Saturday, March 31, 2018

রঙ
শৌভিক রায়



ফাল্গুনের টান আর সেই টানেই শিমুল পলাশ মাদারের সুখবিষণ্ণ রঙ। 
ফাল্গুনের এই ভরা রোদ্দুর ঝলসে দিয়েছে গা। আশেপাশেরর গাছগুলোরও একই অবস্থা। গায়ে যেন রোদের প্রলেপ। আর এই রোদ কি যে সে রোদ! সেই নরম মিঠে মিঠে? এ যে বড্ড পুরুষালি। কঠোর। যে কোনভাবেই যখনতখন পুড়িয়ে দিতে পারে সব। পারে ছারখার করে দিতে। 
.....তবু এই রোদে পুড়তেই যেন মুখিয়ে ছিল তারা। এই রোদ-পুরুষের সান্নিধ্য না পেলে, না ঝলসালে, বর্ষার জলে পুষ্ট হওয়া যাবে না যে। এ তো ঝলসানো নয় বরং নষ্ট হওয়া...নষ্ট মেয়ের মতোই। বেহায়া, লাজহীন। গোপন কটাক্ষে আহ্বান কেবল। আর নষ্ট করবার জন্য পুরুষ তো মুখিয়েই আছে। তাই ফাগুনের রঙে সাজিয়ে নিজেকে অপেক্ষার দিন গোণা। কামুক রোদ ঝাঁপিয়ে পড়ুক তার সব পুরুষত্ব নিয়ে। পুড়িয়ে দিক,জ্বালিয়ে দিক সব।

পুড়েও যে সুখ, জ্বলেও যে সুখ। নষ্ট হতেও সত্যি সুখ। 

ফাল্গুনের টানে সবাই সান্নিধ্য চায় রোদ-পুরুষের। পুড়তে চায় সবাই। তৃণদল শুষ্ক তাই। ঝলসানো গায়ে সবুজ নেই আর। বরং রোদ-পুরুষের সাথে মিলনে লজ্জায় লাল লাল রঙ তার। নিজেদের বেহায়াপনায় নিজেরাই লাল হয়ে গেছে সব লজ্জায়। ফিসফিস কথা শুধু হাওয়ার সাথে। গোপন কথা। হাওয়াটিও তেমন। মিলনের পরই কোথা থেকে হঠাৎ হাজির। তারপর নীচু স্বরে গুণগুণ। সব শুনেটুনে হো হো হেসে হাওয়ার আবার দিকবদল অন্যের গোপন কথা শুনতে। সব দেখে রসিক কোকিল কেবল হাসে আর কু কু ডেকে জানাতে চায় কি দেখেছে কি শুনেছে। চুপ চুপ দুরন্ত পাখি। থেমে যা এখুনি। বলিস নে লজ্জার কথা, বলিস নে গোপন কথা। তবে এটাও ঠিক এই লজ্জার কথা কেউ বললে বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। গোপন কথা ঠিকই, তবে নিজেই চাই জেনে যাক সব্বাই।

ফাল্গুনের টানে সর্বনাশের সময় যেন তাই। প্রকৃতির পরতে পরতে সেই সর্বনাশের ডাক, নষ্ট হবার ডাক। এই ডাক শুনেই ঘরছাড়া আজ ঘর থেকেও। উচাটন মনে ফাল্গুনের হাতছানি আর বেহায়াপনায় নষ্ট হয়ে যাওয়া তাই। 

ফাল্গুনের টানে খড়ি ওঠা চামরায় তেল মাখলে যা একটু সুখ। ঘরের ভেতর আরাম। হালকা ঘামে কপাল ভেজে। দুপুরবেলার তিস্তা-তোর্ষা-মানসাই-মুজনাইয়ের চর সাদা মরুভূমি যেন। কোথায় জল আর কোথায় বালি ঠাহর করাই মুশকিল। 
হঠাৎ হাওয়ায় বালি ওড়ে, যেন মরুঝড়। পাগল পাগল চারধার। চোখ কুঁচকে দেখতে হয় কোনটা কি। মাঠ-ফাঠ সব ন্যাড়া। 
তবু ন্যাড়া মাঠের কোথাও কোথাও উচ্ছে আর করলার চাষ। মাটিতে শুয়ে থাকা গাছগুলোতে হলুদ হলুদ ফুল,ছোট ছোট। সজনে গাছে সজনে দোলে দে দোল দে দোল। ফুল এসেছে তাতে.... সাদা। ঠিক যেন বরফকুচি। চারদিকে শিমুল, পলাশ আর মাদারের গাছ। সব লালে লাল। ধূসর ল্যান্ডস্কেপে ন্যাড়া প্রকৃতিতে লাল, হলুদ, সাদার মিশেলে এক অদ্ভুত রঙবাহার!

 জীবন মানেই রঙ যে! আর সে রঙের কি বাহার। লাল, নীল, সবুজ, হলুদে হৈ হৈ এক দশা যেন। সাথে যোগ হচ্ছে হঠাৎ মাখিয়ে দেওয়া আবির রঙা লাজ-শরমের রঙ। 
রঙ তো সবদিকেই। রঙের টানেই দুনিয়াদারি। রঙবিলাসী জীবন আর জীবনের বিলাস রঙেই। সুখের রঙ, তীব্র চাহিদার রঙ যদি হয় লাল, হলুদ তবে পিছিয়ে কোথায়! সুখকে, চাহিদাকে মঙ্গল চিহ্নে ঢেকে দিতে হলুদ তাই বারবার। লাল হলুদে মিশেই যেন সৃষ্টি হয় সৃজনের রঙ- সবুজ। আবার সেই সৃষ্টি ধাবিত নীলের দিকে। নীল যে স্বয়ং বেহায়া কানুর রঙ। নীলে মজেই তো রাধার সেই আলুথালু ভাব। সেই নীলকে কন্ঠে ধারণ করেই তো কেউ হয়ে যান নীলকন্ঠ! 

অন্যদিকে জীবনের সাদা-কালোকে ছুঁয়ে থাকে কতই না ঘাতপ্রতিঘাত!  যদি ওড়াই শান্তির সাদা পতাকা, তবে প্রতিবাদে তুলে নিই রঙ এক কালো, সেই শান্তিভঙ্গকারীর জন্য। রঙের খেলায় জীবন তাই কখনো আশমানি তো সহসা বেগুনি, কখনো আবার কমলা! 

রঙেই বাঁচা, পুড়ে খাক হয়ে যাওয়াও সেই ভয়ঙ্কর সুন্দর আগুন রঙে অথবা মিশে যাওয়া মেটে রঙা পৃথিবীর মাটির সাথে।

পুড়ে খাক হয়েও বা মাটিতে মিশে গিয়েও বেঁচে ওঠা হয়তো আবার...

রঙের নেশায় মাততে।

বারবার।

(প্রকাশিত- ELIXIR, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় )

No comments: