মিলিয়ে যাচ্ছে কি ডুয়ার্স ম্যাজিক?
শৌভিক রায়
চোখের সামনে স্বর্ণকোষের রাজকীয় বিস্তার। অনেকটা উঁচুতে দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি সেটা। ওপারের সবুজ পাহাড় কোথাও কোথাও ন্যাড়া। অনেকটা ডুয়ার্সের মতোই।
স্বর্ণকোষ অর্থাৎ সংকোষ। অসম বাংলার সীমা নির্ধারণ করেছে এই নদী। অসমে ঢুকে অবশ্য নাম বদলেছে। ডুয়ার্সের আর পাঁচটা নদীর মতোই রূপসী সে। বিশেষ করে কুমারগ্রামদুয়ারের কালিখোলায়। দূরত্বের বিচারে রাজধানী কলকাতা থেকে সবচেয়ে দূরের ব্লক এই কুমারগ্রাম। তরঙ্গায়িত সবুজ চা বাগান, খরস্রোতা নদী, দুর্ভেদ্য বক্সা অরণ্য, হাতি আর বাইসনের পাল, বর্ণময় জনজাতি জীবন আর নিজস্ব ইতিহাস নিয়ে নিজের মতোই অনন্য সে। কিন্তু সেভাবে এখানে পর্যটক কোথায়?
কালিখোলা ভুটানে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এই সবই। আজকাল একটা অভিযোগ উঠছে, ডুয়ার্সে একবার এলে আর আসবার প্রয়োজন নেই। সোজা বাংলায়, ডুয়ার্স ম্যাজিক দেখার জন্য একবারই যথেষ্ট। কথাটা সর্বৈব মিথ্যে, সেটা বলা যাবে না। আবার পুরোপুরি সত্য, তেমনও নয়। এক্ষেত্রে আমার নিজস্ব অবস্থানটি মধ্যবর্তী। আসলে ডুয়ার্সের ইতিহাস না জানলে, একবারেই যথেষ্ট। আর যদি জানা যায় অতীত কথা, তবে হয়ত এক জন্মেও শেষ হবে না ডুয়ার্স অন্বেষণ!
অতীতে সমতল থেকে উত্তরে ভুটানে যাওয়ার জন্য পাহাড়পথ ব্যবহার করা হত। এরকম মোট আঠারোটি পাহাড়পথ 'দুয়ার` বা 'দুয়ারগুচ্ছ` নামে পরিচিত ছিল। ইংরেজরা সেখান থেকেই 'door` বা 'dwar` বা দরজা অর্থে, বহুবচনে 'Dooars`বা 'ডুয়ার্স` বেছে নেন। ১৮৬৬ সালে সার্জন রেনি তাঁর 'Bhotan and the Story of Dooar War` বইতে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের তিস্তা থেকে আসামের ধানসিড়ি যদি পর্যন্ত আঠারোটি দুয়ারের উল্লেখ করে গেছেন, যার মধ্যে প্রথম এগারোটিকে বেঙ্গল ডুয়ার্স ও বাকিগুলিকে অসম ডুয়ার্স বলে চিহ্নিত করা হত। বর্তমানে অবশ্য অসম ডুয়ার্সের আর অস্তিত্ব নেই। এখন ডুয়ার্স বলতে তিস্তা নদীর পূর্ব প্রান্ত থেকে সংকোষের পশ্চিম প্রান্ত অবধি বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে বোঝায়। সেই অর্থে, অসম ডুয়ার্স পর্যটকদের কাছে প্রায় অধরাই। কেননা অনেকেই জানি না তার কথা। তিস্তা থেকে অসমের উদালগুড়ির ধানসিঁড়ি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত, তিরিশ কিমি চওড়া আর ৩৫০ কিমি লম্বা, সেই ডুয়ার্সও নেই আর। কাটছাঁট করে সংকোষ থেকে তিস্তা অবধি দূরত্ব ১৬৮ কিমি। পর্যটকের আনাগোনা বেশি তাই এই ক্ষুদ্র খন্ডে। বেড়াতেও বেশি সময় লাগে না। তার ওপর প্রচার ও প্রসারের অভাবে, এই ছোট্ট অংশের সব জায়গাগুলি সেভাবে প্রচার পায়নি। সমস্যা এটাও।
কুমারগ্রামদুয়ারের কথাই ধরা যাক। এখান থেকে কালিখোলা ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। সেটি পার হলেই ভুটানের পাহাড়ি গ্রাম। অপূর্ব তার রূপ। ছোট ছোট বাড়ি, মনাস্ট্রি, পাহাড় আর খাপ খোলা তরবারির মতো সংকোষের বাঁক মুহূর্তে বুঁদ করে দেয়। এপাশে, সংকোষ চা বাগান আর বক্সা অরণ্যের সবুজ মোহিত করে তোলে সবাইকেই। নিউল্যান্ড চা বাগান পার করে, বক্সার সবুজ অরণ্যের একদম গা ঘেঁষে থাকা বনবস্তিতে রাত্রি যাপন করেছেন যাঁরা, একমাত্র তাঁরাই জানেন নির্জনতার একটানা গান। কখনও সেখানে ভাগ বসায় বুনো হাতি আর ময়ূরের ডাক। এই অঞ্চলেই ছিল ডুয়ার্সের অন্যতম প্রাচীন কাঠের বন-বাংলো। সংকোষ থেকে খানিকটা পূর্বে রায়ডাক নদী পেরিয়েই আবার বিস্তার বক্সার। এক সময় এই অঞ্চলে বন কেটে বসত গড়ে উঠেছিল চা-বাগানের হাত ধরে। তুরতুরি, হাতিপোতা, জয়ন্তী, রহিমাবাদ, কোহিনুর ইত্যাদি বাগানগুলি দেখতে দেখতে মনেই পড়ে না, অতীতে অসমে যাওয়ার এটিই ছিল প্রধান পথ। আজকের জাতীয় সড়ক তখন স্বপ্ন কেবল।
১৯১৫-১৬ সালে ব্রিটিশ কোম্পানির ট্রান বুলস (গ্লাসগো) জয়ন্তী নদীর ওপর ব্রিজ তৈরী করেছিল। ছিল জয়ন্তী রেল স্টেশন। কাঠ, ডলোমাইট আর প্রয়োজনে বন্যপ্রাণও পাড়ি দিত রাজাভাতখাওয়া হয়ে পশ্চিমে শিলিগুড়ি জংশনের দিকে। সেই ব্রিজ ভেঙে গেছে ১৯৯৩ সালের প্রবল বন্যায়। ব্রিজের মৃতদেহ এখন টুরিস্টদের সেলফি তোলার জায়গা। ২০১৬ সাল নাগাদ একবার নদী পেরিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে জয়ন্তী থেকে হাতিপোতা-শামুকতলার দিকে গিয়েছিলাম। ঝুঁকে থাকা বিরাট মহীরুহ, ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা ডাক, আধো আলো-ছায়ার ছমছমে পথ ইত্যাদি সব কিছু মিলে সে যাত্রা ছিল অনবদ্য। কিন্তু তার পরে পরেই ওই পথ সাধারণ মানুষদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। আজকাল বনবিভাগের সাফারি ছাড়া ঐসব এলাকায় প্রবেশ নিষেধ। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে আস্ত একটি বস্তি। এমনকি জয়ন্তী নামের ছোট্ট জনপদটির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছে পরিবেশ রক্ষার তাগিদে।
পরিবেশ-উন্নয়ন-অরণ্য ধ্বংস-বন্যপ্রাণ নিধন ইত্যাদি সব রকম তর্ক বিতর্ক সরিয়ে রেখেও বলা যায়, ডুয়ার্সের পর্যটনে কিছুটা হলেও কোপ বসিয়েছে সরকারি নানা সিদ্ধান্ত। ফলে আজকের ডুয়ার্সের পূর্বাংশ এখনও তেমন পরিচিত নয় শুধুমাত্র লাটাগুড়ি-চাপড়ামারি ঘুরে ডুয়ার্স দেখে ফেলা পর্যটকদের কাছে। অথচ ডুয়ার্সের এই সব অঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রয়েছে অত্যন্ত সুন্দর নানা জায়গা। থাকবার জন্য পর্যাপ্ত হোম-স্টে। এমনকি রাজ্যের প্রথম বইগ্রামটিও এই এলাকায়, রাজাভাতখাওয়ার খুব কাছে পাম্পু বস্তিতে। রয়েছে সিকিয়াঝোরার মতো নৌকোবিহারের অনবদ্য স্থান। কিন্তু সমস্যা একটাই। প্রচারের অভাব। ফলে নিউজলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমেই অধিকাংশ পর্যটক দৌড়োন অন্যত্র। কিন্তু যদি ডুয়ার্স নিয়ে কিছু তথ্য জেনে আসা যায়, তবে অন্য অঞ্চলগুলি দেখতে যথেষ্ট সময় লাগবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস আমার।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে দুটি জায়গার কথা। প্রথমটি বক্সা দুর্গ। এটি কবে তৈরি তা নিয়ে প্রামাণ্য কোনও নথি নেই। তবে ১৬৬১ সালে কোচবিহাররাজ প্রাণনারায়ণ এই দুর্গে এক বছর কাটিয়ে ছিলেন বলে মনে করা হয়। ফলে এই দুর্গ বা `জং`-এর বয়েস যথেষ্ট সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এর অধিকার নিয়ে ভুটান ও কোচবিহারের মধ্যে লড়াই লেগে থাকত সবসময়। শেষ পর্যন্ত ১৭৭৩ সালে কোচবিহারের সঙ্গে চুক্তি করে ক্যাপ্টেন জোনস বক্সা অধিকার করলেও, দুর্গটি তখনও পাকাপাকিভাবে তাঁদের অধিকারে আসেনি। সেটি হয় ১৮৬৪ সালে। দুর্গটিকে সংস্কার করে পাথরের দেওয়ালে মুড়ে ফেলা হয়। টিনের ছাদ দেওয়া হয়। নির্মিত হয় অফিসারদের থাকবার ঘর, পোস্ট অফিস। ১৯১৪ থেকে ১৯২৪ অবধি মিলিটারি পুলিশের ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল এই দুর্গটি। কিন্তু ১৯৩০ সাল নাগাদ স্বাধীনতা সংগ্রামের ঝাঁজ বাড়লে, দুর্গকে বদলে দেওয়া হয় কারাগারে। বস্তুত, আন্দামানের সেলুলার জেলের পরেই দুর্ভেদ্যতার দিক থেকে কুখ্যাত ছিল এই বক্সা দুর্গ। মেঘের গায়ের এই জেলখানায় বন্দী ছিলেন বহু পরিচিত স্বাধীনতা সংগ্রামী। তবে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস-কে এখানে বন্দী রাখা হয়েছিল বলে যে কথা এখানকার বাতাসে উড়ে বেড়ায়, সেটি সঠিক নয়। স্বাধীনতা সংগ্রামী ত্রৈলোক্যনাথ বন্দোপাধ্যায়কে নেতাজি সম্বোধন করতেন এখানকার বন্দীরা। সম্ভবত সেখান থেকেই এই রটনা। স্বাধীনতা লাভের পর নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম সদস্য পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বও এখানে বন্দী ছিলেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ অবধি এটি ছিল রিফিউজি তিব্বতিদের ক্যাম্প। বলতে চাইছি, বক্সা দুর্গের ইতিহাস ও চরিত্র এককথায় বর্ণময়। কিন্তু ক`জন জানি সে কথা!
নিজের চোখে দেখে এসেছি, কীভাবে আন্দামানের সেলুলার জেলকে জাতীয় স্মারকে পরিণত করে সাজানো হয়েছে। প্রতি সন্ধ্যায় `লাইট অ্যান্ড সাউন্ড` তুলে ধরে সেলুলার জেলের অবর্ণনীয় অত্যাচার আর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আন্দোলন। কুখ্যাত এক জেলখানা কীভাবে বদলে গিয়ে হয়ে উঠেছিল মুক্তিতীর্থ সে কথা জেনে রোমাঞ্চিত হয় পর্যটকেরা। কলকাতার আলিপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারও আজ অসামান্য এই মিউজিয়ামে বদলে গেছে। কিন্তু বক্সা দুর্গের কপালে সেরকম কিছুই জোটেনি। ফলে, অজানাই থেকে গেছে এখানকার কথা। আজ যেন শুধুমাত্র ট্রেক করবার জন্যই এখানে পর্যটকদের আগমন। আর তাঁদের অধিকাংশই `বুড়ি ছোঁওয়া` ছুঁয়ে যান লেপচাখা বা রোভার্স পয়েন্ট ট্রেকের পথে। বক্সার সৌন্দর্য ও ইতিহাস জানানোর প্রয়োজন মনে করেন না কেউ। অথচ ১৭৮৪ সালে লেফটেন্যান্ট ডেভিস ও ১৮৩৮ সালে উইলিয়াম গ্রিফিত বক্সা অরণ্যের দুর্ভেদ্য জঙ্গল ও অপরূপ সভায় মোহিত হয়ে যে উচ্ছসিত প্রশংসা করেছিলেন, তার চাইতে কোনও অংশে কম নয় আজকের বক্সা। আশার কথা, স্বাধীনতা দিবসে আজকাল কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে বক্সা দুর্গ অঞ্চলে। যদিও এখনও তার প্রচার নেই তেমন। প্রত্যেক বছর আলিপুরদুয়ারে ঘটা করে ডুয়ার্স উৎসব পালিত হলেও, ডুয়ার্স নিয়ে সচেতনতা নেই আমাদের নিজেদের মধ্যেই।
দ্বিতীয় যে জায়গাটির কথা বলব, সেটিও ডুয়ার্সের সমৃদ্ধ ইতিহাসের অংশ হতে পারত। কিন্তু শুধুমাত্র অবহেলা আর উদাসীনতার জন্য নষ্ট হয়ে গেল। আজকের পশ্চিম ডুয়ার্সের মালবাজারের কাছে, রাঙামাটি চা-বাগানের ইউরোপিয়ান কবরটি কিন্তু পর্যটকদের তালিকায় থাকে না। অথচ এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন কবর। এখানে শায়িত ইউরোপ থেকে চা-বাগান প্রতিষ্ঠার কাজে এসে অকালে প্রাণ হারানো টি-প্ল্যান্টার্সরা। ১৮৮০ সালে মৃত রোডেরিক ম্যাকলিডের কবরটিই বোধহয় এখানকার সবচেয়ে পুরোনো। ডুয়ার্স তখন অরণ্যে ঘেরা। সর্বত্রই ঘুরে বেড়ায় হিংস্র শ্বাপদ ও সরীসৃপ। ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের প্রবল উৎপাতে স্থানীয় আদিবাসীরা পর্যন্ত কাবু। সে রকম একটি অজানা জায়গায় ব্যবসা করতে আসা এই ইউরোপিয়ানরা কোনও দিনই ভাবেননি, আর ফিরতে পারবেন নিজ বাসভূমে। এটি শুধু একটি কবরখানা নয়, ডুয়ার্সের ইতিহাসের এক প্রামাণ্য দলিল। কিন্তু এটিও প্রচারের আলোর বাইরে। ফলে, লাটাগুড়ি ও চাপড়ামারির অরণ্য, ওয়াচ টাওয়ার, বন্যপ্রাণ, বিন্দুর জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও লালিগুরাস দেখে ফিরে যাওয়া যে কোনও পর্যটকের কাছে মনে হতেই পারে, ডুয়ার্সে দ্বিতীয়বার যাওয়ার মতো আর আছেটা কী!
অথচ তাঁরা যেতে পারেন শাখাম, ডালিমকোট, গরুবাথান, পাপড়খেতি, লাভা। এই জায়গাগুলির মধ্যে প্রথম দুটি অনেকের কাছেই অপরিচিত। অথচ ডুয়ার্সের দুর্ভেদ্য অঞ্চলের অন্যতম হল হাতিদের আঁতুরঘর শাখাম। গরুবাথান প্রবেশের মুখে চেক পোস্ট থেকে ডান দিকে বেঁকে ফাগু ও মিশন হিলস চা-বাগান পেরিয়ে পৌঁছতে হয় শাখামে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এই পথ সোজা চলে গেছে সুন্দর বস্তি পার করে সামসিংয়ে। গ্যারান্টি দিচ্ছি, হাতির দর্শন না-ও যদি পাওয়া যায়, তাদের ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত হবেন না কেউ। `ভার্জিন বিউটি`র শাখামে নেওরা নদীর অসামান্য রূপ না দেখলে ডুয়ার্স আর জানা হল কোথায়! সত্যিই `এখানে দিনেতে অন্ধকার/ হেথা নিঃঝুম চারিধার/ হেথা উর্ধে উঁচায়ে মাথা দিল ঘুম/ যত আদিম মহাদ্রুম`। গরুবাথানের কাছে, বক্সা দুর্গের মতোই পুরোনো ডালিমকোট দুর্গে ইতিহাস আর মিথ মিলেমিশে একাকার হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, সামসিং থেকে সুনতালিখোলাকে বাঁ হাতে রেখে রকি আইল্যান্ড পেরিয়ে যদি কুমাই যাওয়া যায়, তবে কোথায় লাগে দুন উপত্যকা! কিন্তু কথা ওই একটাই। ডুয়ার্সকে জানতে হবে, চিনতে হবে। একই কথা বলা যায়, ডুয়ার্সের পূর্বদিকে থাকা ছিপছিপি, সেন্ট্রাল ডুয়ার্স চা বাগান, রায়মাটাং, কালচিনির কাজিমান গোলের একক সংগ্রহশালা সম্পর্কেও। আবার মোটামুটি ডুয়ার্সের মাঝামাঝি থাকা বীরপাড়ার কাছের লঙ্কাপাড়া, মাকড়াপাড়া, গারুচিরা ইত্যাদিও অজানা অনেকের কাছে। যেমন জানি না, বীরপাড়ার কাছের বান্দাপানি চা-বাগানে থাকা একশ কুড়ি বছর অতিক্রান্ত চা-গাছটির কথা কিংবা অতি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর টোটোদের বাসস্থান টোটোপাড়া-কেও। যাঁরা শুধুমাত্র লাটাগুড়িকে কেন্দ্র করে ডুয়ার্স ঘুরে বেড়ান, তাঁরা কি জানেন, বিন্দু যেতে প্যারেন হয়ে যে পথ তোদে-র দিকে চলে গেছে, সেই পথে আরণ্যক লেখক বিভূতিভূষণ পা রেখেছিলেন?
ডুয়ার্সে দ্বিতীয়বার না আসার মূল কারণ আসলে সঠিকভাবে ডুয়ার্সকে না জানা। অবিভক্ত দার্জিলিং জেলার কালিম্পঙ মহকুমা বাদে আর কোনও অংশই ডুয়ার্সের মধ্যে কস্মিনকালেও ছিল না। আজ তো কালিম্পঙ আলাদা জেলা বলেই পরিচিত। কিন্তু না জানার ফলে, অনেকে দার্জিলিংকেও ডুয়ার্সের মধ্যে বলে মনে করেন। এই অজ্ঞতার জন্য তাঁরা দায়ী নন। দায় আমাদের সকলের। না আমাদের পাঠ্য পুস্তকে, না ব্যবহারিক জীবনে, জানাবার ও জানবার আগ্রহ আছে। তাই পর্যটকের চাইতে বাড়ছে টুরিস্টের সংখ্যা, যাঁদের কাছে কোনও স্থানের `কোয়ালিটি` নয়, `কোয়ান্টিটি` বেশি মান্যতা পায়। ফলে `এই এই জায়গা দেখেছি`-এর তাগিদে তাঁরা একবার এলে, দ্বিতীয়বার আর ডুয়ার্সমুখী হন না।
কিন্তু শুধুই অজ্ঞতা নয়, যোগ হয়েছে উদাসীনতাও। সেটি সরকারি স্তরেই সব চাইতে বেশি। বন্যপ্রাণীদের প্রজননের সময়ে, মোটামুটি বর্ষাকালে, জঙ্গল বন্ধ রাখাই নিয়ম। সেটি নিয়ে কোনও প্রশ্ন আসে না। কিন্তু তা বাদেও, বিভিন্ন সময় নানা নিষেধাজ্ঞায় জেরবার হন পয়সা খরচ করে বেড়াতে আসা মানুষজন। কিছুদিন আগে মূর্তি নদীর একটা অংশ বন্ধ রাখা তার প্রমাণ। এতে কার কী লাভ হল কে জানে, মাঝখান থেকে মুখ পুড়ল ডুয়ার্সের। লাটাগুড়ির জঙ্গল ঘিরে ব্যাঙের ছাতার মতো রিসোর্ট, হোম স্টে গড়ে উঠতে পারে, জঙ্গল কেটে ফ্লাইওভার হতে পারে। তখন পরিবেশের ক্ষতি হলেও, সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট উচ্ছনে গেলেও, যত নিষেধাজ্ঞা সাধারণের ওপর। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অমুক `টোল`, তমুক `ট্যাক্স`। বেড়াতে এসে কে এত হ্যাপা সামলাবে। তাই `একবার দেখেছি, সেটাই যথেষ্ট` হয়ে যাচ্ছে অনেকের কাছে। পরের বার আসবার সূক্ষ ইচ্ছে থাকলেও, সেটি আর বাস্তবায়িত হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রে। আবার কিছু রিসোর্ট, হোম স্টে ও হোটেল মালিকের ব্যবহারও কম দায়ী নয়। অনেকে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়লেও `হসপিটালিটি` ব্যাপারটিই বোঝেন না। ফলে, বেড়াতে এসে অনেকেই নানা অসুবিধের মুখে পড়েন। অন্যদিকে, যেহেতু ডুয়ার্সের অধিকাংশ জনপদ এখনও তেমন ভাবে আধুনিক নয়, ফলে অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে, চিকিৎসার জন্য শিলিগুড়ি ছাড়া উপায় থাকে না। নানা জায়গায় `সুপার স্পেশালিটি` হাসপাতাল থাকলেও, সেগুলি যে আদতে ধোঁকার টাটি, সেটি বুঝতে বেগ পেতে হয় না। অনেক সময় ঝোপ বুঝে কোপ মারতে অভ্যস্ত আবার গাড়ি চালকরাও। বিশেষ করে পাহাড়ের ক্ষেত্রে। এই অঞ্চলের বহু জায়গায় ধ্বসপ্রবণ। মাঝেমাঝেই বন্ধ হয়ে যায় রাস্তা। কখনও হড়পা বানে ভেঙে যায় সড়ক। সেই সময়েই স্বমূর্তি ধরেন অনেক চালক। দশ টাকার পথ বদলে যায় চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকায়। ফলে, ডুয়ার্সে আর একবার বেড়াতে আসার আগে দু`বার ভাবেন অনেকে।
সব মিলিয়ে , অচেনার আনন্দে অনেকেই আর দ্বিতীয়বার মেতে উঠতে চান না। ডুয়ার্স রয়ে যায় সবুজ ন্যাড়া পাহাড়ের মতোই।
প্রকাশিত: www.a2onuswor.com
























