Friday, March 30, 2018

তিনি যীশু, তিনি ঈশা
শৌভিক রায়
খ্রীষ্টমাস কি ও কেন নিয়ে একটি লেখায় মাস তিনেক আগে বলেছিলাম যীশুখ্রীষ্টের মৃত্যু ও কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য নিয়ে জানাবো একদিন। 
আজ গুড ফ্রাইডে। আজকের দিনে এই লেখাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলেই মনে হয়। তবে বিষয়টি বিতর্কিত। এই মতকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। কাউকে কাউকে মিথ্যুক অপবাদ দেওয়া হয়েছে। আবার এমন কিছু নাম এই মতের সাথে জড়িয়ে যে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করতেও মন দ্বিধাগ্রস্ত হয়।
শুরুটা করি কাশ্মীর নিয়ে। অনেকেই কাশ্মীরে বেড়াতে গেছেন। শ্রীনগরও বেড়িয়ে এসেছেন। শ্রীনগরের রোজাবল বা রাউজাবল (Rauzabal) মসজিদ দেখেছেন কি? যদি দেখে থাকেন তবে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন কাশ্মীরের অন্যান্য স্মৃতিসৌধের মত বৌদ্ধ বা ইসলামি স্থাপত্যের কোন ছাপ নেই। কেবল জালির ওপর হিব্রু ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি যার পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি।
রোজাবল মসজিদের কথায় আবার পরে আসব। এবার বলি যীশুর কথা। যীশুর জীবন খুব ভাল করে অধ্যয়ণ করলে দেখবেন যে তাঁর জীবনের চোদ্দ বছর থেকে আটাশ বছরের কোন ঘটনাক্রম জানা যায় না। আটাশ-উনত্রিশ বছর বয়সী যীশুকে আমরা দেখি মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর সহনশীলতার বাণী প্রচার করতে। এখানেও খটকা একটি। Old Testament কিন্তু 'চোখের বদলে চোখ বা দাঁতের বদলে দাঁত' এই নীতিতেই বিশ্বাসী। New Testament সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটে প্রেম-ভালবাসা-সহনশীলতা-ক্ষমার বাণীকেই তুলে ধরেছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এই মতবাদ কিন্তু যীশুর আগে কোনভাবেই দেখা যায় না। তাহলে প্রশ্নটা এখানেই জাগে যে কিভাবে যীশু এই মতাদর্শে নিজেকে সমৃদ্ধ করলেন? এই মতাদর্শ তো আর্যাবর্তের। এখানে তাঁর জন্মের অন্ততঃ পাঁচশো বছর আগে জন্মেছেন তথাগত বুদ্ধ। রাম, কৃষ্ণ...এরকম যাঁরাই আর্যাবর্তের মানুষ তাঁদের প্রত্যেকেই এই কথাই বলে গেছেন। মধ্য-প্রাচ্যের যীশু সেই মতাদর্শে কিভাবে নিজিকে দীক্ষিত করলেন? এখান থেকেই আসছে সেই বিখ্যাত (যা অস্বীকার করা হচ্ছে মিথ্যে বলে) তথ্য। কিন্তু তথ্যটা কি? একদমই সোজা এবং ঠিকই ভাবছেন।
হ্যাঁ যীশু অধ্যয়ন করেন ভারতবর্ষে।
মনে করা হচ্ছে, ইসরায়েলের নিয়ম অনুযায়ী চোদ্দ বছর বয়সে যীশুর বিবাহ স্থির হলে তিনি জেরুজালেম থেকে বাগদাদে আসেন। সম্ভবতঃ বণিকদের দলে ভিড়ে হামাদান, তেহেরান, মাশাহাদ হয়ে আফগানিস্তানের হেরাতে পৌঁছান। খাইবার পাস পার করে কাবুল নদী ধরে আটক এবং সিন্ধু নদের সঙ্গ ধরে গিলগিট, স্কার্দু হয়ে লে তে আসাটা কেবল ছিল সময়ের অপেক্ষা। মনে রাখতে হবে এটাই কমবেশী সেই বিখ্যাত সিল্করুট যে পথে আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেন। তাই এই পথ আলেকজান্ডারের পরে জন্ম নেওয়া যীশু জানবেন না তা নাও হতে পারে। লে কার্গিল হয়ে জোজিলা গিরিবর্ত পেরোলেই তো সুজলাসুফলা ভারতের প্রথম গাঁ- পহেলা গাঁও- পহেলগাঁও। তারপরেই তো শ্রীনগর।
কিন্তু ভারতে আসার কারণটা কি যীশুর? কারণ জ্ঞানার্জন। ভারত তখন শিক্ষায় সংস্কৃতিতে সুবর্ণ যুগে প্রবেশ করেছে। ভারতের বিপুল সম্পদের মতই ঈর্ষণীয় তার মেধাশক্তি অধ্যাত্মিক শক্তি। যীশুর মত প্রাজ্ঞ মানুষ তাতে আকৃষ্ট হবেন এ আর নতুন কথা কি!
লে তে যীশু আশ্রয় নেন বিখ্যাত হেমিস গুম্ফায়। শুরু হয় তাঁর শিক্ষা গ্রহণ। আরও বলা হচ্ছে যে হেমিস গুম্ফায় পাঠ শেষে তিনি আর্যাবর্তের নানা স্থান এমনকি পুরী, বারানসী, কপিলাবস্তুতেও গেছিলেন, শিক্ষালাভ করেছিলেন এসব জায়গাতেও। কপিলাবস্তুতে পালি ভাষা শিখে বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়ণ করেন। নেপাল ও হিমালয় ভ্রমণ করে পারস্য হয়ে তিনি ফিরে যান অবশেষে নিজের দেশে এবং প্রচার করতে শুরু করেন তাঁর নিজস্ব ধর্মমত। মনে রাখতে হবে মানুষ ধর্ম নিয়ে জন্মায় না। ধর্ম শব্দটির আক্ষরিক অর্থ আমরা যা ধারণ করি তাই-ই।
এখন যীশুর জীবনের এই কথার ভিত্তি কি? রাশিয়ান লেখক ডঃ নিকোলাস নটোভিচ 1894 সালে তাঁর The Unknown Life of Jesus Christ বইটিতে প্রথম এই দাবী তোলেন। তাঁর দাবী 1887 সালে লাদাখ ভ্রমণের সময় হেমিস গুম্ফার নাম শুনে তিনি হেমিসে যাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু পা ভেঙে তাঁকে পৌঁছতে হয় সেখানে। দেড়মাস তাঁকে থাকতে হয় হেমিসে এবং যে লামা তাঁকে সেবা করছিলেন তিনিই তাঁকে তিব্বতী ভাষায় রচিত একটি পুঁথি দেখান। মূল পুঁথিটি পালিভাষায় রচিত ও পোতলা প্রাসাদের কাছে মারবুর মঠে রক্ষিত। নটোভিচ দোভাষীর সাহায্যে সেই অনুবাদিত তিব্বতী পুঁথিকে অনুবাদ করেন এবং স্তম্ভিত হন যে পুঁথিটিতে যীশুর ভারতে আসা, তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি বর্ণিত। নটোভিচ এরপর দেশে ফেরেন ও ফরাসীতে একটি বই প্রকাশ করেন যার ইংরেজিতে অনুবাদ করেন অ্যালেক্সিনা লোরেঞ্জা। নটোভিচের এই দাবীকে নস্যাৎ করা হয়। হেমিস গুমফার মঠাধ্যক্ষও কোন বিদেশীর আগমন অস্বীকার করেন। কিন্তু অনেকেই জানান যে নটোভিচ সেসময় লাদাখে ছিলেন। নটোভিচের বইটি পড়ে স্বামী অভেদানন্দ আকৃষ্ট হন। 1921 সালে আমেরিকা থেকে ভারতে ফিরে তিনি লাদাখে যান। স্বামী অভেদানন্দও সেই পুঁথিটি দেখেন এবং পড়েন। চোদ্দটি পরিচ্ছেদ ও দুশোচুয়াল্লিশ শ্লোকযুক্ত সেই পুঁথিটিতে যীশুর জীবন বিদ্ধৃত। কিন্তু পরবর্তীতে এই পুঁথিও আর পাওয়া যায় না যখন কাশ্মীর সরকার হেমিস গুম্ফার সব পুঁথি অধিগ্রহণ করেন। সাহিত্যিক প্রবোধকুমার স্যান্যালও এই পুঁথির খোঁজ করেন। তাঁকে জানানো হয় এই কথা। মূল পুঁথিটি যা পালিভাষায় লেখা তা হয়তো আজও মারবুর মঠে রক্ষিত। ডঃ নটোভিচকে প্রতারক আখ্যা দেওয়া হয়। যদি মেনেও নেই তিনি মিথ্যে বলেছেন কিন্তু স্বামী অভেদানন্দ বা প্রবোধকুমার স্যান্যালকে সেরকম স্বপ্নেও ভাবতে পারি না।
মানুন না মানুন ভাবনা একটা আসেই। প্রশ্নও আসে তবে সত্যিই কি যীশু ভারতে এসেছিলেন? অধ্যয়ণ করেছিলেন? অনেক রহস্যময় ব্যাপারের মতই এই প্রশ্নটিও বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কুয়াশায় ঢাকা থাকবে। আর আমার লেখার উদ্দেশ্য কোন ধর্মীয় ভাবাবেগকে আঘাত করা নয়। ইতিহাস যেভাবে বিবৃত হয়েছে তাকেই স্মরণ করা। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি সব ধর্মেরই মূল কথা হল মানুষকে ভালবাসা।
কিন্তু লেখার শুরুতেই রোজাবলের কথা কেন বললাম? যীশুর সাথে তার কি সম্পর্ক? সম্পর্ক এটাই যে অনেকে বিশ্বাস করেন রোজাবল হল ঈশ্বরপুত্র যীশুর সমাধি। না, চমকানোর কিছু নেই। ব্যাখ্যা করা যাক।
ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মৃত্যু যে হয় নি তার স্বপক্ষে একটা বড় প্রমাণ প্রায় তৃতীয় শতক পর্যন্ত খ্রীষ্টান সমাজে যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ দেখাবার রীতি চালু হয় নি। আরও পরে সম্ভবতঃ সহানুভূতি আদায়ের জন্যই এই রীতি চালু হয়। বাইবেল বা প্রাচীন হিব্রু গ্রন্থও বলছে মেরে ফেলার জন্য ক্রুশবিদ্ধ করা হত না। উদ্দেশ্য ছিল চরম যন্ত্রণা দেওয়া। তিন-চারদিন ঝুলিয়ে রাখলে এমনিতেই রক্তক্ষরণ ও অপুষ্টিতে মারা যেত ক্রুশে ঝুলছে যে। ক্রুশ থেকে নামিয়ে চিকিৎসা করালে বাঁচার সুযোগ থাকত। এখন যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয় শুক্রবারে এবং দুপুরে। শনিবার ইহুদিদের পবিত্র সাবাথ ডে। পানভোজন আমোদপ্রমোদ বন্ধ। তাই সন্ধ্যে নাগাদ অর্থাৎ ঘন্টা তিনেক পরেই তাঁকে নামানো হয়। মাথা ঝুলে পড়া যীশুকে পানভোজনের তাগিদে তাড়া থাকায় তাড়াতাড়ি মৃত ভাবা হয় যখন ক্রুশ থেকে নামিয়ে যীশুর পায়ে খোঁচানো হয় বল্লম দিয়ে এবং যীশু অজ্ঞান হয়ে যান। যীশুর বন্ধুরা তাঁকে ধরাধরি করে নিয়ে যান তাঁর শিষ্য জোসেফ আরিমাথিয়ার বাড়ি। জোসেফ রোমান গভর্ণর পন্টিয়াস পাইলটের সাথে দেখা করে যীশুকে নিজের বাড়িতে সমাধিস্থ করার অনুমতি পান। খোঁড়া হল কবর তিনদিন ধরে। ওদিকে চলল যীশুর চিকিৎসা। তিনদিন পর সবার সামনে যীশুকে রেখে কবরের মুখ বন্ধ করা হল। আসলে কবরটি ছিল একটি সুড়ঙ্গ যার সাথে যোগ ছিল অন্য একটি ঘরের যেখান দিয়ে আবার বাইরে যাওয়া যেত। যীশু সে পথেই পালালেন। মা মেরীর সাথে দেখাও করলেন। প্যালেস্তাইনে তাঁর কবর খালি পাওয়া গেল। জোসেফকে বন্দী করা হল। রেজারেকশন বা পুনঃ আবির্ভাবের কথা বিশ্বাস করল না শাসকেরা। জেরুজালেম থেকে দেড়শ মাইল দূরে প্রাণভয়ে শঙ্কিত যীশু গ্যালিলিতে দেখা করলেন শিষ্যদের সাথে। তাঁর এই দেখা করার কথা রটে যেতেই যীশু আবার লুকিয়ে পড়লেন। পাহাড়ী পথে পৌঁছলেন মাউন্ট অফ অলিভস-এ। বললেন কথা তাঁর শিষ্যদের কথা- Whither I go you cannot come. নীচে দাঁড়ানো শিষ্যরা দেখল মেঘ এসে ঘিরে ধরল তাঁকে আর মেঘ সরতেই তিনি নেই।
এই ঘটনা শিষ্য ও লোকমুখে যীশুর স্বর্গারোহণে পরিণত হলেও যীশু আবার ধরলেন পথ সেই আর্যাবর্তের যেখানে হেমিস গুম্ফায় কেটেছে তাঁর অনেকদিন। কেননা নিজ বাল্যভূমি নাজারেথ, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়ায় তিনি নিরাপদ বোধ করলেন না। বরং ছিল প্রাণভয়। পাল্টালেন নাম। নতুন নাম হল তাঁর- ইউজা আসফ। লাদাখে এসেও তিনি নিরাপদ বোধ করেন নি। চলে এলেন কাশ্মীরে রাজা গোপাদত্তের সুশাসনের রাজ্যে। তাঁর প্রজ্ঞা, জ্ঞান, পান্ডিত্যে রাজা প্রজা সবাই মুগ্ধ হলেন অচিরেই। রয়ে গেলেন তিনি এদেশেই। গোপাদত্তের আমলের ইউজা আসফ যে প্যালেস্তাইন থেকে এসেছিলেন সে কথা পুষ্ট করেছেন কাশ্মীরের প্রথম ঐতিহাসিক মোল্লা নাদিরি। নাসিরি দাবী করেন কোন এক কাশ্মিরী গ্রন্থে তিনি পেয়েছেন ইউজা আসফই আসলে হজরত ইসা বা জেসা বা যীশু। এমনকি শ্রীনগরের শঙ্করাচার্য মন্দিরের গম্বুজের ফাটল নির্মাণকালে পারস্যের স্থপতি সুলাইমান যে লিপি উৎকীর্ণ করেন তার পাঠোদ্ধার করলে দেখা যায় তাতে স্পষ্ট লেখা- ইউজা আসফ হলেন জেসাস। ইউজা আসফের শিষ্যরা নিজেদের নাথযোগী বলতেন। ইউজা আসফ তাদের কাছে ঈশা। 'ঈশ' শব্দটির অর্থ শিব। প্যালেস্টাইনে তখন শৈবধর্মের প্রচলন ছিল। মনে করা হয় ক্রুশবিদ্ধ হয়ে ভারতে এসে যীশু তাঁর ধর্মমতে ভারতীয় ঐতিহ্যকে স্থান দিয়েছিলেন, ফলে তাঁর প্রবর্তিত এই নবধর্মমতের সাথে হিন্দু বা বৌদ্ধধর্মের সংঘাত হয় নি। বরং প্রচুর মানুষ নাথযোগী সম্প্রদায়ভুক্ত হন সেসময়। দীর্ঘদিন কাশ্মীরে কাটিয়ে ইউজা আসফ (নাকি যীশু?) শ্রীনগরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ও সমাধিস্থ হন রোজাবলে। তাই অনেকে আজও বিশ্বাস করে রোজাবল হল যীশুর সমাধি।
ইতিহাসের এ এক অদ্ভুত তথ্য। এর সত্য-মিথ্যা আমার জানা নেই। জানার চেষ্টাও আমার নেই। সে কাজ ঐতিহাসিকের। আমি এটুকুই জানি মানুষের বিশ্বাসের ওপর আর কিছু হতে পারে না। যিনি বিশ্বাস করেন তিনিও স্বাগত, যিনি করেন না তিনিও স্বাগত।
কারো জীবন নয়, তাঁর কর্ম, তাঁর প্রদর্শিত পথই (যদি তা অনুসরণ করার মত হয়) আমাদের মনে রাখা দরকার।
ঈশ্বরপুত্র যীশু দেখিয়েছিলেন অমৃতের পথ। নিজের জীবন দিয়ে শিখিয়েছিলেন প্রেমের কথা। অনুসৃত হক তাঁর ও তাঁর মত মহামানবদের দেখানো পথ অস্থির এই সময়ে, অসম্প্রীতির এই বিশ্বে।

No comments: