Saturday, March 31, 2018

  স্তাবক 
শৌভিক রায় 


কিছু স্তাবকতা থাকে নির্জনে 
রং মশাল নিয়ে 
নানা রঙে রাঙাবে ব`লে

সাদা কালো মুখ একই থাকে 

বিপ্রতীপে কেউ ধরে তুলি 
মাখে মাসকারা 

বেশ রং ঢং নিজের শরীরে 

গোপন গোপন খেলায় 
হঠাৎ পর্দা উঠে গেলে, 
সাদা কালো অঙ্গে 
রঙেরা কেমন কুন্ডলি পাকায়  

একটা কুটিল সাপ হয়ে যায় সে ....

কিছু কবি ও উলঙ্গ রাজা ও জলে খেলতে নামা কুমীর
( একটি অকবিতা প্রয়াস)


শৌভিক রায়


ঘটনা: এক

ওরা কয়েকজন কবিতা পড়ছিল
আমি, উলঙ্গ রাজা, ওদের বললাম,
'বরাদ্দ তোমাদের জন্য দশটি মিনিট,
এসব তাড়াতাড়ি সারো,
ফাঁকা করো মঞ্চ
আমি সেই সূক্ষ বসনটি পড়বো
আর তোমরা হাততালি দেবে।'
ওরা কবিতা পড়েই চলল...

ঘটনা: দুই

আমি উলঙ্গ রাজা নই এখন আর,
ছু কিত কিত খেলে খেলে
কুমীর হয়ে জলে নেমেছি
চারাপোনা খাবো বলে।
আর কি দুঃসাহস!
ওরা এখনো কবিতা পড়েই চলেছে!
আমি কুমীর হয়ে ওদের বললাম,
' বরাদ্দ তোমাদের জন্য দশটি মিনিট,
এসব তাড়াতাড়ি সারো,
ফাঁকা করো মঞ্চ
আমি কুমীর হয়ে ভজন গাইব।'
ওরা কবিতা পড়েই চলল

ঘটনা: তিন

ওরা কবিতা পড়েই চলেছে
মঞ্চ নেই, শ্রোতা নেই,
নেই কোন প্রত্যাশা,
নেই কিছুই ওদের কাছে
তবু ওরা কবিতা পড়েই চলেছে
ওরা কবিতা পড়বেই
নিযুত কোটি দশ মিনিট ওরা কবিতা পড়বে
আমি উলঙ্গ রাজা থেকে
ছু কিত কিত জলে নামা কুমীর হয়ে যাব
কবিতা থামবে না ওদের তবু
ওরা কবিতা পড়বেই
ওরা কবিতা পড়ছেই.....

বেড়ানো
শৌভিক রায়


- না না আমি বুঝতেই পারি না কেন মাত্র সাত-আটদিনের জন্য তোমার বোন নিজের মায়ের দায়িত্ব নিতে পারে না!
- আরে তুমি তো জানোই সব...ওর ননদের অ্যাডভান্স পিরিয়ড এখন, পুরো সংসারটাই ওর ওপর, দেওর, শ্বশুর..
- থাক। আর ফিরিস্তি দিও না। আমারই সব দায়িত্ব যখন তখন আর আমাকে ব'ল না...আমি যাবো না। এই বলে রাখলাম।
- আরে একটু ভাবতে দাও তো। এতো ব্যস্ত হচ্ছ কেন!
- মা....দিদু যাবে না আমাদের সাথে?
- অ্যাই...ঘুমো তো। তোকে পাকামি করতে হবে না। মা...দিদু যাবে না!! এটার মাথাটাও যাচ্ছে বাপের মতো।
**************************************
পেছন ফেরে মিতুন। জানালায় দিদু দাঁড়িয়ে নেই অন্যদিনের মতো। মা বাবা সব জানালা দরজা ভাল ক'রে বন্ধ করে দিয়েছে। বাড়ির পেছন দিকের একটেরে ঘরটায় দিদুকে রাখা হয়েছে। মিটমিটে একটা বাল্ব সে ঘরে যার আলো পৌঁছায় না পাশের ঘরেও।
মা বাবা খুব খুশী। আন্দামানে যাচ্ছে তারা বেড়াতে।
মিতুনের মনটাই শুধু ভাল নেই।
দিদুটা কেন যে বেড়াতে যাচ্ছে না তাদের সাথে!

(প্রকাশিত- মোহনা, বইমেলা ফোল্ডার  )
আমার সরস্বতী পুজোর সেকাল আর একাল
শৌভিক রায়
মাঠের এক কোণায় দাঁড়িয়ে দাদাটা। আমি লক্ষ্য করেছিলাম অনেক আগেই। কিন্তু আবাল্য সেই বাজে অভ্যেস...আগ বাড়িয়ে কথা বলবো না! বলিও নি। আমাদের মধ্যেই কে যেন ডেকে নিল মাঠে। ফালাকাটায় নতুন এসেছে, বাড়ি কলকাতায়। ফালাকাটায় দিদি জামাইবাবুর কাছে থাকবে। শালাবাবু আসবে সে আর নতুন কি! কিন্তু শালাবাবু যখন তার মানে বেশীদিনের অতিথি নয়। পরিচয় পর্ব মিটে গেলে জানলাম নাম হ'ল কার্তিক। ফুটবলে বেশ ভাল স্কিল। অচিরেই অসমবয়সী বন্ধুত্ব পোক্ত হয়ে গেল। এটাও আবাল্য আমার বাজে অভ্যেস। বড়দের সাথে বন্ধুত্ব আর কি। তবে খুব কিছু বড় নয়। মাত্রই দু বছরের। কলকাতার ছেলে বলে সমীহ একটা ছিলই মনে মনে। কলকাতা তো আমাদের কাছে স্বপ্নের শহর সে সময়। ওখানে যারা থাকেন তারা সবেতেই যেন আমাদের চেয়ে বেশী পারদর্শী। আর এ ছেলে তো স্কিলড ফুটবলার। হেডমাস্টারের ছেলে বলে আমাকেই সে চেপে ধরলো হাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে। বিস্মিত হলাম। দিদি জামাইবাবুর বাড়িতে লোকে বেড়াতে আসে এটাই জানি, এ তো এখানে থাকতে চাইছে। প্রণব, পুটন, বাপি চুপিচুপি খবর আনল ছেলেটি খুব গরীব। তাই বাবা মায়ের কাছ থেকে এখানে চলে এসেছে দিদির সংসারে। বিস্ময়ের পারদ চড়ল বৈ কি! কলকাতাতেও গরীব লোক আছে তবে! এতটা গরীব যে কলকাতা ছাড়তে হয়!! বয়সটাই তখন আসলে বিস্মিত হওয়ার। তাই বিস্ময়ের ঘোর নিয়ে বাবার কাছে আবেদনটা করেই ফেললাম। রাশভারী বাবা নামক ভদ্রলোক কিন্তু সাথে সাথেই আবেদন মঞ্জুর করলেন না। রীতিমত ইন্টারভিউ নিয়ে ভর্তি হতে হল কার্তিকদাকে ক্লাস নাইনে। হ্যাঁ কার্তিকদা নাম ছিল তার। সরস্বতী পুজো সেবার দেরীতে। স্পোর্টস আগে। সে সময়ের হাই স্কুলের স্পোর্টস মানে মেলা। ফালাকাটার মতো ছোট্ট শহরে গৌরী টকিজ ছাড়া আমোদপ্রমোদের কি-ই বা ছিল! তাও ছবি যা আসতো তা সেই হীরেমানিক, সুনয়নী গোছের। হিন্দিও আসতো, তবে কম। যাকগে সে অন্য কথা। তা ওই স্পোর্টসে কার্তিকদা অভিনব পন্থায় হাইজাম্প দিয়ে মন জয় করে নিল আরও। ব্যাপারটা কিছুই না, কোণাকুণি না দৌড়ে সোজা এসে বার ক্রস করা। এটা ফালাকাটায় প্রথম দেখালো কার্তিকদা। আমারও কার্তিকদায় মজে যেতে সময় লাগল না বিশেষ।
ধান ভানতে শিবের গীত মনে হচ্ছে? আসলে এটুকু না বললে বলাটা পুরো হবে না আমার। যাহক সেবার, আমি তখন ক্লাস সেভেন, কার্তিকদা প্রস্তাব দিল সরস্বতী পুজো করবার। অভিনব ব্যাপার। পুজো বাড়িতে হয়, স্কুলে হয়। গার্লস স্কুলেও হয়। আমরা নষ্টিফস্টির ধান্দা নিয়ে গিয়ে বড়দিমণি মায়াপিসীকে (বাবা হাই স্কুলের হেডমাস্টার, সেই সূত্রে গার্লস হাই স্কুলের হেডমিস্ট্রেস আমার পিসী আর কি) দেখে পালাই! পুজোর আগে কাশীকুল খাই আর দুরু দুরু বুকে সারা বছর কাটাই যে এবার নির্ঘাৎ ফেল করবো! পুজোর দিন দুটিতে হাই স্কুলে অ্যানুয়াল ফাংশনে অংশ নিই, নাটক করি, এগজিবিশনে পার্টিসিপেট করি। এই অবধি ঠিক ছিল। কিন্তু পুজো! করি নি তো কোনদিন। ব্যাপারটা আক্ষরিক অর্থেই অভিনব আমার কাছে। আবার আবেদন বাবার কাছে। একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি। বাবা আমাকে কোনদিন কোন কিছুতেই আটকান নি, তা সে মাধ্যমিক দিয়ে সান্দাকফু ট্রেকে চলে যাওয়াই হক বা উচ্চ মাধ্যমিকের পর কমলদের চা বাগানে তেজপুরের কাছে মাজবাটে যাওয়াআ হক বা নিজের মত ডুয়ার্স চষে বেড়ানোতেই হক! বাবা কি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন আমাকে নাকি আমার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন এটা আজও প্রশ্ন আমার কাছে!
যথারীতি এবারও আটকালেন না। এক পাহাড় উদ্যমে চলল আমাদের কাজ। প্রথম বলি জহর স্যার। পাঁচটাকা চাঁদা দিলেন। সেই সময়ে বিরাট ব্যাপার। একে একে পন্ডিতকাকু, হরকাকু, প্রমথকাকু, চন্ডীস্যার প্রমুখের বধ হলেন। কার্তিকদা নিজেই খুঁটি গেড়ে ত্রিপল টানিয়ে মন্ডপ বানালো। বাঁশের কঞ্চি বেঁকিয়ে ধনুকের মতো করে কালো কাগজ লাগানো হল। সরু সরু পেরেক নির্দিষ্ট গ্যাপে আটকে ওপর নীচে সাদা সুতো আটকে আটকে দিব্যি ডেকরেশন হল। প্রতিমার দাম বোধহয় কুড়ি-পঁচিশ টাকা ছিল। পন্ডিতকাকু আমাদের বাড়ির পুজো সেরে এই প্রতিমার পুজো করে দিলেন। কার্তিকদারা বামুন। কার্তিকদার দিদি, রূপে লক্ষ্মী, সরস্বতী পুজোর বাকি কাজ করে দিলেন। চোখের সামনে দিব্যি পুজোটা উতরে গেল। আবিষ্কার করলাম আমরাও আয়োজন করতে পারি। আর একই সাথে এটাও আবিষ্কার করলাম যে কার্তিকদা বিড়ি খায়।
সরস্বতী পুজোর সন্ধ্যে বা রাতে লুকিয়ে ধূমপান করা তখন একটা রেওয়াজ ছিল ছাত্রদের মধ্যে। অনেককেই টানতে দেখতাম সেরাতে। ইলেভেন টুয়েলভের দাদা-দিদিরা (আমাদের হাই স্কুলের হায়ার সেকেন্ডারি সেকশান কো-এড ছিল) সেদিন বেশ গল্প গুজব করত। হিরো হিরো ভাব দু একজন দাদা সিগারেট টেনে কায়দা দেখাত। আর আমরা ড্যাবড্যাব করে দেখতাম। মনে মনে ওদের সমীহ করতাম কিন্তু বাইরে ভাব দেখাতাম কি বাজে ওই দাদাটা, এরাম কি বাজে! দু চারজন আবার সিগারেটের প্রথম ধোঁওয়াতে খকখক করে কাশতো। ধোঁওয়া টানার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এই দাদারা অতঃপর নানা জিনিষ ভক্ষণ করত যাতে বাড়িতে টের না পায় কেউ! এতো পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিতে পারছি এই জন্যই যে পরবর্তীতে মহাজন গতঃ স পন্থা আমরাও অবলম্বন করেছিলাম ওই একই হিরোগিরি দেখাতে। অনেক পরে চাকরী জীবনে আমার এক অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মী কোন এক দিদিমণিকে দেখানোর জন্য কায়দা করে সিগারেট টানছিলেন। সেটা দেখে আর এক সহকর্মী আমাকে সারবস্তুটি বলেছিলেন, ' সি.. সি..সিগারেট টা..টাইনে কি আর মে..মেয়েদের প..পটানো যায়! তো তোমার ওই দা..দাদা বো বোঝেই না! ফা..ফালতু প..পয়সা ন নষ্ট করতেছে!' বুঝেছিলাম ব্যাপারটা। তবে অনেক পরে!
সরস্বতী পুজো মানেই তখন অবধারিত আরতি প্রতিযোগিতা। আজকাল আর দেখিই না! ধুনুচি নিয়ে আরতি প্রতিযোগিতার দুরন্ত ক্রেজ ছিল সে সময়টায়। আমাদের স্কুলে বেশ কয়েকজন তাবড় নাচিয়ে ছিল। প্রতিযোগিতার সময় তাদের আরতি দেখতে যে ভীড়টা হত সেটা ঈর্ষা করার মতোই। নাচের ব্যাপারে আমার চিরকালই উঠোন বাঁকা। তাই দর্শকাসনে বসে দেখতাম। একবার এক দাদা জামাতে গিঁট দিয়ে ধুনুচি মাঝখানে রেখে অমিতাভ বচ্চনের নাচ নেচে গেল। সে কি নাচ! তখন কোন একটা ছবিতে অমিতাভ জামাতে গিঁট বেঁধে অভিনয় করেছিলেন। অনেক পরে ওঁর জীবনি পড়তে গিয়ে জানতে পারি যে জামাটা মাপে লম্বা ছিল বলে বাঁধনটা দিয়েছিলেন কিন্তু সেটা একটা ফ্যাশন হয়ে গিয়েছিল। তা দাদার সেই নাচ দেখে আমরা উত্তেজিত। একই সাথে হতভম্ব। স্কুলে আরতি প্রতিযোগিতায় এই নাচের আমদানি করে দাদাটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছিল প্রায়। কিন্তু চন্ডীস্যার বললেন 'কানা এইডায় কি? আরতি? যা বাড়ি যা, বেতায় লাল করুম'। আর পুলককাকু তাঁর অননুকরণীয় রাঢ় বাংলার উচ্চারণে বললেন, 'বাঁদর, পড়াশোনা তো শিখছেই না, যত রাজ্যের বাঁদরামি শিখছে!' যুগান্তকারী ঘটনার দফারফা হয়ে গেল সেখানেই। কিন্তু চোখে ভাসে ঢাকের প্রথম দ্রুতলয়ে বাজনার সাথে প্রতিযোগীদের প্রথম দ্রুত শরীর দোলানো, তারপর মধ্যলয়ে ধুনুচি নিয়ে ধীরে ধীরে নাচ ও পরবর্তীতে আবার দ্রুতলয়ের নাচ ও হাত বেঁকিয়ে ধুনুচিকে উল্টে দিয়েই সোজা করে নেওয়া যাতে জ্বলন্ত নারকেলের ছোবা নীচে না পড়ে যায়। পড়লে নম্বর কাটা যাবে যে! পুজোর পরদিন সকালে বেলপাতায় 'ওঁ সরস্বতী নমঃ' লিখতে লিখতে হাত ব্যথা হয়ে যেত। দাদার কঠোর নির্দেশ ছিল একটি বেলপাতায় তিনবার করে তিনটি বেলপাতায় লিখতে হবে। এবার একটি বেলপাতা মানে তিনটি। অর্থাৎ তিনটি বেলপাতা মানে হল মোট ন'টি। ন'টিতে তিনবার করে মানে সাতাশ বার। কি যন্ত্রণা! ওই খাগের কলমে লেখা যায় নাকি! আজকাল আমা নয় কে নিয়ে নতুন ভাবনা ভেবে দেখেছি। নয় মানে নয়ই। দেখুন নয় একে নয়, নয় দুগুণে আঠারো। আঠারো মানে এক আর আট। যোগ করুন। নয়। তিন নয়ে সাতাশ, দুই আর সাত। যোগ করুন- নয়। চার নয়ে ছত্রিশ...তিন আর ছয়...যোগ সেই নয়। গুণে যান। দেখবেন নয় সেই থাকছেই। পাল্টাবে না। এর মানে হল নয় পালটানোর নয়। দাদা সাতাশবার লেখাতো যাতে আমার কিছু না হয়। দাদার সেই প্রচেষ্টাকে সম্মান করে সত্যিই আমার কিছু হয় নি। ওই নয়েই আটকে আছি!
টেন-ইলেভেন-টুয়েলভে বেশ দাদাগিরি করা গেল বড় হয়ে যাবার সুবাদে। তবে যেহেতু নাটক-সহ নানা কালচারাল প্রোগ্রামে ব্যস্ত থাকতাম আর স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশনটা দু-তিনদিন ধরে এই সময়টাতেই হত তাই ব্যস্ত থাকতাম বেশী ওদিকটায়। তবু তার মাঝে সরস্বতী পুজোর বাজার করতে হাটে যাওয়া, দু-চারটি দোকানে ছোটখাটো ফল বা সব্জী না বলেই নিয়ে নেওয়া এসব নষ্টামিও করেছি। ঠেলায় মালপত্র চাপিয়ে হইহই করে ঠেলাওয়ালাকে মালেপত্রের সাথে বসিয়ে নিজেরাই ঠেলে আনা এসব তো ছিলই। পুজো শেষে ঘটের ডাব কেটে জল খেয়ে ডাবের কাটা অংশ ফেভিকল দিয়ে আটকানোর বৃথা চেষ্টা ও ফলস্বরূপ সুধাস্যারের 'এইগুলা মানুষের পোলা না' শুনতে সর্বোত্তম প্রচেষ্টাও চলত। কৃষ্ণস্যারের সাথে রাত জেগে পলিটিক্যাল সায়েন্সের এগজিবিশনের কাজ করা, রাতে সরস্বতী প্রতিমার দিকে প্রেমিকা জ্ঞানে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে কবে যে কখন স্কুল জীবনটাই শেষ হয়ে গেল কে জানে! বাড়িতে কিন্তু নিয়মিত পুজো হচ্ছে বা আজও হয়। বাড়ির পুজোতে ভিড় হত বেশ। হাই স্কুল কোয়ার্টার্সে বা পরে কলেজ পাড়াতে নিজেদের বাড়িতে অনেকেই আসতো পুজোর দিন অঞ্জলি দিতে। সকাল সকাল পুজোটা হত তাই ভিড়টা হত বেশী। তাছাড়া সংস্কৃত গুলে খাওয়া পন্ডিতকাকুর স্পষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ ও শুদ্ধাচার এবং যজ্ঞ বাড়ির পুজোকে অন্য মাত্রা দিত।
পুজো শেষ করেই স্কুলে দৌড় পর্বটা শেষ হল স্কুল জীবনের পরে। কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে সেই আনন্দ ছিল না। সত্যি বলতে জানতামও না কলেজে কোথায় পুজো হচ্ছে, কারা করছে। ইউনিভার্সিটির দু-বছর পুজোর সময়টায় আগেই চলে আসতাম বাড়ি। প্রতিমা আনা, কিছু বাজার ইত্যাদি করতে হবে যে!
চাকরীতে ঢোকার পরেও কোচবিহারে সরস্বতী পুজোর সময় থাকতাম না। কেননা ওই বাড়ির পুজো। এমন কি নিজে যেবার স্কুলের পুজো কমিটির সেক্রেটারি সেবারও পালিয়েছিলাম। এখানে একটা কথা না বলে পারছি না। আমাদের স্কুল অর্থাৎ মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের নামটা কিন্তু এই সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করেই। স্কুলের নাম আগে ছিল সুইডিশ মিশন ইনস্টিটিউট। মিশনারীদের অধীন হওয়ার জন্য স্কুলে পুতুল পুজো নিষিদ্ধ ছিল। সরস্বতী পুজো তাই হত না। ছাত্রদেরকে যেতে হত জেনকিন্স স্কুলে। স্বাধীনতার পরের বছর অর্থাৎ আটচল্লিশ সালে (কোচবিহার তখনও ভারত প্রজাতন্ত্রের অন্তর্ভূক্ত হয় নি) তখনকার ছাত্রেরা মিশনারীদের বিরুদ্ধে গিয়ে পুজো করে স্কুলে। ফল হল, সুইডিশ মিশনারীরা স্কুলের সাথে সম্পর্ক রাখলেন না। তদানিন্তন কোচবিহারের বিশিষ্টজনেরা রাজদরবারে আবেদন করলেন। পরের বছর অর্থাৎ উনচল্লিশ সালে রাজদরবার থেকে পাওয়া গেল স্কুলের নতুন নাম প্রজাবৎসল মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুরের নামে। ভূ-ভারতে সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে এরকম নাম পাল্টে যাবার ঘটনা আর কি না জানি না!
যাহক কোচবিহারের বাড়িতে পুজো চালু করতে হল শ্রীমানের জন্য। একটু বড় হয়েই নিজের স্কুলের পুজো ছেড়ে সে আর নড়বে না বলে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা করে বসল। একে নিয়ে মুশকিল একটাই। জেদের মাত্রাটা অত্যাধিক। মনে আছে একবার কালীপুজোর আগে কলকাতায় আছি। তখন ও বেশ ছোট। কোলে চেপে ঘুরে অভ্যস্ত। যাদবপুর এইট-বি স্ট্যান্ডের বাজারে কি একটা কাজে ঢুকেছি, ওর চোখ পড়ল দশকর্মা ভান্ডারে ঝোলানো মা কালীর ছোট সাইজের খড়্গের দিকে। বাধ্য করালো সেটা কিনতে। পরের দৃশ্যটা ভাবুন। কোলে ছেলেকে চাপিয়ে আমি হাঁটছি। ওর হাতে খড়্গ। দেখি লোকজন আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, দু একজন বয়স্কা প্রণামটুকুও সেরে নিলেন বোধহয়। কি ব্যাপার? না ছেলে কোলে উঠে একহাতে বরাভয় মুদ্রায় ও অন্য হাতে খড়্গ মুঠ করে ধরে জিভ বের করে আছে! হাসবো না কাঁদবো এসব ভাবার চেয়ে দ্রুতগতিতে পলায়নটাই শ্রেয় মনে হল। পুরো যাদবপুর স্টেশন রোড, রেললাইন পার করে ওপারে পালবাজারে পৌঁছে তাড়াতাড়ি রিক্সায় উঠে 'গড়ফা' বলেই হুডের তলায় আশ্রয় নিলাম। তাই সরস্বতী পুজোতে থাকব না এটা জানলে আবার কোন কীর্তি দেখতে হবে ভেবে থেকে যাওয়াটাই ভাল মনে হল। কিন্তু থাকলেই তো হবে না, পুজোটাও করতে হবে যে! অতএব আজ অবধি মা সরস্বতী আমার কোচবিহারের বাড়িতে পুজো পেয়ে আসছেন। আগে যত ছোট ছিল তত লম্বা প্রতিমা পছন্দ করত। আজকাল লম্বা হবার পর ছোট প্রতিমা পছন্দ করছে। আমি বাজার করতে বা প্রতিমা আনতে সাথে যাই। বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ছেলে বা ছেলের মা যা মনস্থির করে সেটা মেনে নিই, কেননা গৃহশান্তি রাখাটা আমার মত সচেতন নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য। মাঝে মাঝে ভাবি ছোটবেলায় সরস্বতী পুজোর বাজার করা বা প্রতিমা আনার ব্যাপারে বাবার সাথে গিয়ে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, আজও তাই দাঁড়িয়ে থাকি। দাদা সেই যে নয়ের আশীর্বাদ ভায়া মা সরস্বতী আমাকে দিয়েছে তা নড়চড় হওয়ার নয় আর আমারও কিছু হওয়ার নয়!
বাড়ির পুজো শেষে দুপুরে বা পরে সন্ধ্যেবেলায় স্কুলে যখন ছাত্রদের দেখি মনটা ভরে যায়। সারাদিন হুটোপুটি করে ওরা। আমার হাতে ক্যামেরা দেখলে 'ও স্যার আমার ছবি তোল' বলে আবদার করে অনেকে। উল্টোদিকের এ বি এন শীল কলেজ থেকে প্রাক্তন ছাত্রেরা আসে। আসেন বহু মানুষ। আমরা প্রৌঢ়রা বসে থাকি। একদিন এই স্কুলে থাকবো না যেভাবে থাকতে পারি নি ফালাকাটা হাই স্কুলে বা দিনহাটা কলেজে বা নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে। কালের নিয়মে এই স্কুল থেকে, এই জীবন থেকেই বিদায় নিতে হবে। কিন্তু থেকে যাবে এই পুজো আর তাকে ঘিরে শিশুদের কলরব, নব্য যুবক-যুবতীর গাঢ় চোখে তাকানো। সেদিনও আমার মত কোন প্রৌঢ় এভাবেই দেখবে সব, ভাববে নিজের কথা। আর সব ছাপিয়ে কোন এক পন্ডিতকাকুর গলায় প্রায় সারাদিন শোনা যাবে-
'সরস্বতী মহাভাগে, বিদ্যা কমললোচনে......'

সুরমা কলিং - শৌভিক রায় 
কিছু প্রতিক্রিয়া 








শিল্পী, প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজকর্মী শ্রী মৃগাঙ্ক (চাঁদ) দাস- 

শৌভিক রায়ের লেখা "সুরমা কলিং " গল্পগ্রন্থটি পড়লাম।এক কথায় দুরন্ত আধুনিক ও সময়োপযোগী এক অনন্য গল্প সংগ্রহ।লেখক রচনায় অত্যন্ত আধুনিক ও মননশীল।
এখানে প্রথমেই রচনার কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য যা আমাকে তীব্র উদ্দিপীত করেছে সেগুলো একে একে বলছি।
প্রথমতঃ গল্প সংগ্রহের প্রতিটি গল্পেই কোনও গল্প নেই। অধিকাংশ গল্পের মূল আশ্রয় হচ্ছে কোনও না কোনোও সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এই ঘটনাগুলোর সাথে যুক্ত প্রতিটি মানব-মানবী,বা অবস্থা ও অবস্থানের মানবিক বিশ্লেষন যা এক একটা গল্পকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে গেছে।কখনো কোনও বস্তু ও মানুষের আন্তরিক সম্পর্কের ভেতরকার ছান্দিক মননশীলতা পুরানো,বেহালাকে পূর্ণবাবুর আশার অভিন্ন রূপকল্প হিসাবে এঁকেছেন এক অনন্য পারদর্শীতায়। আবার একটা গল্পে "তরুণবাবুর কান" কখনো বেশী শোনে,কখনো সম্পূর্ণ বধির হয়ে যায়,তা নিয়ে গল্প। এটুকু শুনলে বোঝা যাবেনা,গল্পটি কি?আবার সেই প্রেক্ষিত রচনার মধ্যে দিয়ে যে সামাজিক খন্ডচিত্র সামনে এনেছেন, তা আমাদের অজান্তেই এক গহীন ব্যথার সমব্যথী করে তোলে। প্রতিটি গল্পেই এইরকম কায়াহীন ছায়ার মতো,গল্পহীন গল্পের কাব্যিক রূপ প্রতিভাত করেছে।
দ্বিতীয়তঃ প্রতিটি গল্পেই লেখকের সমাজচেতনার ছাপ, আমাদের উপলব্ধিকে সচকিত করে তোলে।সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা বা অব্যবস্থা যাই বলিনা কেন তার বিরুদ্ধে লেখাতে জেহাদ এক অনিবর্চনীয় রূপ ধরে প্রকাশিত হয়েছে। বলতে চাইছি এই কাজটি করতে গিয়ে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই লেখক স্লোগান সর্বস্বতায় ভোগে, কিন্তু শৌভিক রায় তার কথকতার জাদুতে সমগ্র বাক্-সর্বস্বতাকে অতিক্রম করতে পেরেছে এবং এইখানেই শৌভিক ভীষণভাবে প্রেমচাঁদ, কৃষণচন্দর, মানিক বন্দোপাধ্যায়দের উত্তরসূরি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করেছেন।
তৃতীয়তঃ শ্রেণীচেতনা। এক অনন্য শ্রেণীচেতনার অধিকারী শৌভিক রায়।জানিনা এই উপলব্ধি কোথা থেকে পেলেন তিনি। যে নিম্নবর্গীয় মানুষের চালচিত্র বইটিতে আঁকা হয়েছে, যাদের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার এত কারুকার্যময় প্রকাশ তা অত্যন্ত তীব্র শ্রেণীচেতনা না থাকলে ঘটানো সম্ভবই নয়।চরিত্রগুলো সব নিম্নবর্গীয় মানুষের মত আত্মনির্ভরশীল। প্রতেকেই সাবলম্বী, অর্থনৈতিক সম্পর্কে কেউ কারোর সাথে আবদ্ধ নয়। এই বোধ শ্রেণীচেতনা ছাড়া সম্ভব নয়।আর এই শ্রেণীচেতনা থেকেই নীচুতলার মানুষের যৌনচেতনা তার রচনায় সাবলীল হয়ে উঠে এসেছে,যা কোনো সেন্সরশিপের অপেক্ষা রাখে না। অনেকটা যেন মহাভারতের "দ্রৌপদীর" মত পাঁচ স্বামী নিয়ে ঘর করার পর কখনো দ্রৌপদীকে অসতী মনে হয় না। তাই যৌনতা (তলপেট,বুদবুদির গরম ভাত) এক জরুরি অথচ জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা হিসাবেই গল্পে একটা ডাইমেনশন তৈরি করেছে। যৌনতার এই উত্তরণ কেবলমাত্র শ্রেণীচেতনা থেকেই আসা সম্ভব। উল্লেখ্য কবিতা,যেখানে যৌনতা এসেছে তার স্বাভাবিক ছন্দে,নৃত্যপটীয়সী নারীর মত। শৌভিকের যৌনতাচেতনা তাই শ্রেণীচেতনার ঋদ্ধ মননের প্রকাশ হিসাবে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। এই শ্রেণীচেতনায় সমৃদ্ধ "সুরমা কলিং " চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় শৌভিক অনেকদূর যাবে। এই মুহূর্তে শৌভিকের মত এত ভাল "বামপন্থি" লেখক পাওয়া মুশকিল।
চতুর্থতঃ লেখক শৌভিক বড়, না স্টোরিটেলার বড় এটা বুঝতে আমার সময় লেগেছে। প্রতিটি গল্পে যেভাবে গল্পের গতিকে নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে গল্প বলিয়ে শৌভিকই প্রাধান্য পেয়েছে। লেখক তার সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যেই নিজেকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় প্রকাশ করেছেন যেন। কিন্তু "সুরমা কলিং " এর কোনও গল্পেই তা হয়নি,বরং সচেতনভাবে গল্প থেকে নিঃস্পৃহ থেকে একের পর এক মানব জমিনের জটিলতাগুলোর বিন্যাসকে খুলে গেছেন। আর এই কথকতার প্রশ্নে আরও একটা বড় সম্পদ হল ভাষার ব্যবহার। লোক কথার মত সহজ সরল করে বলে যাওয়া, এ যে কত কঠিন, যারা লেখালেখির সাথে যুক্ত তারাই জানেন এর মাহাত্ম্য। গালিবের ভাষায়,"আশা করনে কি করতে হ্যায় ফরমায়েনা, গোয়েম মুশকিল, বগঢ়না গোয়েম মুশকিল "। (কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদ-"আদেশ করেন যেন লিখি সহজ অনাবিল,কিন্তু আমার দুরূহ রীতি ছাড়াই মুস্কিল") শৌভিক এই দুরূহ রীতি ছাড়তে পেরেছে। তাই আমার মনে হয়"স্টোরিটেলার" হিসাবে শৌভিক সত্যিই অনেক দামী।
পঞ্চমতঃ পুরো বইটি এক অনন্য মননশীলতার কাব্যিক রূপ। কবিতার যে বেগময়তা তা গদ্যে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু "সুরমা কলিং "এর ব্যতিক্রম। শব্দচয়ন,পরিমিতবোধ (কলাবতীর রাজকন্যা) শৌভিকের গদ্য রচনায় এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে।
সর্বোপরি এ প্রসঙ্গে একটু তুলনা নিয়ে আমি দ্বিধাগ্রস্ত, কারণ শ্রেণীচেতনায় ঋদ্ধ এই গল্পমালা, জনগণের হৃদয়ের অনেক কাছের সম্পদ।অনুভবের, উপলব্ধির জন্যই সৃষ্টি। একটা উপেক্ষিত শ্রেণীর প্রতি সমবেদনা ও ভালবাসার লক্ষ্যেই যেন এর সৃষ্টি। তুলনামূলক সাহিত্যের আলোচনায় গিয়ে একে "ব্র‍্যান্ডেড"করাটা নির্বুদ্ধিতা, শুধু তাই নয়, এ যেন অমৃত মন্থন করে প্রতারণা পূর্বকতা দেবতার হাতে তুলে দেওয়া।তবুও বলা উচিৎ মনে করেই বলছি। প্রায় ২০০শ বছর আগে ইউরোপে শিল্প, সাহিত্যে একটা রূঢ় ঝড় হয়ে উঠেছিল- ইম্প্রেশনিজম, এবং এই ইম্প্রেশনিষ্টদের মধ্যে যারা ছিলেন, যেমন বোদলেয়ার,লরেন্স, কনরাডের মত বিখ্যাত সাহিত্যিকগণ, তেমনি শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন গ্যগা, সেজান, ভ্যানগগ্ প্রমুখ। এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক করে, সেই ইম্প্রেশনিজম কি জিনিস জানলেই এই আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্য বোঝা যাবে। খুব স্পষ্ট কথায় ইম্প্রেশনিজম বলতে বোঝায় impressionists interpret -impressions,sensations and emotions that constitate a character's mental life,not the description of the incidents or characters ".ইম্প্রেশনিস্টরা মানুষ বা ঘটনার সাথে যুক্ত মানব-মানবী বা কোন ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত অন্তর্লীন ফ্লগুধারার মত প্রবাহিত মননশীলতা নিয়ে চিন্তা করে,ঘটনা বা চরিত্রের বহিরঙ্গ নিয়ে নয়।" "সুরমা কলিং "গল্প সংগ্রহ (নাকি কাব্যগ্রন্থ) এমনি একটি গল্পমালা যা শুরু থেকে শেষ অবধি ঠিক এই কাজটি অত্যন্ত নিপুণতার সাথে করেছে, ঈর্ষনীয়ভাবে করেছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে,বইটিতে গল্পগুলোর পরপম্পরা রক্ষা করে সাজানোর কাজের মুন্সিয়ানার প্রশংসা করলাম।তবে ছাপানোর কাজের ভুলগুলো সংশোধন করা জরুরি।
১)"আরাবানের বিধবা"- এক অত্যন্ত সুন্দর সৃষ্টি।গল্পটি এক চিরাচরিত গন্ডীকে ভেঙে এক অচেনা জগতের বর্ণময়তা ও তার মননকে সাদরে আমাদের (সাধারণের) জীবনের সাথে অত্যন্ত নিপুণতারর সাথে মিশিয়েছেন যা শুধু শৈল্পিক উৎকর্ষতায় অনন্য নয়,দরদী মননের ছাপ রেখে যায়।উপসংহারে যখন গোকুলদা আর আরাবান মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়,তখন হিজরা জীবন বিলীন হয়ে এক সামগ্রিক মনুষ্যত্বের মননের উত্তরণ ঘটে। সৃষ্টি সার্থকতা পায়।
২)"কলাবতীর রাজকন্যা"-সৃষ্টির কোনও ধর্ম হয় না, হয় না কোনো জাত। বর্তমান জীবনের এক জটিলতম সমস্যাকে যেভাবে ফোটানো হয়েছে, তা কেবলমাত্র ক্যানভাসে আঁকা একটা জীবন যন্ত্রণার সাথে তুলনীয়। সবচেয়ে আমাকে আকৃষ্ট করেছে আঙ্গিক ও পরিমিতবোধ। এই বিষয়টা এক বহুল প্রচলিত বিষয়, যা এখন আর মনকে নাড়া দেয় না। সামান্য দুঃখ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শৌভিকের সাফল্য মাত্র চোদ্দ লাইনে এর একটা সার্বজনীন বেদনার রূপ দিতে পারা আর হৃদয়ের কোনো একটা জায়গায় মোচড় দিতে বাধ্য করা। লেখাটার একটা রূপ এর একটা বড় বৈশিষ্ট্য। একটা সফল সৃষ্টি।
৩)"একদিন প্রতিদিন "- উপলব্ধির এক অন্যরূপ। সাধারণ এক কাজের মেয়ের সাথে মা ও মেয়ের দুই ভিন্ন ব্যবহার, এক থেকে অন্য প্রজন্মে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বস্তুত যেটা প্রায় অসম্ভব, সেটাই দেখানো হয়েছে।
৪)"শিল্পী"- একজন মোটিভেটেড খুনির বিবরণ।এক চূড়ান্ত মোটিভেশন যেমন কোনও সাধককে নির্বাণ লাভে সাহায্য করে, ঠিক তেমনি, কাজটা যাই হোক না কেন, তন্ময়তা তাকে সেই কাজের শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসাবে মর্যাদা দেয়।এখানে তেমনি একটা মানুষের তন্ময়তার বিবরণ, যে তন্ময়তায় সে খুন করাকে শৈল্পিক স্তরে নিয়ে গেছে,তার ২২তম খুনের সময়। সে কল্পনার এক নিঁখুত শল্যচিকিৎসকই হ'ক বা শিল্পী হ'ক, নিঁখুত ছবির টান বা তুলির টান হোক, তা অবশ্যই তুলির টানের মতই বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। অনবদ্য কল্পনা।
৫)"তারক আর কিশোরকুমার"- একজন অটোচালকের জীবনের অজান্তেই গড়ে ওঠা এক ভালবাসার গল্প।কিশোরকুমারের সঙ্গীত উঠে এসেছে তার হৃদয়ের অনুরণন হিসাবে। এইখানেই লেখকের স্বকীয়তা ভীষণভাবে ফুটে উঠেছে।আরো অনেকভাবে অনেক ভাষায় একে প্রকাশ করা যেত। কিন্তু নায়কের শ্রেণীর (অটোচালক) কল্পনা, তার শ্রেণী চরিত্রের এক দুর্দান্ত প্রকাশ ঘটিয়েছে।অটোচালকের মুখে সাহিত্য বুলি অত্যন্ত বেমানান হতো।সবচেয়ে বড় পুরো গল্প সংকলনেই শৌভিক তার নিজের শ্রেণী চরিত্রকে পরিস্ফুট করেছে, যা পৃথিবীর খুব বিখ্যাত হাতে গোনা লেখকের লেখায় দেখা যায়। এটা স্পষ্ট যে লেখক জানেন তিনি, কার বা কাদের জন্য লেখেন।
৬)"ইচ্ছেপূরণ"- এক অনবদ্য মাইক্রোগল্প। স্বামী-স্ত্রীর খুনসুটি দিয়ে যে গল্প শুরু, মুহূর্তেই তার ট্রাজিক সমাপ্তি মনটাকে ভারী করে তোলে।মধ্যবিত্ত সংসারের সীমাবদ্ধতা ও তার থেকে উদ্ভূত বেদনাময় পরিণতি। অন্তরে এক হাহাকারের জন্ম দেয়। তাই গল্পটা শেষ হওয়ার পরেও অনেকক্ষণ লাগে পৃষ্ঠা ওলটাতে পরের গল্পে যাওয়ার জন্য।
৭)"সুরমা কলিং "- কভার স্টোরি আপডেটেড। গল্পটির তিনটি বৈশিষ্ট্য ১) স্বামী-স্ত্রীর চাওয়া পাওয়া, ২) শিল্পী ও কারিগরের মধ্যে ফারাক বোঝানো, ৩) শিল্পীর আত্মচেতনা ও আত্মসম্মানবোধ, নিজেকে বিক্রি না করে দেওয়ার অনমনীয় দৃঢ়তা। আমি,যখন লিখছি, যথেষ্ট সচেতন থাকতে হচ্ছে, মনে পড়ে যাচ্ছে জীবনানন্দের সেই মন্তব্য যা তিনি আলোচকদের প্রসঙ্গে বলেছিলেন,"অক্ষমতা পিচুটি মাখা চোখে...।" জানি আমার বোধ,আমার উপলব্ধি আমি বর্ণনা করতে পারব না, কারণ আমি শৌভিক নই।কারণ আমি যা উপলব্ধি করি, তা সঠিকভাবে উপস্থাপনা করার বিদ্যেও আমার নেই।এই সমস্ত তাত্ত্বিক কচকচানি, গল্পটির অনবদ্য সুষমাকে মলিন করে দিতে পারে। না পাওয়া জীবনে কিছু স্বীকৃতি পাওয়ার পর, প্রথমে যার কথা মনে পড়েছে, সে বহুদূরে থাকা সাফল্য বা ব্যর্থতার উৎকণ্ঠায় থাকা স্ত্রী সুরমা। কিন্তু সেই মুহূর্তে মোবাইলে বেজে ওঠে রিংটোন। লেখা ভেসে ওঠে-"সুরমা কলিং "। আশ্চর্য সুন্দর ভালবাসার টেলিপ্যাথি?
৮)"সমাপতন"- অন্যান্য গল্পের তুলনায় দুর্বল লেগেছে।রেণুবালা হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারেনি। গল্পের বিন্যাসও দুর্বল মনে হয়েছে।রেণুবালা কি অতীতের ভ্রান্তির ভুল চোকালো অথবা দীর্ঘকালীন পুষে রাখা যন্ত্রণার প্রতিশোধ নিল? যার জন্য সত্যিকারের সমাপতন হয়ে তা হয়ে উঠতে পেরেছে কি?
৯)"পূর্ণবাবুর বেহালা"- এক অনবদ্য রসময় সৃষ্টি। সমস্ত জীবনের অপূর্ণ বাসনাগুলো জীবনের কোন এক সময় আবার সামনে এসে দাঁড়ায়।কল্পনাগুলো, ভালোলাগা -ভালবাসা যা প্রাত্যহিক জীবনের বহুমুখী চাপে হারিয়ে যায়, হঠাৎ জীবনের অবেলায় তার মুখোমুখি হতে হয় পূর্ণবাবুকে এবং তার অপূর্ণতাই তার ওপর ভর করে। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই বোধ একবার, পূর্ণবাবু হয়ে ওঠা তাই অনিবার্য হয়ে ওঠে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে পূর্ণবাবুর মধ্যে নিজেকে দেখতে পাই।ভায়োলিন কি সুর সৃষ্টি করল সেটা মেইন নয়, কিন্ত এই আকুলতার এক সর্বগামী দৃষ্টিভঙ্গি উন্নীত হয় এক চমৎকার গল্পে। সার্থক রচনা।
১০)"তলপেট "- একটু হালকা হাওয়া। নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত জীবনের ভালোলাগা ও ভালবাসার গল্প যা চিরাচরিত পথ ছেড়ে একটু ভিন্ন পথে এগোয়।দুজনের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ গল্পটিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। সুমতিকে কখনো অসতী মনে হয় না। সুমতির প্রেম পরিক্রমণ এত জটিল,অথচ লেখনীর বলিষ্ঠতায় অত্যন্ত সুখপাঠ্য (পাঠ্য শব্দটায় আপত্তি আগেই জানিয়েছি) হয়ে উঠেছে। একগুঁয়ে বুকুর সরল জীবনদর্শন ও সার্বিক সরলতা সকলকে মুগ্ধ করে।
১১)"সাধুচরনের একদিন"- আবার সেই মানব-মানবীর জীবন যন্ত্রণা ও বক্রগতির প্রেমের বিশ্লেষণ। দুই ভিন্ন চরিত্র একখানে হৃদয়ের টানে বাঁধা পড়ে। সেইমুহূর্তের দুজনের মনস্তাত্ত্বিক অপূর্ব বিশ্লেষণ, অবশেষে মিলন অথবা বিচ্ছেদ যা নান্দনিক রূপ লাভ করে। প্রতিটি গল্পের মত স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। বাউণ্ডুলে সাধুচরণ গল্পের নায়ক, যে বলার চেয়ে ভাবে বেশী।দিনশেষে ব্যথাই সম্বল যার। শৌভিক অস্তমিত সূর্যের লাল ছটায় রক্তিমতা প্রদান করে জীবনের ছোটখাটো চাওয়া পাওয়ার চেয়েও যে জীবন অনেক বড় তা স্পষ্ট করে।এই আশাবাদই সার্থকতা লাভ করে।
১২)"বদুবুড়ি ও গরম ভাত"- একজন ক্লিষ্ট, নিরন্ন,জীবনযুদ্ধে পরাজিত নারীর মনোজগতের এক অসীম মায়াময় কথন।জীবনের আবর্জনা,গলিত পচাগলা,সমাজের ক্লেদ যাকে ছিন্নভিন্ন করেছে,অথচ মনুষ্যত্ব মারতে পারেনি।কোমরের দীর্ঘকালীন ব্যথা নাকি সমাজের নপুংসকতাকে অতিক্রম করে রুখে দাঁড়ায় নারীর সম্মান রক্ষার অসম লড়াইয়ে। জীবনের সায়াহ্নে যার ভালোলাগা,একটুখানি গরম ভাত আর কাঁচা লঙ্কার মিষ্টি সুবাস সে পেয়ে যায় নিজের রক্তেই। অনবদ্য আখ্যান।
১৩)"কবীরের দোহা"- সমাজের এক অন্ধকার দিক "কুসংস্কার "। যে ধর্মীয় অন্ধত্ব মানুষকে দিনদিন এক ভয়ংকর অন্ধকারের দিকে নিয়ে চলেছে,তার প্রতি তীব্র কষাঘাত দেখতে পাই। এক দুর্দান্ত আলেখ্য। এক এমন চিত্রকল্প যা পড়তে পড়তে নিজের বিশ্বাসটা যাচাই করে নিতে হয়। এক মহান উপলব্ধি, যা বিজ্ঞান মনষ্ক মানুষ, বিজ্ঞান মনষ্কতা নিয়ে ভাবনা ছড়াবে,ষঅথচ সমাজ সংস্কারে নামবে না, তা আদৌ সম্ভব? ঘুমের মধ্যে হাঁটা একটা রোগ, যাকে পুঁজি করে এক নারীর ওপর সতীত্ব চাপিয়ে তাকে অবস্থার শিকার বানিয়ে, গণপ্রতারণা ও শোষণ চালিয়ে যাওয়ার কুৎসিত চক্রান্ত। যেখানে প্রশাসন ও নির্বিকার, সেখানে এমন এক ব্যবস্থা, সবাই মিলে এক অশুভ ষড়যন্ত্রে সামিল হয়ে সমাজটাকে উচ্ছনে পাঠাচ্ছে। অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং লেখনীর গুণে কাল-উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
শৌভিক রায়কে ধন্যবাদ এরকম আধুনিক একটি গল্পসংগ্রহ উপহার দেওয়ার জন্য।





কবি শ্যামলী সেনগুপ্ত-
শৌভিক রায়----বরং বলি ' মুজনাইয়ের বালক'।অন্তর্জালেই আলাপ।ফেসবুকে মুজনাইয়ের বালক কে যখন আত্মস্থ করছি ,মুগ্ধহচ্ছি অনবদ্য গদ্যশৈলী তে তখনই আলাপ।এরপর হাতে এল 'সুরমা কলিং'---- জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তে , যেসময়ে মনেমনে চাই নিকটজনকে , ঠিক সেই সময়ে সেলফোনের মধুর শব্দে স্ক্রিনে ফুটেওঠে সুরমাকলিং-----এক মাইম শিল্পীর জীবন নিয়ে লেখা এই গল্পে যুদ্ধজয়ের আনন্দ--জীবনযুদ্ধ।রোজ যাদের যুদ্ধ করতে হয় পেটের জন্য,ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য,ভালবাসারজন্য আর ভালবাসা পাওয়ার জন্য----তারাই শৌভিকের গল্পের নায়ক-নায়িকা।তলপেট , রসিকার রিক্সাওয়ালা, সাধুচরণের একদিন পড়তে পড়তে ভুলেযাই এলিটক্লাসের ড্রইংরুম গল্পের পানসে স্বাদ।' বদুবুড়ি ও গরম ভাত'--জটিলজীবনের অনবদ্য কাহিনী--বাস্তব বড়োই বেপরোয়া বাস্তব।মুগ্ধহই ' আরাবানের বিধবা ' পড়ে।তৃতীয়লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে লেখা -তিদের প্রেম তাদের আকাঙ্ক্ষা আর বাস্তব ---সব মিলেমিশে অনন্য । পরাবাস্তবতায় ডুবেছিলাম 'আগুনঝাঁপ ' পড়ে।আমার মতে এই গ্রন্থের শ্রেষ্ঠ গল্প।তবে সবটুকু বলবো না।
পাঠক!এঁদের পড়ুন।আমার বন্ধুদের বলি----শিলিগুড়ি,কোচবিহারের এই লেখক লেখিকাদের লেখা পড়ুন আর পড়ান।কি শক্তিশালী গদ্যশৈলী!কিইই অসাধারণ কল্পনা আর বাস্তবের মিশেল।



কবি সুবীর সরকার -

সুরমা কলিং। একটি ১৪০ পাতার,১৮ টি গল্পে সাজানো ঝকঝকে পেপারব্যাক।দৃষ্টিনন্দন প্রছদ প্রথমেই মন কেড়ে নেয়।লেখকঃ শৌভিক রায়। তার আগের গদ্যের বই ‘মুজনাইয়ের বালক’ পাঠ করে আমি চমকে উঠেছিলাম। কি অসামান্য কলম। কি তীব্র দেখবার চোখ শৌভিকের! সুরমা কলিং পড়তে পড়তে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছি। একটানেই পড়ে ফেলতে হয়েছে এই বই আমাকে। কোন বিরতির সুযোগ নেই। মানে এই বইএর এমনই টান,শেষ না করে ছাড়া যায় না। এখানেই লেখক জিতে গেছেন।
এই বইয়ের ১৮ টি গল্পে নানারকমের মেজাজ। নানান চরিত্র ঘোরাফেরা করে।সহজসরল ভঙ্গীতে শৌভিক বুনে চলেছেন বহুবর্ণ তাঁতের রোদহাওয়া। কিছুতেই মুছে ফেলতে পারি না পূর্ণবাবুর বেহালা ও যাপনকে। আর ‘আরাবানের বিধবা’ গল্পে কি নিখুঁতভাবে বিদ্রুপ ছুঁড়ে দেন লেখক।আর শিউরে উঠি ‘শিল্পী’ গল্পের সেই সিরিয়াল কিলারকে দেখে। সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সাহসী লড়াইএর ছবি তুলে দরা হয় ‘কবিরের দোহা’ গল্পে। চোখ ভিজে ওঠে ‘রসিকার রিক্সাওয়ালা’ পড়ে,যেখানে জয়ী হয় মানবতা। মানুষের চিরন্তন ও চিরায়ত দর্শন কুহকের মতন জাপটে ধরে আমাদের যখন পড়তে হয় ‘সাধুচরণের একদিন’,’আগুন ঝাঁপ’ ও ‘নিশি’ গল্পগুলির ভেতরে প্রবেশ করি। আর সমাজের এক অন্ধকার নিয়ে শৌভিক তুমুল লিখে ফেলেন ‘বদুবুড়ি ও গরম ভাত’ গল্পটি।তবে পাঠ শেষে কেবল স্তব্ধতা নিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না আমাদের ‘সমাপতন’ এবং ‘সুরমা কলিং’ পড়বার পর।
কি আলোকসামান্য এই লেখকের জীবনবোধের জায়মান বিস্তার! ’হাওয়াকল’ প্রকাশিত এই বই বাঁশি,দোতরা ও গিলোটিনের মতন,তীব্র সংক্রামক। 
মুগ্ধতা জাগায় কেবল।



কবি দীপশিখা চক্রবর্তী -

হাতে পেয়েই বইটিকে খুব মন দিয়ে পড়া শুরু করলাম। যতটা আনন্দ হয়েছিল হাতে পেয়ে,পড়তে গিয়ে ঠিক ততটাই অবাক হতে হয়েছে। না,এটা কোনো রিভিউ নয়। রিভিউ লিখতেও পারিনা। শুধু নিজের ভাললাগাটুকু জানাতে চাই।
শৌভিক রায়ের "সুরমা কলিং", একটি সোনার পালক, যার ছোঁয়ায় পাঠকের মন নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে। ভিন্ন স্বাদে লেখা প্রতিটি গল্প চেনা কিছু দৈনন্দিন ঘটনাকেও নতুন আঙ্গিকে দেখতে শেখায়। নতুন অনেক তথ্যে পাঠক সমৃদ্ধ হবে।
এবার আসি প্রথম গল্পে-"আরাবানের বিধবা"-অনেকেরেই হয়তো আরাবান সম্পর্কে জানা, আমার জানা ছিলনা। তাই গল্পের দ্বিতীয় পাতাতেই অনুমানে ধাক্কা লাগে।যাদের নিয়ে ভাবার লোক পাওয়া দুষ্কর,তাদের নিয়ে অন্য রঙের টান তুলিতে। এরপর একের পর এক গল্প পড়ার নেশা ঘিরে ধরে। পড়তে শুরু করলে থামা মুশকিল, কিন্ত নানা কাজের চাপে একটু থেমেই পড়তে হল। এত ভাল লেখা না হয় আমেজ করেই পড়লাম। "সুরমা কলিং", "আগুন ঝাঁপ" অনেক অজানা তথ্যের যোগান দেয়। দুটো গল্পের শেষ অবাক করেছে। অনুমান করে গল্প পড়তে গেলেই শেষে অবাক হতেই হবে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। "পূর্ণবাবুর বেহালা"র সুরে নিজেকেই হারিয়ে ফেলা যায়। কিছু গল্পে বেশ মজার ছলে নির্মম বাস্তবকে দেখানো হয়েছে। লেখকের লেখার ধরনের প্রশংসা যতই করা হবে, কমই বলা হবে। প্রত্যেক গল্পে নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছেন। নতুনভাবে সমাজের দিকগুলো চিনতে শেখায়। আগামীতে আশা আরও অনেক বেড়ে গেল। এত ভাল বই যতই পড়ি, মন যেন আরও পড়তে চায়। ধন্যবাদ লেখককে এত সুন্দর বইটি পাঠকদের উপহার দেওয়ার জন্য।




লেখিকা রীনা মজুমদার-

আমাদের সাহিত্য জগতে যে সব কবি ও লেখক বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, সেখানে কবি,লেখক ও "মুজনাই সাহিত্য পত্রিকা"র সফল সম্পাদক শৌভিক রায় তাঁর অনুভূতির সৃষ্টির বই " সুরমা কলিং" বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবেই সে আশা রাখি__
বড় বিচিত্র জীবনের দাবি l সেই দাবি মেনেই লেখক তাঁর স্পর্শকাতর চাওয়া-পাওয়া কে তুলে ধরেছেন lসেই চাওয়া থেকেই লেখক তাঁর বইটিতে আঠেরো টি ছোট গল্পে জীবনের সৃষ্টিশীল সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছেন.... অসাধাররণ সব গল্প গুলি তবুও আমার কিছু গল্প "ইচ্ছেপূরণ" , "ডোরবেল", তরুণবাবুর কান", "শিল্পী", "আগুন ঝাঁপ" মন ছুঁয়ে যায়.... প্রতিটি গল্পই যে মানুষের জীবনেরই গল্প l লেখক শৌভিক ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর হয়েও মাতৃভাষার অমোঘ টানেই তাঁর অনুভূতির জগৎ কত বড়, সৎ ও আন্তরিক ,সেটাই দেখতে পাই ছোট গল্পের সংকলন " সুরমা কলিং" বইটিতেl আলোচনা, পর্যালোচনা ,সমালোচনা নয়, শুধু ভাললাগাটুকুই বললাম l সেই স্কুলের বন্ধু শৌভিক আজ উত্তরবঙ্গের পরিচিত লেখক! গর্ব তো বটেই,,, তোর কলম এগিয়ে চলুক শৌভিক.... রীনা ও তোর জন্য অনেক ভালবাসা রইল l পাঠকদের সুন্দর বইটি উপহার দেওয়ার জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা...শুভকামনা সবসময়l


কবি বিপ্লব সরকার -

বাংলা সাহিত্যে হয়তো গল্পকারের নামটা এখনো তেমন বোল্ড হয়নি। হবে কি করে? এই তো শুরু!আর তাছাড়া আপনারা অনেকেই তো এখনও পড়েননি। "সুরমা কলিং" -- ইয়েস! ইটস্ কলিং ইউ । কলকাতা বইমেলা- 2018 তে পাওয়া যাচ্ছে এই বইটি। স্টল - 54, হল - 2 । আপনারই আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো চরিত্রগুলো। অথচ আপনি হয়তো সেভাবে ধরতে পারেননি। ওরা কিছু নতুন কথা বলতে চায় আপনাকে। ঘরের ভিতর ঘর কিভাবে ছায়াঘন বন হয়ে ওঠে। কিংবা চরিত্রের ভিতর চরিত্র কিভাবে চোখের পাতায় রং ঢেলে দেয়। উপলব্ধি করতে একটু পড়ে নিন। এখানে চরিত্ররা পাতা থেকে নেমে হেঁটে যায় বহুদূর। দীর্ঘ পরিধি এঁকে সোজা এসে ঢুকে যায় লম্ব অ্যানাটমির ভিতর। আমরা দেখতে পাই কলকব্জাগুলো নড়ছে। তখনই মানব থেকে হয়ে যাই যন্ত্রমানব। অনুভব করি যান্ত্রিকতা। আসলে কিছু স্তরে স্তরে সাজানো টুকরো পারিপার্শ্বিকতা দিয়ে নতুন করে, নতুন ভাবে একটা অবক্ষয়ী সমাজকে তুলে ধরা। কিংবা, কখনও বিবর্ণ তটরেখা বরাবর রামধনু সাজিয়ে পাঠকের দু'ঠোঁট বর্ণময় করে তোলা। গল্পের টান ভারী সুন্দর। ভাষা সহজ অথচ বৈচিত্রময়তায় পূর্ন। হঠাৎ মোচড়গুলিও মন কেড়ে নেয়। আর বাকিটা তো আপনারা পড়লেই জানতে পারবেন।



লেখিকা কুমকুম ঘোষ-
"পূর্ণবাবুর বেহালা"---পৃষ্ঠা ৪২
অন্তরশুদ্ধির ধাপগুলো পেরিয়ে একজন মানুষ যদি এভাবে সুর তোলে বুকের মাঝে , --তাহলে পৃথিবিতে হিংসা- দ্বেষ - খুন- হানাহানি -যুদ্ধ-রক্তপাত কিছুই ঘটতো না। হায়! সেটা যদি হতো, --তাহলে বেয়নেটের সামনে গোলাপ ফুটে থাকতো অথবা এ-কে ফর্টিসেভেন থেকে ছুটে বের হতো রাশি রাশি প্রজাপতি।
#ম্যাজিক অথবা #মেটামরফসিস-----
রূপ থেকে রূপান্তর!!
রূপ থেকে অরূপের পথে।
রবি ঠাকুরকে ধার করে বলি--"এমন কেন সত্যি হয় না , আহা "
"পূর্ণবাবু' এরপর --দেবদূত। এই রক্ত-মাংসের সংসারে একটি কিংবা একজন অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।
দাউ দাউ চিতার আগুন রোজ প্রতিমুহূর্তে জ্বলে উঠছে কোথাও না কোথাও।
"দাউ দাউ চিতার আগুন"----শুদ্ধ হোক চিত্ত--লুপ্ত হোক হিংস্র বাসনা।
একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে এই শুভকামনা রাখলাম।
লেখক-শৌভিক রায়ের জন্য থাকলো আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ।।

নৃত্যশিল্পী সুতপা রায় -
১৮ টি বাস্তব ও কল্পনা মিলেমিশে "সুরমা কলিং" যে কোনো পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করবে। সহজ সরল ভাষায় অতি সাধারন মানুষের কথা তুলে ধরা হয়েছে। 
"আরবানের বিধবা "গল্পে হিজরা থেকে মনুষ্যত্বে উত্তরণ মনে দাগ কাটে। "কলাবতী রাজকন্য"... সমাজে মেয়েদের জীবন-যন্ত্রণার কথা ফুটে উঠেছে। খুন করাও যে একটা আর্ট হতে পারে সেটা " শিল্পী" গল্পের মাধ্যমে জানলাম। কিশোরকুমার-প্রেমী তারকের মনের গোপন প্রেম গোপনই থেকে গেলো। মিষ্টি প্রেমের ট্র্যাজিক যবনিকা "ইচ্ছাপূরণ"- এ। "সুরমা কলিং"'- এ মূকাভিনয় নিয়ে গল্প, সাফল্যে সবথেকে কাছের প্রিয়জনকে স্মরণ করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কল ও মোবাইলে ভেসে ওঠা 'সুরমা কলিং'.. এ যেন অদ্ভুত টেলিপ্যাথি। পূর্ণবাবুর মনে গোপন শিল্পী সত্বা একটা বেহালা জাগিয়ে তুললো। সুরের প্রতি ভালোবাসায় সুর সৃষ্টি, চমৎকার লাগলো। "তরুণ বাবুর কান," "রসিকার রিক্সাওয়ালা" মন ছুঁয়ে যায়। জাটিঙ্গার পাখীদের অদ্ভুত আচরণ জানা গেলো "আগুনঝাঁপ" গল্পটি থেকে। "নিশি" তে হরিপদর সব কিছু ঝেড়ে ফেলার মনোভাব ভাবিয়ে তোলে বৈকি! " তলপেট", "গরম ভাত ও বদুবুড়ি" গল্প দুটিতে মেয়েদের জীবনের নানা ঘাতপ্রতিঘাতের কাহিনী প্রকাশ হয়েছে। সবশেষে কুসংস্কারের জন্য সমাজে একজন নারী কি করে ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়ে উঠলো তা 'কবিরের দোঁহা'তে পড়ে মন খারাপ হয়ে যায়। এরকম ঘটনা একবিংশ শতাব্দীতে এখনো ঘটে! এই গল্পে উপরি পাওনা হলো কবীরের দোহাগুলি।
পরিশেষে শৌভিককে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। আগামী দিনে আরো সমৃদ্ধ হবো এই আশা রাখি।

কবি পিয়াংকী মুখার্জী - 
'সুরমা কলিং' 
ডাকছে আমায় , পড়ছি ,শেষ করলাম আজ কিন্তু একবার ও মনে হচ্ছে না শেষ হলো বলে , 
রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের মতো শেষ হইয়াও হইল না শেষ !
না , শৌভিকদার লেখার রিভিউ দেবার মতো যোগ্যতা নেই আমার তবে গর্বের সাথে বলতে পারি আমরা "মুজনাইয়া"রা সমৃদ্ধ ওনার লেখা পড়ে !
যারা পড়েননি পড়ে ফেলুন , ভাল লাগবে এই প্রতিশ্রুতিটা দিতেই পারি !
কোনো গল্পকারের সাজানো গোছানো প্লট বাগান এখানে নেই , যেটা আছে সেটা প্রাত্যহিক জীবনের থেকে নেওয়া কিছু ভগ্নাংশ মূহুর্ত ! তারাই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কথা বলবে জীবন্ত হয়ে আপনার সাথে !
প্রথম গল্প #আরাবানের_বিধবা তে বিধবা স্ত্রী বলছেন বইটির প্রথম লাইনে "এই এখুনি বিধবা হলাম আমি, আমার ই মতো কয়েকশ আমার ই সাথে বিধবা হয়েছে কিন্তু স্বামী আরাবান তো মৃত , তবে কী ব্যক্তি চলে গেলে স্পর্শ থেকে যায় ?" কি অসম্ভব গভীর একটা প্রশ্ন সদ্য বিধবার তার নিজের জীবিত লাশের প্রতি !!
একপাতার একটা ছোট গল্প #কলাবতী_রাজকন্যা তে তিনটে ভিন্ন দৃশ্য , শেষ প্রশ্নে আগুন যখন জিজ্ঞেস করে রাজকন্যা এখন তুমি কার ? লেখকের সুচিন্তিত মতামতে রাজকন্যা চরিত্র বলে ওঠে , "আগে ছিলাম এই পৃথিবীর এখন যে তোমার !"
সত্যিই তো জীবনের শেষ দৃশ্যে আমরা সবাই অগ্নিভ জ্বলন্ত !
#একদিন_প্রতিদিন গল্পে, মননে শিক্ষিত গৃহস্থ বাড়ির একটি মেয়ে কাজের দিদি কমলীকে নিয়ে গানের আসরে যাবার অঙ্গীকার নেয় ,যখন মায়ের স্থানে তাকে বসায় তখনই খুব সহজেই লেখকের সমাজের একপেশেমির বিরুদ্ধে গিয়ে সকলকে সমাজিক মর্যাদা দেবার মানসিকতা ফুটে ওঠে !
প্রতিটি গল্পই মন ছোঁয়া !
#ডোরবেল_তরুণবাবুরকান_পূর্ণবাবুরবেহালা যেমন একদিকে পরিবারিক সুখ দুঃখ উত্থান পতন ,জীবন স্রোতের গল্প ,
অন্যদিকে #সমাপতন পুরোনো স্মৃতির ঘরে ঢুকে আবার বাস্তবে বাঁচার সুন্দর উপস্থাপন ।
#ইচ্ছেপূরণ গল্পে স্বামী-স্ত্রীর নির্ভেজাল ভালোবাসা ফুটে উঠেছে গল্পের পরতে পরতে !
আঠেরোটি গল্প গঠিত একটা আস্ত জীবন পাওয়া যাবে বইটিতে !
সব ভাললাগার মধ্যে "কিছু বিশেষ " ভালোবাসা হয়ে ওঠে ,তেমনই আমাকে ছুঁয়ে গেছে #কবিরের দোহা #শিল্পী
শিল্পী তে আক্ষরিক অর্থ বড় ব্যঞ্জনাময় , লেখক বলছেন মৃত্যু তো একটা শিল্প , ছুরির টান দু ইঞ্চি ,ব্যস... চিচিং ফাঁক রক্তবর্ষা !
"শিল্পকে পারফেকশনে নিয়ে যেতে হয় ,আর কে না জানে পারফেক্ট বলে কিছু হয় না ", কি অপূর্ব জীবন পর্যালোচনা লেখকের , পড়ে অবাক হলাম।
কাহিনীর সারাংশ আমার মতে , মৃত্যুদাতা একজন মহান শিল্পী আর....
শিল্পীর দক্ষিণা তার পারিশ্রমিক !
কবিরের দোহায় স্বচ্ছ মানবিকতা টেনেছে আমায় চুম্বকের মতো ,কিভাবে একটা নিষ্পাপ সরল গরীব বাবার মেয়ে বিয়ের পর লাল চোখের ভয়ে সুমতি থেকে সতী মা হয়ে ওঠে, সেটা বই না পড়লে বোঝা সম্ভব নয় ।
যেখানে স্লিপ ওয়াকিং একজন পেশেন্ট মানব-জন্মের প্রতি চরম শ্লাঘায় বলে ওঠে , হায়রে মেয়ে জীবন ! ছোটবেলার কিছু স্মৃতি হ্যালুসিনেশন এর মতো করে ঘুরে বেড়ায় চারপাশে , অদৃশ্য কবির দোহার পাতা থেকে উঠে এসে জীবন্ত মহামানবের বেশে একজন ভয় ভীতু বাধ্য ভন্ড সাধুবেশিনীকে তার মনুষ্যত্ব দান করেন , দেখান শক্তি নামের আলোর রোশনাই ,কিভাবে গোটা গল্পটা এগোয় সেটা গভীরে পড়ার বিষয় !!শেষে একটাই কথা বলি শৌভিকদা তুমি লিখে যাও , আমরা সমৃদ্ধ হই , তোমার পরের বই এর অপেক্ষায় রইলাম!! একটা কথা বলতে ভুলেই যাচ্ছিলাম , শৌভিকদা ,আমার কন্যা যিনি কিনা কোন ধরনের কবিতার পাশ দিয়েও হাঁটেন না কখনও😊 , সে তোমার বইটির অনেক গল্প পড়ে ফেলেছে আবার আমি সামান্য লিখছি শুনে আমায় বলেছে তোমাকে বলতে , "#সুরমা_কলিংএর জন্য স্যারকে অনেক শ্রদ্ধা আর ধন্যবাদ " !!


কবি সম্পাদক গৌরাঙ্গ সিনহা (প্রকাশিত- জার্নাল , কোচবিহার জার্নালিস্ট ক্লাব ২০১৮)-  






সি-অফ
শৌভিক রায়

এ সি থ্রি টিয়ারে উঠে নিজের বার্থে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো প্রিয়ম। আর তাকাতেই ট্রেন হুইসিল বাজিয়ে ছেড়ে দিল।
অভ্যাস মতোই হাত তুললো প্রিয়ম। টা টা দেওয়ার জন্যই। কিন্তু হাত নাড়তে গিয়েই থেমে গেল সে। 
আজ আর জানালায় কেউ নেই।
থাকতো একসময়।
বাবা।
আর থাকে না এখন।
বাবা তো আর থাকবেও না।
পাশের বার্থের ছোট্ট ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে। প্রিয়ম বুঝতে পারছে। কিন্তু দেখতে পারছে না ছেলেটাকে।
প্রিয়মের চোখ ঝাপসা।
রঙ
শৌভিক রায়



ফাল্গুনের টান আর সেই টানেই শিমুল পলাশ মাদারের সুখবিষণ্ণ রঙ। 
ফাল্গুনের এই ভরা রোদ্দুর ঝলসে দিয়েছে গা। আশেপাশেরর গাছগুলোরও একই অবস্থা। গায়ে যেন রোদের প্রলেপ। আর এই রোদ কি যে সে রোদ! সেই নরম মিঠে মিঠে? এ যে বড্ড পুরুষালি। কঠোর। যে কোনভাবেই যখনতখন পুড়িয়ে দিতে পারে সব। পারে ছারখার করে দিতে। 
.....তবু এই রোদে পুড়তেই যেন মুখিয়ে ছিল তারা। এই রোদ-পুরুষের সান্নিধ্য না পেলে, না ঝলসালে, বর্ষার জলে পুষ্ট হওয়া যাবে না যে। এ তো ঝলসানো নয় বরং নষ্ট হওয়া...নষ্ট মেয়ের মতোই। বেহায়া, লাজহীন। গোপন কটাক্ষে আহ্বান কেবল। আর নষ্ট করবার জন্য পুরুষ তো মুখিয়েই আছে। তাই ফাগুনের রঙে সাজিয়ে নিজেকে অপেক্ষার দিন গোণা। কামুক রোদ ঝাঁপিয়ে পড়ুক তার সব পুরুষত্ব নিয়ে। পুড়িয়ে দিক,জ্বালিয়ে দিক সব।

পুড়েও যে সুখ, জ্বলেও যে সুখ। নষ্ট হতেও সত্যি সুখ। 

ফাল্গুনের টানে সবাই সান্নিধ্য চায় রোদ-পুরুষের। পুড়তে চায় সবাই। তৃণদল শুষ্ক তাই। ঝলসানো গায়ে সবুজ নেই আর। বরং রোদ-পুরুষের সাথে মিলনে লজ্জায় লাল লাল রঙ তার। নিজেদের বেহায়াপনায় নিজেরাই লাল হয়ে গেছে সব লজ্জায়। ফিসফিস কথা শুধু হাওয়ার সাথে। গোপন কথা। হাওয়াটিও তেমন। মিলনের পরই কোথা থেকে হঠাৎ হাজির। তারপর নীচু স্বরে গুণগুণ। সব শুনেটুনে হো হো হেসে হাওয়ার আবার দিকবদল অন্যের গোপন কথা শুনতে। সব দেখে রসিক কোকিল কেবল হাসে আর কু কু ডেকে জানাতে চায় কি দেখেছে কি শুনেছে। চুপ চুপ দুরন্ত পাখি। থেমে যা এখুনি। বলিস নে লজ্জার কথা, বলিস নে গোপন কথা। তবে এটাও ঠিক এই লজ্জার কথা কেউ বললে বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। গোপন কথা ঠিকই, তবে নিজেই চাই জেনে যাক সব্বাই।

ফাল্গুনের টানে সর্বনাশের সময় যেন তাই। প্রকৃতির পরতে পরতে সেই সর্বনাশের ডাক, নষ্ট হবার ডাক। এই ডাক শুনেই ঘরছাড়া আজ ঘর থেকেও। উচাটন মনে ফাল্গুনের হাতছানি আর বেহায়াপনায় নষ্ট হয়ে যাওয়া তাই। 

ফাল্গুনের টানে খড়ি ওঠা চামরায় তেল মাখলে যা একটু সুখ। ঘরের ভেতর আরাম। হালকা ঘামে কপাল ভেজে। দুপুরবেলার তিস্তা-তোর্ষা-মানসাই-মুজনাইয়ের চর সাদা মরুভূমি যেন। কোথায় জল আর কোথায় বালি ঠাহর করাই মুশকিল। 
হঠাৎ হাওয়ায় বালি ওড়ে, যেন মরুঝড়। পাগল পাগল চারধার। চোখ কুঁচকে দেখতে হয় কোনটা কি। মাঠ-ফাঠ সব ন্যাড়া। 
তবু ন্যাড়া মাঠের কোথাও কোথাও উচ্ছে আর করলার চাষ। মাটিতে শুয়ে থাকা গাছগুলোতে হলুদ হলুদ ফুল,ছোট ছোট। সজনে গাছে সজনে দোলে দে দোল দে দোল। ফুল এসেছে তাতে.... সাদা। ঠিক যেন বরফকুচি। চারদিকে শিমুল, পলাশ আর মাদারের গাছ। সব লালে লাল। ধূসর ল্যান্ডস্কেপে ন্যাড়া প্রকৃতিতে লাল, হলুদ, সাদার মিশেলে এক অদ্ভুত রঙবাহার!

 জীবন মানেই রঙ যে! আর সে রঙের কি বাহার। লাল, নীল, সবুজ, হলুদে হৈ হৈ এক দশা যেন। সাথে যোগ হচ্ছে হঠাৎ মাখিয়ে দেওয়া আবির রঙা লাজ-শরমের রঙ। 
রঙ তো সবদিকেই। রঙের টানেই দুনিয়াদারি। রঙবিলাসী জীবন আর জীবনের বিলাস রঙেই। সুখের রঙ, তীব্র চাহিদার রঙ যদি হয় লাল, হলুদ তবে পিছিয়ে কোথায়! সুখকে, চাহিদাকে মঙ্গল চিহ্নে ঢেকে দিতে হলুদ তাই বারবার। লাল হলুদে মিশেই যেন সৃষ্টি হয় সৃজনের রঙ- সবুজ। আবার সেই সৃষ্টি ধাবিত নীলের দিকে। নীল যে স্বয়ং বেহায়া কানুর রঙ। নীলে মজেই তো রাধার সেই আলুথালু ভাব। সেই নীলকে কন্ঠে ধারণ করেই তো কেউ হয়ে যান নীলকন্ঠ! 

অন্যদিকে জীবনের সাদা-কালোকে ছুঁয়ে থাকে কতই না ঘাতপ্রতিঘাত!  যদি ওড়াই শান্তির সাদা পতাকা, তবে প্রতিবাদে তুলে নিই রঙ এক কালো, সেই শান্তিভঙ্গকারীর জন্য। রঙের খেলায় জীবন তাই কখনো আশমানি তো সহসা বেগুনি, কখনো আবার কমলা! 

রঙেই বাঁচা, পুড়ে খাক হয়ে যাওয়াও সেই ভয়ঙ্কর সুন্দর আগুন রঙে অথবা মিশে যাওয়া মেটে রঙা পৃথিবীর মাটির সাথে।

পুড়ে খাক হয়েও বা মাটিতে মিশে গিয়েও বেঁচে ওঠা হয়তো আবার...

রঙের নেশায় মাততে।

বারবার।

(প্রকাশিত- ELIXIR, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় )
দহনবেলায়
শৌভিক রায়

এই টানের সময়ে আদাড়ে-বাদাড়ে ঘোরাঘুরি দিনভর। গাজনের দিন। ঢাক বাজে পাগলপারা। ক্ষ্যাপা চৈত্রের খা খা রোদে, শুকনো বাতাসে, শিমূলের তুলো ঝিম ধরা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে যায়। 

লাল শালুর ধুতি আর উড়নি পরণে ক্ষ্যাপা তার চ্যালাকে নিয়ে ধুলো উড়িয়ে চলতে থাকে গাঁয়ের পর গাঁ। পথচলতি হঠাৎ বসে পড়া ধুলো ভরা পথে। লাল থলি থেকে অনায়াসেই বেরিয়ে আসে কল্কে। শুকনো শরীরে শুকনো নেশায় লাল হয়ে ওঠে চোখ অচিরেই চারদিকে ফুটে থাকা শিমূল, পলাশ আর মাদারের মতোই। হলুদ ছাতিমের গন্ধে টৈ টৈ নেশা ছড়িয়ে পড়ে যেন মনময়। নিজেকে মনে হয় রাজা-বাদশা। কেবল ঠোঁট চড়চড়, চড়চড় গলা। টাকরা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ। তবু চলা নেশার ঘোরেই। হঠাৎ দেখা হয়ে যায় আলগোখরোর সাথে। বিরাট শরীরটা টেনে টেনে আলের এপার থেকে ওপারে যায় সে। গর্বিত গ্রীবা সামান্য হেলিয়ে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি দিয়ে চলে যায় সে নিজ পথে। অপূর্ব সহাবস্থান যেন! যাও তুমি তোমার মত, আমি চলি আমার পথে। 
কিন্তু কে না জানে সর্বনাশা এই চৈত্রে এই চলা যেন সত্যিই সর্বনাশের দিকে....যদিও সর্বনাশ হয়ে গেছে বহু আগেই।
জল নেই। কেবল ছোট ছোট পাহাড় থেকে নামা স্রোতা আর ঝর্ণাতে হালকা রেখা। শীতের সেই জমাট বরফ এখনো তিরতিরে জলের উৎস। অনায়াসে পেরিয়ে যায় পশুর দল।মাথা উঁচু করে থাকা বড় পাথরগুলোতে শ্যাওলার ছোপ বোধহয় এই জীবনে ছাড়বে না। পা রাখলে পিছলে যায়। ঠান্ডা জলে তবু গা ভেজাতে ভালো লাগে এই চৈত্রের রোদে।

 ক্ষ্যাপা সাধু জলে নামে তাই। আচমন করে। বিড়বিড় জপে মন্ত্র। এ যেন নদীকে বাঁধার কোন এক গুহ্য কথা। অবশেষে অবগাহন। অবগাহনে জেগে ওঠে শরীর। আরে ক্ষেপীকেও তো বাঁধতে হয় মন্ত্রে। তারপর অবগাহনে হতে হয় শুদ্ধ। কে না জানে নারী হল নদী। চিরবহতা। বাঁধা পড়ে না এমনি এমনি। বাঁধতে হয় জীবনের মন্ত্রে, ভালবাসার মন্ত্রে। তবেই না অবগাহনে সায় দেবে সে! আর অবগাহন মানেই তো সৃজন। অবগাহন ব্যতিত সৃজন কোথায়! সৃজন না হলে কে কার! কোথায় থাকবে পাগলপারা এই সে চলা, কোথায় থাকবে নিত্য কুটুম আর মন্ত্রশুদ্ধি। ক্ষ্যাপা সাধু নিজেই খলখল হাসে। বড় রসিক ওহে ওপরওয়ালা তুমি। দেহ দিলে, কাম দিলে, সৃজন দিলে। দিলে, তবে সবটা নয়, সুতো রেখে দিলে নিজের হাতে। যেদিন টান পড়বে সেই সুতোয় চারদিক ঠিক থাকবে ঠিকই, ঠিক থাকবে শরীরটাও, থাকবে না কেবল প্রাণবায়ু। ফুড়ুত উড়ে পালাবে সে। ফিক ফিক হেসে ক্ষ্যাপা তাই গান ধরে- 'কি এক অচিন পাখি পুষলাম আমি খাঁচায়...।'

কচি পাতা আসছে গাছগুলোতে। লক্ষ্য করলে বোঝা যায়। ক'দিন পরেই নামবে বৃষ্টি। নববারিধারায় পুষ্ট হবে সবুজ পাতার দল।হালকা ধুলোর পরত তাই যায়নি এখনো। নিজের রঙ হারিয়ে ফেলা গাছগুলোতে কচি পাতার উঁকিঝুঁকি  অদ্ভুত রঙ এনেছে গাছে।কিছু গাছের ছাল উঠে গিয়ে নতুন ছালের আবরণ। সেরকম পুরু নয় এখনো, রোদ আর বাতাসের ছোঁওয়ায় এখনো কর্কশ হয়নি তেমন। বড় গাছের কোটরে উঁকি দেয় ছোট ছোট পাখির ছানা, উড়তে শেখেনি। ক'দিন পরই মা-পাখি শেখাবে ওড়া। তারপর ওড়াউড়ি সারাদিন, এ ডাল, সে ডাল। ঠিক তার মত। সেই যে কবে বাপ-মা মুখে অন্ন দিল, পুষ্ট করলো শরীর আর সে হয়ে গেল নিজস্বচারী! তারপর তো এই ডাল সেই ডাল ঠিক পক্ষীশাবকের মত। ক্রমে হৃষ্টপুষ্ট হলে নিজের মত দুনিয়াদারি। কে কার এই দুনিয়ায়! জন্মেই যখন হাত নেই কারো তখন কি আর কর্মে হাত থাকে! তবু কর্ম করতে হয়। কখনো ধরতে হয় ভেক। কখনো ছুটে ফিরতে হয় এক অমোঘ টানে।

উজ্জ্বল দিন। সূর্যের লম্বকিরণ শরীরের ভেতর চলে যায় যেন। শুষে নেয় সবকিছু। নাড়া দেয় অন্তরে। ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া রক্ত টগবগ করে। ভাঙতে যায় সবকিছু। ভেঙে চুরমার করে গড়তে চায় আবার নতুন উদ্দ্যমে। ভাঙা যায় না। একজীবনে ভাঙা যায়না কিছুই।
 
প্রকৃতি ভাঙে, প্রকৃতি গড়ে।কচিপাতায় ভরিয়ে গা গাছেরাও ভাঙচুর করে নিজেদের। নদী ভাঙে নিজেকে আবার গড়তে নতুন করে।

মানুষ ভাঙে। 
ভাঙতেই থাকে। গড়তে পারেনা কিছুই আর। ভাঙা মনের মানুষ অর্থনীতির সোপান বেয়ে গড়তে পারে বিরাট সাম্রাজ্য। 
কিন্তু গড়তে পারে কি নিজের মনকে আবার?
উত্তর নেই। জানে না ক্ষ্যাপা। বোধহয় কেউই জানে না। সর্বনাশা চৈত্রও জানে না।

ক্ষ্যাপা তাই হেঁটেই চলে। চৈত্র দহনে এক তপ্ত বুক নিয়ে ক্ষ্যাপা চলতেই থাকে, চলতেই থাকে.......

(প্রকাশিত- কবিতা করিডোর )
বৈষম্য
শৌভিক রায়

              সিট বেল্ট বেঁধে মাথাটাকে চিতিয়ে দিতেই অরিত্রর চোখ গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এয়ার হোস্টেসের দিকে। মুহূর্তেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল অরিত্রর।
             আমস্টারডাম থেকে দিল্লী অবধি পুরো রাস্তাটা ঘুমোবে বলে ভেবেছিল অরিত্র। মনটাও চাঙা হয়ে রয়েছে। লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে তার বক্তব্য এই কনফারেন্সে বিপুল প্রশংসা পেয়েছে। নারীর অধিকার রক্ষায় যেভাবে সে সোচ্চার হয়েছে তাতে অন্য দেশের প্রতিনিধিরা সাবাস জানিয়েছে, বিশেষ করে মহিলারা। কিন্তু এয়ার হোস্টেস মেয়েটাকে দেখে তার এতক্ষণের মানসিক স্থৈর্যটা ভেঙে গেল।


************************************************************************
                  দিল্লীতে নামবার আগে সাহস করে মেয়েটাকে তার নাম জিজ্ঞেস করতেই পরিষ্কার হয়ে গেল সব। ঠিকই ধরেছিল সে। প্রতিভা তবে প্রতিশোধটা নিয়েইছে। মেয়েকে এয়ার হোস্টেস বানিয়ে ছেড়েছে। এই এয়ার হোস্টেস হওয়া নিয়েই অরিত্রর সাথে সমস্যা শুরু। মেয়েদের আবার কিসের চাকরির দরকার! তার একার উপার্জন কি যথেষ্ট নয়? এই ছিল অরিত্রর যুক্তি। বিরোধটা তিক্ততার আকার নেবার আগেই দু'জনে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। স্বভাবমতো প্রতিভা জানায়ও নি যে অরিত্রর সন্তান তার গর্ভে।
                মিমোসা খুব গর্ব নিয়ে মায়ের নাম বলেছে তাকে। বাবার নামটাও জানিয়েছে। জানিয়েছে বাবা মা আলাদা থাকেন। সরকারী আমলা এ চ্যাটার্জীকে সে ছবিতে দেখেছে বহুবার। এ চ্যাটার্জীর কাজের খবর রাখে মিমোসা। আমস্টারডামে পেপারেই পড়েছে ডঃ চ্যাটার্জীর ভাষণের কথা। ভারতীয় হিসেবে সে ডঃ চ্যাটার্জীর জন্য গর্বিত।
                ......না সে তার বাবা অরিত্র চ্যাটার্জীকে চেনে না। দেখে নি কোনদিন।


(প্রকাশিত- এক মুঠো রোদ ) 

Friday, March 30, 2018

তিনি যীশু, তিনি ঈশা
শৌভিক রায়
খ্রীষ্টমাস কি ও কেন নিয়ে একটি লেখায় মাস তিনেক আগে বলেছিলাম যীশুখ্রীষ্টের মৃত্যু ও কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য নিয়ে জানাবো একদিন। 
আজ গুড ফ্রাইডে। আজকের দিনে এই লেখাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলেই মনে হয়। তবে বিষয়টি বিতর্কিত। এই মতকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। কাউকে কাউকে মিথ্যুক অপবাদ দেওয়া হয়েছে। আবার এমন কিছু নাম এই মতের সাথে জড়িয়ে যে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করতেও মন দ্বিধাগ্রস্ত হয়।
শুরুটা করি কাশ্মীর নিয়ে। অনেকেই কাশ্মীরে বেড়াতে গেছেন। শ্রীনগরও বেড়িয়ে এসেছেন। শ্রীনগরের রোজাবল বা রাউজাবল (Rauzabal) মসজিদ দেখেছেন কি? যদি দেখে থাকেন তবে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন কাশ্মীরের অন্যান্য স্মৃতিসৌধের মত বৌদ্ধ বা ইসলামি স্থাপত্যের কোন ছাপ নেই। কেবল জালির ওপর হিব্রু ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি যার পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি।
রোজাবল মসজিদের কথায় আবার পরে আসব। এবার বলি যীশুর কথা। যীশুর জীবন খুব ভাল করে অধ্যয়ণ করলে দেখবেন যে তাঁর জীবনের চোদ্দ বছর থেকে আটাশ বছরের কোন ঘটনাক্রম জানা যায় না। আটাশ-উনত্রিশ বছর বয়সী যীশুকে আমরা দেখি মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর সহনশীলতার বাণী প্রচার করতে। এখানেও খটকা একটি। Old Testament কিন্তু 'চোখের বদলে চোখ বা দাঁতের বদলে দাঁত' এই নীতিতেই বিশ্বাসী। New Testament সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটে প্রেম-ভালবাসা-সহনশীলতা-ক্ষমার বাণীকেই তুলে ধরেছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এই মতবাদ কিন্তু যীশুর আগে কোনভাবেই দেখা যায় না। তাহলে প্রশ্নটা এখানেই জাগে যে কিভাবে যীশু এই মতাদর্শে নিজেকে সমৃদ্ধ করলেন? এই মতাদর্শ তো আর্যাবর্তের। এখানে তাঁর জন্মের অন্ততঃ পাঁচশো বছর আগে জন্মেছেন তথাগত বুদ্ধ। রাম, কৃষ্ণ...এরকম যাঁরাই আর্যাবর্তের মানুষ তাঁদের প্রত্যেকেই এই কথাই বলে গেছেন। মধ্য-প্রাচ্যের যীশু সেই মতাদর্শে কিভাবে নিজিকে দীক্ষিত করলেন? এখান থেকেই আসছে সেই বিখ্যাত (যা অস্বীকার করা হচ্ছে মিথ্যে বলে) তথ্য। কিন্তু তথ্যটা কি? একদমই সোজা এবং ঠিকই ভাবছেন।
হ্যাঁ যীশু অধ্যয়ন করেন ভারতবর্ষে।
মনে করা হচ্ছে, ইসরায়েলের নিয়ম অনুযায়ী চোদ্দ বছর বয়সে যীশুর বিবাহ স্থির হলে তিনি জেরুজালেম থেকে বাগদাদে আসেন। সম্ভবতঃ বণিকদের দলে ভিড়ে হামাদান, তেহেরান, মাশাহাদ হয়ে আফগানিস্তানের হেরাতে পৌঁছান। খাইবার পাস পার করে কাবুল নদী ধরে আটক এবং সিন্ধু নদের সঙ্গ ধরে গিলগিট, স্কার্দু হয়ে লে তে আসাটা কেবল ছিল সময়ের অপেক্ষা। মনে রাখতে হবে এটাই কমবেশী সেই বিখ্যাত সিল্করুট যে পথে আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেন। তাই এই পথ আলেকজান্ডারের পরে জন্ম নেওয়া যীশু জানবেন না তা নাও হতে পারে। লে কার্গিল হয়ে জোজিলা গিরিবর্ত পেরোলেই তো সুজলাসুফলা ভারতের প্রথম গাঁ- পহেলা গাঁও- পহেলগাঁও। তারপরেই তো শ্রীনগর।
কিন্তু ভারতে আসার কারণটা কি যীশুর? কারণ জ্ঞানার্জন। ভারত তখন শিক্ষায় সংস্কৃতিতে সুবর্ণ যুগে প্রবেশ করেছে। ভারতের বিপুল সম্পদের মতই ঈর্ষণীয় তার মেধাশক্তি অধ্যাত্মিক শক্তি। যীশুর মত প্রাজ্ঞ মানুষ তাতে আকৃষ্ট হবেন এ আর নতুন কথা কি!
লে তে যীশু আশ্রয় নেন বিখ্যাত হেমিস গুম্ফায়। শুরু হয় তাঁর শিক্ষা গ্রহণ। আরও বলা হচ্ছে যে হেমিস গুম্ফায় পাঠ শেষে তিনি আর্যাবর্তের নানা স্থান এমনকি পুরী, বারানসী, কপিলাবস্তুতেও গেছিলেন, শিক্ষালাভ করেছিলেন এসব জায়গাতেও। কপিলাবস্তুতে পালি ভাষা শিখে বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়ণ করেন। নেপাল ও হিমালয় ভ্রমণ করে পারস্য হয়ে তিনি ফিরে যান অবশেষে নিজের দেশে এবং প্রচার করতে শুরু করেন তাঁর নিজস্ব ধর্মমত। মনে রাখতে হবে মানুষ ধর্ম নিয়ে জন্মায় না। ধর্ম শব্দটির আক্ষরিক অর্থ আমরা যা ধারণ করি তাই-ই।
এখন যীশুর জীবনের এই কথার ভিত্তি কি? রাশিয়ান লেখক ডঃ নিকোলাস নটোভিচ 1894 সালে তাঁর The Unknown Life of Jesus Christ বইটিতে প্রথম এই দাবী তোলেন। তাঁর দাবী 1887 সালে লাদাখ ভ্রমণের সময় হেমিস গুম্ফার নাম শুনে তিনি হেমিসে যাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু পা ভেঙে তাঁকে পৌঁছতে হয় সেখানে। দেড়মাস তাঁকে থাকতে হয় হেমিসে এবং যে লামা তাঁকে সেবা করছিলেন তিনিই তাঁকে তিব্বতী ভাষায় রচিত একটি পুঁথি দেখান। মূল পুঁথিটি পালিভাষায় রচিত ও পোতলা প্রাসাদের কাছে মারবুর মঠে রক্ষিত। নটোভিচ দোভাষীর সাহায্যে সেই অনুবাদিত তিব্বতী পুঁথিকে অনুবাদ করেন এবং স্তম্ভিত হন যে পুঁথিটিতে যীশুর ভারতে আসা, তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি বর্ণিত। নটোভিচ এরপর দেশে ফেরেন ও ফরাসীতে একটি বই প্রকাশ করেন যার ইংরেজিতে অনুবাদ করেন অ্যালেক্সিনা লোরেঞ্জা। নটোভিচের এই দাবীকে নস্যাৎ করা হয়। হেমিস গুমফার মঠাধ্যক্ষও কোন বিদেশীর আগমন অস্বীকার করেন। কিন্তু অনেকেই জানান যে নটোভিচ সেসময় লাদাখে ছিলেন। নটোভিচের বইটি পড়ে স্বামী অভেদানন্দ আকৃষ্ট হন। 1921 সালে আমেরিকা থেকে ভারতে ফিরে তিনি লাদাখে যান। স্বামী অভেদানন্দও সেই পুঁথিটি দেখেন এবং পড়েন। চোদ্দটি পরিচ্ছেদ ও দুশোচুয়াল্লিশ শ্লোকযুক্ত সেই পুঁথিটিতে যীশুর জীবন বিদ্ধৃত। কিন্তু পরবর্তীতে এই পুঁথিও আর পাওয়া যায় না যখন কাশ্মীর সরকার হেমিস গুম্ফার সব পুঁথি অধিগ্রহণ করেন। সাহিত্যিক প্রবোধকুমার স্যান্যালও এই পুঁথির খোঁজ করেন। তাঁকে জানানো হয় এই কথা। মূল পুঁথিটি যা পালিভাষায় লেখা তা হয়তো আজও মারবুর মঠে রক্ষিত। ডঃ নটোভিচকে প্রতারক আখ্যা দেওয়া হয়। যদি মেনেও নেই তিনি মিথ্যে বলেছেন কিন্তু স্বামী অভেদানন্দ বা প্রবোধকুমার স্যান্যালকে সেরকম স্বপ্নেও ভাবতে পারি না।
মানুন না মানুন ভাবনা একটা আসেই। প্রশ্নও আসে তবে সত্যিই কি যীশু ভারতে এসেছিলেন? অধ্যয়ণ করেছিলেন? অনেক রহস্যময় ব্যাপারের মতই এই প্রশ্নটিও বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কুয়াশায় ঢাকা থাকবে। আর আমার লেখার উদ্দেশ্য কোন ধর্মীয় ভাবাবেগকে আঘাত করা নয়। ইতিহাস যেভাবে বিবৃত হয়েছে তাকেই স্মরণ করা। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি সব ধর্মেরই মূল কথা হল মানুষকে ভালবাসা।
কিন্তু লেখার শুরুতেই রোজাবলের কথা কেন বললাম? যীশুর সাথে তার কি সম্পর্ক? সম্পর্ক এটাই যে অনেকে বিশ্বাস করেন রোজাবল হল ঈশ্বরপুত্র যীশুর সমাধি। না, চমকানোর কিছু নেই। ব্যাখ্যা করা যাক।
ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মৃত্যু যে হয় নি তার স্বপক্ষে একটা বড় প্রমাণ প্রায় তৃতীয় শতক পর্যন্ত খ্রীষ্টান সমাজে যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ দেখাবার রীতি চালু হয় নি। আরও পরে সম্ভবতঃ সহানুভূতি আদায়ের জন্যই এই রীতি চালু হয়। বাইবেল বা প্রাচীন হিব্রু গ্রন্থও বলছে মেরে ফেলার জন্য ক্রুশবিদ্ধ করা হত না। উদ্দেশ্য ছিল চরম যন্ত্রণা দেওয়া। তিন-চারদিন ঝুলিয়ে রাখলে এমনিতেই রক্তক্ষরণ ও অপুষ্টিতে মারা যেত ক্রুশে ঝুলছে যে। ক্রুশ থেকে নামিয়ে চিকিৎসা করালে বাঁচার সুযোগ থাকত। এখন যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয় শুক্রবারে এবং দুপুরে। শনিবার ইহুদিদের পবিত্র সাবাথ ডে। পানভোজন আমোদপ্রমোদ বন্ধ। তাই সন্ধ্যে নাগাদ অর্থাৎ ঘন্টা তিনেক পরেই তাঁকে নামানো হয়। মাথা ঝুলে পড়া যীশুকে পানভোজনের তাগিদে তাড়া থাকায় তাড়াতাড়ি মৃত ভাবা হয় যখন ক্রুশ থেকে নামিয়ে যীশুর পায়ে খোঁচানো হয় বল্লম দিয়ে এবং যীশু অজ্ঞান হয়ে যান। যীশুর বন্ধুরা তাঁকে ধরাধরি করে নিয়ে যান তাঁর শিষ্য জোসেফ আরিমাথিয়ার বাড়ি। জোসেফ রোমান গভর্ণর পন্টিয়াস পাইলটের সাথে দেখা করে যীশুকে নিজের বাড়িতে সমাধিস্থ করার অনুমতি পান। খোঁড়া হল কবর তিনদিন ধরে। ওদিকে চলল যীশুর চিকিৎসা। তিনদিন পর সবার সামনে যীশুকে রেখে কবরের মুখ বন্ধ করা হল। আসলে কবরটি ছিল একটি সুড়ঙ্গ যার সাথে যোগ ছিল অন্য একটি ঘরের যেখান দিয়ে আবার বাইরে যাওয়া যেত। যীশু সে পথেই পালালেন। মা মেরীর সাথে দেখাও করলেন। প্যালেস্তাইনে তাঁর কবর খালি পাওয়া গেল। জোসেফকে বন্দী করা হল। রেজারেকশন বা পুনঃ আবির্ভাবের কথা বিশ্বাস করল না শাসকেরা। জেরুজালেম থেকে দেড়শ মাইল দূরে প্রাণভয়ে শঙ্কিত যীশু গ্যালিলিতে দেখা করলেন শিষ্যদের সাথে। তাঁর এই দেখা করার কথা রটে যেতেই যীশু আবার লুকিয়ে পড়লেন। পাহাড়ী পথে পৌঁছলেন মাউন্ট অফ অলিভস-এ। বললেন কথা তাঁর শিষ্যদের কথা- Whither I go you cannot come. নীচে দাঁড়ানো শিষ্যরা দেখল মেঘ এসে ঘিরে ধরল তাঁকে আর মেঘ সরতেই তিনি নেই।
এই ঘটনা শিষ্য ও লোকমুখে যীশুর স্বর্গারোহণে পরিণত হলেও যীশু আবার ধরলেন পথ সেই আর্যাবর্তের যেখানে হেমিস গুম্ফায় কেটেছে তাঁর অনেকদিন। কেননা নিজ বাল্যভূমি নাজারেথ, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়ায় তিনি নিরাপদ বোধ করলেন না। বরং ছিল প্রাণভয়। পাল্টালেন নাম। নতুন নাম হল তাঁর- ইউজা আসফ। লাদাখে এসেও তিনি নিরাপদ বোধ করেন নি। চলে এলেন কাশ্মীরে রাজা গোপাদত্তের সুশাসনের রাজ্যে। তাঁর প্রজ্ঞা, জ্ঞান, পান্ডিত্যে রাজা প্রজা সবাই মুগ্ধ হলেন অচিরেই। রয়ে গেলেন তিনি এদেশেই। গোপাদত্তের আমলের ইউজা আসফ যে প্যালেস্তাইন থেকে এসেছিলেন সে কথা পুষ্ট করেছেন কাশ্মীরের প্রথম ঐতিহাসিক মোল্লা নাদিরি। নাসিরি দাবী করেন কোন এক কাশ্মিরী গ্রন্থে তিনি পেয়েছেন ইউজা আসফই আসলে হজরত ইসা বা জেসা বা যীশু। এমনকি শ্রীনগরের শঙ্করাচার্য মন্দিরের গম্বুজের ফাটল নির্মাণকালে পারস্যের স্থপতি সুলাইমান যে লিপি উৎকীর্ণ করেন তার পাঠোদ্ধার করলে দেখা যায় তাতে স্পষ্ট লেখা- ইউজা আসফ হলেন জেসাস। ইউজা আসফের শিষ্যরা নিজেদের নাথযোগী বলতেন। ইউজা আসফ তাদের কাছে ঈশা। 'ঈশ' শব্দটির অর্থ শিব। প্যালেস্টাইনে তখন শৈবধর্মের প্রচলন ছিল। মনে করা হয় ক্রুশবিদ্ধ হয়ে ভারতে এসে যীশু তাঁর ধর্মমতে ভারতীয় ঐতিহ্যকে স্থান দিয়েছিলেন, ফলে তাঁর প্রবর্তিত এই নবধর্মমতের সাথে হিন্দু বা বৌদ্ধধর্মের সংঘাত হয় নি। বরং প্রচুর মানুষ নাথযোগী সম্প্রদায়ভুক্ত হন সেসময়। দীর্ঘদিন কাশ্মীরে কাটিয়ে ইউজা আসফ (নাকি যীশু?) শ্রীনগরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ও সমাধিস্থ হন রোজাবলে। তাই অনেকে আজও বিশ্বাস করে রোজাবল হল যীশুর সমাধি।
ইতিহাসের এ এক অদ্ভুত তথ্য। এর সত্য-মিথ্যা আমার জানা নেই। জানার চেষ্টাও আমার নেই। সে কাজ ঐতিহাসিকের। আমি এটুকুই জানি মানুষের বিশ্বাসের ওপর আর কিছু হতে পারে না। যিনি বিশ্বাস করেন তিনিও স্বাগত, যিনি করেন না তিনিও স্বাগত।
কারো জীবন নয়, তাঁর কর্ম, তাঁর প্রদর্শিত পথই (যদি তা অনুসরণ করার মত হয়) আমাদের মনে রাখা দরকার।
ঈশ্বরপুত্র যীশু দেখিয়েছিলেন অমৃতের পথ। নিজের জীবন দিয়ে শিখিয়েছিলেন প্রেমের কথা। অনুসৃত হক তাঁর ও তাঁর মত মহামানবদের দেখানো পথ অস্থির এই সময়ে, অসম্প্রীতির এই বিশ্বে।