি বলেন, ' দৈনিক ২০২ টাকা হাজিরায় আমাদের পরিবার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৯০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে তা কেনার মতো এত টাকা নেই। তাই গ্যাস থাকলেও মাটির উনুনে কাঠকুটো দিয়েই রান্না করছি।` বাগানে শ্রমিকের কাজ করতেন পাটালি লামা। তাঁর কোথায়, 'আমি বিধবা। বর্তমানে আমার কোনও কাজ নেই। বিধবা ভাতার মাসিক হাজার টাকাই আমার মাসে রোজগার। তাতে উজ্জ্বলার গ্যাস কিনব কোথা থেকে?'' (আনন্দবাজার পত্রিকা, ৯ নভেম্বর ২০২১) প্রসঙ্গত, এই মহিলারা উজ্জ্বলা যোজনায় রান্নার গ্যাস পেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আয়ের প্রেক্ষিতে শুধু গ্যাস কেন, যে কোনও জিনিস কেনাই কার্যত অসম্ভব। যাঁরা অবসর নিয়েছেন, তাঁদের কথা যত কম বলা যায়, তত মঙ্গল।যে দেশে কোনও কোনও শিল্পপতির পরিবারে ৭৫০ এম এল জলের বোতলের দাম হয় বাইশ হাজার টাকা, সে দেশে ১০০০ টাকা দিয়ে সংসার চালানো মানুষ থাকেন বলাটা শুধু রাষ্ট্রের লজ্জা নয়, হয়ত বা বিরোধিতা করা!
চা সংক্রান্ত পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গের চা-বাগানগুলিতে মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১,২৮,৩৯৯, পুরুষের সংখ্যা সেখানে ১,১৮,১৭৭। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং ও ডুয়ার্স অঞ্চলে পুরুষ ও মহিলা চা-শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় সমান। মহিলাদের সংখ্যা বরং দিনদিন বেড়ে চলেছে। কিন্তু মহিলাদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের অবস্থার কোনো গুনগত পরিবর্তন কি হয়েছে? অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, আগের তুলনায় চা-বাগান শ্রমিকেরা খানিকটা উন্নত জীবনযাপন করলেও তা একেবারেই যথেষ্ট নয়। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো চেপে বসেছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সম্যক বোধের অভাব। রক্তস্বল্পতা-সহ নানা রোগ তাদের লেগে রয়েছে সারা বছর। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার চাইতে গুনিন বা ওঝার ওপর নির্ভরশীল মহিলা-শ্রমিকদের অকালমৃত্যু তাই সাধারণ ঘটনা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের চা -বাগানগুলিতে হাসপাতালের অভাবে স্থানীয় গুণিন, হাতুড়ে ডাক্তার বা ওঝাদের রমরমা । আবার হাসপাতালের সুবিধা রয়েছে এরকম বাগানে মহিলা ডাক্তারের অভাবে অনেক সময় মহিলারা নিজেদের রোগের কথা বলেন না। ফলে নানা জটিল রোগ বাসা বাঁধে তাদের শরীরে।
বসবাস অযোগ্য কুলি লাইনের বাড়িঘরের দিকে তাকালে বোঝা যায় সমস্যা কতটা প্রকট। মানুষ ও পালিত পশুর সহাবস্থান চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় কেউ সে অর্থে ভালো নেই। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে সারাদিন ধরে চা-পাতা তুলে যে পয়সা মেলে তা দিয়ে কোনোমতে গ্রাসাচ্ছাদন ছাড়া আর কিছুই হয় না। অথচ মরদের ভুখ মেটাবার জন্য নিয়ম করে প্রতিবছরই গর্ভবতী হাতে হয় তাদের। অবশ্য এক্ষেত্রে অর্থনীতির একটা সূক্ষ তত্ব কাজ করে। দারিদ্র সীমারেখার নিচে থাকা এই পরিবারগুলি মনে করে, সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানে সংসারে আর একজন উপার্জনকারীর আগমন। কিন্তু এই সরল অর্থনীতি যে আসলে সত্য নয়, সেটি বুঝবার মতো যথেষ্ট পড়াশোনা তাদের নেই। ফলে বছরের পর বছর ধরে সন্তান জন্ম দিয়ে দিয়ে ভেঙে পরে মহিলাদের শরীর। প্রসূতিকালীন নানা সমস্যা দীর্ঘায়িত হয় আর তা পরবর্তী সময়ে ছাপ ফেলে। কম বয়সে বিয়েও চা-বাগানের মহিলাদের একটি বড় সমস্যা। একটি সমীক্ষায় প্রকাশ পাচ্ছে যে, চা-বাগানের শ্রমিক-মহিলাদের বিয়ের গড় বয়স ১৪ থেকে ১৮। বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনরায় বিবাহের সংখ্যা ৭ শতাংশ।
সামাজিক জীবনেও চা-বাগানের মহিলারা কিন্তু এখনও পুরুষদের মুখাপেক্ষী। নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থেকে তারা অনেক দূরে। পরিবারের ছোট-বড় সব ধরণের ব্যাপারে পুরুষদের মতামত চূড়ান্ত। বাড়ির মহিলাটি কাজে গেলে সংসারের কাজ সামলাতে হয় ছোট মেয়েদেরকেই। ইদানিং কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, মিড ডে মিল ইত্যাদির জন্য বিদ্যালয়ে মেয়েদের কিছুটা ভিড় বাড়লেও সামাজিক উন্নতি কিন্তু সেভাবে চোখে পড়ে না। যে সামান্য সংখ্যক মহিলা চা-বাগানের শ্রমিকের কাজ করেন না, তারাও কিন্তু এর থেকে বাইরে নন। কেননা তাদের ঠাঁই হয় সামান্য চাষের জমিতে মজুর হিসেবে। অনেকে বাগানের বাবু-বাড়িতে পরিচারিকার কাজেও নামেন। অতএব, শিক্ষার আলো থেকে তারা অনেকটা দূরেই রয়ে গেছেন। আবার কিছুদূর পড়বার পর বিদ্যালয় ত্যাগের চিত্রটিও চিন্তাজনক। বিশেষ করে, কারণে অতিমারির জন্য লকডাউনের পর এই সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক এক ক্ষেত্রে সমীক্ষা দেখাচ্ছে যে, চা-বাগানের নারী শ্রমিক ও তাদের ঘরের মেয়েদের ড্রপ আউটের পরিমাণ ৬৭ শতাংশ। বিদ্যালয় থেকে প্রত্যেক মাসে প্রদত্ত মিড ডে মিল-সহ অন্যান্য সুযোগসুবিধাও আটকাতে পারে নি এই ভয়াবহ অবস্থাকে। একই সঙ্গে চা-বাগানের অভিভাবকদের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।
সবচেয়ে খারাপ লাগে ভেবে যে, স্বাধীনতার ৭৫ বছরেও চা-বাগানে আজও রয়ে গেছে ডাইনি প্রথা। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর শিকার চা-বাগানের মহিলা শ্রমিকরা। আজ অবধি ঠিক কতজন মহিলা এই প্রথার বলি হয়েছে তার সঠিক হিসেবে নেই। কিন্তু ডাইনি প্রথার চল আজও বিলুপ্ত হয় নি। এমনিতে জনজাতি গোষ্ঠীগুলি সাধারণত মাতৃতান্ত্রিক হয়। তাই এটা বিস্ময়কর যে মাতৃতান্ত্রিক সমাজেও সেই মা বা নারীকে এরকম একটি অমানবিক ও নিষ্ঠুর প্রথার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এর ফলে একেবারেই একঘরে হয়ে পড়ে ডাইনি বলে দাগিয়ে দেওয়া সেই মহিলাটি। অবস্থা চরমে পৌঁছায় ধীরে ধীরে এবং একটা সময় আসে যখন সেই মহিলার প্রাণ সংশয় হয় বা তাকে একেবারে মেরে ফেলা হয়। আজ অবধি ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলিতে ডাইনি সন্দেহে কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে তার সঠিক হিসেবে কেউ দিতে পারবে না। কেননা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা থানা অবধি পৌঁছায় না। অধ্যাপক অর্ণব সেন লিখছেন, 'সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে অর্থাৎ একুশ শতকের গোড়া থেকে বিশ্বায়ন ব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি, সরকারি উদাসীনতা, বাগিচা মালিকদের লোভ ও ধূর্ততা, 'বট লিফ ফ্যাক্টরির`যথেচ্ছ নির্মাণ, অসংখ্য ছোট ছোট বাগিচা সৃষ্টি, বাগিচা-সংক্রান্ত আইনের অসংখ্য ফাঁকফোকর, চা নিলাম ব্যবস্থার ত্রুটির ফলে বেশ কিছু চা বাগান বন্ধ হয়েছে এবং আদিবাসী সমাজকে বিপুল বেকারত্ব ও দারিদ্র এই সংকটকে ঘনীভূত করে তুলেছে।` আর এই সংকটের শিকার হচ্ছেন চা-বাগানের নারীরা। নানকি মুন্ডাকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল ভাসুরের রোগভোগ আর মৃত্যুর কারণে। কালচিনির সেন্ট্রাল ডুয়ার্স চা-বাগানে সুখানি দেবী আর সুমিত্রা দেবী খুন করা হয় কয়েকজনের অসুখের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এরকম উদাহরণ অজস্র। এখানেও মনে রাখতে হবে যে, সব অভিযোগ কিন্তু প্রকাশ্যে আসে না। তা না হলে এই একবিংশ শতকে সাতকাইথা চা-বাগানে 'ডাইন লাইন' বলে শ্রমিকদের বস্তিটি হয়ত থাকত না।
স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতেও তাই ডুয়ার্সের চা-বাগানের মহিলা-শ্রমিকরা কতটা স্বাধীন সে প্রশ্ন রয়ে যায়। স্বাধীন দেশের উন্নয়নের কোনও আলো তাদের আলোকিত করে নি একথা যেমন বলা মিথ্যাচারণ হবে, তেমনি এটা বলা বুঝি ভুল হবে না যে, প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্ত কম। ফলে, কাঙ্খিত মান সম্পূর্ণ অধরা। চা-বাগানের নারী জন্ম তাই যেন এক অভিশাপ। কেটে গেছে আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ, প্রতি বছর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস, নারীদের কল্যাণে ঘোষণা হচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্প, কিন্তু চা-বাগানের নারীরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও স্বাধীন দেশের পরাধীন নাগরিক হয়েই জীবন কাটাচ্ছেন।
(প্রকাশিত: দ্যুতি, দিনহাটা)
No comments:
Post a Comment