আমার সরস্বতী পুজোর সেকাল আর একাল
শৌভিক রায়
শৌভিক রায়
মাঠের এক কোণায় দাঁড়িয়ে দাদাটা। আমি লক্ষ্য করেছিলাম অনেক আগেই। কিন্তু আবাল্য সেই বাজে অভ্যেস...আগ বাড়িয়ে কথা বলবো না! বলিও নি। আমাদের মধ্যেই কে যেন ডেকে নিল মাঠে। ফালাকাটায় নতুন এসেছে, বাড়ি কলকাতায়। ফালাকাটায় দিদি জামাইবাবুর কাছে থাকবে। শালাবাবু আসবে সে আর নতুন কি! কিন্তু শালাবাবু যখন তার মানে বেশীদিনের অতিথি নয়। পরিচয় পর্ব মিটে গেলে জানলাম নাম হ'ল কার্তিক। ফুটবলে বেশ ভাল স্কিল। অচিরেই অসমবয়সী বন্ধুত্ব পোক্ত হয়ে গেল। এটাও আবাল্য আমার বাজে অভ্যেস। বড়দের সাথে বন্ধুত্ব আর কি। তবে খুব কিছু বড় নয়। মাত্রই দু বছরের। কলকাতার ছেলে বলে সমীহ একটা ছিলই মনে মনে। কলকাতা তো আমাদের কাছে স্বপ্নের শহর সে সময়। ওখানে যারা থাকেন তারা সবেতেই যেন আমাদের চেয়ে বেশী পারদর্শী। আর এ ছেলে তো স্কিলড ফুটবলার। হেডমাস্টারের ছেলে বলে আমাকেই সে চেপে ধরলো হাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে। বিস্মিত হলাম। দিদি জামাইবাবুর বাড়িতে লোকে বেড়াতে আসে এটাই জানি, এ তো এখানে থাকতে চাইছে। প্রণব, পুটন, বাপি চুপিচুপি খবর আনল ছেলেটি খুব গরীব। তাই বাবা মায়ের কাছ থেকে এখানে চলে এসেছে দিদির সংসারে। বিস্ময়ের পারদ চড়ল বৈ কি! কলকাতাতেও গরীব লোক আছে তবে! এতটা গরীব যে কলকাতা ছাড়তে হয়!! বয়সটাই তখন আসলে বিস্মিত হওয়ার। তাই বিস্ময়ের ঘোর নিয়ে বাবার কাছে আবেদনটা করেই ফেললাম। রাশভারী বাবা নামক ভদ্রলোক কিন্তু সাথে সাথেই আবেদন মঞ্জুর করলেন না। রীতিমত ইন্টারভিউ নিয়ে ভর্তি হতে হল কার্তিকদাকে ক্লাস নাইনে। হ্যাঁ কার্তিকদা নাম ছিল তার। সরস্বতী পুজো সেবার দেরীতে। স্পোর্টস আগে। সে সময়ের হাই স্কুলের স্পোর্টস মানে মেলা। ফালাকাটার মতো ছোট্ট শহরে গৌরী টকিজ ছাড়া আমোদপ্রমোদের কি-ই বা ছিল! তাও ছবি যা আসতো তা সেই হীরেমানিক, সুনয়নী গোছের। হিন্দিও আসতো, তবে কম। যাকগে সে অন্য কথা। তা ওই স্পোর্টসে কার্তিকদা অভিনব পন্থায় হাইজাম্প দিয়ে মন জয় করে নিল আরও। ব্যাপারটা কিছুই না, কোণাকুণি না দৌড়ে সোজা এসে বার ক্রস করা। এটা ফালাকাটায় প্রথম দেখালো কার্তিকদা। আমারও কার্তিকদায় মজে যেতে সময় লাগল না বিশেষ।
ধান ভানতে শিবের গীত মনে হচ্ছে? আসলে এটুকু না বললে বলাটা পুরো হবে না আমার। যাহক সেবার, আমি তখন ক্লাস সেভেন, কার্তিকদা প্রস্তাব দিল সরস্বতী পুজো করবার। অভিনব ব্যাপার। পুজো বাড়িতে হয়, স্কুলে হয়। গার্লস স্কুলেও হয়। আমরা নষ্টিফস্টির ধান্দা নিয়ে গিয়ে বড়দিমণি মায়াপিসীকে (বাবা হাই স্কুলের হেডমাস্টার, সেই সূত্রে গার্লস হাই স্কুলের হেডমিস্ট্রেস আমার পিসী আর কি) দেখে পালাই! পুজোর আগে কাশীকুল খাই আর দুরু দুরু বুকে সারা বছর কাটাই যে এবার নির্ঘাৎ ফেল করবো! পুজোর দিন দুটিতে হাই স্কুলে অ্যানুয়াল ফাংশনে অংশ নিই, নাটক করি, এগজিবিশনে পার্টিসিপেট করি। এই অবধি ঠিক ছিল। কিন্তু পুজো! করি নি তো কোনদিন। ব্যাপারটা আক্ষরিক অর্থেই অভিনব আমার কাছে। আবার আবেদন বাবার কাছে। একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি। বাবা আমাকে কোনদিন কোন কিছুতেই আটকান নি, তা সে মাধ্যমিক দিয়ে সান্দাকফু ট্রেকে চলে যাওয়াই হক বা উচ্চ মাধ্যমিকের পর কমলদের চা বাগানে তেজপুরের কাছে মাজবাটে যাওয়াআ হক বা নিজের মত ডুয়ার্স চষে বেড়ানোতেই হক! বাবা কি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন আমাকে নাকি আমার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন এটা আজও প্রশ্ন আমার কাছে!
যথারীতি এবারও আটকালেন না। এক পাহাড় উদ্যমে চলল আমাদের কাজ। প্রথম বলি জহর স্যার। পাঁচটাকা চাঁদা দিলেন। সেই সময়ে বিরাট ব্যাপার। একে একে পন্ডিতকাকু, হরকাকু, প্রমথকাকু, চন্ডীস্যার প্রমুখের বধ হলেন। কার্তিকদা নিজেই খুঁটি গেড়ে ত্রিপল টানিয়ে মন্ডপ বানালো। বাঁশের কঞ্চি বেঁকিয়ে ধনুকের মতো করে কালো কাগজ লাগানো হল। সরু সরু পেরেক নির্দিষ্ট গ্যাপে আটকে ওপর নীচে সাদা সুতো আটকে আটকে দিব্যি ডেকরেশন হল। প্রতিমার দাম বোধহয় কুড়ি-পঁচিশ টাকা ছিল। পন্ডিতকাকু আমাদের বাড়ির পুজো সেরে এই প্রতিমার পুজো করে দিলেন। কার্তিকদারা বামুন। কার্তিকদার দিদি, রূপে লক্ষ্মী, সরস্বতী পুজোর বাকি কাজ করে দিলেন। চোখের সামনে দিব্যি পুজোটা উতরে গেল। আবিষ্কার করলাম আমরাও আয়োজন করতে পারি। আর একই সাথে এটাও আবিষ্কার করলাম যে কার্তিকদা বিড়ি খায়।
সরস্বতী পুজোর সন্ধ্যে বা রাতে লুকিয়ে ধূমপান করা তখন একটা রেওয়াজ ছিল ছাত্রদের মধ্যে। অনেককেই টানতে দেখতাম সেরাতে। ইলেভেন টুয়েলভের দাদা-দিদিরা (আমাদের হাই স্কুলের হায়ার সেকেন্ডারি সেকশান কো-এড ছিল) সেদিন বেশ গল্প গুজব করত। হিরো হিরো ভাব দু একজন দাদা সিগারেট টেনে কায়দা দেখাত। আর আমরা ড্যাবড্যাব করে দেখতাম। মনে মনে ওদের সমীহ করতাম কিন্তু বাইরে ভাব দেখাতাম কি বাজে ওই দাদাটা, এরাম কি বাজে! দু চারজন আবার সিগারেটের প্রথম ধোঁওয়াতে খকখক করে কাশতো। ধোঁওয়া টানার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এই দাদারা অতঃপর নানা জিনিষ ভক্ষণ করত যাতে বাড়িতে টের না পায় কেউ! এতো পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিতে পারছি এই জন্যই যে পরবর্তীতে মহাজন গতঃ স পন্থা আমরাও অবলম্বন করেছিলাম ওই একই হিরোগিরি দেখাতে। অনেক পরে চাকরী জীবনে আমার এক অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মী কোন এক দিদিমণিকে দেখানোর জন্য কায়দা করে সিগারেট টানছিলেন। সেটা দেখে আর এক সহকর্মী আমাকে সারবস্তুটি বলেছিলেন, ' সি.. সি..সিগারেট টা..টাইনে কি আর মে..মেয়েদের প..পটানো যায়! তো তোমার ওই দা..দাদা বো বোঝেই না! ফা..ফালতু প..পয়সা ন নষ্ট করতেছে!' বুঝেছিলাম ব্যাপারটা। তবে অনেক পরে!
সরস্বতী পুজো মানেই তখন অবধারিত আরতি প্রতিযোগিতা। আজকাল আর দেখিই না! ধুনুচি নিয়ে আরতি প্রতিযোগিতার দুরন্ত ক্রেজ ছিল সে সময়টায়। আমাদের স্কুলে বেশ কয়েকজন তাবড় নাচিয়ে ছিল। প্রতিযোগিতার সময় তাদের আরতি দেখতে যে ভীড়টা হত সেটা ঈর্ষা করার মতোই। নাচের ব্যাপারে আমার চিরকালই উঠোন বাঁকা। তাই দর্শকাসনে বসে দেখতাম। একবার এক দাদা জামাতে গিঁট দিয়ে ধুনুচি মাঝখানে রেখে অমিতাভ বচ্চনের নাচ নেচে গেল। সে কি নাচ! তখন কোন একটা ছবিতে অমিতাভ জামাতে গিঁট বেঁধে অভিনয় করেছিলেন। অনেক পরে ওঁর জীবনি পড়তে গিয়ে জানতে পারি যে জামাটা মাপে লম্বা ছিল বলে বাঁধনটা দিয়েছিলেন কিন্তু সেটা একটা ফ্যাশন হয়ে গিয়েছিল। তা দাদার সেই নাচ দেখে আমরা উত্তেজিত। একই সাথে হতভম্ব। স্কুলে আরতি প্রতিযোগিতায় এই নাচের আমদানি করে দাদাটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছিল প্রায়। কিন্তু চন্ডীস্যার বললেন 'কানা এইডায় কি? আরতি? যা বাড়ি যা, বেতায় লাল করুম'। আর পুলককাকু তাঁর অননুকরণীয় রাঢ় বাংলার উচ্চারণে বললেন, 'বাঁদর, পড়াশোনা তো শিখছেই না, যত রাজ্যের বাঁদরামি শিখছে!' যুগান্তকারী ঘটনার দফারফা হয়ে গেল সেখানেই। কিন্তু চোখে ভাসে ঢাকের প্রথম দ্রুতলয়ে বাজনার সাথে প্রতিযোগীদের প্রথম দ্রুত শরীর দোলানো, তারপর মধ্যলয়ে ধুনুচি নিয়ে ধীরে ধীরে নাচ ও পরবর্তীতে আবার দ্রুতলয়ের নাচ ও হাত বেঁকিয়ে ধুনুচিকে উল্টে দিয়েই সোজা করে নেওয়া যাতে জ্বলন্ত নারকেলের ছোবা নীচে না পড়ে যায়। পড়লে নম্বর কাটা যাবে যে! পুজোর পরদিন সকালে বেলপাতায় 'ওঁ সরস্বতী নমঃ' লিখতে লিখতে হাত ব্যথা হয়ে যেত। দাদার কঠোর নির্দেশ ছিল একটি বেলপাতায় তিনবার করে তিনটি বেলপাতায় লিখতে হবে। এবার একটি বেলপাতা মানে তিনটি। অর্থাৎ তিনটি বেলপাতা মানে হল মোট ন'টি। ন'টিতে তিনবার করে মানে সাতাশ বার। কি যন্ত্রণা! ওই খাগের কলমে লেখা যায় নাকি! আজকাল আমা নয় কে নিয়ে নতুন ভাবনা ভেবে দেখেছি। নয় মানে নয়ই। দেখুন নয় একে নয়, নয় দুগুণে আঠারো। আঠারো মানে এক আর আট। যোগ করুন। নয়। তিন নয়ে সাতাশ, দুই আর সাত। যোগ করুন- নয়। চার নয়ে ছত্রিশ...তিন আর ছয়...যোগ সেই নয়। গুণে যান। দেখবেন নয় সেই থাকছেই। পাল্টাবে না। এর মানে হল নয় পালটানোর নয়। দাদা সাতাশবার লেখাতো যাতে আমার কিছু না হয়। দাদার সেই প্রচেষ্টাকে সম্মান করে সত্যিই আমার কিছু হয় নি। ওই নয়েই আটকে আছি!
টেন-ইলেভেন-টুয়েলভে বেশ দাদাগিরি করা গেল বড় হয়ে যাবার সুবাদে। তবে যেহেতু নাটক-সহ নানা কালচারাল প্রোগ্রামে ব্যস্ত থাকতাম আর স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশনটা দু-তিনদিন ধরে এই সময়টাতেই হত তাই ব্যস্ত থাকতাম বেশী ওদিকটায়। তবু তার মাঝে সরস্বতী পুজোর বাজার করতে হাটে যাওয়া, দু-চারটি দোকানে ছোটখাটো ফল বা সব্জী না বলেই নিয়ে নেওয়া এসব নষ্টামিও করেছি। ঠেলায় মালপত্র চাপিয়ে হইহই করে ঠেলাওয়ালাকে মালেপত্রের সাথে বসিয়ে নিজেরাই ঠেলে আনা এসব তো ছিলই। পুজো শেষে ঘটের ডাব কেটে জল খেয়ে ডাবের কাটা অংশ ফেভিকল দিয়ে আটকানোর বৃথা চেষ্টা ও ফলস্বরূপ সুধাস্যারের 'এইগুলা মানুষের পোলা না' শুনতে সর্বোত্তম প্রচেষ্টাও চলত। কৃষ্ণস্যারের সাথে রাত জেগে পলিটিক্যাল সায়েন্সের এগজিবিশনের কাজ করা, রাতে সরস্বতী প্রতিমার দিকে প্রেমিকা জ্ঞানে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে কবে যে কখন স্কুল জীবনটাই শেষ হয়ে গেল কে জানে! বাড়িতে কিন্তু নিয়মিত পুজো হচ্ছে বা আজও হয়। বাড়ির পুজোতে ভিড় হত বেশ। হাই স্কুল কোয়ার্টার্সে বা পরে কলেজ পাড়াতে নিজেদের বাড়িতে অনেকেই আসতো পুজোর দিন অঞ্জলি দিতে। সকাল সকাল পুজোটা হত তাই ভিড়টা হত বেশী। তাছাড়া সংস্কৃত গুলে খাওয়া পন্ডিতকাকুর স্পষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ ও শুদ্ধাচার এবং যজ্ঞ বাড়ির পুজোকে অন্য মাত্রা দিত।
পুজো শেষ করেই স্কুলে দৌড় পর্বটা শেষ হল স্কুল জীবনের পরে। কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে সেই আনন্দ ছিল না। সত্যি বলতে জানতামও না কলেজে কোথায় পুজো হচ্ছে, কারা করছে। ইউনিভার্সিটির দু-বছর পুজোর সময়টায় আগেই চলে আসতাম বাড়ি। প্রতিমা আনা, কিছু বাজার ইত্যাদি করতে হবে যে!
চাকরীতে ঢোকার পরেও কোচবিহারে সরস্বতী পুজোর সময় থাকতাম না। কেননা ওই বাড়ির পুজো। এমন কি নিজে যেবার স্কুলের পুজো কমিটির সেক্রেটারি সেবারও পালিয়েছিলাম। এখানে একটা কথা না বলে পারছি না। আমাদের স্কুল অর্থাৎ মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের নামটা কিন্তু এই সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করেই। স্কুলের নাম আগে ছিল সুইডিশ মিশন ইনস্টিটিউট। মিশনারীদের অধীন হওয়ার জন্য স্কুলে পুতুল পুজো নিষিদ্ধ ছিল। সরস্বতী পুজো তাই হত না। ছাত্রদেরকে যেতে হত জেনকিন্স স্কুলে। স্বাধীনতার পরের বছর অর্থাৎ আটচল্লিশ সালে (কোচবিহার তখনও ভারত প্রজাতন্ত্রের অন্তর্ভূক্ত হয় নি) তখনকার ছাত্রেরা মিশনারীদের বিরুদ্ধে গিয়ে পুজো করে স্কুলে। ফল হল, সুইডিশ মিশনারীরা স্কুলের সাথে সম্পর্ক রাখলেন না। তদানিন্তন কোচবিহারের বিশিষ্টজনেরা রাজদরবারে আবেদন করলেন। পরের বছর অর্থাৎ উনচল্লিশ সালে রাজদরবার থেকে পাওয়া গেল স্কুলের নতুন নাম প্রজাবৎসল মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুরের নামে। ভূ-ভারতে সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে এরকম নাম পাল্টে যাবার ঘটনা আর কি না জানি না!
যাহক কোচবিহারের বাড়িতে পুজো চালু করতে হল শ্রীমানের জন্য। একটু বড় হয়েই নিজের স্কুলের পুজো ছেড়ে সে আর নড়বে না বলে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা করে বসল। একে নিয়ে মুশকিল একটাই। জেদের মাত্রাটা অত্যাধিক। মনে আছে একবার কালীপুজোর আগে কলকাতায় আছি। তখন ও বেশ ছোট। কোলে চেপে ঘুরে অভ্যস্ত। যাদবপুর এইট-বি স্ট্যান্ডের বাজারে কি একটা কাজে ঢুকেছি, ওর চোখ পড়ল দশকর্মা ভান্ডারে ঝোলানো মা কালীর ছোট সাইজের খড়্গের দিকে। বাধ্য করালো সেটা কিনতে। পরের দৃশ্যটা ভাবুন। কোলে ছেলেকে চাপিয়ে আমি হাঁটছি। ওর হাতে খড়্গ। দেখি লোকজন আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, দু একজন বয়স্কা প্রণামটুকুও সেরে নিলেন বোধহয়। কি ব্যাপার? না ছেলে কোলে উঠে একহাতে বরাভয় মুদ্রায় ও অন্য হাতে খড়্গ মুঠ করে ধরে জিভ বের করে আছে! হাসবো না কাঁদবো এসব ভাবার চেয়ে দ্রুতগতিতে পলায়নটাই শ্রেয় মনে হল। পুরো যাদবপুর স্টেশন রোড, রেললাইন পার করে ওপারে পালবাজারে পৌঁছে তাড়াতাড়ি রিক্সায় উঠে 'গড়ফা' বলেই হুডের তলায় আশ্রয় নিলাম। তাই সরস্বতী পুজোতে থাকব না এটা জানলে আবার কোন কীর্তি দেখতে হবে ভেবে থেকে যাওয়াটাই ভাল মনে হল। কিন্তু থাকলেই তো হবে না, পুজোটাও করতে হবে যে! অতএব আজ অবধি মা সরস্বতী আমার কোচবিহারের বাড়িতে পুজো পেয়ে আসছেন। আগে যত ছোট ছিল তত লম্বা প্রতিমা পছন্দ করত। আজকাল লম্বা হবার পর ছোট প্রতিমা পছন্দ করছে। আমি বাজার করতে বা প্রতিমা আনতে সাথে যাই। বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ছেলে বা ছেলের মা যা মনস্থির করে সেটা মেনে নিই, কেননা গৃহশান্তি রাখাটা আমার মত সচেতন নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য। মাঝে মাঝে ভাবি ছোটবেলায় সরস্বতী পুজোর বাজার করা বা প্রতিমা আনার ব্যাপারে বাবার সাথে গিয়ে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, আজও তাই দাঁড়িয়ে থাকি। দাদা সেই যে নয়ের আশীর্বাদ ভায়া মা সরস্বতী আমাকে দিয়েছে তা নড়চড় হওয়ার নয় আর আমারও কিছু হওয়ার নয়!
বাড়ির পুজো শেষে দুপুরে বা পরে সন্ধ্যেবেলায় স্কুলে যখন ছাত্রদের দেখি মনটা ভরে যায়। সারাদিন হুটোপুটি করে ওরা। আমার হাতে ক্যামেরা দেখলে 'ও স্যার আমার ছবি তোল' বলে আবদার করে অনেকে। উল্টোদিকের এ বি এন শীল কলেজ থেকে প্রাক্তন ছাত্রেরা আসে। আসেন বহু মানুষ। আমরা প্রৌঢ়রা বসে থাকি। একদিন এই স্কুলে থাকবো না যেভাবে থাকতে পারি নি ফালাকাটা হাই স্কুলে বা দিনহাটা কলেজে বা নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে। কালের নিয়মে এই স্কুল থেকে, এই জীবন থেকেই বিদায় নিতে হবে। কিন্তু থেকে যাবে এই পুজো আর তাকে ঘিরে শিশুদের কলরব, নব্য যুবক-যুবতীর গাঢ় চোখে তাকানো। সেদিনও আমার মত কোন প্রৌঢ় এভাবেই দেখবে সব, ভাববে নিজের কথা। আর সব ছাপিয়ে কোন এক পন্ডিতকাকুর গলায় প্রায় সারাদিন শোনা যাবে-
'সরস্বতী মহাভাগে, বিদ্যা কমললোচনে......'
ধান ভানতে শিবের গীত মনে হচ্ছে? আসলে এটুকু না বললে বলাটা পুরো হবে না আমার। যাহক সেবার, আমি তখন ক্লাস সেভেন, কার্তিকদা প্রস্তাব দিল সরস্বতী পুজো করবার। অভিনব ব্যাপার। পুজো বাড়িতে হয়, স্কুলে হয়। গার্লস স্কুলেও হয়। আমরা নষ্টিফস্টির ধান্দা নিয়ে গিয়ে বড়দিমণি মায়াপিসীকে (বাবা হাই স্কুলের হেডমাস্টার, সেই সূত্রে গার্লস হাই স্কুলের হেডমিস্ট্রেস আমার পিসী আর কি) দেখে পালাই! পুজোর আগে কাশীকুল খাই আর দুরু দুরু বুকে সারা বছর কাটাই যে এবার নির্ঘাৎ ফেল করবো! পুজোর দিন দুটিতে হাই স্কুলে অ্যানুয়াল ফাংশনে অংশ নিই, নাটক করি, এগজিবিশনে পার্টিসিপেট করি। এই অবধি ঠিক ছিল। কিন্তু পুজো! করি নি তো কোনদিন। ব্যাপারটা আক্ষরিক অর্থেই অভিনব আমার কাছে। আবার আবেদন বাবার কাছে। একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি। বাবা আমাকে কোনদিন কোন কিছুতেই আটকান নি, তা সে মাধ্যমিক দিয়ে সান্দাকফু ট্রেকে চলে যাওয়াই হক বা উচ্চ মাধ্যমিকের পর কমলদের চা বাগানে তেজপুরের কাছে মাজবাটে যাওয়াআ হক বা নিজের মত ডুয়ার্স চষে বেড়ানোতেই হক! বাবা কি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন আমাকে নাকি আমার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন এটা আজও প্রশ্ন আমার কাছে!
যথারীতি এবারও আটকালেন না। এক পাহাড় উদ্যমে চলল আমাদের কাজ। প্রথম বলি জহর স্যার। পাঁচটাকা চাঁদা দিলেন। সেই সময়ে বিরাট ব্যাপার। একে একে পন্ডিতকাকু, হরকাকু, প্রমথকাকু, চন্ডীস্যার প্রমুখের বধ হলেন। কার্তিকদা নিজেই খুঁটি গেড়ে ত্রিপল টানিয়ে মন্ডপ বানালো। বাঁশের কঞ্চি বেঁকিয়ে ধনুকের মতো করে কালো কাগজ লাগানো হল। সরু সরু পেরেক নির্দিষ্ট গ্যাপে আটকে ওপর নীচে সাদা সুতো আটকে আটকে দিব্যি ডেকরেশন হল। প্রতিমার দাম বোধহয় কুড়ি-পঁচিশ টাকা ছিল। পন্ডিতকাকু আমাদের বাড়ির পুজো সেরে এই প্রতিমার পুজো করে দিলেন। কার্তিকদারা বামুন। কার্তিকদার দিদি, রূপে লক্ষ্মী, সরস্বতী পুজোর বাকি কাজ করে দিলেন। চোখের সামনে দিব্যি পুজোটা উতরে গেল। আবিষ্কার করলাম আমরাও আয়োজন করতে পারি। আর একই সাথে এটাও আবিষ্কার করলাম যে কার্তিকদা বিড়ি খায়।
সরস্বতী পুজোর সন্ধ্যে বা রাতে লুকিয়ে ধূমপান করা তখন একটা রেওয়াজ ছিল ছাত্রদের মধ্যে। অনেককেই টানতে দেখতাম সেরাতে। ইলেভেন টুয়েলভের দাদা-দিদিরা (আমাদের হাই স্কুলের হায়ার সেকেন্ডারি সেকশান কো-এড ছিল) সেদিন বেশ গল্প গুজব করত। হিরো হিরো ভাব দু একজন দাদা সিগারেট টেনে কায়দা দেখাত। আর আমরা ড্যাবড্যাব করে দেখতাম। মনে মনে ওদের সমীহ করতাম কিন্তু বাইরে ভাব দেখাতাম কি বাজে ওই দাদাটা, এরাম কি বাজে! দু চারজন আবার সিগারেটের প্রথম ধোঁওয়াতে খকখক করে কাশতো। ধোঁওয়া টানার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এই দাদারা অতঃপর নানা জিনিষ ভক্ষণ করত যাতে বাড়িতে টের না পায় কেউ! এতো পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিতে পারছি এই জন্যই যে পরবর্তীতে মহাজন গতঃ স পন্থা আমরাও অবলম্বন করেছিলাম ওই একই হিরোগিরি দেখাতে। অনেক পরে চাকরী জীবনে আমার এক অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মী কোন এক দিদিমণিকে দেখানোর জন্য কায়দা করে সিগারেট টানছিলেন। সেটা দেখে আর এক সহকর্মী আমাকে সারবস্তুটি বলেছিলেন, ' সি.. সি..সিগারেট টা..টাইনে কি আর মে..মেয়েদের প..পটানো যায়! তো তোমার ওই দা..দাদা বো বোঝেই না! ফা..ফালতু প..পয়সা ন নষ্ট করতেছে!' বুঝেছিলাম ব্যাপারটা। তবে অনেক পরে!
সরস্বতী পুজো মানেই তখন অবধারিত আরতি প্রতিযোগিতা। আজকাল আর দেখিই না! ধুনুচি নিয়ে আরতি প্রতিযোগিতার দুরন্ত ক্রেজ ছিল সে সময়টায়। আমাদের স্কুলে বেশ কয়েকজন তাবড় নাচিয়ে ছিল। প্রতিযোগিতার সময় তাদের আরতি দেখতে যে ভীড়টা হত সেটা ঈর্ষা করার মতোই। নাচের ব্যাপারে আমার চিরকালই উঠোন বাঁকা। তাই দর্শকাসনে বসে দেখতাম। একবার এক দাদা জামাতে গিঁট দিয়ে ধুনুচি মাঝখানে রেখে অমিতাভ বচ্চনের নাচ নেচে গেল। সে কি নাচ! তখন কোন একটা ছবিতে অমিতাভ জামাতে গিঁট বেঁধে অভিনয় করেছিলেন। অনেক পরে ওঁর জীবনি পড়তে গিয়ে জানতে পারি যে জামাটা মাপে লম্বা ছিল বলে বাঁধনটা দিয়েছিলেন কিন্তু সেটা একটা ফ্যাশন হয়ে গিয়েছিল। তা দাদার সেই নাচ দেখে আমরা উত্তেজিত। একই সাথে হতভম্ব। স্কুলে আরতি প্রতিযোগিতায় এই নাচের আমদানি করে দাদাটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছিল প্রায়। কিন্তু চন্ডীস্যার বললেন 'কানা এইডায় কি? আরতি? যা বাড়ি যা, বেতায় লাল করুম'। আর পুলককাকু তাঁর অননুকরণীয় রাঢ় বাংলার উচ্চারণে বললেন, 'বাঁদর, পড়াশোনা তো শিখছেই না, যত রাজ্যের বাঁদরামি শিখছে!' যুগান্তকারী ঘটনার দফারফা হয়ে গেল সেখানেই। কিন্তু চোখে ভাসে ঢাকের প্রথম দ্রুতলয়ে বাজনার সাথে প্রতিযোগীদের প্রথম দ্রুত শরীর দোলানো, তারপর মধ্যলয়ে ধুনুচি নিয়ে ধীরে ধীরে নাচ ও পরবর্তীতে আবার দ্রুতলয়ের নাচ ও হাত বেঁকিয়ে ধুনুচিকে উল্টে দিয়েই সোজা করে নেওয়া যাতে জ্বলন্ত নারকেলের ছোবা নীচে না পড়ে যায়। পড়লে নম্বর কাটা যাবে যে! পুজোর পরদিন সকালে বেলপাতায় 'ওঁ সরস্বতী নমঃ' লিখতে লিখতে হাত ব্যথা হয়ে যেত। দাদার কঠোর নির্দেশ ছিল একটি বেলপাতায় তিনবার করে তিনটি বেলপাতায় লিখতে হবে। এবার একটি বেলপাতা মানে তিনটি। অর্থাৎ তিনটি বেলপাতা মানে হল মোট ন'টি। ন'টিতে তিনবার করে মানে সাতাশ বার। কি যন্ত্রণা! ওই খাগের কলমে লেখা যায় নাকি! আজকাল আমা নয় কে নিয়ে নতুন ভাবনা ভেবে দেখেছি। নয় মানে নয়ই। দেখুন নয় একে নয়, নয় দুগুণে আঠারো। আঠারো মানে এক আর আট। যোগ করুন। নয়। তিন নয়ে সাতাশ, দুই আর সাত। যোগ করুন- নয়। চার নয়ে ছত্রিশ...তিন আর ছয়...যোগ সেই নয়। গুণে যান। দেখবেন নয় সেই থাকছেই। পাল্টাবে না। এর মানে হল নয় পালটানোর নয়। দাদা সাতাশবার লেখাতো যাতে আমার কিছু না হয়। দাদার সেই প্রচেষ্টাকে সম্মান করে সত্যিই আমার কিছু হয় নি। ওই নয়েই আটকে আছি!
টেন-ইলেভেন-টুয়েলভে বেশ দাদাগিরি করা গেল বড় হয়ে যাবার সুবাদে। তবে যেহেতু নাটক-সহ নানা কালচারাল প্রোগ্রামে ব্যস্ত থাকতাম আর স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশনটা দু-তিনদিন ধরে এই সময়টাতেই হত তাই ব্যস্ত থাকতাম বেশী ওদিকটায়। তবু তার মাঝে সরস্বতী পুজোর বাজার করতে হাটে যাওয়া, দু-চারটি দোকানে ছোটখাটো ফল বা সব্জী না বলেই নিয়ে নেওয়া এসব নষ্টামিও করেছি। ঠেলায় মালপত্র চাপিয়ে হইহই করে ঠেলাওয়ালাকে মালেপত্রের সাথে বসিয়ে নিজেরাই ঠেলে আনা এসব তো ছিলই। পুজো শেষে ঘটের ডাব কেটে জল খেয়ে ডাবের কাটা অংশ ফেভিকল দিয়ে আটকানোর বৃথা চেষ্টা ও ফলস্বরূপ সুধাস্যারের 'এইগুলা মানুষের পোলা না' শুনতে সর্বোত্তম প্রচেষ্টাও চলত। কৃষ্ণস্যারের সাথে রাত জেগে পলিটিক্যাল সায়েন্সের এগজিবিশনের কাজ করা, রাতে সরস্বতী প্রতিমার দিকে প্রেমিকা জ্ঞানে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে কবে যে কখন স্কুল জীবনটাই শেষ হয়ে গেল কে জানে! বাড়িতে কিন্তু নিয়মিত পুজো হচ্ছে বা আজও হয়। বাড়ির পুজোতে ভিড় হত বেশ। হাই স্কুল কোয়ার্টার্সে বা পরে কলেজ পাড়াতে নিজেদের বাড়িতে অনেকেই আসতো পুজোর দিন অঞ্জলি দিতে। সকাল সকাল পুজোটা হত তাই ভিড়টা হত বেশী। তাছাড়া সংস্কৃত গুলে খাওয়া পন্ডিতকাকুর স্পষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ ও শুদ্ধাচার এবং যজ্ঞ বাড়ির পুজোকে অন্য মাত্রা দিত।
পুজো শেষ করেই স্কুলে দৌড় পর্বটা শেষ হল স্কুল জীবনের পরে। কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে সেই আনন্দ ছিল না। সত্যি বলতে জানতামও না কলেজে কোথায় পুজো হচ্ছে, কারা করছে। ইউনিভার্সিটির দু-বছর পুজোর সময়টায় আগেই চলে আসতাম বাড়ি। প্রতিমা আনা, কিছু বাজার ইত্যাদি করতে হবে যে!
চাকরীতে ঢোকার পরেও কোচবিহারে সরস্বতী পুজোর সময় থাকতাম না। কেননা ওই বাড়ির পুজো। এমন কি নিজে যেবার স্কুলের পুজো কমিটির সেক্রেটারি সেবারও পালিয়েছিলাম। এখানে একটা কথা না বলে পারছি না। আমাদের স্কুল অর্থাৎ মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের নামটা কিন্তু এই সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করেই। স্কুলের নাম আগে ছিল সুইডিশ মিশন ইনস্টিটিউট। মিশনারীদের অধীন হওয়ার জন্য স্কুলে পুতুল পুজো নিষিদ্ধ ছিল। সরস্বতী পুজো তাই হত না। ছাত্রদেরকে যেতে হত জেনকিন্স স্কুলে। স্বাধীনতার পরের বছর অর্থাৎ আটচল্লিশ সালে (কোচবিহার তখনও ভারত প্রজাতন্ত্রের অন্তর্ভূক্ত হয় নি) তখনকার ছাত্রেরা মিশনারীদের বিরুদ্ধে গিয়ে পুজো করে স্কুলে। ফল হল, সুইডিশ মিশনারীরা স্কুলের সাথে সম্পর্ক রাখলেন না। তদানিন্তন কোচবিহারের বিশিষ্টজনেরা রাজদরবারে আবেদন করলেন। পরের বছর অর্থাৎ উনচল্লিশ সালে রাজদরবার থেকে পাওয়া গেল স্কুলের নতুন নাম প্রজাবৎসল মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুরের নামে। ভূ-ভারতে সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে এরকম নাম পাল্টে যাবার ঘটনা আর কি না জানি না!
যাহক কোচবিহারের বাড়িতে পুজো চালু করতে হল শ্রীমানের জন্য। একটু বড় হয়েই নিজের স্কুলের পুজো ছেড়ে সে আর নড়বে না বলে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা করে বসল। একে নিয়ে মুশকিল একটাই। জেদের মাত্রাটা অত্যাধিক। মনে আছে একবার কালীপুজোর আগে কলকাতায় আছি। তখন ও বেশ ছোট। কোলে চেপে ঘুরে অভ্যস্ত। যাদবপুর এইট-বি স্ট্যান্ডের বাজারে কি একটা কাজে ঢুকেছি, ওর চোখ পড়ল দশকর্মা ভান্ডারে ঝোলানো মা কালীর ছোট সাইজের খড়্গের দিকে। বাধ্য করালো সেটা কিনতে। পরের দৃশ্যটা ভাবুন। কোলে ছেলেকে চাপিয়ে আমি হাঁটছি। ওর হাতে খড়্গ। দেখি লোকজন আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, দু একজন বয়স্কা প্রণামটুকুও সেরে নিলেন বোধহয়। কি ব্যাপার? না ছেলে কোলে উঠে একহাতে বরাভয় মুদ্রায় ও অন্য হাতে খড়্গ মুঠ করে ধরে জিভ বের করে আছে! হাসবো না কাঁদবো এসব ভাবার চেয়ে দ্রুতগতিতে পলায়নটাই শ্রেয় মনে হল। পুরো যাদবপুর স্টেশন রোড, রেললাইন পার করে ওপারে পালবাজারে পৌঁছে তাড়াতাড়ি রিক্সায় উঠে 'গড়ফা' বলেই হুডের তলায় আশ্রয় নিলাম। তাই সরস্বতী পুজোতে থাকব না এটা জানলে আবার কোন কীর্তি দেখতে হবে ভেবে থেকে যাওয়াটাই ভাল মনে হল। কিন্তু থাকলেই তো হবে না, পুজোটাও করতে হবে যে! অতএব আজ অবধি মা সরস্বতী আমার কোচবিহারের বাড়িতে পুজো পেয়ে আসছেন। আগে যত ছোট ছিল তত লম্বা প্রতিমা পছন্দ করত। আজকাল লম্বা হবার পর ছোট প্রতিমা পছন্দ করছে। আমি বাজার করতে বা প্রতিমা আনতে সাথে যাই। বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ছেলে বা ছেলের মা যা মনস্থির করে সেটা মেনে নিই, কেননা গৃহশান্তি রাখাটা আমার মত সচেতন নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য। মাঝে মাঝে ভাবি ছোটবেলায় সরস্বতী পুজোর বাজার করা বা প্রতিমা আনার ব্যাপারে বাবার সাথে গিয়ে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, আজও তাই দাঁড়িয়ে থাকি। দাদা সেই যে নয়ের আশীর্বাদ ভায়া মা সরস্বতী আমাকে দিয়েছে তা নড়চড় হওয়ার নয় আর আমারও কিছু হওয়ার নয়!
বাড়ির পুজো শেষে দুপুরে বা পরে সন্ধ্যেবেলায় স্কুলে যখন ছাত্রদের দেখি মনটা ভরে যায়। সারাদিন হুটোপুটি করে ওরা। আমার হাতে ক্যামেরা দেখলে 'ও স্যার আমার ছবি তোল' বলে আবদার করে অনেকে। উল্টোদিকের এ বি এন শীল কলেজ থেকে প্রাক্তন ছাত্রেরা আসে। আসেন বহু মানুষ। আমরা প্রৌঢ়রা বসে থাকি। একদিন এই স্কুলে থাকবো না যেভাবে থাকতে পারি নি ফালাকাটা হাই স্কুলে বা দিনহাটা কলেজে বা নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে। কালের নিয়মে এই স্কুল থেকে, এই জীবন থেকেই বিদায় নিতে হবে। কিন্তু থেকে যাবে এই পুজো আর তাকে ঘিরে শিশুদের কলরব, নব্য যুবক-যুবতীর গাঢ় চোখে তাকানো। সেদিনও আমার মত কোন প্রৌঢ় এভাবেই দেখবে সব, ভাববে নিজের কথা। আর সব ছাপিয়ে কোন এক পন্ডিতকাকুর গলায় প্রায় সারাদিন শোনা যাবে-
'সরস্বতী মহাভাগে, বিদ্যা কমললোচনে......'
No comments:
Post a Comment