Saturday, July 23, 2022

এক মধ্যবর্তী জনপদের যন্ত্রণা জানে ফালাকাটা 

শৌভিক রায় 

একটি মধ্যবর্তী জনপদ। একদিকে কোচবিহার ও অসম এবং অন্য দিকে শিলিগুড়ি ও বৃহত্তর পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ছোট্ট হাইফেনের মতো রয়েছে সে। অতীতে এই জনপদের ঊর্বরা ভূমি আর অবস্থানগত সুবিধের জন্য ভুটান ও কোচবিহার রাজ্যের মধ্যে লড়াই বেঁধেই থাকত। দীর্ঘদিন ভুটানের অধীনে থাকা এই জনপদ, ফালাকাটা, দ্বিতীয় ইঙ্গো-ভুটান যুদ্ধের পর ইংরেজদের হাতে আসে এবং ১৮৬৯ সালে জলপাইগুড়ি জেলা গঠিত হলে ফালাকাটাকে মহকুমায় পরিণত করা হয়। স্থাপিত হয় ফালাকাটা থানা। 

তবে ১৮৭৪-৭৫ সালে মহকুমা স্থানান্তরিত হয় বক্সায়। কিন্তু ফালাকাটার গুরুত্ব কমেনি তাতে। বরং এই অঞ্চলের বৃহত্তম তহশিল হিসেবে, ব্রিটিশদের কাছে তার কদর ছিল আলাদা। তাই ১৯০০ সালে ওয়েস্টার্ন ডুয়ার্স ফান্ড মার্কেট গঠিত হলে, তারা হাট তৈরি করবার জন্য বেছে নিয়েছিল এই জনপদকে। শতাব্দী প্রাচীন এই হাটের কিন্তু খুব বেশি উন্নয়ন হয়নি। ফলে অসন্তোষ বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই। 

আসলে দুর্ভাগ্য বোধহয় ফালাকাটার ললাটলিখন। মহকুমার তকমা হারানো জনপদটিতে একটি বাসস্ট্যান্ড এখনও পর্যন্ত গড়ে তোলা গেল না। বছর তিরিশ আগে কিছুদিন মিল রোডে ফালাকাটার বাস স্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু অজানা কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। অথচ, কোচবিহার রাজ্যে যখন প্রথম পরিবহন সংস্থা চালু হয়, তখন প্রথম যাত্রীবাহী বাসটি চলেছিল কোচবিহার ফালাকাটার মধ্যে। তারিখটি ছিল ১৯৪৫ সালের ২ এপ্রিল। তার আগে ২৭শে মার্চ তদানীন্তন কোচবিহার রাজ্যের 'স্টেট কাউন্সিল` কোচবিহার রাজ্য পরিবহনকে প্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়েছিল। সেদিনের সেই পরিবহন সংস্থাই আজকের উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা নামে পরিচিত। 

শিক্ষাব্যবস্থায় অগ্রণী ফালাকাটায় এম ই স্কুল স্থাপিত হয়েছিল ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে। এখানকার শিক্ষাব্যবস্থায় চমৎকৃত হয়ে ১৯৪৯ সালে এম জি চ্যাম্পিয়ান ও সি জে জেনসন কর্মাটার থেকে তাদের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়টিকে ফালাকাটায় স্থানান্তরিত করেছিলেন। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের  মেধাতালিকায় এই জনপদের ছাত্ররা জায়গা পেলেও, আজ অবধি ফালাকাটা কলেজে বিজ্ঞান বা বাণিজ্য বিভাগ খোলা সম্ভবপর হয়নি। অথচ ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্য বিভাগে পড়বার ব্যবস্থা কিন্তু শুরু হয় সেই সত্তরের দশকে।  

আবার, ফালাকাটার গর্বের টাউন ক্লাব মাঠের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ভাবতে খারাপ লাগে একসময় এই মাঠে রয়াল ভুটান সহ রাজ্যের বি-ডিভিশনের নানা ফুটবল দল খেলে গেছে। বহু আগে ইতিহাসের হাত ধরে, গিরিপথ বেয়ে সমতলে নেমে এসে, এই মাঠে খেলতেন লস্ট হরাইজন বা নিষিদ্ধ দেশ ভুটানের দুর্দান্ত মানুষেরা। একই অবস্থা, ইতিহাসের সাক্ষী থাকা খাসমহল ময়দান। সেই বিখ্যাত মাঠটিই হারিয়ে গেছে আজ। 

নাট্যচর্চায় ফালাকাটা উত্তরের যে কোনও জনপদকে টেক্কা দিত একসময়। শুধুমাত্র নাট্যচর্চার জন্য এখানে ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ড্রামাটিক হল। উত্তরবঙ্গের মুক্তমঞ্চ আন্দোলনেও ফালাকাটার স্থান শিলিগুড়ির পরে। ১৯৭৯ সালে এখানে মুক্তমঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বর্তমানে, একটি কমিউনিটি হল ছাড়া ফালাকাটায় নাট্যচর্চার আর কোনও জায়গা নেই। 

ফালাকাটার এই দৈন্য দশা কবে কাটবে জানেন না কেউই। হারানোর যন্ত্রনা নিয়ে তাই ফালাকাটা আজও তাকিয়ে আগামীর দিকে সুদিনের আশায়। 

(প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ, ২১ জুলাই, ২০২২)

No comments: