Tuesday, January 27, 2026




মিলিয়ে যাচ্ছে কি ডুয়ার্স ম্যাজিক?

শৌভিক রায়  

চোখের সামনে স্বর্ণকোষের রাজকীয় বিস্তার। অনেকটা উঁচুতে দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি সেটা। ওপারের সবুজ পাহাড় কোথাও কোথাও ন্যাড়া। অনেকটা ডুয়ার্সের মতোই।
 
স্বর্ণকোষ অর্থাৎ সংকোষ। অসম বাংলার সীমা নির্ধারণ করেছে এই নদী। অসমে ঢুকে অবশ্য নাম বদলেছে। ডুয়ার্সের আর পাঁচটা নদীর মতোই রূপসী সে। বিশেষ করে কুমারগ্রামদুয়ারের কালিখোলায়। দূরত্বের বিচারে রাজধানী কলকাতা থেকে সবচেয়ে দূরের ব্লক এই কুমারগ্রাম। তরঙ্গায়িত সবুজ চা বাগান, খরস্রোতা নদী, দুর্ভেদ্য বক্সা অরণ্য, হাতি আর বাইসনের পাল, বর্ণময় জনজাতি জীবন আর নিজস্ব ইতিহাস নিয়ে নিজের মতোই অনন্য সে। কিন্তু সেভাবে এখানে পর্যটক কোথায়? 

কালিখোলা ভুটানে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এই সবই। আজকাল একটা অভিযোগ উঠছে, ডুয়ার্সে একবার এলে আর আসবার প্রয়োজন নেই। সোজা বাংলায়, ডুয়ার্স ম্যাজিক দেখার জন্য একবারই যথেষ্ট। কথাটা সর্বৈব মিথ্যে, সেটা বলা যাবে না। আবার পুরোপুরি সত্য, তেমনও নয়। এক্ষেত্রে আমার নিজস্ব অবস্থানটি মধ্যবর্তী। আসলে ডুয়ার্সের ইতিহাস না জানলে, একবারেই যথেষ্ট। আর যদি জানা যায় অতীত কথা, তবে হয়ত এক জন্মেও শেষ হবে না ডুয়ার্স অন্বেষণ!     

 অতীতে সমতল থেকে উত্তরে ভুটানে যাওয়ার জন্য পাহাড়পথ ব্যবহার করা হত। এরকম মোট আঠারোটি পাহাড়পথ 'দুয়ার` বা 'দুয়ারগুচ্ছ` নামে পরিচিত ছিল। ইংরেজরা সেখান থেকেই 'door` বা 'dwar` বা দরজা অর্থে, বহুবচনে 'Dooars`বা 'ডুয়ার্স` বেছে নেন। ১৮৬৬ সালে সার্জন রেনি তাঁর 'Bhotan and the Story of Dooar War` বইতে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের তিস্তা থেকে আসামের ধানসিড়ি যদি পর্যন্ত আঠারোটি দুয়ারের উল্লেখ করে গেছেন, যার মধ্যে প্রথম এগারোটিকে বেঙ্গল ডুয়ার্স ও বাকিগুলিকে অসম ডুয়ার্স বলে চিহ্নিত করা হত। বর্তমানে অবশ্য অসম ডুয়ার্সের আর অস্তিত্ব নেই। এখন ডুয়ার্স বলতে তিস্তা নদীর পূর্ব প্রান্ত থেকে সংকোষের পশ্চিম প্রান্ত অবধি বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে বোঝায়। সেই অর্থে, অসম ডুয়ার্স পর্যটকদের কাছে প্রায় অধরাই। কেননা অনেকেই জানি না তার কথা। তিস্তা থেকে অসমের উদালগুড়ির ধানসিঁড়ি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত, তিরিশ কিমি চওড়া আর ৩৫০ কিমি লম্বা, সেই ডুয়ার্সও নেই আর। কাটছাঁট করে সংকোষ থেকে তিস্তা অবধি দূরত্ব ১৬৮ কিমি। পর্যটকের আনাগোনা বেশি তাই এই ক্ষুদ্র খন্ডে। বেড়াতেও বেশি সময় লাগে না। তার ওপর প্রচার ও প্রসারের অভাবে, এই ছোট্ট অংশের সব জায়গাগুলি সেভাবে প্রচার পায়নি। সমস্যা এটাও। 

কুমারগ্রামদুয়ারের কথাই ধরা যাক। এখান থেকে কালিখোলা ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। সেটি পার হলেই ভুটানের পাহাড়ি গ্রাম। অপূর্ব তার রূপ। ছোট ছোট বাড়ি, মনাস্ট্রি, পাহাড় আর খাপ খোলা তরবারির মতো সংকোষের বাঁক মুহূর্তে বুঁদ করে দেয়। এপাশে, সংকোষ চা বাগান আর বক্সা অরণ্যের সবুজ মোহিত করে তোলে সবাইকেই। নিউল্যান্ড চা বাগান পার করে, বক্সার সবুজ অরণ্যের একদম গা ঘেঁষে থাকা বনবস্তিতে রাত্রি যাপন করেছেন যাঁরা, একমাত্র তাঁরাই জানেন নির্জনতার একটানা গান। কখনও সেখানে ভাগ বসায় বুনো হাতি আর ময়ূরের ডাক। এই অঞ্চলেই ছিল ডুয়ার্সের অন্যতম প্রাচীন কাঠের বন-বাংলো। সংকোষ থেকে খানিকটা পূর্বে রায়ডাক নদী পেরিয়েই আবার বিস্তার বক্সার। এক সময় এই অঞ্চলে বন কেটে বসত গড়ে উঠেছিল চা-বাগানের হাত ধরে। তুরতুরি, হাতিপোতা, জয়ন্তী, রহিমাবাদ, কোহিনুর ইত্যাদি বাগানগুলি দেখতে দেখতে মনেই পড়ে না, অতীতে অসমে যাওয়ার এটিই ছিল প্রধান পথ। আজকের জাতীয় সড়ক তখন স্বপ্ন কেবল। 

 ১৯১৫-১৬ সালে ব্রিটিশ কোম্পানির ট্রান বুলস (গ্লাসগো) জয়ন্তী নদীর ওপর ব্রিজ তৈরী করেছিল। ছিল জয়ন্তী রেল স্টেশন। কাঠ, ডলোমাইট আর প্রয়োজনে বন্যপ্রাণও পাড়ি দিত রাজাভাতখাওয়া হয়ে পশ্চিমে শিলিগুড়ি জংশনের দিকে। সেই ব্রিজ ভেঙে গেছে ১৯৯৩ সালের প্রবল বন্যায়। ব্রিজের মৃতদেহ এখন টুরিস্টদের সেলফি তোলার জায়গা। ২০১৬ সাল নাগাদ একবার নদী পেরিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে জয়ন্তী থেকে হাতিপোতা-শামুকতলার দিকে গিয়েছিলাম। ঝুঁকে থাকা বিরাট মহীরুহ, ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা ডাক, আধো আলো-ছায়ার ছমছমে পথ ইত্যাদি সব কিছু মিলে সে যাত্রা ছিল অনবদ্য। কিন্তু তার পরে পরেই ওই পথ সাধারণ মানুষদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। আজকাল বনবিভাগের সাফারি ছাড়া ঐসব এলাকায় প্রবেশ নিষেধ। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে আস্ত একটি বস্তি। এমনকি জয়ন্তী নামের ছোট্ট জনপদটির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছে পরিবেশ রক্ষার তাগিদে। 

পরিবেশ-উন্নয়ন-অরণ্য ধ্বংস-বন্যপ্রাণ নিধন ইত্যাদি সব রকম তর্ক বিতর্ক সরিয়ে রেখেও বলা যায়, ডুয়ার্সের পর্যটনে কিছুটা হলেও কোপ বসিয়েছে সরকারি নানা সিদ্ধান্ত। ফলে আজকের ডুয়ার্সের পূর্বাংশ এখনও তেমন পরিচিত নয় শুধুমাত্র লাটাগুড়ি-চাপড়ামারি ঘুরে ডুয়ার্স দেখে ফেলা পর্যটকদের কাছে। অথচ ডুয়ার্সের এই সব অঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রয়েছে অত্যন্ত সুন্দর নানা জায়গা। থাকবার জন্য পর্যাপ্ত হোম-স্টে। এমনকি রাজ্যের প্রথম বইগ্রামটিও এই এলাকায়, রাজাভাতখাওয়ার খুব কাছে পাম্পু বস্তিতে। রয়েছে সিকিয়াঝোরার মতো নৌকোবিহারের অনবদ্য স্থান। কিন্তু সমস্যা একটাই। প্রচারের অভাব। ফলে নিউজলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমেই অধিকাংশ পর্যটক দৌড়োন অন্যত্র। কিন্তু যদি ডুয়ার্স নিয়ে কিছু তথ্য জেনে আসা যায়, তবে অন্য অঞ্চলগুলি দেখতে যথেষ্ট সময় লাগবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস আমার।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে দুটি জায়গার কথা। প্রথমটি বক্সা দুর্গ। এটি কবে তৈরি তা নিয়ে প্রামাণ্য কোনও নথি নেই। তবে ১৬৬১ সালে কোচবিহাররাজ প্রাণনারায়ণ এই দুর্গে এক বছর কাটিয়ে ছিলেন বলে মনে করা হয়। ফলে এই দুর্গ বা `জং`-এর বয়েস যথেষ্ট সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এর অধিকার নিয়ে ভুটান ও কোচবিহারের মধ্যে লড়াই লেগে থাকত সবসময়। শেষ পর্যন্ত ১৭৭৩ সালে কোচবিহারের সঙ্গে চুক্তি করে ক্যাপ্টেন জোনস বক্সা অধিকার করলেও, দুর্গটি তখনও পাকাপাকিভাবে তাঁদের অধিকারে আসেনি। সেটি হয় ১৮৬৪ সালে। দুর্গটিকে সংস্কার করে পাথরের দেওয়ালে মুড়ে ফেলা হয়। টিনের ছাদ দেওয়া হয়। নির্মিত হয় অফিসারদের থাকবার ঘর, পোস্ট অফিস। ১৯১৪ থেকে ১৯২৪ অবধি মিলিটারি পুলিশের ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল এই দুর্গটি। কিন্তু ১৯৩০ সাল নাগাদ স্বাধীনতা সংগ্রামের ঝাঁজ বাড়লে, দুর্গকে বদলে দেওয়া হয় কারাগারে। বস্তুত, আন্দামানের সেলুলার জেলের পরেই দুর্ভেদ্যতার দিক থেকে কুখ্যাত ছিল এই বক্সা দুর্গ। মেঘের গায়ের এই জেলখানায় বন্দী ছিলেন বহু পরিচিত স্বাধীনতা সংগ্রামী। তবে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস-কে এখানে বন্দী রাখা হয়েছিল বলে যে কথা এখানকার বাতাসে উড়ে বেড়ায়, সেটি সঠিক নয়। স্বাধীনতা সংগ্রামী ত্রৈলোক্যনাথ বন্দোপাধ্যায়কে নেতাজি সম্বোধন করতেন এখানকার বন্দীরা। সম্ভবত সেখান থেকেই এই রটনা। স্বাধীনতা লাভের পর নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম সদস্য পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বও এখানে বন্দী ছিলেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ অবধি এটি ছিল রিফিউজি তিব্বতিদের ক্যাম্প। বলতে চাইছি, বক্সা দুর্গের ইতিহাস ও চরিত্র এককথায় বর্ণময়। কিন্তু ক`জন জানি সে কথা!                    

নিজের চোখে দেখে এসেছি, কীভাবে আন্দামানের সেলুলার জেলকে জাতীয় স্মারকে পরিণত করে সাজানো হয়েছে। প্রতি সন্ধ্যায় `লাইট অ্যান্ড সাউন্ড` তুলে ধরে সেলুলার জেলের অবর্ণনীয় অত্যাচার আর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আন্দোলন। কুখ্যাত এক জেলখানা কীভাবে বদলে গিয়ে হয়ে উঠেছিল মুক্তিতীর্থ সে কথা জেনে রোমাঞ্চিত হয় পর্যটকেরা। কলকাতার আলিপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারও আজ অসামান্য এই মিউজিয়ামে বদলে গেছে। কিন্তু বক্সা দুর্গের কপালে সেরকম কিছুই জোটেনি। ফলে, অজানাই থেকে গেছে এখানকার কথা। আজ যেন শুধুমাত্র ট্রেক করবার জন্যই এখানে পর্যটকদের আগমন। আর তাঁদের অধিকাংশই `বুড়ি ছোঁওয়া` ছুঁয়ে যান লেপচাখা বা রোভার্স পয়েন্ট ট্রেকের পথে। বক্সার সৌন্দর্য ও ইতিহাস জানানোর প্রয়োজন মনে করেন না কেউ। অথচ ১৭৮৪ সালে লেফটেন্যান্ট ডেভিস ও ১৮৩৮ সালে উইলিয়াম গ্রিফিত বক্সা অরণ্যের দুর্ভেদ্য জঙ্গল ও অপরূপ সভায় মোহিত হয়ে যে উচ্ছসিত প্রশংসা করেছিলেন, তার চাইতে কোনও অংশে কম নয় আজকের বক্সা। আশার কথা, স্বাধীনতা দিবসে আজকাল কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে বক্সা দুর্গ অঞ্চলে। যদিও এখনও তার প্রচার নেই তেমন। প্রত্যেক বছর আলিপুরদুয়ারে ঘটা করে ডুয়ার্স উৎসব পালিত হলেও, ডুয়ার্স নিয়ে সচেতনতা নেই আমাদের নিজেদের মধ্যেই। 

দ্বিতীয় যে জায়গাটির কথা বলব, সেটিও ডুয়ার্সের সমৃদ্ধ ইতিহাসের অংশ হতে পারত। কিন্তু শুধুমাত্র অবহেলা আর উদাসীনতার জন্য নষ্ট হয়ে গেল। আজকের পশ্চিম ডুয়ার্সের মালবাজারের কাছে, রাঙামাটি চা-বাগানের ইউরোপিয়ান কবরটি কিন্তু পর্যটকদের তালিকায় থাকে না। অথচ এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন কবর। এখানে শায়িত ইউরোপ থেকে চা-বাগান প্রতিষ্ঠার কাজে এসে অকালে প্রাণ হারানো টি-প্ল্যান্টার্সরা। ১৮৮০ সালে মৃত রোডেরিক ম্যাকলিডের কবরটিই বোধহয় এখানকার সবচেয়ে পুরোনো। ডুয়ার্স তখন অরণ্যে ঘেরা। সর্বত্রই ঘুরে বেড়ায় হিংস্র শ্বাপদ ও সরীসৃপ। ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের প্রবল উৎপাতে স্থানীয় আদিবাসীরা পর্যন্ত কাবু। সে রকম একটি অজানা জায়গায় ব্যবসা করতে আসা এই ইউরোপিয়ানরা কোনও দিনই ভাবেননি, আর ফিরতে পারবেন নিজ বাসভূমে। এটি শুধু একটি কবরখানা নয়, ডুয়ার্সের ইতিহাসের এক প্রামাণ্য দলিল। কিন্তু এটিও প্রচারের আলোর বাইরে। ফলে, লাটাগুড়ি ও চাপড়ামারির অরণ্য, ওয়াচ টাওয়ার, বন্যপ্রাণ, বিন্দুর জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও লালিগুরাস দেখে ফিরে যাওয়া যে কোনও পর্যটকের কাছে মনে হতেই পারে, ডুয়ার্সে দ্বিতীয়বার যাওয়ার মতো আর আছেটা কী!

অথচ তাঁরা যেতে পারেন শাখাম, ডালিমকোট, গরুবাথান, পাপড়খেতি, লাভা। এই জায়গাগুলির মধ্যে প্রথম দুটি অনেকের কাছেই অপরিচিত। অথচ ডুয়ার্সের দুর্ভেদ্য অঞ্চলের অন্যতম হল হাতিদের আঁতুরঘর শাখাম। গরুবাথান প্রবেশের মুখে চেক পোস্ট থেকে ডান দিকে বেঁকে ফাগু ও মিশন হিলস চা-বাগান পেরিয়ে পৌঁছতে হয় শাখামে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এই পথ সোজা চলে গেছে সুন্দর বস্তি পার করে সামসিংয়ে। গ্যারান্টি দিচ্ছি, হাতির দর্শন না-ও যদি পাওয়া যায়, তাদের ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত হবেন না কেউ। `ভার্জিন বিউটি`র শাখামে নেওরা নদীর অসামান্য রূপ না দেখলে ডুয়ার্স আর জানা হল কোথায়! সত্যিই `এখানে দিনেতে অন্ধকার/ হেথা নিঃঝুম চারিধার/ হেথা উর্ধে উঁচায়ে মাথা দিল ঘুম/ যত আদিম মহাদ্রুম`। গরুবাথানের কাছে, বক্সা দুর্গের মতোই পুরোনো ডালিমকোট দুর্গে ইতিহাস আর মিথ মিলেমিশে একাকার হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, সামসিং থেকে সুনতালিখোলাকে বাঁ হাতে রেখে রকি আইল্যান্ড পেরিয়ে যদি কুমাই যাওয়া যায়, তবে কোথায় লাগে দুন উপত্যকা! কিন্তু কথা ওই একটাই। ডুয়ার্সকে জানতে হবে, চিনতে হবে। একই কথা বলা যায়, ডুয়ার্সের পূর্বদিকে থাকা ছিপছিপি, সেন্ট্রাল ডুয়ার্স চা বাগান, রায়মাটাং, কালচিনির কাজিমান গোলের একক সংগ্রহশালা সম্পর্কেও। আবার মোটামুটি ডুয়ার্সের মাঝামাঝি থাকা বীরপাড়ার কাছের লঙ্কাপাড়া, মাকড়াপাড়া, গারুচিরা ইত্যাদিও অজানা অনেকের কাছে। যেমন জানি না, বীরপাড়ার কাছের বান্দাপানি চা-বাগানে থাকা একশ কুড়ি বছর অতিক্রান্ত চা-গাছটির কথা কিংবা অতি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর টোটোদের বাসস্থান টোটোপাড়া-কেও। যাঁরা শুধুমাত্র লাটাগুড়িকে কেন্দ্র করে ডুয়ার্স ঘুরে বেড়ান, তাঁরা কি জানেন, বিন্দু যেতে প্যারেন হয়ে যে পথ তোদে-র দিকে চলে গেছে, সেই পথে আরণ্যক লেখক বিভূতিভূষণ পা রেখেছিলেন?       

ডুয়ার্সে দ্বিতীয়বার না আসার মূল কারণ আসলে সঠিকভাবে ডুয়ার্সকে না জানা। অবিভক্ত দার্জিলিং জেলার কালিম্পঙ মহকুমা বাদে আর কোনও অংশই ডুয়ার্সের মধ্যে কস্মিনকালেও ছিল না। আজ তো কালিম্পঙ আলাদা জেলা বলেই পরিচিত। কিন্তু না জানার ফলে, অনেকে দার্জিলিংকেও ডুয়ার্সের মধ্যে বলে মনে করেন। এই অজ্ঞতার জন্য তাঁরা দায়ী নন। দায় আমাদের সকলের। না আমাদের পাঠ্য পুস্তকে, না ব্যবহারিক জীবনে, জানাবার ও জানবার আগ্রহ আছে। তাই পর্যটকের চাইতে বাড়ছে টুরিস্টের সংখ্যা, যাঁদের কাছে কোনও স্থানের `কোয়ালিটি` নয়, `কোয়ান্টিটি` বেশি মান্যতা পায়। ফলে `এই এই জায়গা দেখেছি`-এর তাগিদে তাঁরা একবার এলে, দ্বিতীয়বার আর ডুয়ার্সমুখী হন না। 

কিন্তু শুধুই অজ্ঞতা নয়, যোগ হয়েছে উদাসীনতাও। সেটি সরকারি স্তরেই সব চাইতে বেশি। বন্যপ্রাণীদের প্রজননের সময়ে, মোটামুটি বর্ষাকালে, জঙ্গল বন্ধ রাখাই নিয়ম। সেটি নিয়ে কোনও প্রশ্ন আসে না। কিন্তু তা বাদেও, বিভিন্ন সময় নানা নিষেধাজ্ঞায় জেরবার হন পয়সা খরচ করে বেড়াতে আসা মানুষজন। কিছুদিন আগে মূর্তি নদীর একটা অংশ বন্ধ রাখা তার প্রমাণ। এতে কার কী লাভ হল কে জানে, মাঝখান থেকে মুখ পুড়ল ডুয়ার্সের। লাটাগুড়ির জঙ্গল ঘিরে ব্যাঙের ছাতার মতো রিসোর্ট, হোম স্টে গড়ে উঠতে পারে, জঙ্গল কেটে ফ্লাইওভার হতে পারে। তখন পরিবেশের ক্ষতি হলেও, সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট উচ্ছনে গেলেও, যত নিষেধাজ্ঞা সাধারণের ওপর। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অমুক `টোল`, তমুক `ট্যাক্স`। বেড়াতে এসে কে এত হ্যাপা সামলাবে। তাই `একবার দেখেছি, সেটাই যথেষ্ট` হয়ে যাচ্ছে অনেকের কাছে। পরের বার আসবার সূক্ষ ইচ্ছে থাকলেও, সেটি আর বাস্তবায়িত হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রে। আবার কিছু রিসোর্ট, হোম স্টে ও হোটেল মালিকের ব্যবহারও কম দায়ী নয়। অনেকে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়লেও `হসপিটালিটি` ব্যাপারটিই বোঝেন না। ফলে, বেড়াতে এসে অনেকেই নানা অসুবিধের মুখে পড়েন। অন্যদিকে, যেহেতু ডুয়ার্সের অধিকাংশ জনপদ এখনও তেমন ভাবে আধুনিক নয়, ফলে অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে, চিকিৎসার জন্য শিলিগুড়ি ছাড়া উপায় থাকে না। নানা জায়গায় `সুপার স্পেশালিটি` হাসপাতাল থাকলেও, সেগুলি যে আদতে ধোঁকার টাটি, সেটি বুঝতে বেগ পেতে হয় না। অনেক সময় ঝোপ বুঝে কোপ মারতে অভ্যস্ত আবার গাড়ি চালকরাও। বিশেষ করে পাহাড়ের ক্ষেত্রে। এই অঞ্চলের বহু জায়গায় ধ্বসপ্রবণ। মাঝেমাঝেই বন্ধ হয়ে যায় রাস্তা। কখনও হড়পা বানে ভেঙে যায় সড়ক। সেই সময়েই স্বমূর্তি ধরেন অনেক চালক। দশ টাকার পথ বদলে যায় চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকায়। ফলে, ডুয়ার্সে আর একবার বেড়াতে আসার আগে দু`বার ভাবেন অনেকে।

সব মিলিয়ে , অচেনার আনন্দে অনেকেই আর দ্বিতীয়বার মেতে উঠতে চান না। ডুয়ার্স রয়ে যায় সবুজ ন্যাড়া পাহাড়ের মতোই। 


প্রকাশিত: www.a2onuswor.com

Saturday, January 24, 2026


 

।। পাঠ প্রতিক্রিয়া।।

রাজনগর কোচবিহার : অরবিন্দ ভট্টাচার্য
বিয়ন্ড হরাইজন পাবলিকেশন
বিভিন্ন গ্রন্থ, পত্র পত্রিকা, গেজেট ইত্যাদি থেকে ইতিহাস আরোহন করা এক ব্যাপার, আর স্বচক্ষে দেখা সময়কে নিজের মতো লিপিবদ্ধ করা অন্যরকম একটি বিষয়।
প্রথমটি কিছুটা নীরস। সেটাই স্বাভাবিক। অতীতের ঘটনাপ্রবাহ, সাল তারিখ ইত্যাদি সবাইকে আকর্ষণ করে না। একঘেয়ে বিবরণ পাঠককূলকে খানিকটা দূরে রাখে। পান্ডিত্য ও গবেষণা এইরকম লেখার প্রধান স্তম্ভ। ফলে, ঐতিহাসিক তথ্য ও নিরীক্ষণের দিক থেকে গুরুত্ব আলাদা হলেও, রসসিক্ত হওয়ার সুযোগ তাতে কম।
কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অন্যরকম। সেখানে প্রাধান্য পায় ব্যক্তির নিজস্ব দেখা, অনুভব ও প্রকাশ। তাই যখন লেখক বলেন, `....পুজোটা আসত মলয় চন্দন সাবান, জবা কুসুম তেল, কিউটিকিরা পাউডার, আফগান স্নো, অগুরু সেন্টার ঘ্রাণ নিয়ে', তখনই একটা সময়ের ছবি গেঁথে যায় পাঠকের মনে। বিশেষ করে সেই পাঠকরা মুহূর্তেই স্পর্শ করতে পারেন ফেলে আসা কালখণ্ডকে। সেজন্যই দ্বিতীয় ধরণের লেখায় পাঠক একাত্মবোধ করেন। মিলিয়ে নিতে পারেন। লেখকের সঙ্গে মানসভ্রমণে নিজেও লেখক হয়ে ওঠেন।
বর্ষীয়ান সাংবাদিক অরবিন্দ ভট্টাচার্যের `রাজনগর কোচবিহার` বইটি পড়তে পড়তে বারবার এরকম মনে হয়েছে। লেখক বর্ণিত বেশ কিছু ঘটনা আমার জন্মের আগেও হলেও, তিনবিঘা আন্দোলন, ছিটমহল বিনিময়, কেপিপি থেকে গ্রেটার কোচবিহার গণআন্দোলন ইত্যাদি বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী থেকেছি আমরাও। ফলে সেই ইতিহাস বুঝতে বেগ পেতে হয়নি। অন্য যে বিষয়গুলি এসেছে, সেগুলিও অত্যন্ত সহজে উপলব্ধি করেছি লেখকের বলার গুণে। নিজেকে জাহির করার কোনও প্রয়াস তাঁর লেখার মধ্যে নেই, বরং যা দেখেছেন, জেনেছেন সবটাই নির্মোহ লেখনশৈলীতে বিবৃত করেছেন তিনি। নিশ্চিন্ত জানি, এই গ্রন্থটি একটি অন্যধরণের `ডকুমেন্টেশন` হয়ে রইল আগামীর জন্য।
দু`একটি উদাহরণ দিই। কোচবিহারে একসময়ে সংখ্যায় খুব কম হলেও যে ব্রাহ্মরা ছিলেন, সেটা আমরা অনেকেই ভুলে গেছি। অরবিন্দবাবু কিন্তু মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন কোচবিহারের সুনীতি একাডেমির দুরন্ত ছাত্রী আরতি ভৌমিকের কথা। এই আরতি ভৌমিক-ই পরবর্তীতে অঞ্জনা ভৌমিক নামে বাঙালি ছায়াছবির বিখ্যাত নায়িকা হয়েছিলেন। কাজ করেছিলেন উত্তাকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে। সঙ্গীতাচার্যঃ কোমল দাশগুপ্ত, গীতিকার শৈলেন রায়, লোকসঙ্গীত সংগ্রাহক সতীন্দ্র নাথ দে সরকার, চারণ কবি নিবারণ পন্ডিত, বিষহরা গায়ক রাজকুমার গিদাল, গবেষক হরিশচন্দ্র পাল, সাইটোল সম্রাজ্ঞী ফুলতি গিদালি প্রমুখ বিস্মৃতপ্রায় মানুষদের কথা রয়েছে গ্রন্থটিতে। তিনি বলেছেন কোচবিহারে নাট্যচর্চা, খেলাধুলা, সিনেমাহল, মিষ্টির দোকান ইত্যাদির ইতিহাসের কথা। লিখেছেন রাজনগরের লোকসঙ্গীতের ইতিকথা থেকে জাতিসত্বা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের কথা। আর সবটাই বলেছেন নিজের মতো। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো-ই দেখেছেন। বদলাননি নিজস্ব ভাষ্য ও বিশ্বাস।
মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের প্রভাব যে লেখকের ওপর বিরাট সেটা বইটি পড়লেই বোঝা যায়। বারবার উল্লেখিত হয়েছেন মহারাজা। আবার উপেক্ষিত শিল্পী শিবশংকরকেও মনে করেছেন একইরকম আবেগ নিয়ে। একজন সংবেদনশীল লেখক ও মানুষের এমনটাই হওয়া উচিত। অরবিন্দবাবু আমাদের, অনুজদের, এই শিক্ষা দিলেন তাঁর গ্রন্থ দিয়ে।
একটি বিরাট সময়ের খণ্ড খণ্ড ইতিহাস, ঘটনা, কথোপকথন অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীলভাবে লিপিবদ্ধ হওয়ায় বইটি পড়তে একটিবারের জন্যও একঘেয়ে লাগেনি। পাঠককে ধরে রাখার এই গুণ সব লেখকের থাকে না, বিশেষ করে তিনি যখন এমন একটি সময়ের কথা বলছেন যার সম্পর্কে অনেকেরই কিছুই জানা নেই। অস্বীকার করব না, অত্যন্ত সহজভাবে সময়ের সেই বাধা ডিঙোতে পেরেছেন লেখক। পৌঁছে গিয়েছেন লেখকের নিজস্ব `অ্যাটিক রুম`-এ।
দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে কত প্রসিদ্ধ মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন লেখক, তা বইটি পড়লেই বোঝা যায়। তাঁদের নাম উল্লেখ করছি না। পাঠকরা খুঁজে নেবেন এবং নিশ্চিন্ত জানি, অত্যন্ত বিস্মিত হবেন।
বিয়ন্ড হরাইজন পাবলিকেশনের এই বইটি বাঁধাই, কাগজ যথাযথ। অনিরুদ্ধ দেবের প্রচ্ছদটিও বইয়ের বিষয়ের সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। মূল্য ৩০০ টাকা।
নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বইটি পড়লে পাঠক সমৃদ্ধ হবেন। আর গবেষকরাও ক্রমশ বদলে যাওয়া অন্য এক কোচবিহারকে চিনবেন।
(আলোচক: শৌভিক রায়)

Saturday, January 17, 2026


 

শেষ অবধি নাকাল হয় সেই সাধারণ মানুষই 
শৌভিক রায় 

বেলা তিনটে। শহরের এক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। প্রশাসনের নির্দেশে সেটি এখন বন্ধ। এক টোটোরিক্সা চালক প্রবল মিনতি করে চলেছেন। তাঁর রিক্সায় স্কুল ইউনিফর্মে  জনা পাঁচেক শিশু। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, যথেষ্ট খিদে পেয়েছে। চালকের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও রাস্তা খুলল না। 

আমি নিজে দাঁড়িয়ে রয়েছি সহধর্মিনীর জন্য। তিনি তিন কিমি দূর থেকে হেঁটে হেঁটে আসছেন। তাঁর হাঁটুর অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিস্থাপন দরকার। বেশি হাঁটাচলা বারণ। প্রশাসনের তরফে মূল রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে বলে,  শহরের বিভিন্ন গলিপথ ধরে কোনও মতে এই অবধি আসতে পেরেছি। এখান থেকে অন্তত নিজের দ্বিচক্রযানে সহধর্মিণীকে বসিয়ে নিয়ে যেতে পারব। এইটুকু পৌঁছতে পাঁচ কিমির পথ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর বেশি আর এগোতে পারছি না। অসহায়ভাবে অপেক্ষা করে আছি। আমার মতো আরও প্রায় শ` তিনেক মানুষ আটকে আছেন। কারণ? রাজনৈতিক সভা করতে আসা কোনও এক নেতা এই পথ দিয়ে যাবেন। তাঁর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত। প্রায় সাত কিমি দূর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সাধারণ মানুষের চলার পথ। থেমে রয়েছে সব ধরণের পরিবহন। কোনও কোনও জায়গায় রাস্তার এপার থেকে ওপারে পর্যন্ত যেতে দেওয়া হচ্ছে না। 

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, এই না রঙ্গে ভরা বঙ্গ দেশ! অতীতে রাজধানী দিল্লিতেও `ভি ভি আই পি মুভমেন্ট` দেখেছি। বড়জোর দশ থেকে পনেরো মিনিট বন্ধ থাকে কোনও ব্যস্ত সড়ক। আর এখানে? সকাল থেকে রাস্তার দুই ধারে মোটা দড়ি ফেলে রাখা হয়। নেতা যদি বেলা দুটোয় আসেন, রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রায় ঘন্টা দুয়েক আগে থেকে। নিজের কর্মক্ষেত্রে পৌঁছতে কী পরিমাণ সমস্যায় পড়তে হয়, সেটা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন। আর যাঁরা নিত্যযাত্রী, তাঁদের অবস্থা তো আরও করুণ। সেদিন বাসের সংখ্যা নগণ্যে নেমে আসে। প্রবল ভীড়ে ঠাসাঠাসি করে তাঁরা যান। বাড়ি থেকে বেরোতেও হয় অন্যদিনের তুলনায় অনেকটা আগে।     

নির্বাচন এগিয়ে এলে এরকম ঘটনার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয় পথ অবরোধ, পিকেটিং ইত্যাদি। আজকাল পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক হাঙ্গামা, মারপিট, খুন-জখম। আর এসবের সঙ্গে নেতাদের দ্রুত আগমন, পরিদর্শন, গরম ভাষণ, চরম উত্তেজনা। মজা হল, সাধারণ মানুষের জীবন সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া সেই একই প্রশাসন, নেতাদের আগমনে, এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে, সব কিছু অত্যন্ত সুচারুভাবে সেরে ফেলে। অথচ এই কাজটি যদি তারা আগে করত, তাহলে  কোনও কিছুরই প্রয়োজন পড়ত না। দুর্ভাগ্য, সেটি কখনও হয় না। ফলে, আবার সেই চিত্রের পুনরাবৃত্তি। পথে আটকে থাকা। বাসে গাদাগাদি ভিড়। কর্মস্থলে পৌঁছতে রাজ্যের হ্যাপা। এটিই বোধহয় আমাদের একমাত্র নিয়তি। 

তবে সব নেতার কপাল এক রকম নয়। অনেকের ক্ষেত্রেই নিরাপত্তার `ন` পর্যন্ত থাকে না। ফলে সেই নেতার কনভয়ে লাঠি মারা থেকে শুরু করে ঢিল পাটকেল ছোঁড়া হয়, ভেঙে দেওয়া হয় গাড়ির কাঁচ। এসবের নেপথ্যে যে সব মাথা, তারা মেঘনাদের মতোই আক্ষরিক অর্থে অন্তরালে থাকে। এগিয়ে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষকে। কুকীর্তি করে তাঁরা অনেকে ধরাও পড়েন। প্রশাসনের হাত মাথায় থাকায়, ছাড়াও পেয়ে যান। উল্টোদিকে, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর শুরু হয় বিক্ষোভ ও পথ আটকানোর সস্তা রাজনীতি। ভোগে কারা? স্কুল ফেরতা শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে হাসপাতালের পথে যাওয়া মুমূর্ষু রোগী। 

পশ্চিমবঙ্গে পথ অবরোধের ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে মৃতের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। রাজনৈতিক দলগুলির ভেবে দেখার সময় হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের ভালর জন্য কাজ করতে গিয়ে, তারা শেষ পর্যন্ত তাদের সমস্যা বাড়িয়ে দিচ্ছেন না তো? এমনিতেই নেতাদের নিরাপত্তা দিতে হিমশিম খাওয়া প্রশাসন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই সমস্যায় ফেলে। তার ওপর আপনারাও যদি পথ অবরোধ, পিকেটিং করে আরও অসুবিধে করেন, তাহলে আমরা, সাধারণ মানুষরা, যাব কোথায়?

সুশাসনের প্রথম শর্ত হল, নাগরিকদের স্বাচ্ছন্দ্য ও জীবনের নিরাপত্তা প্রদান। বলতে দ্বিধা নেই, সেই শর্ত অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ। `ভি আই পি মুভমেন্ট`-এর নামে যেভাবে সাধারণ মানুষদের নাকাল করা হয়, সেটি যেমন কাম্য নয়, তেমনি সাধারণ মানুষদের, একে অন্যের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে বিভাজনের কু-নীতিও চাই না কেউ। আমরা এমন কোনও `ওয়ার জোন`-এ বাস করি না যে, নিরাপত্তার এত বাড়াবাড়ি করতে হবে কিংবা বিরুদ্ধে স্বরকে স্তব্ধ করে দিতে হবে পরস্পরকে আক্রমণ করে। 

(প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা/ সম্পাদক: শ্রী কৃষ্ণ দেব)      

Friday, January 16, 2026

Tuesday, January 13, 2026







 

`সখী তুমি কার টাকা যার তার।` 

সুতরাং `মুরুব্বি মুরুব্বি হু হু হু.......` 

আজকাল অবশ্য মুরুব্বি একজনই। যে জানো, বুঝে নিও।

আর সখী `সখি` ও `টাকা` ঢাকা দেখে বিচার করবেন না। ওর চেয়ে অনেক বড় ভুল আমরা করেই চলেছি।  তার চাইতে, মন খারাপ হলে, ট্রাক সাহিত্যে নজর দিন। নিরাশ হবেন না।  

(কোনও একদিন চলার পথে করণদিঘি ও নলহাটির কাছে ....)

Sunday, January 11, 2026


 

Saturday, January 3, 2026



অলৌকিক সেই দিনে মায়ের কাছে 

শৌভিক রায় 



দাঁড়িয়ে থাকি। চুপ করে। 
চোখের সামনে সেই জায়গা। এখানেই জন্মেছিলেন মা।

মাটির সেই দোতলা বাড়ি আর নেই। নেই মাটির প্রাচীর আর তার গায়ে লাগানো দরজাও।
তবু জায়গাটা সেই একই.... 

- কী বুঝছ এখন?
ফিসফিস করল হাওয়া।
প্রশ্ন পথ আর পাকুড় গাছেরও। 

বুঝব আর কী! ধরে রেখেছি কোনও ভাবে। নিজেকে।  

বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন মহিলারা। পুরুষেরাও। 
জয়বাংলা পরিচয় দেয় আমাদের। 





মুহূর্তেই হইচই। 
সাদরে ডেকে নেন সবাই ভেতরে। 
পা ভারী হয়ে আসে। এগোই তবু পায়ে পায়েই।

অদূরে তালগাছ। বয়সে মায়ের বড়। 





ওই তো বাড়ি। মাটির। দোতলা।
দাওয়াও বসে মায়ের পিসিমা। চালভাজার বাটি হাতে।  
মাটির পুরু দেওয়াল। জানালার মোটা কার্নিশ।
পেছনের দেওয়ালে দরজা। পুকুরে যাওয়ার।   
সাধনদা হাত ধরে আছে। পুকুরে নামছি আমি। দাদা বসে পারে।
বাড়ির সামনে শ্যাওলা পুকুর।

- এই বসতে দে রে.....বসতে দে..... দাদা বসো বসো..... তোমাদেরই তো বাড়ি....

হ্যাঁ। আমাদেরই বাড়ি। সব কিছুই আমাদের। শুধু হাত বদলে `তোর` আর `আমার`। বোকার মতো। `আমাদের` ভাবি না কেন কখনও! 

- পুকুর তো নেই গা। বুজে গেছে। দেখবে?

ফুটিফাটা মাটি বলে, জল ছিল এখানে। অতল জল ছিল কোনও এক সময়। 





জল শুকোয় না। বাষ্প হয় কেবল। 
মায়ের মতোই। মা চলে যান না। 
থেকে যান নানাভাবে। 

মায়েরা যান না কখনও। জল যেমন জীবন, মা-ও তাই।

- কী গো, কষ্ট হচ্ছে?
উদগ্রীব শুনি হাওয়ার গলা। ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে থাকে পথ আর পাকুড় গাছ। 

- না, ঠিক কষ্ট নয়। কেমন একটা ব্যাপার যেন....বলতে পারছি না, বোঝাতে পারছি না.....

- দাদা, খেয়ে যেতে হবে। 
বলে ওঠে মল্লিক। ওরাই এখন মালিক। এই জমির। এই বাড়ির।
- হ্যাঁ হ্যাঁ।
সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে মহিলারা। 
ওদের কলেজে পড়া ছেলে, স্কুলে পড়া মেয়ে আর অন্য কিশোর-কিশোরীরা ঘিরে ধরে। 
- জয়বাংলাকে বলেছি যে। ওর বাড়িতে রান্না হচ্ছে। খেতের চাল, পুকুরের মাছ, জমির শাক। 
- তা বলে এই দুপুরে না খেয়ে এভাবে কেউ যায়? আমরা কি মামাবাড়ির লোক নই?
- অবশ্যই তাই। তোমরা তো সবাইই তাই। কিন্তু বোঝো তো.....
- মানতে পারলাম না। কষ্ট পেলাম। ভিন জাত বলে খাবে না বোধহয়!
- ভিন জাত? সে আবার কী! না গো। সে সব নয়। 
- তবে? গেরস্থের অকল্যাণ হবে যে। 
- হবে না। তোমরা যা দিলে, এই গ্রাম যা দিল, সে তো এক জীবনের....
- তা বললে হয়?  
- আসব তো আবার। সেবার না হয় মুরগি রেঁধো।
- কথা দিলে?
- দিলাম।  
- বলে গেলেন কিন্তু.....   






বলি। আমরা। সবাই। 
তবু কথা রাখি না। জানি সেটাও। 

ছবি তুলি। সবার সঙ্গে। জড়িয়ে ধরে সকলে। শুভেচ্ছা জানায়। 

ভেসে যায় ধর্মের কচকচি। বেঁচে থাকে মানুষ শুধু। কে বলে কে কোন জাত। আমি জানি, আমিই জাত, আমিই বেজাত।

- দেখেছ ওই দেওয়াল? 
বলে ওঠে হাওয়া। 
- দেখোনি? 
গলা মেলায় পথ আর পাকুড় গাছ। 

দেখেছি আগেই। উত্তরে ভাঙা দেওয়াল। মাটির। বাড়ির শেষ চিহ্ন। 
বুক টনটন করে। হাত রাখি দেওয়ালে। 
মনে হয়, মায়ের মুখে হাত রেখেছি। 

মা যেদিন চলে যান, মায়ের কপাল ছিল বরফ ঠান্ডা। 
কিন্তু মায়ের ওম ছিল আমার বুকে।  
আসলে মায়েরা কোথাও যান না। থেকে যান। জীবনভর। 

দেওয়ালের গায়ে মায়ের গায়ের ওম। 
মনে হচ্ছে, মা জড়িয়ে রেখেছেন আমাকে।




 
প্রণাম করি। আবার প্রণাম করি। 
প্রণাম ছাড়া আর কী করতে পারি?
এই গ্রাম না থাকলে অস্তিত্ব কি থাকত আমার?
দেখতে পেতাম কি এই রূপ রস ঐশ্বর্য? শুনতে কি পেতাম পৃথিবীর গান?
বড় তুড়িগ্রাম আছে বলেই আমিও আবহমান। সেই কবে থেকে....
আর এখন?
প্রবাহিত ধারা আর জীবনের ধারাপাতে, এক্কা দোক্কা খেলতে খেলতে, দাঁড়িয়ে আছি নির্দিষ্ট সময়ের শেষ প্রান্তে.....

অনেক আগেই পায়ে মেখেছি গ্রামের ধুলো। 
এবার ঠেকাই মাথায়।

পেছনে পড়ে থাকে বড় তুড়িগ্রাম। 
রেখে আসি হাওয়া, পথ আর বুড়ো পাকুরকে। 

আবার কখনও, কোনও এক দুপুরে, হয়ত উত্তরাধিকারের শর্ত নিয়ে, ফিরবে কেউ মায়ের কাছে, আমার মতোই......

(শেষ)





(বড় তুড়িগ্রাম বীরভূম জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। আমার মায়ের আদি বাড়ি। দাদু প্রয়াত মৃত্যুঞ্জয় নাগ নিজের বড় দাদার সঙ্গে ভাগ্য অন্বেষণে চলে গিয়েছিলেন বিহারের কাটিহারে। গ্রামের বাড়িতে ছিলেন তাঁদের বোনেরা। বছর পঁয়তাল্লিশ আগে একবার সেই গ্রামে যাওয়ার ও দেখবার সুযোগ হয়েছিল। অতি সম্প্রতি মা টেনে নিয়ে গেলেন সেখানে আবার। এই লেখায় হয়ত আবেগ বেশি। কিন্তু বিন্দুমাত্র খাদ নেই তাতে। বড় অদ্ভুত এই অলৌকিক যাত্রা। রামপুরহাট-সাঁইথিয়া পথে তারাপীঠের পর বীরচন্দ্রপুর। আর তার পরেই বড় তুড়িগ্রাম। রামপুরহাট থেকে অবশ্য আজকাল বাঁ হাতে তারাপীঠকে রেখে, মল্লারপুর হয়ে, রাস্তা সোজা চলে গেছে সাঁইথিয়া। তবে সাবেক রাস্তাটি আজও মোহময়, প্রকৃতির নিজস্ব সাজে সাজানো। সামান্য সময় থাকলেও, সেদিন বড় তুড়িগ্রাম, আমাকে এবং আমাদেরকে যা দিয়েছে তা এক জীবনের সঞ্চয়। যদিও নিতান্ত ব্যক্তিগত এই কথন, তবু ভাগ করছি সবার সঙ্গে।)          


Friday, January 2, 2026


 

অলৌকিক সেই দিনে মায়ের কাছে 
শৌভিক রায় 


জয়বাংলার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। ঠাহর করতে পারছি না কোন দিকে সেই বাড়ি। 
ছোট মামা বলে দিয়েছেন জয়বাংলার কথা। একাত্তর সালে জন্ম। নাম তাই জয়বাংলা। বড় তুড়িগ্রামে, মায়েদের পরিবারের কাছের মানুষ। 
উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে দু`চারজন। বুঝতে পারছি। ভাবছেন, ভর দুপুরে এরা কারা! ভাবাটাই স্বাভাবিক। 

- কে গো তোমরা? কনে থেকে এলে?

বলি। একই কথা। 

- সে কি গা! তুমি লীলুদির ছেলে! বড় জনা?

উত্তর দিই। অবাক হই। মা তো গ্রাম ছেড়ে ছিলেন সেই কবে। শেষবার এসে ছিলেন বছর পঁয়তাল্লিশ আগে। উনি জানলেন কী ভাবে মা`কে!

- গেরাম দেশ। সবাই সবাইকে চিনি গা। তুমাদের ভিটে অবশ্যি নেই এক্ষণে। পাকা বাড়ি হইচে। তুমি দেখেছিলে সে বাড়ি? পুরোনো? এসেছিল কখনও?

হ্যাঁ। এসেছিলাম সেই বছর পঁয়তাল্লিশ আগে। মায়ের সঙ্গে। 
এসেছি আবার আজ। মা-কে ছাড়া দাঁড়িয়ে আছি মায়ের গ্রামে। 





হাজির হল জয়বাংলা। মুখে হাসি। 
- দেরি করলেম। স্নানে গেছিলেম। চলুন চলুন। 
- মামা বলেছেন আপনার কথা।
- কাকা আমাকেও ফোন করেছিল। সৌভাগ্য আমাদের। আপনারা এলেন...
- না, না ওরকম বলছেন কেন! সৌভাগ্য বরং আমাদের। আপনাকে পেলাম।




জয়বাংলা নিয়ে যায় নিজের বাড়ি। পেশায় কলমিস্ত্রি। বাড়িতে তার গৃহিণী। দুই ছেলের বিয়ে দিয়ে নাতি নাতনি নিয়ে ভরা সংসার। তারা অবশ্য নেই এখন। 
গৃহিণী বুঝে পান না কোথায় বসাবেন। 

 - গরিবের বাড়ি। বসুন কোনও রকম।
- গরিবের বাড়ি? সেজন্য দালান কোঠা?

হেসে ফেলি।

- চা খান আগে। 
- এই ভর দুপুরে চা খাব না আর।
- তাহলে একেবারে ভাত খাবেন। ব্যবস্থা অবশ্য কিছুই করিনি। রাতে কিন্তু থাকতে হবে।
- না রে ভাই, সম্ভব নয় সেটাও। যাব বোলপুর। 
- সে বললে হয়! মামাবাড়ি এখন নেই তো, কী হয়েছে! আমরা তো আছি।
- ভিটেটা নিশ্চয়ই আছে?
- আছে। তবে এখন পাকা বাড়ি সেখানে। অন্যদের। 
- সেটা জানি। সেটাই দেখব। 
- সে তো অবশ্যই দেখাবো। কিন্তু আজ রাতে ছাড়ছি না.....
- এবার নয় ভাই। 
- সবাই আমাকে বকবে। বলবে, গ্রামের নাতি এলো, আর থাকল না!

উত্তরে হাসি শুধু। 





রীনা বলে,
- সেই ভিটে কোথায়?
- চলুন তবে, দেখিয়ে আনি।

উঠে পড়ি। পা মেলাই। জয়বাংলার সঙ্গে। 
ধুলো মাখা পথ। হলুদ খড় শুকোতে দিয়েছে কেউ কেউ। 
মাটির বাড়ি। দোচালা। চারচালা। 
টলটলে পুকুর। হাঁসের দল। মস্ত বড় গাছ। মন্দির।
- এই মন্দির কাকার হাতে তৈরি। 




জানতাম ছোট মামা মন্দির তৈরি করেছেন একটি। দাঁড়াই খানিকক্ষণ।
- কে গা বটে?
- কাকার ভাগ্নে।
- কোন কাকার কথা বলছ বটে?
- আরে নাগ কাকা রে। সেই যে মন্দির...
- বটে বটে! মামাবাড়ি দেখতে এসেছে! দেখাও দেখাও।  

হাসি। এগিয়ে যাই। 
পোস্ট অফিস। সাবেক দোকান। পুরোনো মন্দির। দুর্গা মণ্ডপ।




 
- এখানে আমার বরের মামাবাড়ি। দেখতে এসেছে।
রীনার গলা কানে আসে।

অলস রোদে রোয়াকে বসে বধূ।
- ও জয়বাংলা। কোন বাড়ির কথা বলছে?
- আরে নাগ বাড়ি গো, নাগ বাড়ি। সেই যে কাকা এলো, মন্দির, শ্মশান করল....
- বুইচি গো বুইচি। কুটুম তো। অ বৌমা, আমাদের বাড়ি এসো। আমরা ব্যানার্জি। ভাত খেয়ে যাও....

দুজনেই হাত জোড় করি। আবার কখনও।




জয়বাংলা এগিয়ে যায়। পেছনে আমরা। অবশেষে এক বাড়ির সামনে দাঁড়ায় সে।
- দেখুন, চিনতে পারেন কিনা!





হাওয়া ফিসফিস করে। মুখ টিপে হাসে। পথ তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। চোখের দিকে। বুড়ো পাকুড় গাছের চোখে জিজ্ঞাসা। 
- চিনতে পারছ? চিনতে পারছ? 


(ক্রমশ)


(বড় তুড়িগ্রাম বীরভূম জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। আমার মায়ের আদি বাড়ি। দাদু প্রয়াত মৃত্যুঞ্জয় নাগ নিজের বড় দাদার সঙ্গে ভাগ্য অন্বেষণে চলে গিয়েছিলেন বিহারের কাটিহারে। গ্রামের বাড়িতে ছিলেন তাঁদের বোনেরা। বছর পঁয়তাল্লিশ আগে একবার সেই গ্রামে যাওয়ার ও দেখবার সুযোগ হয়েছিল। অতি সম্প্রতি মা টেনে নিয়ে গেলেন সেখানে আবার। এই লেখায় হয়ত আবেগ বেশি। কিন্তু বিন্দুমাত্র খাদ নেই তাতে। বড় অদ্ভুত এই অলৌকিক যাত্রা। রামপুরহাট-সাঁইথিয়া পথে তারাপীঠের পর বীরচন্দ্রপুর। আর তার পরেই বড় তুড়িগ্রাম। রামপুরহাট থেকে অবশ্য আজকাল বাঁ হাতে তারাপীঠকে রেখে, মল্লারপুর হয়ে, রাস্তা সোজা চলে গেছে সাঁইথিয়া। তবে সাবেক রাস্তাটি আজও মোহময়, প্রকৃতির নিজস্ব সাজে সাজানো। সামান্য সময় থাকলেও, সেদিন বড় তুড়িগ্রাম, আমাকে এবং আমাদেরকে যা দিয়েছে তা এক জীবনের সঞ্চয়। যদিও নিতান্ত ব্যক্তিগত এই কথন, তবু ভাগ করছি সবার সঙ্গে।)          

Thursday, January 1, 2026


 

অলৌকিক সেই দিনে মায়ের কাছে 
শৌভিক রায় 

অবশেষে..... ওই যে.... 
বড় তুড়িগ্রাম.....

বুকে চলকে উঠল রক্ত....
 
'কতদিন পর? কতদিন পর?' 
জানতে চাইল হাওয়া। 
যে পথ ঢুকে গেছে এঁকেবেঁকে, তারও জিজ্ঞাসা এক। 
বুড়ো পাকুর গাছটা মাথা নুইয়ে সঙ্গ দিল ওদের।

কতদিন পর মা? কতদিন পর? 

ভেসে এলো মায়ের গলা, 'ওদিকে যাস না, খেজুর কাঁটা ঢুকবে পায়ে....' 
ফিরে তাকাই পেছনে। 
মায়ের পাশে দুই কাকিমা। মেজো কাকিমার কোলে ঝিনি। পাশে আছে দাদা আর বাবা। 

বাতাস জড়িয়ে ধরে সারা গা। শিউরে উঠি। কোথায় কে! বাবা আর নেই। নেই মা আর মেজো কাকিমাও। 
দাদা, ঝিনি আর বড় কাকিমা কোথায় এখানে! ওরা যে যার বাড়িতে। নিজের মতো। 





- ছবি তুলছেন কেন? রাস্তার কাজ হবে নাকি?
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি দাঁড়িয়ে এক মানুষ।

- না।‌ এমনিই তুলছি।
- কোথায় যাবেন বলুন তো?
- মায়ের কাছে।
- মায়ের কাছে? মানে...
- এই গ্রামে জন্মেছিলেন আমার মা। বাড়ি ছিল। নেই আর। বিক্রি হয়ে গেছে। তবু তো মামাবাড়ি! মায়ের বাড়ি। তাই বললাম, মায়ের কাছে....
- বলেন কী! কোন বাড়ি? কোথা থেকে এসেছেন?
- এসেছি কোচবিহার থেকে।
- আরিব্বাস! এত দূর! তা কোন বাড়ি? কোন বাড়ি?
- নাগ বাড়ি। দাদুর নাম ছিল মৃত্যুঞ্জয় নাগ। নিজের দাদাকে নিয়ে চলে যান কাটিহারে। স্কুলে পড়াতেন। ছোট নাগবাবু বলে চিনতেন সবাই ওঁকে। মায়ের জন্ম অবশ্য এখানেই। বাড়ি ছিল। হাতবদল হয়েছে বছর কয়েক আগে।
- নাগ....আছে তো নাগ পরিবার কয়েক ঘর।
- আমাদের আর কেউ নেই। বললাম যে। ছোট জন বাদে মামারাও নেই আর। মা নেই, ছোট মাসি নেই। মেজ মাসি আর ওই ছোট মামা। মামা অবশ্য আসতেন। একটা মন্দির করেছিলেন, শ্মশান তৈরি....
- আরেএএএ.....আপনি কাকার বড়দির ছেলে!! ওই দেখো দেখো .... ওহহহ....কী যে ভাল লাগছে....মামা বাড়ি। ঠিক। একদম। আপনার মামা বাড়ি। কত বড় ব্যাপার। কী দারুণ ব্যাপার। যান যান। উফফফ....দেখেছিস তোরা! নাগ কাকার ভাগ্নে রে। নাগ কাকার ভাগ্নে। মামাবাড়ি দেখতে এসেছে, মায়ের গ্রাম দেখতে এসেছে....
- আপনি চিনলেন? 
- চিনব না? গ্রাম দেশ। সবাই সবাইকে চেনে। আর আপনার মামাবাড়ি তো.......আহা বড় আনন্দ পেলাম, বড় আনন্দ! আপনি এত দূর থেকে এসেছেন....যান দাদা যান। সব্বাই চেনে আপনাদের। শুধু গিয়ে বলবেন। এই বাদলদা, তুমি যাও সঙ্গে। আমাদের গ্রামের গো। গ্রামের নাতি। যাও যাও.....কী যে আনন্দ!

'আর তোমার আনন্দ?' আবার জানতে চাইল হাওয়া, মাটি আর পাকুড় গাছ। 

উত্তর দেব কী! এগিয়ে গেছি ততক্ষণে অনেকটা পথ। ওই তো....ওই সেই বাঁক.... ওখানেই সাধনদা চটি খুঁজে দিয়েছিল। কাদা মাটির ভেতর থেকে। নিয়ে গিয়েছিল পাশের গ্রামে। কামধেনু দেখাতে। সেখানে দেখেছিলাম এক বৃদ্ধাকে। তিনি নাকি পূর্ণদাস বাউলের পিসি। সত্যি মিথ্যে জানিনি সেদিনও। আজও।

'এত মনে রেখেছ! এত কিছু? তুমি তো তখন বেশ ছোট। বোধহয় ক্লাস সেভেন। সিক্স‌ও হতে পারে।' ঝাঁঝিয়ে উঠল হাওয়া।
'রেখেছি। মনে। এই মনে রাখাটা আমার কাল। বুঝলে হাওয়া? স্মৃতি খুব বাজে ব্যাপার। কষ্ট দেয় বড্ড।'
'ও কথা বলো না। যদি ভুলে যেতে, তবে কি আসতে এই পথে? মায়ের কাছে? এভাবে?'

উত্তর দিই না। মুখ ফিরিয়ে রাখি। জল আসে চোখে। দেখাতে চাই না কাউকে। 

গাড়ি ঢুকে যায় গ্রামে.....




(ক্রমশ)

(** বড় তুড়িগ্রাম বীরভূম জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। আমার মায়ের আদি বাড়ি। দাদু প্রয়াত মৃত্যুঞ্জয় নাগ নিজের বড় দাদার সঙ্গে ভাগ্য অন্বেষণে চলে গিয়েছিলেন বিহারের কাটিহারে। গ্রামের বাড়িতে ছিলেন তাঁদের বোনেরা। বছর পঁয়তাল্লিশ আগে একবার সেই গ্রামে যাওয়ার ও দেখবার সুযোগ হয়েছিল। অতি সম্প্রতি মা টেনে নিয়ে গেলেন সেখানে আবার। এই লেখায় হয়ত আবেগ বেশি। কিন্তু বিন্দুমাত্র খাদ নেই তাতে। বড় অদ্ভুত এই অলৌকিক যাত্রা। 

রামপুরহাট-সাঁইথিয়া পথে তারাপীঠের পর বীরচন্দ্রপুর। আর তার পরেই বড় তুড়িগ্রাম। রামপুরহাট থেকে অবশ্য আজকাল বাঁ হাতে তারাপীঠকে রেখে, মল্লারপুর হয়ে, রাস্তা সোজা চলে গেছে সাঁইথিয়া। তবে সাবেক রাস্তাটি আজও মোহময়, প্রকৃতির নিজস্ব সাজে সাজানো। সামান্য সময় থাকলেও, সেদিন বড় তুড়িগ্রাম, আমাকে এবং আমাদেরকে যা দিয়েছে তা এক জীবনের সঞ্চয়। যদিও নিতান্ত ব্যক্তিগত এই কথন, তবু ভাগ করছি সবার সঙ্গে।)